ওরা কথা বলে আর আবালার ছবি কী বলে

এক

আজকের লেখাটা ফেসবুক বন্ধু আবালা চাকমার আঁকা ছবিকে কেন্দ্র করে। এর মানে হলো, এ লেখার বিষয়বস্তু হলো আবালার ছবির বিশ্লেষণ।কাজেই, আমার বিশ্লেষণ নিয়ে সবাই খুশী হবেন তেমনটা বিশ্বাস করি না।তবে যে কোন আলোচনা-সমালোচনা সাদরে গ্রহণ করতে প্রস্তুত আছি।

অবশ্য এ লেখাটা এক সপ্তাহ আগে, লেখার কথা ছিলো। কিন্তু সময়ের অভাবে তা করা হয়নি। গতকালকে লেখার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু হরি দা’র (প্রথম আলো’র সাংবাদিক হরি কিশোর চাকমা) ফেসবুকে দেওয়া একটি সংবাদ লিংকের উপর যে বিতর্ক হয়ে গেলো, তাতে পুরো সময়টা ব্যয় হয়ে যাওয়ায় গতকালও লেখাটা হয়ে উঠেনি।

কিছু দিন লেখার ছেদ পড়ায় লেখার শিরোনাম কী দেবো তা নিয়ে একটু সমস্যায় ছিলাম। শেষ পর্যন্ত “ওরা কথা বলে আর আবালার ছবি কী বলে” শিরোনামে লিখতে শুরু করলাম। আর আজকের লেখাটা আবালা চাকমার সম্মানে আপনাদের কাছে উপস্থাপন করলাম।  

দুই

জেএসএস-ইউপিডিএফ-এর মারামারি-খুনোখুনি ও আবালা চাকমার ছবি

জেএসএস-ইউপিডিএফ-এর মারামারি ও খুনোখুনি নিয়ে পাঠক ভাইবোনদেরকে নতুন করে বলার কিছুই নেই। গত ১৪ বছর ধরে ওরা মারামারি ও খুনোখুনি করে আসছে। মাঝে মাঝে চুপচাপ হয় আবার জেগে উঠে। কতজন মারা গেলো এ মুহুর্তে পরিসংখ্যান দিতে পারছি না, তবে এটা সত্য যে, ওদের মারামারি-খুনোখুনিতে মৃতের সংখ্যা তিন ডিজিটের উপরে গেছে।এদের অধিকাংশই তরুণ যুবক। সর্বশেষ মৃত্যুর মিছিলে দুই বছরের এক শিশুও (অর্কি চাকমা)যুক্ত হয়েছে। অসংখ্য নারী বিধবা হয়েছে।অসংখ্য শিশু অনাথ হয়েছে। অনেক মায়ের কোল খালি হয়েছে।আর্মি-সেটেলার দ্বারা নয়, আমাদের জুম্ম বাপ বা ভাইয়ের হাতে আমাদের ভাইয়েরা প্রাণ হারিয়েছে। হারাচ্ছে প্রতিনিয়ত। কীসের জন্যে এত প্রাণের বিসর্জন? কার স্বার্থ রক্ষার জন্যে এত প্রাণের বলি? জুম্মজাতির স্বার্থ নাকি জেএসএস-ইউপিডিএফ বড় নেতাদের স্বার্থ রক্ষার জন্যে? বড় নেতারা কী বলেন? বড় নেতাদের কথা “আমরা” কী বিনা বাক্য ব্যয়ে মেনে নেবো? বিশ্বাস করবো?

এ প্রশ্নগুলো একক কারোর নয়, পাহাড়ের সকল শান্তিকামী জনতার।পাঠকরা চলুন না দেখি, আমজনতার প্রতিনিধি আবালা চাকমা কীভাবে তার শৈল্পিক মনের কল্পনায় দুই দলের সংঘাতময় রাজনীতির ভেলকিবাজি ছবির সাহায্যে ফুটিয়ে তুলেছেন। দেখুন, ছবির সাহায্যে কীভাবে তিনি জেএসএস-ইউপিডিএফ-কে পাঠ করেছেন।

ছবি ১ বিবেক তুমি কার?, সৌজন্যে আবালা চাকমা

ছবি ২ বিবেক তাদের যাদের হাতে…?, সৌজন্যে আবালা চাকমা

আবালার ছবিগুলোর বিশেষ ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই, নিজেরাই কথা বলছে। ইংরেজীতে যাকে বলে self-explanatory. ছবিগুলো নিজেরাই ব্যাখ্যা করছে জেএসএস-ইউপিডিএফ-এ ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের ফলে পাহাড়ে কী কী ঘটছে।

একপাশে জেএসএস, অন্যপাশে ইউপিডিএফ আর মাঝখানে আবালা চাকমা (১ম ছবি দেখুন)।গভীর মনোযোগ দিয়ে আবালা জেএসএস-ইউপিডিএফ-র “অ আ ক খ রাজনৈতিক তত্ত্ব, আন্দোলন ও অর্জন” ম্যানুয়েল পড়ছে।সে দেখতে পাচ্ছে, স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত ঝাঁঝালো মিছিল, প্রতিবাদী মানুষের মুষ্ঠিবদ্ধ হাত, আর ব্যানার-প্ল্যাকাড। দিকে দিকে স্লোগান ধ্বনিত হচ্ছে “পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন কর, করতে হবে”, “পূর্ণস্বায়ত্তশাসন কায়েম কর, করতে হবে”, “পার্বত্য চট্টগ্রাম হতে সেটেলার প্রত্যাহার কর, করতে হবে”, “পার্বত্য চট্টগ্রাম হতে সেনাশাসন প্রত্যাহার কর, করতে হবে” ইত্যাদি ইত্যাদি স্লোগান। এসব স্লোগান আর মিছিলের ধ্বনি শুনে আবালার মনে সে কী উত্তেজনা! মনে মনে বলছে, সবই তো জুম্ম জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে।একটার পর একটা ম্যানুয়্যালের পাতা উল্টাচ্ছে।কিছুদূর পড়ার পর হঠাৎ থমকে গেলো আবালা।ম্যানুয়্যালের পাতায় দেখতে পাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। গুলিবিদ্ধ মানুষের লাশ, মাথার খুলি উড়ে যাওয়া শিশুর লাশ, বিধবার কান্না…আবালা স্তম্ভিত!মনে মনে প্রশ্ন করছে, “তাহলে কার স্বার্থে এত মিটিং-মিছিল-স্লোগান? কার স্বার্থে ভাই ভাইকে গুলি করে, কার স্বার্থে নিরীহ নিস্পাপ শিশুকে খুন করে?” আবালা বাকরুদ্ধ। মনের ভেতর থেকে প্রতিবাদের এক তীব্র ঢেউ বের হয়ে আসছে। জেএসএস-ইউপিডিএফ-এর ভীবৎসতা দেখে তাদের কাছে প্রশ্ন করছে, “বিবেক তুমি কার?”

আবালা আরো এগোয়।বিষন্ন মনে ম্যানুয়্যালের পাতা উল্টায়। যতই উল্টায় ততই দেখতে পাচ্ছে, জুম্মদের দুঃখ (রেফারেন্স হিসেবে ২ নং ছবি দেখুন)। একদিকে সেনাবাহিনী-সেটেলার মিলে জুম্ম উচ্ছেদ করছে, ঘরবাড়ী পুড়িয়ে দিচ্ছে।গ্রামছাড়া হচ্ছে।সেনাবাহিনীর গুলিতে নিরীহ জুম্মগ্রামবাসী মারা যাচ্ছে। বাবা হারানো ছেলেমেয়েরা কান্নায় চারদিক পরিবেশ ভারী করে তুলেছে। এই অন্যায়-অত্যাচার প্রতিকারের কেউ নেই। রাষ্ট্র, সে তো অনেক দূরে বসবাস করে।আবালার মন ভারী হয়ে যায়।

অন্যদিকে, জুম্মজনগণের অধিকার রক্ষার দাবীদার রাজনৈতিক দল জেএসএস-ইউপিডিএফ কী করছে? রাষ্ট্রের এসব অন্যায়-অবিচারের কথা ভুলে গিয়ে ওরা নিজেরাই মারামারি করছে। তাদের মারামারি-খুনোখুনিতে ভাইয়ের লাশ পড়ছে একটার পর একটা।কখনো জেএসএস কর্মী খুন হচ্ছে, কখনো ইউপিডিএফ-এর কর্মী খুন হচ্ছে। গুলিবিদ্ধ রক্তাক্ত লাশ অনাদরে অবহেলায় মাটিতে পড়ে আছে।রক্তের স্রোতধারা বয়ে যাচ্ছে মাটি বেয়ে।গুলিবিদ্ধ বাবা গুলিবিদ্ধ শিশু কন্যার সাথে নিথর হয়ে শুয়ে আছে।স্বামীহারা বিধবা কান্নায় ভেঙে পড়েছে। মা-বাবা হারিয়ে শিশুরা অসহায় হয়ে পড়েছে। ওদের একূলও নেই, ওকূলও নেই। ওদের ভবিষ্যত হয়ে পড়েছে অন্ধকার।আবালা যতই জেএসএস-ইউপিডিএফ-এর রাজনৈতিক আন্দোলনের ম্যানুয়্যাল পড়ছে ততই দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ছে।সেনাবাহিনী-সেটেলারের হাতে জুম্ম ভাইবোন মারা যায়, শিশুরা অনাথ হয়, জমিহারা হয়। অন্যদিকে জেএসএস-ইউপিডিএফ-এর মারামারিতেও জুম্ম ভাইয়েরা খুন হয়, মহিলারা বিধবা হয়, শিশুরা খুন হয়, অনাথ হয়….তাহলে সেনাবাহিনী-সেটেলারদের সাথে জেএসএস-ইউপিডিএফ-এর তফাৎটা কোথায়? আবালা যতই পড়ে ততই জেএসএস-ইউপিডিএফ-এর রাজনৈতিক অর্জনের হিসাবের ব্যালেন্সশিট মেলাতে পারে না।এত খুন, এত রক্ত কীসের জন্যে, কার স্বার্থ রক্ষার জন্যে??? আবালা যন্ত্রণাবিদ্ধ, তার বিবেকে ধরছে না জুম্মজাতির এত ক্ষতি কীসের জন্যে আর কার স্বার্থ রক্ষার জন্যে? আবালা খুঁজে ফেরে বিবেক।তাই তার প্রশ্ন, বিবেক কাদের হাতে? যাদের হাতে মানুষ খুন হয়, তাদের বিবেক কোথায় থাকে?

তেনারা কী বলেন?

দুই দলের আত্মঘাতী খুনোখুনি নিয়ে জুম্ম জনগণ বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ, কিন্তু কেউ মুখ খুলে কথা বলতে সাহস করছে না।মাঝে মধ্যে নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে একটু আধটু ‍বিবৃতি দেওয়া হয়, বক্তব্য দেওয়া হয়, কিন্তু সেগুলো দ্বন্দ্ব-সংঘাত নিরসনের জন্যে যথেষ্ট নয়। আর ইউপিডিএফ-জেএসএস নিজে থেকে আন্তরিক না হলে এ ধরনের সংঘাত বন্ধ করা এত সহজ নয়। তাই আবালা বুঝার চেষ্টা করেছে, দুই দলের নেতারা তাদের দ্বন্দ্ব-সংঘাত বিষয়ে কী বলেন, এবং কীভাবে সমস্যাটাকে ব্যাখ্যা করেন।কেউ কেউ মনে করেন দুই দলের প্রধান ঠিক না হলে সংঘাত বন্ধ হবে না।কিন্তু তাদের নাম নাকি উচ্চারণ করা যায় না, বলতে হয়, “তেনা”। আবালার ভয় হয়। কারণ, ‘তেনা’দের নাম ধরে ডাকলে নাকি অমঙ্গল হয়। পাঠক বন্ধুরা, আপনারাও এ ব্যাপারে মতামত দিতে পারেন।

ছবি ৩ উনাদের হাত পরিস্কার (!)।পেছনে ওগুলো কী (???), সৌজন্যে আবালা চাকমা

আবালা ছবির সাহায্যে বিষয়টা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছে। দুই ‘তেনা’ পরস্পরের পার্টিকে মানেন না, পরস্পরকে অসম্মান করে কথা বলেন। জেএসএস-এর ‘তেনা’ বলেন, “ইউপিডিএফ সন্ত্রাসী সংগঠন”।আর ইউপিডিএফ-এর ‘তেনা’ বলেন, “জেএসএস দেউলিয়া সংগঠন এবং আপোসচুক্তি করে জুম্মজাতির সাখে বেঈমানী করেছে”। ৩ নং ছবি দেখুন, কীভাবে ‘তেনা’রা নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এক ‘তেনা’ নেতৃত্ব দিচ্ছেন জেএসএস-কে আরো এক ‘তেনা’ নেতৃত্ব দিচ্ছেন ইউপিডিএফ-কে। তাই আবালা কারোর নাম উল্লেখ না করে দুই ‘তেনা’র ছবি লাগিয়ে এক পাশের বাক্সে জেএসএস আর অন্য পাশের বাক্সে ইউপিডিএফ-এর নাম দেখিয়েছে। দুই ‘তেনা’ কেউ কাউরে মানেন না, তাই সংঘাত অপরিহার্য। আর “তেনা”দের মান-সম্মান রক্ষা করতে গিয়ে অকালে প্রাণ ঝরছে “সাকরেদ আর কমরেডদের”।

কিন্তু দুঃখের বিষয়, ‘তেনারা’ এ দ্বন্দ্ব-সংঘাতকে প্রকাশ্যে স্বীকার করেন না। কোন সহিংস ঘটনা ঘটলে তাদের কমরেডদের দিয়ে ঘটনার দায় অস্বীকার করা হয়। এক তেনা’র দল বলে, “আমাদের দলে কোন সন্ত্রাসী নেই”। অন্য ‘তেনা’র দল বলে, “আমরা হানাহানি রাজনীতি নয়, গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বিশ্বাসী”। এর মানে হলো, ‘তেনা’দের দল মারামারি-খুনোখুনি করে না। তেনা’দের দলে “সন্ত্রাসী” না থাকলে, অস্ত্র না থাকলে, তেনারা গণতান্ত্রিক হলে, তাহলে এত লোকের তো প্রাণ হানি হওয়ার কথা নয়, রক্তাক্ত লাশ দেখতে পাওয়ার কথা নয়, কোন শিশুর অনাথ হওয়ার কথা নয়, কোন মহিলার অকালে বিধবা হওয়ার কথা নয়।

আবালা, তার ছবির সাহায্যে যথার্থভাবে তেনা’দের দলের মিথ্যাচার ও ভেলকিবাজী উন্মোচন করেছে।মুখে মিষ্টিসুর, পেছনে লুকানো অস্ত্র আর সাজানো আছে রক্তাক্ত কফিন। এরকম মিথ্যাচার দিয়ে জনগণের মঙ্গল করা যায় কী? শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায় কী?

আমরা কী করতে পারি তেনা’দের বুঝানোর জন্যে?

আমার এ প্রশ্ন নিয়ে আমারও কোন সঠিক প্রস্তাবনা নেই। বিভিন্ন জনের কাছ যা শুনি, তেনা’দের বুঝানোর মত কোন মানুষ আমাদের জুম্মজাতির মধ্যে নেই। তাই আমি পাঠকদের কাছে আহবান রাখলাম এ ব্যাপারে কী করা যায় সেসব নিয়ে আপনাদের নিজস্ব মতামত বিনিময় করার জন্যে।

………………………………………………….

অডঙ চাকমা, ৯ অক্টোবর ২০১১

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/1035

সোনার চিজিদের ভবিষ্যত কী হবে?

আবার জেএসএস-ইউপিডিএফ মারামারি! ওরা কী চায়? ওরা কোথায় নিয়ে যেতে চায় জুম্ম সমাজকে?

গত বুধবার ফেসবুকে ঢুকে চোখে পড়লো এক ফেসবুক বন্ধু ‘প্রথম আলো’র প্রতিনিধি সাধন বিকাশ চাকমার একটি প্রতিবেদন ফেসবুক দেওয়ালে পোস্ট করেছিলেন।শিরোনাম ছিলো, “ওদের কেউ রইল না”।সংবাদটা মনযোগ দিয়ে পড়লাম। সংবাদটা পড়ে খুব খারাপ লাগলো।মর্মান্তিক জীবনের গল্প। বাঘাইছড়ি উপজেলার তালুকদার পাড়ার ছোট্ট সোনার চিজি জেকি চাকমা (১৪), তুসি চাকমা (১১) ও শতরূপা চাকমা (৭) তার বাবা মোহন লাল চাকমাকে হারিয়েছে। পত্রিকার প্রতিবেদন অনুসারে, গত ডিসেম্বরে তারা মাকে হারিয়েছিলো। অন্ত:সত্বা অবস্থায় পা পিছলে মা মারা গিয়েছিলেন। এবার জেএসএস (সন্তু লারমা) সশস্ত্র গ্রুপের গুলিতে তারা তাদের বাবা মোহন লাল চাকমা’কে হারালো গত ২৫ সেপ্টেম্বর।

ছোট্ট চিজি জেকি, তুসি ও শতরূপার এখন মাও নেই, বাবাও নেই। সবার ছোট শতরূপা এখনো বুঝতে পারছে না তার বাবা নেই। ছোট্ট চিজিদের এ করুণ অসহায় অবস্থার কথা ভাবতেই মনটা ভীষণ বেদনায় নীল হয়ে যায়। তাদের বাবা না হয় ইউপিডিএফ কর্মী ছিলেন, কিন্তু জেকি, তুসি ও শতরূপার তো এভাবে অনাথ হওয়ার কথা ছিলো না। মা-বাবা হারিয়ে অনাথ অসহায় হয়ে বেঁচে থাকতে হবে এরকম তো কথা ছিলো না। ওদেরও তো সমাজের মধ্যে মা-বাবা-আত্মীয় স্বজনদের সাথে আনন্দঘন পরিবেশে বেঁচে থাকার কথা ছিলো।কিন্তু জেএসএস-ইউপিডিএফ-এর হানাহানি তা হতে দিলো না।জেএসএস (সন্ত) সশস্ত্র গ্রুপের বুলেট কেড়ে নিলো ওদের বাবার জীবন।বড়ই দীর্ঘশ্বাস।

লক্ষ লক্ষ মানুষের ভীড়ে ছোট্ট চিজি জেকি, তুসি ও শতরূপার এখন কেউ নেই। কেবল অবলম্বন ৬৫ বছর বয়সী বৃদ্ধা দাদী। শোকে মূহ্যমান বৃদ্ধা দাদীও দিশেহারা। কী করবেন নাতনীদের নিয়ে? কীভাবে তাদের লালন-পালন করবেন, কীভাবে  মানুষ করবেন? তাই তো দিশেহারা দাদী বলেন, “ওদের কেউ রইল না। আমি আর কদিন বাঁচব। এদের কে দেখবে?”

জেএসএস-ইউপিডিএফ আর কত শিশুদের অনাথ বানাবেন? শিশু অর্কিমণিকে নতুন বছরের প্রথম প্রহরে খুন করেছিলেন। আর কত কাল এরকম অর্থহীন মারামারি-হানাহানি?

আরো লিখতে ইচ্ছে হলো। কিন্তু আপনাদের এরকম পাশবিক কর্মকান্ড বর্ণনা করতে ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না। মুখ থেকে কেবল বের হয়ে আসছে থু: থু: থু:।

থু: থু: থু: দেওয়া শেষে একটি প্রশ্ন রেখে ছোট লেখাটি শেষ করতে চাই। জেএসএস (সন্তু লারমা) ও ইউপিডিএফ, ছোট্ট চিজি জেকি, তুসি ও শতরূপাদের ভরনপোষণ ও লেখাপড়ার দায়িত্ব নেওয়ার জন্যে আপনারা এগিয়ে আসবেন কী?

