দীঘিনালায় এক পাহাড়ি কিশোরীকে ধর্ষণের পর হত্যা : আর কতকাল ‘ধুন্দুক’ খেতে হবে?

ইদানীং দিনগুলো কেমন যেন মনে হচ্ছে। কেমন এক ধরনের অস্বস্তি কাজ করে – কখন কোথায় কী ঘটে। আজকেও এক ভয়ানক ও নৃশংস ঘটনা দেখার দুর্ভাগ্য হলো।এই ঘটনাটা দেখে কী লিখবো ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না। লেখার শিরোনামটা কী দেবো তাও বুঝতে পারছি না।চাকমা-বাংলা মিলে লেখার শিরোনামটা দিলাম দীঘিনালায় এক পাহাড়ি কিশোরীকে ধর্ষণের পর হত্যা:  আর কতকাল ধুন্দুক খেতে হবে?”?ধুন্দুক চাকমা শব্দ যার বাংলার অর্থ আফশোস বা দীর্ঘশ্বাস। পার্বত্য চট্টগ্রামে যেসব ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটে যাচ্ছে সেগুলো দেখলে অসহায় হয়ে আফশোস করা বা দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া করার কিছুই নেই। আজকের ঘটনাটা দেখেও তা করা ছাড়া কিছুই করতে পারিনি।নিজেকে প্রশ্ন করি, আমরা কোন সমাজে বসবাস করছি?

আজ দুপুরে হঠাৎ ফোন বেজে উঠলো। জনৈক বন্ধু ফোন করে জানালো, গতকাল রাতে দীঘিনালায় সেটেলার বাঙালিরা নাকি এক ছোট মেয়েকে ধর্ষণ করে হত্যা করেছে। ঐ মেয়ের লাশ খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালে আনা হয়েছে। সে আরো বললো, যদি সময় হয় তো তাহলে কিছু একটা করা যায় কী না দেখে আসো। ঐ সংবাদ শুনে আর স্থির থাকতে পারিনি। ছুটে গেলাম হাসপাতালে। যা দেখলাম এবং শুনলাম তা রীতিমত মর্মান্তিক ও জঘন্যতম। কোন জঘন্যতম বিশেষণ দিয়েও এ ঘটনাকে ব্যাখ্যা করা যাবে না।

ঘটনার বিবরণঃ

কামক্যাছড়া থেকে আসা লোকজনের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, ঘটনাটা গতকাল রাতে ঘটেছিলো দীঘিনালার কামক্যাছড়া গ্রামে।ঐ গ্রামের তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্রী সুনিমিকা চাকমাকে গণধর্ষণ করে হত্যা করা হয়। আজ সকালে সুনিমিকার লাশ উদ্ধার করে খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালে আনা হয়।

লাশের সাথে আসা নিহত সুনিমিকাদের জনৈক প্রতিবেশী জানান, গতরাতে আনুমানিক ৮.০০/৯.০০টার দিকে সুনিমিকাকে সিগারেট কিনে আনতে দোকানে পাঠানো হয়।সিগারেট আনতে গিয়ে সুনিমিকা আর বাসায় ফিরেনি। তার মা নাকি মনে করেছিলো, সুনিমিকা হয়তো কারোর সাথে অন্য কোন বাসায় গেছে। তাই রাতে আর তার খোঁজ খবর নেওয়া হয়নি। ঐ প্রতিবেশী আরো জানায়, কামক্যাছড়ার কাছাকাছি সেটেলার পাড়া জিয়ানগর। ঐ জিয়ানগরের এক বাঙালি মহিলা সকাল বেলায় পানি আনতে গিয়ে সুনিমিকার লাশ দেখতে পায়। সঙ্গে সঙ্গে সে আশেপাশের লোকজনকে খবর দেয়।পরে থানায় খবর দেওয়া হয়। পুলিশ গিয়ে লাশ উদ্ধার করে। পরে পোস্টমর্টেম করার জন্যে খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়।

সুনিমিকার মৃতদেহ দেখলে মানবিক হৃদয় সম্পন্ন যে কোন মানুষকে চরমভাবে নাড়া দেবে। তাকে এমন নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে ভাষায় ব্যক্ত করা কঠিন।মুখে ছোপ ছোপ জমাট বাঁধা রক্ত।সম্ভবত গলা টিপে খুন করা হয়েছে। নরপশুরা গণধর্ষণ করে খুন করেছে মনে হয়। পায়ে আঘাতের চিহ্ন।সম্ভবত নরপশুদের নির্যাতন হতে বাঁচার জন্যে সে আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলো।

ঘটনায় কারা জড়িত?

যখন হাসপাতালে যাই, তখন দেখি একটি চাঁদের গাড়ীতে চাদর দিয়ে সুনিমিকার লাশ হাসপাতালের সামনে রাখা হয়েছে। গাড়ীর আশেপাশে কিছু লোক জড়ো হয়ে আছে। সাংবাদিকরা ছিলো।তারা সুনিমিকার আত্মীয়স্বজনদের সাথে কথা বলতে চাচ্ছিলো।জানতে চাচ্ছিলো কারা এ ঘটনার সাথে জড়িত? কিন্তু কেউই সঠিক তথ্য দিতে পারছিলো না।

সুনিমিকার নিকট আত্মীয় বলতে কেবল তার নানা সেখানে উপস্থিত ছিলো।জানা গেছে, সুনিকার বাবা নেই। মা আছে, তবে তার মা আসতে পারেনি।সুনিমিকার নানাও সুনিমিকাদের গ্রাম থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে থাকে। তাই তার নানাও তেমন তথ্য দিতে পারছিলো না। চেহারা দেখে বুঝা যাচ্ছে, সুনিমিকার নানা এক নিরীহ গরীব লোক। সুনিমিকাদের জনৈক প্রতিবেশী তথ্য দিতে চাচ্ছিলো। সেও যা শুনেছে তা বলে যাচ্ছিলো।কিন্তু সাংবাদিকদের প্রশ্নে সে কী বলবে তাও ভেবে পাচ্ছিলো না বলে মনে হলো।

কিছুক্ষণ পর এক মহিলা এলো। তাকে দেখিয়ে দিয়ে বলা হলো, ঐ মহিলার সাথে কথা বলতে।ঐ মহিলার চারপাশে সাংবাদিকরা ভীড় করলো। ঐ ভীড়ে আমিও ঢুকলাম। শুনছিলাম কে কী প্রশ্ন করছিলো আর ঐ মহিলা কী কী উত্তর দিচ্ছেন। প্রথমে সাংবাদিকরা সুনিমিকার পরিচিতি নিলো। পিতামাতার নাম, গ্রাম ঠিকানা আর পরিবারে কে কে আছে ইত্যাদি তথ্য জেনে নিলো। বিভিন্ন প্রশ্নের এক পর্যায়ে এক সাংবাদিক মহিলাকে জিজ্ঞেস করলেন, “ঘটনায় কারা জড়িত থাকতে পারে বলে সন্দেহ হয়?” মহিলার সরাসরি উত্তর দিলো, “পার্বত্য চট্টগ্রামে এতদিন কারা ধর্ষণের ঘটনা ঘটিয়ে আসছে? যারা ঘটিয়ে আসছে, তারাই এই ঘটনা ঘটিয়েছিলো বলে মনে করি।” সরাসরি সেটেলার বাঙালিদের নাম উল্লেখ না করলেও সেটেলাররা এ ঘটনা ঘটিয়েছিলো বলে তিনি মনে করেন।

পার্শ্ব কথাবার্তা ও গুরুত্বপূর্ণ  তথ্যাবলী

ঐ মহিলার নাম ছিলো রণিকা দেওয়ান।রণিকার কথা শুনার পর এদিক ওদিক হাঁটছিলাম। শুনার চেষ্টা করছিলাম কে কী বলছিলো। একপাশে ৩/৪ জন পুরুষ জড়ো হয়ে কথা বলছিলো। তাদের কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়ালাম। এক লোক বলছিলো, “এই মাত্র শুনে এলাম এক বাঙালি মহিলা রোগী (সুনিমিকাদের পাশের গ্রাম থেকে) বলছে, ওদের পরিবার (সুনিমিকাদের পরিবার) নাকি চরিত্রহীন।মদ বিক্রি করে”।ঐ লোকটা এমনভাবে নির্দেশ করছিলো, মদের সাথে দেহও বিক্রি হয় বোধয়। ঐ লোকের কথা শুনে চুপ থাকতে পারিনি।প্রতিবাদের সুরে প্রশ্ন রাখলাম, “তাতে কী? তাই বলে কী এক অল্প বয়সী মেয়েকে গণধর্ষণ করে খুন করা হবে? এটা কোন সভ্যতা? এটা কোন মানবতা?” ঐ লোকগুলো আর কথা বাড়ায়নি।চুপচাপ করে ছিলো। ওরা সুনিমিকাদের প্রতিবেশি কি না তা জিজ্ঞেস করা হয়নি।

এরপর আরো দু’এক জনের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, সুনিমিকার মা বিধবা। দুইবার ঘর করেছে। দু’ঘরেই তার স্বামী মারা গেছে।তার চার মেয়ে দুই ছেলে। সুনিমিকা ছিলো আগের ঘরের মেয়ে।যেটুকু অনুধাবন করতে পেরেছি সেটা হলো, বিধবা হওয়ার কারণে সুনিমিকার মা’কে অনেক সংগ্রাম করে জীবন চালাতে হচ্ছে। জীবনের ঘানি টানতে হয়তো সে মদও বিক্রি করে।

সুনিমিকার মা’র সাথে কথা বলা সম্ভব হয়নি – আসল ঘটনাটা কী ছিলো। তবে ঘটনার বিবরণে অনুমান করা যায়, সেই মদের খদ্দেররাই তার মেয়েকে খুন করেছিলো।সুনিমিকার মার সাথে কথা বললে প্রকৃত ঘটনার কারণ বের হয়ে আসবে।

অতঃপর আরো চমকপ্রদ তথ্য

লাশ পোস্টমর্টেম করার জন্যে ডাক্তার খুঁজাখুঁজি হচ্ছিলো। ডাক্তার খুঁজার এক ফাঁকে রণিকার সাথে আরো দু’এক জনের মধ্যে হাসপাতালের বারান্দায় এক কোণে আলাপ হচ্ছিলো। রণিকার ভাষ্যমতে, সুনিমিকার হত্যার সাথে একটা চাকমা ছেলেও জড়িত থাকতে পারে। ঐ চাকমা ছেলেটাই সুনিমিকাকে সিগারেট আনতে দোকানে পাঠিয়েছিলো।সুনিমিকার সিগারেট আনতে যাওয়ার পর ঐ চাকমা ছেলেটাও নাকি উধাও হয়ে গিয়েছিলো।সেই চাকমা ছেলেটার সাথে সেটেলার ছেলেদের সম্পর্ক খুবই ঘনিষ্ঠ।চাকমা ছেলেটা মদ গাঁজায় আসক্ত এবং এ ব্যাপারে তার গ্রামে বেশ নাম ডাক রয়েছে।

উল্লেখ্য, সুনিমিকাদের আরো এক প্রতিবেশি জানিয়েছে, বিজুর আগে কাসেম নামে জনৈক এক সেটেলার সুনিমিকার বড় বোনকে উত্যক্ত করতে গিয়েছিলো।

এ লেখা তৈরী করার সময় পর্যন্ত দীঘিনালাতে মামলা করা হয়নি। জানা গেছে, ঐ চাকমা ছেলেটার কারণে নাকি গ্রামবাসীরা দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে আছে কী করবে। মামলা করলে ঐ চাকমা ছেলেটার বিরুদ্ধেও করতে হয়।

শেষ কথা

সুনিমিকা এখনো শিশু। সে কেবল তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্রী। আমাদের সমাজে এক নিষ্পাপ শিশুর এমন করুন মৃত্যু আমরা কখনো কামনা করি না। এমন নিষ্ঠুর পাশবিক আচরণ আমরা সহ্য করতে পারি না। এর একটা দৃষ্টান্তমূলক বিচার হওয়া উচিত।

প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য, অবস্থাদৃষ্টে প্রতিভাত হয় সুনিমিকার মা বিধবা হিসেবে অত্যন্ত অসহায়।যদি উল্লেখিত চাকমা ছেলেটাও ঘটনার সাথে জড়িত থাকে, এবং সে যদি একটু প্রভাবশালী হয় তাহলে সুনিমিকার মায়ের পক্ষে মামলা করা কঠিন হতে পারে। আরও উল্লেখ্য, লাশের সাথে হাসপাতালে আসা দু’একজনকে বলতে শুনেছি সুনিমিকাদের পরিবার (মানে সুনিমিকার মা) ভালো নয়, মদ বিক্রি করে। চরিত্রহীন, মদ বিক্রেতা ইত্যাদি ইত্যাদি বলে সুনিমিকার মাকে চাপে রাখার একটা সম্ভাবনা রয়ে গেছে।চরিত্রহীনতার দোহাই দিয়ে ঘটনাকে অন্যখাতে প্রভাবিত করার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। এই প্রেক্ষিতে সুনিমিকার মায়ের পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন। সরেজমিনে ঘটনা তদন্ত করার জন্যে এবং সুনিমিকার মায়ের প্রতি সহযোগিতা ও সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দিতে বিবেকবান ব্যক্তি ও সংগঠনসমূহের এগিয়ে আসা এ মুহুর্তে খুবই জরুরী।অন্যথায় এ নৃশংস ঘটনাটা ধামাচাপা পড়ে যেতে পারে।

