“জেএসএস-ইউপিডিএফ-এর ফেসবুক নাটিকা এবং কিছু ভাষ্য বিশ্লেষণ”-এর উপর মন্তব্যের প্রেক্ষিতে কিছু জবাব

গতকাল “জেএসএস-ইউপিডিএফ-এর ফেসবুক নাটিকা এবং কিছু ভাষ্য বিশ্লেষণ” শিরোনামে একটি লেখা দিলাম। আমার লেখার উদ্দেশ্য ছিলো ফেসবুকে বিশেষকরে CHTBD গ্রুপে যেভাবে জেএসএস-ইউপিডিএফ-এর নেতা ও আন্ডানেতাদের মধ্যে বাক্য সন্ত্রাস সহিংসতা সে ব্যাপারে ভাষ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিষয়টার প্রতি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করা।অনেকে মন্তব্য দিয়েছেন। তবে অধিকাংশ মন্তব্যই মূল বিষয়বস্তুর বাইরে। অভিযোগ পাল্টা অভিযোগ। দু’একজন আমার উদ্দেশ্যে মন্তব্য রেখেছেন। তাদের মধ্যে জুম্মল্যান্ড অন্যতম।সবার মন্তব্য পড়ে নিচে আমার মন্তব্য বা জবাব দেওয়ার চেষ্টা করলাম।

CHTBD গ্রুপের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও কিছু কথা-

জুম্মল্যান্ড বলেছেন,

ভাই, আমি দীর্ঘ ৫ মাস ধরে এই গ্রুপের আলোচনা দেখে এসেছি শুধু জেএসএস, আন্দোলন, সন্তু লারমা, সন্তু লারমার ব্যক্তিজীবন নিয়ে, তার চেয়ে বেশি নাই। এখানে বাংলাদেশের পরিস্থিতি, সরকার কী করছে, আমাদের দুলোগোষ্ঠীদের, জুম্ম যুব সমাজের, আন্দোলন কীভাবে আরো ‍এগিয়ে নেওয়া যাই, সচেতনতার, নারী অধিকার, ইতিহাস নিয়ে, সংস্কৃতি নিয়ে, কীভাবে যুব সমাজকে প্রগতিশীল রাজনৈতিক এগিয়ে নেওয়া যায় ইত্যাদি [সে] বিষয়ে কোনদিন আলোচনা করতে দেখিনি।

আমিও তো দেখে আসছি। সন্তু লারমা ও তার ব্যক্তি জীবন নিয়ে অপপ্রচারণার অভিযোগ আসছে কেন? এতদিন তো এ প্রশ্ন উঠেনি। সে যাহোক। আসল কথা হলো, জেএসএস-ইউপিডিএফ উভয় দলের কেউই সাধু নন। আমিও দেখে আসছি, উভয় দলের লোকজনই পরস্পরের বিরুদ্ধে, নেতাদের বিরুদ্ধে বিষোদগার করে যাচ্ছেন। এসব কথার মাধ্যমে তারা নিজেদের চরিত্র যেমন ফুটিয়ে তুলছেন, তেমনি নিজেদের নেতাদেরকেও হেয় করছেন। আর আমরা দুর্বলরা দু’দলের লোকদের তান্ডব চেয়ে চেয়ে আছি। সহ্যের সীমা যখন ছাড়িয়ে যাচ্ছে, তখন চিৎকার দিচ্ছি তোমরা ঐক্যবদ্ধ হও। ঐক্যের চিৎকার দিলে দীপায়নরা গালি দেয় “ফেরিওয়ালা” বলে।

আপনার দ্বিতীয় বিষয়টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফেসবুকে ও ব্লগের মাধ্যমে আমরা অনেককিছু জানতে পারতাম। জ্ঞান সৃষ্টি ও জ্ঞান বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারতো। কিন্ত দুঃখের বিষয়, যারা রাজনীতির সাথে জড়িত আছেন তারা কেউ তো আমাদের মত তরুণ প্রজন্মের সদস্যদের মাঝে জুম্মদের রাজনীতি, ইতিহাস, সংস্কৃতি, আন্দোলন কীভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়, চুক্তিবাস্তবায়ন, নারী অধিকার, যুব ও ছাত্র সমাজ সংগঠিতকরণ ইত্যাদি বিষয়ে ধারনা দেওয়ার মত কোন কিছুই লিখেননি বা লেখেন না। কোন উদাহরণ কী দিতে পারবেন, জেএসএস থেকে কেউ কী এই CHTBD গ্রুপে কোন লেখা দিয়েছেন?ইদানীং এই গ্রুপে দীপায়নবাবুর পদচারণা দেখা যাচ্ছে। কিন্তু তিনি যা করে যাচ্ছেন সেটাকে আপনি কী বলবেন? জেএসএস-এর লোকজনও তো এই গ্রুপে তাদের রাজনৈতিক চিন্তা, আদর্শ, চুক্তিবাস্তবায়নের পক্ষে জনমত গড়ে তোলা, ও তাদের চলমান কর্মসূচী ইত্যাদি সম্পর্কে লিখতে পারতেন। কেউ যদি জেএসএস বা সন্তু লারমা সম্পর্কে কোন বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে থাকেন, সেটা তথ্য-উপাত্ত দিয়ে যুক্তি খন্ডন করতে আসছেন না কেন? কই, জেএসএস-এর লোকজনের কেউ তো কিছুই করছেন না। নিজেরা কিছুই করছেন না, অন্যদের দোষ দিয়ে লাভ কী? আমি আশা করবো, আপনি বা আপনারাও এগিয়ে আসুন। আলোচনা করুন, মন খুলে লিখুন, বলুন এবং অবশ্যই তা গঠনমূলকভাবে।

দীপায়ন খীসার ছাগলামি আর কত দিন?

আরো একটা ব্যবহার লক্ষণীয়। জেএসএস-এর লোকজন নিজেরা তো কিছুই করলো না। বরং অন্যরা যা করতে চায় সেটাতে বাগড়া দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। কিছু কিছু মন্তব্য থেকে বুঝা যাচ্ছে, জেএসএস-এর অনেক নেতাও আন্ডানেতা এখন CHTBD গ্রুপের উপর ক্ষুব্দ। বিভিন্নভাবে CHTBD গ্রুপের উপর চাপ সৃষ্টি করতে চাচ্ছেন।এদের মধ্যে দীপায়ন খীসার নাম সবার আগে দেখা যাচ্ছে।তিনি যেভাবে “ছাগলামি” শুরু করেছেন, তাতে সবাই বিরক্ত না হয়ে পারবেন না। পাঠকবন্ধুরা, মাফ করবেন।“ছাগলামি” শব্দটা তারজন্যে ব্যবহার করলাম। কারণ, তিনি নিজেই নিজের সম্পর্কে বলেছেন,

তা ঠিক।আগে ছাগল ছিলাম, এখন মানুষ হতে পারলাম।প্রসিতবাবুর ছাগলগুলো আসুন মানুষ হই” (দীপায়ন খীসা)

প্রসিতবাবুর কাছে থাকার সময় তিনি ছাগল ছিলেন।প্রসিতবাবুর খোঁয়াড় থেকে বের হয়ে জেএসএস-এর ঘরে আশ্রয় নিয়েছেন। এখানে এসেও মানুষ হয়েছেন বলে মনে হয় না, যদিও তিনি তা দাবী করছেন। সেই ছাগলামি এখনো রয়ে গেছে। তার ছাগলামির জন্যে পুরো জেএসএস-এর ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হওয়ার উপক্রম। CHTBD গ্রুপকে জব্দ করার জন্যে দীপায়নবাবু কখনো বলছেন, CHTBD গ্রুপ “গুন্ডুষের দোকান”, আবার কখনো বলছে “ডিজিএফআইয়ের দালাল”।আর অপ্রয়োজনীয়ভাবে এডমিন পাইচিংমং মারমাকে “গুন্ডুষ দালাল” বলে গালি দিচ্ছেন।আর এখানে শেষ নয়, CHTBD গ্রুপ দীপায়নবাবুকে সংযত হওয়ার অনুরোধ জানালে দীপায়নবাবু প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়ে বলেন,

“Dear CHT BD ADMIN Eta Asol Dipayon KHisa, ADMin ki Nokol der Bundu? DeKa hobe Kono Somoy”

এটা কিসের ইঙ্গিত? “দেখা হবে কোন সময়” – কীভাবে? “দেখা হবে” মানে কী? দীপায়নবাবু কী CHTBD গ্রুপকে কোন জঙ্গী হামলার হুমকি দিচ্ছেন? দীপায়নবাবু, অক্ষমের শেষ হাতিয়ার হুমকী, ধামকি ও সহিংসতা। কিন্তু দিন তো অনেক বদলেছে।হুমকী-ধামকি দিয়ে রাজনীতি হয় না।

আপনার দোহাই দীপায়নবাবু, আপনি একজন রাজনৈতিক কর্মী। আপনার কাছ থেকে দায়িত্বশীল আচরণ কামনা করি। আপনার কর্মকান্ডের মাধ্যমে “ম্যূয়ত মাল্লে লাজ নেই, পুনত মাল্লেও লাজ নেই”- এই চাকমা প্রবাদ বাক্যটাকে সত্য বলে প্রমাণিত করবেন না।

সেই সাথে জেএসএস-এর নেতা-কর্মীদের কাছেও আহবান জানাই, দীপায়ন খীসার ছ্যাবলামি রোধ করার জন্যে। জেএসএস-এর নেতা-কর্মীদের মনে রাখতে হবে, হুমকী ধামকি দিয়ে মানুষের ভালবাসা শ্রদ্ধা অর্জন করা যায় না।দীপায়নবাবুর মত ছাগলের মাথা দিয়ে নয়, বুদ্ধিদীপ্ত নেতা-কর্মীর মেধা ও প্রজ্ঞা দিয়ে রাজনীতি করতে হবে। পেশ শক্তি দিয়ে নয়, বুদ্ধি দিয়ে লড়াই করতে হবে।তবে ভবিষ্যত উজ্জল হতে পারে নতুবা নয়।

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/833

জেএসএস-ইউপিডিএফ-এর ফেসবুক নাটিকা এবং কিছু ভাষ্য বিশ্লেষণ

চাকমা প্রবাদঃ গাছ চিনে বাগলে মানুষ চিনে হা গল্লে (গাছ চেনা যায় বাকলে, মানুষ চেনা যায় মুখ খুললে)

………………………………………

বেশ ক’দিন হয়ে গেলো ব্লগ লেখা হচ্ছে না কাজের ব্যস্ততার কারণে। আজকে একটু সময় পেলাম। ইচ্ছা ছিলো আজকে পার্বত্য চট্টগ্রামের দু’দলের রাজনৈতিক বিষয়ের বাইরে অন্য বিষয় নিয়ে লিখবো।কিন্তু ফেসবুকে ঢুকে অন্য বিষয় আর মাথায় আসছে না।ফেসবুক দেওয়াল জুড়ে চোখ পড়লো জেএসএস-ইউপিডিএফ-এর নেতা ও আন্ডানেতাদের প্যাচাল।চাকমা ভাষায়, “গুজি গুজি চঁ থোন” (ঘুরে ফিরে একই পদ) – জেএসএস ও ইউপিডিএফ-এর মধ্যে পরস্পরকে রেষারেষি ও দোষাদোষি। মন্তব্যগুলোতে কি রকম ভাষার ছিরি! দু’দলের নেতা ও আন্ডানেতাদের মধ্যে ফেসবুক জগতে বিনিময় হচ্ছে ঝাল-অম্ল-টক-তিক্ত কথাবার্তা।আপাতত এটুকুই সান্তনা অন্তত গুলি বিনিময়ের চেয়ে ঝাল-অম্ল-টক-তিক্ত বাক্য বিনিময় অনেক ভালো। আরও একটা সুযোগ হলো, এসব কথাবার্তা বিনিময়ের মাধ্যমে তারা তাদের প্রকৃত চেহারাগুলো আমাদের সামনে পরিস্কার করে ফুটে তুলছে। সবাই জানার সুযোগ পাচ্ছি জেএসএস-ইউপিডিএফ-এর নেতা ও আন্ডানেতারা কতটুকু যোগ্যতাসম্পন্ন।তাই আজকের লেখাটার উদ্দেশ্য হলো উপরে উল্লেখিত চাকমা প্রবাদ বাক্য অনুসরণে জেএসএস এবং ইউপিডিএফ-এর নেতা ও আন্ডানেতাদের ব্যবহৃত ভাষাগুলোর বিশ্লেষণ করা।

এক একটা বিষয়ের উপর ফেসবুক বন্ধুরা সংলাপের মাধ্যমে ছোটখাটো অনেক নাটিকা তৈরী করে ফেলেছেন। হয়েছে)।নমুনা হিসেবে এ লেখার জন্যে কেবল দু’টো ছোট ফেসবুক নাটিকা বেছে নেওয়া হয়েছে। একটা হলো, Chtnews Bangla-র পোস্টকৃত বান্দরবানে ইউপিডিএফ কর্তৃক ২০ জুলাই সড়ক ও নৌ-অবরোধ, আর অন্যটা হলো ফেসবুকবন্ধু জুনোপহর-এর পোস্টকৃত ইউপিডিএফ ‍কর্তৃক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র অপহরণ ঘটনা।এ দু’টো ঘটনার উপর ফেসবুকবন্ধুরা সংলাপের মাধ্যমে অনেক মজার নাটিকা তৈরী করে ফেলেছিলেন (নাটিকাগুলো সংযুক্তিতে দেওয়া

ফেসবুক নাটিকা ও কুশীলবদের পরিচিতি

CHTDB গ্রুপের কল্যাণে এখন অনেকের সাথে অনেক পোস্ট ও মন্তব্য ভাগাভাগি করার সুযোগ হচ্ছে। এসব পোস্টে ও মন্তব্যে অনেক মজার মজার তথ্য আছে। আগেই উল্লেখ করেছি, এ লেখার জন্যে কেবল Chtnews Bangla ও জুনোপহরের দু’টো ফেসবুক নাটিকা বেছে নিয়ে নিয়েছি। প্রথমটা, Chtnews Bangla-র অন্যটি জুনোপহরের। Chtnews Bangla-র একটি পোস্ট দিয়েছে,

“সংখ্যালঘু জাতিসমূহের ওপর বাঙালি জাতীয়তা চাপিয়ে দেয়ার প্রতিবাদে এবং সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের দাবিতে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) আগামী ২০ জুলাই বুধবার বান্দরবান জেলাব্যাপী পূর্ণ দিবস শান্তিপূর্ণ সড়ক নৌপথ অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে”

এ পোস্টের ভিত্তিতে নাটিকাটি তৈরী করা হয়েছে। এ নাটিকার কুশীলবরা হলেন, দীপায়ন খীসা, মোনটুক চাঙমা, রয়েল চাঙমা ও স্মরবিন্দু টাইরেংস্রি। কুশীলবদের দু’ভাগে ভাগ করা যায় – জেএসএস আর ইউপিডিএফ। জেএসএস-এর পক্ষে অভিনয় করেছেন দীপায়ন ও স্মরবিন্দু। আর ইউপিডিএফ-এর পক্ষে অভিনয় করেছেন মোনটুক চাঙমা ও রয়েল চাঙমা।প্রসিতবাবুর শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ঘর নিয়ে দীপায়নবাবুর সূচনা সংগীতের মাধ্যমে নাটিকার শুরু এবং শেষও হয় তার স্বগতোক্তির মাধ্যমে। যেই স্বগতোক্তির মাধ্যমে জানা গেলো ইউপিডিএফ-এর নেতা রবিবাবুর অবরোধকালে “পালানোর রোগ” হয়।

অন্যদিকে, অন্য নাটিকাটি রচনা করেছেন ফেসবুকবন্ধু জুনোপহর। তার নাটিকার সূচনা বক্তব্য (যেটা ফেসবুকে দেওয়া হয়, সেটা ইংরেজী থেকে বাংলায় ট্রান্সক্রিপট করা হলো) ছিলোঃ

জুনো পহরঃ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র জুয়েল চাকমাকে ইউপিডিএফ অপহরণ করে ৫০০০০ হাজার টাকা দাবি করতেছে …….এই স্বার্থলোভী কাজকে তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি।(Chittagong universitir pali bivager prothom borsher chhatro Jwel chakma ke UPDF opohoron kore 50000 hajar taka dabi kortechhe……. Ei sartho lovi kajke tibro ninda janachchhi…..)

নাটিকার কুশীলবরা হলেন জুনোপহর, জুম্মনেশন, হিল্লো গাবুজ্জ্যে, জিদু চাঙমা, রনো চাকমা, দীপক চাকমা, জুনি জুম্মবী, স্মরবিন্দু ও রয়েল চাঙমা।এই নাটিকার সংলাপ বিশ্লেষণে বুঝা যায়, জুম্মনেশন ও রয়েল জোরালেভাবে জেএসএস-এর বিপক্ষে কথা বলেছেন। আর জেএসএস-এর পক্ষে দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন জুনোপহর, জিদু, রনো, দীপায়ন, স্মরবিন্দু। অন্যদিকে মাঝেমাঝে ‘বিবেক’ চরিত্রে অভিনয় করেছেন হিল্লোগাবুজ্জ্যা, জুনিজুম্মবী আর দীপক।জেএসএস-এর অর্থ নেওয়া আর প্রাণ নেওয়া নিয়ে সূচনাসংগীত গেয়েছেন জুম্মনেশন। আর বিদায়ী সংগীত গেয়েছেন নাট্যকার জুনোপহর নিজেই।

নাটিকাগুলোর বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ

নাটিকা ও কুশীলবদের পরিচিতির পর স্বাভাবিকভাবে আলোচনায় আনতে হবে নাটিকা দু’টোর বিষয়বস্তু – কী বিষয় নিয়ে এগুলো মঞ্চস্থ হলো ফেসবুক জগতে। কুশীলবদের  ‍মুখে অনেক সংলাপ উচ্চারিত হয়েছে। এসব সংলাপ বিশ্লেষণ করলে অনেক বার্তা পাওয়া যায়।তাদের সংলাপে কী কী বিষয়ে তারা জনগণকে বার্তা পৌঁছে দিতে চেয়েছেন, সেগুলো সংক্ষেপে আলোচনা করার প্রয়াস পাচ্ছি।

নাটিকার মূল বিষয়ঃ সড়ক ও নৌপথ অবরোধ, এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র অপহরণ

শিরোনাম অনুসারে দু’টো নাটিকার বিষয় ভিন্ন ভিন্ন। প্রথমটার বিষয় হলো, “সংখ্যালঘু জাতিসমূহের ওপর বাঙালি জাতীয়তা চাপিয়ে দেয়ার প্রতিবাদে এবং সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের দাবিত” ইউপিডিএফ আগামী ২০ জুলাই ২০১১ তারিখে বান্দরবান জেলায় সড়ক ও নৌপথে অবরোধের ডাক। নাটিকার কুশীলবরা ইউপিডিএফ-এর এ কর্মসূচীর উপর তেমন কোন আলোচনা করেননি, কেবল দীপায়নবাবু ছাড়া। ইউপিডিএফ-এর এ কর্মসূচীর উপর আলোকপাত করতে গিয়ে, দীপায়ন বাবু বললেন, “ভালো কাজ”। তিনি একটু মস্করা করে আরো বললেন, ইউপিডিএফ-এর এসব কর্মসূচীর মাধ্যমে যদি জুম্মজনগণের ভাগ্য পরিবর্তন হয়, তাহলে প্রসিতবাবু ও রবিবাবুদেরও ভাগ্যের পরিবর্তন হবে এবং শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ঘরে থাকার সুযোগ হবে। জানিনা, জেএসএস নেতাদের শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ঘরে থাকার কোন খায়েশ আছে কী না। থাকুক বা না থাকুক, সেটা নিয়ে মাথা ঘামাই না। তারাও জুম্মজাতি উদ্ধারে তারাও ভালো কাজ করবে সেটা কামনা করি।

অন্যদিকে মোনটুক চাঙমা প্রশ্ন রেখেছিলেন, ইউপিডিএফ বান্দরবানে যে অবরোধের কর্মসূচীর ডাক দিয়েছে, তাতে দীপায়নবাবুর হিসাবের কোন হেরফের হচ্ছে কী না। মোনটুকের এ প্রশ্নের উত্তর বিভিন্ন দিক থেকে হতে পারে। যতদূর জানি, দীপায়ন বাবুর বাড়ী হলো বান্দরবানে। সেখানে ইউপিডিএফ-এর অবস্থান তেমন শক্ত ছিলো না বলে জানি। এখন দীপায়নবাবুর জন্মভূমিতে ইউপিডিএফ বাঙালি জাতীয়তা চাপিয়ে দেয়ার প্রতিবাদে অবরোধ কর্মসূচী দিচ্ছে।স্বাভাবিকভাবে দীপায়নবাবুর হিসাবে কিছুটা এলোমেলো হতে পারে।প্রথমত, তার জন্মভূমিতে ইউপিডিএফ-এর প্রবেশ ঘটেছে বা ঘটছে, যা তার জন্যে একটু বিব্রতকর বটে। দ্বিতীয়ত, আগে যেখানে ইউপিডিএফ-এর শক্ত সাংগঠনিক ভিত্তি ছিলো না, সেখানে অবরোধ কর্মসূচী ঘোষণা করা হয়েছে। এসব দিক বিবেচনা করলে দীপায়নবাবুর জন্যে একটু অস্বস্তিকর বৈকি।তবে এখন দেখার বিষয় সেই কর্মসূচী বাস্তবায়নে ইউপিডিএফ কতটুকু সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে।

এদিকে দ্বিতীয় নাটিকার বিষয় ছিলো, ইউপিডিএফ কর্তৃক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র জুয়েল চাকমার অপহরণ ও “৫০০০০ হাজার টাকা” মুক্তিপন দাবী। অপহরণ বিষয়ে ইউপিডিএফ-এর কুশীলবদের কাছ থেকে কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অপহরণ যেই করুক – ইউপিডিএফ হোক আর জেএসএস হোক, আমরা তার নিন্দা জানাই। আর অপহরণ কোন সভ্য সমাজে কখনো মেনে নেওয়া যায় না।

তবে টাকার অংক নিয়ে একটু খটকা লাগছে। নাট্যকার জুনোপহর কোথাও ভুল করেছেন কি না। তিনি বলেছেন, “৫০,০০০ হাজার টাকা” মুক্তিপণ হিসেবে ইউপিডিএফ দাবী করেছে। এখন “৫০,০০০ হাজার টাকার” সাথে আরো তিনটা শুন্য যোগ করলে হয় ৫০,০০০,০০০ মানে পাঁচ কোটি।এত পরিমাণ টাকা কোন জুম্ম মা বাবার আছে? যে এত টাকা দাবী করতে পারে তার মানসিক সুস্থতা সম্পর্কে যে কেউ সন্দিহান হতে বাধ্য। সে যাই হোক, পাঁচ টাকা হোক আর পাঁচ কোটি হোক, অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ও একটি জঘন্য অপরাধ। এই অপরাধের প্রতি তীব্র ঘৃণা জানাই।সেই সাথে নাট্যকার জুনোপহরকেও পুরো অপহরণ ঘটনা সম্পর্কে অবহিত আহবান জানাই। ঘটনা বা টাকার অংক সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা না থাকলে, এরকম একটি স্পর্শকাতর বিষয়ে অসত্য ভাষণ হতে বিরত থাকা উচিত।

এটাও ঠিক, শুধু ইউপিডিএফ নয়, জেএসএসও ধোয়া-তুলসী পাতা নয়। দু’দলেরই প্রতিপক্ষকে বা প্রতিপক্ষের আত্মীয়স্বজনকে অপহরণ করা আর মুক্তিপন দাবী করা –এরকম অনেক নজির আছে। অপহরণ ও মুক্তিপন আদায় জঘন্য অপরাধ। আমরা উভয় দলের কাছে প্রত্যাশা করি, অপহরণ ও মুক্তিপন আদায়ের মত কাজ করে করে জুম্মসমাজকে অসভ্য ও বর্বর সমাজে পরিণত করবেন না।

নাটিকার সাইড ইভেন্টস

উপরে উল্লেখ করেছি নাটিকার মূল বিষয় ছিলো ইউপিডিএফ-এর বান্দরবানে অবরোধ কর্মসূচী আর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র অপহরণ। এগুলো নাটিকার মূল বিষয় হলেও কুশীলবরা এসব বিষয়ে তেমন কোন অভিনয় করেননি। আগ্রহও ছিলো মনে হয়নি। বরং তারা সাইড ইভেন্টেস বা পার্শ্বচরিত্রে অভিনয়ের ব্যাপারে বেশি আগ্রহ ছিলেন বলে মনে হয়। নিচে তাদের সাইড ইভেন্টসগুলো নিয়ে আলোচনা করা গেল।

১) রাজনীতির নামে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অসুস্থতার চর্চা

ফেসবুকের আলোচনায় অনেক চরিত্র আছে। ভালো-মন্দ দুইই আছে। ফেসবুকের সুবাদে এ চরিত্রগুলোর মধ্যে তর্কাতর্কি হয়, বুদ্ধিদীপ্ত আলোচনাও হয়।নিজস্ব ভাষা, বর্ণ, সংস্কৃতি কিভাবে রক্ষা ও উন্নয়ন করা যায় সেসব ব্যাপারে ভাববিনিময় হতো। আবার কখনো কখনো রস ও রসিকতায় ফেসবুক দেওয়াল ভরে উঠতো। নতুন নতুন ফেসবুক গ্রুপ সৃষ্টি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে CHTDB গ্রুপে সবচেয়ে বেশি সদস্য আছে এবং এই গ্রুপে জুম্ম ছেলেমেয়েদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনা বা ভাববিনিময় হয় বলে আমার ধারনা। আমার পর্যবেক্ষণমতে, আগে CHTDB গ্রুপে যে আলোচনা ও রস-রসিকতা বিনিময় করার যে পরিবেশ ছিলো, সেটা গত ২/৩ সপ্তাহে অনেক ম্লান হয়ে গেছে মনে হয়। এটার পেছনে কয়েকজন কুশীলবের ভূমিকা রয়েছে।  দীপায়ন বাবুর প্রতি দুঃখ প্রকাশ করে বলতে চাই, এসব কুশীলবদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত মুখ হলেন দীপায়নবাবু। দীপায়নবাবুকে জানতাম একজন ভালো লিখতেন এবং রাজনৈতিক কর্মী।কিন্তু তিনি সেই পরিচিতিকে ছাড়িয়ে গত কয়েকদিনে ফেসবুক দেওয়ালে যা যা করছেন সেটাকে পাগলামি ছাড়া আর অন্যকিছু বলা যায় না (দুঃখিত, দীপায়নবাবু এটাকে ব্যক্তিগত আক্রমণ বা পেছন থেকে আপনাকে ল্যাঙ মারা হিসেবে নেবেন না)।আগেও দু’দলের নেতা ও আন্ডানেতাদের মধ্যে ফেসবুকে ঝগড়া হতো না তা নয়। সেই ঝগড়াতে দীপায়ন খীসার পাগলামি নতুন মাত্রা যোগ করেছে বলে মনে হয়। যেমন, দীপায়ন খীসা ও অন্যদের মধ্যেকার একটা সংলাপ দেখুন,

দীপায়ন খীসাঃ আজ বিকেলবেলা ঢাকা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে কিছু গুন্ডুস (ইউপিডিএফ) দেখলাম। সবার হাতে ল্যাপটপ। একজন বললো, নিরনবাবু তাদেরকে ল্যাপটপগুলো দিয়েছে।

জুম্মনেশনঃ দীপায়ন তোর পাগলামি দিন দিন বাড়ছে। মনে হয়, তোকে চিকিৎসা করার জন্যে সন্তু টাকা দিচ্ছেন না।

স্মরবিন্দু টাইরেংস্রিঃ জুম্মনেশন ভাই, তাহলে তুই কী? তুই তো পাগলের চেয়ে অধম। পাগলের চেয়ে অধম না হলে কী, অন্ধকারে কালো বিড়াল খুঁজিস? খেক!খেক!খেক!খেক!খেক! লজ্জাশরম নেই। আর জুম্মনেশন নাম রেখে বলে, জাতিকে বিক্রি করে খাও!