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/1025

জেএসএস-ইউপিডিএফ-এর কান্ডজ্ঞান দেখে কালু-লালুরাও কাঁদে

নির্জন রাত। একা একা। কেমন যেন লাগছিলো। আকাশে একটু মেঘের গর্জন ছিলো। ঝড়ো হাওয়ায় মনটা কেন উদাস হয়ে যায়। উদাস মনটাকে কীভাবে একটু ব্যস্ত রাখবো তা নিয়ে ভাবছিলাম।হাতে কোন বই নেই। তাই কম্পিউটার খুললাম। কী পড়বো?পত্রিকায় সর্বশেষ সংবাদ জেনে নেওয়ার জন্যে দৈনিক পত্রিকার ওয়েবসেইটে প্রবেশ করলাম। অনলাইন সংস্করণে সংবাদ শিরোনামগুলো পড়ছিলাম। এমন সময় হঠাৎ বিদ্যূত চলে গেলো।বিদ্যূত চলে গেলে মেজাজটা কেমন হয় তা বলা মুশকিল। করার কিছুই নেই। বিদ্যূত উৎপাদনের ক্ষমতা আমার নেই। বিদ্যূত নেই। তাই কম্পিউটার বন্ধ করে বিছানায় শুয়ে পড়লাম।

শুয়ে শুয়ে একাকী মনে বাধাবন্ধনহীনভাবে ভাবনার জগতে বিচরণ করছিলাম।কিন্তু তাও করতে পারলাম না।হঠাৎ করে পাশের বাড়ীর কুকুরটা ঘেউ ঘেউ করে উঠলো।এরপর ঘেউ ঘেউ শব্দটা সারা গ্রামের কুকুরদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লো। এক সময় ঘেউ ঘেউ থেকে সারা গ্রামজুড়ে কুকুররা ছন্দ শুরু করলো উ-উ-উ-উউ…সে এক ধরনের করুণ সুর।অনেকদিন পর কুকুরের এরকম করুণ ধ্বনি শুনতে পেলাম।কুকুরদের এরকম করুণ সুরে ফিরে গেলাম ছোটবেলার অনেক অতীতে। মনে পড়ছে ছোটবেলার সেই দুঃসময়ের অনেক কথা। সামরিক শাসনের কথা।

আমাদের দু’টো কুকুর ছিলো। একটা কালো। নাম হলো কালু। সে ছিলো খুব সাহসী।অন্যটা হলো লাল। নাম হলো লালু। লালু ছিলো একটু ভীতু ধরনের। কিন্তু ভীতু হলে কী হবে, পাহাড়ে চরম গন্ডগোলের সময় লালুই প্রথমে ঘেউ ঘেউ করে জানিয়ে দিতো আর্মিদের আগমণ বার্তা।লালুর ঘেউ ঘেউ শব্দের মধ্যে এক ধরনের টান ছিলো, সেটা শুনেই আমরা বুঝতে পারতাম আর্মি না অন্য কেউ আসছে।তখন ছোট ছিলাম। লালুর ‘অন্য ধরনের’ ঘেউ ঘেউ শব্দ শুনলে ভয়ে ঘরের ভিতর গিয়ে চুপচাপ করে বসে থাকতাম।মা-বাবার নির্দেশ থাকতো আর্মি আসলে চুপচাপ করে থাকতে হবে। কোন কান্নাকাটি বা দৌঁড়াদৌড়ি করা যাবে না। আর্মির ভয়ে  ‍কুঁকড়ে থাকতাম কখন কাকে কী করে বসে!তখন যুবকদের ঘরে থাকা নিরাপদ ছিলো না। জলপাই রঙের প্যান্ট পরা নিষেধ ছিলো। মনে পড়ছে, একদিন তো জলপাই রঙের প্যান্ট ছিলো বলে বড় ভাইকে আর্মিদের হাতে কতই না হেস্তনেস্ত হতে হয়েছিলো। ছাত্র হিসেবে পরিচয়পত্র ছিলো বলে মার খাওয়া থেকে কোনমতে রেহাই পেয়েছিলো।

আজ রাতের অন্ধকারে গ্রামের কুকুররা উ-উ-উ-উউ কান্না দিয়ে সে এক অন্যরকম আবহ সৃষ্টি করে ফেলেছে। মনটা খুব খারাপ লাগছিলো। মনে পড়ছে আমাদের সেই কালু ও লালুর কথা। তারা এখন ইহজগতে নেই। ২৫ বছর আগে শরণার্থী যাওয়ার সময় কালু ও লালুকে শুন্য ঘরে নীরবে ঘুমের মধ্যে পেছনে ফেলে রেখে গিয়েছিলাম। যেখানে নিজেদের জীবন বাঁচানো দায় ছিলো, সেখানে কীভাবে কালু ও লালুকে সঙ্গে নিয়ে যাই।তাছাড়া ওরা অবুঝ প্রাণী। পলায়নরত অবস্থায় বন-বাদারে তাদেরকে ঘেউ ঘেউ বা উ-উ-উ-উউ করা থেকে বিরত রাখা কোনভাবে সম্ভব হতো। আর তাদের ঘেউ ঘেউ বা উ-উ-উ-উউ কান্না পলায়নরত লোকজনের বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারতো। সে কারণে একান্তই নিজেদের মনের উপর অত্যাচার চালিয়ে চুপে চুপে কালু ও লালুকে ঘুমের মধ্যে ফেলে গিয়েছিলাম। আজ অনেক বছর পর গ্রামের কুকুরদের উ-উ-উ-উউ করুণ কান্না মনে করিয়ে দিচ্ছে কালু ও লালুর কথা। জানিনা, শুন্য ঘরে, জনমানবহীন গ্রামে কতদিন অনাহারে থেকে কালু ও লালুর মৃত্যূ হয়েছিলো। শুধু আমাদের কালু ও লালু নয়, গ্রামে আরো অনেক কুকুর ছিলো। সেই কুকুরগুলো কয়দিন না খেয়ে ছিলো সেকথা ভাবতেই মনটা হু হু করে উঠতে লাগলো। মনে খুব করে বেজে উঠতে লাগলো, কালু ও লালুও তো ঘেউ ঘেউ করে শত্রুদের আগমণ বার্তা আগে থেকেই জানিয়ে দিতো।আগাম সতর্কীকরণ করতো। তাদের ঘেউ ঘেউ’র কারণে তো অনেক শান্তিবাহিনী সদস্য ও কালেক্টর আর্মির কাছে ধরা খাওয়া থেকে বেঁচে গিয়েছিলো। জুম্ম জনগণের অধিকার আন্দোলনে কালু-লালুর মত অনেক কুকুরেরও তো আত্মত্যাগ ছিলো। লালু-কালুদের সেই অবদান কেউ কী কখনো স্মরণ করবে?মনটা খুব খারাপ হয়ে গেলো। সে এক অবর্ণনীয় নস্টালজিয়া পেয়ে বসলো আমাকে।

চোখের সামনে কত স্মৃতি ভেসে উঠতে লাগলো। শরণার্থী জীবনের দুঃসহ স্মৃতি মনে পড়তে লাগলো। স্টীলের থালায় শক্ত ও রসকষহীন দুর্গন্ধযুক্ত ভাত।কখনো এমন দিন গিয়েছিলো যেদিন একমুঠো ভাতের সাথে কেবল লবন আর লাল মরিচের বাটা জুটেছিলো।এভাবে শরণার্থী শিবিরে দিন কেটে গিয়েছিলো দীর্ঘ একযুগেরও বেশি সময়।শরণার্থী শিবিরে শক্ত শক্ত দু’মুঠো খেয়ে জীবন বাঁচিয়েছিলাম, কিন্তু কালু-লালুদের সেই শক্ত ভাতও জুটেনি। জনমানবহীন জনপদে অনাহারে মারা গিয়েছিলো। আজকে ভাবতে খুব কষ্ট লাগছে। চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগলো কালু-লালুদের কৌশলে চুরি করে ফেলে যাওয়ার স্মৃতি।এখন এ কাজটা খুব অমানবিক বলে মনে হচ্ছে।

আজকে গ্রামের কুকুরদের উ-উ-উ-উউ কান্না মনটাকে খুব ভারী করে দিলো। বিরস মনে শুয়ে শুয়ে “এক, দুই, তিন” করে গুণে গুণে মনটাকে একটু হালকা করার চেষ্টা করছিলাম। এমন সময় শুনতে পেলাম একজন লোক স্যান্ডেলের টাস্ টাস্ শব্দ করে উঠান দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। আর স্বগতোক্তির মত করে বলে যাচ্ছে, “মগদাউনর বাড়াবাজ্জ্যা হামানি থুম ন অব আর। অল্প বয়স্যা এক্কো গাবুজ্জ্যা মরদরে হুত্তুন ধুরি আনিলাক হিজেনি। হি গরন্দোই ভগবান জানে” (হারামজাদাদের বাঁদরামির কাজগুলো আর শেষ হবে না। কী জানি, অল্পবয়সী এক যুবককে কোথা থেকে ধরে নিয়ে এসেছে। ভগবান জানে, তার ভাগ্যে কী আছে)।

ঐ লোকটার কথা শুনে হঠাৎ সম্বিৎ ফিরে পেলাম। বুঝতে আর বাকী রইলো না কেন কুকুরগুলো ঘেউ ঘেউ করে উঠেছিলো। তারপর ঘেউ ঘেউ থেকে উ-উ-উ-উউ করে করুণ সুরে কান্না শুরু করে দিয়েছিলো সারা গ্রামজুড়ে। কুকুরের এই কান্না শুনে আজ এই অধম অডঙ্রের মনে আরো একটি প্রশ্ন জাগলো – মানুষ হিসেবে আমাদের রাজনৈতিক নেতারা কী তাহলে কালু-লালুর মত কুকুরদের চেয়েও অধম? আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের চেয়ে কী প্রভুভক্ত কুকুরা মানুষের দুঃখগুলো বুঝতে পারে? মনটা আরো খারাপ হয়ে গেলো।

এখানে ঐ লোকের নাম দেওয়ার প্রয়োজন নেই। তার কাছ থেকে যা জানা গেলো, তা হলো রাঙামাটির লেকের পাড় থেকে এক যুবককে ধরে নিয়ে টেক্সিতে করে কোন এক জায়গায় নামানো হয়েছে। আর গ্রামের ভেতর দিয়ে ঐ যুবককে কোন এক অজানা গন্তব্যে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ঐ যুবকের নাম ঠিকানা কী কেউ জানে না, কেউ চিনে না। তার ভাগ্যে কী ঘটবে তা বলাও কঠিন। রাতের অন্ধকারে এরকম ঘটনা ঘটানো হচ্ছে। কারোর জানার কথা নয়। আর কখনো পত্রিকায় এরকম ঘটনা প্রকাশিত হবে বলেও মনে হয় না। জানি না, পাহাড়ে এরকম আরো কত ঘটনা ঘটছে? কেউ কী এসব ঘটনার তদন্ত করবে?

আর এরকম অপহরণ ও খুনোখুনি ঘটনার কুশীলব কারা? অপ্রিয় হলেও চরম সত্য হলো জেএসএস বনাম ইউপিডিএফ।কে ভালো? জেএসএস নাকি ইউপিডিএফ? ভাবতে কষ্ট লাগছে, তারা নাকি জুম্ম জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে সংগ্রাম করে। কার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে তারা এসব অপহরণ ও খুনোখুনি করছে?

ভাদ্রমাসে কুকুরের উ-উ-উ-উউ কান্না আর সেই কান্নার সাথে অপহরণের সংবাদ মনটাকে খুব ভারী করে দিলো। কী করবো বুঝতে পারছিলাম না।এমন সময় বিদ্যূত চলে এলো।

আবার কম্পিউটার খুললাম। ফেসবুকে গেলাম।সিএইচটিবিডি’ গ্রুপের অপঠিত বার্তাগুলো প্রথমে চোখে পড়লো। কতজনের কত কিসিমের কথা। জেএসএস-ইউপিডিএফ-এর লোকজন বা সমর্থকদের কথা তো কী আর বলার আছে! জাতি প্রেম, দেশপ্রেম কেবল ওদের আছে।ইচ্ছে হলো, কড়া ভাষায় কিছু মন্তব্য দিই। না, পরক্ষণে নিজেকে সামলে নিলাম। শ্রদ্ধেয় বনভান্তের উপদেশবাণী মনে পড়লো। তার অমিয়বাণী “পরধর্ম চর্চা হতে বিরত থাকো”। এর অর্থ হলো, হিংসা, বিদ্বেষ, রাগ, মোহ ইত্যাদি হতে বিরত থাকতে পারলে পরম শান্তি পাওয়া যায়।জেএসএস-ইউপিডিএফ-এর লোকজন পরধর্ম চর্চা করে বলে তাদের মত আমারও করতে হবে কেন? “তুমি অধম হলে আমি উত্তম হইবো না কেন?” তাই ফেসবুক স্ট্যাটাসে আর কড়া ভাষায় কোন কিছু লিখতে পারলাম না।

নেতিবাচক চিন্তা বাদ দিয়ে ইতিবাচকভাবে কোন মন্তব্য ফেসবুকে লেখা যায় কী না তা ভাবতে লাগলাম।কিন্তু কিছুতেই ঐ লোকটার “মগদাউনর বাড়াবাজ্জ্যা হামানি থুম ন অব আর” (হারামজাদাদের বাঁদরামির কাজগুলো শেষ হবে না) কথাটা কানে বাজছিলো। শেষে মনে হলো, সন্ত লারমা ও প্রসিত খীসা এক হতে না পারলে জেএসএস-ইউপিডিএফ-এর বাঁদরামি শেষ হবে না।তাদের দু’জনকে পাশাপাশি দেখতে খুব মন চাই। বাস্তবে সেটা এখন সম্ভব না হলেও কল্পনা করতে অসুবিধা কী? ছবি এঁকে দেখাতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু ছবিও আঁকতে পারি না। তাই আমার ফেসবুক স্টাট্যাসে লিখলাম। স্ট্যাটাসের ভাষা ছিলো অনেকটা এরকম,

“কেউ কী একটা ছবি আঁকতে পারবেন সন্তু লারমা আর প্রসিত বি. খীসা কোলাকুলি করছেন।ফটোশপেও করা যাবে। দু’জনে কোলাকুলি করছেন – এরকম একটি ছবি দেখে দেখে লেখা লিখতে ইচ্ছে করছে”।

ব্যক্তিগতভাবে আমার যদিও কিছুই হয়নি, তারপরেও কোন তরুণ যুবকের অপহরণের ঘটনা শুনে মনটা খুব ভারাক্রান্ত হয়ে গেলো। চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগলো চিত্রটা কীভাবে ধরে নিয়ে যাচ্ছে ওরা। ওরা আর কেউ নয়, আমাদের জুম্মসমাজেরই লোক।শুধু লেবেল আঁটা আছে ওরা জেএসএস কর্মী ও ইউপিডিএফ কর্মী। মনের চোখে ভেসে উঠতে লাগলো, লাম্বা-বাদিতে বিভক্ত হয়ে শান্তিবাহিনীর লাম্বা গ্রুপের একদল সৈনিক কীভাবে আমাদের পাশের গ্রামের এক মুরুব্বিকে (তিনি জেএসএস প্রতিষ্ঠার পরে গ্রামপঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি ছিলেন, গ্রাম সংগঠক ছিলেন) কীভাবে আমাদের বাড়ীর ‘ইজরের’ (মূল বাড়ীর সাথে সংলগ্ন মাচার মত উঁচু প্লাটফর্ম) পাশ ঘেঁষে পিছমোড়া করে বেঁধে নিয়ে গিয়েছিলো। তখন ছোট বালক ছিলাম। সন্ধ্যাবেলায় ইজরে বসে হাওয়া খেতে খেতে সেই দৃশ্যটা দেখেছিলাম। লাম্বা-বাদির পরে এখন হলো জেএসএস-ইউপিডিএফ হয়েছে। ওরাও লাম্বা-বাদির মত পরস্পরকে খুন করছে, রাতের অন্ধকারে অপহরণ করছে, চাঁদাবাজি করছে, মুক্তিপণ আদায় করছে। মিলিটারিদের মত এরাও জঘন্য কাজ করছে। এসব কথা ভাবতেই মনটা আরো ভারাক্রান্ত হয়ে গেলো। অবশেষে অত্যন্ত ভারাক্রান্ত মনে ফেসবুকে স্ট্যাটাস লিখে ঘুমাতে গেলাম।

একদিন পরে ফেসবুক খুলে দেখি আমার দেওয়ালে একটা ছবি ট্যাগ করে দেওয়া হয়েছে। ফেসবুক বন্ধু আবালা চাকমা তা করেছেন। তিনি আমার স্ট্যাটাসের বার্তা অনুসারে সন্তু লারমা ও প্রসিত বি. খীসার মধ্যে কোলাকুলির ছবি দিয়েছেন (দেখুন ছবি ১)। ছবির জন্যে আবালাকে আগেভাগে ধন্যবাদ জানিয়ে রাখি।

ছবি ১ সন্ত লারমা ও প্রসিত বি. খীসা। সৌজন্যে আবালা চাকমা

ছবি ১ সন্ত লারমা ও প্রসিত বি. খীসা। সৌজন্যে আবালা চাকমা

ছবির নীচে বেশ কয়েকজনে মন্তব্য দিয়েছিলেন।তাদের মধ্যে ফেসবন্ধু শিবচরণ মন্তব্য করেছিলেন, “এক সময় তারা এরকম ছিলেন”। এছাড়া ইউপিডিএফ-এর এক সময়ের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড ও বর্তমানে সুইজারল্যান্ড প্রবাসী সঞ্চয় চাকমাও মন্তব্য দিয়েছিলেন। তিনিও জোর দিয়ে বলেছেন, জুম্মজাতির অস্তিত্ব রক্ষা করতে হলে ঐক্যের কোন বিকল্প নেই। তিনি আরো বলেন, শুধু অডঙ চাকমাদের কল্পনায় নয়, বাস্তবে কীভাবে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে তা নিয়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে।তার সাথে কোন দ্বিমত নেই।

পাঠকবন্ধুরা, এখন আপনারাই বলুন, এ ছবিগুলো দেখে আপনাদের কেমন অনুভূতি জাগছে?

তবে আমার মনে হয়েছিলো, প্রথম ছবিটা নিয়ে আরও কাজ করার দরকার ছিলো। কিন্ত আমি যে প্রযুক্তি ব্যবহারে বড় “সেদামপাঞ্জা” (অদক্ষ) সেটা কীভাবে বুঝাই (আশা করি বন্ধুবর সেদামপাঞ্জা চাকমা তার নামটা ব্যবহার করলাম বলে কিছু মনে করবেন না) । তাই ফেসবুকবন্ধু আবালা চাকমাকে আরো অনুরোধ করলাম ছবিটাকে আরো একটু বাস্তবভিত্তিক করা যায় কী না। যেই কথা সেই কাজ। আবালা চাকমা আমার অনুরোধ রেখেছিলেন। তিনি পরপর কয়েকটা ছবি পাঠিয়ে দিলেন। পাঠক বন্ধুরা আগে ছবিগুলো দেখে নিন। কোন প্রতিক্রিয়া থাকলে ফেসবুকের মাধ্যমে অথবা ব্লগের মাধ্যমে জানাতে পারেন।

ছবি ২ এসো গাই, চলো আমরা বদলে যাই…। সৌজন্যে আবালা চাকমা

ছবি ২ এসো গাই, চলো আমরা বদলে যাই…। সৌজন্যে আবালা চাকমা

ছবি ৩ রাজনৈতিক ক্লাশ। বিষয়ঃ পূর্ণস্বায়ত্তশাসন ও চুক্তিবাস্তবায়ন। সৌজন্যে আবালা চাকমা

ছবি ৩ রাজনৈতিক ক্লাশ। বিষয়ঃ পূর্ণস্বায়ত্তশাসন ও চুক্তিবাস্তবায়ন। সৌজন্যে আবালা চাকমা

ছবি ৪ ধঙে, কাকা, আর ছিনিমিনি খেলা নয়, চলো জনতার কথা শুনি সৌজন্যে আবালা চাকমা

ছবি ৪ ধঙে, কাকা, আর ছিনিমিনি খেলা নয়, চলো জনতার কথা শুনি

সৌজন্যে আবালা চাকমা

বন্ধুরা, আসুন এখন ছবির জগত থেকে বাস্তব জগতে ফিরে যাই। শুরুতে আমাদের কালু-লালু ও গ্রামের কুকুরদের কান্নার কথা বলেছিলাম। তারপর বলেছিলাম জেএসএস-ইউপিডিএফ-এর “বাড়াবাজ্জ্যা” কাজের কথা।কেন তাদের এই “বাড়াবাজ্জ্যা” (বাঁদরামি)কাজ? তাদের এই “বাড়াবাজ্জ্যা” কাজ দিয়ে কার লাভ? কবি ও ফেসবুক বন্ধু প্রতিভাস তার “তবুও স্বপ্ন বুনি” কবিতায় প্রশ্ন রেখেছেন,

“দুনিয়াজুড়ে হানাহানি, তা পাহাড়ে ভাইয়ে ভাইয়ে

বুঝি না বুঝতে চাও না, কী লাভ এই রক্তোক্ষয়ে?”

রক্তক্ষয় হচ্ছে, মানুষের জীবন ক্ষয় হচ্ছে, তবুও জেএসএস-ইউপিডিএফ-এর কোন হুঁশ হচ্ছে না। থেমে থেমে মারামারি করে, খুনোখুনি করে। ফেসবুকে চোখে পড়ে পড়ে জেএসএস-ইউপিডিএফ-এর অনেক নেতা, আন্ডানেতা ও সমর্থক তাদের মধ্যেকার এই “বাড়াবাজ্জ্যা” কাজকে আদর্শগত দ্বন্দ্ব হিসেবে চালিয়ে দিতে চান। এসব অস্পষ্ট বুলির মাধ্যমে মারামারি, খুনোখুনি ও অপহরণের মত জঘন্য কাজগুলোকে জায়েজ করতে চান। আসলে কী তাদের এই দ্বন্দ্ব আদর্শিক নাকি সম্পূর্ণ ভাঁওতাবাজী? পাঠকবন্ধুরা, তাহলে চলুন সন্তু লারমা ও প্রসিত বি. খীসার রাজনৈতিক ক্লাশে অংশগ্রহণ করি তারা জেএসএস ও ইউপিডিএফ সম্পর্কে কী বলেন। (রেফারেন্স হিসেবে ৩ নং ছবিটা আগে দেখে নিন)।

জেএসএস সম্পর্কে সন্তু লারমা’র লেকচার

পাঠকবন্ধুরা, মনে মনে কল্পনা করুন, আপনারা এখন সন্তু লারমার লেকচার শুনছেন। তিনি শুরু করেছেন এভাবেঃ জুম্মজনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জেএসএস ’৭২ সালে মানবেন্দ্র লারমার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয়…। তার কথার মধ্যে তাকে থামিয়ে দিয়ে ফেসবুক বন্ধু আবালা চাকমা প্রশ্ন করতে চাইলেন। বললেন, “এক্সকিউজ মি স্যার! আমি কী প্রশ্ন করতে পারি?”

সন্ত লারমাঃ লেকচার শুরু না করতে প্রশ্ন কেন?

আবালাঃ না, মানে স্যার…!

সন্তু লারমাঃ না, মানে কী?

আবালাঃ স্যার, আগে আমাদের কাছ থেকে প্রশ্ন নিয়ে যদি আপনার লেকচার শুরু করতে পারতেন?

সন্তু লারমাঃ তুমি কী বলতে চাচ্ছো?

আবালাঃ স্যার, না মানে…

সন্তু লারমাঃ মানে কী?