বিশেষদ্রষ্টব্য: সুনিমিকার হত্যার ঘটনা বিচারের ব্যাপারে স্থানীয় রাজনৈতিক দল জেএসএস ও ইউপিডিএফ কর্মীদের জোরালো ভূমিকা রাখা আবশ্যক। একটা চাকমা ছেলে জড়িত থাকতে পারে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। সেই চাকমা ছেলেটাও যাতে পার না পায় সে ব্যাপারে তাদের কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। এ ঘটনার বিচার না হলে এ ধরনের জঘন্য অপরাধ প্রবণতা জুম্ম সমাজে ছড়িয়ে পড়তে পারে। কাজেই এখনই জেএসএস ও ইউপিডিএফকে এ ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/420

দুই আঙুলের চিঠি- অডং চাকমা

আজকের লেখাটা খাগড়াছড়ি শহরের ব্রিজের গোড়ার পাশে একটা মোটর সাইকেল গ্যারেজে দুই বন্ধুর মধ্যে আলাপ নিয়ে। আলাপের বিষয়বস্তু ছিলো জুম্মদেরই যাপিত জীবনের অব্যক্ত বেদনা নিয়ে সর্বশেষ ঘটনাবলী নিয়ে।

দু’জনের নাম কী জানা হয়নি।তাই তাদের একজনের নাম দিলাম অমগদ চাকমা আর অন্যজনের নাম উরিপ্প্যা চাকমা।তাদের দু’জনের আলাপ থেকে যা উদ্ধার করা গেছে, সেখান থেকে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পেরেছি অমগদ চাকমা পেশায় ঠিকাদার আর উরিপ্প্যা চাকমা অ্যাকটিভিস্ট যাকে প্রচলিত ভাষায় বলা যেতে পারে রাজনৈতিক কর্মী।আলাপের ধরন থেকে এও অনুমান করতে পেরেছি, অমগদ চাকমাও এক সময় রাজনৈতিক কর্মী ছিলো।সময়ের বিবর্তনে সে আজ ঠিকাদার আর উরিপ্প্যা এখনো রাজনৈতিক কর্মী।তবে সে রাজনৈতিক কর্মী হলেও যেখানে শুরু হয়েছিলো সেখানে তার অবস্থান স্থায়ী হয়নি।সহজ ভাষায়, উরিপ্প্যা হলো দল বদল করা রাজনৈতিক কর্মী।

বিজুর পর ঐ গ্যারেজে অমগদ চাকমা ও উরিপ্প্যার মধ্যে প্রথম সাক্ষাৎ হলো বলে মনে হলো। সেদিন অমগদ চাকমা মেরামতের জন্যে তার মোটরবাইকটা গ্যারেজে নিয়ে এসেছিলো। মেরামত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সে মোটরবাইকের গ্যারেজে অপেক্ষা করছিলো।এমন সময় পেছন দিক থেকে উরিপ্প্যা এসে তার কাঁধে ঝাঁকি দিয়ে বললো, “হেই, তুই এখানে একমনে বসে কী করছিস”?

অমগদ একটু উচ্ছ্বাস নিয়ে উরিপ্প্যাকে বললো, “আরে তুই! কেমন আছিস”?

উরিপ্প্যা কোন রাখঢাক না করে বললো, “কেমন আর থাকবো!এখন নৌকায় দাঁড় টানি।এছাড়া কী আর উপায় আছে?”

অমগদ বললো, “তা তো জানি।তাতে তুই তো বেশ ভালোই আছিস…”।উরিপ্প্যা অমগদকে কথাটা শেষ করতে দিলো না। বললো, “আরে ভালো নেই। নৌকায় দাঁড় টানা কত যে কঠিন কাজ তোরে কীভাবে বুঝাই?”

ঠিকভাবে বুঝতে পারলাম না, উরিপ্প্যা কীভাবে দাঁড় টানে আর নৌকায় দাঁড় টানার বিনিময়ে কী কী পায়।তবে দু’জনের আলাপ থেকে এটুকু বুঝা গেলো, একসময় জেএসএস সমর্থিত পাহাড়ী ছাত্রপরিষদের কর্মী ছিলো।জেএসএস তথা পাহাড়ের রাজনীতির দূরবস্থার কারণে সে না পারে গ্রামে যেতে, না পারে শহরে থাকতে। শহরে থাকতে হলে পয়সার প্রয়োজন।এই দুরবস্থায় বেঁচে থাকার জন্যে কিছু একটা পাওয়ার আশায় জেএসএস বাদ দিয়ে ক্ষমতাসীন দলে যোগ দিয়েছে।মনে হলো, সে এখন টেন্ডারবাজি করে।

অমগদকে বললো, “আমি তো জানি। তোর হাতে এখন বেশ কিছু ভালো কাজ আছে। যে যাই বলুক, তুই ঠিকাদারি করে পয়সা কামাচ্ছিস।স্বাধীনভাবে বেঁচে আছিস।বেঁচে থাকার জন্যে অন্তত আমার মত তোকে লড়াই করতে হচ্ছে না।”

“দোস্ত, তুই পড়স নাই, নদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিঃশ্বাস, ওপারে তে আছে যতসুখ আমার বিশ্বাস”।অমগদ উরিপ্প্যাকে আরো বললো, “সবই ভুল। জাতি হিসেবে আমরা এখন মহা ভ্রান্তি বিলাসে ডুবে আছি।স্বাধীন নয়, কত পরাধীন হয়ে, কত মান-মর্যাদা বিসর্জন দিয়ে ঠিকাদারি করছি। দুঃখের কথা তোরে কীভাবে বলি?”

উরিপ্প্যা মনে হয় যেন কিছু না বুঝে জিজ্ঞেস করলো, “তোর আবার মান-মর্যাদা, স্বাধীনতা বিসর্জন দিতে হয় কেন?”

অমগদ কোন উত্তর না দিয়ে তার পকেটে থেকে একটা হলদে খাম বের করলো। খামটা এমনভাবে ভাঁজ করা মুখটা আঁটা দিয়ে লাগাতে হয়নি। খামটা খুলে দু’আঙুলের মত ছোট্ট একটা চিরকুট বের করলো।উরিপ্প্যাকে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলো, “এটা কী জিনিস, চিনিস?”

“হা হা হা। সেটা আবার কী! চিরকটু।” উরিপ্প্যা না চেনার ভান করে উত্তর দিলো।

অমগদ একটু উত্তেজিত হয়ে বললো, “আরে বুদাই, চিরকুট না।এটা হলো দুই আঙুলের চিঠি।তুইও কত লিখেছিলে মনে নেই? দুই আঙুলের চিঠি দিয়ে তোর দাদারা আমার জন্যে অপেক্ষা করে কমলছড়ি বটতলিতে।চারটার মধ্যে পৌঁছতে না পারলে মাথার খুলি উড়ে যেতে পারে।”

“হা হা হা।এখন একটু বুঝতে পেরেছি। কিন্তু আমি তো অনেক আগেই চিরকুট লেখা বন্ধ করে দিয়েছি।তার বদলে এখন নৌকায় দাঁড় টানি।”

অমগদ উরিপ্প্যার সাথে আর বেশি কথা বাড়ালো না। সারসংক্ষেপ করে অমগদ যা বললো সেটা হলো এরকমঃ

“সে তার পাঁচ বছরের ঠিকাদারী জীবনে অনেক দুই আঙুলের চিঠি পেয়েছে।ইদানিং এই চিঠির সংখ্যা আরো বেশি বেড়েছে। তিনটা গ্রুপই (সন্তুজ-গুন্ডুষ-ফান্ডুস) দুই আঙুলের চিঠি লেখে। যার যে এলাকায় প্রভাব বেশি সে এলাকায় বেশি লিখে।দুই আঙুলের চিঠিতে সংগ্রামী শুভেচ্ছা জানানো হলেও মূল বিষয় “সহযোগিতা”, সহজ প্রচলিত ভাষায় “চাঁদা”। চাঁদা দিতে দিতে জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। দুই আঙুলের চিঠির দৌরাত্ম্যে সৎভাবে ঠিকাদারি করা সম্ভব নয়। যার কুফল জনগণকে ভোগ করতে হয়। ভাড়া রাস্তা, ভাঙা বাড়ী, ভাঙা সেচ ড্রেন ইত্যাদি ইত্যাদি।কোন একটা জায়গায় এক একটা ইট কুড়ালেই দুই আঙুলের চিঠি আসে। নিজের বাড়ী বানালেও এখন দুই আঙুলের চিঠি আসে।দুই আঙুলের চিঠিতে অনেক টাকা জমে। টাকা জমলে অস্ত্র আসে, গোলা বারুদ আসে।অবশেষে অস্ত্র-গোলা বারুদ ভ্রাতৃঘাতী হানাহানিতে ব্যবহার হয়।সংঘাত জিইয়ে থাকে। এতে অনেক তাজা প্রাণ ঝরে, রক্ত ঝরে।অশ্রু ঝরে। বাঘাইছড়ির দুই বছরের শিশু অর্পিরা মরে।বিচারের বাণী নির্ভৃতে কেঁদে মরে। জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার? সে তো এখন সন্তুজ-গুন্ডুষ-ফান্ডুস‘দের মুখের ফাঁকা বুলি।”

উরিপ্প্যার প্রশ্ন, “তাহলে দুই আঙুলের চিঠি লেখা বন্ধ করার ব্যবস্থা করলে তো হয়।”

অমগদ’র প্রশ্ন, “কীভাবে?”

“ইট, লোহা, বালি, সিমেন্ট, কংকর, পাকা রাস্তা, কাঁচা রাস্তা, গাছবাঁশ ইত্যাদি দুই আঙুলের চিঠি লেখায়।এসব পাহাড়ে বন্ধ করলেই তো সব ল্যাটা চুকে যায়”।

অমগদ’র প্রশ্ন, “সত্যি যায় কি?”

উরিপ্প্যা চুপচাপ।

অবশেষে অমগদ দুই আঙুলের চিঠির সমীকরণ মেলায় এভাবেঃ দুই আঙুলের চিঠি = অনুন্নতি + জনদুর্ভোগ + ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত++”।

অতএব, দুই আঙুলের চিঠি বন্ধ হওয়া জরুরী।

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/369

কিপটে ঠিকাদারের বিবেক দংশন- অডং চাকমা

গত লেখাতে ঠিকাদার অমগদ চাকমা’র দুই আঙুলের চিঠি নিয়ে একটা ছোটগল্প লিখেছিলাম।আজকে তার বন্ধু কিপটে ঠিকাদার ও দুই জনদরদী(!) চাঁদাবাজের কাহিনী নিয়ে এ লেখা।

নিশ্চিতভাবে জানি, জনদরদীদেরকে চাঁদাবাজ বললে ওরা খুব মাইন্ড করবে। ওরা নিজেদেরকে জনদরদী ও জুম্ম জনগণের অধিকারকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে পছন্দ করে। ওরা নিজেদেরকে মনে করে তারা জুম্ম জনগণের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষার জন্যে মনপ্রাণ দিয়ে আত্মনিবেদিত। কাজেই তাদেরকে চাঁদাবাজ বললে ওরা খুব মাইন্ড করতে পারে।সেজন্যে তাদেরকে বলতে হবে, ইউপিডিএফ কর্মী, জেএসএস (সন্তু)কর্মী ও জেএসএস (এমএন লারমা)কর্মী।সবাই জনদরদী।

জনদরদীর সংখ্যা বেশি বলে খরচও বেশি।তাদের জনদরদী কাজের জন্যে প্রচুর টাকা প্রয়োজন।সেই টাকা আসে কোথা থেকে? তবে এটুকু সাধারণভাবে জানা আছে, সেই টাকার বড় অংশ আসে ঠিকাদারদের পকেট থেকে।

ঠিকাদারদের মধ্যেও রকমভেদ আছে। তৃতীয় শ্রেণী থেকে প্রথম শ্রেণী।পাহাড়ী বাঙালি। সে যেই শ্রেণীর হোক, পাহাড়ী হোক, বাঙালি হোক এবং সে যেই কাজ করুক না কেন, তাকে পার্বত্য চট্টগ্রামে কাজ করলে চাঁদা দিতে হয় এবং দিতে হবে।জনদরদীদের চাঁদা না দিয়ে আরামে কাজ করতে পেরেছে এমন কোন ঠিকাদার খুঁজে পাওয়া কঠিন। কোন ঠিকাদারী কাজ করলেই চাঁদা দিতে হয়।