কিছুদিন হলো দীপায়ন খীসা ইউপিডিএফ-এর ল্যাপটপ বিতরণ, প্রসিত খীসার জামা ও শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ঘরের খায়েসের কথা বলে বেড়াচ্ছেন।জানিনা, দীপায়নবাবু এসব কথা বলে বলে কী অর্জন করতে চান। তিনি এখন জেএসএস-এর নেতা ও কর্মী। তার দায়িত্বশীল কথাবার্তা ও আচরণ সবার কাম্য। কিন্তু তার এ ধরনের আচরণের মাধ্যমে নিজেকে যেমন খাটো করছেন, তেমনি জেএসএস-এর গুরুত্বকেও হালকা করে ফেলছেন।এটা কাম্য হতে পারে না। আমি নিশ্চিত, এখানে ফেসবুকে যারা অংশগ্রহণ করছেন, তাদের অধিকাংশই তরুণ, এবং তারা দীপায়নবাবুর চেয়ে কম বয়সী হবে। দীপায়ন বাবু, ছ্যাবলামি করে এসব তরুণদের মধ্যে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও রেষারেষির সুযোগ করে দিচ্ছেন কেন? ঢিল মারলে পাটকেল খেতে হয়। পাঠকবন্ধুরা, একটু গভীরভাবে দেখুন দীপায়নবাবুর জবাবে জুম্মনেশন কী বলেছেন। দীপায়নবাবুর কারণে ফেসবুকের এ নোংরা নাটিকায় সন্তু লারমাও জড়িত হয়ে পড়ছেন।জুম্মনেশন জোর দিয়ে বলেছেন, সন্তু বাবুর টাকা না পাওয়ায় দীপায়ন বাবুর পাগলামি বেড়ে যাচ্ছে। এ ধরনের কথাবার্তা অগণিত সাধারণ ফেসবুক ব্যবহারকারীদের মধ্যে কী বার্তা পাঠাচ্ছে? সন্তু লারমা’র কী অঢেল টাকা পয়সা আছে? থাকলেও কী তাহলে তিনি সেসব টাকা পয়সা দীপায়নবাবুদের মত রাখাল বালক লালন-পালন করতে ব্যয় করেন?

দীপায়নবাবুর ছোট ভাইয়েরা আরো একধাপ উপরে উঠে গেছেন। দেখুন জুম্মনেশন ও জুনোপহরের মধ্যেকার সংলাপ,

জুম্মনেশনঃ(জুনোপহরের উদ্দেশ্যে)কুত্তার বাচ্চা কাকে কি বলছিস জানিস?জুম্মনেশন ইউপিডিএফ-এর কাছ ভাত খায় না, জেএসএস-এর থেকেও খায় না।সে নিজের ভাত খেয়ে জুম্মদের গোলামী করছে। আর তোরা তো জুম্মদের ভাত খেয়ে কামড়াকামড়ি করছিস। তোদের রাত জেগে ভাত রান্না করে দিতে হয়, দরজা খুলে দিতে হয়। ভাত খাওয়াইয়ে তোদের [শরীরের] মাংস বাড়িয়ে দিচ্ছি নিজের জাতিকে মেরে ফেলতে।

জুনোপহরঃ হ্যাঁ, মিঃ চুদিরপতু [Fucking-বাংলা অনুবাদ] জুম্মনেশন। তোমার ব্যবহৃত ভাষার জন্যে তোমাকে ধন্যবাদ……তোমার বাবা-মা মনে হয় এটুকুই শিখিয়েছে…..ইস্ বিরক্তিকর।

জুম্মনেশনঃ কুত্তার বাচ্চা, কার বীর্য খেয়ে বেঁচে আছো জানিস? তোরা আরো আমাদের মত মুর্খদের লাঠি মারো।

জানিনা, এ দু’জন জেএসএস-ইউপিডিএফ-এর পালিতপুত্র কী না। তাদের এই পালিতপুত্ররা নির্লজ্জভাবে কত সুন্দর সুন্দর শব্দ উচ্চারণ করতে পারেন। তারা যদি কোন চক্ষুলজ্জাছাড়া জনসমক্ষে “কুত্তারবাচ্চা”, “চুদিরপুত” ইত্যাদি বলে গালিগালাজ করতে পারেন, তাহলে তারা বাস্তবেও কী মারামারি করতে দ্বিধা করবেন?(ফেসবুকে যদিও তাদের গালিগুলো শুনতে পাচ্ছি না, কিন্তু শব্দগুলো হৃদয়ে গভীরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে)।তাদের আচরণ দেখে প্রশ্ন জাগে, জেএসএস-ইউপিডিএফ  তাদের পালিতপুত্রদের কী শিক্ষা দিচ্ছে? পালিতপুত্ররা তাদের অভিভাবকদের কাছে থেকে কী মূল্যবোধের শিক্ষা পেয়েছেন? এরা যদি ভবিষ্যতে জেএসএস-ইউপিডিএফ-এর নেতৃত্বের হাল ধরেন, তাহলে তারা কেমন নেতা হবেন? তাদের দিয়ে কী জুম্মজাতির অধিকার প্রতিষ্ঠা সম্ভব?

দোহাই জেএসএস-ইউপিডিএফ-এর পালিতপুত্ররা/সমর্থকরা, পরস্পরের বিরুদ্ধে বিষ বমন করা থেকে বিরত থাকুন, বাক্যসন্ত্রাস হতে বিরত থাকুন। এরকম অসুস্থতার চর্চা চলতে থাকলে সমাজে এটার ভবিষ্যত পরিণতি শুভ হবে না। আর মনস্তাত্তিকভাবে অসুস্থ জাতি কখনো অধিকার ছিনিয়ে আনতে পারবে না। এ ব্যাপারে দু’দলেরই সচেতন থাকা দরকার।

২) মানুষের দুঃখ নিয়ে মস্করাঃ কে কাকে বিক্রি করে খায়?

দু’দলই দাবী করে তারা জুম্মজগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে কাজ করছে। সে কথা প্রতিধ্বনিত তাদের পালিতপুত্র/সমর্থকদের কন্ঠেও। তারাও সাজতে চায় সাচ্চা দেশপ্রেমিক। কেবল তারাই জুম্মজনগণের জন্যে কাজ করছে। কেবল নিজের কাজটা সঠিক, অন্যেরটা বেঠিক, অন্যরা দুঃখী জুম্মজনগণের দুঃখগুলো বিক্রি করে খায়। একে অপরকে নিলর্জ্জ বলে গালিগালাজ করে। পরস্পরের বিরুদ্ধে “জাতি বিক্রি” করে খাওয়ার অভিযোগ তুলেন। বিষয়টা বুঝার সুবিধার জন্যে ইউপিডিএফ ও জেএসএস-এর পক্ষীয় দুই কুশীলবের সংলাপ উদ্ধৃত করা গেলোঃ

রয়েল চাঙমাঃ …বুঝেসুজে মন্তব্য করবা…এনজিও চাকরী করে আদিবাসী আদিবাসী করে দুঃখি মানুষদের দুঃখগুলোকে বিক্রি করে খাও (জোর দেয়া হলো)…..লজ্জা করে না? (ইউপিডিএফ পক্ষে)

…………………………………………………………………………………………………………….

স্মরবিন্দু টাইরেংস্রিঃ … লজ্জাশরম নেই। আর জুম্মনেশন নাম রেখে বলে, জাতিকে বিক্রি (জোর দেয়া হলো) করে খাও!(জেএসএস পক্ষে)

এখানে উল্লেখ্য, ইউপিডিএফ-এর কর্মী রয়েল চাঙমার উদ্ধৃতিটা ছিলো জেএসএস-এর স্মরবিন্দুর উদ্দেশ্যে। সংলাপ অনুসারে, স্মরবিন্দু (যিনি জেএসএস সমর্থক) দেন) এনজিওতে চাকরী করেন।এনজিওতে চাকরী করে বলে তাকে ইউপিডিএফ-এর রয়েল খোঁচা মারছেন।আর প্রশ্ন করছেন, দুঃখি মানুষদের দুঃখগুলোকে বিক্রি করে খাওয়াতে লজ্জা করে কি না।

অন্যদিকে জেএসএস-এর স্মরবিন্দু(যার বিরুদ্ধে ইউপিডিএফ-এর কর্মী মানুষের দুঃখগুলো বিক্রি করে খাওয়ার অভিযোগে আনেন)জুম্মনেশন নামক জনৈক ইউপিডিএফ কর্মীকে “জুম্মনেশন” নাম রেখে জাতিবিক্রি করে খাওয়ার অভিযোগ এনে লজ্জাশরম নেই বলে গালিগালাজ করেন।

পাঠকবন্ধুরা, এখানে আপাতত রয়েল চাঙমা ও স্মরবিন্দুর উক্তিগুলোতে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন নেই।আমাদের জোর দিতে হবে তাদের মনের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা তিনটি শব্দগুচ্ছ – “লজ্জাশরম”, “মানুষের দুঃখগুলো” আর “জাতি” বিক্রি করে খাওয়া। রয়েল-স্মরবিন্দুরা মনের অজান্তে হোক, আর রাগে-ক্ষোভে হোক অনেক বড় বড় শব্দ উচ্চারণ করেছেন। এসব বিষয়ে লেখার ইচ্ছা ছিলো। কিন্তু লেখাটা লম্বা হয়ে যাচ্ছে বলে আপাতত নিজেকে বিরত রাখলাম। তবে পাঠকদের উদ্দেশ্যে এসব বিষয়ে লেখার জন্যে অনুরোধ রইলো। লেখার সূত্র হিসেবে কয়েকটা প্রশ্ন রাখলাম,

ক) জেএসএস-ইউপিডিএফ-এর নেতা, আন্ডানেতা ও পালিতপুত্ররা লজ্জাশরম শব্দের সাথে পরিচিত আছেন কী? না থাকলে, পার্টির তরফ থেকে জেএসএস-ইউপিডিএফ তাদেরকে লজ্জাশরমের উপর কোন রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ র্কোস চালু করতে পারেন কি?

খ)এনজিওতে চাকরী করে যদি “মানুষের দুঃখগুলো” বিক্রি করে খাওয়া যায়, তাহলে জেএসএস-ইউপিডিএফ করে কী করা যায়? অর্থাৎ “মানুষের দুঃখগুলো” নিয়ে জেএসএস-ইউপিডিএফ কী করে?

গ) “জাতি” কোথায় বিক্রি হয়? “জাতি” বিক্রিতে জেএসএস-ইউপিডিএফ কী কোন ভূমিকা পালন করছে? করলে কীভাবে?

শেষকথাঃ

ফেসবুক নাটিকা নিয়ে অনেক কথা হলো। এ লেখাতে অনেকে খুশী হতে পারেন আর অনেকে হতে পারেন বেজার। এখানে খুশি-বেজার হওয়ার বিষয় নয়। বরং ইদানিং ফেসবুকে জেএসএস-ইউপিডিএফ-এর অনেক নেতা বা আন্ডানেতা যেভাবে বাক্য সহিংসতা চর্চা শুরু করেছেন সেটা নিয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণের উদ্দেশ্যে আমার এ লেখা। ফেসবুকে পরস্পরকে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করা, বা হুমকী দেওয়া আপাতদৃষ্টিতে নির্দোষ কোন ব্যাপার বলে মনে হতে পারে। কিন্তু আমার মতে, এটা একটি ভয়ংকর চর্চা।এর ভবিষ্যত পরিণতি জুম্ম সমাজের জন্যে শুভ হতে পারে না।

ইংরেজীতে একটা কথা আছে, “Let the anger and talents in you be trained”.   ব্যক্তিগত উন্নয়ন হোক আর সামাজিক উন্নয়ন হোক, দু’টোতে রাগ বা জেদ যেমন দরকার তেমনি দরকার মেধা। সেজন্যে রাগ বা জেদকে বাগ মানানো যেমন দরকার, তেমনি দরকার মেধার সঠিক বিকাশ ও ব্যবহার।কিন্তু ফেসবুকের মাধ্যমে আমাদের তরুণ প্রজন্মের জেএসএস কিংবা ইউপিডিএফ-এর সদস্যরা যা করছেন, সেটা হলো রাগ বা সহিংসতার চর্চা।এখানে কোন মেধার চর্চা হচ্ছে না। পরস্পরের সাথে ঝগড়া করতে গিয়ে তারা রাগ ঝাড়ছেন, আর অপচয় করছেন সময় ও মেধা।

আসুন, ফেসবুকে হোক আর পাহাড়ের পরতে পরতে হোক, অসুস্থতার চর্চা বন্ধে আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ হই, সচেতন হই। ফেসবুক বা ভার্চুয়াল জগতে গালিগালাজ নয়, বাক্যসন্ত্রাস নয়, চাই পরমতসহনশীল পরিবেশ।পরমতসহিঞ্চুতাই আমাদের ঐক্য-শান্তি আনতে পারে। জেএসএস-ইউপিডিএফ-এর প্রতি অন্ধ আবেগ নয়, আমাদের তারুণ্যের রাগ ও মেধাশক্তি যুক্তিবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠায় ব্যবহৃত হোক সেটা কামনা করছি।

অডঙ চাকমা, ১৮ জুলাই ২০১১

…………………………………………

দুঃখ প্রকাশ

এ লেখাটা সাজাতে গিয়ে রেফারেন্স হিসেবে অনেকের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের কারোর মধ্যে মনোকষ্ট ঘটিয়ে থাকলে আমি তার জন্যে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি।

……………………………………………

সংযুক্তি

নাটিকা ১: ইউপিডিএফ-এর বান্দরবানে সড়ক ও নৌপথ অবরোধ

Chtnews Bangla

“সংখ্যালঘু জাতিসমূহের ওপর বাঙালি জাতীয়তা চাপিয়ে দেয়ার প্রতিবাদে এবং সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের দাবিতে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) আগামী ২০ জুলাই বুধবার বান্দরবান জেলাব্যাপী পূর্ণ দিবস শান্তিপূর্ণ সড়ক নৌপথ অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে”

দীপায়ন খীসাঃ ভালো কাজ। এবার যদি জুম্মরা উদ্ধার হয়, তবে প্রসিতবাবু আর রবি বাবু সেসময় কোথায় থাকবে? এসি ঘরে…

মোনটুক চাঙমাঃ ইউপিডিএফ-এর কর্মসূচী দেখে দীপায়ন বাবুর হিসাব কী গড়মিল হচ্ছে না কি?

দীপায়ন খীসাঃ একবার রবিবাবু অবরোধ করার ছবি তুলতে খাগড়াছড়ি যান, কিন্তু ছবি না তুলে পালিয়ে আসেন।

রয়েল চাঙমাঃ দীপায়ন খীসার লজ্জাশরম বলতে কিছু যে নেই। তোমার মুখে বিড়াল-কুকুরে পর্যন্ত প্রস্রাব করে দেবে না।

স্মরবিন্দু টাইরেংস্রিঃ তো রয়েলবাবু নিরন ও প্রসিত তোরে কত দেয় আকাম করার জন্যে? এরকম বে-আক্কলের মত কথা বলার জন্যে?

রয়েল চাঙমাঃস্মরবিন্দু তোমাকে শুধু জানলাম তুমি কে। বুঝেসুজে মন্তব্য করবা…এনজিও চাকরী করে আদিবাসী আদিবাসী করে দুঃখি মানুষদের দুঃখগুলোকে বিক্রি করে খাও…..লজ্জা করে না?

স্মরবিন্দু টাইরেংস্রিঃ তাই? তুমি লোকজনকে হুমকি দিতে পারো, তাই না? ভালো, এটা তো তোমার কাজ।

রয়েল চাঙমাঃ না, আমি করি না…..কেবল তোমরাই…..কারণ, তোমরাই সমাজে অশান্তি সৃষ্টির দায়ী।

স্মরবিন্দু টাইরেংস্রিঃ বড় মুক্তিযোদ্ধা বলে মনে হচ্ছে। খেক! খেক! খেক!

দীপায়ন খীসাঃ রয়েল চাঙমা, ফোরখেলা* খেলছে আর রবিবাবুকে আটকানোর [জন্যে] সেটা করছে, যাতে পালাতে না পারে। সামনে অবরোধ তো। রবিবাবুর তো পালানোর রোগ আছে।

………………………………………………………………………….

নাটিকা ২: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র অপহরণ ও মুক্তিপন দাবী

জুনোপহর

জুনো পহরঃ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র জুয়েল চাকমাকে ইউপিডিএফ অপহরণ করে ৫০০০০ হাজার টাকা দাবি করতেছে …….এই স্বার্থলোভী কাজকে তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি…………(Chittagong universitir pali bivager prothom borsher chhatro Jwel chakma ke UPDF opohoron kore 50000 hajar taka dabi kortechhe……. Ei sartho lovi kajke tibro ninda janachchhi……)

জুম্মনেশনঃ ইউপিডিএফ তো শুধু টাকা নিলো। তোমরা টাকাও নাও জীবনও নাও।

হিল্লো গাবুজ্জ্যেঃ দুঃখিত জুম্ম দা, আর নয় পক্ষপাতিত্ব। আসুন, আমরা খারাপ কাজগুলোকে নিন্দা জানাই। জুনো পহর ভাই, তোমরা মিথ্যা বলতে বলতে তোমাদের কথাগুলো আর বিশ্বাস হয় না। একটু পরিস্কার করে জানাতে পারবে কি যাতে আমরা বিশ্বাস করতে পারি?

জিদু চাঙমাঃ ওহ জুম্মনেশন, ভালো পথে হাঁটতে এসো এখনো সময় আছে।ভালো পথে হাঁটো। একটা প্রবাদ আছে, “সময় থাকতে হাঁটো, ঝোল থাকতে নাড়ো”।

জুনোপহরঃ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ফোন করে দেখো ভাই….জুম্মনেশন, তুইও কি একভাগ পেয়েছিস? তোদের কাজ হলো একতা একতা বলে জুম্ম জাতিকে খেয়ে শেষ করলে। জুম্মনেশন, ভালো হয়ে যা ভাই।

হিল্লো গাবুজ্জ্যেঃ ঠিক আছে জুনো ভাই। আমি ফোন করে দেখেছি। কিছুটা সত্য। কিন্তু কেউই বলতে পারছে না আসলে ঘটনাটা কী হয়েছে। বেশ হয়েছে ভাইয়েরা। এখানে আর ঝগড়া নয়। কালকে তো পত্রিকায় আসবে নিশ্চয়।

জুম্মনেশনঃ (জুনোপহরের উদ্দেশ্যে)কুত্তার বাচ্চা কাকে কি বলছিস জানিস? জুম্মনেশন ইউপিডিএফ-এর কাছ ভাত খায় না, জেএসএস-এর থেকেও খায় না।সে নিজের ভাত খেয়ে জুম্মদের গোলামী করছে। আর তোরা তো জুম্মদের ভাত খেয়ে কামড়াকামড়ি করছিস। তোদের রাত জেগে ভাত রান্না করে দিতে হয়, দরজা খুলে দিতে হয়। ভাত খাওয়াইয়ে তোদের মাংস বাড়িয়ে দিচ্ছি নিজের জাতিকে মেরে ফেলতে।

জুনোপহরঃ হ্যাঁ, মিঃ চুদিরপতু জুম্মনেশন। তোমার ব্যবহৃত ভাষার জন্যে তোমাকে ধন্যবাদ……তোমার বাবা-মা মনে হয় এটুকুই শিখিয়েছে…..ইস্ বিরক্তিকর।

জুম্মনেশনঃ কুত্তার বাচ্চা, কার বীর্য খেয়ে বেঁচে আছো জানিস? তোরা আরো আমাদের মত মুর্খদের লাঠি মারো।

রনো চাকমাঃ ইউপিডিএফ-এর ভাত তো খাস, তাই তাদের গুণগান তো গাস।এটাতো ইউপিডিএফ-এর আদর্শ তা প্রমাণ করলি। উপরে কী ভাষা! সংগঠনের আদর্শ কর্মীর প্রমাণ।

জুম্মনেশনঃ আমি কোন সংগঠন করি না। আমি নিজের ভাত খেয়ে জুম্মদের গোলামি করি।

জুনোপহরঃ হ্যাঁ, তুই মুর্খ। হা হা হা হা ইউপিডিএফ! এই আপনাদের আদর্শ? ইউপিডিএফ এখন দোতলা ভবন তোলার জন্যে নিরীহ জুম্মদের অপহরণ করে চাঁদা আদায় করছে।দাদা জুম্মনেশন, আপনি কয় টাকা ভাগ পাবেন?

দীপক চাকমাঃ (জুম্মনেশনের উদ্দেশ্যে) তোমার ভাষার ব্যবহারে তোমাকে ঘৃণা না করে পারলাম না।

জুম্মনেশনঃ তুই আসলে একটা বেকুব। সেজন্যে তো জেএসএস-এর এই অবস্থা।

জুম্মনেশনঃ (দীপকের উদ্দেশ্যে) ভাই, আসলে কথাগুলো বলতে চাচ্ছিলাম না। কিন্তু কী করবো! দুঃখে, এগুলো বলছি। কত কষ্ট করে ওদের রাত জেগে ভাত রান্না করে দিতে হয়, দরজা খুলে দিতে হয়। কিন্তু ইউপিডিএফ আর জেএসএস মুর্খ জুম্মদের এসব কষ্ট বুঝে না।

জুনোপহরঃ জুম্মনেশন ভালো। তাই ইউপিডিএফ চাঁদাবাজিতে ব্যস্ত। মনে হয়, জুম্মনেশন একটা ভাগ বেশি পাবে।তাই বাড়াবাড়ি করতেছে। চাকমা প্রবাদ বাক্য আছে, “হক কথা বললে আহম্মক বেজার, গরম ভাত দিলে বিলাই বেজার”…..

জুম্মনেশনঃ সবাইকে বলছি, আমার কথাগুলো দ্বারা মনে কষ্ট নেবেন না। আমি আসলে অনেক কষ্টে দুঃখে এসব বলতে বাধ্য হয়েছি।

জুম্মনেশনঃ তোমরা আসলে মানুষ হবে না।

দীপক চাকমাঃ (কিছু মনে করবেন না) কে কী মনে করবেন জানি না। আমার মনে হয়, ১৯৯৭ সালে প্রসিত যদি ইউপিডিএফ সৃষ্টি না করতেন, আমাদের জুম্মরা এতজন মরতো না।পার্বত্য চট্টগ্রামে এত ঝামেলা হতো না। তখন সরকার একটু হলেও আমাদের জুম্মদের ভয় করতে হতো। হয়তো সন্তুর কিছু ভুল থাকতে পারে শান্তিচুক্তি করার কারণে। তাই বলে তিনি এত ভুল করেছেন বলে মনে হয় না। কারণ, শান্তিবাহিনী আর কতদিন পাহাড় পর্বতে থাকবে। তাদের জন্যে একটু হলেও সহানুভূতি প্রকাশ করা দরকার ছিলো বলে মনে হয়।

জুম্মনেশনঃ হ্যাঁ, তাদের জন্যে কার সহানুভূতি ছিলো না? সবার আছে। আসলে তাদের স্বভাব খারাপ বলে তাদের প্রতি সহানুভূতি জাগে না। ওহ আচ্ছা!ওরা শান্তিচুক্তি করেছে ভালো কথা। তারা তো এ ব্যাপারে সরকারের সাথে কথা বলবে। ইউপিডিএফ তো তাদেরকে চুক্তি বাস্তবায়ন করে দেবে না। আর সরকারের কয় ১৩ বছর গেলো, তাদেরকে কী বাস্তবায়ন করে দিচ্ছে নাকি? বাস্তবায়ন করে দেবে না জেনেই ইউপিডিএফ-এর জন্ম হয়েছে।

দীপক চাকমাঃ (জুম্মনেশনের উদ্দেশ্যে) তুমি কেন কথায় কথায় আক্কেল ধরে কথা বলো? তুমি জানানো না চাকমারা আক্কেল ধরে কথা বললে পছন্দ করে না?

জুনি জুম্মবীঃ অপহরনের জবাব খুন করার অধিকার চাই। একটা গুলি মারলে পাল্টা গুলি মারতে হবে। জ্বালো রে আগুন জ্বালো। জুম্মমারা জিন্দাবাদ, জুম্মঅপহরণ জিন্দাবাদ। বাপের টাকা আনবো, ফেসবুকে থাকবো। ধাওয়া-ধাওয়ি করবো। ধাওয়া-ধাওয়ি যারা করবো না, তারা ফেসবুক প্রেম করবো।

দীপায়ন খীসাঃ আজ বিকেলবেলা ঢাকা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে কিছু গুন্ডুস (ইউপিডিএফ) দেখলাম। সবার হাতে ল্যাপটপ। একজন বললো, নিরনবাবু তাদেরকে ল্যাপটপগুলো দিয়েছে।

জুম্মনেশনঃ দীপায়ন তোর পাগলামি দিন দিন বাড়ছে। মনে হয়, তোকে চিকিৎসা করার জন্যে সন্তু টাকা দিচ্ছেন না।

স্মরবিন্দু টাইরেংস্রিঃ জুম্মনেশন ভাই, তাহলে তুই কী? তুই তো পাগলের চেয়ে অধম। পাগলের চেয়ে অধম না হলে কী, অন্ধকারে কালো বিড়াল খুঁজিস? খেক!খেক!খেক!খেক!খেক! লজ্জাশরম নেই। আর জুম্মনেশন নাম রেখে বলে, জাতিকে বিক্রি করে খাও!

রয়েল চাঙমাঃ পার্বত্য চট্টগ্রামের গোয়েন্দাসংস্থার মাধ্যমে স্মরবিন্দু টাইরেংস্রি এখন একজন এনজিও কর্মী। বিদেশে থাকে……তার আইডির মাধ্যমে প্রমাণ করা গেছে….

স্মরবিন্দু টাইরেংস্রিঃ হা হা হা হা হা রয়েল চাকমা। নিজে ডিজিএফআই-এর দালালগিরি করতো। তাই অন্যজনকেও সেরকম মনে করে।লজ্জা করে না, “ওয়াদুদকে গড ফাদার মেনে সেনাবাহিনীর সাথে উঠাবসা করে জুম্মজনগণের বিরুদ্ধে কথা বলতে। আমি তো জানি, তুমি কী করো না করো, কোথায় থাকো। এখানে লুকানোর কিছু নেই।

রয়েল চাঙমাঃ স্মরবিন্দু তোমাকে শুধু জানলাম তুমি কে। বুঝেসুজে মন্তব্য করবা…এনজিও চাকরী করে আদিবাসী আদিবাসী করে দুঃখি মানুষদের দুঃখগুলোকে বিক্রি করে খাও…..লজ্জা করে না?