আবালাঃ স্যার, মানে… মানে…জেএসএস জুম্মজনগণের জন্যে কী রকম সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চায়? মানে, জেএসএস-এর চূড়ান্ত লক্ষ্য কী সে ব্যাপারে যদি আগে ধারনা দিতেন…।

সন্তু লারমাঃ বুঝছি, তুমি বসো।

এর মধ্যে অনেকে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, “হ্যাঁ স্যার, আবালার সাথে আমরা একমত। জেএসএস সম্পর্কে আমরা তেমন কিছু জানি না।পার্টির কর্ণধার হিসেবে জেএসএস আমাদের জুম্মজনগণের জন্যে কী রকম সমাজের স্বপ্ন দেখাতে চায় সে ব্যাপারে যদি আগে বলে আমাদের বুঝতে সুবিধা হবে”।

“আচ্ছা, ঠিক আছে”।এই কথা বলে সন্তু লারমা একজনকে দিয়ে গঠনতন্ত্রের একটা কপি আনালেন। গঠনতন্ত্র থেকে জেএসএস-এর মূল লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সম্পর্কে সন্তু লারমা পড়ে শোনাচ্ছেন।

জেএসএস-এর লক্ষ্য-উদ্দেশ্য হলোঃ

১. সমতাভিত্তিক শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করা;

২. পার্বত্য চট্টগ্রামের বহুভাষাভাষি ক্ষুদ্র জাতিসত্তাসমূহের মধ্যে ভেদাভেদ, নির্যাতন, শোষণ ও বঞ্চণা দূর করা;

৩. জুম্মজাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠা করা;

৪. সাংবিধানিক স্বীকৃতিসহ জুম্মজনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠা করা;

৫. পার্বত্য চট্টগ্রামের বহুভাষাভাষি জাতিসত্তাসমূহের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব রক্ষা করা;

৬. পার্বত্য চট্টগ্রামে অগণতান্ত্রিক ও সামন্ততান্ত্রিক নেতৃত্ব পরিহার করা এবং উগ্র জাতীয়তাবাদ, সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ, মৌলবাদ ও সম্প্রসারণবাদ প্রতিরোধ করা;

৭. সমাজে নারীদের সমান অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মুক্তিসংগ্রামে নারীদের সংগঠিত করা।

জেএসএস-এর আদর্শ ও নীতি

জেএসএস-এর মূল আদর্শ হলো মানবতাবাদ। আর এই আদর্শ পাঁচটি নীতির উপর প্রতিষ্ঠিতঃ

১. জাতীয়তাবাদ;

২. গণতন্ত্র;

৩. ধর্মনিরপেক্ষতা;

৪. সমতা; ও

৫. সামাজিক ন্যায়বিচার।

(তথ্যসূত্র হিসেবে জেএসএস-এর ওয়েবসাইট দেখুন http://www.pcjss-cht.org/aimsandobjectives.php)।

জেএসএস সম্পর্কে সারসংক্ষেপ ও কিছু প্রশ্ন

সন্তু লারমা জেএসএস লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও আদর্শ সম্পর্কে বক্তব্য দিয়ে মঞ্চ থেকে অন্য কাজে চলে গেলেন। তবে তার বক্তব্য সারসংক্ষেপ করলেন উবচুলো চাকমা এভাবেঃ

“এখানে সন্তু লারমা জেএসএস-এর সাতটি লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের কথা বলা হয়েছে। তাদের মধ্যে কোনটা চূড়ান্ত লক্ষ্য (কী রকম সমাজ ব্যবস্থা কাম্য) আর কোনটা আশু লক্ষ্য (যা নিকটতম সময়ে অর্জন করা যায়) সে ব্যাপারে স্পষ্টভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। তবে সময়ের দূরবর্তীতা আর নিকটবর্তীতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রথমটাই হলো জেএসএস-এর চূড়ান্ত লক্ষ্য। অর্থাৎ জেএসএস-এর চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো “সমতাভিত্তিক শোষণহীন” সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। এমন সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে মানবতাবাদের কথা বলা হয়েছে। জেএসএস-এর মানবতাবাদ পাঁচটি নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত, যেমন, জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র ধর্মনিরপেক্ষতা, সমতা ও সামাজিক ন্যায়বিচার।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, জেএসএস “সমতাভিত্তিক শোষণহীন” সমাজ বলতে কী বুঝাতে চায় এবং সমতাভিত্তিক শোষণহীন সমাজের মানদন্ডগুলো কী কী? কীভাবে সমতাভিত্তিক শোষণহীন জুম্মসমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে? জেএসএস-এর মূল কর্মসূচীগুলো কী কী? তাদের সেসব কর্মকান্ডে তাদের কথিত মানবতাবাদের পাঁচটি নীতি কীভাবে প্রয়োগ করা হয় কিংবা বাস্তবে তারা সেসব নীতি প্রয়োগ করেন কী?

ইউপিডিএফ সম্পর্কে প্রসিত বি. খীসার লেকচার

সন্তু লারমা চলে যাওয়ার পর ইউপিডিএফ প্রধান প্রসিত বি. খীসা মঞ্চে এলেন। মাথায় একটা ক্যাপ। তার বক্তব্যের পালা শুরু হলো। তিনি আঙুল উঁচিয়ে বক্তব্য দেওয়া শুরু করলেন। বললেন, “সংগ্রামী বন্ধুরা, আজকে জুম্মজাতি এক মহাসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে।কেন এই করুণ অবস্থা? এই করুণ অবস্থার পেছনে জেএসএস-এর “আপোসচুক্তি” দায়ী। জেএসএস জুম্মজাতির সাথে বেঈমানী করে চুক্তি স্বাক্ষর করে সরকারের কাছে আত্মসমর্পন করে…”। প্রসিত বাবু বাক্যটা শেষ করতে পারেননি। আবালা তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, “প্রসিত দা, আপনার কাছ থেকে এরকম উত্তেজক লেকচার শুনতে আসিনি। ইউপিডিএফ জুম্ম জনগণের জন্যে কী রকম সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করতে চায় সে ব্যাপারে শুনতে এসেছি।”

প্রসিত খীসাঃ লেকচার তো শুরুই করতে পারলাম না। আমাকে থামিয়ে দিলেন…

আবালাঃ না, মানে…দাদা, শুনেন, আপনি যা বলছেন সেসব তো অনেক শুনেছি। এখন শুনতে চাচ্ছি, আপনাদের ইউপিডিএফ-এর চূড়ান্ত লক্ষ্য বা রূপকল্প কী? মানে, আপনারা আমাদের জন্যে কেমন সমাজ ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেন, আর আপনাদের পার্টির নীতি-আদর্শ কী সেসব ব্যাপারে সুনির্দিষ্টভাবে বললে আমাদের বুঝতে সুবিধা হবে”।

প্রসিত খীসাঃ পার্টির জন্মের ইতিহাস না বললে তো আপনাদের জানা সম্পূর্ণ হবে না…

আবালাঃ না, না, প্রসিত দা, ইউপিডিএফ কখন, কীভাবে গঠিত হয়েছে সেসব ব্যাপারে তো অনেক কথা বলেছেন আপনাদের নেতারা… মানে, কিছু মনে করবেন না…রাজনীতির মঞ্চে যেভাবে গলাবাজি করে বক্তব্য দেন ঠিক সেরকম বক্তব্য নয়। শ্রেণী কক্ষে শিক্ষকরা যেভাবে ছাত্র-ছাত্রীদের পড়া বুঝিয়ে দেন, ঠিক সেভাবে আমাদের মত অশিক্ষিত জুম্মজাতিকে আপনার পার্টি ইউপিডিএফ-এর চূড়ান্ত লক্ষ্য কী,  জেএসএস-এর চেয়ে আপনারা জুম্ম জাতির জন্যে ভিন্ন কিছু কী কী দিতে চাচ্ছেন, আপনাদের পার্টির লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও আদর্শ কী – এসব ব্যাপারে যদি আগে বলতেন, তাহলে আমাদের বুঝতে সুবিধা হবে।

প্রসিত খীসাঃ ওহ! বুঝছি।

এরপর প্রসিত বি. খীসা তার পকেট থেকে ছোট্ট একটা লাল নোটবুক বের করলেন। তারপর ইউপিডিএফ সম্পর্কে লেকচার শুরু করলেন।

ইউপিডিএফ-এর লক্ষ্য-উদ্দেশ্যঃ

ইউপিডিএফ-এর লক্ষ্য-উদ্দেশ্য হলো “পূর্ণস্বায়ত্তশাসন কায়েমের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল জাতিসত্তার অস্তিত্ব রক্ষা করা এবং শোষণ-নির্যাতনমুক্ত গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। অর্থাৎ ইউপিডিএফ-এর চূড়ান্ত লক্ষ্য হলোঃ ‍

১. পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল জাতিসত্তার অস্তিত্ব রক্ষা করা; এবং

২. শোষণ-নির্যাতনমুক্ত গণতান্ত্রিক সমাজ।

ইউপিডিএফ-এর কর্মনীতি ও পদ্ধতি (principle and style of work)

ইউপিডিএফ তার সকল কর্মকান্ডে নিম্নোক্ত নীতিগুলো অনুসরন করবে

১. সকল জাতির মধ্যে সমতা;

২. নারী পুরুষের মধ্যে সমতা;

৩. অসাম্প্রদায়িকতা; ও

৪. গণতান্ত্রিক আদর্শ

প্রসিত খীসা আরো বললেন, ইউপিডিএফ দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও অখন্ডতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে। অর্পিত শত্রু সম্পত্তি আইনসহ যে কোন কালাকানুন বাতিলের দাবী জানাবে। এছাড়া দলের কার্যক্রম চালাতে গিয়ে তারা পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল বাসিন্দার সুনির্দিষ্ট বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রচেষ্টা চালাবে। দেশে সকল নাগরিকের অধিকার ও গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে তারা অন্যান্য গণতান্ত্রিক দলগুলোর সাথে কাজ করবে (তথ্যসূত্র: ইউপিডিএফ-এর ওয়েবসাইট: http://www.updfcht.org/menifesto.html)।

ইউপিডিএফ সম্পর্কে সারসংক্ষেপ ও কিছু প্রশ্ন

প্রসিত খীসাও তার বক্তব্য শেষ করে তাড়াতাড়ি মঞ্চ ছেড়ে চলে গেলেন।কারণ, তারও অন্য জরুরী কাজের তাড়া আছে। তাই নোনাহাজি হেডম্যান জনভীড় ঠেলে এসে উপস্থিত সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে প্রসিত খীসার বক্তব্যের সারসংক্ষেপ তুলেন ধরলেন আর কিছু প্রশ্ন রাখলেন। তিনি বললেন এভাবেঃ

“প্রসিত বি. খীসার কথা অনুসারে ইউপিডিএফ চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল জাতিসত্তার অস্তিত্ব রক্ষা করা এবং শোষণ-নির্যাতনমুক্ত গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। এ লক্ষ্য অর্জনের মাধ্যমে হিসেবে “পূর্ণস্বায়ত্তশাসন”-এর কথা বলছেন। সন্দেহ নেই,  তাদের পার্টির লক্ষ্য হলো আদর্শিক (idealistic) বা কাংখিত।

কিন্তু কিছু প্রশ্ন রয়ে গেছে। ইউপিডিএফ “জাতিসত্তার অস্তিত্ব রক্ষা” আর “শোষণ-নির্যাতনমুক্ত গণতান্ত্রিক সমাজ” বলতে কী বুঝাতে চাচ্ছে? কী কী শর্ত বা মানদন্ড থাকলে পরে বুঝবো “জাতিসত্তার অস্তিত্ব রক্ষা” হবে? কীভাবে “শোষণ-নির্যাতনমুক্ত গণতান্ত্রিক সমাজ” প্রতিষ্ঠিত হবে?

“পূর্ণস্বায়ত্তশাসন” বলতে ইউপিডিএফ কী বুঝাতে চাচ্ছে? পূর্ণস্বায়ত্তশাসন-এর রূপরেখা বা ক্ষমতার পরিধি কী রকম হবে? তাদের “পূর্ণস্বায়ত্তশাসন” প্রতিষ্ঠা করতে দলের কী কী কর্মসূচী এবং কৌশল কী কী আছে? ইউপিডিএফ যে চারটি নীতির কথা বলেছে, সেগুলো তাদের কাজে কর্মে কীভাবে প্রয়োগ করা হয় কিংবা আদৌ প্রয়োগ করা হয় কী? বাস্তব কোন উদাহরণ দেখাতে পারবেন কী কোথায় কীভাবে তারা তাদের নীতিগুলোর সফল প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন?

এ লেখার শেষ প্রশ্নঃ জেএসএস-ইউপিডিএফ-এর মধ্যে মৌলিক কোন পার্থক্য আছে কী? তারা তাদের নীতি-আদর্শ মানে কী?

পাঠক বন্ধুরা, আপনারা জেএসএস প্রধান সন্তু লারমা ও ইউপিডিএফ প্রধান প্রসিত খীসার লেকচার থেকে তাদের পার্টির মূল লক্ষ্য ও নীতি আদর্শ সম্পর্কে জানলেন। এখন আপনারা দেখুন, দুই দলের মধ্যে কোন মৌলিক পার্থক্য আছে কী? তাদের গঠনতন্ত্র অনুসারে, জেএসএস-এর মূল লক্ষ্য হলোঃ সমতাভিত্তিক শোষণহীন সমাজ (জোর দেওয়া হয়েছে) প্রতিষ্ঠা করা। আর ইউপিডিএফ-এর মূল লক্ষ্য হলোঃ সকল জাতিসত্তার অস্তিত্ব রক্ষা করে শোষণ-নির্যাতনমুক্ত গণতান্ত্রিক সমাজ (জোর দেওয়া হয়েছে)। লক্ষ্য করুন, জেএসএস “সমতাভিত্তিক শোষণহীন” বিশেষণ ব্যবহার করেছে আর ইউপিডিএফ ব্যবহার করেছে “শোষণ-নির্যাতনমুক্ত”।দুই দলের আকাংখার মধ্যে কোন মৌলিক পার্থক্য আছে কী?

এখন তাদের নীতি-আদর্শ লক্ষ্য করুন। জেএসএস-এর আদর্শ মানবতাবাদ। এই মানবতাবাদ পাঁচটি নীতি – “জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, সমতা ও সামাজিক ন্যায়বিচার” –এর উপর প্রতিষ্ঠিত। খুব সুন্দর কথা। অন্যদিকে, ইউপিডিএফ-এর নীতি হলো “সকল জাতির মধ্যে সমতা; নারী পুরুষের মধ্যে সমতা; অসাম্প্রদায়িকতা; ও গণতান্ত্রিক আদর্শ”এগুলোও সুন্দর কথা। দু’দলই গণতন্ত্র মানে, অসাম্প্রদায়িকতায় বিশ্বাস করে, সামাজিক ন্যায্যতায় বিশ্বাস করে।

দেখা যাচ্ছে, দু’দলের মূল লক্ষ্য, আদর্শ ও নীতি বিশ্লেষণ করলে তাদের মধ্যে মৌলিক কোন পার্থক্য নেই। শুধু ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় তাদের মৌলিক আকাংখাগুলো ব্যক্ত করা হয়েছে মাত্র। তাহলে তাদের মধ্যেকারে দ্বন্দ্বকে কেন আদর্শগত দ্বন্দ্ব বলা হচ্ছে? আদর্শের দোহাই দিয়ে কেন খুনোখুনি, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, মারামারি ইত্যাদি জঘন্য কাজ করছে জেএসএস-ইউপিডিএফ? কেনই বা জেএসএস-ইউপিডিএফ-এর লোকজন, নেতা ও আন্ডানেতারা প্রশ্নহীনভাবে নিজেদের পার্টির অন্যায়গুলোকে মেনে নিচ্ছেন?

শেষ কথা

আরো অনেক কথা বলা যায়, অনেক প্রশ্ন করা যায়। লেখাটা অনেক লম্বা হয়ে যায়। তাই লেখা শেষ করার আগে, আবারো আমাদের কালু-লালুর কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। পার্বত্য চট্টগ্রামের কেবল অধিকারহারা জুম্ম জনগণ নয়, তাদের সাথে কালু-লালুর মত অনেক পশু-পাখীকেও জীবন দিতে হয়েছিলো অনাহারে, অর্ধাহারে। প্রভুভক্ত কালু-লালুরা দুর্যোগের ঘনঘটা দিনেও তাদের ঘেউ ঘেউ শত্রুবাহিনী মিলিটারিদের আগমণ বার্তা জানিয়ে দিতো। আজকে পাহাড়ের জনপদে রাতের অন্ধকারে জেএসএস-ইউপিডিএফ-এর ধাওয়া-ধাওয়ি ও অপহরণের ঘটনায়ও কালু-লালুর উত্তরসূরীরা ঘেউ ঘেউ করে সতর্ক বার্তা দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এ অপহরণকারীরা আর অন্য কেউ নয়, আমাদের জুম্ম ভাইবোন – জেএসএস ও ইউপিডিএফ। জুম্মভাইবোনের অকালমৃত্যু দেখে কালু-লালুর মত কুকুররা আজও উ-উ-উ-উউ সুরে অন্তহীন বেদনায় কান্না করে। মনে হয়, জেএসএস ও ইউপিডিএফ-এর লোকজনের মধ্যে সেই মানবিক অনুভূতি হারিয়ে গেছে। আদর্শ, নীতি কিংবা “আত্মরক্ষার” দোহাই দিয়ে কেন এই ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত? জেএসএস ও ইউপিডিএফ-এর লোকজন কোন আদর্শের কথা বলছেন? আপনাদের গঠনতন্ত্রে উল্লেখিত নীতি-আদর্শগুলোকে কী মানুষ হত্যার অনুমতি দেয়? আর কত প্রশ্ন করবো!

নীতি আদর্শ যদি না মানেন, তাহলে সেগুলো গঠনতন্ত্রে লিখলেন কেন? যারা কথা ও কাজে সৎ নয়, তাদের কী বলা হয়? কার স্বার্থে এত অন্যায়, জঘন্য কাজ?

ফেসবুক বন্ধু ও কবি প্রতিভাস চাকমার মত আমিও জেএসএস-ইউপিডিএফকে প্রশ্ন করি, “বুঝি না, বুঝতে চাও না, কী লাভ এই রক্তোক্ষয়ে?” দুই দলের প্রধান সন্তু লারমা ও প্রসিত খীসা কী একসঙ্গে সুর ধরতে পারেন না, “চলো, আমরা বদলে যাই”।

অডঙ চাকমা, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১১

————————–

কৃতজ্ঞতাস্বীকার

ছবির জন্যে ফেসবুকবন্ধু আবালা চাকমার কাছে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করছি।

দুঃখ প্রকাশঃ লেখার প্রয়োজনে কয়েকজনের নাম এখানে উল্লেখ করেছি। আশা করি, তারা বিষয়টা অন্যভাবে নেবেন না।

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/1462

আদিবাসী, পূর্বতিমুর ও দক্ষিণ সুদানঃ আর কত রঙ্গ দেখাবেন বাঙাল এলিটরা?

মুক্তমনায় গত ২৯ আগস্ট নি:সঙ্গ বায়সের “প্রসঙ্গ আদিবাসী: কিছু প্রশ্নের উত্তর খোঁজা….” (http://mukto-mona.com/bangla_blog/?p=18389)  শিরোনামে একটা লেখা চোখে পড়লো। লেখার জন্যে লেখককে অনেক। লেখকের লেখার উপর বেশি কিছু দেখতে পাইনি। তারপরও তার লেখার সাথে কিছু বিষয় যোগ করার ছিলো। সেগুলো নিচে তুলে ধরা হলো।

আদিবাসী প্রসঙ্গে

আদিবাসী কারা – এ ব্যাপারে সংজ্ঞা খুঁজা অনর্থক। বাংলাদেশ সরকার তথা তথাকথিত বাঙালি সুশীল সমাজের একটা বড় অংশ এ অপ্রয়োজনীয়ভাবে বিতর্ক টেনে এনেছেন বা কুটতর্ক করতে চাচ্ছেন। “আদিবাসী” ধারণা নিয়ে তাত্ত্বিক আলোচনায় যাওয়ার প্রয়োজন নেই। কারা আদিবাসী আর কারা আদিবাসী নয়, সংশ্লিষ্ট জনগণই ঠিক করবে। সরকার বা কারোর অন্য কাউকে জোর করে পরিচিতি চাপিয়ে দেওয়া ঠিক নয়।বরং কারোর উপর জোর করে পরিচিতি চাপিয়ে দেওয়াটা অনধিকার চর্চা, যেই চর্চাটা সরকার বা তথাকথিত বাঙালী বুদ্ধিজীবিদের বড় অংশ করতে চাচ্ছেন।

এখানে আরো একটা কথা বলা ভালো, যারা এখন “আদিবাসী”, “উপজাতি” ইত্যাদি নিয়ে আবোল তাবোল বকছেন, আর আদিবাসী স্বীকৃতি দিলে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ক্ষুন্ন হবে ইত্যাদি যুক্তি দাঁড়  করাতে চাচ্ছেন, তাদের উদ্দেশ্য কখনো সৎ ছিলো না, এখনো নেই। বরং তারা শব্দগত ধাঁধা বা শব্দ নিয়ে ভেলকিবাজী খেলতে চাচ্ছেন।কয়েকটা উদাহরণ দিলে বিষয়টা পরিস্কার হয়ে যাবে।

১) আদিবাসী শব্দটি বাংলাদেশে নতুন নয়। অনেক আগে থেকেই বিভিন্ন আইনে আদিবাসী শব্দ ছিলো এবং এখনো বাংলাদেশে প্রচলিত আইনে লেখা আছে। যেমন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি ১৯০০’, ‘বঙ্গীয় প্রজাসত্ত্ব আইন ১৯৫০’, ও আয়কর সংক্রান্ত আইন। আয়কর আইনের আওতায় পাহাড়ের মানুষকে পার্বত্য অঞ্চলে আয়কর দিতে হয় না। এসব আইনে indigenous hillmen ও aboriginals লেখা আছে। এসব শব্দের বাংলা অনুবাদ “আদিবাসী” লেখা হয়।

২) বাংলাদেশের সমগ্র তথাকথিত “উপজাতি”দের আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও বাঙালরা বহিরাগত হয়ে যাবে না। কারণ, জনবল, ধনবল, রাষ্ট্রক্ষমতা সব বাঙালদের হাতে। অর্থাৎ পুরো রাষ্ট্রক্ষমতা বাঙালদের হাতে। কাজেই আদিবাসীরা তাদের ক্ষীণ বল নিয়ে বাঙালদের রাষ্ট্র থেকে কিছু একটা খাবলে ছিনিয়ে নিতে পারবে – এমন ধারনা যারা নিজের মধ্যে পোষণ করেন, তাদের মধ্যে মানসিক সুষ্ঠুতা বা মানব উপযোগী যৌক্তিকতা (human rationality) আছে কী না বড়ই সন্দেহ হয়। মানুষকে যে যুক্তিবাদী প্রাণী বলা হয়, তারা সেই বর্গের মধ্যে তারা পড়ে কী না তা নিয়েও সন্দেহ জাগে।