কেন চাঁদা দিতে হবে? এই প্রশ্ন করার সাহস বোধয় কোন ঠিকাদার এযাবত করতে পারেননি।চাঁদার প্রতিশ্রুতি দিয়ে কেউ তাদেরকে জনগণের স্বার্থ রক্ষার জন্যে পাঠায়নি। তবুও জনগণের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষার নামে ওরা চাঁদা দাবী করে এবং জোর করে আদায় করে নেয়। কিন্তু ঐ টাকা ওরা কীভাবে এবং কোথায় খরচ করে? ঠিকাদার কেন সাধারণ জনগণও এখনো এই প্রশ্ন করতে সাহস করেনি।তবে এরকম সাহস দেখিয়ে চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় এক নবাগত ঠিকাদারকে “কিপটে ঠিকাদার” খেতাব পেতে হয়েছিলো।

এখন আর গৌরচন্দ্রিকা নয়।সেই নবাগত ঠিকাদারের গল্প বলি। সেই ঠিকাদারের নাম ছিলো টুগুন চাকমা। টুগুনের কিপটে ঠিকাদার উপাধি পাওয়াটা অনেকের কাছে খুব মজার, আবার কারোর কাছে বেদনারও বটে।

টুগুন মা-বাবার একমাত্র সন্তান। লেখাপড়া শেষ করে কী করবে তার কোন কূল কিনারা করতে পারছিলো না। চাকরীর বাজার মন্দা। সাধারণ ভাষায় বললে, সে ছিলো বেকার। শেষমেষ বেকার উপাধি থেকে বাঁচার জন্যে তার বন্ধু অমগদ’র হাত ধরে ঠিকাদারি ব্যবসাতে নামে।ব্যবসার জন্যে টাকা জোগার করে মাবাবার কাছ থেকে আর কিছু ধারকর্জ থেকে।

আনকোরা টুগুন জানতো না এই ব্যবসা কত কঠিন।সে জানতো না এই ব্যবসার সাথে কী কী জড়িত আছে।লাভ প্রাপ্তির আশার সাথে আছে ভাগ্য বিড়ম্বনা আর বিবেকের দংশন।লাইসেন্স করলেই কাজ পাওয়া যাবে তার কোন গ্যারান্টি নেই। এখানেও আছে নোংরা রাজনীতির নোংরা খেলা।

সে যাই হোক, অনেক চেষ্টা তদবিরের পর অবশেষে কিছু সরকারী বেসরকারী প্রকল্পের সুবাদে টুগুন কয়েকটা কাজ পেয়েও যায়।ছোট ছোট কাজ। সেচ ড্রেন নির্মাণ ও স্যানিটেশন ও রিং ওয়েল স্থাপনের কাজ।টাকার অংকে তার কাজের পরিমাণ খুব বেশি নয়।তাছাড়া সে তো তৃতীয় শ্রেণীর ঠিকাদার মাত্র।পুঁজি বিনিয়োগের ক্ষমতা নেই।

****

অফিস থেকে কার্যাদেশ পাওয়ার পর পরই টুগুন ইট, লোহালক্কর, সিমেন্ট, বালু ইত্যাদি মালপত্র নিয়ে কাজের এলাকায় নিয়ে যায়।এটাই ছিলো তার প্রথম ঠিকাদারির কাজ। কাজ শুরু করার দু’একদিনের মধ্যে তার কাছে দুই আঙুলের চিঠি এসে পৌঁছলো। চিঠির ভাষাটা এরকম,

“প্রিয় সুধী, পার্টির পক্ষ থেকে সংগ্রামী শুভেচ্ছা ও বিপ্লবী অভিনন্দন জানাচ্ছি।বিশেষ এই, আগামী মাসের ৫ তারিখে আমাদের সাথে গোলাবাড়ী বটতলীতে দেখা করার জন্যে অনুরোধ করা গেলো। সাক্ষাতে বিস্তারিত আলাপ হবে।সংগ্রামী শুভেচ্ছান্তে

রণ”

চিঠিটা পাওয়ার পর টুগুন তেমন একটা গুরুত্ব দেয়নি।রণবাবুর সাথে তার কী বা আলাপ হবে!চাঁদার ব্যাপারটি আঁচ করতে পারলেও টুগুন মনে করেছিলো, সাধারণ গ্রামবাসীদের নিরাপদ পানীয় জল সরবরাহ ও উৎপাদন বৃদ্ধির জন্যে সে কাজ করতে যাচ্ছে।তাছাড়া তার কাজের টাকার পরিমাণ খুব বেশি নয়।কয়েক লক্ষ টাকা মাত্র।কাজেই সংগ্রামী জনদরদীরা তেমন একটা মাথা ঘামাবে না।

এক দিন যায়, দুই দিন যায়। এমনি করে সপ্তাহ পার হয়ে যায়। টুগুন দুই আঙুলের চিঠি মোতাবেক রণবাবুর সাথে সাক্ষাৎ করতে যায়নি। ফলে পরপর আরো দু’টি কড়া চিঠি এলো।তারপর টুগুন গ্রামের এক উপকারভোগীর মারফত খবর পাঠালো সে তার কাজের শেষে সময় করে “রণ” বাবুর সাথে দেখা করতে যাবে।কিন্তু রণ’বাবুর মন মানেনি।

একদিন রণবাবু তার এক সাগরেদ নিয়ে টুগুনের বাসায় হাজির।রণবাবুর সাথে আগে টুগুনের কখনো দেখা হয়নি।তবে তার সাগরেদকে টুগুন বেশ অনেকবার দেখেছে।টুগুন চা আপ্যায়নের ব্যবস্থা করেছে রণ বাবুদের জন্যে।রণবাবু অবশ্য রাগ দেখায়নি। অত্যন্ত ভদ্রভাবে আলাপটা শুরু করেছিলো। সারসংক্ষেপ করে রণবাবু জানালো, ওরা জেএসএস কর্মী।যারা ঠিকাদারী করে তাদের কাছ থেকে ওরা পার্টির জন্যে “সহযোগিতা” নেয়।সেহেতু টুগুনকেও জাতির বৃহত্তর স্বারথে ‘সহযোগিতা’, মানে চাঁদা দিতে হবে।চাঁদা না দিয়ে কোন পার পাবে না।

যেহেতু চাঁদা দিতেই হবে, সেহেতু টুগুন রণবাবুর সাথে একটা আপোস রফা করলো, তার কাজগুলো শেষ হলে তার লভ্যাংশ থেকে সে রণবাবুর পার্টিকে চাঁদা দেবে।

নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হয়ে গেলো। এরপর টুগুন তার কাজের হিসাব মেলাতে লাগলো, কিন্তু ব্যালেন্সশিট মেলে না। কাজ শেষে বিল উঠানোর জন্যে কত জায়গায় ঘুষ আর “পিসি” (মানে পার্সেন্টেজ) দিতে হয় তার জানা ছিলো না। বিল ছাড়াতে সংশ্লিস্ট অফিসের জন্যে ১০%, আর পরিদর্শনকারী ইঞ্জিনিয়ারের জন্যে ৫% ঘুষ দিতে হয়। এছাড়া পিসি দিতে হবে জেএসএস’র জন্যে ৫% আর ইউপিডিএফ’র জন্যে ৫%। অর্থাৎ ২৫% টাকা ঘুষে আর পিসিতে যায়।এর উপর আছে দ্রব্যের মুদ্রাস্ফিতির জন্যে ৫% থেকে ১০% বাড়তি খরচ।সব মিলিয়ে ফাউ খরচ যাচ্ছে ৩০% – ৩৫% টাকা। তাহলে তার লাভটা কোথায়?লাভ তো দূরের কথা, মূলধনটাও উঠে আসছে না। টুগুনের মাথা খারাপ হয়ে গেলো।এ অবস্থায় টুগুন সিদ্ধান্ত নিলো জেএসএস-ইউপিডিএফ’কে “পিসি” দেবে না।কিন্তু দেবে না বললেই কি পার পাওয়া যায়? না, পাওয়া যায় না।

দিন যায়, সপ্তাহ যায়।রণবাবুদের অপেক্ষার বাঁধ ভেঙে যায়। ফোনের পর ফোন আসতে থাকে। দুই আঙুলের চিঠি আসতে থাকে একটার পর একটা। অবশেষে টুগুন রণবাবুদের কথা দিলো সে টাকা দেবে, তবে তার বাসা থেকে নিয়ে যেতে হবে।গাছতলায়, বটতলায় কিংবা বাঁশতলায় গিয়ে সে টাকা দিয়ে আসতে পারবে না।

এদিকে রণবাবুরাও নাছোড়বান্দা। ওরা মনে করছে, টুগুন ইচ্ছা করে টাকা দিচ্ছে না।তারা যেভাবেই হোক টুগুনের কাছ থেকে তাদের প্রাপ্য (?) “পিসি” আদায় করে নেবে।

অবশেষে রণবাবু তার সাগরেদকে নিয়ে একদিন সন্ধ্যাবেলায় টুগুনের বাসায় হাজির।রণবাবু রাগে লাল, যাকে বলে অগ্নিশর্মা।বাসার দরজায় কড়া নাড়তেই টুগুন দরজাটা খুলে দিলো। রণবাবুকে দেখে টুগুন সঙ্গে সঙ্গেই বলে উঠলো, “নমস্কার দা”।

“নমস্কার নিতে আসিনি, টুগুনবাবু”।বললো রণবাবু।

“দাদা, বসেন”।

“বসতে আসিনি। সোজা আঙুলে ঘি উঠে না, বাঁকা আঙুলে ঘি উঠাতে এসেছি”।

টুগুনের বুঝতে অসুবিধে হলো না, রণবাবু খুব রেগে আছে।তাই কোন কথা না বাড়িয়ে শুধু বললো, “সরি দা, আমি খুব অসুবিধার মধ্যে ছিলাম…”

“সুবিধা অসুবিধা বুঝি না।তোমরা বুঝো না কেন, আমরা কী নিজেদের স্বার্থে কাজ করছি নাকি? সময় নেই। যা করার তাড়াতাড়ি করো”।

টুগুন রণবাবুদের চেয়ারে বসতে বলে ভিতরে গেলো।এরমধ্যে তার বোনকে দিয়ে চা-পানির ব্যবস্থা করলো।

রণবাবু ও তার সাগরেদ চা বিস্কিট খাচ্ছে। সিগারেট ধরিয়েছে। গোল্ডলিফ। সিগারেট ফুঁকে আর চা-এর কাপে চুমুক দিচ্ছে। রাগ একটু কমেছে বোধয়।এরমধ্যে টুগুন তার মানি ব্যাগ আর তার কাজের কাগজপত্রগুলো হাতে নিয়ে ভেতর থেকে বের হয়ে এলো। রণবাবুর কাছ ঘেঁষে বসে তার কাছে ক্ষমা চাইলো এতদিন টাকা দিতে না পারার জন্যে।

রণবাবু বললো, “ঠিক আছে। তুমি নতুন ঠিকাদার বলে আমরা এবার কিছু বললাম না।ভবিষ্যতে যাতে আর এরকম না হয়”।

টুগুনও “ঠিক আছে” বলে তার দূরবস্থার কথা বুঝাতে চাইলো। কাগজপত্রগুলো দেখিয়ে বললো, “দাদা, দেখুন, অফিস ও ইঞ্জিনিয়ারের ভাগগুলো পরিশোধ করতেই আসল মূলধনটাও চলে গেছে।বড় লস হয়ে গেছে। তাই আপন লোক বলে আপনাদেরকে এবার “পিসি” দিতে পারিনি”।রণবাবু টুগুনের এসব কথা শুনতে খুব আগ্রহী বলে মনে হলো না।

বললো, “সেসব ঠিকাদারের কাজ। আমরা অতসব বুঝি না।আমরা জনগণের অধিকার রক্ষায় কাজ করি।সেই কাজে তোমাদের সবার সহযোগিতা দরকার”।

রণবাবু আরো বললো, “আমরা কত ঝুঁকি নিয়ে এসব কাজ করি, তোমাদের এটা বুঝা উচিত।জনগণের সামগ্রিক স্বার্থে তোমরা দু’এক পয়সাও ত্যাগ করতে পারো না কেন? দুঃখিত, আমাদের খারাপ কথা বলতে হচ্ছে”।