স্মরবিন্দু টাইরেংস্রিঃ লজ্জা তো তোমার পাওয়া উচিত। মানুষকে অপহরণ করে যে টাকা নাও, বলতে লজ্জা করে না। আমার এনজিও করার কোন খায়েস নেই। সেসব করি না। স্মরবিন্দু তোমার বাড়ীর পাশে আছি।

রয়েল চাঙমাঃ স্মরবিন্দু তোমার ছোটকালের জীবন থেকে বলে দিতে পারবো এক নাগারে……

স্মরবিন্দু টাইরেংস্রিঃ বেশ! বেশ! তোমাকে তো বলেছি তোমার বাড়ীর পাশেই আছি।

দীপায়ন খীসাঃ আসল কথা হলো প্রসিতবাবু কিছু গরু-ছাগল নিয়ে একটা খামার খুলেছে। তাই তারা গরু-ছাগলের স্বভাব দেখাবে।

রয়েল চাঙমাঃ দীপায়নবাবু হলো হচ্ছে প্রসিত খীসার ছাগল। দুঃখের বিষয় ছাগলটি ঘাস খেতে খেতে অন্য মানুষের দ্বারা আরেকজনের কাছে বিক্রি হয়ে গেছে। সে এখন প্রভু ভক্ত হয়ে আছে।

দীপায়ন খীসাঃ তা ঠিক।আগে ছাগল ছিলাম, এখন মানুষ হতে পারলাম। প্রসিতবাবুর ছাগলগুলো আসুন মানুষ হই।

জুনোপহরঃ এদের মানুষ হবার কোন লক্ষণ দেখি না। এদের মনসা পূজায় বলি দিতে হবে মনে হয় প্রসিতবাবু। আগে তো কয়েকটা দিয়েছে, এখন এদের পালা…..

রয়েল চাঙমাঃ না না না না, এখন তুমিও ১০০% পাগল হয়ে গেছো।

জুনোপহরঃ রয়েল চাকমাকে আজকে একটা উপাধি দিলে কেমন হয় দীপায়ন দা? ওকে আজকে থেকে জন্তুবাবু ডাকবো…….হা হা হা হা

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/818

সংবিধান সংশোধন বিল পাসঃ বাঙালদের শঠামি ও আদিবাসীদের করণীয়

অডঙ চাকমা, ১ জুলাই ২০১১

গতকাল সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী বিল ২০১১ পাস হয়ে গেলো। সংবিধান সংশোধন বিষয়কটি প্রথমে ৫১টি সংশোধনী প্রস্তাব করে। পরে আরো চারটি সংশোধনী যোগ করা হয়। অর্থাৎ বর্তমান সংবিধানে মোট ৫৫টি সংশোধনী আনা হয় এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙাল এমপি’র উল্লাস ধ্বনিতে সেসব সংশোধনী পাস হয়ে যায়। পঞ্চদশ সংশোধনী বিল ২০১১ বিল পাস হয়ে যাওয়ার পরপরই গতকাল ৩০ জুন আমার প্রতিক্রিয়া লিখতে বসেছিলাম। লিখতে বসে বিদ্যূতও আমার সাথে বিতলামি শুরু করে দিলো। আসে আর যায়। ফলে গতকাল আর লেখা হয়নি। তাই আজকে আজকে আবার লিখতে বসলাম। কিন্ত সমস্যা দেখা দিলো কী লিখবো? কেননা, গতকাল লেখার যে আবেগ ছিলো, আজকে একদিন পরে লিখতে বসে সে আবেগ কোথায় যেন হারিয়ে গেলো। ফলে আজকে কম্পউটারে আঙুল যেন আর চলতে চাচ্ছিলো না। যেই কী বোর্ডে আঙুল চাপি, তখন মনের মধ্যে প্রশ্ন জাগে কী লিখবো?পঞ্চদশ সংশোধনী বিল ২০১১-এ তো অনেক সংশোধনী আছে। সেসব সম্পর্কে কি বলবো! তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে আমার এই এলোমেলো লেখার অবতারণা। আদিবাসী হিসেবে সংবিধানে আমাদেরকে কী দেওয়া হলো? আওয়ামীলীগ নেতৃত্বাধীন বাঙাল নেতা্রা আমাদের প্রতি কী ন্যায় বিচার করলেন? সংবিধান দেশের পরিচালনার পবিত্র দলিল হিসেবে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের আশা-আকাংখা ধারন করার কথা, সব নাগরিকের সমান অধিকার, মর্যাদা, স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার কথা এবং সব নাগরিকের সমানভাবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়ার কথা – এসব আকাংখা কী আমাদের সংবিধান ধারন করতে পেরেছে? আদিবাসী হিসেবে আমাদের চোখে এ সংবিধান একটি এলোমেলো দলিল এবং আদিবাসীদের আকাংখা ধারন করতে পারেনি। সবচেয়ে বড় কথা, এই সংবিধান প্রণয়ন ও সংশোধনকালে আদিবাসীদের অংশগ্রহণ ছিলো না। কাজেই রাষ্ট্র পরিচালনার দলিল হিসেবে এই সংবিধানকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করা ছাড়া আমাদের আর কোন উপায় নেই। আওয়ামীলীগ সরকার সংবিধান সংশোন নিয়ে অনেক কথাই বলেছে, অনেক যুক্তি দাঁড় করাতে চেষ্টা করেছে। যেমন, সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে ’৭২-এর সংবিধানে ফিরে যাওয়া, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সুদৃঢ় করা, ধর্মনিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনা ইত্যাদি। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ’৭২-এর সংবিধানে বর্ণিত রাষ্ট্রীয় মূলনীতিঃ জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্ম নিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনা হলেও তা করা হয়েছে খন্ডিতভাবে এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের জন্যে এ সংবিধান নয়, এ সংবিধান বাঙালদের জন্যে ও মুসলমানদের জন্যে।কাজেই এ সংবিধান সার্বজনীন নয় – একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। উগ্রবাঙালী জাতীয়তাবাদের পুনরুত্থান সংবিধানের নাগরিকত্ব অনুচ্ছেছদ ৬-এর (২) সংশোধন করে বাংলাদেশী নাগরিকত্বের সাথে সংযুক্ত করা হয়েছে, বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসেবে বাঙালি এবং নাগরিকগণ বাংলাদেশি বলিয়া পরিচিত হইবেন। এই অনুচ্ছেদ সংযোজনের মাধ্যমে বাঙালরা আমাদেরকে আবার বাঙালিতে রূপান্তরিত করলো। নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশী হলেও জাতি হিসেবে আমাদের অস্তিত্ব তো আর রইলো না। অর্থাৎ একক সত্ত্বাবিশিষ্ট বাঙালের জাত ছাড়া বাংলাদেশে আর অন্যকোন জাতির অস্তিত্ব রইলো না। বাংলাদেশ একটি একক জাতবিশিষ্ট রাষ্ট্রে পরিণত হলো। অথচ গত ২১ ফেব্রুয়ারীর বইমেলা অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী গর্ব করে বলেছিলেন, “বাঙালি জাতীয়তাবাদের মধ্যে কোন সংকীর্ণতার স্থান নেই”।কিন্ত সংবিধানে এই অনুচ্ছেদ সংযোজন করে তিনি বা আওয়ামীলীগ কী পরিচয় দিলেন? কোথায় অবশিষ্ট রইলো বহু ভাষা ও বহু সংস্কৃতির চেতনা? আমাদের সবার জানা, স্বাধীনতার পর যখন ’৭২-এ দেশের সংবিধান প্রণয়ন করা হচ্ছিল, তখন বাঙাল নেতারা জাতি, জাতীয়তা ও নাগরিকত্ব ধারনাকে এক করে গুলিয়ে ফেলেছিলেন। সেদিনও তারা বাঙালী জাতীয়তাবাদের খোলসে সব জাতিকে ঢুকাতে চেয়েছিলেন।সেই সময়ে উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টার প্রতিবাদ করেছিলেন তখনকার একমাত্র আদিবাসী প্রতিনিধি তথা গ্রামবাংলার গরীব দুঃখী মানুষের একমাত্র কন্ঠস্বর এম এন লারমা।তিনি চেয়েছিলেন সত্যিকার অর্থে বহুজাতি, বহুভাষী ও বহু সংস্কৃতির একটি আধুনিক রাষ্ট্র, আধুনিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। কিন্তু সেই সময় তার কথা শোনা হয়নি। তাই তিনি সংকীর্ণ বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে গড়ে তুলেছিলেন। সর্বশেষ গণতান্ত্রিক পন্থায় আন্দোলনের পথ রুদ্ধ হয়ে গেলে তিনি সশস্ত্র আন্দোলন শুরু করেছিলেন।যার খেসারত বাংলাদেশকে দীর্ঘ দুই তিন যুগেরও অধিক সময় ধরে দিতে হয়েছিলো।জেএসএস-এর সাথে চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে আওয়ামীলীগ সরকার সেই ঐতিহাসিক ভুলের মাসুল শোধরানোর জন্যে চেষ্টা করেছিলো। কিন্তু নতুন করে আবারো বাঙালি জাতীয়তাবাদের পুনরুত্থান ঘটিয়ে আওয়ামীলীগ আবারও সেই ঐতিহাসিক ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটালো। ধর্মনিরপেক্ষতা আর আওয়ামীলীগের ভন্ডামি আওয়ামীলীগ ধর্ম ব্যবসায়ী জামাতীদের চেয়েও ভন্ড এবং পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম রেখে সেই ভন্ডামির চরম পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছে।শুরুতে বিসমিল্লাহ রেখে কীভাবে ধর্মনিরপেক্ষতা হয়? রাষ্ট্রধর্ম নিয়ে আওয়ামীলীগের চরম ভন্ডামি দেখার মত, প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। তবে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ অন্যান্য ধর্ম পালনে রাষ্ট্র সমমর্যাদা ও সম-অধিকার নিশ্চিত করিবেন। জানি, এদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ইসলাম অনুসরণ করে।কিন্ত আমাদের বক্তব্য হলো, ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার। কোন নির্দিষ্ট ধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করে অন্য ধর্ম অনুসারীদের প্রতি বৈষম্য করা হয়।একদিকে ইসলামকে বলা হলো প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম, অন্যদিকে বলা হলো হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ অন্যান্য ধর্ম পালনে রাষ্ট্র সমমর্যাদা ও সম-অধিকার নিশ্চিত করবে। এটা স্ববিরোধী বক্তব্য নয় কি? একটা ধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করে অন্যান্য ধর্মগুলো কীভাবে সমমর্যাদা ও সম-অধিকার ভোগ করবে এটা বোধগম্য নয়। রাষ্ট্র তো ইসলামকে আসনটা বরাদ্দ দিয়ে ফেলেছে, অন্য ধর্মগুলো কীভাবে সে আসনে বসতে পারবে? সমমর্যাদা ও সম-অধিকার থাকলে কেন অন্যান্য ধর্মাবলম্বী যেমন হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানদের পুলিশের প্রহরায় ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান করতে হয়? কোথায় অন্য ধর্মের প্রতি সমমর্যাদা ও সম-অধিকার?? পার্বত্য চট্টগ্রামে কেন বৌদ্ধ মন্দিরে হামলা হয়? বৌদ্ধমন্দির আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়?যারা মন্দির পুড়িয়ে দিয়েছিলো, লুন্ঠন করেছিলো, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পবিত্রতা হরণ করেছিলো, তাদের ব্যাপারে রাষ্ট্র কী পদক্ষেপ নিয়েছিলো?রাষ্ট্রি একটি নির্দিষ্ট ধর্মের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট বলে পার্বত্য চট্টগ্রামে উগ্র বাঙাল ও উগ্র ইসলামন্থীরা অন্যধর্মের উপর আঘাত করার সাহস পায়, অবাধে জুম্ম জনগণের উপর অত্যাচার-নির্যাতন চালানোর লাইসেন্স পায়।তাই স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগে, পক্ষপাতদুষ্ট রাষ্ট্র কী আমরা চাই? তুমি হলে বাঙালি, আমারে করলে উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতি সত্তা, নৃ গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়! এবারের সংবিধান সংশোধনীতে আরো একটি নতুন চমক হলো, যারা আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতির জন্যে রাষ্ট্রের কাছে দাবী জানাচ্ছি, তাদেরকে বাঙালের আওয়ামী সরকার “উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতি সত্তা, নৃ গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়” হিসেবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করেছে। আওয়ামী বাঙালদের শঠতার আর কোথায় অবশিষ্ট রইলো? কোথায় আমরা সমান অধিকার পেলাম?কোথায় সম-মর্যাদা রইলো আমার? একটি অনুচ্ছেদের মাধ্যমে একদিকে সবাইকে বাঙালি বানালেন, অন্যদিকে আবার আমাদেরকে (আদিবাসীদেরকে) “উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতি সত্তা, নৃ গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়” বানালেন? বাংলায় বলে, কানাছেলের নাম পদ্মলোচন। হে বাঙালের আওয়ামীলীগ, আমাদেরকে কানা বানিয়ে পদ্মলোচন নাম দিলেন। এতে করে কী আমরা আপনাদের মত করে সমান মর্যাদা ও সমান অধিকার ভোগ করতে পারবো? সংবিধান সংশোধন করে পদ্মলোচনের জন্যে কী দিলেন? ২৩ অনুচ্ছেদে ২৩ (ক) সংযোজন করে পদ্মলোচনদের মনে সান্তনা দেওয়ার জন্যে একটা বাক্য ঢুকিয়ে দিলেন, “রাষ্ট্র বিভিন্ন উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতি সত্তা, নৃ গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন। এই বাক্যটা দিয়ে বড় ‘বাঙোদি’ (বাঙালিনী) হাসিনা খুব খুশী হয়ে সংসদে বললেন, “আমরা ক্ষুদ্র জাতিসত্তাদের অনুভূতিতে আঘাত দিতে চাইনি”।বড় বাঙোদি হাসিনা বলতে চেয়েছিলেন, ‘ক্ষুদ্র’দেরও সংবিধানে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সবার অধিকার নিশ্চিত করা হয়ে গেছে। বড় বাঙোদি হাসিনা আমাদের সাথে বড়ই পরিহাস করলেন। কিন্তু বাঙোদি হাসিনা “উপজাতি/ক্ষুদ্রজাতিসত্তাদের” এমন একটা অনুচ্ছেদে (২৩ অনুচ্ছেদ) ঢুকিয়ে দিলেন সেটাও বড়ই গোঁজামিল অনুচ্ছেদ। এই ২৩ অনুচ্ছেদ কেবল বাঙালদের জন্যে বরাদ্দ। সেখানে শিরোনাম দেওয়া আছে, “জাতীয় সংস্কৃতি”। কোন জাতির সংস্কৃতি? কিন্তু সংবিধান তো কেবল বাঙাল জাতিকে স্বীকৃতি দিয়েছে। কাজেই, [বাঙাল] “জাতীয় সংস্কৃতি”র সাথে একটু কায়দা করে যে বাক্যটা ঢুকিয়ে দিলেন তার মূল্য আর কতটুকু রইলো? [বাঙালদের] “জাতীয় সংস্কৃতি”র আগ্রাসনে “উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতি সত্তা, নৃ গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য” সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা কী সম্ভব হবে তো? বাঙোদি হাসিনা বিবি, বড় ভয় হয়, পরে যখন “উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতি সত্তা, নৃ গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের” লোকরা সংবিধানের এই ২৩ (ক) অনুচ্ছেদ বলে নিজেদের সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্যে দাবী জানাবে তখন কী বাঙালরা “জাতীয় সংস্কৃতির” দোহাই দিয়ে “ক্ষুদ্রদের” কন্ঠরোধ করবে না তো? বাঙালদের শঠামি দেখে আমার বিশ্বাস হতে চায় না। একক সত্তাবিশিষ্ট বাঙাল জাতঃ অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রগঠনে মূল অন্তরায় সংবিধান সংশোধন নিয়ে নতুন করে বেশি কিছু বলার নেই। বাঙালদের রাষ্ট্রগঠনের যে মূল দর্শন সেটার মূল ভিত্তি হলো একক সত্তাবিশিষ্ট বাঙাল জাতি রাষ্ট্র। স্বাধীনতার পর ’৭২-এ যে সংবিধান বানানো হয়েছিলো্ সেখানেও মূল চেতনা ছিলো বাংলাদেশকে বাঙাল জাতি রাষ্ট্র বানানো। সে কারণে বাঙাল ভিন্ন অন্য কোন জাতিসত্তার নাম তাদের মনে পড়েনি। এবার যখন সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিলো তখন অনেকে মনে করেছিলেন, অন্তত পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘ সশস্ত্র সংগ্রাম থেকে বাঙাল নেতারা শিক্ষা নেবেন এবং জুম্মজনগণসহ সারা বাংলাদেশের আদিবাসী জনগণকে বিলম্বিত রাষ্ট্রগঠন প্রক্রিয়ায় তাদেরকে সম্পৃক্ত করবেন। কিন্তু না, সেই আশায় একেবারে গুড়ে বালি।বাঙালরা আদিবাসীদের সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করেননি। বাঙাল নেতারা অতীত থেকে শিক্ষা নেননি। তাই তো সংবিধানে বাঙালী জাতীয়তাবাদ পুনরুজ্জীবিত করে গ্রহণ করা হয়েছে, “ভাষাগত ও সংস্কৃতিগত একক সত্তাবিশিষ্ট যে বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ ও সংকল্পবদ্ধ সংগ্রাম করিয়া জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্জন করিয়াছেন, সেই বাঙালি জাতির ঐক্য ও সংহতি হইবে বাঙালী জাতীয়তাবাদের ভিত্তি। দেখুন, সংবিধানে কেবল ভাষাগত ও সংস্কৃতিগতভাবে একক সত্তাবিশিষ্ট বাঙাল জাতির কথা বলা হয়েছে, অন্য জাতির ভাষা ও সংস্কৃতির কথা এখানে নেই। এখানে অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর লোকজন মুক্তিযুদ্ধে যে অবদান রেখেছিলেন সেই অবদানের কোন স্বীকৃতিও নেই।কাজেই বাঙালরা যখন রাষ্ট্রপরিচালনার জন্যে সংবিধান রচনা করেন, এবং কোন আইন বা নীতি তৈরী করেন, তখন তারা বেমালুম আদিবাসীদের কথা ভুলে যান।কারণ তারা একক সত্তাবিশিষ্ট বাঙাল। বাঙালদের এ একক সত্তা ও বিস্মৃতিপ্রবণতাই অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র বা রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পথে বড় অন্তরায়।এই বাধা ভবিষ্যতেও সহজে দূর হবে তেমনটা বিশ্বাস করা কঠিন। এখানে আরো একটি কথা না বললে নয়, একক সত্তাবিশিষ্ট বাঙালরা প্রায়ই আদিবাসীদের দোষারোপ করে থাকেন – আমরা নাকি মূল স্রোতধারায় মিশতে চায় না। বিচ্ছিন্ন হতে চায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কে ‘মূলস্রোতধারায়’ মিশতে চায় না? আদিবাসীরা মূলস্রোতধারায় মানে বাঙালদের সাথে সম মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকার জন্যে ’৭২ সালে যেমন স্থান চেয়েছিলো, তেমনি ২০১১-তে এসেও স্থান চেয়েছিলো। কিন্তু বাঙালরা স্থান দেয়নি।এখন যদি আদিবাসীরা একক সত্তাবিশিষ্ট বাঙাল জাতিকে মানতে না চায়, নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে একক সত্তাবিশিষ্ট বাঙাল জাত থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চায় তাহলে কী বাঙালরা আদিবাসীদের উপর দোষ চাপাবেন? বাঙাল নেতারা যদি সত্যি সত্যি বাংলাদেশকে একটি বহু সংস্কৃতি, বহুভাষী ও বহু মত ও ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান তাহলে তাদেরকে একক সত্তাবিশিষ্ট বাঙাল জাতের ধারনা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। সাংবিধানিক স্বীকৃতির প্রশ্নে আদিবাসী রাজনৈতিক নেতাদের ভূমিকা কী ছিলো? আদিবাসী বন্ধু-বান্ধবীরা, কেবল বাঙালদের দোষ দিলে হবে না। নিজেদেরও আত্মসমালোচনা দরকার। আমার কথায় অনেকে হয়ত বেজার হবেন আবার অনেকে হয়ত খুশী হবেন। বিশেষ করে যারা জেএসএস আর ইউপিডিএফ করেন তাদের বেজার হওয়ার সম্ভাবনাটা বেশি। সাধারণ মানুষের আশা ছিলো, রাজনৈতিক দল হিসেবে জেএসএস–ইউপিডিএফ সাংবিধানিক স্বীকৃতির ব্যাপারে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে। কিন্তু দুঃখের সাথে বলতে হয়, সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া যখন শুরু হয় তখন থেকেই তাদের তরফ থেকে কোন কার্যকর উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়নি।দু’দলই মিটিং, মিছিল করেছিলো, সংবিধান সংশোধন কমিটির কাছে স্মারকলিপি দিয়েছিলো।ব্যাস! এটুকুর মধ্যে তাদের দায়িত্ব সারা।যখন সংবিধান সংশোধনী পাস হয়ে গেলো দু’দলই প্রত্যাখান করে বিবৃতি দিলো। ইউপিডিএফ লাল পতাকার মিছিল করলো। আর জেএসএসও সংবাদ সম্মেলন করলো, আর ‍বিবৃতি দিলো।এক সময় দু’দলই হয়ত ভুলে যাবে সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবী। কিন্তু দু’দলই আসল কাজ করেনি। জুম্মজনগণ চেয়েছিলো পাহাড়ের দু’দল অন্তত সাংবিধানিক স্বীকৃতির প্রশ্নে একবাক্যে কথা বলবে।কিন্তু তা হয়নি। ইউপিডিএফ চেয়েছিলো সংখ্যালঘু জাতি হিসেবে পরিচিত হতে, আর জেএসএস চেয়েছিলো আদিবাসী হিসেবে। কে সঠিক ছিলো কে বেঠিক ছিলো সেটা বিষয় নয়, আমার মত সাধারণ মানুষদের চাওয়া ছিলো জেএসএস–ইউপিডিএফ জোরালোভাবে একবাক্যে কথা বলবে।জনগণের সে চাওয়া দু’দলই পূরণ করতে পারেনি। একদল চাইলো ‘সংখ্যালঘু জাতি’ আর অন্যদল চাইলো ‘আদিবাসী’ হিসেবে পরিচিত হতে। শেষে সরকার বানালো বাঙালি। বাঙালির সাথে আরো বানালো ‘উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতি সত্তা, নৃ গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়’।এখন দু’দলেরই নিজেদের প্রশ্ন করা উচিত, চাইলাম কী আর পাইলাম কী? করলাম কী আর পাইলাম কী? তাদের মনে রাখা উচিত, কেবল রাজপথে মিটিং, মিছিল করলে, ঝাঁঝালো স্লোগান দিলেই রাজনীতি হয় না। বুদ্ধি-প্রজ্ঞা দিয়ে আন্দোলনকে চালিত করতে হবে। রাজপথে মিটিং মিছিলে ঘেউ ঘেউ করার চেয়ে সরকারের নীতিনির্ধারকদের সাথে লবি-অ্যাডকোসি করলে ফল পাওয়া যেতো। লবিষ্ট নিয়োগ করা যেতো। কিন্তু সেসবের কোন কাজ হয়নি।পাহাড়ের রাজনীতিবিদরা এসব কিছুই করতে পারেনি। জেএসএস-ইউপিডিএফ কেবল খুঁজে পায় ছোটোখাটো দলের নেতাদের যেমন পংকজ ভট্টাচার্য, রনো, মেনন, ইনু, মেসবাহ কামাল আর বদরউদ্দীন উমরদের মত লোকদের।এতে দোষের কিছু নেই। কিন্তু মেনন ও ইনু ছাড়া ওরা তো কেউ ক্ষমতার কেন্দ্রের মধ্যে নেই।সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা নেই। এককথায়, জেএসএস-ইউপিডিএফ বাংলাদেশের ক্ষমতার রাজনীতিতে বন্ধুহীন। একদিকে বন্ধুহীন, অন্যদিকে তারা চরমভাবে যোগ্যতাহীন এবং কেবল ঘেউ ঘেউ করে সাধারণ মানুষকে তটস্ত করতে জানেন, দোষারোপ করার সংস্কৃতি চর্চা করতে জানেন।কীভাবে রাজনৈতিক ক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে হবে, কীভাবে লবি-অ্যাডভোকেসি করতে হয় বা বিভিন্ন স্তরে ডিপ্লোম্যাসি চালাতে হয় এ ব্যাপারে তাদের কোন যোগ্যতাই নেই।এই যোগ্যতাহীন নেতাদের দিয়ে কীভাবে আমরা সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবী অর্জন করতে পারি? অন্যদিকে, যতটুকু জানি, চাকমার রাজা দেবাশীষ রায়ের উদ্যোগে কিছু লবি-অ্যাডভোকেসির উদ্যোগ ছিলো।তিনি আদিবাসী এমপিদের সাথে সংযোগ রক্ষা করে সংবিধান সংশোধনের ব্যাপারে আদিবাসীদের পক্ষে প্রস্তাবনা তৈরী করেছিলেন (অবশ্য সেখানে দু’একজন জেএসএস নেতাও ছিলেন বলে জানা গেছে) সংসদীয় আদিবাসী ককাসের সাথে মতবিনিময় করেছিলেন। পাশাপাশি বিভিন্ন লেখনির মাধ্যমে তিনি আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতির সপক্ষে জনমত গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলেন। জানা গেছে, সর্বশেষ পর্যায়ে তিনি প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করেও আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতির ব্যাপারে বক্তব্য তুলে ধরেছিলেন। সংবিধান সংশোধনী বিল সংসদে উঠার আগে আইনমন্ত্রীর সাথেও সাক্ষাৎ করে জোরালো বক্তব্য তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু একা রাজার পক্ষে কতগুলো কাজ করা সম্ভব? রাজার পাশাপাশি নাগরিক উদ্যোগও ছিলো। নাগরিক কমিটি গঠন করে ঐ কমিটি বিভিন্ন সভাসেমিনার করে চুক্তিবাস্তবায়নসহ সাংবিধানিক স্বীকৃতির ব্যাপারে দাবী তুলেছিলো। কিন্তু দুঃখের বিষয়, রাজাসহ ঐ নাগরিক উদ্যোগগুলোকে একটি নির্দিষ্ট গন্তব্যে নিয়ে যাওয়ার জন্যে জেএসএস কিংবা ইউপিডিএফ কোন কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। বরং দু’দলই নাগরিক উদ্যোগকে বিভিন্নভাবে বাধাগ্রস্ত করতে চেয়েছিলো অথবা নাগরিক উদ্যোগগুলোকে নিজেদের মধ্যে অঙ্গীভূত করে নেওয়ার পাঁয়তারা করেছিলো। দু’দলই প্রমাণ করতে চেয়েছিলো জুম্মজনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা তথা সাংবিধানিক স্বীকৃতির জন্যে তারা কতই না নিবেদিতপ্রাণ! আদিবাসী নেতাদের এই অনৈক্যের সুযোগ নিয়ে সরকারও পাত্তা দেয়নি। সরকারের পাত্তা না দেওয়ার আরো একটি উদাহরণ হলো, সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ কিংবা জেলা পরিষদসমূহের সাথে সাংবিধানিক স্বীকৃতির ব্যাপারে কোন আলোচনা করেনি। অন্যদের কথা না হয় বাদ দিলাম, সাংবিধানিক স্বীকৃতির সরকার অন্তত পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান সন্ত লারমার মতামত নিতে পারতেন কিংবা পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদও সরকারকে পরামর্শ দিতে পারতেন।কিন্তু সেরকম কোন ঘটনা ঘটেছিলো বলে জানা নেই। তাই আদিবাসী নেতাদের চরম অনৈক্যে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে সরকার কতটুকু পাত্তা দেবে সেটা আমাদের নেতাদেরই ভেবে দেখতে হবে। বাঙালরা আদিবাসীদের মানেন নাঃ এ প্রেক্ষিতে আদিবাসীদের করণীয় কী? আদিবাসী ভাইবোনেরা, বেশি কথা বলার আর দরকার নেই। বাঙালরা তো স্পষ্ট করে সংবিধানে লিখে ফেলেছে তারা একক সত্তাবিশিষ্ট বাঙাল জাতি। একক সত্তাবিশিষ্ট বাঙালদের ঘরে বাঙাল বাদে অন্যদের জায়গা নেই।তবুও তারা আমরা না চাইলেও আমাদেরকে ‘উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতি সত্তা, নৃ গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়’ হিসেবে নাম দিয়েছে।ওরা আমাকে ‘উপজাতি’ বলুক কিংবা ‘ক্ষুদ্র জাতি সত্তা’ বলুক, বা ‘নৃ গোষ্ঠী’ বলুক এতে আমার কিছু এসে যায় না। বাঙালরা যে নামে ডাকুক না কেন, আমাদের আদিবাসী পরিচিতি আমাদের মন থেকে মুছে যাবে না। কাজেই বাঙালদের দেওয়া নাম নিয়ে আমাদের হতাশ হতে নেই।আমরা আমাদের পরিচিতি আমাদের লেখনিতে এবং আমাদের শয়নে স্বপনে বারবার উচ্চারণ করে যাবো – আমরা আদিবাসী। সেই সাথে আমাদের করণীয়ও ঠিক করতে হবে। বাঙালরা আমাদেরকে সাংবিধানিকভাবে অধিকার না দিলে কী আমরা চুপ করে বসে থাকবো? আমাদের কী করণীয় নেই? এ প্রসঙ্গে আমাদের মাননীয় চাকমা রাজার কথা স্মরণ করতে হয়। এবারের জাতিসংঘে আদিবাসী বিষয়ক স্থায়ী ফোরামে যখন বাংলাদেশ প্রতিনিধি “বাংলাদেশে আদিবাসী নেই, যারা আছে তারা সংখ্যালঘু উপজাতি” বলে সবক দিচ্ছিলেন, তখন তার প্রত্যুত্তরে চাকমা রাজা একটা কথা বলেছিলেন, সরকার উপজাতি বলুক, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বলুক বা যে নামেই ডাকুক তাতে কোন অসুবিধা নেই। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে এসব প্রত্যয় আদিবাসীদেরকে বুঝানো হয়ে থাকে। কাজেই বাংলাদেশ সরকার ‘উপজাতি’ কিংবা ‘ক্ষুদ্র জাতি সত্তা’ বা ‘নৃ গোষ্ঠী’ যে নামেই অভিহিত করুক, বাংলাদেশের আদিবাসীদের অধিকার দমিয়ে রাখতে পারবে না। ঠিক রাজাবাবুর সাথে সুর মিলিয়ে বলতে চাই, বাংলাদেশ সরকার যে নামেই আমাদের ডাকুক এতে হতাশ হওয়ার কিছুই নেই। হাত গুটিয়ে বসে থাকারও কোন কারণ নেই। আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে আমরা আদিবাসী জাতি বা Indigenous Peoples. আদিবাসী জাতি হিসেবে আমাদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার আছে। আর আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার তো মানবাধিকার। এই অধিকার কোন রাষ্ট্রের বা কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দয়ামায়ার উপর নির্ভর করে না।এ অধিকার হতে কেউ আমাদের বঞ্চিত করতে পারবে না। বাঙালরাও পারবেনা, বাঙালদের সংবিধানও আমাদের বঞ্চিত করতে পারবে না। আমাদের অধিকার আমাদেরই আছে। তবে আমাদের আদিবাসী জাতিসমূহকে ঠিক করতে হবে কীভাবে আমরা এ অধিকার প্রয়োগ করবো – বাঙাল রাষ্ট্রের সীমানার মধ্যে নাকি বাঙাল রাষ্ট্রের সীমানার বাইরে? আদিবাসী ভাইবোনেরা, পরস্পরকে দোষারোপ বাদ দিন। দালাল ফালাল ইত্যাদি বিভেদমূলক শব্দ বাদ দিন। দালাল ফালালদের উপর আমাদের ভাগ্য ছেড়ে দেবো কেন? দালাল ফালালরা যদি এতই শক্তিশালী হয়ে থাকে তাহলে কেন আমাদের জুম্মনেতারা (জেএসএস-ইউপিডিএফ) রাজনীতি করছেন জনগণের অধিকারের নামে? জুম্মনেতাদের দোষারোপের সংস্কৃতি চর্চা হতে বিরত থাকতে হবে। বিভেদমূলক কাজ ও হিংসা হানাহানি হতে বিরত থাকতে হবে। সৃজনশীল মন নিয়ে চিন্তা করুন কী করা যায়। চিন্তা করুন যাদেরকে দালাল বলা হচ্ছে তাদেরকে কীভাবে প্রতিরোধ করা যায়। চিন্তা করুন – একতাই শক্তি, জ্ঞানই শক্তি।আমরা যদি এক হই, দালাল ফালাল টিকতে পারবে না। কেবল আজকের জন্যে চিন্তা করবেন না। এই শতাব্দির জন্যে চিন্তা করতে হবে। আমরা যদি বিভিন্ন জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ হই, এই শতাব্দি হবে আমাদের জন্যে, আদিবাসীদের জন্যে। আসুন আমরা এমন এক স্বপ্ন দেখি, এই শতাব্দীতে আমাদের আর বাঙালের সংবিধান লাগবে না। আমরা আদিবাসী জাতিরাই আমাদের সংবিধান আমরাই রচনা করে ফেলেছি। আসুন, আমরা এমন এক সমাজ স্বপ্ন রচনা করি, যেখানে বাঙাল নেতারা নয়, আমরা আদিবাসীরাই আমাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যবস্থা নির্ধারণ করে ফেলেছি – আমরা বাঙালের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নই, বরং আমরাই ঘরে বসে বোতাম টিপে বাঙালদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারি।