৩) বিভিন্ন অজুহাতে যারা আদিবাসী মানতে নারাজ তাদের উছিলার শেষ নেই। তারা আসলে “আদিবাসী”, “উপজাতি” বা অন্য কোন দাবী মানেন না বাঙালদের দাবী ছাড়া। এ বিষয়টা ঐতিহাসিকভাবে পরিস্কার। যেমন, দেখুন ১৯৭২ সালে জেএসএস-এর প্রতিষ্ঠাতা ও তঃকালীন সংসদ সদস্য (বলা যায় একমাত্র বিরোধীদলীয় সদস্য) এম এন লারমা যখন সংসদে দাঁড়িয়ে “উপজাতি” হিসেবে সংবিধানে স্বীকৃতি চাইলেন, তখন বাঙালি নেতারা এম.এন লারমাকে তিরস্কার করেছিলেন। তারা “উপজাতি” মানতে রাজী ছিলেন না। শেখ সাহেব ও তার দলের নেতারা (বর্তমান সংসদ উপনেতা সাজেদা চৌধুরীও ছিলেন) এম এন লারমাকে বললেন, “তোরা উপজাতি না। তোরা বাঙালি জাতির অংশ।মানে সবাই “বাঙালি”। এম.এন লারমা বোঝাতে চাইলেন, “আমরা বাঙালি নয়, বাপ দাদা চৌদ্দপুরুষ কেউ বলেনি আমরা বাঙালি”।তিনি জোর দিয়ে বললেন, “আমরা বাংলাদেশী”। একথা বলাতে তৎকালীন আওয়ামীলীগের নেতারা এম.এন লারমাকে সংসদে তুলো ধুনো করেছিলেন। এক এমপি তো (বর্তমান পাটমন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী) রীতিমত অসৌজন্যমূলকভাষায় সংসদে এম.এন লারমাকে হুমকি দিয়েছিলেন।

এম. এন লারমার সেই “উপজাতি” হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার দাবী তৎকালীন নেতারা মানেননি। শেখ সাহেব রাঙামাটির এক সভায় বলেছিলেন, “আজ থেকে তোমাদের উপজাতি থেকে [বাঙালি] জাতিতে প্রমোশন দেয়া হল”। সংবিধানে এরকম অনুচ্ছেদ অন্তর্ভুক্ত করে তা পুরোপুরি পাকাপোক্ত করার ব্যবস্থা করা হয়।

এরপর এম.এন লারমা জেএসএস নামক রাজনৈতিক দল গঠন করে জুম্মজাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে পাহাড়ী জনগণকে সংগঠিত করলেন। জুম্ম হিসেবে স্বীকৃতির দাবী করলেন। বলে রাখা ভালো, জুম্ম শব্দটা চট্টগ্রাম অঞ্চলের বাঙালরা গালি হিসেবে ব্যবহার করতো।এই গালি যখন আত্মপরিচিতির একটা ভিত্তি পেলো তখন বাঙাল রাষ্ট্রের নেতারা কী বললেন? বাঙাল নেতারা ও তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা ধুঁয়া তুলতে লাগলেন, “না, জুম্ম হলো চাকমা শব্দ। আর এ শব্দের কোন ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। তাছাড়া জুম্ম শব্দটি একটি সেকেলে ও আদিম চাষ পদ্ধতি থেকে নেওয়া হয়েছে। কাজেই পাহাড়ের মানুষ “জুম্ম” হিসেবে পরিচিতি পাবে সেটা মেনে নেওয়া যায়। তাদেরকে আমেরিকার রেড ইন্ডিয়ানদের মত খোঁয়াড়ে আবদ্ধ রাখা হবে। এটা “আধুনিক” বাংলাদেশ রাষ্ট্রে সম্ভব হতে পারে না। দেখুন তো কী যুক্তি!

বেশ বাঙালরা “উপজাতি” মানে না, “জুম্ম”ও মানে না। তাহলে কী মানে? শেষমেশ ’৯০-এ এসে পাহাড় ও সমতলের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপিত হতে লাগলো। ক্রমে সেটা আরো সুদৃঢ় হতে লাগলো। সাংগঠনিক কাঠামোর মধ্যে এসে জড়ো হতে লাগলো। বিভিন্ন সংগঠন হতে লাগলো। সমতলের লোকরা নিজেদের আদিবাসী বলে পরিচয় দিতে পছন্দ করে। অন্যদিকে পাহাড়ের লোকজন পাহাড়ী বা জুম্ম হিসেবে পরিচয় দিতে পছন্দ করে। কিন্ত একটা জায়গায় একটু সমস্যা দেখা দিচ্ছিলো। ‘আদিবাসী’ বললে পাহাড়ের লোকজন বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম কেমন কেমন করতো, অন্যদিকে ‘পাহাড়ী’ বা ‘জুম্ম’ বললে সমতলের লোকজন বাদ পড়ে যায়। কিন্তু একত্রিত হওয়ার তো একটা জায়গা লাগবে। শেষমেশ পাহাড়ের নেতারা দেখলো, আদিবাসী বা indigenous বা aboriginals শব্দ তো অনেক আগে ছিলো। কাজেই আদিবাসী পরিচিতির মধ্যে কোন আপত্তি থাকার কথা নয়। আদিবাসী শব্দটা পরে সবার গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে গেলো। আদিবাসী ব্যানারে বাংলাদেশের সকল তথাকথিত “উপজাতিরা” একত্রিত হতে লাগলো। এক স্বরে “আদিবাসী” হিসেবে সংবিধানে স্বীকৃতির দাবী জানাতে লাগলো। এই ন্যায্য দাবীর প্রতি দেশে বিদেশে ব্যাপক সমর্থন পাওয়া গেলো। এখনো আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে।

এই “আদিবাসী” দাবী যখন জোরালো হলো, তখন বাঙাল নেতারা, আমলা-সেনাতন্ত্র ও বাঙাল বুদ্ধিজীবিদের একটা অংশ বলতে লাগলো, “ওরা আদিবাসী হবে কেন? আমরাই আসল আদিবাসী। ওরা তো বাইরে থেকে এদেশে এসেছিল অর্থনৈতিক অভিবাসী হিসেবে”। বেশ, আর কী করা! এখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী থেকে শুরু করে সরকারে প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত আদিবাসী মানেন না। সরকারীভাবে বলা হচ্ছে, “বাংলাদেশে আদিবাসী নেই, যারা আছে সবাই উপজাতি”। হা! হা! ‘উপজাতি’ হিসেবে যদি এখন মানেন তাহলে ‘৭২ সালে মানেননি কেন? তখন ‘উপজাতি’ থেকে বাঙালি জাতিতে প্রমোশন দিতে চাইলেন কেন?

এসব উদাহরণ থেকে এখন আপনারাই বলুন, বাঙাল নেতারা বা বাঙালরা আসলে কোন শব্দটা মানেন? “উপজাতি”, না “আদিবাসী”? [অবশ্য সরকার আরো একটি শব্দের প্রতি স্বীকৃতি দিয়েছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী। এই শব্দটা যদি আগে থেকে “উপজাতিরা” গ্রহণ করতো তাহলে কী সরকার মেনে নিতো? ]

পূর্ব তিমুর ও দক্ষিণ সুদান প্রসঙ্গে

“সাম্প্রতিক অনেক ঘটনা দেখেই আমি একটু চিন্তিত আসলে আমেরিকা-জাতিসংঘের পলিসি কি?! সুদান-দক্ষিন সুদানের ঘটনাটাই দেখুন…”

ইদানিং অনেককে দেখতে পাচ্ছি, পূর্ব তিমুর ও দক্ষিণ সুদানের সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামকে তুলনা করতে। তার মধ্যে আছেন এক সময়ের কুখ্যাত সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব:) সৈয়দ ইব্রাহিম। তার কথার প্রতিধ্বনি মাঝেমাঝে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিরপাত্তা সংক্রান্ত সভা থেকেও বের হয়। বুঝতে অসুবিধা হয় না, কারা ঐসব যুক্তি হাজির করছে। সে যা হোক, কেউ পার্বত্য চট্টগ্রামকে পূর্ব তিমুর ও দক্ষিণ সুদানের সাথে তুলনা করে ব্যক্তিগতভাবে আমার বেশ ভালো লাগে। কেননা, ঐসব কথাবার্তা থেকে বাঙাল এলিটদের পার্বত্য চট্টগ্রামের ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গি খুঁজে পাওয়া যায়। আপনার মত, আমারও প্রশ্ন জাগে পার্বত্য চট্টগ্রামকে পূর্ব তিমুর ও দক্ষিণ সুদানের সাথে তুলনা করলে কার লাভ হবে? কার স্বাথে এই তুলনা? ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এ তুলনা দিয়ে কিছু সময়ের জন্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করা যায়, মানুষকে বিভ্রান্ত করা যায়, কিন্তু সেখানে সমাধানের সূত্র ‍খুঁজে পাওয়া যায় না। আর পার্বত্য চট্টগ্রামকে পূর্ব তিমুর ও দক্ষিণ সুদানের সাথে তুলনা করাও বাঙাল এলিটদের একধরনের ন্যাকামি, যার মাধ্যমে তারা দেখাতে করতে চায় তারা অনেককিছু জানে। আসলে তাদের জানার মধ্যে কত গোঁজামিল আছে তা তারা জানেন না।

তাদের জানা উচিত, পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে দক্ষিণ সুদান ও পূর্ব তিমুরের ইতিহাস সম্পূর্ণ ভিন্ন। লম্বা ইতিহাস অবতারণা করার সুযোগ এখানে নেই। সোজাসরল ভাষায় বললে, পূর্ব তিমুর কখনো ইন্দোনেশিয়ার অংশ ছিলো না। যে ভূ-খন্ড নিজের নয়, সেখানে ইন্দোনেশিয়া কীভাবে, কতদিন সেখানে জোর-জবরদস্তি করে শাসন করবে? সোজা ইতিহাস। পূর্ব তিমুর পর্তুগীজদের কলোনি ছিলো। ষোড়শ শতাব্দী থেকে। বে-উপনিবেশিকরণ প্রক্রিয়া হিসেবে পর্তুগীজরা পূর্ব তিমুর ছেড়ে চলে যায় এবং ১৯৭৫ সালে পূর্ব তিমুরের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়। এতে প্রতিবেশি রাষ্ট্র ইন্দোনেশিয়া শংকিত হয়ে উঠে। পূর্ণমাত্রায় সামরিক অভিযান চালিয়ে ইন্দোনেশিয়া জোর করে পূর্ব তিমুর দখল করে নেয়। সেই থেকে শুরু হয় দমনপীড়ন। পূর্ব তিমুরের জনগণ তাদের ন্যায্য সংগ্রাম চালিয়ে যেতে থাকে। এখানে শাসন করার নৈতিক ও আইনি কর্তৃত্ব ইন্দোনেশিয়ার কখনো ছিলো না। ৭৫ থেকে ৯৯ সাল পর্যন্ত ইন্দোনেশিয়া পূর্ব তিমুর শাসন করতে পেরেছিলো তার পেছনে বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি তার অনুকূলে ছিলো। এতদিন আমেরিকার সমর্থন ইন্দোনেশিয়ার পেছনে ছিলো। সে কারণে পূর্ব তিমুরের জনগণকে স্বাধীনতা পেতে অনেক ত্যাগ করতে হয়েছিলো। কিন্তু ৯০-এ এসে স্নায়ুযুদ্ধের অবসান হলে পূর্ব তিমুরের ইস্যূতে আমেরিকার আগ্রহ কমে যায়। ফলে জাতিসংঘ সেখানে জাতিসংঘ সনদ ও আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে পূর্ব তিমুরের ইস্যূ নিয়ে কাজ করতে সুবিধা হয়। আর জাতিসংঘের সদস্য হিসেবে ইন্দোনেশিয়ার জাতিসংঘ সনদ ও আন্তর্জাতিক আইন না মানার কোন উপায় ছিলো না। এখানে ইন্দোনেশিয়ার দয়া-মায়ার উপর নয়, পূর্ব তিমুরের জনগণ স্বাধীনভাবে গণভোটের মাধ্যমে তাদের ভবিষ্যত তারাই নির্ধারণ করেছিলো।

অন্যদিকে দক্ষিণ সুদানের জনগণও স্বাধীনভাবে গণভোটের মাধ্যমে স্বাধীনতা বেছে নিয়েছিলো। উত্তর সুদানের দক্ষিণ সুদানের উপর বৈধ কর্তৃত্ব কখনো ছিলো না। এখানেও জবরদস্তি করে দক্ষিণ সুদানকে “সুদানের” সাথে একীভূত করা হয়েছিলো। তাদের ইতিহাসও অনেক লম্বা। উত্তর সুদানের জনগণ বা নেতারা কখনো দক্ষিণ সুদানের জনগণের সাথে ভালো ব্যবহার করেনি। সে অনেক বিষয়।সুদানও কলোনী ছিলো। অনেক হাত বদল হয়েছিলো। তুর্কি-মিশরীয়দের দখলের পূর্ব পর্যন্ত অর্থাৎ১৮২১ সাল পর্যন্ত সুদান বলে কোন রাষ্ট্র ছিলো না। তখন বিভিন্ন রাজা ও গোত্র প্রধানদের অধীনে বর্তমান অবিভক্ত সুদানের বিভিন্ন অংশ শাসিত হতো। তুর্কি-মিশরীয়দের দখলে আসার পর তারা ক্ষমতা সুসংহত করার চেষ্টা করে। সেই সময়ে তুর্কি-মিশরীয় উপনিবেশিকদের মূল আকর্ষণ ছিলো শ্রমদাস, সোনা, হাতির দাঁত ও কাঠ সংগ্রহ করা। দক্ষিণ সুদান থেকে আরব বিশ্বসহ বিভিন্ন জায়গায় দাস পাঠানোর ক্ষেত্রে উত্তর সুদানের জনগণ উপনিবেশিকদের সাথে হাত মিলিয়েছিলো। এক কথায়, উত্তর সুদানের জনগণ রাজাকার ছিলো। সেই থেকে সংঘাত শুরু।

এরপর আসে ব্রিটিশ উপনিবেশিকরা ১৮৯৮ সালে। তারা মিশরীয়দের সাথে সন্ধি করে। ব্রিটিশ-মিশরীয় উপনিবেশিকরা যৌথভাবে ১৮৯৮ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত যৌথভাবে সুদানকে শাসন করে। তবে ব্রিটিশরা আসার পর উত্তর-দক্ষিনের জন্যে আলাদা শাসনব্যবস্থা কায়েম করে।দক্ষিণ সুদানের জন্যে ব্রিটিশরা “বন্ধ দরজা নীতি” (closed door policy) গ্রহণ করে। এর পেছনেও অনেক কারণ ছিলো। উত্তর-দক্ষিণ সুদানের মধ্যে ভৌগলিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় দিকে থেকে অনেক পার্থক্য ছিলো। ধর্মের দিক থেকে দক্ষিণ সুদানের জনগণের বিরাট অংশ খ্রীস্টান। তবে ব্রিটিশদের “বন্ধ দরজা নীতি”র কারণে দক্ষিণের জনগণ সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলো, তারা অনেক দিক থেকে পিছিয়ে পড়ে।

অন্যদিকে ব্রিটিশরা উত্তর সুদানে তাদের শাসনকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে। সকল প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কর্মকান্ডের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠে উত্তর সুদান। উত্তর থেতে দক্ষিণকে পরিচালনা করতে থাকে।

অবশেষে ব্রিটিশরা ১৯৫৬ সালে সুদান থেকে তাদের উপনিবেশ প্রত্যাহার করে নেয়। সুদানকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করে এবং সমস্ত ক্ষমতা উত্তর সুদানের নেতাদের হাতে বুঝিয়ে দিয়ে যায়। ফলে এ স্বাধীনতায় দক্ষিণের কোন লাভ হয়নি। দক্ষিণ সুদানের জনগণ ব্রিটিশদের এ কাজকে চরম বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে আখ্যায়িত করে।তারা এ স্বাধীনতাকে কেবল প্রভু পরিবর্তন হিসেবে বিবেচনা করেছিলো। স্বাধীনতার শুরু থেকেই ক্ষোভ দানা বেঁধে উঠে।

অন্যদিকে উত্তর সুদানের এলিটরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় গিয়ে দক্ষিণের বিষয়গুলোকে পাত্তা দেয়নি। রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে তারা বহুভাষিক, বহু সাংস্কৃতিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কোন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে পারেনি বা করেনি। কাজেই সুদানের রাষ্ট্রীয় সংহতি ও ঐক্য কখনো সুদৃঢ় হয়নি। বরং উত্তর সুদানের এলিটরা দমনপীড়নের মাধ্যমে ও দক্ষিণ সুদানের উপরও ইসলামি ব্যবস্থা চাপিয়ে দিয়ে দেশ শাসন করার চেষ্টা করেছিলো। এভাবে ক্ষোভ এক সময় গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়।

বিশ বছরের গৃহযুদ্ধ শেষে ব্যাপকভিত্তিক শান্তিচুক্তি [Comprehensive Peace Agreement (CPA)] সম্পাদিত হয় দক্ষিণ ও উত্তরের মধ্যে ২০০৫ সালে। ছয় বছর পর ২০১১ সালে ৯ জুলাই, গণভোটের (৯৮% হ্যাঁ) মাধ্যমে দক্ষিণ সুদানের জনগণ নিজেদের ভাগ্য নিজেরাই নির্ধারণ করে নেয়। এখানে উত্তর সুদানের করার কিছুই নেই। অন্যকে দোষ দেওয়ারও সুযোগ নেই। অন্যকে অত্যাচার নিপীড়ন করে শাসন ক্ষমতা সুসংহত করা যায়। শাসন করার নৈতিক অধিকারও থাকে না।

উপরের দুটো দেশের উদাহরণ থেকে বাংলাদেশেরও শিক্ষা নেওয়ার আছে। বাংলাদেশকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা কোন পথ বেছে নেবেন। নিপীড়ন, নির্যাতন ও অস্বীকৃতির নীতি চালিয়ে যাবে? নাকি রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে আদিবাসীদের স্থান দিয়ে, স্বীকৃতি দিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবে। এখানে বাঙাল শাসক ও এলিটদের মনে রাখতে হবে রাষ্ট্রগঠনে মানে দেশের সংবিধান ও বিধিব্যবস্থা প্রণয়নে আদিবাসীদের একটা দাড়িও নেই, একটি কমাও নেই। কাজেই রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারকদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা কেবল পূর্ব তিমুর ও দক্ষিণ সুদানের উদাহরণ টেনে টেনে জুজুর ভয় দেখিয়ে দিন কাটাবে নাকি রাষ্ট্রগঠনে আদিবাসী জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবে?

কিছু কথা বলতে গিয়ে অনেক কথা বলা হয়ে গেলো। শেষে যারা বিচ্ছিন্নতাবাদের ভয় দেখায় তাদের মুখে থু থু দিয়ে লেখাটা শেষ করতে চাই। আদিবাসীরা কখনো বিচ্ছিন্ন হওয়ার দাবী করেনি।এখনো করেনি। করেনি বলে সংবিধানে আদিবাসীদের স্বীকৃতির দাবী করছে। আর পাহাড়ে জেএসএস শান্তিবাহিনী গঠন করে অস্ত্র হাতে নিয়েও বলেছিলো, বাংলাদেশের সংবিধানে জুম্মজনগণের অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়া হোক। সেই সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবী এখনো পুরন হয়নি।

অতএব, বাঙাল এলিটরা যারা রাষ্ট্রপরিচালনা করছেন, আপনাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে কোন পথে হাঁটবেন – সংঘাতে নাকি সামঞ্জস্যে?

অডঙ চাকমা, ৩০ আগস্ট ২০১১

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/979

বিতর্কঃ কারা আদিবাসী?

আদিবাসী বিতর্ক নিয়ে Kungo Thang  আমাকে একটা নোটে ট্যাগ করেছেন। তার নোটটা ছিলোঃ “পৃথিবীকে একটাই দেশ আছে যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ শাসক জাতি নিজেদেরকে আদিবাসী এবং বাকীদের বহিরাগত বলে দাবী করে— দেশটির নাম বাংলাদেশ। বিপন্ন নিপীড়িত শোষিত বিলুপ্তপ্রায় আদিবাসী বাঙালি জাতিসত্তার জয় হোক… আমিন!”! এই নোটের প্রেক্ষিতে বিভিন্ন জনে মন্তব্য দিয়েছেন। আমিও দিয়েছিলাম।আমার ফেসবুকের সেই নোটটা পরিমার্জন করে এখানে ছাপালাম।]

******************************************

বাঙালিদের (দুঃখিত সবার কথা বলছি না, তবে অধিকাংশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য) আদিবাসী নিয়ে বিতর্কে মশগুল হতে দেখে একটা কৌতুক মনে পড়ে গেলো। এই কৌতুকটা অনেক আগে কোন এক পত্রিকায় পড়েছিলাম। একদিন পড়া আদায় করতে না পারার জন্যে শাস্তি হিসেবে শিক্ষক ছেলেকে আটকিয়ে রেখেছিলেন।ফলে ছেলের বাড়ী ফিরতে দেরী হলো। দুশ্চিন্তাগ্রস্ত বাবা ছেলের দেরী হওয়ার কারণ জানতে চাইলো। বিস্তারিত পড়তে ক্লিক করুন.. »

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/959

পার্বত্য জেলা পরিষদে নিয়োগ দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতিঃ পাঙেই ম্যূঅরা বলে। কী বলে?