টুগুন বুঝতে পারলো, কোন ব্যাখা বিশ্লেষণ কাজে আসবে না।তাদের মন পাথর হয়ে গেছে।নিথর পাথরে জল ঢেলে আর কোন ফুল ফুটানো যাবে না।টুগুনের মনের অতল গভীর থেকে কান্নার ঢেউ আসছে। কোনমতে কান্নার চাপ ধরে রেখে তার মানিব্যাগ থেকে টাকাগুলো বের করছে আর গুনছে। তারপর আবার মানিব্যাগে ঢুকাচ্ছে।মন চাচ্ছে না টাকাটা দিতে। মানসিক ভারসাম্যহীন লোকের মত টুগুন মানিব্যাগ থেকে টাকাটা বারবার বের করছে আর ঢুকাচ্ছে। অন্যদিকে রণবাবু ও তার সাগরেদ একদৃষ্টে টুগুনের দিকে চেয়ে আছে। তারা মনে মনে ভাবছে, টাকার প্রতি মানুষের কী মায়া!জনসেবার জন্যে এক পয়সাও স্বেচ্ছায় দিতে রাজি নয়।কী কৃপন লোক!সে এক অন্যরকম আবহ সৃষ্টি হলো। কোন কথা নেই। সবাই চুপচাপ।

“টুগুন বাবু, তাড়াতাড়ি করো। আমাদের উঠতে হবে”।রণবাবু বলে উঠলো।

টুগুনের করার কিছুই নেই। চুপচাপ করে মাথানিচু করে পাঁচশত টাকার একটা বান্ডেল রণবাবুর হাতে বুঝিয়ে দিলো। আর সঙ্গে সঙ্গেই হো হো করে কেঁদে উঠলো।রণবাবুকে কিছু বলতে চাইলেও কান্নার স্রোতে কোন কথা বের করতে পারলো না।

ওদিকে রণবাবু নির্বিকার চিত্তে টাকাটা গ্রহণ করে বললো, “টুগুনবাবু, তোমার মত কিপটে ঠিকাদার জীবনে দেখিনি।কিপটামির একটা সীমা আছে।কেবল নিজের জন্যে নয়, জনগণের জন্যেও একটু ভেবো”।এই উপদেশ দিয়ে রণবাবুরা দপদপ করে চলে গেলো।

*******

সংবাদটা শুনে তিনদিন পর অমগদ চাকমা টুগুনের বাসায় গেল। অমগদ টুগুনকে বললো, “লাভ-ক্ষতি জীবনের অংশ। পাহাড়ে ঠিকাদারী করলে “পিসি” ‍দিতে হয়।এটাও ঠিকাদারি ব্যবসার অংশ।এসব মানতে না পারলে ঠিকাদারি ব্যবসা করা যাবে না”।

টুগুন চুপচাপ।অমগদ যা বলছে নীরব স্রোতা হয়ে তা শুনছে। অমগদ প্রশ্ন করলো, “ঐ দিন শুধু শুধু রণবাবুদের সাথে নাটক করতে গেলি কে?রণবাবু তো বলে বেড়াচ্ছে তুই নাকি হাড়ে হাড়ে কিপটে ঠিকাদার। লোক হাসাচ্ছিস কেন?”

টুগুন আর চুপ থাকতে পারলো না। বললো, “আমি লোক হাসাতে যাবো কেন? কিপটে হবো কেন? তুই কী জানিস, আমরা ঠিকাদাররা বছরে কী পরিমাণ টাকা পাহাড়ের রাজনৈতিক দলগুলোকে “পিসি” (চাঁদা) দিই? ওই চাঁদা দিয়ে ওরা কী করে?ওরা জনগণের কোন সেবা দিচ্ছে? তুই কী গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারিস, ওরা আমাদের দেওয়া টাকায় অস্ত্র গোলা-বারুদ কেনে না? ঐ অস্ত্র গোলাবারুদ কী জনগণের অধিকার রক্ষার জন্যে? তুই কী বলতে পারবি, আমার দেওয়া ঘামঝরা টাকায় ওরা অস্ত্র কিনবে না? তুই কী গ্যারান্টি দিতে পারবি, ঐ অস্ত্র কোন জুম্ম ভাইবোনের প্রাণ কেড়ে নেবে না? তুই কী অস্বীকার করবি, আমরা ঠিকাদাররা জেএসএস ইউপিডিএফকে যে পরিমাণ টাকা দিই সে টাকা দিয়ে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত বাঁচিয়ে রাখতে সহায়তা করছি না? কোথায় আমাদের বিবেক? মারামারিতে টাকা দিতে একটুও বিবেক দংশন করে না?”

অমগদ একসাথে এতগুলো প্রশ্ন কখনো শুনেনি। জবাব দেওয়ার মত উত্তরও তার জানা নেই।

বললো, “টুগুন, স্বীকার করি, ভাইয়ে ভাইয়ে মারামারি জিইয়ে রাখার জন্যে ঠিকাদার হিসেবে আমিও দায়ী।কিন্তু বেঁচে থাকার জন্যে, পেটের দায়ে ঠিকাদারি করতে হচ্ছে। কিন্তু…”।

“কিন্তু কী?” টুগুন জিজ্ঞেস করে।

অমগদ আমতা আমতা করে কী যেন বলতে চাইলো। বুঝতে পারছে না কী বলবে।

টুগুন আবার জিজ্ঞেস করে, “বলো তো কোনটা বেশি প্রয়োজন? বেঁচে থাকা নাকি বিবেক দংশন হতে মুক্তি পাওয়া”?

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/367

ইউপিডিএফ-এর বৈসাবি বর্জন এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের অনুরোধ – ‘বৈসাবি’ নয় ‘বিজু’ -এসব নিয়ে আমার কিছু কথা ।

অমিত হিল

আজ যেখানে যাওয়ার কথা ছিল যেতে পারলাম না । সময় আমার কাছ থেকে সরে দাঁড়িয়েছে । তাই বিসর্জন দিতে হলো কোনরকম প্রচন্ডতা ছাড়া । সবখানে ঘুরে বেরিয়ে কিছু শেখা হয়েছে, এবং সাথে দেখাটা ও হয়ে গেলো । বেশ কয়েকদিন ধরে বিজু-বৈসাবি এর ব্যবহার এবং বর্জন- প্রতি পালন নিয়ে লিখবো বলে ভাবতেছিলাম; কিন্তু সময় চলে যায় ব্যস্ততায় । যার কারণে চিন্তা করার মানসিকতা ও উঠে আসে না । আজ নিরিবিলিভাবে বসে নির্জন কক্ষে কিছু আনন্দ করার প্রয়াসে বিশ্রাম করতে গিয়ে কিছু লিখে মনোভাব ব্যক্ত করবো বলে দৃঢ় মনোভাব পোষন করলাম ।

গতবছর ইউপিডিএফ বিশেষ কারণে ‘বৈসাবি’কে বর্জনের ঘোষণা দেয়, যার প্রতিপক্ষ দল (জেএসএস-সন্তু লারমা) ইউপিডিএফের সেই ঘোষণাকে নিজস্ব ব্যক্তিগত ইস্যু বলে বৈসাবি পালনের উৎসাহ দেই । ইউপিডিএফ-এর ভাষ্য মতে, এত বড় এক ঘটনা বাঘাইছড়ি এবং খাগড়াছড়িতে হয়ে গেলো এতে আমাদের শোকের জন্য একাত্মতা ঘোষণা করে বৈসাবিকে প্রতিবাদমূলকভাবে বর্জন করা উচিত । আর অন্যদিকে জেএসএস-সন্তু লারমা দলের মতে, পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর সংষ্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও বিকাশের লক্ষ্যে ‘বিজু’ প্রতিপালনে কোন বাঁধা থাকা উচিত নয় । এর জন্য সংষ্কৃতি রক্ষা, বিকাশের জন্য কাকতালিয়ভাবে অপশক্তি (ইউপিডিএফ-এর) বিরুদ্ধে ও রুখে দাঁড়াতে আহ্বান করা হয় । এভাবে দুদলের মধ্যে ছিল বিরাট ধরনের মতাধৈক্য । এ নিয়ে দুদল রীতিমতো বাংলাদেশের আওয়ামিলীগ এবং বিএনপি’র মতো রাজনীতিক খেলা খেলেছে । এতে অনেকে ভিন্নভাবে দুদিকে অবস্থান নেই ।

এক্ষেত্রে দুদলের কর্মসূচিকে আমি ব্যক্তিগতভাবে সাপোর্ট করি । দুদলের অবস্থান ভিন্নমাত্রিক হলেও নেগেটিভ বলে আমি ধরে নিতে পারি না । ইউপিডিএফ-এর ভাষ্যটির যেমনটা যৌক্তিকতা রয়েছে ঠিক সেভাবে জেএসএস-এর ভাষ্যতে ও যৌক্তিকতা রয়েছে । কারণ, আমরা যদি এভাবে প্রতিবছর এই বিজু দিনকে বর্জন করি একদিন ভবিষ্যত প্রজন্ম এর শুধু নেগেটিভ দিককে দেখে এরকম এক গুরুত্বপূর্ণ সাংষ্কৃতিকে ভুলে যেতে বসবে -যা জেএসএস মনে করে । অবশ্যই জেএসএস-এর ভাষ্যতে ও যথেষ্ট যৌক্তি বিদ্যমান । আর অন্যদিকে ইউপিডিএফ মনে করে, এত বড় এক ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর ও যদি প্রতিবাদস্বরুপ আমাদের এই আনন্দকে উৎসর্গ করতে না পারি তাহলে আমরা কিভাবে জাতির উদ্দেশ্য কাজ করবো, যা ও অত্যন্ত যৌক্তিক । ঘটনাটি রাঙামাটিতে ঘটলে আমি ধারণা করি জেএসএস-এর অবস্থান ও এরকম হতো । আগুন-গুম-হত্যা-জেলের ভাত কিভাবে খেতে হয় তা খাগড়াছড়ির জু্ম জনগণেরা দেখেছে । ঘটনাটির তিব্রতা কিন্তু খাগড়াছড়িকে বিশেষভাবে নাড়া দেয়, যা বহিঃবিশ্বে তাৎক্ষণিকভাবে ছড়িয়ে যায় । সেহেতু ইউপিডিএফ-এর কার্যক্রমকে নেগেটিভভাবে নেয়ার কোন যৌক্তিকতা নেই । আর অন্যদিকে জেএসএস-যদি মনে করে যে সংষ্কৃতি রক্ষার জন্য যখন সংগ্রাম হচ্ছে সেহেতু বিজু দিনকে কখনো বর্জন করা যুক্তিসংগত নয়, তা ও অবশ্যই যুক্তি আছে । তাই, আমি মনেকরি সেই পুরানো রেসের অবসান অন্তত এই বছরের প্রথম দিনেই শেষ হয়ে যাক । এই নিয়ে যেনো ভ্রাতৃঘাটের রাজনীতি আর খেলা না হয় ।

এবার এবছরের প্রসঙ্গে আসি, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ অনুরোধ করল যে- ‘বৈসাবি’ নয় ‘বিজু’, বিবৃতিতে আর ও বলা হয় যে, “পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর সংষ্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও বিকাশের লক্ষ্যে ‘বৈসাবি’ শব্দটি সকল ক্ষেত্রে ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকার জন্য সকলের প্রতি অনুরোধ’ । আঞ্চলিক পরিষদের প্রেক্ষিতে বলতে গিয়ে কিন্তু জেএসএস (সন্তু লারমা) -এর দর্শন এখানে উঠে আসে । কারণ গণতান্ত্রিকতার কথা পার্বত্য চুক্তিতে থাকলে ও আঞ্চলিক পরিষদের একচেটিয়া সুযোগ এবং ক্ষমতা আদৌ জেএসএস (সন্তু লারমা) এর হাতে । আমি এবছরের আঞ্চলিক পরিষদের এই বিবৃতির বিরুদ্ধে আমার অবস্থান ব্যক্ত করছি যৌক্তিক কারণে । ‘বিজু’ শব্দটি চাকমাদের ব্যক্তিগত ভাষার শব্দ । আঞ্চলিক পরিষদ কোন শুধু চাকমাদের একচেটিয়া সম্পত্তি নয় যে, সকল জাতিস্বত্তাদের উপর বিজু’ শব্দ ব্যবহারের জন্য জোড়ভাবে চাপানো হবে । আঞ্চলিক পরিষদ কি এই এক স্পর্শকাতর ইস্যু নিয়ে একবার ও ভাবলো না ? যেখানে সরকার চাই জাতিসহিংষতা বাড়িয়ে দিয়ে নিজের দোষকে চাপা দিতে আর সেখানে আঞ্চলিক পরিষদ এত বড় এক ভুল করতে যাবে আমি বুঝতে পারলাম না । এই বিবৃতির মাঝে সরকারের এক চক্রান্ত আমার মনে করিয়ে দিলো । ব্যক্তিগত এবং নিজস্ব জাতি ভাইদের সাথে কিংবা চাকমা ভাষায় ব্যাখ্যা, কতাবার্তা বলতে কিংবা নিজস্ব চাকমা জাতির সংষ্কৃতির ক্ষেত্রে চাকমারা ‘বিজু’কে নির্দ্বিধায় ব্যব হার করতে পারে, কিন্তু রাজনীতি  প্রেক্ষিতে যখন এটি চলে যায় তাহলে তা সকল বসবাসরত জাতিস্বত্তাদের কথা বিবেচনা করে নির্ধায়ন করা উচিত । আমি সেজন্য জেএসএস (সন্তু লারমা), ইউপিডিএফ, জেএসএস ( এম.এন. লারমা) তিন আঞ্চলিক রাজনীতিক দলকে আহ্ববান জানাবো যেনো রাজনীতিক পরিসরে ‘বিজুর’ বদলে ‘বৈসাবি’ বলে লেখার নীতি নির্ধারন করা হয় । আঞ্চলিক পরিষদ শুধু চাকমাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, এখানে শ্রেণীভেদের সূচনা করা কোনমতে গ্রহণযোগ্য নয় ।