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/780

সংবিধান সংশোধন বিল পাসঃ বাঙালদের শঠামি ও আদিবাসীদের করণীয়

গতকাল সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী বিল ২০১১ পাস হয়ে গেলো। সংবিধান সংশোধন বিষয়কটি প্রথমে ৫১টি সংশোধনী প্রস্তাব করে। পরে আরো চারটি সংশোধনী যোগ করা হয়। অর্থাৎ বর্তমান সংবিধানে মোট ৫৫টি সংশোধনী আনা হয় এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙাল এমপি’র উল্লাস ধ্বনিতে সেসব সংশোধনী পাস হয়ে যায়।   পঞ্চদশ সংশোধনী বিল ২০১১ বিল পাস হয়ে যাওয়ার পরপরই গতকাল ৩০ জুন আমার প্রতিক্রিয়া লিখতে বসেছিলাম। লিখতে বসে বিদ্যূতও আমার সাথে বিতলামি শুরু করে দিলো। আসে আর যায়। ফলে গতকাল আর লেখা হয়নি। তাই আজকে আজকে আবার লিখতে বসলাম। কিন্ত সমস্যা দেখা দিলো কী লিখবো? কেননা, গতকাল লেখার যে আবেগ ছিলো, আজকে একদিন পরে লিখতে বসে সে আবেগ কোথায় যেন হারিয়ে গেলো। ফলে আজকে কম্পউটারে আঙুল যেন আর চলতে চাচ্ছিলো না। যেই কী বোর্ডে আঙুল চাপি, তখন মনের মধ্যে প্রশ্ন জাগে কী লিখবো?পঞ্চদশ সংশোধনী বিল ২০১১-এ তো অনেক সংশোধনী আছে। সেসব সম্পর্কে কি বলবো! তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে আমার এই এলোমেলো লেখার অবতারণা।   আদিবাসী হিসেবে সংবিধানে আমাদেরকে কী দেওয়া হলো? আওয়ামীলীগ নেতৃত্বাধীন বাঙাল নেতা্রা আমাদের প্রতি কী ন্যায় বিচার করলেন? সংবিধান দেশের পরিচালনার পবিত্র দলিল হিসেবে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের আশা-আকাংখা ধারন করার কথা, সব নাগরিকের সমান অধিকার, মর্যাদা, স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার কথা এবং সব নাগরিকের সমানভাবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়ার কথা – এসব আকাংখা কী আমাদের সংবিধান ধারন করতে পেরেছে? আদিবাসী হিসেবে আমাদের চোখে এ সংবিধান একটি এলোমেলো দলিল এবং আদিবাসীদের আকাংখা ধারন করতে পারেনি। সবচেয়ে বড় কথা, এই সংবিধান প্রণয়ন ও সংশোধনকালে আদিবাসীদের অংশগ্রহণ ছিলো না। কাজেই রাষ্ট্র পরিচালনার দলিল হিসেবে এই সংবিধানকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করা ছাড়া আমাদের আর কোন উপায় নেই।         আওয়ামীলীগ সরকার সংবিধান সংশোন নিয়ে অনেক কথাই বলেছে, অনেক যুক্তি দাঁড় করাতে চেষ্টা করেছে। যেমন, সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে ’৭২-এর সংবিধানে ফিরে যাওয়া, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সুদৃঢ় করা, ধর্মনিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনা ইত্যাদি। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ’৭২-এর সংবিধানে বর্ণিত রাষ্ট্রীয় মূলনীতিঃ জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্ম নিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনা হলেও তা করা হয়েছে খন্ডিতভাবে এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের জন্যে এ সংবিধান নয়, এ সংবিধান বাঙালদের জন্যে ও মুসলমানদের জন্যে।কাজেই এ সংবিধান সার্বজনীন নয় – একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।   উগ্রবাঙালী জাতীয়তাবাদের পুনরুত্থান সংবিধানের নাগরিকত্ব অনুচ্ছেছদ ৬-এর (২) সংশোধন করে বাংলাদেশী নাগরিকত্বের সাথে সংযুক্ত করা হয়েছে,            বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসেবে বাঙালি এবং নাগরিকগণ বাংলাদেশি বলিয়া পরিচিত হইবেন।   এই অনুচ্ছেদ সংযোজনের মাধ্যমে বাঙালরা আমাদেরকে আবার বাঙালিতে রূপান্তরিত করলো। নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশী হলেও জাতি হিসেবে আমাদের অস্তিত্ব তো আর রইলো না। অর্থাৎ একক সত্ত্বাবিশিষ্ট বাঙালের জাত ছাড়া বাংলাদেশে আর অন্যকোন জাতির অস্তিত্ব রইলো না। বাংলাদেশ একটি একক জাতবিশিষ্ট রাষ্ট্রে পরিণত হলো। অথচ গত ২১ ফেব্রুয়ারীর বইমেলা অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী গর্ব করে বলেছিলেন, “বাঙালি জাতীয়তাবাদের মধ্যে কোন সংকীর্ণতার স্থান নেই”।কিন্ত সংবিধানে এই অনুচ্ছেদ সংযোজন করে তিনি বা আওয়ামীলীগ কী পরিচয় দিলেন? কোথায় অবশিষ্ট রইলো বহু ভাষা ও বহু সংস্কৃতির চেতনা?        আমাদের সবার জানা, স্বাধীনতার পর যখন ’৭২-এ দেশের সংবিধান প্রণয়ন করা হচ্ছিল, তখন বাঙাল নেতারা জাতি, জাতীয়তা ও নাগরিকত্ব ধারনাকে এক করে গুলিয়ে ফেলেছিলেন। সেদিনও তারা বাঙালী জাতীয়তাবাদের খোলসে সব জাতিকে ঢুকাতে চেয়েছিলেন।সেই সময়ে উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টার প্রতিবাদ করেছিলেন তখনকার একমাত্র আদিবাসী প্রতিনিধি তথা গ্রামবাংলার গরীব দুঃখী মানুষের একমাত্র কন্ঠস্বর এম এন লারমা।তিনি চেয়েছিলেন সত্যিকার অর্থে বহুজাতি, বহুভাষী ও বহু সংস্কৃতির একটি আধুনিক রাষ্ট্র, আধুনিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। কিন্তু সেই সময় তার কথা শোনা হয়নি। তাই তিনি সংকীর্ণ বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে গড়ে তুলেছিলেন। সর্বশেষ গণতান্ত্রিক পন্থায় আন্দোলনের পথ রুদ্ধ হয়ে গেলে তিনি সশস্ত্র আন্দোলন শুরু করেছিলেন।যার খেসারত বাংলাদেশকে দীর্ঘ দুই তিন যুগেরও অধিক সময় ধরে দিতে হয়েছিলো।জেএসএস-এর সাথে চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে আওয়ামীলীগ সরকার সেই ঐতিহাসিক ভুলের মাসুল শোধরানোর জন্যে চেষ্টা করেছিলো। কিন্তু নতুন করে আবারো বাঙালি জাতীয়তাবাদের পুনরুত্থান ঘটিয়ে আওয়ামীলীগ আবারও সেই ঐতিহাসিক ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটালো।   ধর্মনিরপেক্ষতা আর আওয়ামীলীগের ভন্ডামি    আওয়ামীলীগ ধর্ম ব্যবসায়ী জামাতীদের চেয়েও ভন্ড এবং পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম রেখে সেই ভন্ডামির চরম পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছে।শুরুতে বিসমিল্লাহ রেখে কীভাবে ধর্মনিরপেক্ষতা হয়? রাষ্ট্রধর্ম নিয়ে আওয়ামীলীগের চরম ভন্ডামি দেখার মত,                              প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। তবে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ অন্যান্য ধর্ম পালনে রাষ্ট্র সমমর্যাদা ও সম-অধিকার নিশ্চিত করিবেন।   জানি, এদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ইসলাম অনুসরণ করে।কিন্ত আমাদের বক্তব্য হলো, ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার। কোন নির্দিষ্ট ধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করে অন্য ধর্ম অনুসারীদের প্রতি বৈষম্য করা হয়।একদিকে ইসলামকে বলা হলো প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম, অন্যদিকে বলা হলো হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ অন্যান্য ধর্ম পালনে রাষ্ট্র সমমর্যাদা ও সম-অধিকার নিশ্চিত করবে। এটা স্ববিরোধী বক্তব্য নয় কি? একটা ধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করে অন্যান্য ধর্মগুলো কীভাবে সমমর্যাদা ও সম-অধিকার ভোগ করবে এটা বোধগম্য নয়। রাষ্ট্র তো ইসলামকে আসনটা বরাদ্দ দিয়ে ফেলেছে, অন্য ধর্মগুলো কীভাবে সে আসনে বসতে পারবে? সমমর্যাদা ও সম-অধিকার থাকলে কেন অন্যান্য ধর্মাবলম্বী যেমন হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানদের পুলিশের প্রহরায় ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান করতে হয়?                                                                                         কোথায় অন্য ধর্মের প্রতি সমমর্যাদা ও সম-অধিকার??   পার্বত্য চট্টগ্রামে কেন বৌদ্ধ মন্দিরে হামলা হয়? বৌদ্ধমন্দির আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়?যারা মন্দির পুড়িয়ে দিয়েছিলো, লুন্ঠন করেছিলো, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পবিত্রতা হরণ করেছিলো, তাদের ব্যাপারে রাষ্ট্র কী পদক্ষেপ নিয়েছিলো?রাষ্ট্রি একটি নির্দিষ্ট ধর্মের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট বলে পার্বত্য চট্টগ্রামে উগ্র বাঙাল ও উগ্র ইসলামন্থীরা অন্যধর্মের উপর আঘাত করার সাহস পায়, অবাধে জুম্ম জনগণের উপর অত্যাচার-নির্যাতন চালানোর লাইসেন্স পায়।তাই স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগে, পক্ষপাতদুষ্ট রাষ্ট্র কী আমরা চাই?          তুমি হলে বাঙালি, আমারে করলে উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতি সত্তা, নৃ গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়!   এবারের সংবিধান সংশোধনীতে আরো একটি নতুন চমক হলো, যারা আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতির জন্যে রাষ্ট্রের কাছে দাবী জানাচ্ছি, তাদেরকে বাঙালের আওয়ামী সরকার “উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতি সত্তা, নৃ গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়” হিসেবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করেছে। আওয়ামী বাঙালদের শঠতার আর কোথায় অবশিষ্ট রইলো? কোথায় আমরা সমান অধিকার পেলাম?কোথায় সম-মর্যাদা রইলো আমার? একটি অনুচ্ছেদের মাধ্যমে একদিকে সবাইকে বাঙালি বানালেন, অন্যদিকে আবার আমাদেরকে (আদিবাসীদেরকে) “উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতি সত্তা, নৃ গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়” বানালেন? বাংলায় বলে, কানাছেলের নাম পদ্মলোচন। হে বাঙালের আওয়ামীলীগ, আমাদেরকে কানা বানিয়ে পদ্মলোচন নাম দিলেন। এতে করে কী আমরা আপনাদের মত করে সমান মর্যাদা ও সমান অধিকার ভোগ করতে পারবো?       সংবিধান সংশোধন করে পদ্মলোচনের জন্যে কী দিলেন? ২৩ অনুচ্ছেদে ২৩ (ক) সংযোজন করে পদ্মলোচনদের মনে সান্তনা দেওয়ার জন্যে একটা বাক্য ঢুকিয়ে দিলেন,    “রাষ্ট্র বিভিন্ন উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতি সত্তা, নৃ গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।   এই বাক্যটা দিয়ে বড় ‘বাঙোদি’ (বাঙালিনী) হাসিনা খুব খুশী হয়ে সংসদে বললেন, “আমরা ক্ষুদ্র জাতিসত্তাদের অনুভূতিতে আঘাত দিতে চাইনি”।বড় বাঙোদি হাসিনা বলতে চেয়েছিলেন, ‘ক্ষুদ্র’দেরও সংবিধানে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সবার অধিকার নিশ্চিত করা হয়ে গেছে। বড় বাঙোদি হাসিনা আমাদের সাথে বড়ই পরিহাস করলেন।   কিন্তু বাঙোদি হাসিনা “উপজাতি/ক্ষুদ্রজাতিসত্তাদের” এমন একটা অনুচ্ছেদে (২৩ অনুচ্ছেদ) ঢুকিয়ে দিলেন সেটাও বড়ই গোঁজামিল অনুচ্ছেদ। এই ২৩ অনুচ্ছেদ কেবল বাঙালদের জন্যে বরাদ্দ। সেখানে শিরোনাম দেওয়া আছে, “জাতীয় সংস্কৃতি”। কোন জাতির সংস্কৃতি? কিন্তু সংবিধান তো কেবল বাঙাল জাতিকে স্বীকৃতি দিয়েছে। কাজেই, [বাঙাল] “জাতীয় সংস্কৃতি”র সাথে একটু কায়দা করে যে বাক্যটা ঢুকিয়ে দিলেন তার মূল্য আর কতটুকু রইলো? [বাঙালদের] “জাতীয় সংস্কৃতি”র আগ্রাসনে “উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতি সত্তা, নৃ গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য” সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা কী সম্ভব হবে তো? বাঙোদি হাসিনা বিবি, বড় ভয় হয়, পরে যখন “উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতি সত্তা, নৃ গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের” লোকরা সংবিধানের এই ২৩ (ক) অনুচ্ছেদ বলে নিজেদের সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্যে দাবী জানাবে তখন কী বাঙালরা “জাতীয় সংস্কৃতির” দোহাই দিয়ে “ক্ষুদ্রদের” কন্ঠরোধ করবে না তো? বাঙালদের শঠামি দেখে আমার বিশ্বাস হতে চায় না।   একক সত্তাবিশিষ্ট বাঙাল জাতঃ অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রগঠনে মূল অন্তরায় সংবিধান সংশোধন নিয়ে নতুন করে বেশি কিছু বলার নেই। বাঙালদের রাষ্ট্রগঠনের যে মূল দর্শন সেটার মূল ভিত্তি হলো একক সত্তাবিশিষ্ট বাঙাল জাতি রাষ্ট্র। স্বাধীনতার পর ’৭২-এ যে সংবিধান বানানো হয়েছিলো্ সেখানেও মূল চেতনা ছিলো বাংলাদেশকে বাঙাল জাতি রাষ্ট্র বানানো। সে কারণে বাঙাল ভিন্ন অন্য কোন জাতিসত্তার নাম তাদের মনে পড়েনি। এবার যখন সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিলো তখন অনেকে মনে করেছিলেন, অন্তত পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘ সশস্ত্র সংগ্রাম থেকে বাঙাল নেতারা শিক্ষা নেবেন এবং জুম্মজনগণসহ সারা বাংলাদেশের আদিবাসী জনগণকে বিলম্বিত রাষ্ট্রগঠন প্রক্রিয়ায় তাদেরকে সম্পৃক্ত করবেন। কিন্তু না, সেই আশায় একেবারে গুড়ে বালি।বাঙালরা আদিবাসীদের সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করেননি। বাঙাল নেতারা অতীত থেকে শিক্ষা নেননি। তাই তো সংবিধানে বাঙালী জাতীয়তাবাদ পুনরুজ্জীবিত করে গ্রহণ করা হয়েছে,        “ভাষাগত ও সংস্কৃতিগত একক সত্তাবিশিষ্ট যে বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ ও সংকল্পবদ্ধ সংগ্রাম করিয়া জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্জন করিয়াছেন, সেই বাঙালি জাতির ঐক্য ও সংহতি হইবে বাঙালী জাতীয়তাবাদের ভিত্তি।     দেখুন, সংবিধানে কেবল ভাষাগত ও সংস্কৃতিগতভাবে একক সত্তাবিশিষ্ট বাঙাল জাতির কথা বলা হয়েছে, অন্য জাতির ভাষা ও সংস্কৃতির কথা এখানে নেই। এখানে অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর লোকজন মুক্তিযুদ্ধে যে অবদান রেখেছিলেন সেই অবদানের কোন স্বীকৃতিও নেই।কাজেই বাঙালরা যখন রাষ্ট্রপরিচালনার জন্যে সংবিধান রচনা করেন, এবং কোন আইন বা নীতি তৈরী করেন, তখন তারা বেমালুম আদিবাসীদের কথা ভুলে যান।কারণ তারা একক সত্তাবিশিষ্ট বাঙাল। বাঙালদের এ একক সত্তা ও বিস্মৃতিপ্রবণতাই অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র বা রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পথে বড় অন্তরায়।এই বাধা ভবিষ্যতেও সহজে দূর হবে তেমনটা বিশ্বাস করা কঠিন।      এখানে আরো একটি কথা না বললে নয়, একক সত্তাবিশিষ্ট বাঙালরা প্রায়ই আদিবাসীদের দোষারোপ করে থাকেন – আমরা নাকি মূল স্রোতধারায় মিশতে চায় না। বিচ্ছিন্ন হতে চায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কে ‘মূলস্রোতধারায়’ মিশতে চায় না? আদিবাসীরা মূলস্রোতধারায় মানে বাঙালদের সাথে সম মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকার জন্যে ’৭২ সালে যেমন স্থান চেয়েছিলো, তেমনি ২০১১-তে এসেও স্থান চেয়েছিলো। কিন্তু বাঙালরা স্থান দেয়নি।এখন যদি আদিবাসীরা একক সত্তাবিশিষ্ট বাঙাল জাতিকে মানতে না চায়, নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে একক সত্তাবিশিষ্ট বাঙাল জাত থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চায় তাহলে কী বাঙালরা আদিবাসীদের উপর দোষ চাপাবেন? বাঙাল নেতারা যদি সত্যি সত্যি বাংলাদেশকে একটি বহু সংস্কৃতি, বহুভাষী ও বহু মত ও ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান তাহলে তাদেরকে একক সত্তাবিশিষ্ট বাঙাল জাতের ধারনা থেকে বের হয়ে আসতে হবে।        সাংবিধানিক স্বীকৃতির প্রশ্নে আদিবাসী রাজনৈতিক নেতাদের ভূমিকা কী ছিলো? আদিবাসী বন্ধু-বান্ধবীরা, কেবল বাঙালদের দোষ দিলে হবে না। নিজেদেরও আত্মসমালোচনা দরকার। আমার কথায় অনেকে হয়ত বেজার হবেন আবার অনেকে হয়ত খুশী হবেন। বিশেষ করে যারা জেএসএস আর ইউপিডিএফ করেন তাদের বেজার হওয়ার সম্ভাবনাটা বেশি।   সাধারণ মানুষের আশা ছিলো, রাজনৈতিক দল হিসেবে জেএসএস–ইউপিডিএফ সাংবিধানিক স্বীকৃতির ব্যাপারে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে। কিন্তু দুঃখের সাথে বলতে হয়, সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া যখন শুরু হয় তখন থেকেই তাদের তরফ থেকে কোন কার্যকর উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়নি।দু’দলই মিটিং, মিছিল করেছিলো, সংবিধান সংশোধন কমিটির কাছে স্মারকলিপি দিয়েছিলো।ব্যাস! এটুকুর মধ্যে তাদের দায়িত্ব সারা।যখন সংবিধান সংশোধনী পাস হয়ে গেলো দু’দলই প্রত্যাখান করে বিবৃতি দিলো। ইউপিডিএফ লাল পতাকার মিছিল করলো। আর জেএসএসও সংবাদ সম্মেলন করলো, আর ‍বিবৃতি দিলো।এক সময় দু’দলই হয়ত ভুলে যাবে সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবী।   কিন্তু দু’দলই আসল কাজ করেনি। জুম্মজনগণ চেয়েছিলো পাহাড়ের দু’দল অন্তত সাংবিধানিক স্বীকৃতির প্রশ্নে একবাক্যে কথা বলবে।কিন্তু তা হয়নি। ইউপিডিএফ চেয়েছিলো সংখ্যালঘু জাতি হিসেবে পরিচিত হতে, আর জেএসএস চেয়েছিলো আদিবাসী হিসেবে। কে সঠিক ছিলো কে বেঠিক ছিলো সেটা বিষয় নয়, আমার মত সাধারণ মানুষদের চাওয়া ছিলো জেএসএস–ইউপিডিএফ জোরালোভাবে একবাক্যে কথা বলবে।জনগণের সে চাওয়া দু’দলই পূরণ করতে পারেনি। একদল চাইলো ‘সংখ্যালঘু জাতি’ আর অন্যদল চাইলো ‘আদিবাসী’ হিসেবে পরিচিত হতে। শেষে সরকার বানালো বাঙালি। বাঙালির সাথে আরো বানালো ‘উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতি সত্তা, নৃ গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়’।এখন দু’দলেরই নিজেদের প্রশ্ন করা উচিত, চাইলাম কী আর পাইলাম কী? করলাম কী আর পাইলাম কী? তাদের মনে রাখা উচিত, কেবল রাজপথে মিটিং, মিছিল করলে, ঝাঁঝালো স্লোগান দিলেই রাজনীতি হয় না। বুদ্ধি-প্রজ্ঞা দিয়ে আন্দোলনকে চালিত করতে হবে। রাজপথে মিটিং মিছিলে ঘেউ ঘেউ করার চেয়ে সরকারের নীতিনির্ধারকদের সাথে লবি-অ্যাডকোসি করলে ফল পাওয়া যেতো। লবিষ্ট নিয়োগ করা যেতো। কিন্তু সেসবের কোন কাজ হয়নি।পাহাড়ের রাজনীতিবিদরা এসব কিছুই করতে পারেনি। জেএসএস-ইউপিডিএফ কেবল খুঁজে পায় ছোটোখাটো দলের নেতাদের যেমন পংকজ ভট্টাচার্য, রনো, মেনন, ইনু, মেসবাহ কামাল আর বদরউদ্দীন উমরদের মত লোকদের।এতে দোষের কিছু নেই। কিন্তু মেনন ও ইনু ছাড়া ওরা তো কেউ ক্ষমতার কেন্দ্রের মধ্যে নেই।সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা নেই। এককথায়, জেএসএস-ইউপিডিএফ বাংলাদেশের ক্ষমতার রাজনীতিতে বন্ধুহীন। একদিকে বন্ধুহীন, অন্যদিকে তারা চরমভাবে যোগ্যতাহীন এবং কেবল ঘেউ ঘেউ করে সাধারণ মানুষকে তটস্ত করতে জানেন, দোষারোপ করার সংস্কৃতি চর্চা করতে জানেন।কীভাবে রাজনৈতিক ক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে হবে, কীভাবে লবি-অ্যাডভোকেসি করতে হয় বা বিভিন্ন স্তরে ডিপ্লোম্যাসি চালাতে হয় এ ব্যাপারে তাদের কোন যোগ্যতাই নেই।এই যোগ্যতাহীন নেতাদের দিয়ে কীভাবে আমরা সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবী অর্জন করতে পারি?     অন্যদিকে, যতটুকু জানি, চাকমার রাজা দেবাশীষ রায়ের উদ্যোগে কিছু লবি-অ্যাডভোকেসির উদ্যোগ ছিলো।তিনি আদিবাসী এমপিদের সাথে সংযোগ রক্ষা করে সংবিধান সংশোধনের ব্যাপারে আদিবাসীদের পক্ষে প্রস্তাবনা তৈরী করেছিলেন (অবশ্য সেখানে দু’একজন জেএসএস নেতাও ছিলেন বলে জানা গেছে) সংসদীয় আদিবাসী ককাসের সাথে মতবিনিময় করেছিলেন। পাশাপাশি বিভিন্ন লেখনির মাধ্যমে তিনি আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতির সপক্ষে জনমত গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলেন। জানা গেছে, সর্বশেষ পর্যায়ে তিনি প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করেও আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতির ব্যাপারে বক্তব্য তুলে ধরেছিলেন। সংবিধান সংশোধনী বিল সংসদে উঠার আগে আইনমন্ত্রীর সাথেও সাক্ষাৎ করে জোরালো বক্তব্য তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু একা রাজার পক্ষে কতগুলো কাজ করা সম্ভব?     রাজার পাশাপাশি নাগরিক উদ্যোগও ছিলো। নাগরিক কমিটি গঠন করে ঐ কমিটি বিভিন্ন সভাসেমিনার করে চুক্তিবাস্তবায়নসহ সাংবিধানিক স্বীকৃতির ব্যাপারে দাবী তুলেছিলো। কিন্তু দুঃখের বিষয়, রাজাসহ ঐ নাগরিক উদ্যোগগুলোকে একটি নির্দিষ্ট গন্তব্যে নিয়ে যাওয়ার জন্যে জেএসএস কিংবা ইউপিডিএফ কোন কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। বরং দু’দলই নাগরিক উদ্যোগকে বিভিন্নভাবে বাধাগ্রস্ত করতে চেয়েছিলো অথবা নাগরিক উদ্যোগগুলোকে নিজেদের মধ্যে অঙ্গীভূত করে নেওয়ার পাঁয়তারা করেছিলো। দু’দলই প্রমাণ করতে চেয়েছিলো জুম্মজনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা তথা সাংবিধানিক স্বীকৃতির জন্যে তারা কতই না নিবেদিতপ্রাণ!   আদিবাসী নেতাদের এই অনৈক্যের সুযোগ নিয়ে সরকারও পাত্তা দেয়নি। সরকারের পাত্তা না দেওয়ার আরো একটি উদাহরণ হলো, সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ কিংবা জেলা পরিষদসমূহের সাথে সাংবিধানিক স্বীকৃতির ব্যাপারে কোন আলোচনা করেনি। অন্যদের কথা না হয় বাদ দিলাম, সাংবিধানিক স্বীকৃতির সরকার অন্তত পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান সন্ত লারমার মতামত নিতে পারতেন কিংবা পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদও সরকারকে পরামর্শ দিতে পারতেন।কিন্তু সেরকম কোন ঘটনা ঘটেছিলো বলে জানা নেই।   তাই আদিবাসী নেতাদের চরম অনৈক্যে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে সরকার কতটুকু পাত্তা দেবে সেটা আমাদের নেতাদেরই ভেবে দেখতে হবে।   বাঙালরা আদিবাসীদের মানেন নাঃ এ প্রেক্ষিতে আদিবাসীদের করণীয় কী? আদিবাসী ভাইবোনেরা, বেশি কথা বলার আর দরকার নেই। বাঙালরা তো স্পষ্ট করে সংবিধানে লিখে ফেলেছে তারা একক সত্তাবিশিষ্ট বাঙাল জাতি। একক সত্তাবিশিষ্ট বাঙালদের ঘরে বাঙাল বাদে অন্যদের জায়গা নেই।তবুও তারা আমরা না চাইলেও আমাদেরকে ‘উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতি সত্তা, নৃ গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়’ হিসেবে নাম দিয়েছে।ওরা আমাকে ‘উপজাতি’ বলুক কিংবা ‘ক্ষুদ্র জাতি সত্তা’ বলুক, বা ‘নৃ গোষ্ঠী’ বলুক এতে আমার কিছু এসে যায় না। বাঙালরা যে নামে ডাকুক না কেন, আমাদের আদিবাসী পরিচিতি আমাদের মন থেকে মুছে যাবে না। কাজেই বাঙালদের দেওয়া নাম নিয়ে আমাদের হতাশ হতে নেই।আমরা আমাদের পরিচিতি আমাদের লেখনিতে এবং আমাদের শয়নে স্বপনে বারবার উচ্চারণ করে যাবো – আমরা আদিবাসী।   সেই সাথে আমাদের করণীয়ও ঠিক করতে হবে। বাঙালরা আমাদেরকে সাংবিধানিকভাবে অধিকার না দিলে কী আমরা চুপ করে বসে থাকবো? আমাদের কী করণীয় নেই?   এ প্রসঙ্গে আমাদের মাননীয় চাকমা রাজার কথা স্মরণ করতে হয়। এবারের জাতিসংঘে আদিবাসী বিষয়ক স্থায়ী ফোরামে যখন বাংলাদেশ প্রতিনিধি “বাংলাদেশে আদিবাসী নেই, যারা আছে তারা সংখ্যালঘু উপজাতি” বলে সবক দিচ্ছিলেন, তখন তার প্রত্যুত্তরে চাকমা রাজা একটা কথা বলেছিলেন, সরকার উপজাতি বলুক, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বলুক বা যে নামেই ডাকুক তাতে কোন অসুবিধা নেই। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে এসব প্রত্যয় আদিবাসীদেরকে বুঝানো হয়ে থাকে। কাজেই বাংলাদেশ সরকার ‘উপজাতি’ কিংবা ‘ক্ষুদ্র জাতি সত্তা’ বা ‘নৃ গোষ্ঠী’  যে নামেই অভিহিত করুক, বাংলাদেশের আদিবাসীদের অধিকার দমিয়ে রাখতে পারবে না।   ঠিক রাজাবাবুর সাথে সুর মিলিয়ে বলতে চাই, বাংলাদেশ সরকার যে নামেই আমাদের ডাকুক এতে হতাশ হওয়ার কিছুই নেই। হাত গুটিয়ে বসে থাকারও কোন কারণ নেই। আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে আমরা আদিবাসী জাতি বা Indigenous Peoples. আদিবাসী জাতি হিসেবে আমাদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার আছে। আর আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার তো মানবাধিকার। এই অধিকার কোন রাষ্ট্রের বা কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দয়ামায়ার উপর নির্ভর করে না।এ অধিকার হতে কেউ আমাদের বঞ্চিত করতে পারবে না। বাঙালরাও পারবেনা, বাঙালদের সংবিধানও আমাদের বঞ্চিত করতে পারবে না। আমাদের অধিকার আমাদেরই আছে। তবে আমাদের আদিবাসী জাতিসমূহকে ঠিক করতে হবে কীভাবে আমরা এ অধিকার প্রয়োগ করবো – বাঙাল রাষ্ট্রের সীমানার মধ্যে নাকি বাঙাল রাষ্ট্রের সীমানার বাইরে?   আদিবাসী ভাইবোনেরা, পরস্পরকে দোষারোপ বাদ দিন। দালাল ফালাল ইত্যাদি বিভেদমূলক শব্দ বাদ দিন। দালাল ফালালদের উপর আমাদের ভাগ্য ছেড়ে দেবো কেন? দালাল ফালালরা যদি এতই শক্তিশালী হয়ে থাকে তাহলে কেন আমাদের জুম্মনেতারা (জেএসএস-ইউপিডিএফ) রাজনীতি করছেন জনগণের অধিকারের নামে? জুম্মনেতাদের দোষারোপের সংস্কৃতি চর্চা হতে বিরত থাকতে হবে। বিভেদমূলক কাজ ও হিংসা হানাহানি হতে বিরত থাকতে হবে। সৃজনশীল মন নিয়ে চিন্তা করুন কী করা যায়। চিন্তা করুন যাদেরকে দালাল বলা হচ্ছে তাদেরকে কীভাবে প্রতিরোধ করা যায়। চিন্তা করুন – একতাই শক্তি, জ্ঞানই শক্তি।আমরা যদি এক হই, দালাল ফালাল টিকতে পারবে না। কেবল আজকের জন্যে চিন্তা করবেন না। এই শতাব্দির জন্যে চিন্তা করতে হবে। আমরা যদি বিভিন্ন জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ হই, এই শতাব্দি হবে আমাদের জন্যে, আদিবাসীদের জন্যে।     আসুন আমরা এমন এক স্বপ্ন দেখি, এই শতাব্দীতে আমাদের আর বাঙালের সংবিধান লাগবে না। আমরা আদিবাসী জাতিরাই আমাদের সংবিধান আমরাই রচনা করে ফেলেছি। আসুন, আমরা এমন এক সমাজ স্বপ্ন রচনা করি, যেখানে বাঙাল নেতারা নয়, আমরা আদিবাসীরাই আমাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যবস্থা নির্ধারণ করে ফেলেছি – আমরা বাঙালের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নই, বরং আমরাই ঘরে বসে বোতাম টিপে বাঙালদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারি।       ——————————————————–