অনেকদিন বিরতির পর আজকে একটু কিছু লেখার চেষ্টা করছি। কী লিখবো তা নিয়ে ভাবছিলাম। ভাবতে ভাবতে হঠাৎ লেখার একটা শিরোনাম পেয়ে গেলাম এক বৃদ্ধার মুখ থেকে।চাকমা বাংলা মিলে আজকের লেখার শিরোনাম দিলাম “পার্বত্য জেলা পরিষদে নিয়োগ দুর্নীতিঃ পাঙেই ম্যূঅরা বলে। কী বলে?” এ শিরোনামের শেষ অংশটা ঐ বৃদ্ধার কাছ থেকে ধার করা। সে কথা পরে আসছি।

বিকেল বেলায় কম্পিউটার খুলে অনলাইন সংস্করণে পত্রিকা পড়ছিলাম। আর ফেসবুক স্ট্যাটাস পড়ছিলাম। চোখে পড়লো হরি দা (প্রথম আলোর সাংবাদিক হরি কিশোর চাকমা) রাঙামাটি জেলাপরিষদের শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতির খবরটা ফেসবুকে পোস্ট করেছেন। খবরের মূল বিষয় হলো, রাঙামাটি জেলা পরিষদের শিক্ষক নিয়োগে ব্যাপক দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি হয়েছে। বিক্ষুব্ধ লোকজন জেলাপরিষদে ভাংচুর চালিয়েছিলো। অন্যদিকে, আওয়ামীলীগের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের একাংশও বিক্ষুব্ধ হয়ে মিছিল করার চেষ্টা করেছিলো। কিন্ত জেলা নেতাদের হস্তক্ষেপে সে মিছিল বাতিল হয়ে যায়।পার্বত্য জেলাপরিষদগুলোর দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির খবর নতুন নয়। এ পরিষদগুলো অনেক আগেই দুর্নীতির আক্রাতে পরিণত হয়েছিলো। তবে এবারে নতুন মাত্রা হয়েছে সেটা হলো বিক্ষুব্ধ জনতার ক্রোধ। প্রথমবারের মত জেলা পরিষদে ভাংচুর চালালো।

এ খবরটা মোটামুটি এখন মুখে মুখে অনেক জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে। যারা চাকরী প্রার্থী ছিলো, কিন্তু চাকরী হয়নি তারাও কথা বলার চেষ্টা করছে, ক্ষোভ ঝাড়ছে বিভিন্নভাবে। আমাদের পাড়ার এক বৃদ্ধার ছেলেও তেমনি এক চাকরী প্রার্থী ছিলো। তবে শিক্ষক পদে নয়, অন্য একটি পদে। কয়েক সপ্তাহ আগে পরীক্ষা দিয়েছিলো, কিন্ত চাকরী হয়নি। সেই বৃদ্ধা কোন এক কাজে আমাদের বাসায় বেড়াতে এসেছিলো। বাসাতে আরো কয়েকজন মহিলা একত্রিত হয়েছিলো।তামাক খেতে খেতে গল্পগুজব করছিলো।কথায় বলে, মুরগীর মুখে চিংড়ি পড়ার মত। এক কথা থেকে সাত কথা উঠতে উঠলো। আমার রুম থেকে তাদের কথাবার্তাগুলো স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলাম।

এক মহিলা বললো, “চিজিও জেলাপরিষদের মাস্টারি পরীক্ষা দিয়েছিলো……জেলাপরিষদের অফিসে নাকি মারামারি হয়েছিলো। নেই, নেই, কোন আশা নেই।আজকাল লেখাপড়া শিখলেও কোন চাকরীর আশা নেই। কেবল নাকি নেতাদের আত্মীয় স্বজনদের চাকরী হয়েছে”।

“হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমাদের মত গরীবদের কী আর চাকরী হবে? নেতাও নেই, টাকাও নেই। টাকা ছাড়া কী আর চাকরী হয়?” আরো একজন গড়গড় করে বলে গেলো।

আরো এক মহিলা বলে উঠলো, “আগে আমাদের চাকমারা চাকরী করতে চাইতো না।আর এখন টাকা দিয়েও চাকরী হয় না। কি যে দিনকাল পড়েছে!আর চাকরী না হলেও “পো-ছা” (ছেলে-মেয়েরা)কীভাবে বাঁচবে? জায়গা-জমি সংকুচিত হয়ে গেছে, ধন-দৌলত কমে গেছে।”

“ঠিক ঠিক! সেজন্যে তো এখন নাতি-পুতিদের জন্যে খুবই চিন্তা হয়। আমাদের জীবন তো চলে গেছে। কিন্তু ওরা কীভাবে বাঁচবে সে কথা চিন্তা করলে কুল পাই না”।এক মহিলা বললো।

এভাবে গল্প চলছিলো। এক পর্যায়ে পাড়ার ঐ বৃদ্ধাও কথায় যোগ দিলো।সে বললো, “আমাদের চিকনগুলোও (ছোট ছেলেটা) গত মাসে জেলাপরিষদে চাকরী ইন্টারভিউ দিয়েছিলো।ভগবান দিলে ওর একটু মাথা আছে। যেখানে পরীক্ষা দেয় সেখানে টিকে।কিন্তু টাকা [ঘুষ] দিতে পারি না বলে চাকরী হয় না”।

আরো এক মহিলা বলে উঠলো, “কষ্টবিষ্ট করে কিছু টাকা জোগাড় করে নেতা ধরো না কেন?”

বৃদ্ধা তৎক্ষণাৎ বলে উঠলো, “আহ! বোন!আমা সংসার চলে উন্ধুরো নাগত্তুন চাজ হুবেইন্যা। হুত্তুন টেঙা জুগুলেদঙ। (হায় রে বোনটি আমার! আমাদের সংসার চলে ইঁদুরের নাক থেকে মাংস বের করার মত করে। কোথা থেকে টাকা জোগার করবো!)

“তোমাদের তো বড় নেতার সাথে সম্পর্ক আছে। সন্তুবাবুকে তো রান্না করে কত খাওয়াছিলে। সন্তুবাবুরে ধরতে পারো না?উনি সুপারিশ করলে তো চাকরী হয়ে যেতো।”

ঐ বৃদ্ধা মহিলা বললো, “অয়, ঠিক কধা। পাঙেই মূঅ কয় পারা। তারাবন্ন্যা থাকদে হদকদিন সন্তুবাবুসুত্ত বহুত নেতারে ভাত রানি খাবেইয়ং। কয়জনে আর আমারে মনত রাগান দে!বড় মানুজো ইদু যাদেইয়্যো লাজ গরে (হ্যাঁ, ঠিক বলেছো।পাঙেই মুঅ* বলার মত। তারাবন্যা থাকার সময় সন্তুবাবুসহ অনেক নেতাকে ভাত রান্না করে খাওয়াছিলাম। এখন কয়জনে আর সেসব কথা মনে রাখে। বড়লোকের কাছে যেতেও লজ্জা করে)।

মহিলারা আরো অনেক কথা বলেছিলো। তারা রাজনীতি করে না।রাজনীতির অ-আ-ক-খও বোঝে না। কিন্তু রাজনীতি তাদের জীবনে অভিঘাত হানে। জেলাপরিষদ কী এবং কীভাবে সৃষ্টি হলো, কী উদ্দেশ্যে সৃষ্টি হলো সেসব হয়তো তারা জানে না। অথচ পার্বত্য জেলা পরিষদগুলো এসব গরীব দুঃখি পিছিয়েপড়া অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের জন্যে করা হয়েছে। সাধারণ গরীব দুঃখি মানুষের ছেলে-মেয়েরা, নাতিপুতিরা লেখাপড়া শেষ করে চাকরী করবে, সমাজের জন্যে কাজ করবে। কিন্তু সাধারণ মানুষের সেই সাধারণ আশা-প্রত্যাশা কী পূরণ হচ্ছে? সাধারণ মানুষের ছেলেমেয়েরা কী নিজের মেধা ও যোগ্যতায় চাকরী পাচ্ছে? বিস্তর অভিযোগ আছে জেলাপরিষদগুলোর বিরুদ্ধে। এসব পরিষদ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। যাদের টাকা পয়সা আছে, যাদের নেতাদের সাথে উঠাবসা আছে, যারা নেতাগিরি করে কেবল তাদের জন্যে এবং তাদের আত্মীয় স্বজনদের জন্যে এসব চাকরী বরাদ্দ হচ্ছে।কিন্তু যাদের টাকা নেই, ঘনিষ্ঠ কোন নেতাও নেই, তাদের কী হবে?

ফেসবুকেও রাঙামাটি জেলা পরিষদের দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি নিয়ে কিছু আলোচনা হয়েছে। কিন্তু জেএসএস-ইউপিডিএফ-এর লোকজন পরস্পরের বিরুদ্ধে বিষোদগার করতে যেভাবে শক্তিক্ষয় করে, কিন্তু তাদেরকে জেলাপরিষদের এসব দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি নিয়ে আলোচনা করতে দেখলাম না। তবে কয়েকজন ফেসবুক বন্ধু স্ট্যাটাসে এ ব্যাপারে লিখেছেন। যেমনটা শুরুতে উল্লেখ করেছি, হরি দা একটা পোস্ট দিয়েছিলেন। জুনোপহর চাকমা, ভবতোষ চাকমা ও কিরন চাকমার স্টাটাসে পোস্ট দেখলাম। তারা জেলাপরিষদের দুর্নীতির বিষয় তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। এখানে কিরণ চাকমার স্ট্যাটাস উল্লেখ করতে চাই। তিনি লিখেছেন,

“আমার এক আত্মীয় ৩০০০০০ টাকা ঘুষের বিনিময়ে একটি চাকরি নিশ্চিত করেন।এভাবে ২০০টির বেশি পোস্টে কত টাকা লেনদেন হয়েছে তা সাদা চোখে দেখা যায়।যার ফলে এখন সেখানে মেধার আর কোন দাম থাকছে না।বস্তুত এখন সেখানে টাকাওয়ালারাই চাকরি পাচ্ছে।একটা গরিব মানুষ অনেক কষ্ট করে লেখাপড়া শিখেও টাকা না দিতে পারাই যখন তার চাকরি হয় না তখন তার মনের অবস্থা সহজে অনুমান করা যায়।আর একটা লোকের দশ আনসার দেওয়ার পরও চাকরি হয়”।

কিরণ চাকমার হিসাব অত্যন্ত সোজা। প্রতি চাকরীর বিনিময়ে ৩০০,০০০ টাকা x ২০০ টা পদ = ৬০,০০০,০০০ টাকা। মানে ৬ কোটি টাকা। এটা তো সরল হিসাব করা হয়েছে। কিছু কিছু পদ আছে যেগুলোর দাম ৫০০,০০০ – ৬০০,০০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। পাঠক বন্ধুরা একটু হিসেব করে দেখুন এই বিপুল পরিমাণ টাকা কাদের পকেট থেকে যাচ্ছে আর কাদের পকেটে ঢুকছে? সাধারণ মানুষরা ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যত জীবনের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে যেভাবে হোক ঐ টাকা যোগার করার চেষ্টা করে। আর সেসব টাকা জেলা পরিষদের সদস্য, চেয়ারম্যান, কখনো মন্ত্রী বা ম্যাডাম, আর কখনো বা সংশ্লিষ্ট সরকারী কমকর্তাদের হাতে বুঝিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু কেউ কী প্রশ্ন করেছে ঐ টাকা কীভাবে জোগার হয়? কেউ জমি বেচে, কেউ গরু-ছাগল বেচে, কেউ আদা-হলুদ বেচে আর কেউ ধার দেনা করে ঐ টাকা জোগার করে। সাধারণ মানুষের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের বিনিময়ে উপার্জিত ঐ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে দুর্নীতিবাজ জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা কিংবা সংশ্লিষ্ট সরকারী কমকর্তারা। সেই সাথে আরো কিছু লোক আছে যাদেরকে দালাল বলা যায়। ঐ দালালরাও নেতাদের সাথে সংযোগ রক্ষা করে চাকরী পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে টাকা কামাই করে। “যদি লাইগা যায়” তাহলে তো দালাদের পোয়াবারো হয়। যারা টাকা জোগার করতে পারছে তারা না হয় চাকরী ছিনিয়ে নিলো। কিন্তু যাদের টাকা পয়সা নেই তাদের কী হবে? তাদের মনের দুঃখগুলো কে দেখবে?

কিরণ চাকমা আরো বলেছেন, কেউ কেউ ১০ নম্বর উত্তর দিয়েও চাকরী পায়। আর অনেকে ১০০ নম্বর উত্তর দিয়েও চাকরী পায় না। যেমন, উপরের সংলাপে এক বৃদ্ধা বলছে, তার ছোট ছেলে পরীক্ষা দিলে টিকে যায়, কিন্তু টাকা [ঘুষ] দিতে না পারার কারণে তার বারবার চাকরী হয় না। এসব অন্যায়ের প্রতিকার কে করবে?

এখানে আরো একটি বিষয় উল্লেখ করার মত। যারা ঘুষ দিয়ে শিক্ষক হচ্ছেন, তারা শিক্ষক হিসেবে কেমন হবেন? তাদের কী প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে শিক্ষকতা করার কোন মানসিকতা থাকবে? তাদের আদর্শ, জ্ঞান ও দক্ষতা কেমন হবে? এসব পয়সাওয়ালা শিক্ষকের অনেকে তার শিক্ষকতা পেশাকে বর্গা দেবেন না এমন গ্যারান্টি কেউ কী দিতে পারবেন? এসব শিক্ষকরা কমেপক্ষে ২০ – ২৫ বছর চাকরী করবেন। দীর্ঘ এ সময়ে এসব আদর্শবিহীন ও বর্গাদার শিক্ষক দিয়ে আমরা কেমন ভবিষ্যত প্রজন্ম গড়তে চাচ্ছি? আমাদের শিশুদের ভবিষ্যত কাদের হাতে তুলে দিচ্ছি? আমরা এসব প্রশ্ন নিয়ে কী ভাবছি?

সাদা চোখে দেখতে পাচ্ছি শিক্ষক নিয়োগ হচ্ছে। দুর্নীতি হচ্ছে, গরীব দু:খি মানুষের টাকার হরিলুট হচ্ছে।কিন্তু আমরা কেউ কথা বলছি না। মুখ বন্ধ করে আছি। এসব কথা কাকে বলবো?এসব দুর্নীতি প্রতিরোধে কেউ কী নেই?

জনৈক ফেসবন্ধু জুনোপহর বলে ফেলেছেন, “সন্তুজ, গন্ডুষ, ফান্ডুস – এরা কোথায় গেছে? এদের তো কোন শব্দ নেই….এরা শুধু নিজের কর্মী একটা মারা গেলে ব্যাঙের মত চিল্লাপাল্লা করে ফাল মারে…এদিকে জাতিকে মেধাশুন্য করে দিচ্ছে তারা নাকে তেল দিয়ে ঘুমুচ্ছে”।জুনোপহরবাবুর সাথে একমত। জাতি আজ মেধাশুন্য হতে চলেছে, নিরবে জুম্ম জাতির প্রাণ বিনাশ হতে চলেছে সে ব্যাপারে জেএসএস (সন্তু লারমা), জেএসএস (এমএন লারমা) ও ইউপিডিএফ-এর কোন হুঁশ নেই। নিরব নি:শব্দে আমাদের শিশুদের ভবিষ্যত মেধাহীন শিক্ষকদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে, সেটার জবাব কে দেবে? নিশ্চিতভাবে বলা যায়, এসব আদর্শহীন ও মেধাহীন শিক্ষকদের বলির পাঠা হবে গ্রামের শিশুরাই বেশি। অথচ এখানে পাহাড়ী রাজনৈতিক দলগুলো কোন ভূমিকা রাখছে না। রা নীরব। তাদের এ নীরবতা দেখে প্রশ্ন জাগে, তাহলে তারা কাদের জন্যে রাজনীতি করে?

এসব প্রশ্ন দেখে জেএসএস (সন্তু লারমা), জেএসএস (এমএন লারমা) ও ইউপিডিএফ-এর নেতারা হয়তো বেজার হতে পারেন। হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন, এখানে কেন তাদের প্রসঙ্গ টেনে আনা হচ্ছে?এ প্রসঙ্গে হরি দা’র একটি লেখার উদ্ধৃতি উল্লেখ করতে হয়। তিনি তার একটি লেখাতে, প্রখ্যাত সাংবাদিক আবুল মনসুরের প্রশ্নের প্রেক্ষিতে এ কে ফজলুল হকের কথা তুলে ধরেছেন – “মানুষ আমড়া গাছে ঢিল মারে, ঝাউ গাছে মারে না। কেননা, আমড়া গাছে ফল ধরে, ঝাউগাছে ধরে না।” এই কথার সুরের সাথে সুর মিলিয়ে বলতে হয়, আওয়ামীলীগ ও বিএনপি যদি পাহাড়ী জুম্মজনগণের আশা-আকাংখা পুরন করতে পারতো, তাহলে আলাদা করে জেএসএস নামক রাজনৈতিক দল গঠনেরও প্রয়োজন হতো না (এখন ইউপিডিএফও হয়েছে)।আওয়ামীলীগ-বিএনপির কাছে ফল পাওয়া যাচ্ছে না বলেই তো পাহাড়ী জনগণ জেএসএস –ইউপিডিএফ-এর কাছে ঢিল মারে। এখানে অবশ্যই জেএসএস-এর ভূমিকা বেশি থাকা প্রয়োজন। কেননা, চুক্তি স্বাক্ষরকারী দল হিসেবে জেএসএস-এর এখানে দায়বদ্ধতা আছে। সাধারণ জনগণ তো ঘুষ দিয়ে চাকরী নেওয়ার জন্যে জেলাপরিষদ চায়নি, মেধাহীন আদর্শহীন লোকদের হাতে নিজেদের শিশুদের ভবিষ্যত সঁপে দেওয়ার জন্যে চুক্তি হয় নি।

লেখা শেষ করার আগে বৃদ্ধা মহিলার “পাঙেইম্যূঅ কয় পারা” উক্তিটা জেএসএস ও ইউপিডিএফ নেতাদের আরো একবার স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। ঐ বৃদ্ধা কেবল সন্তু লারমাকে ভাত রান্না করে খাওয়াইনি। ঐ বৃদ্ধার মত অজস্র নারী শান্তিবাহিনী যোদ্ধাদের রান্না করে খাওয়াইয়েছিলেন। এখনো খাওয়াইয়ে যাচ্ছে জেএসএস-ইউপিডিএফ-এর অজস্র নেতাকর্মীদের। সাধারণ মানুষ এখনো ধান-চাল, অর্থ ও শ্রম দিয়ে জেএসএস-ইউপিডিএফ-জেএসএস (এমএন লারমা)- এই তিন দলকে লালন পালন করে যাচ্ছে। সেসব সাধারণ মানুষের চাওয়া-পাওয়া বেশি নেই। খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকতে পারলে খুশি।ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করতে পারলে খুশি। এখন সেসব শিশুদের যদি উপযুক্ত শিক্ষক দিতে পারা না যায়, এবং জেএসএস-ইউপিডিএফ-জেএসএস (এমএন লারমা) কোন ভূমিকা পালন না করে তাহলে আপনাদের দরকার কী? ঐ বৃদ্ধার মত “পাঙেইম্যূঅ কয় পারা” বলে বলে আপনাদের দিকে আর কতকাল চেয়ে থাকবো? জনগণের প্রতিদানের কথা ভাবতে হবে।

অডঙ চাকমা, ২৪ আগস্ট ২০১১

*******

**পাঙেই মুঅ’র আক্ষরিক মানে হলো নৌকার বৈঠার মত মুখওয়ালা। বাস্তবে ঐরকম মুখওয়ালা কোন লোক ছিলো কী না জানা নেই। চাকমারা কাউকে বেশি করে আপ্যায়ন করে খাওয়াতে পারলে খুশী হয়। সেই আপ্যায়নের কথা স্মরণ করতেও খুশী হয়। কিন্তু সে আপ্যায়নের কথা স্মরণ করতে গিয়ে “পাঙেই মুঅ কয় পারা” বলে একটা বাক্য বলে থাকে। এটা একটা অর্থহীন বাক্য হলেও এ কথার একটা তাৎপর্য আছে।সেটা হলো, যা আপ্যায়ন করেছিলাম, সেটা নিজের ভান্ডারে ধনসম্পদ ছিলো বলে খাওয়াতে পেরেছিলাম। সেই আপ্যায়নের কথা স্মরণ করে যাতে মনের মধ্যে দুঃখ না আসে এবং নিজের ধন দৌলতে যাতে কখনো কমতি না পড়ে।

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/946

প্রশ্ন (?) নানা মুনির নানা মত !