বিঃদ্রঃ কেউ আলোচনায় এলে আমি খুশি হবো । কারণ, আমি ও এক মানুষ । ভুল ও হতে পারে আমার বুঝার মাঝে । সকলে মিলে আলোচনার মাধ্যমে আমরা ভুলকে শুধরিয়ে নিতে পারবো বলে আশা করি ।

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/326

বর্ণবাদ এবং এর বাস্তবতা ।

অমিত হিল

সবে শিক্ষা নিতে চলেছি মানুষের জীবনের উদ্দেশ্যে বা কি ? কেনো আমরা বেঁচে থাকতে চাই ? আমাদের অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎকে কেনো তাৎপর্যমন্ডিত করতে হয় ? ঠিক সেসময় সবসময় হাতে থাকতো মহা-মনিষী অথবা মানবতাবাদীদের জীবন চরিত, যা ছিল বিভিন্ন মানবিক গুণাবলির পংত্তিসমৃদ্ধ । ভালোই লাগতো, নিজেকে মানুষ-মানুষ অনুভব করতাম । অনেকে রীতিমতো পরিহাসচ্ছলে নব্য দার্শনিক বলে ডাকতো । আমি কান্ড দিতাম না, শুধু মুখে এক মুশকি হাসি । হাসিটির হয়ত অনেক শক্তি ছিল, কেননা সেই হাসিই আমাকে ধাপে-ধাপে সাফল্যর পানে পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছিল ।

নতুন এক জীবন শুরু হতে থাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ভাষাভাষি এবং সংষ্কৃতির মানুষের সাথে । আগে পাহাড়ী-বাঙালীর দন্ধটা জানা থাকলে ও তেমনটা বাস্তবে অনুভব করিনি । কিন্তু এখন আমি বাস্ততার মুখোমুখি । চারদিকে আমার চেহারার লোক খুঁজে পাওয়াই ছিল মুশকিল । আমি একা । সাহজ এবং আত্মবিশ্বাস ছিল খুব প্রবল । আমি হারতে রাজী নই । আস্তে-আস্তে বন্ধুত্ব গড়তে থাকি একে -একে, এভাবে মাস দুয়েকে অনেক বন্ধু হয়ে যায় । তারপর একাকীত্বতা কেটে যায়, আমি নিজেকে আর একা ভাবি না । মাস ছয়েক হতে না হতে কয়েকজন মেয়ে, সঙ্গী হতে আসে । আমি সরল মনে তাদেরকে ও অন্য ছেলে সঙ্গীদের মতো ভাবতে থাকি । এরপর নেমে আসে জীবনের কয়েক বিপদজনক মূহুর্ত । এখানে এসেই আমি বর্ণবাদের শিকার হই । হুমকি আসে আমি যেনো সেসব ভিন্ন ভাষী মেয়েদের এড়িয়ে চলি । না হয় সোজা কথা, “গো দ্যা হেল” । আমি ও যেহেতু মানুষ আমি সবকিছু মানিয়ে চলি, আর আস্তে-আস্তে মেয়েদের এড়িয়ে চলতে থাকি । এভাবে ক্লাসে ও আমার উপর ডজেনখানেক চোখ আমার দিকে নজর থাকতো । সে চোখগুলো ছেলেদের ছিল না, বরং মেয়েরা কৌতুহল বশে সাদা চামড়ার মানুষটিকে চেয়ে থাকতো । আমি না দেখার ভান করে অন্য ছেলে বন্ধুদের সাথে গল্প-স্বল্প করি । প্রাইভেত-এ ও রীতিমতো মেয়েদের সঙ্গে দেখা কিন্তু সবসময় এড়িয়ে চলা ছাড়া বৈকি বা কি । আমি অন্য এক সংষ্কৃতির যে রীতিনীতি সেসবকে সম্মান করে যাওয়ার পাশাপাশি নিজের জীবন সম্পর্কে ভাবছিলাম মাত্র । অনেক মেয়ে আমাকে ভুল বুঝতে থাকে । বলে, “আমি নাকি সাদা বলে তাদের পাত্তা দিই না” । কি আর করা, চুপ থাকা, আর কখনো মুশকি হাসি । এভাবে শেষ হয়ে যায় কলেজ জীবন ।

তারপর, ভার্সিটির জীবন শুরু হয় । এটাতো দেশ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন জাতির । আমাকে আগেভাগে বলা হয়, সব ঠিক আছে কিন্তু মেয়েদের দিকে যেন চোখ তুলে না তাকায় । ভালোবাসার বন্ধু যেনো সেসব মেয়েদের নিয়ে না ভাবি । একই সমস্যা, বর্ণবাদের শিকার । এভাবে মনকে প্রতিপালন করতে থাকি । মেয়েদের সাথে কথা বলি খুব সীমিত । কিন্তু একদিন হঠাৎ করে এক ফোন আসে, ফোনে এক মেয়ের কন্ঠ, “হাউ আর ইউ?”, আমি বলি “আই অ্যাম ফাইন, এন্ড ইউ ?”…. সে হাসে । তারপর আমাকে বলে, “ক্যান আই হ্যাভ সাম ক্রোয়েশনস ফর ইউ?”….আমি বলি “হোয়াই নট ?”……মেয়েটি প্রথম প্রশ্ন করে “আর ইউ এ্যা ম্যান অর উইম্যান ?”….আমি সঙ্গে-সঙ্গে বলে উঠি, “সরি, দিস ইস নট মাই বেজিন্যাস টু আনসার ইউ সাচ ইমপোলাইট ক্রোয়েশন”…..তারপর ফোন রাখি । এভাবে প্রতিটি দিনে অন্ততঃপক্ষে ৪-৫ টি মিস কল আসতে থাকে । এভাবে যেতে যেতে একদিন মেয়েটি আমার সাথে দেখা করতে চায় কোন এক কপি শপ-এ । সেদিন ছিল রবিবার, ক্লাস নেই । দেখা করতে রাজী হই, ঠিক ৫.৩০ টায় । সময়মতো আমি পৌঁছি, অপেক্ষা করতে-করতে দেখি আমাদের প্রফেসরের মেয়েটি এক পাজেরো থেকে নেমে হাসতে-হাসতে আসছে । আমি হতবাক, স্যার ও আসছে নাকি এমনটা চিন্তা করতে । না, শুধু মেয়েটি । সে আসা মাত্রই আমাকে জিঞ্জেস করে, “হোয়াই আর ইউ হেয়ার ?….আর ইউ লুকিং ফর সাম ওয়ান ?” …আমি মুশকি হাসি হেসে বলি, “ইয়েস, আই এম ওয়েটিং ফর এন এলিয়েন……ডোন্ট নো হু ইস শি, বাট আই থিংক শি ইস বিউটিফুল….” । সে হাসে আবার, “হাউ ডু ইউ নো দ্যাট শি ইস বিউটিফুল সীনস ইউ ডোন্ট নো হার….?”। এবার আমি বুঝতে পারি, তারপর কৌশলে বলি, “ওয়েল, আই থিংক শি উয়িল নট কাম, আই মাস্ট গো নাউ….”। সে ও চতুরভাবে বলে, “সী ইউ, এ্যন্ড টেক কেয়ার” । আমি যেতে চাইলে সে বলে “সুড আই ড্রপ ইউ.?” আমার সোজা উত্তর “নো থ্যাংকস” । সে এক অট্রহাসি হেসে বলে, “দ্যাট ইস হোয়াই আই আস্কসড -ম্যান অর ওয়েম্যান (?) ।” আমি গম্ভীর হয়ে যায়, আর বলি “আর ইউ দ্যাট গার্ল অফ ফ্যানটাসি.?” । আমি ভীষন ভয় পেয়ে গেলাম । সে রাতে মাকে ফোন করে জানাই, মা সমস্যা একটা হতে যাচ্ছে, আমি অন্য ভিন্ন এক জাতি মেয়ের প্রেমে পড়ে যাচ্ছি । মা বলে, খবরদার । আমি হেসে হেসে মজকারি করি, কেনো মা >? সমস্যা কোথায় ? মা বলেন, এসব আমরা মেয়েরা বুঝি, তুমি ছেলে মানুষ বুঝবে না । মা’তো এমনিতেই সহজ -সরল । মা মোটেই রাজী থাকতেন না ভিন্ন কোন জাতির মেয়েকে বিয়ে করতে । আমি মাকে সম্মান করি, তাই মা’র আদর্শে আমি সমর্পন করি । তারপর কৌশলে সব সামলিয়ে নিই । বান্ধবীর স্বপ্ন থেকে বোন-এর সম্পর্কে দাঁড়িয়ে দিই । এর মধ্যে আমাকে মারার জন্য প্রস্তুত ছিল কয়েকজন উগ্র জাতিবাদী ছেলে । কিন্তু আমার ও অনেক বন্ধু থাকাতে তাদের সেসব প্রস্তুতি ভেস্তে যাই । এই হচ্ছে বর্ণবাদ ।

‘ফারজানা গুটেকুরানি’ নামের এক ভদ্র মহিলা সেদিন আমার সাথে আলোচনা করতে আসেন । তিনি যেমনভাবে কথা বলতেছিলেন আমার মনে হয়েছিলো আমাদেরই একজন পাহাড়ী মেয়ে নতুবা ছেলে কেননা, তিনি আমাদের সংষ্কৃতি নিয়ে ভীষণ চিন্তিত । রীতিমতো বলে ও ফেললেন যে আমাদের সমাজ নাকি বেশি কঠোর নিয়মাসারি নয় যেখানে সংখ্যাগুরুর মুসলমান এবং হিন্দুর নারীরা কঠোর নিয়মে বাঁধা । আর আমাদের সমাজব্যবস্থা শিথিল বিধায় আমাদের মেয়েরা খোলাখুলি সবকিছু করতে পারছে । তিনি তাহার অভিজ্ঞতার কথা মন্তব্য এবং ব্যক্তিগত ম্যাসেজে করে পাঠান । তিনি ব্যক্তিগতভাবে আমাদের মেয়েদের কার্যকলাপ এবং সততা সম্পর্কে যথেষ্ট সন্দিহান । বর্ণবাদের রুপরেখা কিন্তু আমাদের পাহাড়ী মেয়েদের দিকে ঈঙ্গিত দেন, যদিও আমি মানতে রাজী ছিলাম না । আমি জেনেটিক্যালি ব্যাপার বলে আলোচনা করি । মেয়েদের জেনেটিক্যাল স্বভাব সম্পর্কে বলি, এতে বর্ণবাদ নয় বরং সাইকোলজি এবং কিছু জেনেটিক্যাল ব্যাপার-চেপার বিদ্যমান ।

আমার অভিজ্ঞতা মতে, ছেলেরা স্বভাব  এবং মানসিকগতভাবে বর্ণবাদী হয়ে থাকে । মেয়েরা খুব সহজে বর্ণবাদী হয় না, মেয়েদের অহংকার এবং আবেগপ্রবণতা মূলত জেনেটিকস-এর ব্যাপার । ছেলেদের বর্ণবাদী স্বভাব প্রায় প্রতি সমাজে-জাতিতে এবং দেশে বিদ্যমান । প্রতি জাতি এবং দেশে এই বর্ণবাদীর মানসিকতা ছেলেদের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে চোখে পড়ে -আমেরিকায় বলেন কিংবা অস্ট্রেলিয়ায় বলেন অথবা জাপানে বলেন । আর জাপানের মতো দেশে, মেয়েরা ও চরমভাবে বর্ণবাদী হয়ে থাকে । যেখানে কোটি-কোটি উন্নত প্রযুক্তিসমৃদ্ধ জনবহুল মানুষের মনে এমন বর্ণবাদের ধারণা কাজ করে সেখানে আমাদের মতো ক্ষুদ্র জাতিগুলোতে অস্তিত্ব রক্ষার্থে যে জাতিবাদ কাজ করবে না, সেটাতো নয় । তবে আমাদের সমাজের ছেলেদের ও বুঝতে হবে, নেশাগ্রস্থতা, উগ্রতা কিংবা উচ্চবিলাসীতা এখন পর্যন্ত কাম্য নয় । এসব করার পর আমরা কি্ন্তু আমাদের নারীদের সব দোষ চাপাতে পারি না । কিন্তু মোট কথা হচ্ছে, আমরা কে কিভাবে নিচ্ছি কিংবা বুঝতে চেষ্টা করছি । সংষ্কৃতিগতভাবে যতদিন মানুষের যে মৌলিক অধিকার সেসব অর্জন হবে না, ততদিন পর্যন্ত রক্ষণশীল হয়ে থাকার আমি ব্যক্তিগতভাবে পক্ষপাতি । তবে, এই রক্ষণশীলতা যেন উগ্র জাতিবাদী নেশায় পরিণত না হয় সেদিকে ও নজর দেয়া উচিত । এরজন্য, প্রয়োজন পড়ে এক জাতিগত দর্শনের, নৈতিকতাসমৃদ্ধ এক বিবর্তনমুখী এবং সময়োপযোগী বৈজ্ঞানিক দর্শনের ।