অডঙ চাকমা, ১ জুলাই ২০১১

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/690

পার্বত্য চট্রগ্রামের “ভ্রাতৃঘাত” নিয়ে কিছু প্রাসঙ্গিকতা এবং কিছু মানবিক আবেদন

span style=”color: #008000;”>কিছু অনুভূতিঃ
পার্বত্য চট্রগ্রামের কথা লিখতে গিয়ে বাস্তবিক জীবনের কথা মনে পড়ে যায়, তারপর একটু বেশি আবেগপ্রবল হয়ে উঠি । এমন আবেগ একসময় মুক্তিকামী বাংলার মুক্তিযোদ্ধারা হৃদয়ে গেঁথে মুক্তির জন্য সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন পাকিস্তানি বর্বর শাসকশ্রেণীর উপর । রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে অধিকারের জন্য জয় ছিনিয়ে নিয়েছিলেন । তাই সেই আবেগ অন্যদশজনের আবেগের চেয়ে ছিল ভিন্ন, সেই আবেগ ছিল ভালোবাসা-মায়া-মমত্ববোধে আবদ্ধ । দেশের-দশের-জাতির মুক্তির সোপানে সেই আবেগ ছিল মর্যাদাপূর্ণ এবং শ্রদ্ধাজনক । আজ আমার মতো অধিকারহারা ছেলে-মেয়ে সেই একই আবেগ হৃদয়ে গেঁথে লাঞ্জনা-বঞ্চনার তীব্র প্রতিবাদী । এই প্রতিবাদ ভেদাভেদ কিংবা অজ্ঞ-অন্ধপূর্ণ নয় কিন্তু ধারাবাহিক অকথ্য করুণ বাস্তবতা মানসিকভাবে জ্বালা দিতে দিতে বাধ্য করাচ্ছে আরো একটু বেশি সতর্ক হবার । এই সতর্কতার কারণ অবিশ্বাস, আর এই অবিশ্বাসের কারণ চাতুকারিতা এবং প্রতারণা করার প্রতিফলন । আজ সেই প্রতারণার পরিপূর্ণ ফসল হচ্ছে “ভ্রাতৃঘাত”, যে ভ্রাতৃঘাতে ঝরে যাচ্ছে বাংলাদেশের একএক সুনাগরিক ।

পার্বত্য চট্রগ্রাম নিয়ে লেখালেখি করতে ব্যক্তিগতভাবে অনেক খারাপ লাগে । তবু ও না লিখলে যে নিজেকে অপরাধী মনে হয়, দ্বায়ভার কম হলেও নিজের উপর ও বত্তায়, তাই অন্য একজনের মতো চুপ করে ও থাকতে পারি না । পার্বত্য সমস্যাটি এখন বহুমুখী । এই বহুমুখী সমস্যাটিকে একমুখী করার আহ্বান জানালে ও আবার আমার রক্তের ভাইয়েরা আমাকে ভুল বুঝে থাকেন । পার্বত্য চট্রগ্রামের সমস্যাটি দিনদিন বহুমুখী আকারে রুপ নিচ্ছে, আর অন্যদিকে নিরাপত্তা বাহিনীর “ডিজিএফআই” -একের পর এক ছক একে নিজেদের উদ্দেশ্যকে বৃহৎ আকারে হাজিল করে যাচ্ছেন । অনেকাংশে আজ নিরাপত্তা বাহিনীরা সফল ও বটে । এমন এক মন্তব্য ফেইসবুকে এক বন্ধু করেছিলেন যেটি আমি লেখার শেষাংশে আপনাদের সাথে শেয়ার করতে চাই ।

শান্তি চুক্তির অপর নাম এখন অশান্তি চুক্তিঃ
শান্তি চুক্তির উপর শ্রদ্ধা রেখে – বর্তমানে পার্বত্য চট্রগ্রামে তিনটি সক্রিয় আঞ্চলিক রাজনীতিক দল রয়েছে । জেএসএস (সন্তু লারমা), জেএসএস (রুপায়ন দেওয়ান) এবং ইউপিডিএফ ( প্রসিত বিকাশ খীসা) । ১৯৯৭ সালের আগে আঞ্চলিক রাজনীতিক দল ছিল মাত্র একটি তা হচ্ছে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জেএসএস ( অবিভক্ত ) । কিন্তু ১৯৯৭ সালের পরবর্তীতে “পার্বত্য চুক্তি” ( অন্য নাম “শান্তি চুক্তি” ? ) হওয়ার পর নতুনভাবে পাহাড়ের সবুজ বনাঞ্চল হয়ে যায় রক্তে রঞ্জিত । দীর্ঘ সময়ের জেএসএস এবং বাংলাদেশ সরকারের অস্ত্রবিরতির সমাপ্তি ঘটে, চলে পাহাড়ী কতৃক পাহাড়ী হত্যা-ঘুম-অপহরণসহ মুক্তিপণ আদায় -এর পিছনের অবশ্যই আগেভাগে আঁকা ছিল এক দাবা খেলার ঘর । এই দাবা খেলার ঘরটি এঁকেছিলেন বর্তমানে ক্ষমতাসীন আওয়ামিলীগ সরকারের কূটনীতিকবৃন্ধ অন্যদিকে নিরাপত্তা বাহিনীর “ডিজিএফআই” । আর জীবনহানি খেলায় নাম লেখান দুই পাহাড়ী নেতা -১. সন্তু লারমা ( যিনি তাহার ভাই এমএন লারমার মৃত্যুর পর ছিলেন জেএসএস -এর নেতৃত্ব ), এবং ২. প্রসিত বিকাশ খীসা ( যিনি একজন পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের অন্যতম জন্মদাতা, বর্তমানে ইউপিডিএফ’ ) ।

১৯৯৭ সালের চুক্তির পর থেকে পাহাড়ে শান্তি ফিরেছে ভাবলে ভুল করা হবে । বরং শান্তি পিছনে বয়ে বেড়াচ্ছে অব্যত্ত অশান্তি, সন্তানহারা মা-বাবা করুণ আর্তনাত আদৌ কোমলময়ী মা-বাবার বুকে জ্বালা দিয়ে যায় । স্বামীহারা বিধবা মা-বোনের জীবন আজ অসহায় । পিতাহারা সন্তানের অর্থনীতিক দূদর্শা আদৌ মানবিকতা হরণ করে চলে; পড়াশুনার খরচভার বহন করতে না পারাতে অনেক ছেলে-মেয়েকে পড়াশুনা থেকে ঝড়ে যেতে হচ্ছে । তবুও গুলাগুলির আওয়াজে আজ পাহাড় কেঁদে বিলাপ করে; মা-বোনেরা এই বিলাপে অংশ নেন । শুধু তারাই জানে যারা ধ্বংসাত্মক ভ্রাতৃঘাতে হারাচ্ছেন প্রাণপ্রীয় একজনকে -মাষ্টার পাশ একজন শিক্ষিত যুবককে । এর জ্বালার অনুশোচনা কয়েকবার স্বচক্ষে দেখেছি যখনি গ্রামে-গ্রামে ঘুরেছি । সন্তানহারা এক মাকে দেখেছি সন্তান হারানোর ব্যথায় সে পাগলপ্রায়; পরিবারের সবাইকে অবিশ্বাস করে সে । এই অবিশ্বাস অত্যন্ত গভীরের; করুণ মানবিক এবং হৃদয়স্পর্শী । তারপর ও কি চুক্তিটি আসলে “শান্তি চুক্তি” হওয়ার দাবী রাখে ? মাননীয়া শেখ হাসিনার ইউনেস্কো শান্তি পুরষ্কারের মূল্য কোথায় ? আবার নাকি নোবেল পুরষ্কার পাওয়ার দরকার ছিল ?

পার্বত্য রাজনীতির সংকটে আঞ্চলিক রাজনীতিক দলসমূহঃ
প্রথম আলোতে সাংবাদিক ‘অরুণ কর্মকার ও হরি কিশোর চাকমা’র “সংকটে পার্বত্য রাজনীতি” কলামে পার্বত্য চট্রগ্রামের বর্তমানে চলমান ভ্রাতৃঘাতের বাস্তবধর্মী চিত্র উঠে আসে । পার্বত্য আঞ্চলিক রাজনীতিক দলগুলো প্রায়ই কাঁদা ছুঁড়াছুঁড়িতে ব্যস্ত হয়ে সত্যিকার আন্দোলনকে একটু হলেও ব্যহৃত করছে । একে অপরকে বলছে কুচক্রী-দালাল-সন্ত্রাসি এবং আরো অনেক বিশেষণ এর ব্যবহারবিধি চোখে পড়ার মতো [1] । এবার আসুন একটু চোখ বুলিয়ে নিই, কে কে এই ভ্রাতৃঘাতের দ্বায়িত্বপূর্ণ পদে অত্যন্ত নিষ্ঠতা এবং সততার সহীত নিজের দ্বায়িত্ব এক ভাইকে মারার মধ্যে দিয়ে সম্পন্ন করে যাচ্ছেন । আরো অনেকের নাম বাদ পড়তে পাড়ে কারণ সবগুলোর নাম আমার জানা নেই, তবে কারোর জানা থাকলে মন্তব্য লিখে দিতে পারেন । আমার তাঁদের আত্মত্যাগের জন্য অনবরত শ্রদ্ধা যারা যারা সুখের জীবন উৎসর্গ করে অধিকারহারা জাতিমুক্তির জন্য লড়ায়ে সামিল হয়েছেন ঠিক একইভাবে আমার অশ্রদ্ধা এবং ঘৃণা তাদের ভ্রাতৃহত্যা রাজনীতির জন্য । অস্ত্রবাজী রাজনীতির জন্য, এক ভাই অন্য এক ভাইয়ের বুকে গুলি চালানোর জন্য আমি সেসব হত্যার রাজনীতিকে ঘৃণা করি, আর সেসব ভ্রাতৃঘাতের রাজনীতিকে যারা যারা উস্কে দিচ্ছে তাদেরকে ও আমার অশ্রদ্ধা এবং ঘৃণা । এই ঘৃণা মানবিক আবেদনের । এই ঘৃণা শুধু আবেগের নয় বরং মানবিক প্রশ্নের ।

পার্বত্য চট্রগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস):
পার্বত্য চট্রগ্রাম জনসংহতি সমিতি হচ্ছে পার্বত্য চট্রগ্রামে এগার আদিবাসী জুম্মমানুষের প্রথম রাজনীতিক সংগঠন । এই সংগঠনটির জন্ম হয় ১৫ই ফ্রেব্রুয়ারি ১৯৭২ সালে । তাদের নিজস্ব ওয়েব সাইটে দেয়া আছে যে মানবাধিকার ভাবাদর্শ সম্মিলিত যাতে বিদ্যমান জাতীয়তা, গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িক, সামন্তবাদ এবং সামাজিক সুবিচার । সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন শহীদ মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা [2]। বর্তমানে সংগঠনটির উচ্চপদস্থ নেতা-নেত্রীবৃন্ধরা হলেন; জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় ( ওরফে সন্তু) লারমা (পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান এবং সংগঠনের প্রধান ), প্রণতি বিকাশ চাকমা (সাধারণ-সম্পাদক), উষাতন তালুকদার, মঙ্গলকুমার চাকমা, গৌতম চাকমা, শক্তিপদ ত্রিপুরা, সজীব চাকমা নবীনদের সারিতে আছেন বোধিসত্ত্ব চাকমা, দীপায়ন খীসা, বব লারমা, ত্রিজিনাথ চাকমা, তেজদীপ্ত চাকমা, নিটোল চাকমা, বুলবুল চাকমাসহ আরো অনেকেই । মহিলা সমিতির নেত্রী হলেন জ্যোতিপ্রভা লারমা আর নবীন নেত্রীদের সারিতে আছেন চৈতালি ত্রিপুরা, চঞ্চনা চাকমা, সৃজনী ত্রিপুরা প্রমুখ ।

পার্বত্য চট্রগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস -সংষ্কার):
২০০৬ সালের সময়ে সন্তু লারমা নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতির ভাঙ্গন শুরু হয় এর প্রেক্ষিতে নতুন অন্যএক সংষ্কারপন্থী আঞ্চলিক রাজনীতিক দল সৃষ্টি হয়, যেটিকে নামকরণ করা হয় জনসংহতি সমিতি (জেএসএস-এম এন লারমা) । সংগঠনটির বর্তমান কনভেনিং কমিটি গঠন করে ১০রা এপ্রিল ২০১০ সালে । নতুন সংস্কারপন্থী সংগঠনটি অভিযোগ করে যে সন্তু লারমা নেতৃতাধীন ২০-৩১ মার্চের ২০১০ সালে জেএসএস এর ৯ম জাতীয় আলোচনাতে সংবিধান লংঘনের সাথে ৬জন নেতাকে বহিষ্কার করা হয়, যার মধ্যে ছিলেন মৃত চন্দ্র শেখর চাকমা যিনি দলের ৩য় বারের মতো সাধারণ সম্পাদক পদে দ্বায়িত্ব পালন করেন । সংগঠনটি সন্তু লারমাকে একনায়কসুলভ নেতা বলে অভিহিত করে । বর্তমানে সংগঠনটির উচ্চপদস্থ নেতা-নেত্রীরা হলেনঃ সুধাসিন্দু খীসা (কো-চেয়ারপার্সন), রুপায়ন দেওয়ান (কো-চেয়ারপার্সন), তদিন্দ্রলাল চাকমা (সাধারণ-সম্পাদক), আরো আছেন ইন্জিনিয়ার মৃনালকান্তি ত্রিপুরা, এডভোকেট শক্তিমান এবং নেত্রী কাকলি খীসা । [3] http://chtvoice.blogspot.com

ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ):
ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) পার্বত্য চট্রগ্রামের অন্যএক আঞ্চলিক রাজনীতিক সংগঠন । সংগঠনটির জন্ম হয় ২৬শে ডিসেম্বর ১৯৯৮ সালে, এক প্রস্তুতিমূলক কনফারেন্সের মধ্যে দিয়ে যার মধ্যে দিয়ে সংগঠনটি সুষ্পষ্টভাবে শক্তিশালী এবং গুরুতরভাবে ২রা ডিসেম্বরের ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত “পার্বত্য চুক্তি”কে আপত্তি জানাই যে “চুক্তিটি” মৌলিক দাবীগুলো অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে বলে । তাই সংগঠনটি জুম্মমানুষের আত্ম-নিয়ন্ত্রনের অধিকারকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য “পূর্ণ স্বায়ত্বশাসনের” আহ্বান জানায় । আর তাদের ওয়েব সাইটে আছে যে সংগঠনটি দৃরভাবে বিশ্বাস করে গণতান্ত্রিকনীতি, ভ্রাতৃত্ববোধ এবং সামন্তবাদ, এসবকিছু হচ্ছে সমাজকে অত্যাচার এবং ধ্বংস থেকে রক্ষাকরার স্বার্থে । সামন্তবাদের মধ্যে জাতিসমূহের অবিভেদ, লিঙ্গ বৈষম্যহীন, অসাম্প্রদায়িক এবং গণতান্ত্রিক পদ্ধতিগত । সংগঠনটির বর্তমান নেতা-নেত্রীরা হলেনঃ প্রসিত বিকাশ খীসা (প্রেসিডেন্ট), রবি শংকর চাকমা (সাধারণ সম্পাদক), উজ্জ্বল স্মৃতি চাকমা, নিরন চাকমা, ধ্রুব জ্যোতি চাকমা, শান্তি দেব চাকমা, মিথুন চাকমা, মাইকেল চাকমা, রিকো চাকমা, সোনামুনি চাকমা, অংগ্য মারমা, টুংগ্য মারমা এবং আরো অনেকই । নেত্রীর সারিতে আছেন, কণিকা দেওয়ান, যুথিকা চাকমা, রীনা দেওয়ানসহ আরো অনেকেই । [4]

উপরে উল্লেখিত নামগুলোকে চিনে রাখুন, যেগুলোর মধ্যে যেমন আছে জাতির প্রেম তেমনি আছে জাতি হত্যার প্রেম । তেনারা বলেন যে, এই ভ্রাতৃঘাত একটি রাজনীতিক বাস্তবতা যা থেকে বেরিয়ে আসতে সময়ের প্রয়োজন, সেজন্য অনেকেই যুদ্ধকে অনিবার্য বলে মনে করেন । আবার জনসংহতি সমিতির নেতা সন্তু লারমার মতে, “র্বতমানে চট্টগ্রামে আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল একটিই, জেএসএস । তিনি মনে করেন, ইউপিডিএফ একটি সন্ত্রাসী সংগঠন । শুরু থেকেই এদের কাজ চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাস । আর নবগঠিত জেএসএস (বিক্ষুব্ধ) সম্পর্কে তিনি বলেন, তারা চক্রান্তকারী, কুচক্রী। খুদে দলবাজি করার জন্য তারা দল থেকে বের হয়ে গেছে । দলের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে তাদের পেছনে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মদদ আছে” [5] । অন্যদিকে ইউপিডিএফের রাঙামাটি জেলার প্রধান সংগঠক শান্তি দেব চাকমা ও তাঁদের অঙ্গসংগঠন গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সচিব মাইকেল চাকমা বলেন, “জেএসএস নেতারা প্রতিটি সরকারকে খুশি রেখে নিজেদের বিভিন্ন লাভজনক পদে বহাল রাখার কৌশল অবলম্বন করছেন। পাহাড়ি জনগণের দাবি বাস্তবায়নের অবস্থান থেকে তাঁরা সরে এসেছেন। তাই চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য তাঁরা কোনো কর্মসূচি দিতে পারছেন না। দলে ভাঙনও হয়েছে এই কারণে” [6]। এই হচ্ছে কাঁদা ছুঁড়াছুঁড়ির নমুনা ।

ইউপিডিএফ এর সমর্থিতদের নেতৃবৃন্ধের মধ্যে যারা যারা প্রতিপক্ষ জেএসএস (সন্তু লারমার) গ্রুপের কাছে নিহত হন তারা হলেনঃ প্রদীপ লাল চাকমা, কুসুম প্রিয় চাকমা, রুপক চাকমা এবং অনিমেষ চাকমা [7]। এরমধ্যে আরো শতখানেক সাধারণ কর্মি এবং সমর্থক । আর অন্যদিকে ইউপিডিএফের কাছে নিহত হনঃ অভিলাষ চাকমা [8] । এরমধ্যে আরো শতখানেক সাধারণ কর্মি এবং সমর্থক । গত ১৪ এপ্রিল বাঘাইছড়ি উপজেলার মারিশ্যা ইউনিয়নের কদমতলী গ্রামে জেএসএস (রুপায়ন) সমর্থিত এক নেতা চিজিমনি চাকমা ও তার দুই বছরের শিশু কন্যা অর্কি চাকমাকে গুলি করে হত্যা করা হয় । এরজন্য দায়ী করা হয় জেএসএস (সন্তু লারমা) কে । শুধুমাত্র গত তিন মাসে ৮ জন খুন এবং অপহরণের শিকার হয়েছে ১৫ জন । [9]

স্বনামে প্রগতিশীল জুম্মপ্রেমীক বনাম জুম্মবিদ্বেষীদের মধ্যে তফাৎতা কোথায় ?