প্রশ্ন করুন । প্রশ্ন করতে শিখুন । মনে প্রশ্নের উৎপাদন দৈনিক অন্ততঃ একটা করে বাড়ান । যেকোন এক লেখা পড়ার পর নিজের কাছে নিজে প্রশ্ন করুন; অন্যকে যৌক্তিক প্রশ্ন করতে শিখুন । । প্রশ্নের ধরণটা ও জেনে নিন । তবেই, আপনার বিচার বুদ্ধির ক্ষমতা বেড়ে যাবে ।

দার্শনিক, বিজ্ঞানিক, ধর্মীয় প্রবর্তকদের জীবনি পড়ে নিন, আবিষ্কার এবং উদ্ভাবনের রহস্যর ইতিহাসটা ও জেনে নিন । ফঁড়িং-পাখিদের উড়া নিয়ে প্রশ্ন জাগে লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চির, যার পরিপ্রেক্ষিতে সে উড়োজাহাজের মডেল এঁকে যান, হেলিকপ্টার আবিষ্কারের সূচনাটা প্রথম এভাবেই ঘটেছিল । জীবনের “দূঃখ সত্য” নিয়ে অনেক দার্শনিকের মনে অজানার প্রশ্ন ছিল, সফল হয়েছিলেন গৌতম বুদ্ধ কারণ তিনি দূঃখের কারণসহ মুক্তির উপায় ও খুঁজে পান । তাই মনে রাখুন নিজের প্রশ্নের উত্তরের সমাধান কিন্তু নিজেকেই বের করতে হয় । অন্যের উপর ভর করে নিজের সকল প্রশ্নের উত্তর খোঁজা পরনির্ভরশীলতার অবনতি; উন্নতির অন্তরায় । বিজ্ঞানী স্যার আইজ্যাক নিউটনের 'মহাকর্ষ-অভিকর্ষ' নীতির আবিষ্কারের কারণ, “গাছ থেকে পড়া এক পাঁকা আপেল” । কিন্তু পরবর্তীতে বিজ্ঞানী আইনস্টাইন এতে প্রশ্নে ছুঁড়ে দেন এবং বিরোধিতা করে “আপেক্ষিক তত্ত্বের” আবিষ্কার ঘটান । খ্রীষ্টপূর্ব ৩শত শতাব্দীতে গ্রীকের অন্য এক নামজাদা দার্শনিকের নাম ছিল অ্যারিষ্টটল, সমাজে তার প্রভাব ছিল খুব বিশাল । তৎকালীন সমাজ ছিল ঈশ্বর নির্ভর, বিশ্বাসই ছিল মানুষের সুখ-দূঃখের একমাত্র উপায় । সত্য-মিথ্যা যাচাই-বাচাই করার আধুনিক বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি তখন ছিল না । জ্ঞানের পরিধি নিয়ে সমাজে অ্যারিষ্টটলের ছিল অন্য দার্শনিকদের চেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্যতা । “সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘুরে” এমন তত্ত্ব যদিও বর্তমানে ভ্রান্ত বিশ্বাস ব্যতীত কিছু নয় কিন্তু সমাজ সেসময় অ্যারিষ্টটলের এমন তত্ত্বকে সত্য বলে ধরে নিয়েছিল, আর অন্যদিকে অ্যারিষ্টাকার্স এর বিপরীতমুখী তত্ত্ব “পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরে” সমাজে ভ্রান্ত বলে পরিগণিত হয়েছিল ।সমাজের মানুষদের মননের চিন্তাশীলতা, চাওয়া -পাওয়াভেদে এমন অনেক সত্যকে ভ্রান্ত বলে উড়িয়ে দেয়া হয় ইতিহাস সাক্ষ্য দেই, আবার পরবর্তীতে এইসব সত্যর জয় ঘটেছে এমন ও সাক্ষ্য ইতিহাস দেই ।

পৃথিবীতে যেকোন আদর্শিক তত্ত্বকে ধ্রুব সত্য বলে ধরে নেয়ার কিছু নেই । ইহা নির্ভর করে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, উন্নয়ন, এবং নীতিরীতির উপর । কার্ল মাক্সের শ্রেণী সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তা পশ্চিমা বিশ্বে একসময় ছিল সময়ের দাবী । ক্রমে শ্রেনীভেদের উন্নতি হয়ে পশ্চিমা বিশ্বে মাক্সের শ্রেনীসংগ্রামের আদর্শ হারিয়ে যেতে বসে । পরবর্তীতে তা পূর্ববিশ্বে জোয়ালোভাবে গ্রহণযোগ্যতা পায় । কার্ল মাক্সের দ্বান্ধিক বস্তুবাদকে এক বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব বলা হলেও বিজ্ঞানভিক্তিক দার্শনিক-লেখকরা তা উড়িয়ে দেন । প্রশ্ন -পাল্টা প্রশ্ন; উত্তর -পাল্টা উত্তর -এসবের নিয়মাতান্ত্রিকতা আদর্শিক মতভেদে সবসময় থেকে যাবে । একজন যা সত্য বলে আদর্শিক দর্শনগত তত্ত্ব দিচ্ছেন কালকে আরেকজন এসে তা মিথ্যা বলে প্রমাণ করবেন না তা কি নিশ্চিত ?

প্রয়োজনীয়তায় উদ্ভাবনের জনক” – কোন এক জিনিসের উদ্ভাবন হয় কিন্তু মানুষের চাহিদা এবং প্রয়োজনীয়তার উপর ভিত্তি করে । দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর, জাপানে যখন মানবিক বিপর্যয় ঘটে তখন বিশ্ববাসী “মানব অধিকারের” প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করেন । ফলশ্রুতিতে ১৯৪৮ সালে ফ্রান্সের প্যারিসে জাতিসংঘের সাধারণ সভা করা হয় যেখানে মানব-অধিকার সংক্রান্ত ৩০ টির মতো আইন প্রনয়ন করা হয় ।

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসন চলাকালে স্থানীয় বাসিন্দারদের উপজাতি হিসেবে পরিগণিত করে নিজেদের শ্রষ্ঠত্ব ঠেকিয়ে রাখতে ব্রিটিশরা বিভিন্নভাবে আইন প্রনয়নসহ শুল্ক-কর আরোপ করতেন । 'ইন্ডিজিন্যাস-পিপলস' অধিকারের কথা আজ বিশ্বে এক আলোচিত বিষয় । এর মধ্যে দিয়ে মানুষের মৌলিক অধিকারগুলো ব্যতীত আরো কয়েকটি সুনিদির্ষ্ট নিয়মনীতি দেয়া হয়েছে যাতে করে প্রান্তিক জনজাতিদের ভূমি অধিকারসহ ভাষাগত এবং ধর্মগত অধিকার রক্ষা পায় । যেসব অধিকারকে সুনিদির্ষ্ট নিয়মনীতি বলে দাবী করা হচ্ছে, সেসবকে সাধারণ মানবাধিকার সম্মলনে এবং আইনের সনদে ও সর্বসাধারণভাবে স্বীকৃতি দেয়া হয় । যেমন, “All human beings are born free and equal in dignity and rights. They are endowed with reason and conscience and should act towards one another in a spirit of brotherhood” (article-1) – সকল মানুষই জন্মগতভাবে মুক্ত এবং অধিকারের ক্ষেত্রে সমান মর্যাদাসম্পন্ন…..। যা বাংলাদেশে প্রান্তিক জনজাতিদের ক্ষেত্রে আদৌ অমানবিক । ২ নম্বর আর্টিকেলে আরো বলা হয়, “Everyone is entitled to all the rights and freedoms set forth in this Declaration, without distinction of any kind, such as race, colour, sex, language, religion, political or other opinion, national or social origin, property, birth or other status” -যাতে করে প্রমানিত হয় বাংলাদেশের সরকার নাগরিকদের সকল সুবিধাধি এবং সম্মান রাখতে ব্যর্থ হয়েছে । ১৩ নম্বর আর্টিকেলে বলা হয়, “Everyone has the right to freedom of movement and residence within the borders of each State” যা বাংলাদেশ সরকার বিচ্ছিন্নবাদী বলে উড়িয়ে দেই । অতএব, বলতে হয় বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় জীবরা জাতিসংঘের বাইরে হয়ে দেশের আইন-কানুন চালাচ্ছে । আমি মনেকরি সর্বসাধারণ মানবাধিকারের মৌলিক আইনগুলোকে কার্যকর করা গেলে আলাদাভাবে “ইন্ডিজিন্যাস-পিপলস”-এর আইনের প্রয়োজনীয়তা পড়ে না । আমি ব্যক্তিগতভাবে জাতিসংঘের কাছে প্রশ্ন রাখবো যে, এক্ষেত্রে জাতিসংঘ কি ব্যর্থ হয়নি যেখানে মানবাধিকার আইন অমান্যকারী দেশ বাংলাদেশকে আদৌ জাতিসংঘে স্থান দেয়া হচ্ছে ?

প্রকৃতির স্বভাবগতভাবে মানুষ ক্ষমতালোভী এবং শাসক । বাংলাদেশের মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো যেমন, বিএনপি-আওয়ামিলীগ এবং জাতীয় পার্টি ও তাই করে এসেছে, বর্তমানে ও করছে । সেজন্য বলা হয়ে থাকে অধিকার কেউ কাউকে এমনিতে দেই না, অধিকার ছিনিয়ে নিতে হয় ।

আমি যখন প্রশ্ন করতে চাইবো, অনেকে আমার প্রশ্নের কারণ হয়ত বুঝতে চাইবেন না । না বুঝে তারা হয়ত আমার উপর ভুল বুঝবে নতুবা যাকে প্রশ্ন করবো তার উপর ভুল বুঝবে । আমি তবে প্রশ্ন করবো নিজেকে সজাগ করাতে এবং যাকে প্রশ্ন করবো তাকে সজাগ করাতে । আমরা সাধারণ মানুষ, চলার পথে ভুল হবে স্বাভাবিক । আমরা ভগবান ও নই, আবার সৃষ্টিকর্তা ও নই । তাই কোন মানুষকে ভগবান অথবা সৃষ্টিকর্তার আসনে বসিয়ে সব প্রশ্নের উর্ধ্বে রাখা ভালো না ।

শ্রদ্ধেয় সন্তু লারমা, শ্রদ্ধেয় রাজা দেবাশীষ রায় এবং শ্রদ্ধেয় প্রসিত খীসা আমাদের পার্বত্য চট্রগ্রামের গতানুগঠিক নেতা তথা সম্মানিত ব্যক্তি । যদিও তিনজনের আদর্শিকতার মধ্যে পার্থক্য আছে বলে সাধারণ মানুষের ধারণা বিদ্যমান । তবে আমি মনেকরি তারা এক ষ্টেশনে পৌঁছাতে আলাদা -আলাদা তিন রাস্তা ব্যবহার করছেন । ঢাকায় পৌঁছাতে কেউ ব্যবহার করছে রাঙামাটি-টু-ঢাকা সড়ক, কেউ খাগড়াছড়ি-টু-ঢাকা সড়ক, আবার কেউ বান্দরবান-টু-ঢাকা সড়ক । সন্তু বাবু আর রাজা বাবুর মিলন ঘটেছে চন্দ্রঘোনা সড়কে (যথাক্রমে দুজনে আসছেন রাঙামাটি এবং বান্দরবান থেকে)। দুজনে একমিলিত পথে ঢাকা যাত্রায় মিলন ঘটিয়েছেন কিছুক্ষণ, চট্রগ্রাম শহরে তারা আবার ট্রাফিক জ্যামে পড়ে ছিটকে পড়েছেন । অর্থাৎ, দুজনে আদিবাসী নিয়ে আন্দোলন করতে ঐক্যবদ্ধ হন কিন্তু সরকারের ফ্যাসিবাদের শিকার হয়ে ছিটকে পড়েন । আর অন্যদিকে প্রসিত বাবু'র সাথে অন্য দুইজনের মিলন ঘটবে ফেনির মিরসরাই-এ । অর্থাৎ আরো অনেক পথ বাকি ।

তিনজনকে ট্রাফিক পুলিশদের কাছে অনেক কফিয়ত দিতে হচ্ছে । এক্ষেত্রে রাজা বাবুর প্রেসারটা একটু কম যেহেতু তিনি ব্যবহার করছেন এক প্রাইভেট মাইক্রো বাস । আর অন্যদিকে সন্তু বাবু এবং প্রসিত বাবু ব্যবহার করছেন দুজনে দুইটা বাস, তাছাড়া দুজনই দু বাসের মালিক । সাথে অনেক যাত্রী । ট্রাফিক পুলিশ বারবার পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা তথ্য দিয়ে দুজনকে বিভ্রান্ত করছে এই বলে যে, অমুক বাসের মালিক এতজন যাত্রী বহন করছে আর প্রতিজনের কাছ থেকে এত-এত টাকা করে ভাড়া নিয়েছে, এবং ইত্যাদি । এখন যাত্রা পথে দুজনের এমন খবরে মাথা খুব গরম । তাই তাদের সাঙপাঙদের মোবাইলে ফোন করে সতর্ক করে দিচ্ছে যে অমুক বাসের মালিকের গাড়ি আমাদের জায়গায় আসলে কথাবার্তা না বলে হামলা চালিয়ে গুড়িয়ে ছুরমার করবে । সাঙপাঙরা তাই করছে, আবার অনেক সময় বেশিও করে ফেলছে । ট্রাফিক পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মূল টার্গেট হচ্ছে পাহাড়ে সে গাড়ির ব্যবসা করতে চাই । তবে তার আগে দুইজন পাহাড়ীর ব্যবসায় বারটা বাজাতে হবে । সেজন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সকল ট্রাফিক পুলিশদের এমনভাবে সাজিয়ে রেখেছেন । দুই বাসের মালিক নাম-সুনাম ঠিকিয়ে রাখতে বেশিমাত্রায় সতেষ্ট, যাত্রীদের দিকে চোখ নেই । তাদের ভুল ভাঙবে যখন মিরসরাই-এ সাক্ষাৎ মিলবে । কিন্তু এতক্ষণে দুই মালিকের অনেক গাড়ি ভাঙবে, কত গাড়ি ভাঙবে ? অতিরিক্ত বাড়তি ভাড়ায় শিকার হচ্ছেন সাধারণ যাত্রীরা । দুইবাসের মালিক দূর্ভোগটা চাপিয়ে দিচ্ছেন সাধারণ যাত্রীর উপর, যদিও ভুলের দ্বন্ধতা চলছে অর্ধ পথে । তেনারা উভয়সংকটে পড়েছেন, একদিকে ট্রাফিক পুলিশের ফাঁদ অন্যদিকে যাত্রীদের হাতে রাখার পন্থা, এটা কি তাহলে ক্ষমতার লোভ ?

অন্যদিকে রাজা বাবুর মাইক্রো বাসের ব্যবসা দুই বাসের মালিকের সাথে পাল্টা দেয়া অনেক কঠিন । তাছাড়া তিনি বাড়া ও বেশি নেন, তাই সাধারণ যাত্রীদের পক্ষে রাজা বাবুর মাইক্রো বাসে চড়া খুবই ব্যয়বহুল । এখন রাজা বাবু ও জেনে গেছেন অন্য দুইবাসের মালিকের দ্বন্ধ চলছে, তাছাড়া তিনি এতবড় ঝুঁকি ও নিতে চাইছেন না যে বাসের ব্যবসা শুরু করবেন । তাই সবকিছুর পর ও এখন পর্যন্ত সাধারণ যাত্রীদের বাসের মালিক সন্তু বাবু এবং প্রসিত বাবুর উপর নির্ভর করতে হচ্ছে । এতসব কিছু পর রাজা বাবু কি বাসের ব্যবসা করতে নিজের ঝুঁকি নিবেন ? নাকি মাইক্রো বাসের ব্যবসায় সীমাবদ্ধ থাকবেন ?

আমরা সাধারণ যাত্রী, আমাদের কথা কি তাদের মতো বড়বড় ব্যবসায়ীর কানে পৌঁছাতে পারবে ? আর পার্বত্য পাহাড়ী সমাজে তাদের কথাই বেশি প্রভাব রাখে । আমরা মূর্খ -মানুষ । একটা -দুইটা মতামত দামতো তাদের কানে পৌঁছাবে না, তাই বলে কি আমাদের কোন অধিকার নেই ?

বিঃদ্রঃ উদাহরগুলো একটু বুঝে পড়ুন । বাস্তবজীবন বলে না নিয়ে শিক্ষনীয় কিছু বলে ধরে নিন ।

zp8497586rq

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/927

“আদিবাসীদের ভাষা চর্চা ও উন্নয়ন : আমাদের করণীয়” প্রসঙ্গে

গত সপ্তাহে জুম খীসার ‎“আদিবাসীদের ভাষা চর্চা ও উন্নয়ন: আমাদের করণীয়” (http://www.news.chtbd.net/?p=861) শিরোনামে একটি লেখা ফেসবুকে ও সিএইচটিবিডি’তে প্রকাশিত হওয়ার পর কথা দিয়েছিলাম তার লেখার প্রেক্ষিতে আমার মন্তব্য পরে জানাবো।কিন্তু ব্যস্ততার কারণে আমার সে প্রতিশ্রুতি এতদিন রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। অনেক দিন পর আজকে একটু অবসর পেলাম বলে আমার সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার প্রয়াসে দু’এক কথা লিখছি।

লেখাটা ভালো করে পড়লাম। তথ্য-উপাত্ত সম্বলিত যুক্তিপূর্ণ একটি লেখা। লেখার জন্যে লেখককে অনেক ধন্যবাদ।লেখকের লেখার উপর তেমন কিছু বলার নেই। তার লেখার মূল সুর ও সুপারিশমালার সাথে একমত এবং সমর্থন জানাচ্ছি।পাশাপাশি লেখকের সাথে “আমাদের করণীয়” সম্পকে কিছু বিষয় যোগ করতে চাচ্ছি।

লেখক বাংলাদেশের আদিবাসীদের মাতৃভাষা চর্চার ক্ষেত্রে যে নানা রকম সমস্যা রয়েছে, সেগুলোর ব্যাপারে যেমন আলোচনা করেছেন, তেমনি আদিবাসীদের মাতৃভাষা চর্চার গুরুত্ব বিষয়েও আলোকপাত করেছেন। তিনি যথার্থই বলেছেন, বাংলাদেশের আদিবাসীদের মাতৃভাষার চর্চার পথে যে প্রধান কাঠামোগত সমস্যা রয়েছে সেগুলো হলো সংবিধানে আদিবাসীদের আত্মপরিচিতির অভাব ও এক ভাষিক রাষ্ট্রব্যবস্থা। অর্থাৎ বাঙালি আর বাংলা ভাষা ভিন্ন অন্য কোন জাতির পরিচিতি ও ভাষা-সংস্কৃতির রক্ষা ও চর্চার বিষয়গুলো সংবিধানে রাখা হয়নি। ফলে রাষ্ট্রীয় বাধ্যবাধকতা না থাকায় আদিবাসীদের মাতৃভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার ব্যাপারগুলো বরাবরই উপেক্ষিত থেকে গেছে।

উপরে উল্লেখিত নেতিবাচক চিত্রের পাশাপাশি কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে। এখানে অবশ্যই আদিবাসীদের দীর্ঘ দিনের আন্দোলনের ফসল। সংবিধানে আদিবাসীদের মাতৃভাষায় পড়ালেখা ও চর্চার ব্যাপারে কোন ব্যবস্থা না থাকলেও কিছু আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা ইতোমধ্যে গৃহীত হয়েছে। যেমন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে প্রাথমিক স্তর পর্যন্ত মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের অধিকার স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয়ত, ২০১০ সালে গৃহীত শিক্ষানীতিতে আদিবাসীদের ভাষা ও সংস্কৃতির বিকাশ ঘটানো এবং আদিবাসী শিশুদের ঝরে পড়া রোধ করার ব্যাপারে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপের কথা স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে।তৃতীয়ত, দেশের প্রাথমিক স্তরে সকল শিশুর জন্যে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্যে অনেক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলো। তার মধ্যে অন্যতম একটি প্রকল্প হলো “সবার জন্যে শিক্ষা” (education for all) অর্জনের লক্ষ্যে প্রণীত কর্মসূচী যা “প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্প” যা Primary Education Development Programme (PEDP) নামে পরিচিত।এশিয় উন্নয়ন ব্যাংক কর্তৃক অর্থায়িত এই কর্মসূচী বাস্তবায়নের দায়িত্ব ছিলো প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের। PEDP কর্মসূচীর প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায় (PEDP I ও II) ইতোমধ্যে শেষ হয়ে গেছে। এখন তৃতীয় পর্যায় (PEDP III) শুরু হওয়ার পথে। PEDP দেশের সকল জেলাতে বাস্তবায়ন করা হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্যে বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়।আমার জানা মতে, আগামীতে বাস্তবায়িতব্য PEDP III-তে একশত কোটির উপর টাকা বাজেট ধরা হয়েছে।কিন্ত প্রশ্ন হলো, জাতীয় পর্যায়ে যে PEDP III প্রণীত হচ্ছিল, তাতে আমাদের  প্রতিনিধিত্বকারী পার্বত্য মন্ত্রণালয়, আঞ্চলিক পরিষদ ও পার্বত্য জেলাপরিষদগুলোর কোন ভূমিকা কী ছিলো? অথবা তারা PEDP III সম্পর্কে অবহিত আছে কী?

এখানে উল্লেখ্য, শিক্ষা সবসময় বাংলাদেশ সরকারের অগ্রাধিকারের তালিকার মধ্যে আছে। বাংলাদেশ সরকার জাতিসংঘ ঘোষিত সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনে অঙ্গীকারাবদ্ধ এবং তা ২০১৫ সালের মধ্যে “সবার জন্যে শিক্ষা” নিশ্চিত করতে হবে। নিশ্চয়ই আদিবাসী শিশুদের বাদ দিয়ে সরকারের পক্ষে এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। আদিবাসী শিশুদের জন্যে শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে প্রথমে মাতৃভাষায় শিক্ষা প্রদানের বিষয়টি সামনে চলে আসে। কিন্তু আদিবাসী শিশুদের জন্যে কীভাবে মাতৃভাষা চালু করা হবে – সেটা নিয়ে অনেক সমস্যা আছে। অনেকে টাকার অভাবকে অন্যতম একটি সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেন। কিন্ত  টাকা কী কোন সমস্যা? PEDP III-র কোটি কোটি টাকার বাজেট থেকে যদি ২% থেকে ৫% টাকাও যদি আদায় করা যায়, তাহলে সহজে আদিবাসী শিশুদের জন্যে মাতৃভাষায় শিক্ষা চালু করা কোন ব্যাপার নয়। কিন্তু এই টাকা পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের পক্ষে কে সরকারের সাথে লবি করবে? বা কে সরকারের বাজেট থেকে টাকা আদায় করে আনবে? পার্বত্য মন্ত্রণালয়, আঞ্চলিক পরিষদ ও পার্বত্য জেলাপরিষদগুলোর সে যোগ্যতা ও দক্ষতা আছে কী? যদি তাদের সে যোগ্যতা ও দক্ষতা না থাকে, তাহলে সাধারণ নাগরিক সমাজের করণীয় কী হতে পারে?