আমাদের বিশেষ-বিশেষ ক্ষেত্রবিশেষে বুঝাবুঝির দরকার রয়েছে । একজনের ব্যক্তিগত চাওয়াকে প্রাধান্য দিয়ে যদি পুরো সমাজকে উড়িয়ে দিই, তাহলে সমগ্র স্বত্তার অধিকারের দাবীর কোন মূল্যই থাকে না । সমাজ থেকে ব্যক্তি কখনো বড় হতে পারে না । আর কোন এক জাতির সংষ্কৃতি একদিন-এক মাস কিংবা এক বছরে গড়ে উঠেনি । এর পিছনে শত বছরের ইতিহাস বিদ্যমান । শত বছরের গড়ে উঠা সংষ্কৃতিকে ইচ্ছে করলে ও একদিনে কিংবা বছরে ও ধ্বংস করতে পারবো না । তড়িঘড়ি পরিবর্তন-পরিবর্তন করতে গিয়ে সমগ্র সমাজের অনেক মৌলিক অধিকারগুলো ও হুমকির সম্মুখীন হবে । যেকোন ধরণের পরিবর্তনের এক ধারাবাহিকতা বিদ্যমান । মানুষের বিবর্তন ঘটতে লক্ষ-কোটি বছরের প্রয়োজন পড়েছে । যদি কেউ স্বার্থহীনভাবে সমাজকে দিতে চাইলে নিজের ভিতরে থেকে দিতে পারাটাই সবচেয়ে উত্তম ।

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/299

অর্পি, তোমায় আমরা কী জবাব দেবো?

অডং চাকমা

মূল বিজু শেষ।গোজ্জ্যাপোজ্জ্যে দিন অর্থাৎ ১৪ এপ্রিল, ১ বৈশাখ ১৪১৮। বাংলা নতুন বছরের প্রথম দিন। সন্ধ্যার দিকে কম্পউটার খুলে সংবাদপত্রের অনলাইন সংস্করণ পড়ছিলাম। প্রথম আলো’র একটি সংবাদ শিরোনাম ছিলো, “বাঘাইছড়িতে সন্ত্রাসীর গুলিতে বাবা-মেয়ে খুন”।উক্ত শিরোনামে চোখ আটকে গেলো। ঘটনার বিবরণে বলা হয়েছে, গত বুধবার দিবাগত রাতে বাঘাইছড়ি উপজেলার মারিশ্যা ইউনিয়নের কদমতলী গ্রামে জনসংহতি সমিতির সংস্কারপন্থী হিসেবে পরিচিত এমএন লারমা গ্রুপের সদস্য চিজিমণি চাকমা (৩২) ও তার দুই বছরের শিশুকন্যা অর্পিমণি চাকমা (পক্ষান্তবরে অর্কি)সন্ত্রাসীর গুলিতে নিহত হয়েছেন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সন্তু লারমা গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যরা এ ঘটনাটি ঘটিয়েছে।

জেএসএস বনাম ইউপিডিএফ, ইউপিডিএফ বনাম জেএসএস মারামারি ও খুনের ঘটনা অনেকদিন আগেই আমার অনুভূতিকে ভোঁতা করে দিয়েছে। কিন্তু আজকে যখন প্রথম আলো’র সংবাদটা পড়ছিলাম, সত্যি বলতে কী চিজিমণির জন্যে তেমন দুঃখবোধ হয়নি। তবে ছোট্ট শিশু অর্পির জন্যে মনটা হু হু করে কেঁদে উঠেছে। যে শিশুর পার্বত্য চট্টগ্রামের সংস্কার-কুসংস্কারের রাজনীতি, শান্তিচুক্তির পক্ষ-বিপক্ষ রাজনীতি বুঝারও বোধ হয়নি, তাকে সেই নষ্ট রাজনীতির বুলেটের আঘাতে বেঘোরে প্রাণ দিতে হলো। ভাবতেই মনের গভীরে তীব্র বেদনার তরঙ্গ সৃষ্টি হলো। হে অর্পি, তুমি কী নিষ্ঠুর, মমতাহীন এ জুম্ম সমাজে জন্ম গ্রহণ করেছো!

অর্পি, পৃথিবীতে এসেছো এই তো সেদিন। তুমি এখনো বুঝে উঠতে পারোনি জুম্ম সমাজের রাজনীতিবিদদের নষ্টামি।তুমি এখনো উচ্চারণ করতেও শিখোনি পাহাড়ের নষ্ট রাজনীতির পরিভাষা সন্তুজ-গুন্ডুষ-ফান্ডুজ, সংস্কার পন্থী, সংস্কারবিরোধী। তুমি এখনো তুমি এখনো জানতে পারোনি সেই সন্তুজ-গুন্ডুষ-ফান্ডুজ-এর ধ্বজাধারী সংগঠনসমূহের নাম।জেএসএস (সন্তু), জেএসএস (এমএন লারমা) ও ইউপিডিএফ। তুমি এখনো জানতে পারোনি আজ সেই ‘সন্তুজ-গুন্ডুষ-ফান্ডুজ’ত্রয় জুম্ম সমাজকে রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিষাক্ত করে তুলেছে জুম্ম জাতীয় অস্তিত্ব তখা অধিকার রক্ষার নামে। কার অস্তিত্ব? কার অধিকার? সন্তুজ-ফান্ডুজরা কী তোমাকে দিয়েছে সেই অধিকার?হে অর্পি, জানি তুমি এখনো নিষ্পাপ শিশু। তুমি এখনো জানতে পারোনি অস্তিত্ব কী, অধিকার কী?কিন্তু সন্তুজরা আজ তোমাকে বাঁচতে দিলো না সেই জুম্মজাতির অস্তিত্ব ও অধিকার রক্ষার নামে।অর্পি, তুমি কী সেই জুম্ম সমাজের বাইরে ছিলে? না, না, না। তাহলে, তোমার কী অপরাধ ছিলো সন্তুজরা তোমাকে বাঁচতে দিলো না?

অর্পি, জানি, তোমার এই প্রশ্নের উত্তর জানা নেই। না জানার মধ্যে তোমার কোন অপরাধ ছিলো না। তুমি ফান্ডুজ-এর কর্মী চিজিমণির ঘরে জন্ম নিয়েছো বলেই তোমার অপরাধ? কিন্তু পৃথিবীতে আসার সময় তোমার তো হাত ছিলো না।তুমি সন্তুজ-ফান্ডুজ তথা জুম্ম সমাজের কাছে জবাবদিহি চাইতে পারো – তোমার কী অপরাধ ছিলো? কেন তারা তোমাকে বাঁচতে দিলো না? সন্তুজরা তোমাকে মেরে কী জুম্মজাতির অধিকার রক্ষা করতে পেরেছে?

অর্পি, আমার লজ্জা লাগছে আমি এ জুম্ম সমাজের একজন। এ সমাজের আমরা কেউই কিছু করতে পারিনি। আমি তোমার মৃত্যুর জন্যে অন্য কাউকে কোন জবাব দিতে পারবো না।

অর্পি, আমি আজ অসহায় কাপুরুষ।তোমার জন্যে কিছুই করতে পারিনি। সন্তুজ-গুন্ডুষ-ফান্ডুজ-ত্রয়ের নির্লজ্জ মারামারি, খুনোখুনি, উলম্ফন ও উন্মাদনা চেয়ে চেয়ে বসে আছি সাড়ে সাত লক্ষ জুম্ম ভাইবোন। নাকের ডগায় অস্ত্র হাতে নিয়ে সাধারণ মানুষকে শাসায়। অথচ আমরা কেউই কিছুই করছি না।কোথায় প্রতিবাদী জুম্ম সমাজ?

অর্পি, আমার মাথা আরো হেঁট হয়ে যায়, যখন দেখি তোমার খুনী গ্রুপের নেতারা শহরে বসে নিজেদের অপরাধ অস্বীকার করে পত্রিকায় দাঁত খিঁচিয়ে বিবৃতি দেয়, জেএসএস (সন্তু) নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করে।এ ধরনের কোন সশস্ত্র দল নেই। (এটা অবশ্য কেবল জেএসএস (সন্তু) করে না, ফান্ডুজ ও সন্তুজরাও করে)।কিন্তু অপরাধ অস্বীকার করলেও মন থেকে কখনো অপরাধীদের নিন্দা জানাতে পারে না।অর্পি, তোমার ঘটনার বেলায়ও সন্তুজরা অপরাধীদের নিন্দা জানাতে পারেনি। অপরাধীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে কী সন্তুজরা জুম্মজাতির অধিকার রক্ষা করবে?

অন্যদিকে, জুম্ম সমাজ সন্তুজ-গুন্ডুষ-ফান্ডুজ-এর মিথ্যাচার চেয়ে চেয়ে বসে আছে নীরবে।জুম্ম সমাজের এ তিন দুষ্টচক্রের কালো হাত গুড়িয়ে দিতে জুম্ম সমাজে কী প্রতিবাদী লোকের অভাব পড়েছে? কেন দূরন্ত সাহসী প্রতিবাদীরা বের হয়ে আসছেন না সন্তুজ-গুন্ডুষ-ফান্ডুজ চক্রের অনাচার, অত্যাচার প্রতিরোধ করতে?

অর্পি, তোমার জন্যে কিছুই করতে পারিনি।কিছু করতে না পারলেও জুম্ম সমাজের বিবেকের কাছে নিম্নোক্ত আবেদন জানাচ্ছি।

১) শিশু অর্পির হত্যার জন্যে সরকারের কাছে নয়, সন্তু লারমার কাছে বিচার চাওয়া।জুম্ম জাতির অভিভাবক হিসেবে সন্তু লারমাকে এর সুষ্ঠু বিচার করতে হবে।

২) একটি দলনিরপেক্ষ কমিটি গঠন করে শিশু অর্পির হত্যাকান্ড তদন্ত করা। উক্ত তদন্ত কমিটিতে সাংবাদিক, আইনজীবি ও মানবাধিকারকর্মী অন্তর্ভুক্ত করা। প্রয়োজনে দেশের শিশু অধিকার ও মানবাধিকার সংগঠনসমূহকে সম্পৃক্ত করা।

৩) আগামীতে এরকম কোন ধরনের ভ্রাতৃঘাতী খুনখারাবি হলে যেই গ্রুপ দায়ী হবে সেই গ্রুপের নেতার কাছে লংমারচসহকারে বিচার দাবী করা। যতক্ষণ না পর্যন্ত দাবী আদায় না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত সেই নেতা/নেত্রীর বাসভবনে অবস্থান ধরমঘট চালিয়ে যাওয়া।

৪) সরকারের কাছে নয়, সকল রাজনৈতিক হত্যাকান্ড, খুনখারাবি ও অপহরণ ঘটনার জন্যে স্থানীয় রাজনৈতিকদলসমূহের (সন্তুজ-গুন্ডুষ-ফান্ডুজ)কাছে দাবী জানানো।

৫) জুম্ম জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার নামে সন্তুজ-গুন্ডুষ-ফান্ডুজ চক্রের ভন্ডামির বিরুদ্ধে স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রতিরোধ গড়ে তোলা।


জুম্মবিবেকের কাছে এই দাবীসমূহ বিবেচনার জন্যে উপস্থাপন করলাম। আমাদের প্রশ্ন করতে হবে, অর্পির মত আমাদের শিশুদের জন্যে আমরা কীরকম সমাজ ব্যবস্থা রেখে যেতে চাচ্ছি? আমাদের আগামী প্রজন্মকে আমরা কী সন্তুজ-গুন্ডুষ-ফান্ডুজ বানাতে চাই? যদি “না” হয়, তাহলে এখনই ভাবার সময়।