স্বনামে প্রগতিশীল জুম্মপ্রেমীকদের মধ্যে বিপ্লব রহমান, নোমান চৌধুরির মতো লেখক এবং সাংবাদিকরা ও রীতিমতো পক্ষপাতিত্ব করে কাঁদা ছুঁড়াছুঁড়িতে লিপ্ত হয়ে নিজেদেরকে প্রগতিশীল বলে দাবী করেন । বিপ্লব রহমান নিজের অভিমত ব্যত্ত করতে গিয়ে বলেন,

“স্পষ্টতই আমার পক্ষপাতিত্ব জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) প্রতি । সন্তু লারমা থেকে শুরু করে সমিতির শীর্ষস্থানীয়রা সকলেই আত্নত্যাগী বিপ্লবী। স্বশাসনের আদর্শের ভিত্তিতেই তারা অতীতে সশস্ত্র সংগ্রাম করেছেন, এখনো প্রকাশ্য রাজনীতিতে তারই স্বাক্ষর রেখে চলেছেন ” [10]

নোমান চৌধুরী যিনি নিজেকে জুম্মপ্রেমীক মনে করেন আর নিজের প্রগতিশীলতা প্রকাশ করতে গিয়ে সব দোষের ভার ইউপিডিএফ এর উপর ছেড়ে দেন,

“ক্রমেই বেপরোয়া হয়ে উঠছে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। পার্বত্য চট্টগ্রামের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে শান্তিচুক্তিবিরোধী সংগঠনটি একের পর এক অস্ত্রবাজি করে যাচ্ছে। আগে এই অস্ত্রবাজির মহড়া দুর্গম পাহাড়ে সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমানে সংগঠনটি জেলা ও উপজেলা সদরে ঘাঁটি গেড়ে অস্ত্রের মহড়া দিচ্ছে।” [11]

তেনারা যেদলকে সমর্থন করুক তাতে কোন সমস্যা দেখি না, কিন্তু সৈয়দ ইবনে রহমত, হোসেন খিলজী সাথে কি তেনাদের পার্থক্য খুঁজে পাওয়া যায় ? সৈয়দ ইবনে রহমতের মতে,

“পার্বত্য চট্টগ্রামে সন্তু লারমাদের সন্ত্রাসী এবং হিংস্রতার চরম দৃষ্টান্তের নজির আছে অসংখ্য। কিন্তু তাদের বর্বরতার চিত্র আমাদের মিডিয়াতে স্থান পায় না। কারণ তারা আমাদের মিডিয়ার কাছে অসহায় অবলা জীব হিসেবেই পরিচিত। কিন্তু মিডিয়াতে তাদের পরিচয় যাইহোক সত্য কখনো চাপা থাকে না।” [12]

ঠিক একইভাবে উচ্চ শিক্ষিত হোসেন খিলজী ও খুবভাবে শংকিত যেকোন সময় পার্বত্য চট্রগ্রাম বিচ্ছিন্ন হয়ে পূর্ব তিমুর হয়ে যাবে এমন মানসিকতার । [13] তবে এখানে একটি মাত্র ব্যবধান লক্ষ্যনীয় তা হচ্ছে বিপ্লব রহমান এবং নোমানরা পাহাড়ীদের সান্নিধ্য থেকে পক্ষপাতিত্ব করার সুযোগ পান আর অন্যদিকে সৈয়দ ইবনে রহমত এবং হোসেন খিলজীরা বাইরের থেকে পাথর মারতে থাকেন । তবে সৈয়দ এবং হোসেনদের জন্য ভ্রাতৃঘাত উস্কে যায় না বরং উনাদের চরিত্রগুলো লিখনিতে সুন্দরভাবে ফুটে উঠে যদিও জাতিবিদ্বেষকে উস্কে দিতে উনারা খুবই পটু কিন্তু অন্যদিকে যারা পাহাড়ীদের সান্নিধ্য থেকে পাহাড়ীদের নিয়ে কিছু লেখালেখি করেন প্লাস নির্দিষ্ট দলকে সাপোর্ট দিয়ে নিজেরকে জুম্মপ্রেমীক বলে ঘুরে বেড়ান তারাইতো আরো বেশি ভয়ংকর পার্বত্য চট্রগ্রামের “ভ্রাতৃঘাতকে” উস্কে দেওয়ার জন্য কারণ স্বপক্ষ দলের সব খারাপ কার্যকলাপকে ডেকে রেখে প্রতিপক্ষ দলের বিরুদ্ধে নানারকম লেখালেখিতে ব্যস্ত হয়ে যান । সে পরিপ্রেক্ষিতে স্বপক্ষ দলের সব খারাপ কাজগুলো হয়ে যায় জায়েজ, না হয় জায়েজ করার আপ্রান্ত চেষ্টা ।

পার্বত্য সংকটে কী করণীয়ঃ
আমি খুব আন্তরিকভাবে চাকমা সার্কেলের প্রধান রাজা দেবাশীষ রায় যেভাবে প্রথম আলোকে বলেন তাতে আশাবাদী, তিনি বলেন,

“একাধিক রাজনৈতিক দল থাকা কোনো সমস্যা নয় বরং তা সুস্থ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও সমাজে বহুমত বিকাশে সহায়ক। কিন্তু সমস্যা হলো সশস্ত্র সংঘাত। এই সংঘাত পার্বত্য সমাজে এক দুষ্টক্ষত হিসেবে বিরাজ করছে। অনেক তরুণ অকালে শেষ হয়ে যাচ্ছে। চাকমা রাজা বলেন, সশস্ত্র তৎপরতা স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে হলে সংশ্লিষ্ট দলগুলোকে যেমন পরমতসহিষ্ণু হতে হবে, তেমনি সরকারের সহযোগিতাও লাগবে। এই সংঘাত একটি রাজনৈতিক সমস্যা। সে হিসেবেই এটা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিতে হবে। আর যদি এটাকে আইনশৃঙ্খলার বিষয় বলে বিবেচনা করা হয়, তাহলেও তা নিয়ন্ত্রণে পুলিশি ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করা হচ্ছে পুলিশের কাজে। তা ছাড়া পাহাড়ে ইনসার্জেন্সি (সশস্ত্র অনুপ্রবেশকারী তৎপরতা) না থাকলেও কাউন্টার ইনসার্জেন্সির একটা চশমা এঁটে রাখা হয়েছে। দেশের অন্য কোনো অঞ্চলে এ রকম সশস্ত্র সংঘাত হলে সরকার যা করত, এখানেও তাই করা উচিত।”

পার্বত্য আঞ্চলিক রাজনীতিক সমস্যার জন্য কে বা কারা দ্বায়ীঃ?
পার্বত্য চট্রগ্রামে ভ্রাতৃঘাতের মূল হোতা কিন্তু ক্ষমতাসীন সরকার আর সব ছকের কারিগর কিন্তু নিরাপত্তা বাহিনীর “ডিজিএফআই” । ‘মুই জুম্মো’ নামে এক সচেতন ব্যক্তি যিনি আলজাজিরায় পার্বত্য চট্রগ্রামের সাম্প্রতিক রামগড়-গুড়মারাতে ঘটনার বিবরণ দিয়ে খবর প্রকাশে সমর্থ হন । ৫-ই জুন তিনি আরেকটি খুব গুরুত্বপূর্ণ খবর জেএসএস (সন্তু লারমা) সমর্থিত পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের নেতা বুলবুল চাকমাকে মন্তব্যর খাটিরে জানালেন যা প্রায়ই গোপন থাকতো, যদি ও আঁচ করতে পারি কিন্তু পর্যাপ্ত গবেষণার অভাবে প্রকাশ করা হয়ে উঠেনি । তিনি যা লিখেছেন, আমি অস্বীকার করতে পারি না, যেজন্য আমি দুদলের একে-অপরকে যে ‘সন্ত্রাসী’ অভিধাটি দিয়ে থাকে তার বিরুদ্ধে দুইদলের কর্মী-সমর্থকদের সাথে বেশ কয়েকবার তর্ক করেছি । শুধু তাদের সাথে নয়, এবং কি বিভিন্ন বাংলা ব্লগে আমি উগ্র বাঙালী জাতিবাদী এবং জামাতি-শিবিরদের সাথে এই ‘সন্ত্রাসী’ অভিধাটি নিয়ে গুরুতর তর্ক করেছি । যদি ও আমাদের আঞ্চলিক রাজনীতিবিদরা এখন পর্যন্ত এক চোখ দিয়ে দেখতে ভালোবাসেন । মুই জুম্মো’ যে গুরুত্বপূর্ণ গোপনীয়তাটি প্রকাশ করলেন আমি মনে করি সেটা আঞ্চলিক রাজনীতিবিদদের জানার কথা, না হলে আমাদের আঞ্চলিক রাজনীতিবিদরা এতো অজ্ঞ হয়ে জাতি মুক্তির নেশার স্বপ্ন দেখে কিভাবে ? তাহলে তবু ও কেন এত ভ্রাতৃঘাত ? টাইটেলটি দি্যেছিলাম “নিরাপত্তা বাহিনীর খপ্পরে আমাদের পার্বত্য রাজনীতিক দলগুলো” । মুই জুম্মোর’ মন্তব্যটি আমি হুবহু বাংলার ফন্টে টাইপ করে দিয়ে নোটে রেখে দিয়েছি, যা ছিলঃ

::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::

আপনার সাথে একমত….একমাত্র আলোচনায় পারে আমাদের এই অবস্থা থেকে মুক্ত করতে….সাথে দরকার পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং বিশ্বাস (যেটা আমাদের দুই দলের মানুষের-এ অভাব) ।
এবং আরেকটি জিনিস “দালাল” সম্পর্কে……এই ব্যাপারে আমি যেটা মনে করি, কোন পক্ষই দালাল নয়……পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে এই ভুলবুঝাবুঝি, যার পিছনে দায়ী “সেনাবাহিনী এবং ডিজিএফআই” ।
আমি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে যেটা দেখেছি…..আপনারা যারা রাজনীতি সম্পৃক্ত তারাও হয়ত জানেন, সন্তু লারমা’র যেমন ডিজিএফআই, সেনাবাহিনীদের সাথে আনুষ্ঠানিকতা বজায় রাখার জন্য দেখা করতে হয়, তেমনি খাগড়াছড়িতে ও ইউপিডিএপহ-এর উচ্চপদস্ত নেতাদের একিই জিনিস বজায় রাখতে হয়…..সব ঝামেলা হলো এখানে ।
দুই পক্ষই কিন্তু শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিকতা বজায় রাখার জন্য বাধ্য হয়ে এই সভায় অংশগ্রহণ করেন….আপনারা যারা রাজনীতিতে যুক্ত তারা ভালোমতো জানেন এসব সভায় এড়িয়ে চলার কোন উপায় নেই ।
গেঞ্জাম সৃষ্টি হয় এখানেই…………………….।
যদিও আমাদের উভয় দল এই সভাটা করেন আনুষ্ঠানিকতা বজায় রাখতে, কিন্তু ডিজিএফআই-সেনাবাহিনী ওদের কাছে কিন্তু এটা আনুষ্ঠানিক সভা না…..ওদের কাছে এটা একটা খেলা, যেই খেলা-এ ওরা আমাদের উভই দলকে হারিয়ে আসছে এত দিন ধরে ।
আনুষ্ঠানিক আলোচনা নামে ডিজিএফআই যা করে টা হলো, একজনের বিরুদ্ধে আরেকজন কে লাগিয়ে দেই…..যেমন ধরেন ইউপিডিএপহ এর জনৈক নেতা এর সাথে আনুষ্ঠানিক আলোচনাতে বসলেন খাগড়াছড়ির ডিজিএফআই এর জনৈক মেজর, উনি করবেন কি উক্ত ইউপিডিএফ নেতার সাথে একটা অনুষ্ঠানিক সম্পর্ক বানানোর চেষ্তা করবেন…..এবং ধীরে ধীরে উনার কাছে সন্তু বাবুর কুৎসা রচনা করতে চেষ্টা করতে থাকবেন, এবং কিছউ ভুয়া প্রমাণ ও দিবেন সাথে করে যাতে উক্ত ইউপিডিএফ নেতা-এর মনে গেঠেই যাই আসলেই সন্তু বাবু সরকারের দালাল ।
একই জিনিস করবে রাঙামাটি ডিজিএফআই-এর কর্তা……সন্তু বাবুকে অনেক প্রমাণ দিবেন যে ইউপিডিএফ শান্তি চাই না, শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নে-এ বাঁধা ইউপিডিএফ অনেক কিছু ।
ডিজিএফআই এর উপাস্থাপনা এতই নিখুঁত যে অভাগ্যবঃশত আমাদের নেতারা বুঝতে পারেন না যে ওনাদের বোকা বানানো হইতেছে এসব করে ।
আর আমাদের দলগুলো’র পারস্পরিক অবিশ্বাস এখন এতই বেশি হয়ে গেছে যে আমরা আমাদের বিরুদ্ধে ওরা যা বলে টাই বিশ্বাস করি ।
আর ভুলে গেলে চলবে না, ডিজিএফআই/ইন্টালিজেন্ট ফোর্স এর মানুষগুলো উচ্চ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পেশাদার লোক….যার কারণে ওদের বুদ্ধির কাছে আমরা বারবার পরাজিত হই ।
এরকম একটা উদাহরণ আমি একটা বই এ পড়েছিলাম, যে ইন্টালিজেন্ট ফোর্সগুলো কেমনে অন্তর কোলাহ সৃষ্টি করতে পারে……….কোথায় পড়ছি ঠিক মনে পড়তেছে না কিন্তু কাহিনীটা এরকম, “একটা দলে সদস্যরা একটা শহরে ভয়ংকর রকমের সন্ত্রাসী কার্যকর্ম সৃষ্টি করে চলেছে যা শহরের পুলিশ/নিরাপত্তা বাহিনীর নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে গেছে….দলটা এতই শক্তিশালী হয়েছে যে পুলিশ রা আর পারতেছে না…..শক্তিতে যখন পাড়তেছে না তখন শহরের নিরাপত্তা বাহিনী করলো কি বুদ্ধির আশ্রয় নিলো…..ওরা দেখলো কি, আমরা শক্তিতে দলটির সাথে পারছিনা যখন, আমাদের এখন একটা কিছু করতে হবে দলটাকে ভাঙানোর জন্য” ।
এবং একসময় দলটা ভাঙার সুযোগ ও ওরা পেয়ে গেলো…..হইছিলো কি দল-এর কিছু সদস্য একটা ব্যাংক ডাকাটি করলো….এই সুযোগ থাকেই ওরা কাজে লাগালো….ব্যাংক ডাকাতি করে দলের সদস্যরা নিয়েছিলো ধরেন ১০ কোটি টাকা….পরদিন খবরের কাগজে-এ নিরাপত্তা বাহিনীর নির্দেশনায় সাংবাদিকরা টাকার অংকটা ছাপালো ২০ কোটি টাকা । এই শুরু হয়ে গেলো অন্তর খন্ডল দলটার মাঝে….যারা ব্যাংক ডাকাটিতে অংশ নিয়েছিলো, দলের নেতা ওদের ধরলো, তোমরা ২০ কোটি টাকা ব্যাংক থেকে আনছো কিন্তু দলে-এ জমা দিয়েছো মাত্র ১০ কোটি, বাকি ১০ কোটি কোথায় গেলো বলো ।
এভাবে শুরু হয়ে গেলো অন্তরখন্ডল যার শেষ হলো দলকে দুইভাগে ভাগ করে…..এবং দল ভাঙার পর অন্তরখুন্ডলের মাধ্যমে মারামারি করে পুরা দলটাই ধ্বংস হয়ে গেলো…..আর ঐদিকে নিরাপত্তা বাহিনী হাসতে লাগলো ।
যেই দলের সাথে ওরা এতদিন শক্তিতে খুলিয়ে উঠতে পারেনি, ছোটো এক বুদ্ধিতে কেমনে পুরা দলটা রে ধ্বংস করে দিলো ওরা ? মাফ করবেন আমি এখানে আমাদের রাজনীতি দলগুলোকে ঐই খারাপ দলের সাথে তুলনা করেছি ….কিন্তু এটা শুধু নিরাপত্তা বাহিনীর চালাকি টা বুঝানোর জন্য । [14]

:::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::

সন্দেহ জন্ম নেই কিজন্য ?
এসব কিছুর পর যখন কেউ এক তরফাভাবে পার্বত্য রাজনীতিক দলদের উপর লেখালেখি সমালোচনা করে তখন সন্দেহ এবং অবিশ্বাস এমনিতেই চলে আসে । পার্বত্য আঞ্চলিক রাজনীতিক দলগুলো ও নিশ্চয় আত্মপক্ষকে সমর্থন করলে খুশীতে আত্মহারা হয়ে যাবে তাতে কোন সন্দেহ নেই । কিন্তু তাতে করে কোন বৃহৎ স্বার্থ সিদ্ধি হয় না । এই নিয়ে বেশ জোড়েসোড়ে ফেইসবুককে এক অন্যতম মাধ্যম বানিয়ে ঐক্যতার জন্য প্রচারণা করা হচ্ছে, দেয়া হচ্ছে মতামত এবং করা হচ্ছে করুণ আকুতি-মিনতি, সবকিছুর পর ও কাঁদাছুঁড়াছুঁড়িতো আছেই । [15] আন্তরিকতার অভাবে বারবার ঐক্যতা ভেস্তে যাচ্ছে আর ভ্রাতৃঘাত তীব্র থেকে তীব্রতর ধারণ করছে । এ যাবৎ ৫০০ এর অধিক পাহাড়ী হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছে এই ভ্রাতৃসংঘাতে । জেএসএস এবং ইউপিডিএফের দস্তাদস্তিতে সাধারণ জনগণ নিরুপায় এবং অসহায় । এমনই বিশ্লেষণধর্মী লেখা পাহাড়ীর অন্যতম ব্লগার অডং চাকমা “জেএসএস-ইউপিডিএফ ঐক্য কী সম্ভব?” শিরোনামে দুদলকে তীব্র সমালোচনার পাশাপাশি ঐক্য হওয়ার আহ্বান করেছেন । [16]

পরিশেষেঃ
পরিশেষে আপনাদের কাছে শ্রদ্ধার সাথে ক্ষমাপ্রার্থী এবং মানবিক আবেদনের সাথে নম্রভাবে বলতে চাই এটি কোন ব্যক্তি আক্রমনাত্মে নয়, এভাবে সরাসরি না লিখলে বাস্তব দিকগুলো উঠে আসে না এবং পার্বত্য সমস্যার উত্তরণ কখনো সম্ভবপর হবে না । যে যেভাবে পারেন পাহাড়ীদের ভ্রাতৃঘাত বন্ধের জন্য সাহায্য করুণ । আরো জানতে হলে বিনাদ্বিধায় প্রশ্ন করতে পারেন । আঘাতের চেয়ে বরং উপকার হবে । পাহাড়ে এসবকিছু মুক্তভাবে আলোচনা করা যায় না, যে করতে চাই থাকে হুমকি দিয়ে নতুবা ধরে নিয়ে যায় । তাই ভ্রাতৃ সংঘাত আদৌ বন্ধ হচ্ছে না দীর্ঘ ১৪ বছরের পর ও । প্রতিদিন কোন না কোন ভ্রাতৃঘাতের ঘটনা লেগেই আছে । পারলে একটু ঐক্যতা নিয়ে কাজ করতে সাহায্য করুণ । ধন্যবাদ ।

:::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::
[1] http://2.42.354a.static.theplanet.com/detail/date/2011-06-20/news/93549
[2] http://pcjss-cht.org/
[3] http://chtvoice.blogspot.com
[4] http://www.updfcht.org/about.html
[5] http://2.42.354a.static.theplanet.com/detail/date/2011-06-20/news/93549 ]
[6] http://2.42.354a.static.theplanet.com/detail/date/2011-06-20/news/93549
[7] http://www.samakal.com.bd/details.php?news=70&action=main&menu_type&option=single&news_id=167278&pub_no=732&type
[8] http://webster.site5.com/~pratidin/?view=details&type=gold&data=Loan&pub_no=165&cat_id=1&menu_id=1&news_type_id=1&index=10
[9] http://www.samakal.com.bd/details.php?news=70&action=main&menu_type&option=single&news_id=167278&pub_no=732&type
[10] http://mukto-mona.com/banga_blog/?p=6118
[11] http://www.shaptahik-2000.com/2010/06/13/%E0%A6%87%E0%A6%89%E0%A6%AA%E0%A6%BF%E0%A6%A1%E0%A6%BF%E0%A6%8F%E0%A6%AB%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%85%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%9C%E0%A6%BF-%E0%A6%9A%E0%A6%B2/
[12] http://www.sonarbangladesh.com/blog/sayedibnrahmat/15585
[13] http://www.sonarbangladesh.com/blog/HossainKhilji/35288
[14] http://www.facebook.com/media/albums/?id=100001390287862#!/note.php?note_id=220825447935270
[15] http://www.facebook.com/home.php?sk=group_152613778124973&ap=1
[16] http://prothom-aloblog.com/posts/8/128159

</span

zp8497586rq

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/662

দীপায়ন খীসার “ঐক্যের ফেরিওয়ালাদের কাছে কিছু বিনীত নিবেদন” ও এক ফেরিওয়ালার প্রতিক্রিয়া

আজকে সকালে ফেসবুকে ঢুকে চোখে পড়ল CHTBD গ্রুপে দীপায়ন খীসার একটি লেখার লিংক (http://www.news.chtbd.net/?p=605)।লেখার শিরোনাম ছিলো “ঐক্যের ফেরিওয়ালাদের কাছে কিছু বিনীত নিবেদন”।নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়, তবে বাংলা ব্লগীয় শিরোনাম।সহজে পাঠকের চোখ আকৃষ্ট করতে পারে।আমার চোখও আকৃষ্ট হলো। অনলাইন ভার্সনে পত্রিকা পড়া বাদ দিয়ে দীপায়ন বাবুর লেখাটা আগে পড়ে নিলাম। ইচ্ছা হলো সঙ্গে সঙ্গে আমার প্রতিক্রিয়া লেখার জন্যে। কিন্তু কাজের ব্যস্ততা আমাকে তা করতে সময় দেয়নি। তাই তৎক্ষণাত ছোট্ট একটা মন্তব্য লিখে বিদায় নিলাম। বিস্তারিত পড়তে ক্লিক করুন.. »

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/615

আদিবাসী বিতর্ক

[আদিবাসী বিতর্ক নিয়ে Kungo Thang আমাকে একটা নোটে (http://www.facebook.com/kungothang/posts/2170110211960

) ট্যাগ করেছেন। উনার পোস্টে মন্তব্য দিতে গিয়ে আমার লেখাটা পোস্ট হয়নি। তাই আলাদা করে নোট দিলাম।]


বাঙালিদের (দুঃখিত সবার কথা বলছি না, তবে অধিকাংশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য) আদিবাসী নিয়ে বিতর্কে মশগুল হতে দেখে একটা কৌতুক মনে পড়ে গেলো। এই কৌতুকটা অনেক আগে কোন এক পত্রিকায় পড়েছিলাম। একদিন পড়া আদায় করতে না পারার জন্যে শাস্তি হিসেবে শিক্ষক ছেলেকে আটকিয়ে রেখেছিলেন।ফলে ছেলের বাড়ী ফিরতে দেরী হলো। দুশ্চিন্তাগ্রস্ত বাবা ছেলের দেরী হওয়ার কারণ জানতে চাইলো। বিস্তারিত পড়তে ক্লিক করুন.. »

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/515

জেএসএস-ইউপিডিএফ ঐক্য কী সম্ভব?