আমাদের আদিবাসীদের মাতৃভাষার পক্ষে জাতীয়ভাবেও অনেক শক্তিশালী যুক্তি ও আইনগত ভিত্তি ইতোমধ্যে তৈরী হয়েছে।এখন প্রয়োজন এগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা। যেমন, ২০১০ সালে গৃহীত জাতীয় শিক্ষানীতি। উক্ত শিক্ষানীতিতেও আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষা শিক্ষা প্রদান ও প্রাথমিক স্তর হতে ঝরে পড়া রোধ করার জন্যে কিছু সুপারিশ করা হয়েছে। যেমন,

(১) দেশের আদিবাসীসহ সকল ক্ষুদ্রজাতিসত্তার ভাষা ও সংস্কৃতির বিকাশ ঘটানো (জাতীয় শিক্ষানীতিঃ ২৩ নং লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও নীতি);

(২) প্রাথমিক স্তরে আদিবাসীসহ সকল ক্ষুদ্রজাতিসত্তার জন্যে “স্ব স্ব মাতৃভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা” (আদিবাসী শিশু: অনুচ্ছেদ ১৮);

(৩) আদিবাসী প্রান্তিক শিশুদের জন্যে বিশেষ সহায়তার ব্যবস্থা করা (আদিবাসী শিশু: অনুচ্ছেদ ১৯);

(৩) প্রাথমিক স্তরে আদিবাসী শিশুদের ঝরে পড়া রোধ করার লক্ষ্যে: ক) আদিবাসী শিশুরা যাতে নিজেদের ভাষা শিখতে পারে সেজন্যে আদিবাসী শিক্ষক নিয়োগ ও পাঠ্যপুস্তকের ব্যবস্থা করা; খ) আদিবাসী এলাকায় প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা; এবং গ) যেসব আদিবাসী এলাকায় হালকা জনবসতি রয়েছে, প্রয়োজন হলে সেসব এলাকার শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের জন্যে আবাসনের ব্যবস্থা করা (আদিবাসী শিশু: অনুচ্ছেদ ২০)।

জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ উল্লেখিত উপরের সুপারিশগুলো কে বাস্তবায়ন করবে? এসব সুপারিশ এমনি এমনি বাস্তবায়ন হবে না। আমাদের প্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠান যেমন পার্বত্য মন্ত্রণালয়, আঞ্চলিক পরিষদ ও পার্বত্য জেলাপরিষদগুলোর কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠান কী আমাদের পাহাড়ের জনগণের জন্যে কোন কার্যকর কোন ভূমিকা রাখতে পেরেছে বা পারছে?

এখানে আরো একটি কথা বলা প্রয়োজন, পার্বত্য মন্ত্রণালয় পাহাড়ের জনগণের আশা আকাংখা পূরণ করতে পারছে না। যাদের পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিলো তাদের অনেকে তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের নাম দিয়েছেন, “মন্ত্রণালয় নয়, যন্ত্রণালয়”। আর পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোর নাম দেওয়া হয়েছে, “জ্বালা পরিষদ”। “জ্বালা পরিষদ” পরিষদ হওয়ার অনেক কারণ আছে। জেলা পরিষদের প্রাথমিক শিক্ষা দেখাশুনা করার কথা। পার্বত্য জেলাগুলোতে যাতে গুণগত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত হয়, সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগসহ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করার কথা। কিন্তু নিয়োগ নিয়ে কী হচ্ছে? শিক্ষক পদের জন্যে এখন চাকরী প্রার্থীদের ২ – ৪ লক্ষ টাকা ঘুষ দিয়ে নিয়োগ পেতে হচ্ছে। মেধার পরিবর্তে টাকা প্রাধান্য পাচ্ছে। মাতৃভাষা তো দূরের কথা, মেধাহীন শিক্ষক দিয়ে আমাদের জুম্ম জাতির ভবিষ্যত কী হবে? ঘুষ দিয়ে চাকরী পাওয়ার জন্যে কী জেলা পরিষদ চেয়েছিলাম? ঘুষ দেওয়ার জন্যে কী আমরা আন্দোলন করেছিলাম? জেলা পরিষদসমূহের ‘জ্বালা’ কে দূর করবে? আমাদের নেতারা কিংবা ‘সুশীল’ সমাজের প্রতিনিধিরা জেলা পরিষদসমূহের এসব ‘জ্বালা’র ব্যাপারে কোন চিন্তা করেন কী? জেএসএস-ইউপিডিএফ নেতারাও মাতৃভাষা চালুর ব্যাপারে দাবী তোলেন, শোভাযাত্রা করেন। কিন্তু সাধারণ মানুষকে জেলা পরিষদসমূহের ‘জ্বালা’ থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্যে তারাও কী কখনো ভাবেন? কোন কঠোর কর্মসূচী নেবেন কী?

আদিবাসীদের মাতৃভাষা চর্চা ও রক্ষার ব্যাপারে অনেক তত্তকথা বলা যায়। তবে আমি মনে করি, আমাদের প্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠানসমূহ যেমন পার্বত্য মন্ত্রণালয়, আঞ্চলিক পরিষদ ও পার্বত্য জেলাপরিষদগুলো যতদিন পর্যন্ত কার্যকর করা যাবে না, ততদিন পর্যন্ত আমাদের স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে। ‘যন্ত্রণালয়’ ও ‘জ্বালা পরিষদ’ হয়ে তারা যন্ত্রণা ও জ্বালা দিয়ে যাবে। তাই এ মুহুর্তে আন্দোলন হওয়া উচিত ‘যন্ত্রণালয়’কে কার্যকর মন্ত্রণালয়ে পরিণত করা, আর তিন ‘জ্বালা পরিষদের’ নির্বাচনের ব্যবস্থা করে প্রকৃত জেলা পরিষদে পরিণত করা। সেই সাথে দূরদৃষ্টি সম্পন্ন মেধাবী নেতৃত্বও প্রয়োজন। তা না হলে আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষার দাবী কখনো পূরন হবে না।

অডঙ চাকমা, ৩১ জুলাই ২০১১

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/878

‘চেতনার এনজিওকরণ’ প্রসঙ্গে

CHTBD-এর “পাহাড়ের প্রতিধ্বনি”-তে ‘চেতনার এনজিওকরণ’ শিরোনামে পাইচিংমং মারমার একটি লেখা চোখে পড়ল। তিনি দাবী করেছেন তিনি কোন তাত্ত্বিক নন, বুদ্ধিজীবীও নন। তবে তার দাবী তিনি একজন “কর্মী”। জানিনা, তিনি নিজেকে কোন বর্গভুক্ত করছেন – রাজনৈতিক কর্মী নাকি সমাজকর্মী।  যাহোক, “কর্মী” হিসেবে তিনি কী বলতে চেয়েছেন সেটা বুঝার চেষ্টা করেছি।  তার আলোচনা থেকে মনে হয়েছে, তিনি এনজিওদের উপর ক্ষুব্ধ। কেননা, তার মতে জুম্ম সমাজে বিশেষকরে যুব সমাজে যে রাজনৈতিক বিমুখতা ও মূল্যবোধহীনতা বিরাজ করছে, অর্থাৎ ছাত্র-যুব সমাজের অংশগ্রহণে যে বড় ধরনের কোন আন্দোলন ঘটছে না, তার পেছনে এনজিওদের ভূমিকা রয়েছে।  আন্দোলনে ভূমিকা রাখার পরিবর্তে এনজিওরা “সমাজ মননে” অন্যরকম পরিবর্তন ঘটাচ্ছে। এককথায়, তিনি বর্তমান জুম্ম সমাজের প্রেক্ষাপটে এনজিওর ভূমিকাকে ক্ষতিকর হিসেবে বিবেচনা করছেন।  তার এই তত্ত্ব বা অবস্থানের সপক্ষে তার লেখায় গভীর বিশ্লেষণ দেখতে পাইনি।  ভাসাভাসা বা বিক্ষিপ্তভাবে কিছু ইস্যূ তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে লেখককে ধন্যবাদ জানাই – সমাজ ও এনজিও সংক্রান্ত আলোচনায় চিন্তার খোরাক জোগানোর জন্যে। বিস্তারিত পড়তে ক্লিক করুন.. »

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/858

চলতি পথে আড্ডাঃ চুক্তিবাস্তবায়ন ও রাজনীতির টুকিটাকি প্রসঙ্গ

চলতি পথে আড্ডাঃ চুক্তিবাস্তবায়ন ও রাজনীতির টুকিটাকি প্রসঙ্গ
…২ ডিসেম্বর ২০১০ পার্বত্য চুক্তির ১৩ বছর পূরণ হয়ে গেলো।তার পরের দিন অর্থাৎ গত ৩ নভেম্বর ছুটির দিন ছিল বলে ঐ দিন গ্রামে ঘুরতে যাচ্ছিলাম।যাবার পথে চুক্তিদিবস উদযাপন সম্পর্কে খবর জানার জন্যে খাগড়াছড়ি বাজার থেকে একটা ‘প্রথম আলো’ কিনে নিলাম।

আমার গন্তব্য ছিল বাউমোছড়া।অনেক দূরে। সেখানে যাওয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো কিছু ঔষধি চারা সংগ্রহ করা। আর চলতি পথে যতদূর পারা যায় একটু আধটু ঘুরে বেড়ানো।মোটরবাইক নিলাম।মোটরবাইক নিলেও সেখানে মোটরবাইক নিয়ে পৌঁছানো যায় না।সেখানে মোটরগাড়ী চলার উপযোগী কোন রাস্তা নেই। দুধুক ছড়াতে মোটরবাইকটা রেখে হেঁটে যেতে হয়।তবে সেদিন খাগড়াছড়িতে ফিরতে হবে এমন কোন তাড়া ছিল না।গ্রামে থাকবো এরকম প্রস্তুতি নিয়ে বের হয়েছিলাম।চলতি পথে জোরমরমের শিবমন্দির এলাকায় চা পানের জন্যে একটি চা দোকানে থামলাম।সেই চা-এর আসরে সাধারণ মানুষের চুক্তিকেন্দ্রিক অসাধারণ ভাবনা ও রসবোধে সমৃদ্ধ কথাবার্তা উপভোগ করার সুযোগ হলো।এ সুযোগটা পাওয়ার অন্যতম উপলক্ষ্য হলো আমার হাতে করে নেওয়া সেদিনের ‘প্রথম আলো’ পত্রিকাটা।সে কথায় পরে আসছি।

আমার চলতি পথে আমার সহযাত্রী হলো হাল্যাপেদা।প্রত্যেক নামের পেছনে এক একটা ইতিহাস থাকে।হাল্যাপেদা’র(বাংলায় মানে হলো ‘খালিপেটওয়ালা’)নামের পেছনের ইতিহাসটাও একটু বলে নিই। সে ছোটবেলায় নাকি খুব বেশি পেটুক ছিল। সবসময় নাকি বলতো, “আমার পেট খালি, আমি কিছু খাবো”।খাবার নিয়ে মা-বাবাকে প্রায়ই জ্বালাতন করতো।বিরক্ত হয়ে তার মা-বাবা নাম দিয়েছিলো হাল্যাপেদা।এখন সেটাই হয়ে গেছে তার আসল পরিচিতি।এনজিওতে চাকরী করার সুবাদে খাগড়াছড়ি জেলার অনেক দুর্গম জায়গায় ঘুরার অভিজ্ঞতা আছে। বিভিন্ন মানুষের সাথে চেনা-জানা আছে।তাই সেদিনের চলতি পথে সে ছিলো আমার মূল পথপ্রদর্শক।

আমি মোটরবাইক চালাচ্ছিলাম।৫০-৫৫ কি.মি. বেগে। পাহাড়ী রাস্তায় বেশি বেগে চালানো ঝুঁকিপূর্ণ ।৩০-৩৫ মিনিটের মধ্যে জোড়মরমের শিবমন্দির দোকানে পৌঁছে গেলাম।পানছড়ি থেকে আসা-যাওয়ার পথে সেখানে চা পান না করলে হাল্যাপেদার পেটের ভাত হজম হয় না। সেখানে পৌঁছামাত্র সে বলে উঠলো, “অডঙ, থাম, থাম, চা খেয়ে নিই। এখানে খাঁটি গরু দুধের চা পাওয়া যায়”।

‘না’ করতে পারলাম না।একপাশে মোটরবাইকটা দাঁড় করিয়ে রাখলাম। হেলমেটটা মোটরবাইকের হাতলে ঝুলিয়ে দিলাম। হাল্যাপেদা নেমে ধপ্ ধপ্ করে একটা চা দোকানে প্রবেশ করলো। তার পিছু পিছু আমিও গেলাম।শিবমন্দির এলাকাটা আমার অপরিচিত নয়। তবে আগের মত এ পথে আনাগোনা হয় না।আগে এতগুলো দোকান ছিল না। মন্দিরের কারণে এলাকাটা সাধারণ মানুষের কাছে সুপরিচিত ছিল। একসময় ঘটা করে শিবমেলা বসতো।দোকানে ঢুকে দেখলাম, কেবল চা নয়, চা-এর সাথে অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীও বিক্রি করা হয়।তবে চা খাইয়েদের জন্যে দোকানের একপাশে আলাদা করে বেঞ্চ বসানো হয়েছে।হাল্যাপেদা চা-এর অর্ডার দিচ্ছিলো, আর আমি একপাশে খালি বেঞ্চে বসে গেলাম।
বেশ কিছু লোক বসে বসে চা খাচ্ছিলো।আর বিড়ি টানছিলো। সবাই পুরুষ। মনে মনে ভাবছিলাম, এটা কী ইতিবাচক পরিবর্তন নাকি নেতিবাচক পরিবর্তন? গ্রামের চাকমারাও এখন চা পানে আসক্ত হয়ে পড়েছে!