অর্পি, আমাদের অক্ষমতার জন্যে ক্ষমা করে দিও।

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/221

“আদিবাসী ব্লগ”-এর ব্লগের সব এডমিনদের উদ্দেশ্য আমার এক খোলা চিঠি

আমি পেশাগতভাবে রাজনীতিবিদ, সমাজসংষ্কারক-কর্মী, দার্শনিক, ব্যবসায়ী, ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার কিংবা ভালো লেখক অথবা গায়ক নই; শুধু নগণ্য এক সাধারণ মানুষরুপী জীব । তবু ও এক মানুষ হিসেবে যাকিছু অভিজ্ঞতা পেতে হয় -এর একটি ও বাদ পড়ছে না । আদৌ অনেককিছু শিখবো-জানবো এবং দেখবো বলে একাকী পথ চলি । একাকীত্বকে সঙ্গী বানাতে অনেক ত্যাগ-স্বীকার করতে হয়, আর এই একাকীত্বের মাঝে কিন্তু এক শক্তিশালীভিট বিদ্যমান, কারণ পিছুটান বলতে কিছুই নেই এখানে, যা আছে সব নিজের জন্য আর নিজের দ্বারা অন্যের ভালো । মা-বাবা-ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজনদের নিয়ে ভালোভাবে ভাবা গেলে চারপাশে বসবাসরত নিরীহ -সহায়-সম্ভলহীন মানুষদের কথাগুলো মনে পড়ে, যারা অতীতের দিনগুলোর চেয়ে এখন অনেকগুণ দূঃখী এবং দীন । এসব ভাবতে গিয়ে মনুষ্যত্ববোধটি নতুন কিছুকে খুঁজে পেয়ে জাগরিত থাকে । যাহোক এসব কিছু, মূল কথায় আসা যাক ।

গতকালকে আমি আপনাদের নোটিশ পেয়ে জানতে পারলাম যে আপনারা ‘আদিবাসী ব্লগটি’ বন্ধ করতে যাচ্ছেন -আমি এখন এসবকিছু দেখে-শুনে অনেক অভ্যস্ত, তেমন অদ্ভুদকিছু অনুভব করি না । কিন্তু আপনাদের প্রতি আমার একটু কষ্ট হলো কারণ আপনারা দান্ডার জন্য এসব করছেন না, বরং নিজের পয়সা খরচ করে যথাসম্ভব এগিয়ে যেতে চেষ্টা করছেন -উৎসাহ-উদ্দীপনাহীন আমাদের পার্বত্য যুব সমাজকে অনুপ্রাণিত করতে আপ্রাণ চেষ্টা করার পর আপনাদের বিনিময়ে মিলেছে হুমকি-দুমকি-এক গাল বকা । অবশ্যই তা মিলার কথা, এখানেতো ব্যতিক্রম কিছু হয়নি, যা হবার ছিল তাই হয়েছে । দেখুন, ভালোকিছু করার আগে আমাদের জানতে হবে যে কাজটিতে অনেক চেলেঞ্জ এবং সময়ের ব্যয় অত্যবশ্যক -কারণ ভালো কিছু উপহার দিতে এমনটা ঘটে । এরজন্য দরকার সঠিক প্লেনিং । আর বাংলাদেশের মানুষদের মন-মানসিকতার উপর ও যথেষ্ট পরিমাণে ভালো ধারণা থাকা উচিত । এখানকার মানুষগুলো খুব ছোট্রকাল হতে শিখে আসছে যে একজনকে কিভাবে ঠকানো যায়, কিভাবে ক্ষতি করা যায় আর কিভাবে পিছু হটা যায় । আমরা সেই পিছু পড়া দেশের এক অংশমাত্র । জুলিয়ানকে উইকি লিক্সের জন্য মৃত্যুর সাথে সামনাসামনি হতে হচ্ছে । সবকিছুর পরও জেএসএস-ইউপিডিএফকে আমরা বকাঝোকা দিচ্ছি, তারপর ও কি সবকিছু তারা এতদ্রুত ইতি টানবে (?) না, কখনো নয় । আপনি যদি ভালো কিংবা খারাপ কিছু করতে চান আপনার পিছনে অনেক শক্রুর জম্ম নেবে, এবং কি আপনার আগের বন্ধুরা ও শক্রুতে রুপ নিতে পারে, কারণ ইহাই হচ্ছে জগতের মানুব মননের নিয়মতান্ত্রিকতা । আপনার পিছু ছুটবে যখন দেখবে যে আপনি শত-বাঁধাবিপত্তিকে সামনে রেখে ও সাফল্যর সোপানে এগিয়ে যাচ্ছেন এবং জীবনকে অর্থবহ করে চলেছেন, ঠি সেসময় আপনার সাফল্যর গাঁথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে আর আপনার দ্বায়িত্বের ভার আগের চেয়ে ও বাড়বে । নিজের আত্ম-সম্মানকে রক্ষা করা অন্য এক গুরুত্বপূর্ণ দ্বায়িত্ব হয়ে যায় ।

পৃথিবীতে কোন মানুষটি বদনাম এবং মানুষের সমালোচনার উর্ধ্বে ? কেউ কি আছেন এমন ব্যক্তি ? না, কেউ নেই । ভগবান-আল্লা-ঈশ্বর কিংবা আইনস্টাইনরা ও সমালোচনার উর্ধ্বে নন । এবং কি ভগবান বুদ্ধকে অনেক কুসংষ্কার-রীতিনীতি-অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে কাজ করতে গিয়ে বহুবার মৃত্যুর সামনা-সামনি হতে হয়েছে । মানবেন্দ্র নারায়ন লারমাকে খুশীচিত্তে মৃত্যুকে অর্ভ্যুথনা জানাতে হয়েছে । আমাদের শ্রদ্ধেয় বনভান্তেকে অনেকেই পাগল বলে অভিহিত করেছিলেন যখন গহীন জঙ্গলে নির্বাণ লাভের সৎ উদ্দেশ্য ভাবনা করতেছিলেন, কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেখা গেলো সেই পাগলের পিছনে লক্ষাধিক মানুষের পদচারণা, যারমতো ক্ষমতাশীল দ্বিতীয় ব্যক্তিটি পার্বত্য তথা সমগ্র বাংলাদেশের বৌদ্ধ সমাজে আদৌ জন্মাতে পারেনি । আইনস্টাইনের শৈশবকালকে পড়তে গেলে বুঝবেন যে, তিনি কোন অবস্থা থেকে কোথায় পৌঁছেছেন । মানুষের উত্তান-পতন থাকে । তাই সবকিছুর পর ও ধৈর্য্য-সহ্যর গুণ না থাকলে জীবনে কখনো ভালো কাজ করতে পারা যায় না । মৃত্যুর হুমকি আমাকে ও একসময় খেতে হয়েছিল, রাষ্ট্রতন্ত্রের হুশিয়ারী । কিন্তু তোয়াক্কা করিনি -ভয় পেয়েছিলাম কিন্তু থেমে থাকিনি । সামহ্যোয়ার নামের ব্লগে আমাকে বিনানোটিশে ব্যান করা হয়েছে । ইউপিডিএফ-জেএসএস’কে যে খোলাখুলি সমালোচনা করছি তারা আমাকে কোনসময় সাক্ষাৎ পেলে কি আমাকে সাদরে-হাশি-খুঁশিতে আপ্যায়ন করবে ? না, আমার উপর কর আরোপ করা হতে পারে অন্যথা শেষ-নিশ্বাস । ছাত্রবস্থায় যদি কোন রিক্স না নিতে চান তাহলে তেমনকিছু জাঁকজমকপূর্ণ না করে ছদ্মনামে চালিয়ে যেতে পারেন । কারণ আমাদের উপর জলপাইদের কড়া নজর সবসময় লক্ষ্যবস্তুতে, তাদের নিজস্ব হ্যাকারস বাহিনী গড়ে তোলা হয়েছে -সিআইডি -কিংবা ইন্টারন্যাশনাল লেভেলের স্পাই । আর আমাদের সমাজের কেউ ও যে লিপ্ত নন কিভাবে বিশ্বাস করা যায় ? আমাদের ও অনেক উগ্রবাদী আছেন যারা নিজের ভাষা-জাত ব্যতীত অন্যভাষা কিংবা জাতকে ভিন্ন চোখে দেখতে চান; তেমন লোকের দল সব সমাজেই থাকবে, তবে কম এবং বেশি ।

প্রতিযোগিতার বিশ্বে অনেক প্রতিযোগিরা ও আপনাদের বিরুদ্ধে নেমে যেতে পারেন । অন্য আদিবাসী ব্লগের এডমিনকে একসময় এমন দশায় পড়তে হয়েছিল বলে তিনি স্বীকার করেছিলেন তেনার রেডিও সাক্ষাৎকারে কিন্তু তারা থেমে থাকেননি । আর এক সত্য কথা হচ্ছে; আমাদের জু্ম্ম-ছাত্রসমাজ লেখালেখিতে এতটা দক্ষ হতে পারেনি । আমি নিজেও তো এতটা দক্ষ নন, তবুও চেষ্টা করি লিখতে তাই লেখা হয়ে যায় । আমার বেঁচে থাকার ভবিষ্যৎ নতুন প্রজন্মকে ঘিরে; বিন্দু-বিন্দু জমে থাকা স্বপ্নগুলোকে বাস্তবে পরিণত করাতে আমি বদ্ধপরিকর । সৎ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে পথ চললে আপনার নিশ্চয় জয়ী হবেন ।

আমি আপনাদের পাশে আছি, অর্থ দিয়ে না পারলে ও আমার পূর্ণ জনসমর্থন আপনাদের পাশে থাকবে । আমি আমার লেখা দিয়ে আপনাদেরকে সাহায্য করে যাবো -আমার প্রতিটি লেখা বিনা-অনুমতিতে প্রকাশ করতে পারেন । জীবন যুদ্ধে জিততে হলে লড়তে হবে ।

ইতি,

অমিত হিল

বাংলাদেশ/ভারত

মূল সংবাদের উৎস

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/191

সরেজমিন পার্বত্য চট্টগ্রাম-৪ : : লক্ষাধিক পরিবারের উদ্বাস্তু জীবন

অ রু ণ   ক র্ম কা র

হ রি  কি শো র  চা ক মা

সৈ ক ত  দে ও য়া ন

খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার চিত্তরঞ্জন চাকমা ১৯৯৮ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ভারতের শরণার্থী শিবির থেকে দেশে আসেন। কিন্তু তিনি তাঁর ২৯ নম্বর ছোট মেরুং মৌজার বিপিন কার্বারিপাড়ার জমিতে আজ পর্যন্ত পুনর্বাসিত হতে পারেননি। দী…ঘিনালার কাঁঠালতলী আবাসিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আরও ২৫টি পরিবারের সঙ্গে তাঁর প…রিবারও ২০০৭ সাল পর্যন্ত বসবাস করেছে। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তাঁদের নামমাত্র জমি দিয়ে অন্যত্র সরিয়ে দেওয়া হয়।

রাঙামাটির লংগদু উপজেলার নিউটন চাকমা ১১ নম্বর পেতান্নেমাছড়া মৌজার হেডম্যান। ১৯৮৯ সালে উদ্বাস্তু হয়ে এখন পর্যন্ত তিনি আর নিজের বাড়িতে ফিরতে পারেননি। সারা জীবন বিভিন্ন স্থানে বসবাস করার পর এখন পেতান্নেমাছড়া থেকে সাত কিলোমিটার দূরে বড় আদামে বাড়ি ভাড়া করে তিনি বসবাস করছেন।

মো. আবদুল মান্নানের বাড়ি ছিল ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলায়। ১৯৮১ সালে তাঁর পরিবারকে পুনর্বাসিত (সেটেলার) হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রামে নেওয়া হয়। তিনবার জায়গা বদল করে এখন তাঁর বসবাস রাঙামাটির সুবলং ইউনিয়নের বিলছড়া গ্রামের নতুনপাড়ায়। সেখানে আরও কয়েকটি পুনর্বাসিত পরিবারের বসবাস। কিন্তু এসব পরিবার যেখানে বসবাস করছে কিংবা যে জমি ভোগদখল করছে, এর কোনো কাগজপত্র তাদের কাছে নেই।

ছন্নছাড়া জীবন: ভারত প্রত্যাগত শরণার্থী, অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু ও পুনর্বাসিত বাঙালিদের এ রকম লক্ষাধিক পরিবারের ছন্নছাড়া জীবন। এর মধ্যে প্রায় ৯৩ হাজার আদিবাসী পরিবার, যারা পুনর্বাসনের অপেক্ষায়। এদের প্রায় ৯০ হাজার পরিবার অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু, অন্যরা ভারত প্রত্যাগত শরণার্থী। আর পুনর্বাসিত বাঙালি পরিবার যে কত, তার সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। একসময় এরা গুচ্ছগ্রামে থাকত। কিন্তু প্রজন্মের পর প্রজন্ম তো গুচ্ছগ্রামের বদ্ধ জীবন মানুষকে বেঁধে রাখতে পারে না। তাই তাদের অনেকেই বের হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে বেছে নিয়েছে ছন্নছাড়া জীবন।

সরকারি সূত্র জানায়, আগের আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে (১৯৯৬-২০০০) গঠিত ভারত প্রত্যাগত শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু পুনর্বাসনবিষয়ক টাস্কফোর্স তিনটি পার্বত্য জেলায় মোট ৯০ হাজার ২০৮টি আদিবাসী পরিবারকে অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু হিসেবে চিহ্নিত করেছিল।