রাঙামাটির বরকল উপজেলাধীন সুবলং ইউনিয়নে জেএসএস-র সশস্ত্র গ্রুপের হামলায় ইউপিডিএফ-এর চার কর্মী নিহত হওয়ার প্রেক্ষিতে ফেসবুক গ্রুপগুলোতে উত্তপ্ত আলোচনা চলছে।উভয় পার্টির প্রতি সাধারণ মানুষের তীব্র ঘৃণা-ক্ষোভ-নিন্দা ঝরে পড়ছে ফেসবুকের দেওয়ালে দেওয়ালে।কেউ কেউ পশুর সাথে তুলনা করে গালি দিচ্ছে উভয় পার্টিকে।এসব ঘৃণা ক্ষোভ দেখে স্পষ্টভাবে অনুধাবন করা যায় সাধারণ মানুষ বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম কতটা জেএসএস-ইউপিডিএফ-এর প্রতি ক্ষুব্ধ।তীব্র ঘৃণা-ক্ষোভ-নিন্দার মাঝেও মোটামুটিভাবে সবাই একটা জায়গায় একমত – জুম্মজনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে গেলে অবশ্যই উভয় পার্টিকে এক হতে হবে।এমনকি জেএসএস-র তরুণ কর্মী বা জেএসএস ঘরানার ফেসবুকবন্ধুদেরও উভয় পার্টির ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে কোন দ্বিমত নেই।তবে কিছু কিছু তরুণ জেএসএস কর্মী ইউপিডিএফ-র সাথে রাজনৈতিক সংঘাতের জন্যে প্রবীণ নেতাদের একগুঁয়েমীকে দায়ী করছেন। অন্যদিকে, ইউপিডিএফ-র কর্মীরা তো অনেক আগে থেকেই বলে আসছেন বৃহত্তর ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের স্বার্থে তারা জেএসএস-র সাথে সমঝোতা করতে প্রস্তুত। এককথায়, অনেক জেএসএস-ইউপিডিএফ কর্মীসহ সাধারণ জুম্মজনগণ পাহাড়ের দুই রাজনৈতিক দলের ঐক্যের ব্যাপারে সোচ্চার এবং প্রতিনিয়ত বিভিন্ন মাধ্যমে বিশেষকরে ফেসবুক ও ব্লগের মাধ্যমে তাদের কাছে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আকুল আবেদন জানিয়ে যাচ্ছেন।কিন্তু এত আবেদন নিবেদন সত্ত্বেও উভয় দল বিভিন্ন ছলছুতোয় নিজেদের মধ্যে মারামারি ও খুনোখুনি এখনো বন্ধ করেনি।স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগে, উভয় দল কী জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল?রাজনৈতিক সহিংসতা ও সংঘাত বন্ধে তারা সত্যিই কী আন্তরিক?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বিস্তারিত বিশ্লেষণে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।সহজভাবে বললে বলতে হয়, উভয় দলই জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নয়।ওরা যদি সত্যি সত্যিই জনমত ও জনগণের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে থাকতো তাহলে তারা এতদিন আন্তরিকভাবে চেষ্টা করতো রাজনৈতিক সহিংসতা ও সংঘাত বন্ধের জন্যে।কিন্তু তা করার জন্যে কোন কার্যকর পদক্ষেপ এখনো পর্যন্ত চোখে পড়েনি (যদিও ইউপিডিএফ মাঝে মাঝে জেএসএসকে ঐক্যের আহবান জানিয়েছিলো)।এই দুই দলের মধ্যেকার সংঘাতের কারণে কত লোকের জীবন হানি ঘটেছে, কত লোকের সংসার তছনছ হয়ে গেছে, কত মায়ের অশ্রু ঝরেছে, কত শিশু অনাথ হয়েছে, অর্কির মত নিরীহ শিশুকে নির্মমভাবে গুলিবিদ্ধ হয়ে মরতে হয়েছে – এসব জঘন্যতম ঘটনার জন্যে কোন দলই কখনো জনগণের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেনি।দুঃখ প্রকাশ তো দূরের কথা, নির্লজ্জভাবে দুই দল বরাবরই এসব ঘটনায় তাদের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করে আসছে।দু’দলই দাবী করে আসছে তাদের কোন সশস্ত্র দল নেই। যদি উভয় দলের কোন সশস্ত্র দল না থাকে, তাহলে কারা অস্ত্র নিয়ে মারামারি করছে? দুঃখের বিষয়, দু’দলই পার্টিগতভাবে “কোন সশস্ত্র দল নেই” এরকম কথাবার্তা বলে সহিংসতা ও অপরাধ প্রবণতাকে প্রশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে।এ প্রেক্ষিতে বলা যায়, দুই উদাসীন দলের মাধ্যমে জুম্ম জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা হবে সে সম্ভাবনা খুবই কম। তারপরেও সাধারণ মানুষের একান্ত চাওয়া হলো জেএসএস-ইউপিডিএফ ঐক্যবদ্ধ হোক।জনগণের এ চাওয়ার প্রেক্ষিতে আরো একটি প্রশ্ন এসে যায় – জেএসএস-ইউপিডিএফ কী কখনো এক হতে পারবে? হলে কীভাবে? নিচে বিশ্লেষণ করে দেখা যাক তাদের মধ্যে ঐক্য সম্ভব হতে পারে কি না।

অধিকারের লাগি জুম্মজনগণ চাহে ঐক্য, ঐক্য মিলে নাঃ কেন মিলে না?

রবি ঠাকুরের গানের সুর স্মরণ করতে হয়, “এরা সুখের লাগি চাহে প্রেম, প্রেম মিলে না/শুধু সুখ চলে যায়”। ঠিক তেমনিভাবে বলতে হয়, “এরা (জুম্ম জনগণ) অধিকারের লাগি চাহে ঐক্য, ঐক্য মিলে না।শুধু সুখ চলে যায়”।অন্যদের বেলায় জানি না, তবে আমার বেলায় পার্বত্য চট্টগ্রামের একজন দুর্ভাগা নাগরিক হিসেবে সুখহীন মনে জেএসএস-ইউপিডিএফ-এর মধ্যেকার ঐক্য হবে সে ব্যাপারে আমি কখনো আশাবাদী হতে পারি না।আশাবাদী হতে না পারার কিছু কারণও রয়েছে। যেমন,
১) ঐক্যের ন্যূনতম শর্ত হলো পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও বিশ্বাস।দুই দলের, সহজ করে বললে জেএসএস প্রধান সন্তু লারমা ও ইউপিডিএফ প্রধান প্রসিত খীসার মধ্যে এ দু’টো জিনিস চরমভাবে অনুপস্থিত।এছাড়া বর্তমান পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনীতিতে ইউপিডিএফ একটি রাজনৈতিক বাস্তবতা হলেও সন্তু লারমা সে বাস্তবতা মানতে রাজী নন। অর্থাৎ, ইউপিডিএফ তো দূরের কথা সন্তু লারমা জেএসএস বাদে অন্য কোন পাহাড়ী রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব মানেন না।যার অস্তিত্ব তিনি মানেন না, তার সাথে কীভাবে জেএসএস-এর ঐক্য হবে?

অন্যদিকে, জেএসএস-র সাথে ঐক্যের আহবান জানালেও ইউপিডিএফ-এর আহবান খুবই আন্তরিক বলে মনে হয় না।কেননা, তারা একদিকে জেএসএস-এর প্রতি ঐক্যের আহবান জানান, অন্যদিকে তারা তাদের মুখপত্র ও বিভিন্ন লিফলেট-বিবৃতির মাধ্যমে জেএসএস-এর প্রধান সন্তু লারমাকে “গণদুশমন”, “সরকারের দালাল” ইত্যাদি অভিধায় অভিহিত করে অসৌজন্যমূলক ভাষায় গালিগালাজ করে থাকেন। সন্তু লারমার গাড়ী বহরে ইটপালকেল নিক্ষেপ করে।“গণদুশমন”-এর সাথে ইউপিডিএফ-এর ঐক্য কীভাবে সম্ভব? এরকম শ্রদ্ধাহীন-ভালবাসাহীন পরিবেশে কী দুই পার্টির মধ্যে কোলাকুলি হবে?

(২) জেএসএস ও ইউপিডিএফ প্রধানগণের ব্যক্তিগত অহংবোধ ও স্বৈরতান্ত্রিক মানসিকতাও বর্তমান সমস্যার অন্যতম কারণ।ব্যক্তিগতভাবে রাজনৈতিক কর্মী না হলেও বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার সাথে আলাপক্রমে যতটুকু জানতে পেরেছিলাম সেটা হলো সরকারের সাথে সংলাপ চলার সময় তৎকালীন পাহাড়ী গণপরিষদের নেতা ও বর্তমান ইউপিডিএফ প্রধান প্রসিত খীসা সংলাপে অংশগ্রহণ করতে চেয়েছিলেন। এর পেছনে প্রসিতের যুক্তি ছিলো, আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকার সময় জেএসএস পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যাকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে তুলে ধরতে পারেনি। সেই জায়গায় পাহাড়ী ছাত্রপরিষদ, হিল উইমেন্স ফেডারেশন ও পাহাড়ী গণপরিষদ এ তিন সংগঠন মিলে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যাকে রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছিলো। কাজেই সংলাপে এই তিন সংগঠনের প্রতিনিধিত্ব থাকা চাই। সেই হিসেবে প্রসিত খীসা সরকারের সাথে সংলাপ প্রক্রিয়ায় প্রতিনিধিত্ব করতে চেয়েছিলেন।কিন্তু জেএসএস নেতৃত্ব তার এ চাওয়াকে ভিন্ন চোখে দেখেছিলেন।যার কারণে তারা প্রসিতের প্রস্তাবে রাজী হননি।এতে প্রসিত খীসা অপমানিত বোধ করেন।সন্তু বলেন, “প্রসিত, তুমি কে?” আর প্রসিত বলেন, “আমি কম কীসের?” এই অহংবোধের ফলশ্রুতিতে সংলাপের শুরু থেকেই পূর্ণস্বায়ত্তশাসনের ধুয়া তুলে জেএসএস-এর নেতৃত্বের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছিলেন প্রসিত।

অন্যদিকে, সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জেএসএসও প্রসিতদের পুরোপুরি উপেক্ষা করে সংলাপ চালিয়ে যান এবং অবশেষে ’৯৭ সালে পার্বত্যচুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।চুক্তি স্বাক্ষরের পর দিনই ঢাকার রাজপথে প্রসিতরা চুক্তির বিরোধিতা করে চুক্তির কপিতে আগুন ধরিয়ে দেন। এছাড়া যেদিন সন্তু লারমা অস্ত্র জমা দেন, সেদিন প্রসিতরা সন্তু লারমাদের কালো পতাকা প্রদর্শন করেন।এভাবে দু’জনের ব্যক্তিগত অহংবোধ ও অপ্রতিরোধ্য জেদাজেদি ক্রমে ক্রমে চরম সংঘাতের দিকে এগিয়ে যায়। সেই সংঘাতের চরমরূপ হলো “শান্তিচুক্তির পক্ষ” ও “শান্তিচুক্তির বিপক্ষ” এবং তাদের মধ্যে খুনোখুনি ও অস্ত্রের ঝনঝনানি। তাই, সন্তু ও প্রসিতের ব্যক্তিগত অহংবোধ ও আহতমনের বেদনাবোধের অবসান না হলে জেএসএস-ইউপিডিএফ-এর ঐক্য প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা আছে কী?

(৩) একটা চাকমা প্রবাদ আছে, এক জঙ্গলে দুই বাঘ থাকতে পারে না।সেই চাকমা সমাজের দুই বাঘ সন্তু আর প্রসিত এক সঙ্গে বসবাস করতে পারবেন এমন সম্ভাবনা খুবই কম।এ প্রসঙ্গে বাস্তব উদাহরণ টানতে হয়, প্রসিত বাঘকে পাহাড়ের রাজনীতির জঙ্গল থেকে তাড়ানোর জন্যে সন্তু বাঘ সরকারের কাছে বারবার দাবী জানাচ্ছেন সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ইউপিডিএফকে নিষিদ্ধ করা হোক।অন্যদিকে, প্রসিত বাঘের দল ইউপিডিএফও সন্তু লারমাকে “দন্তহীন বুড়োবাঘ”, “গণদুশমন”, “জাতীয় বেঈমান”, “সরকারের দালাল” ইত্যাদি উপাধি দিয়ে তাকে নিশ্চিহ্ন করার আহবান জানিয়ে আসছে।মাঝে মাঝে সন্তু বাঘের গাড়ী বহরে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে নিজেদের পেশিশক্তির পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়।

প্রসঙ্গক্রমে আরো একটি বিষয় উল্লেখ না করে পারি না। দুই বাঘই বিশ্বাস করে বন্দুকের নলই ক্ষমতার উৎস।সেই ক্ষমতা সুসংহত করতে দু’জনই বন্দুকের নল ব্যবহারের পক্ষে।যেহেতু দুই বাঘই ‘একাদাজ্জে’ (একক কর্তৃত্বপরায়ন), সেহেতু বন্দুকের নলের মাধ্যমে কে ‘একাদাজ্জে’ থাকতে চান না? ‘একাদাজ্জে’ থাকার জন্যে দু’জনেরই বন্দুকের নল খুবই প্রিয়।

(৪) জুম্মদের রাজনৈতিক ইতিহাসে ঐক্যের নজির নেই।দূর অতীতে না গিয়ে জেএসএস-এর “লাম্বা-বাদি”র ইতিহাসটা দেখলেই চলে। জেএসএস “লাম্বা-বাদি”তে বিভক্ত হওয়ার পর যখন এক হতে চাইলো তখন তার কী পরিণতি হয়েছিলো সেটা আমাদের সবার জানা।সেখানে আমরা হারিয়েছিলাম জুম্মজাতির অগ্রদূত এম.এন লারমাকে।এই নজিরবিহীন জুম্ম ইতিহাসে দুই ‘একাদাজ্জে’ বাঘ ঐক্যের নজির সৃষ্টি করতে পারবেন কী? তবে আমার বড়ই সন্দেহ হয়।

জেএসএস-ইউপিডিএফ ঐক্য কখনো কী সম্ভব হবে?
উপরে কিছু নেতিবাচক দিকের কথা বললাম। আমাদের সমাজে ও রাজনীতিতে আরো অনেক নেতিবাচক দিক আছে। কেবল জেএসএস-ইউপিডিএফ-এর চোখ দিয়ে নয়, সমাজ-মনস্তাত্বিক, দার্শনিক ও ধর্মীয় লেন্স দিয়েও সেসব নেতিবাচক দিকগুলোর বিস্তারিত বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে।তবে এই জাতীয় দুর্যোগ মুহুর্তে এসব নেতিবাচক কথাবার্তা শুনে অনেকে হয়ত প্রশ্ন করতে পারেন, তাহলে কী জেএসএস-ইউপিডিএফ-এর মধ্যে কখনো ঐক্য সম্ভব হবে না?

এ প্রশ্নের সহজ সরল উত্তর নেই। উত্তর পেতে হলে ঐক্যের ধরনটা কী হতে পারে সে ব্যাপারে আগে স্পষ্ট হতে হবে।জেএসএস্-ইউপিডিএফ-এর ঐক্যের ব্যাপারে সবাই এক রা হলেও ফেসবুকবন্ধু ও ব্লগারদের আলোচনা থেকে এ ব্যাপারে কোন স্পষ্ট ধারনা পাইনি।তবে রাধামন ধনপুদি (Radhamon Donpudi)নামে জনৈক ফেসবুক বন্ধু জুম্ম ঐক্যের ব্যাপারে আবেগময়ী নোট দিয়েছিলেন কিছুদিন আগে।স্বাভাবিকভাবে তার লেখাতে আবেগ ছিলো।কিন্তু কীভাবে ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হতে পারে সে ব্যাপারে কোন দিক নির্দেশনা খুঁজে পাইনি। শান্তিচুক্তির প্রতি শোকগাথা লিখে রাধামন বলেছিলেন, যারা “পক্ষে” ছিলেন আর যারা “বিপক্ষে” ছিলেন তাদের কারোর জন্যেই চুক্তিটা কোন সুফল বয়ে আনতে পারেনি ভাইয়ে ভাইয়ে মারামারি ও খুনোখুনি ছাড়া।তাই তিনি চুক্তির “পক্ষ” ও “বিপক্ষ” কাউকে দোষারোপ না করে চুক্তিটাকে ইতিহাসের এক বাঁকে রেখে দিয়ে নতুন করে শুরু করার আহবান জানিয়েছিলেন। অত্যন্ত যৌক্তিক আহবান। কিন্তু ঐক্য কিভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে সেটা এখনো বড় প্রশ্ন।

তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, “ঐক্য” বলতে যদি সবাই জেএসএস্-ইউপিডিএফ এই দু’দলের একটা সংগঠনে একীভূত হওয়াকে বুঝে থাকেন, তাহলে সেই ঐক্য কখনো সম্ভব হবে না।সেটা অবাস্তব ধারনাও বটে।কেননা, যারা অস্ত্র হাতে নিয়ে পরস্পরকে ধাওয়া-ধাওয়ি করেছিলেন এবং গুলি ছুঁড়েছিলেন, তারা ভবিষ্যতে পরস্পরের সাথে শ্রদ্ধায়-ভালবাসায়-বিশ্বাসে কোলাকুলি করবেন সেই সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ, জুম্মজাতির ইতিহাসে বিরলও বটে।এ অবস্থায় তাদের মধ্যে ঐক্য কোন উপায়ে হতে পারে?

আমার সাধারণ জ্ঞান বলে, জেএসএস্-ইউপিডিএফ একটি সংগঠনে একীভূত না হলেও তাদের মধ্যে ঐক্য সম্ভব হতে পারে যদি নিম্নে উল্লেখিত শর্তাবলী পূরণ করা সম্ভব হয়।

এক, এত মারামারির পরও দুই দলের দুই ‘একাদাজ্জে’ বাঘ সন্তু লারমা ও প্রসিত খীসার মনের মধ্যে জুম্মজাতির ঐক্যের ব্যাপারে বিবেকের তাড়নাবোধ বা উপলব্দি হয়েছে কী না। যদি না হয়, তাহলে তাদের মধ্যে সেই তাড়নাবোধ বা উপলব্দি সৃষ্টি করতে হবে।

দুই, উভয়কে পরস্পরের অস্তিত্বকে স্বীকার করতে হবে ও পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে যার যার কাজ করতে হবে।

তিন, দলীয়ভাবে জুম্মর বিরুদ্ধে জুম্ম লেলিয়ে দেওয়া – এরকম বল প্রয়োগের নীতি থেকে তাদের সরে আসতে হবে।অর্থাৎ দলীয়ভাবে পরস্পরের প্রতি অনাক্রম নীতি কঠিনভাবে অনুসরণ করতে হবে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, জেএসএস-ইউপিডিএফ তাদের ঐক্য প্রতিষ্ঠায় এ তিনটি শর্ত পুরণে কী আগ্রহী?

জেএসএস-ইউপিডিএফ ঐক্য কোন পথে হতে পারে?
আমি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী নই, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তত্ত্ব দিয়ে জেএসএস-ইউপিডিএফ ঐক্যের সম্ভাবনা আলোচনা করতাম। তবে অধম কাঁচা নাগরিক হিসেবে তাদের ঐক্যের ব্যাপারে দু’টো উপায় দেখতে পাই। একটা হলো শান্তিপূর্ণ প্রক্রিয়া, আর অন্যটা বেদনাদায়ক প্রক্রিয়া। এবার এ দু’টো প্রক্রিয়া সম্পর্কে আলোচনা করতে চাই।
শান্তিপূর্ণ প্রক্রিয়ায় ঐক্যঃ এ প্রক্রিয়ায় নিজেদের মধ্যে ঐক্য বা সহাবস্থান বজায় রাখার জন্যে আপাতত: দু’টো উপায় খোলা আছে। একটা হলো, যার যার সংগঠনের অস্তিত্ব বজায় রেখে কর্মসূচী ভিত্তিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা; আর অন্যটি হলো অহিংসা প্রক্রিয়ার মাধমে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা।

১) কর্মসূচী ভিত্তিক ঐক্য
জেএসএস-ইউপিডিএফ-র দাবীসমূহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাদের মধ্যে মৌলিক কোন পার্থক্য নেই।শুধু পথের ভিন্নতা রয়েছে। প্রথমোক্ত দল মনে করছে, “পার্বত্য চুক্তি” বাস্তবায়নের মাধ্যমে জুম্ম জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা; আর অন্যদল মনে করছে, “পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের” মাধ্যমে তা করতে হবে।দু’দল দু’টো পরিভাষায় কথা বললেও জুম্ম জনগণের মৌলিক দাবীসমূহ একই। যেমন, (১) পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্মজনগণের জন্যে সাংবিধানিক স্বীকৃতিসহ স্বশাসন ব্যবস্থার কায়েম করা; (২)জুম্মজনগণের ভূমি অধিকার নিশ্চিত করা; (৩) সেটেলার বাঙালিদের অনুপ্রবেশ বন্ধ করা এবং তাদেরকে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে প্রত্যাহার করা; (৪) সেনাশাসন প্রত্যাহার করা; এবং (৫)আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্যে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।উভয় দলের রাজনৈতিক সাহিত্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এগুলোই হলো দু’দলেরই মৌলিক দাবী।তাহলে দু’দল কেন “পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন” ও “পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের” নামে শুধু শুধু মারামারি করছে?নিজেদের মধ্যে হানাহানি না করে, শক্তিক্ষয় না করে দু’দলই এসব দাবীর সাথে সংগতি রেখে নিজ নিজ দলের রাজনৈতিক কর্মসূচী নির্ধারণ করতে পারে।

এখানে প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করতে হয়, ইউপিডিএফ ন্যূনতম কর্মসূচীর ভিত্তিতে জেএসএস-এর সাথে ঐক্যের আহবান জানিয়েছিল।সর্বশেষ, ইউপিডিএফ তার আগের অবস্থান থেকে সরে এসে জেএসএসকে চুক্তি বাস্তবায়নে সহযোগিতা দেবে বলে ঘোষণা দিয়েছিলো।ইউপিডিএফ-এর এসব ঘোষণা কতটুকু আন্তরিকতাপূর্ণ ছিলো সেটা বিতর্কের বিষয়। তবে ইউপিডিএফ-এর এসব ঘোষণা সত্বেও জেএসএসকে উদাসীন থাকতে দেখা গেছে, যা জুম্মজাতির জন্যে অত্যন্ত বেদনাদায়ক।এখানে জেএসএস-এর একধরনের অহংবোধ কাজ করছে বলে মনে হয়।

এটাও জুম্মজাতির জন্যে চরম দুর্ভাগ্য, ইউপিডিএফ-এর অস্তিত্বকে জেএসএস স্বীকার করে না।জেএসএস-এর “মনোকালচার”(জেএসএসই সব) নীতি এই অনৈক্যের পেছনে অনেকাংশে দায়ী।তবে জেএসএস ইউপিডিএফকে রাজনৈতিক দল হিসেবে স্বীকার করুক বা না করুক, ইউপিডিএফ এখন পার্বত্য রাজনীতিতে একটি বাস্তবতা।পার্বত্য চট্টগ্রামের মাটি ও মানুষ নিয়ে যদি জেএসএস আন্দোলন করতে চায় তাহলে অবশ্যই ইউপিডিএফ-এর বাস্তবতাকে তার উপেক্ষা করার কোন উপায় নেই।

আর এটাও সত্য, একপাক্ষিকভাবে কখনো ঐক্য বা সমঝোতা সম্ভব নয়।একদিকে জেএসএস-এর “এক বনে দুই বাঘ থাকতে পারে না”-এরকম একরোখা মানসিকতা, অন্যদিকে ইউপিডিএফ-র সমঝোতা বা ঐক্যের আহবান – এই দু’য়ের মধ্যে কী ঐক্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব? এই রাজনৈতিক ধাঁধার উত্তর দু’দলকে বের করতে হবে।তাদেরকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা মারামারি-খুনোখুনি চালিয়ে যাবে নাকি ঐক্যের পথ খুঁজে বের করবে; তাদেরকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে মারামারি-খুনোখুনির জন্যে পরস্পরকে দোষারোপ করতে থাকবে নাকি নিজেরা নিজেদের সমাধানের পথ শান্তিপূর্ণ উপায়ে খুঁজবেন।

২) রাজনৈতিক সহিংসতার পথে নয়, অহিংসার পথে ঐক্য খুঁজতে হবে
জেএসএস-ইউপিডিএফ পরস্পরের সাথে মারামারি করে অনেক নেতা-কর্মীকে হারিয়েছে (প্রথম আলোর সূত্রমতে, ৭০০-এর অধিক নেতা-কর্মী খুন হয়েছেন)।অসংখ্য লোককে অপহরণ করা হয়েছে, জিম্মি করে চাঁদা আদায় করা হয়েছে। এছাড়া অস্ত্র কেনা ও নিজেদের পার্টির লোকজনের খাওয়া-পরা নিশ্চিত করতে সাধারণ জনগণের উপর চাঁদার জগদ্দল পাথর চাপানো হচ্ছে। অস্ত্রকেনা ও জেএসএস-ইউপিডিএফ চালানোর জন্যে সাধারণ জনগণ আর চাঁদার বোঝা বইতে পারে না। দুই দলের (এখন হয়েছে তিন দল) সহিংস রাজনীতির কারণে জনগণ যেমন ধনে-জনে চরম ক্ষতির শিকার হচ্ছে, ঠিক তেমনি মনস্তাত্তিকভাবেও জুম্মসমাজ বিশেষ করে যুব সমাজ হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে।যুবসমাজের এ হতাশার ভবিষ্যত পরিণতি কী হতে পারে রাজনৈতিক দল হিসেবে জেএসএস-ইউপিডিএফকে এখনই ভাবতে হবে।তাই জেএসএস-ইউপিডিএফের কাছে উদাত্ত আহবান সহিংসতার পথে নয়, অহিংসার পথে সমাধান আনতে আপনাদের আন্তরিক হতে হবে।

অহিংসা আন্দোলনের অনেক সফল উদাহরণ আমাদের সামনে আছে। বৌদ্ধধর্মের প্রবর্তক কেবল মহামতি গৌতম বুদ্ধ নন, আরো অনেক উজ্জ্বল কিংবদন্তী ব্যক্তির দৃষ্টান্ত আমাদের অনুপ্রাণিত করতে পারে।দূরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই, আমাদের কাছের মানুষ মহাত্মা গান্ধী, অংসান সূচি ও দালাইলামার দৃষ্টান্ত দেখেও আমাদের নেতারা শিক্ষা নিতে পারেন। সাদাসিধে কথায়, অহিংসা চর্চার জন্যে মনের বিরুদ্ধে দু’দলের একীভূত হওয়ার প্রয়োজন নেই, একসাথে যৌথ কর্মসূচী দেওয়ার প্রয়োজন নেই। দু’দলের কাছে সাধারণ জনগণের প্রত্যাশা দু’পার্টিই নিজ নিজ দলের মধ্যে অহিংসার চর্চা করুক।অহিংসা চর্চার জন্যে কঠিন কিছু করতে হবে না। কেবল এ তিনটি নীতি পালন করতে হলো: ১)রাজনৈতিক দল হিসেবে তারা জনগণের প্রতি নিজেদের দায়িত্ববোধ সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন থাকবেন; (২) একে অপরকে মারার বা ক্ষতি করার অভিপ্রায় থেকে বিরত থাকবেন এবং নিজ নিজ দলের কর্মীদেরও মারামারি থেকে বিরত থাকার শিক্ষা দেবেন; (৩)সব ধরনের সহিংসতা বন্ধে দলীয়ভাবে অঙ্গীকারাবদ্ধ থাকবেন।এ ত্রিশরণ পালনের জন্যে কেবল প্রয়োজন দু’দলের রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

আরো একটা কথা এখানে উল্লেখ করতে হয়।দু’দলই সাধারণ জনগণের কাছে রাজনৈতিক আহবান জানায় তাদের মধ্যেকার মারামারি বন্ধে উদ্যোগ নিতে এবং সোচ্চার হতে।জনগণ নয়, দু’দলের মধ্যেকার এই মারামারির সমাধান দু’দলকেই করতে হবে।এর সমাধানসূত্র বৌদ্ধধর্মের ধম্মপদে পাওয়া যাবে। আর সেই সমাধান নিজ নিজ দলের মধ্যে আছে।দু’দলের নেতা-কর্মীরা সংযত ও সহনশীল হলে মারামারি আপনাআপনি বন্ধ হয়ে যায়। ধম্মপদে বলা হয়েছে,
“The others do not understand that we should restrain ourselves here.
Those who understand that, therefore appease their quarrels.” (DhP 6)
(অনেকে জানেন না নিজেদেরই সহনশীল হতে হয়।আর যারা এই সত্য অনুধাবন করতে পারেন, তারা নিজেদের ঝগড়া প্রশমিত করতে পারেন)।

কাজেই নিজেদের মধ্যেকার মারামারি বন্ধ করতে হলে দু’দলের নেতাকর্মীদের পরমতসহনশীল ও সংযত হওয়া ছাড়া কোন বিকল্প নেই।এই সত্য উপলব্দি করতে না পারলে জেএসএস-ইউপিডিএফ সবসময় পরস্পরকে দোষারোপ করতে থাকবে। এতে জুম্মজনগণের তো উপকার হবে না, তাদের মধ্যেকার রাজনৈতিক প্রতিহিংসার আগুনও কখনো নিভবে না।ধম্মপদের (ধম্মপদ:৬) আরো একটি চিরন্তন বাণী “শত্রুতা দিয়ে শত্রুতার অবসান হয় না, মিত্রতা দিয়ে শত্রুতার অবসান হয়”। এই সত্য জেএসএস ও ইউপিডিএফ যত তাড়াতাড়ি উপলব্দি করতে পারবে, তত তাড়াতাড়ি জুম্মজনগণ সহিংস রাজনীতির করালগ্রাস হতে মুক্ত হতে পারবে।

জেএসএস-ইউপিডিএফ কী বেদনাদায়ক প্রক্রিয়ায় ঐক্য খুঁজবে?

উপরে উল্লেখিত শান্তিপূর্ণ প্রক্রিয়ায় সমস্যার সমাধান বা ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব না হলে জেএসএস-ইউপিডিএফকে বেদনাদায়ক প্রক্রিয়ায় যেতে হবে। এর অর্থ হলো অস্ত্রের মাধ্যমে আপোসরফা করতে হবে। অস্ত্রই ঠিক করবে কে থাকবে – জেএসএস নাকি ইউপিডিএফ?কিন্তু বড় প্রশ্ন হলো, এই পথে চূড়ান্ত সমাধান আসবে কী? অবশ্য, দু’দল তো গত এক যুগ ধরে এই বেদনাদায়ক পথে হাঁটছে।অনেক খুনোখুনি ও রক্তারক্তি করেও কেউই কাউকে নিশ্চিহ্ন করতে পারেনি। বরং নতুন নতুন সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। আরো একটি নতুন সংযোজন হয়েছে জেএসএস (এমএন লারমা)। সন্তু-প্রসিত-রূপায়ন নেতৃত্বাধীন তিনটি রাজনৈতিক দল এখন জনসাধারণের কাছে “সন্তুজ, গুন্ডুষ ও ফান্ডুজ” হিসেবে পরিচিত। “ফান্ডুজ” নতুন সংযোজন হলেও ইতোমধ্যে এর কিছু নেতাকর্মী “সন্তুজের” হাতে মারা গেছে। অনুমান করা যাচ্ছে, আগামীতে “ফান্ডুজরা”ও বেদনাদায়ক পথে হাঁটতে পারে।“সন্তুজ-গুন্ডুষ-ফান্ডুজ”-এ ত্রিশক্তির সংঘর্ষে জুম্মজাতির অস্তিত্ব কী টিকে থাকবে?

এ প্রশ্নের উত্তরে বেদনাদায়ক পরিসংখ্যানটা দেখে নিলে ভালো হয়। গত ২২ মে ‘প্রথম আলো’র প্রতিবেদন অনুসারে, পার্বত্য চুক্তির পর থেকে গত এক যুগ সময়ে জেএসএস ও ইউপিডিএফ-এর মধ্যেকার সংঘাতে ৭০০-এর অধিক নেতা-কর্মী খুন হয়েছেন। আহত হয়েছেন কমপক্ষে পাঁচ শতাধিক।অপহৃত হয়েছেন দেড় হাজারের বেশি।খুনোখুনির ব্যালেন্সশিট এখনো মেলানো শেষ হয়নি। এছাড়া এই ব্যালেন্সশিটে শুধু মানুষের সংখ্যার হিসেবটা দেওয়া হয়েছে। এখানে পুরো জুম্মজাতির মন ও মানসিক বেদনার হিসেবটা দেয়া হয়নি।দেওয়া হয়নি জেএসএস-ইউপিডিএফ-এর মারামারিতে কী পরিমাণ অর্থের অপচয় হয়।হিসেব নেই “সন্তুজ-গুন্ডুষ-ফান্ডুজ”-এর চাঁদাবাজিতে সাধারণ মানুষ কী পরিমাণ ক্ষতির শিকার হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এই ক্ষতি, এই বেদনা জুম্মজনগণ কতদিন বহন করতে পারবে?এ প্রেক্ষিতে “সন্তুজ-গুন্ডুষ-ফান্ডুজ”দের ভাবতে হবে এই বেদনাদায়ক প্রক্রিয়ায় তারা সমাধান চান কী না।তবে তাদের লড়াইয়ের গতিপ্রকৃতি দেখে আমার ভয় হয়, তারা চাকমা রূপকথার রোঙ্যাবেঙার দুই বনমোরগের লড়াই* শুরু করে দিয়েছে কী না।যদি তাই হয়, তাহলে জুম্মজনগণকে, বিশেষকরে তরুণ প্রজন্মকে ভাবতে হবে, “সন্তুজ-গুন্ডুষ-ফান্ডুজ”দের বেদনাদায়ক পথে তাদের সমস্যার সমাধান হতে দেবে কী না।যদি ‘না’ হয়, তাহলে জেএসএস-ইউপিডিএফকে চূড়ান্তভাবে বয়কট করতে হবে।

শেষকথা
জুম্মজাতির অধিকারের নামে জেএসএস-ইউপিডিএফ নিজেদের স্বার্থে যে সংকট সৃষ্টি করেছে সেটা পুরো জুম্মজাতির ঐক্যের সংকট নয়।বরং তাদের স্বার্থের জন্যে পুরো জুম্মজাতিকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এটা হতে পারে না।জেএসএস-ইউপিডিএফ ছাড়াও জুম্মজনগণ নিজেদের অধিকার রক্ষার জন্যে লড়াই করতে পারে। যেমন, জেএসএস-ইউপিডিএফ নিজেদের মারামারিতে মশগুল তখন বান্দরবানের রুমার জনসাধারণ গত ৩ মে সেনাবাহিনী কর্তৃক ভূমি অধিগ্রহণের প্রতিবাদে ৪০ কিমি. পথ পায়ে হেঁটে লংমার্চ করেছিলো (যদিও পত্র-পত্রিকায় এ খবর তেমন গুরুত্ব পায়নি)।জনগণের এই চেতনা থেকেও জেএসএস-ইউপিডিএফ-এর শিক্ষা নিতে হবে।

জেএসএস-ইউপিডিএফ নিজেদের ব্যর্থতাগুলো কখনো জনগণের কাছে স্বীকার করেনি। তাদের সৃষ্ট দুর্ভোগের জন্যে জনগণের কাছে কখনো দুঃখ প্রকাশ করেনি। বরং তাদের ব্যর্থতার জন্যে তারা অন্যকে দায়ী করে থাকে। ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব আবিষ্কার করে থাকে নিজেদের দোষ ঢাকার চেষ্টা করে। অন্যকে দোষারোপ করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে উভয় দলকে নিজেদের বিকৃত চেহারাগুলো দেখতে হবে।তাদের মনে রাখতে হবে, তাদের মারামারি সমস্যার সমাধান অন্য কেউ করে দেবে না, নিজেদেরকেই করতে হবে।জেএসএস সমাধান চায় না কিংবা ইউপিডিএফ সমাধান চায় না – এরকম খোঁড়া যুক্তি বাদ দিতে হবে। মারামারি সমস্যার সমাধান নিজেদের মধ্যেই লুকিয়ে আছে। নিজের মধ্যেই শান্তি নিহিত আছে। এ প্রেক্ষিতে আবারও তাদেরকে মহামতি গৌতম বুদ্ধের চিরন্তনবাণী স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, “Peace comes from WITHIN, don’t seek it WITHOUT” (শান্তি আসে নিজের ভেতর থেকে, একে খুঁজতে যেও না নিজেকে বাদ রেখে)।

অতএব, জেএসএস-ইউপিডিএফ মারামারি-খুনোখুনি বাদ দিন, পরমতসহিঞ্চু হতে শিখুন। নিজের মধ্যে ঐক্য-শান্তিু খুঁজে নিন।নচেত আপনাদের মুখে জুম্মজনগণের অধিকারের পক্ষে কথা বলা মানাবে না।জুম্মজনগণের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে কোন অধিকার আপনাদের দেয়া হয়নি।

************
পাদটীকাঃ রোঙ্যাবেঙার দুই বনমোরগের লড়াইয়ের কাহিনী ছোটবেলায় গ্রামের এক দাদুর কাছে শুনেছিলাম। অল্প কথায় গল্পটা হলো এইঃ একদিন চৈত্রের ভরদুপুরে জুমঘরে বসে রোঙ্যাবেঙার হুকা টানতে ইচ্ছা হলো।কিন্তু আগুন জ্বালানোর মত ম্যাচ-শলাকা জাতীয় তার হাতে কিছুই ছিলো না। মনে মনে ভাবছিলো যদি আগুন জ্বালানো যায় মনভরে হুকা টানা যেতো।ঠিক সেই সময় দুই বনমোরগ লড়াই শুরু করলো। এমন তুমুল লড়াই সে জীবনে দেখেনি। প্রথমে দুই মোরগের পালকগুলো খসে পড়লো। একটাও অবশিষ্ট নেই। তারপরও দু’জনের লড়াই থামে না।মাংসে মাংসে ধ্বস্তাধ্বস্তি শুরু হলো।একসময় সব মাংসও খসে পড়লো। তবুও লড়াই থেমে নেই। তারপর শুরু হলো হাড়ে হাড়ে লড়াই। টুসটাস্ টুসটাস্।এমনি শব্দ করতে করতে স্যাঁৎ করে আগুন জ্বলে উঠলো। চৈত্রের খাঁ খাঁ রোদ। তখন কী আর আগুন থামানো যায়?পুড়ে ছারখার হয়ে গেলো পুরো জুম আর ছয়কুড়ি ঘরের আদাম (গ্রাম)।

রোঙ্যাবেঙার দুই বনমোরগের লড়াইয়ের সাথে জেএসএস-ইউপিডিএফ-এর লড়াইয়ের মধ্যে সাদৃশ্য দেখতে পাচ্ছি।একযুগ লড়াই করেও এখনো তাদের মধ্যেকার খুনোখুনি, রক্তারক্তি থামেনি। এ অবস্থায় সরকার, সেনাবাহিনী ও সেটেলার লাগবে না। জেএসএস-ইউপিডিএফই মারামারি করে পুরো জুম্মজাতিকে লেলিহান শিখায় জ্বালিয়ে পুড়িয়ে মেরে ফেলতে পারে।

অতএব, জনগণ জেএসএস-ইউপিডিএফ হতে সাবধান।
*******
অডঙ চাকমা, ২৬ মে ২০১১

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/499

এক খোলা চিঠি স্যার সন্তু লারমাকে -অমিত হিল

আমার স্বশ্রদ্ধাবঃশত নমষ্কার এবং ভালোবাসা গ্রহণ করবেন । আশাকরি শারিরীক এবং মানসিকভাবে কৌশলে ভালোই আছেন  । জুম্মজাতির দূরস্বঃন্ধির প্রাক্কালে আমি খুববেশি ভালো থাকতে পাড়ছি  না । আপনি বয়জ্যোষ্ঠ এবং অত্যন্ত অভিজ্ঞ রণকৌশলবিদ হিসেবে প্রথম খোলা চিঠিখানি আপনাকে দিয়ে শুরু করলাম ।  পরবর্তীতে আপনারই প্রতিপক্ষ, এককালে আপনার পোষ্যপুত্র বলে অনেকেই যে দাবী করে থাকেন সেই প্রসিত বাবুকে ও এই অতিসাধারণ এক জুম্ম জনতার সদস্যর বাণী পৌঁছিয়ে দিতে চায় ।

আজ আমাদের সাধারণ জুম্মজনতা বেশিমাত্রায় দিশেহারা আর সর্বহারার চেয়ে আরো বেশি ব্যথিত এবং পীড়িত । এই পীড়ন ব্যক্তিগত পীড়ন নয়, বরং সামগ্রিকতা এর সাথে নিবিরভাবে জড়িত -যার দ্বায়ভার আপনাদের দুইনেতার উপর দিনদিন তীব্রভাবে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে ( ১. বাবু সন্তু লারমা, এবং ২. বাবু প্রসিত খীসা) । এর দ্বায়ভার আপনাদের দুজনের কেউ এড়াতে পারেন না । শুধুমাত্র অপেক্ষার পালা আপনাদের দুজনের কে লক্ষ নিরীহ কম্বোডিয়ান মানুষের হত্যাকারী “পর্পত” এর উপাধিটি পেতে যাচ্ছেন ।

যুদ্ধ এক বোধশক্তি সম্পন্ন মানুষের কোনভাবে কাম্য নয়; এর চেয়ে ভ্রাতৃঘাত আরো বেশি মারাত্মক এবং অভিশক্ত । ভ্রাতৃহত্যার পরিণাম দরিদ্র -নিরীহ কম্বোডিয়ান দেশবাসীকে আদৌ সুখ দিতে পারেনি, বুকে লালন করে যেতে হচ্ছে সেই অমানিশার দিনগুলোর কথা এক-এক চাক্ষুস স্বাক্ষী হিসেবে। যেমনটা জাপানের হিরোশিমা এবং নাগাসাকির কথা আদৌ বিশ্ববাসীকে আরেকবার স্মরণ করিয়ে দেই যুদ্ধের ভয়ংকর থাবার কথা । অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতকে নিয়ে মানুষের স্বপ্ন দেখা, আর স্বপ্নের মধ্যে দিয়ে বেঁচে থাকাটাই হচ্ছে আমাদের মানব সমাজের চিরন্তন রীতি । এই রীতি বিরুদ্ধচারণরা ইতিহাসের আস্তাখুঁড়ে খুব সহজে নিক্ষিপ্ত হন এমন নজীর আদৌ বিরাজমান । রাজনীতির মূলপ্রেক্ষাপথ হচ্ছে জাতিকে মুক্তির সোপানে নিয়ে যাওয়া, ছলে-বলে কিংবা কৌশলে । অনেকক্ষেত্রে কৌশল অবলম্বনই রাজনীতির মূলভিত্তি হয়ে দাঁড়াই, যা আপনার মতো এক নবীন নেতার পক্ষে না বুঝার কোন কারণ নেই । যেমনটা মাননীয়া শেখ হাসিনা আপনার সাথে কৌশলে অবতীর্ণ হয়ে “পার্বত্য চুক্তি” নামে এক চুক্তি করিয়ে আপনাকে ক্ষমতাবিহীনভাবে “আঞ্চলিক পরিষদের” চেয়ারম্যান পদে বসিয়ে রেখে জুম্ম দিয়ে জুম্ম হত্যার ইন্ধন যুগিয়ে যাচ্ছেন । সরকারের এসব কুকৌশল না বুঝারতো কোন কারণ নেই । তারপর ও কেন…….. ?

জীবনের অপর নাম সংগ্রাম । সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে বেঁচে থাকার নামই জীবন । এই মহাবিশ্বে পৃথিবী নামক গ্রহটির যতদিন বিনাশ হবে না এবং মানুষের অস্তিত্ব যতদিন থাকবে ততদিন বিপ্লব কিংবা সংগ্রাম চিরজীবি হয়ে থাকবে । যুগের এবং সামাজিকতারপ্রেক্ষিতে নতুন-নতুনমাত্রা যোগে মানুষের মুক্তির সোপানে আন্দোলন হয়, সংগ্রামের সূচনা ঘটে বিপ্লব শুরু হয় । একজন যখন থেমে যায় অন্য আরেকজন এসে এর হাল ধরে । এটাই হচ্ছে এই পৃথিবীতে বসবাসরত মানুষের জাগতিক নিয়মের অন্যতম একটি । যারা বিপ্লব শিখে আর নিজেকে আত্মনিয়োজিত করে মুক্তি সোপানে তাদেরকে দমিয়ে রাখা যায় না । তাই একে অপরের সম্মান প্রদর্শনের মধ্যে দিয়ে এক বুঝাবুঝির ভিত্তি গড়াতে হয় ।

স্যার, মানুষ আজকাল আদর্শ বুঝে না, বুঝতে চেষ্টা করছে না । প্রতিটি মানুষের আদর্শগত দিক ভিন্ন ভিন্ন হবে তা স্বাভাবিক, কিন্তু এক আদর্শকে অন্য আদর্শের একজনকে সম্মান কিভাবে জানাতে হয় তা শেখা অতীব জরুরি । পৃথিবী শুধু এক আদর্শে চলতে পারে না, তাই সৃষ্টির আদি হতে চলে আসছে আদর্শিক ভিন্নতা । যার আদর্শ যতবেশি শক্তিশালী অথবা বুদ্ধিদীপ্ত সম্পন্ন সে আদর্শ ঠিকে গেছে হাজার বছর, আর যার আদর্শ যত হীন এবং নোংরামানসিকতা সম্পন্ন তাদের আদর্শ মৃত্যুর পরই ধ্বংস হয়ে গেছে । আদর্শের ভিন্নমাত্রিকতার জন্য মৃত্যুগ্রাসী যুদ্ধ, তার চেয়ে ভয়ংকর ভ্রাতৃ হত্যার দিনকাল আজ আর উপযুক্ত নই -এই সভ্য জগতে মানুষ সেসব ঘৃণা করে থুথু ছিটিয়ে দেয় । কিন্তু কঠিন বাস্তব হলেও সত্য যে আপনি সেই সংঘাতে ওঠোপ্রোতভাবে লিপ্ত আছেন । এর দোষ শুধু আপনার উপর পড়ে না । কিন্তু আপনি অন্যতম হোতাদের মধ্যে একজন । এর থেকে আমাদের সাধারণ জুম্ম জনতা পরিত্রাণ চায়, বাঁচতে চায় ।

আমরা সাধারণ জনতা চায় আপনারা আপনাদের রাজনীতিক বাস্তবতা থেকে আস্তে-আস্তে বেড়িয়ে এসে জনগণের কাতারে এসে দাঁড়াবেন । জনগণ আপনাদের পাশে থাকবে, স্বশিক্ষিত এবং উচ্চশিক্ষিত যুব সমাজ আপনাদেরকে সহযোগিতা দিয়ে যাবে । আমরা সাধারণ জনতা গণ-আন্দোলন চাই । ভ্রাতৃহত্যার নিপাক কামনা করি সবসময় দিনে-রাতে । আপনাদের চেয়ে আমরা বেশিমাত্রায় ভুক্তভোগী, কেননা আপনারা প্রতিপক্ষের একজনকে মারতে পারলে খুশিতে আহ্লাদিত হয়ে পড়েন । কিন্তু আমাদের বোধজ্ঞান আমাদেরকে পীড়িত করে যখন শুনি এক জুম্ম ভাই কর্তৃক অন্য এক জুম্ম ভাই হত্যা হয়েছে ।

আমাদের জেএসএস এবং ইউপিডিএফ দুদলকে দরকার, কিন্তু দুদলের মধ্যে আন্তঃদন্ধ থাকুক আমরা চাই না । এক দল অন্য এক দলকে ধ্বংস করার যদি মানসিকতা পোষণ করে থাকেন তাহলে তা আপনাদের মন থেকে মুছে ফেলতে হবে, কেননা আদর্শ একবার যখন ঢুকেছে সহজে ধ্বংস হয়ে যাবে না । তাছাড়া গণতান্ত্রিকতার জন্য যেকোনরকম একশক্তিশালী প্রতিপক্ষ দল অবশ্যাম্ভী, কিন্তু যুদ্ধ জ্ঞানতাত্ত্বিক হলে ও তা যেন অস্ত্রের মহড়াপূর্ণ যুদ্ধ না হয় । অতি ক্ষুদ্রজাতি, এমন ভ্রাতৃঘাট চলতে থাকলে আমরা অচিরে ধ্বংস যে হয়ে যাবো তা খুব কাছ থেকে অনুধাবন করতে পারছি ।

ইউপিডিএফ-এর পূর্ণস্বায়ত্বশাসনের প্রতি আপনাদের সম্মান দেখানো উচিত, যেমনটা ইউপিডিএফ-এর ও উচিত জেএসএস এর “পার্বত্য চুক্তি”কে যথাযতভাবে সম্মান দেখিয়ে সাহায্য হাত বাড়িয়ে দেয়া ।

তাই, আমার-আমাদের সাধারণ জনগণের আহ্বান আপনারা সৌহার্দ্যপূর্ণ অবস্থানে থেকে জুম্মজাতির মুক্তির সোপানে কাজ করতে চেষ্টা করুণ । না হয়, ইতিহাস অনেক নিষ্ঠুর এবং বর্বর হয়ে যাবে -ধ্বংস হয়ে যাবে জুম্মজাতির ছোটছোট জাতিস্বত্তাসমূহ । আপনাদের ভ্রাতৃদন্ধ চলতে থাকলে, এমন ও হতে পারে তৃতীয় পক্ষ গজিয়েছে শুধু আপনাদের ধ্বংস করার জন্য । তাই আগেভাগে সমাধানের পথে হাঁটতে চেষ্টা করুণ । হত্যা মানুষকে সমাধান যোগায় না, চাই বুদ্ধিদীপ্ত মন এবং জ্ঞানতাত্ত্বিক কৌশল ।

পরবর্তীতে আসবে “স্যার প্রসিত খীসা” ।

zp8497586rq

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/449

আবারো সন্তুজ-গুন্ডুজের মধ্যে মারামারি: লাশের মিছিলে আরো কতজন যোগ দিলে ওদের বোধোদয় ঘটবে?

গতকাল ২১ মে রাঙামাটির বরকল উপজেলাধীন সুবলং ইউনিয়নে জেএসএস-র সশস্ত্র গ্রুপ ইউপিডিএফ-এর কর্মীদের উপর গুলি চালায়।এতে চারজন ইউপিডিএফ কর্মী নিহত হয়েছেন।দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যেকার চলমান রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত লাশের মিছিলে যারা সর্বশেষ যুক্ত হলেন তারা হলেন অনিমেষ চাকমা (৪৫), প্রবীণ চাকমা ওরফে শুক্রসেন (৩৫), পূর্ণভূষণ চাকমা (৪৮) ও পুলক জীবন চাকমা (৩৩)। সাধারণ একজন জুম্ম হিসেবে এধরনের হত্যাকান্ডের খবর শুনলে মনটা বেদনায় নীল হয়ে যায়।চুক্তিবাস্তবায়ন আর পূর্ণস্বায়ত্তশাসনের নামে জেএসএস-ইউপিডিএফ যা করে যাচ্ছে তা দেখলে আমার মত অতি সাধারণদের অসহায় হয়ে তাকিয়ে থাকা ছাড়া কী বা করার আছে। কোন কিছুই করতে না পারলেও আজকে এ লেখার মাধ্যমে আমার বুকের ভিতর জমে থাকা একরাশ থু থু নিক্ষেপ করছি খুনীদের উপর।বত্রিশটা দাঁত দিয়ে নীরবে অভিসম্পাত দিচ্ছি জেএসএস-ইউপিডিএফ-এর খুনের রাজনীতি নিপাত যাক।

এখানে বলা নিষ্প্রয়োজন, সাধারণ জনগণের মধ্যে কেউই আর জেএসএস-ইউপিডিএফ-এর মধ্যেকার ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত দেখতে চায় না।সাধারণ জনগণের সাধারণ আকাংখা হলো জেএসএস-ইউপিডিএফ একজোট হয়ে জুম্ম জনগণের পক্ষে কাজ করুক। কিন্তু উভয় দলেরই জনগণের সেই আকাংখার প্রতি কোন ভ্রূক্ষেপ নেই। প্রতিনিয়ত তারা মারামারি করে যাচ্ছে।ফলে বেড়েই চলেছে পাহাড়ে রাজনৈতিক খুনের ঘটনার সংখ্যা।দৈনিক ‘প্রথম আলো’র হিসেব মতে, গত ছয় মাসে কেবল রাঙামাটিতে ১৩ জন খুন হয়েছেন। পার্বত্য চুক্তির পর থেকে গত এক যুগ সময়ে জেএসএস ও ইউপিডিএফ-এর মধ্যেকার সংঘাতে ৭০০-এর অধিক নেতা-কর্মী খুন হয়েছেন। আহত হয়েছেন কমপক্ষে পাঁচ শতাধিক।অপহৃত হয়েছেন দেড় হাজারের বেশি।এ পরিসংখ্যানটা ক্রমে বেড়েই চলেছে। সুবলং-এ ইউপিডিএফ-র ৪ জন নেতা-কর্মী নিহত হওয়ার এ ঘটনাটি যে সর্বশেষ সহিংস ঘটনা হবে তার কোন গ্যারান্টি নেই। এদিকে, তাদের মারামারি, খুনোখুনি ও অপহরণের ঘটনাপ্রবাহ দেখে মনে হয়, রাজনৈতিক সহিংসতা ও হত্যাকান্ড থামানোর জন্যে উভয় দলের মধ্যে যেন কেউই নেই।নিজের বিবেকের বিরুদ্ধে নীরবে অথবা অথর্ব হয়ে সবাই হত্যাযজ্ঞের প্রতি সম্মতি দিয়ে যাচ্ছে। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগে, লাশের মিছিলে আরো কতজন যোগ দিলে পরে জেএসএস-ইউপিডিএফ নেতাদের বোধোদয় ঘটবে? যখন বোধোদয় ঘটবে, তখন জুম্মজাতির অস্তিত্ব টিকে থাকবে কি?

সবশেষে জেএসএস-ইউপিডিএফ-এর কাছে বলতে চাই, আজকে জুম্ম সমাজে যে রাজনৈতিক সংঘাত সেটা আপনাদেরই সৃষ্টি।কাজেই এ সমস্যার সমাধান আপনাদেরই করতে হবে। আর আপনারা যদি এই সমস্যার সমাধান করতে না পারেন, তাহলে জুম্মজনগণের অধিকারের কথা বলা আপনাদের কোন নৈতিক অধিকার থাকতে পারে না।আর রক্তমাখা হাতে, আর দুষিত মুখে জুম্ম জনগণের অধিকারের কথা বলাটা হবে চরম ভন্ডামি। কাজেই আগেভাগে আপনাদের ভন্ডামি পরিহার করুন। নইলে ভবিষ্যত পরিণতির জন্যে জনগণের কাছে জবাব দিতে প্রস্তুত থাকুন।

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/435

Page 24 of 27« First...10...2223242526...Last »