২০০০ সালের ১৫ মে টাস্কফোর্সের তৎকালীন চেয়ারম্যান এবং বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদার অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের জেলাভিত্তিক পরিবারের সংখ্যা ঘোষণা করেন। সে অনুযায়ী রাঙামাটিতে ৩৫ হাজার ৫৯৫, বান্দরবানে আট হাজার ৪৩ এবং খাগড়াছড়িতে ৪৬ হাজার ৫৭০টি পরিবার রয়েছে। এদের একটি পরিবারও পুনর্বাসিত হয়নি।

এ ছাড়া ভারত থেকে ফিরে আসা আদিবাসী শরণার্থী পরিবার ছিল ১২ হাজার ২২২টি। এর মধ্যে নয় হাজারের মতো পুনর্বাসিত হয়েছে। বাকি তিন হাজরেরও বেশি পরিবার এখনো উদ্বাস্তুর মতো ছন্নছাড়া জীবন যাপন করছে।

টাস্কফোর্সের কার্যক্রম: বর্তমান সরকার গত বছরের ২৩ মার্চ খাগড়াছড়ির সাংসদ যতীন্দ্রলাল ত্রিপুরাকে চেয়ারম্যান করে টাস্কফোর্স পুনর্গঠন করে। এটি চতুর্থ টাস্কফোর্স। গত বছরের ৫ অক্টোবর খাগড়াছড়ি সার্কিট হাউসে টাস্কফোর্সের সভায় অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু পরিবারগুলোর আগের তালিকা প্রকাশ করা হয়। সিদ্ধান্ত হয় পরবর্তী সভা থেকে উদ্বাস্তুদের তালিকা যাচাই-বাছাই করে পুনর্বাসনের কাজ শুরু করার। প্রতি মাসে সভা করার বিধান থাকলেও তা হয় না। টাস্কফোর্সের সর্বশেষ সভা হয় গত জানুয়ারিতে। সেখানেও কাজের বিশেষ কোনো অগ্রগতি হয়নি। তারপর আর কোনো সভাই হয়নি।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে যতীন্দ্রলাল ত্রিপুরা প্রথম আলোকে বলেন, শিগগিরই টাস্কফোর্সের সভা হবে। আর অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের ব্যাপারে সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত দরকার।

শরণার্থী-উদ্বাস্তুদের অভিযোগ: অমরেন্দ্র চাকমা (৬২), পিতা সূর্য সেন চাকমা একজন প্রত্যাগত শরণার্থী। ঠিকানা ছিল রসিক নাগরপাড়া, দীঘিনালা, খাগড়াছড়ি। ১৯৯৮ সালে দেশে ফিরে এলেও এখন পর্যন্ত ভিটেমাটি ফেরত পাননি। বর্তমানে খাগড়াছড়ির রত্নমোহন মেম্বারপাড়ায় অন্যের জায়গায় বসবাস করছেন। একটি মুদি দোকানের পসরা বসিয়ে সংসার চালাচ্ছেন। তিনি বলেন, সরকার রেশন বন্ধ করে দিলে তাঁদের আর কোনো উপায় থাকবে না।

সুরনাথ চাকমা (৬৫), পিতা মৃত সুধন্য চাকমাও প্রত্যাগত শরণার্থী। ঠিকানা ছিল রসিক নাগরপাড়া, দীঘিনালা, খাগড়াছড়ি। নিজের ভিটেমাটি ফেরত পাননি। বর্তমানে রত্নমোহন মেম্বারপাড়ার ইন্দ্রমোহন চাকমার জায়গায় অস্থায়ী বসবাস। তিনি বলেন, ইন্দ্রমোহন চাকমা জায়গা ছেড়ে দিতে বললে পথে আশ্রয় নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না।

সুবর্ণা চাকমার পরিবার ১৯৭৯ সালে লংগদু উপজেলার বগাতচর ইউনিয়নের ৯ নম্বর মারিশ্যাচর মৌজার উদয়ছড়া গ্রামের নিজস্ব ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হন। এরপর নানা স্থান ঘুরে এখন আছেন রাঙামাটি শহরের পর্যটন এলাকার একটি বাড়িতে পাহারাদার হিসেবে।

বিপুলেশ্বর চাকমা (৫৩), পিতা মৃত বীর সেন চাকমা অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু। ঠিকানা ছিল ছোট মেরুং, দীঘিনালা, খাগড়াছড়ি। সেখান থেকে উচ্ছেদ হয়ে অনেক জায়গা ঘুরে এখন থাকছেন দীঘিনালার কালাচান মহাজনপাড়ায়। তিনি বলেন, এখনো তাঁদের পরিবারের নামে বন্দোবস্তকৃত ভূমির খাজনা হেডম্যানকে নিয়মিত দিয়ে আসছেন। তাঁদের জায়গা-জমি দখল করে আছেন করিম মেম্বার, মালেক মিস্ত্রিসহ কয়েকজন পুনর্বাসিত বাঙালি।

নন্দী বালা (৬২), স্বামী মৃত দিতেশ্বর দেওয়ান। তিনিও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু। ঠিকানা ছিল কালাচান মহাজনপাড়া, দীঘিনালা, খাগড়াছড়ি। তিনি বলেন, ১৯৮৬ সালে পুনর্বাসিত বাঙালিদের হামলার শিকার হয়ে ভারতে আশ্রয় নিলেও ১৯৯১ সালে স্বেচ্ছায় দেশে ফিরে আসায় প্রত্যাগত শরণার্থী হিসেবে বিবেচিত হননি। কোনো সরকারি সুযোগ-সুবিধাও পাননি। সেটেলার রেজাউল চেয়ারম্যানসহ কয়েকজন তাঁর জমি দখল করে আছেন বলে অভিযোগ করে তিনি বলেন, মামলা করে ১৯৯৪ সালে জমির মালিকানা পেয়ে কিছু জমি দখলে নেন। রেজাউল চেয়ারম্যান ও অন্যরা পাল্টা মামলা করে বাকি জমির দখল পেতে বাধা সৃষ্টি করেছেন।

কল্যাণ সমিতির অভিযোগ: জুম্ম শরণার্থী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক সন্তোষিত চাকমা প্রথম আলোকে বলেন, অধিকাংশ প্রত্যাগত শরণার্থী পরিবার অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা পেলেও জমি ও ভিটেমাটি পায়নি। নয় হাজার ৭৮০টি পরিবার পরিপূর্ণভাবে তাদের ধানি জমি, বাগান ও বসতভিটা ফেরত পায়নি। ৮৯০টি পরিবার হালের গরুর টাকা পায়নি। স্থানান্তরিত ছয়টি বিদ্যালয় আগের জায়গায় ফিরিয়ে আনা হয়নি। স্থানান্তরিত পাঁচটি বাজার পুনঃস্থাপন হয়নি। ৬৪২ জন শরণার্থীর ঋণ মওকুফ করা হয়নি। ৪০টি গ্রাম ও সাতটি হিন্দু-বৌদ্ধ মন্দির পুনর্বাসিত বাঙালিদের দখলে রয়েছে। প্রত্যাগত শরণার্থীরা বেশ কয়েকটি সাম্প্রদায়িক হামলার শিকার হয়েছে। এ ছাড়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে অনেক জমি বেদখলের ঘটনা ঘটেছে।

আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেএসএসের সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় (সন্তু) লারমা প্রথম আলোকে বলেন, এসব বিষয় মীমাংসার জন্য অবিলম্বে টাস্কফোর্সের বৈঠক করে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদার বলেন, এসব সমস্যা ভূমিকেন্দ্রিক। ভূমি কমিশনকে কার্যকর করেই এসব সমস্যার সমাধান করতে হবে। সরকার সেই চেষ্টা করছে।

নাগরিক কমিটির সহায়ক কর্মসূচি: পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের সহায়ক কর্মসূচি নিয়ে সক্রিয় হয়েছে সম্প্রতি গঠিত পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক কমিটি। আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও তাদের অধিকারের সাংবিধানিক স্বীকৃতিসহ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পূর্ণ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কার্যক্রম পরিচালনা এই কমিটির প্রধান কাজ।

গৌতম দেওয়ানকে চেয়ারপারসন ও যশেশ্বর চাকমাকে সেক্রেটারি করে গঠিত নয় সদস্যের এই কমিটি (মোট ১৫ সদস্যের হবে) ইতিমধ্যে ওই অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় সরকার ও সমাজের অন্যান্য অংশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ, আলোচনা, মতবিনিময় প্রভৃতি কার্যক্রম শুরু করেছে।

কমিটি পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে প্রথমত সহনশীল সহাবস্থান এবং পর্যায়ক্রমে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান পৌঁছে দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, নাগরিক কমিটির প্রতিনিধিদের সঙ্গে জনসংহতি সমিতি, ইউপিডিএফ ও জেএসএস (বিক্ষুব্ধ) নেতাদের এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

ভূমি কমিশনের কাজকর্ম সম্পর্কে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর উদ্বেগ জানিয়ে এবং এ ব্যাপারে প্রতিকার পাওয়ার লক্ষ্যে কমিটি সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে একটি স্মারকলিপি পাঠিয়েছে। এতে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিদ্যমান সার্বিক পরিস্থিতি বর্ণনা করে ভূমি কমিশনের চুক্তিবিরোধী কাজে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। কমিটি অবিলম্বে ভূমি কমিশন আইন সংশোধন এবং ওই আইন প্রয়োগের বিধিমালা প্রণয়ন করে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি অনুযায়ী ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির দাবি জানিয়েছে।

এ ছাড়া নাগরিক কমিটি পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের পাশাপাশি আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জাতীয় পর্যায়ে রাজনীতিবিদ, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক সংসদীয় ককাস, আইনজ্ঞ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ, মতবিনিময় প্রভৃতি চালিয়ে যাচ্ছে। সংবিধান সংশোধনের জন্য গঠিত বিশেষ কমিটির কাছে উপস্থাপনের জন্য নাগরিক কমিটি আদিবাসীদের পক্ষ থেকে একটি প্রস্তাব প্রণয়ন করছে বলেও জানা গেছে।

গৌতম দেওয়ান প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় কমিটি গঠনের লক্ষ্যে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থানীয় শাসনব্যবস্থার সমন্বয়হীনতা দূর করতে তাঁরা কাজ করছেন। প্রায় অকার্যকর জেলা পরিষদকে কার্যকর করতে জেলা পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠান যে জরুরি, সে কথাও তাঁরা জাতীয় নেতাদের কাছে তুলে ধরছেন।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন সম্পর্কে পার্বত্যবাসীর হতাশাব্যঞ্জক মনোভাব, আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ক্রমাগত হানাহানি, নির্বিচার চাঁদাবাজি, ভূমি জরিপ নিয়ে সৃষ্ট বিতর্কিত পরিস্থিতি প্রভৃতি মিলে সেখানকার বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সক্রিয় নাগরিক কমিটির প্রতি সর্বস্তরের মানুষের ইতিবাচক মনোভাব লক্ষ করা গেছে।

তারিখ: ১৮-০৯-২০১০ > >  http://www.prothom-alo.com/detail/date/2010-09-18/news/94310

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/101

নানিয়ারচর –এ পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের নেতা আটক

আদিবাসীদের সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ-পার্বত্যচুক্তি বিরোধী) সমর্থিত পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের নেতা বিলাস চাকমাকে আজ শনিবার সকালে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা আটক করেছে।

ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি বাবলু চাকমা চাকমা অভিযোগ করেন, সকাল ১০টার দিকে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা আলোচনার কথা বলে নানিয়ারচর টি অ্যান্ড টি বাজারে ডেকে বিলাসকে আটক করা হয়।

নানিয়ারচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোস্তফা কামাল ছাত্র পরিষদের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন । তিনি বলেছেন, পুলিশ ও সেনাবাহিনী যৌথ অভিযান চালিয়ে বিলাস চাকমাকে পাহাড়ি এলাকা থেকে আটক করা হয়েছে। তাকে এখনো থানায়  (দুপুর ১২টা) আনা হয়নি বলে তিনি জানান।

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/90

বান্দরবানে দুই আদিবাসী কিশোরী অপহৃত এরপর উদ্ধার

শুক্রবার রাতে নাই্যংছড়ি উপজেলার গুমধুম ইউনিয়নের বরইতলী তংচঙ্গ্যা পাড়া থেকে জসিম, জাহেদ ও মোস্তাক আহম্মেদের নেতৃত্বে ৫/৬ জনের বহিরাগত এক দল সন্ত্রাসী কিশোরী ইউনি তংচঙ্গ্যা (১৮) ও থাকিং তংচঙ্গ্যাকে (১৭) অপহরণ করে।

রাতেই তারা অপহৃতদের কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার হলুদিয়ার পাতাবাড়ী এলাকার একটি বাসায় বন্দি করে রাখে। শনিবার সকালে স্থানীয়রা বিষয়টি জানতে পেরে দুই আদিবাসী কিশোরীকে উদ্ধার এবং জসিম, জাহেদকে পাতাবাড়ী বাজারে আটক করে।

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/97

Page 25 of 27« First...1020...2324252627