দোকান দেখাশুনা করছিলেন একজন মধ্যবয়সী মহিলা।একদিকে টাকা গুণে নিচ্ছিলেন, অন্যদিকে চা-এর অর্ডার এলে কর্মঠ হাতে তৎক্ষণাত চা বানিয়ে দিচ্ছিলেন।বেশ দক্ষতার সাথে দোকানটা চালিয়ে নিচ্ছেন বলে মনে হলো।চা-এর অর্ডার দেওয়া শেষ হলে হাল্যাপেদা পাশে এসে বসলো। চা-এর জন্যে অপেক্ষা করছিলাম।
এর ফাঁকে হাতে করে নেওয়া ‘প্রথম আলো’ পত্রিকাটা বের করলাম একটু পড়ার জন্যে।পত্রিকা খুলতেই আরো দু’তিন জন লোক আমার কাছে এসে গা ঘেঁষে বসলো।কেউ কেউ উঁকি মেরে পড়ার চেষ্টা করছিলো।প্রথমে সম্পাদকীয় পড়ে নেওয়া আমার অভ্যাস। তাই ভেতরের পাতাগুলো হাতে রেখে প্রথম পাতাটা একজনকে দিয়ে দিলাম।পত্রিকা হাতে নিয়ে সে পড়তে লাগলো।
:চুক্তি বাস্তবায়নে আন্দোলনের ঘোষণা দিলেন সন্তু লারমা।
ঐ লোকটা সংবাদ শিরোনামটা পড়েই বলে উঠলো, “দেখো, দেখো, সন্তুবাবু আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছেন”।
বেঞ্চের শেষ মাথায় বসে থাকা মধ্যবয়সী লুঙ্গিপড়া একলোক বিড়ি টানতে টানতে বললো,
:গুদুঙ্যা, একটু জোরে জোরে পড় তো। আমরাও শুনি। সন্তুবাবু কী বলেছেন।
গুদুঙ্যা পড়তে লাগলো,
:পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সভাপতি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় (সন্তু) লারমা। ‘স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় এ চুক্তি বাস্তবায়িত হবে না’ – এ মন্তব্য করে গতকাল তিনি বলেছেন, আন্দোলনের মাধ্যমে চুক্তিবাস্তবায়নে সরকারকে বাধ্য করতে হবে।
গুদুঙ্যা সংবাদটা পুরো পড়ে শেষ করতে পারেনি। লোকটা বলে উঠলো,
:সন্তুবাবু তো অনেক দিন ধরে আন্দোলনের হুমকি-ধামকি দিয়ে যাচ্ছেন।কই এতদিন কী ‘ফেদা’(কাজের কাজ) করতে পেরেছেন?
ঐ লোকটার মুখে কয়েকটা কাঁচাপাকা মোস আর দাঁড়ি।পরনে কাদায় গাব ধরা ময়লা জামা। চাকমা ভাষায় ‘ফেদা’ শব্দটা খুব অবজ্ঞা অর্থে ব্যবহার করা হয়।ঐ লোকটার মুখ থেকে কেন ‘ফেদা’ শব্দটা বের হলো জানতে খুব ইচ্ছে হলো।না, কোন কথা জিজ্ঞেস করলাম না। নীরবে শুনে যাচ্ছিলাম কে কী বলছিল।
টেবিলের অন্যপাশে আরো একজন বলে উঠলো,
:ঝুঙঙো, তুমি কী বলো? সন্তুবাবু, ফাদাবাজত বিজে বাজেইয়্যা, চাট্টেই ন পারেল” (সন্তুবাবুর অন্ডকোষ ফাঁটাবাঁশের দুই চিলতের ফাকেঁর মধ্যে আটকে গেছে।এখন নড়াচড়া করতে পারছেন না)।
এই কথার সঙ্গে সঙ্গে অন্যারা হো হো করে হেসে উঠলো।কথা শুনে বুঝা গেলো ঐ লোকটা চাকমাদের কুরোকুট্যা গোজার।অবশ্য জোড়মরম এলাকায় অনেক কুরোকুট্যা গোজার লোক বসবাস করে।হাল্যাপেদা একসময় এ এলাকায় চাকরী করেছিল।তাই তাকে জিজ্ঞেস করলাম ঐ লোকটার নাম জানে কি না। বললো, ওর নাম হলো ভুদা।
ভুদার কথাটা বড্ড বেশি অমার্জিত শোনালেও সেখানে এক রুঢ় সত্য লুকিয়ে আছে।মুখ না খুলে পারলাম না। ভুদাকে জিজ্ঞেস করলাম,
: বা’জি, চাকমা প্রবাদ “ফাদাবাজত বিজে বাজনা” (ফাঁটা বাঁশে অন্ডকোষ আটকে যাওয়া)মানে কী?
ভুদা হে হে করে হাসি দিয়ে বললো,
:বাবু, চাকমারা কেন যে এ কথাটা বলে আমিও বুঝিনা।ফাঁটা বাঁশে কীভাবে মানুষের অন্ডকোষ আটকে যায় সেটা অবশ্যই ভেবে দেখার বিষয়। তবে কোন মানুষ যখন এদিকেও যেতে পারে না, ওদিকেও যেতে পারে না, তখন সেই অর্থে চাকমারা এ কথাটা প্রয়োগ করে থাকে। দেখো না, সন্তুবাবুর অবস্থা। চুক্তি করে কী বিপদে আছে। সরকার তা বাস্তবায়ন করছে না।সন্তুবাবু এখন না পারছেন চুক্তিটা বাদ দিতে, না পারছেন বাস্তবায়ন করতে।এর চেয়ে মনোকষ্ট কী আর হতে পারে বলো?
ভুদা কী বলতে চাচ্ছিলো তা বুঝতে অসুবিধা হলো না।কিন্তু চুক্তির ব্যাপারটা কী কেবল সন্তু লারমার একার বিষয়।সরকার ও জনগণের কী কোন করণীয় নেই? ভুদার অভিমত জানতে জিজ্ঞেস করলাম,
:আচ্ছা বা’জি, বলেন তো, চুক্তি কী কেবল সন্তু লারমার একার বিষয়? চুক্তি বাস্তবায়ন বিষয়ে আমাদের জনগণের কী কোন দায়িত্ব নেই?
:বাবু, তোমরা শিক্ষিত রাজনৈতিক নেতারা যা মনে করো সেটার বাইরে আমাদের বলার কী আছে, করার বা কী আছে? আমরা তো রাজনীতি বুঝি না।
ভুদা এখন কথাটা একটু ইতস্তত: করে বললো।প্যান্ট-শার্ট ও জুতা পরা ভদ্রলোক দেখে ভুদা বোধয় আমাকে কোন রাজনৈতিক দলের কর্মী ভেবেছিল। তাকে অভয় দিয়ে বললাম,
:বা’জি, আমি কোন নেতা নয়, কোন রাজনৈতিক দলের সাথেও জড়িত নেই। আপনার মত আমিও খেটে খাওয়া মানুষ। রাজনীতি করি না। যা আলাপ করছেন তা শুনতে বেশ ভাল লাগছে। কেবল রাজনৈতিক নেতাদের উপর রাজনীতি ছেড়ে দিলে তো হবে না। আমাদেরও আমাদের মত করে রাজনীতি সম্পর্কে ভাবতে হবে। আর আলোচনা করতে তো কোন অসুবিধা নেই। নির্ভয়ে কথা বলে যান।
ভুদা মাথায় হাত বুলিয়ে চা-এর কাপে এক চুমুক দিলো। বললো,
:বাবু, যা দিনকাল পড়েছে, মেপে মেপে কথা বলতে হয়।চর্মমুখে জিহবাটা নাড়ালেই অনেক কথা বের হয়ে যায়। কিন্তু জিহবা নাড়াতে গেলে অনেক সময় বিপদে পড়তে হয়।আমার বদ অভ্যাসটা এখনো ছাড়তে পারিনি।অনেক সময় বেফাঁস কথাবার্তা বলে ফেলি।
ভুদার কথা শুনে হাল্যাপেদাও আর চুপ করে থাকতে পারলো না।সে বললো,
:ভুদা কাকু, আপনিও কী যে বলেন!আপনি হলেন এ এলাকার মুরুব্বি।আপনার ভয় কিসের?
:আরে ভাইপুত, তুমি কী বলো? রাজনৈতিক নেতারা তো এখন মুরুব্বিদের মাথার উপর চিদোল (এক ধরনের শুটকি)পুড়ে খাচ্ছে।আমরা মুরুব্বি নয়, ওরাই এখন আমাদের মুরুব্বি।
:ভুদা কাকু, আপনার কথা একদিক থেকে ঠিক।গায়ে মানে না আপনি মোড়ল। জনগণ না মানলেও আমাদের নেতারা মনে করে জাতির সব ভালোমন্দ কেবল ওরাই বুঝে।
এই বলে হ্যাল্যাপেদা আমাকে ভুদা কাকুর সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললো
:ভুদা কাকু, এ হলো অডঙ বাবু।আমার অন্তরঙ্গ বন্ধু।অত্যন্ত নিরিবিলি মানুষ।সে আপনার মাথার উপর ‘চিদোল’ পুড়ে খাবে না।একটু আধটু কলম চালায়।ভয় নেই, নির্ভয়ে তার সাথে আলাপ চালিয়ে যেতে পারেন।
:ওহ তাই?ঠিক আছে। এই বলে ভুদা কাকু চা কাপে এক চুমুক দিলো।
ওদিকে দোকানের কার্নিসের নীচে দাঁড়ানো আরো এক লোক চুপচাপ করে বিড়ি টানছিলো। আর আমাদের কথাবার্তা শুনছিলো।দা হাতে কোথাও যাচ্ছিলো বোধয়।চলে যাওয়ার সময় স্বগতোক্তির মত করে বলে উঠলো,
:দূর! ‘মান্যা’ ‘ন-মান্যা’ (চুক্তির পক্ষ-বিপক্ষ)নেতাদের কথা বললে তো আফসোসের সীমা নেই। নিজেরাই মারামারি করতে করতে জাতিকে ধ্বংস করে ফেললো।
চাকমা ভাষার একটা প্রবাদ আওড়িয়ে সে আরো বললো,
:বান্দর কবাল টারেঙত, গুইয়ো কবাল সুরুঙত (বানরের বসবাস বন বাদাড়ে, গো-সাপের বসবাস সরু গর্তে)।ওই নেতাদের দিয়ে আমাদের মত খেটে খাওয়া মানুষদের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হবে না।চুক্তি বাস্তবায়ন হলে কী, আর পূর্ণস্বায়ত্তশাসন হলে কী?চুক্তি পূর্ণ বাস্তবায়ন হলেও সন্তুবাবুরা বিনাপয়সায় একবেলা ভাত খাওয়াবে না। আর পূর্ণস্বায়ত্তশাসন হলেও প্রসিতবাবুরা এসে আমার ধানক্ষেতে একবেলা আগাছা পরিস্কার করে দেবে না।যাই, আমার কাজে আমি যাই।
কথা শেষ করতে না করতেই লোকটা বিড়িতে বড় একটা টান দিলো আর বিড়ির শেষ মাথাটা টুপ্ করে তিন আঙুলের মাথা দিয়ে ছুঁড়ে মারলো।তারপর ধোঁয়াটা মুখে কয়েক সেকেন্ড আটকে রেখে নাক মুখ দিয়ে ধোঁয়া বের করতে করতে চলে গেলো।
লোকটার নাম কী জানা হলো না। ভাবছিলাম, গ্রামের সাধারণ মানুষ যাদেরকে আমরা অশিক্ষিত বলে মনে করি তারা কত স্বচ্ছন্দ্যে প্রবাদবাক্যগুলো ব্যবহার করে থাকে।আর সেগুলোতে লুকিয়ে আছে যুগ যুগ ধরে সঞ্চিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা।ঐ লোকটা কত স্বচ্ছন্দ্যে বানর আর গুই সাপের ভাগ্যের সাথে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের ভাগ্যের তুলনা দিয়ে চলে গেল।লোকটার কথা একেবারে ফেলনা নয়।একদিক থেকে চিন্তা করলে জেএসএস-এর চুক্তিবাস্তবায়নের সংগ্রাম কিংবা ইউপিডিএফ-এর পূর্ণস্বায়ত্তশাসনের আহবান দু’টোই ঐ লোকটার মত খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের কাছে অর্থহীন।যাদের দৈনন্দিন জীবনের সিংহভাগ সময় কেটে যায় খাবার সংগ্রহ আর পরিবার পরিজন ভরনপোষণের চিন্তায়, তাদের কাছে চুক্তিবাস্তবায়ন কিংবা পূর্ণস্বায়ত্তশাসনের কথা নিতান্তই পরিহাস শোনায়। চুক্তিবাস্তবায়ন, পূর্ণস্বায়ত্তশাসন এসব দুর্বোধ্য রাজনৈতিক শব্দ নিয়ে তাদের বোধয় মাথা ঘামানোর ফুরসত নেই।চুক্তিবাস্তবায়ন আর পূর্ণস্বায়ত্তশাসনের নামে যারা মারামারি করে, পরস্পরের জীবন হরণ করে তাদের দিয়ে সাধারণ মানুষের সুখ আসবে, ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হবে এমন বিশ্বাস তারা মনের মধ্যে রাখতে পারে না।অন্তত ঐ লোকটার কথাতে তা প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, কিন্তু সেই প্রতিধ্বনি কী চুক্তিপন্থী কিংবা পূর্ণস্বায়ত্তশাসনপন্থী নেতাদের কানে পৌঁছায়?
ঐ লোকটার কথাগুলো ভাবতে ভাবতে চা কাপে চুমুক দিচ্ছিলাম।পত্রিকার পাতায় এদিক ওদিক চোখ বুলাচ্ছিলাম।এমন সময় গুদুঙ্যা একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলো ভুদাকে,
:ভুদা কাকু, সন্তুবাবু তো বলেই ফেললেন, স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় চুক্তি আর বাস্তবায়িত হবে না।এ ব্যাপারে আপনার অভিমত কী?
প্রশ্ন শুনে ভুদা একটু নড়েচড়ে উঠলো।কী বলবে চিন্তা করছিলো বোধয়। ডানহাত দিয়ে বাম হাতের আঙুলগুলো ভাঙতে ভাঙতে বললো,
:ভাইপুত, আমরা তো সাধারণ মানুষ।অভিমত দেওয়ার কোন যোগ্যতা আমাদের নেই। মাঝে মাঝে যা বলি সেটা হলো স্রেফ ছোটমুখে বড় কথা।সন্তু বাবু নিজে বুঝেন স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় না হলে অস্বাভাবিক প্রক্রিয়াটা কী হবে।
:সেটা কী আবার জঙ্গলে যাওয়া? মানে আবার অস্ত্র হাতে নেওয়া?
ভুদা আর কোন উত্তর দিলো না। এক হাতে দুই আঙুলের ফাঁকে সানমুন সিগারেট জ্বলছে, অন্যহাতে চা কাপ।মাঝে মাঝে চা কাপে চুমুক দিচ্ছে, আর সিগারেটে টান মারছে।সিগারেটের ধোঁয়াটা মুখে কুলিকুলি করার মত করে কিছুক্ষণ ধরে রেখে ফু করে উপর দিকে ছুঁড়ে দিচ্ছে।কেমন যেন অন্যমনস্ক দেখাচ্ছে।
:ভুদার কথার স্টক শেষ হয়ে গেলো না কী? ভুদার পাশে বসা আরো এক বয়স্ক লোক বলে উঠলো।
:আরে না, ভেজালিবাপ।সন্তুবাবু আর প্রসিতবাবুদের কথা উঠলে একটু চিন্তা করতে হয় বৈকি।
এতক্ষণ চুপ করে চা পান করছিল ভেজালিবাপ।বয়স ষাটের উপরে হবে বলে মনে হলো।হাল্যাপেদার কাছে জানা গেল, ভেজালিবাপ মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত পড়ালেখা করেছিল। একসময় জেএসএস-এর পক্ষে গ্রাম পঞ্চায়েতে কাজ করতো।এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের একজনও বটে।সে বললো,
:এখন আমাদের পাহাড়ীদের রাজনীতি নিয়ে আলাপ করতে স্বস্তি পাই না।একসময় আমাদের পার্টির (মানে জেএসএস) নেতারা যখন পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ইতিহাস, পাহাড়ীদের অধিকার নিয়ে আলাপ করতো তখন খুব মজা লাগতো। মুগ্ধ হয়ে শুনতাম। গা শিহরণ দিয়ে উঠতো। আর এখন শুনি, অমুক জায়গায় জেএসএস-র সমর্থকরা ইউপিডিএফ-এর সমর্থককে অপহরণ করেছে, খুন করেছে।ঠিক একই ভাবে, ইউপিডিএফ-র সমর্থকরা তমুক জায়গায় জেএসএস-এর সমর্থককে খুন করেছে, অপহরণ করেছে ইত্যাদি ইত্যাদি।এরকম ভ্রাতৃঘাতী হানাহানি, মারামারির কারণে পাহাড়ের রাজনীতির মজাটাই শেষ হয়ে গেছে। যা হোক, ঝুঙঙো আর ভুদা যেহেতু রাজনীতি নিয়ে আলাপটা ফেনিয়ে তুলেছে, সেহেতু গলায় সুড়সুড়ি লাগছে।দু-একটা কথা তো বলা যায়, তাই না?
:হ্যাঁ, হ্যাঁ, জ্যাঠাবাবু।আপনার মন্তব্য শুনতে পেলে সেটা হবে বোনাস। বললো গুদুঙ্যা।
ভেজালিবাপ একটু বিনয়ের সঙ্গে বললো,
:বাইরের দুনিয়া থেকে অনেক বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকি।কোথায়, কখন, কী ঘটছে আমিও বা কী জানি।সাধারণ জ্ঞানে যা দেয় তা বলতে পারি।
:নিশ্চয়ই। গুদুঙ্যা সমর্থন জানালো।
হাল্যাপেদার দিকে তাকিয়ে ভেজালিবাপ আরো বললো,
:আমার মনে হয় ঐ বাবুটা (অডঙ)বোধয় নিয়মিত পত্রপত্রিকা পড়ে। টাউনের লোক। অনেক খবরাখবর রাখতে পারে। আগে তার মতামত শুনতে পেলে খুব ভালো হতো মনে হয়।
মনে হলো ভেজালিবাপ আমাকে খোঁচা মেরে কিছু কথা বের করতে চাচ্ছিলো।আমি বললাম,
:বা’জি, রাজনীতি সম্পর্কে আমি বোকা।আমাদের জুম্মদের হানাহানির রাজনীতি সম্পর্কে আরো বেশি বোকা।জেএসএস-ইউপিডিএফ-এর রাজনীতি আমিও বুঝি না।বয়সে আপনারা অভিজ্ঞ। জীবনে অনেক কিছু দেখে আসছেন। আপনাদের থেকেই বরং আমরা অনেককিছুই জানতে পারবো। আপনারা কথা বলেন আর আমি যা বুঝি আপনাদের কথার ফাঁকে ফাঁকে কিছু যোগ করবো।
:তাই হোক।
এই বলে ভেজালিবাপ সন্তুবাবুর বক্তব্যের ব্যাপারে তার মন্তব্য জানালো,
:সন্তু বাবুকে কাছে থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়নি। তাই তিনি ব্যক্তি হিসেবে কেমন জানিনা।তবে রাজনৈতিক নেতা হিসেবে তার কথা বার্তায় আরো আত্মপ্রত্যয়ী, বাকসংযমী এবং কৌশলী হওয়া উচিত।যে কথার দাম নেই সেই কথা বলে নিজের তথা তার পার্টির গুরুত্বকে হালকা করা কোনভাবে ঠিক নয়।
হাল্যাপেদা আর গুদুঙ্যা ভেজালিবাপের কাছে সন্তুবাবুর ‘আত্মপ্রত্যয়ী, বাকসংযমী এবং কৌশলী’ হওয়া মানে কী তার ব্যাখ্যা চাইলো।ভেজালিবাপের বিশ্লেষণটা ছিল এরকম,
: সন্তুবাবুর আত্মপ্রত্যয়ী ও বাক সংযমী হওয়ার মানে হলো, যেটা তার দ্বারা সম্ভব নয়, সেইকথা তার বলা উচিত নয়।কেবল যেটা করতে পারবেন সেটা দৃঢ়তার সাথে বলা উচিত। ঐ যে, গুদুঙ্যা প্রথম আলোর সংবাদটা পড়ে শোনালো – স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় চুক্তি বাস্তবায়ন হবে না। সন্তুবাবুর এ বক্তব্যের মানে কী? তিনি কী আবার জঙ্গলে ফিরে যাওয়ার কথা বুঝাচ্ছেন? তিনি তো এর আগেও বেশ অনেকবার অস্ত্র হাতে নেওয়ার হুমকী দিয়েছিলেন।কিন্তু তার কী সেই বাস্তবতা ও প্রস্তুতি আছে?সন্তুবাবু যেটা করতে পারবেন না সেই কথা বললে তার নিজের ভাবমূর্তি যেমন নষ্ট হবে, তেমনি তার পার্টির গুরুত্বও কমে যাবে।সেটা কখনো কাম্য হতে পারে না।আমার সাফ কথা হলো, কড়া কড়া কিছু বলতে হলে তিনি নিজে বলবেন না, দলের অন্য কাউকে দিয়ে সেটা বলাবেন।
অন্যদিকে “কৌশলী” হওয়ার অর্থ হলো কঠিন ও অপ্রিয় সত্য কথা বলার সময় দেশের সার্বিক রাজনৈতিক অবস্থা, যেটাকে উনারা বলেন বুর্জোয়ারাজনীতি, এবং আমলাতন্ত্র ও সামরিকতন্ত্রকে বিবেচনায় নেওয়া উচিত। এমনভাবে কথা বলা উচিত, যাতে “সাপও মরে, লাঠিও না ভাঙে”। সন্তুবাবুরা তো ভালো বুঝেন, বুর্জোয়া রাজনীতিবিদ, বুর্জোয়া আমলা ও বুর্জোয়া মিলিটারিদের যতই গালি দেওয়া হয়, ততই তারা জেদ ধরে।বাংলাদেশের বুর্জোয়া আমলাতন্ত্র ও সামরিকতন্ত্র চুক্তিবাস্তবায়নে সহযোগিতা করছে না এটা তো বাস্তব সত্য।কিন্তু তাই বলে লাগামহীনভাবে বাগাড়ম্বর কথা বলে তাদের সাথে বিদ্যমান সম্পর্ক নষ্ট করে কী লাভ? সন্তুবাবুর বুঝতে হবে, একচেটিয়া রাষ্ট্র ক্ষমতা তার হাতে নেই, দেশে পরমত সহিষ্ণু গণতন্ত্র নেই।তাকে এ চরম সত্যটাও অনুধাবন করতে হবে, আমলাতন্ত্র ও সামরিকতন্ত্রের সহযোগিতা ছাড়া কেবল সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা দিয়ে চুক্তিবাস্তবায়ন হবে না। তাঁকে বুঝতে হবে কীভাবে ঐ দুই তন্ত্র কাজ করে।ঐ দুই তন্ত্রের সহযোগিতা পেতে হলে তাকে অনেক অনেক কৌশলী হতে হবে।আস্থার পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।
ভেজালিবাপের কথাগুলো শুনছিলাম।মনে হলো তার যুক্তিগুলো একেবারে ফেলে দেওয়ার মত নয়।কিন্তু রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া কীভাবে দুই তন্ত্র কাজ করবে? ভেজালিবাপকে এ প্রশ্ন রাখলাম। সে বললো,
:ভাইপুত, তোমার প্রশ্নটা যৌক্তিক। কিন্তু এ প্রশ্নের কোন সহজ সরল উত্তর নেই।তবে প্রয়োজন বিভিন্ন দিক থেকে এ সমস্যার যথাযথ বিশ্লেষণ ও কার্যপদক্ষেপ। আঞ্চলিক পরিষদের নেতা হিসেবে সন্তুবাবু কীভাবে সমস্যাকে বিশ্লেষণ করেন জানিনা।তবে তার কথাবার্তা থেকে আমার যেটুকু মনে হয় সেটা হলো, তিনি রাজনৈতিক বিষয়ের উপর বেশি জোর দিচ্ছেন, আর সব সমস্যা সমাধানের জন্যে কেবল সরকারের দিকে তাকিয়ে আছেন।অন্যদিকে আমলাতন্ত্র ও সামরিকতন্ত্রকে পক্ষে আনার জন্যে, নিদেনপক্ষে তাদেরকে নিরপেক্ষ রাখার জন্যে তিনি কোন কার্যপদক্ষেপ নেননি। অন্তত আমার চোখে তা ধরা পড়েনি।আমার মনে হয় এখানেই তার কৌশলগত সমস্যা।আমার সহজ বিশ্লেষণ হলো, সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলেও যদি আমলাতন্ত্র ও সামরিকতন্ত্র সহায়তা না করে তাহলে সেখানে চুক্তিবাস্তবায়ন হওয়া এত সহজ নয়। আর আমলাতন্ত্র ও সামরিকতন্ত্র যদি সহায়তা দেয় তাহলে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা অর্জন সহজতর হবে।
ভেজালিবাপের অংশগ্রহণে আলাপটা বেশ জমে উঠেছে।গুদুঙ্যাকেও রাজনৈতিক আলাপে বেশ আগ্রহী বলে মনে হলো। ভেজালিবাপের কথার প্রেক্ষিতে সে বললো,
:কিন্তু সন্তু বাবু তো বারবার অভিযোগ করে আসছেন আমলাতন্ত্র ও সামরিকতন্ত্র চুক্তিবাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করছে।সরকার নির্দেশ না দিলে কীভাবে ওদের থেকে সহায়তা পাওয়া সম্ভব?
ভেজালিবাপ এর মধ্যে একটা সিগারেট জ্বালালো।গোল্ডলিফ।সিগারেটে ছোট একটা টান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে দিয়ে বললো,
:আমলাতন্ত্র ও সামরিকতন্ত্র বাধা সৃষ্টি করছেই বলে তো ওদের সহায়তার প্রশ্ন আসছে। কিন্তু সরকার ওদের নির্দেশ দেবে মানে কী? সরকার বলতে কী কেবল প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রী-এমপিদের বুঝায়? আমলাতন্ত্র ও সামরিকতন্ত্রও সরকারের অংশ। সন্তু বাবুও তো এখন সরকারের অংশ।তাঁকে বুঝতে হবে, কেবল মন্ত্রী-এমপিদের নির্দেশে আমলাতন্ত্র ও সামরিকতন্ত্র কাজ করে না।গতিশীল আমলাতন্ত্র ছাড়া মন্ত্রী-এমপিরাও অচল।বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রে একজন কেরানীর কেরামতিও অনেক।কেরানীর কেরামতিতে অনেক ফাইল উপরে উঠে আর নীচে নামে, আর কখনো গায়েব হয়ে যায়।
:সবই তো বুঝলাম।প্রশ্ন হলো, সন্তুবাবু কীভাবে আমলাতন্ত্র ও সামরিকতন্ত্রের সহায়তা পেতে পারে? গুদুঙ্যার প্রশ্ন।
ভেজালিবাপের উত্তর,
:এ প্রশ্নের এককথায় কোন উত্তর নেই।
সে আরো বললো,
:চাকমা ভাষায় একটা কথা আছে, গাছকে গাছ দিয়ে ধরতে হয়, বাঁশকে বাঁশ দিয়ে বাঁধতে হয়।চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও তাই। নেতা হিসেবে এবং সরকারের অংশ হিসেবে সন্তুবাবুকে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিতে হবে চুক্তিবাস্তবায়ন সংশ্লিষ্ট যারা আছেন তাদের মধ্যে কাকে দিয়ে কাকে ধরবেন আর কাকে দিয়ে কাকে বাঁধবেন।এজন্যে তো তার কৌশলী হওয়ার প্রশ্নটা আসছে। জানিনা, তাদের পার্টির মধ্যে যথাযথ ফোরামে এ ব্যাপারে বিস্তারিতভাবে আলাপ-আলোচনা ও পর্যালোচনা হয় কি না; কখনো কোন কর্মকৌশল ও কর্মসূচী গৃহীত হয়েছিলো কী না।
ভেজালিবাপের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ বেশ ভালো লাগছিলো।এদিকে হাল্যাপেদা আমাকে মাঝে মাঝে খোঁচা মারছিলো কখন উঠবো।তাকে বললাম, আরো কিছুক্ষণ সময় নিলেও কোন ক্ষতি নেই।
ভুদা কাকু এর মধ্যে উঠে চলে গেছে। “স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় চুক্তি আর বাস্তবায়িত হবে না” সন্তুবাবুর এ বক্তব্যের ব্যাপারে গুদুঙ্যা ভুদা কাকুর কাছে তার মন্তব্য জানতে চেয়েছিলো। অথচ এতক্ষণ আলাপের পরেও সে ব্যাপারে সুনির্দিষ্টভাবে আলাপ হয়নি। তাই ভেজালিবাপের কাছে একই প্রশ্ন রাখলাম – চুক্তিবাস্তবায়ন সম্পর্কে সন্তুবাবুর বক্তব্যের ব্যাপারে তার মন্তব্য কী?
ভেজালিবাপ একটু ভেবেচিন্তে প্রশ্নের উত্তর দিলো। তার উত্তরটা অনেকটা এরকম,
:“স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় চুক্তিবাস্তবায়ন হবে না” বলতে সন্তুবাবু কী বুঝিয়েছেন জানিনা।তবে আমার মতে, অস্বাভাবিক প্রক্রিয়াগুলোর মধ্যে একটা হতে পারে আবার সশস্ত্র আন্দোলনে যাওয়া।কিন্তু এই বাস্তবতা তার হাতে নেই।আরো একটা বিকল্প প্রক্রিয়া আছে বলে মনে হয়। সেটা হলো চুক্তিবাস্তবায়নে সরকারের কাছে আর দেন দরবার না করে ‘একলা চলো’ নীতি গ্রহণ করা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে বিকল্প জুম্ম সরকার গঠন করা।কিন্তু সন্তুবাবু দ্বিতীয় প্রক্রিয়াটার কথা বুঝাচ্ছেন কী না?
:বিকল্প জুম্ম সরকার মানে কী? ভেজালিবাপকে একটু বিশ্লেষণ করতে অনুরোধ করলাম।সে বললো,
: ব্যাপারটা একটু অদ্ভুদ শোনায় বটে।তবে আমি মনে করি সম্ভব।
:কীভাবে?
:জুম্মদের তো বিকল্প সরকার ব্যবস্থা ছিলো। এখনো আছে কোন না কোনভাবে। এটাতে একটু পরিবর্তন আনলেই হবে।
:রাজাদের নেতৃত্বে প্রথাগত শাসনব্যবস্থার কথা বলছেন? জিজ্ঞেস করলাম ভেজালিবাপকে।
:অনেকটা তাই।তবে পরিবর্তিত একটি গণতান্ত্রিক হাইব্রিড শাসন ব্যবস্থার কথা বলছি।হাইব্রিড এই অর্থে প্রথাগত শাসনব্যবস্থারও ভূমিকা থাকবে, আর গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রতিনিধিদেরও ভূমিকা থাকবে।
:একটু ব্যাখ্যা দেবেন কী? আবার প্রশ্ন করলাম ভেজালিবাপকে।
ভেজালিবাপ তার ভাবনাটা বিশ্লেষণ করলো,
:আমাদের জুম্মজনগণ সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার আশায় সরকারি অফিসের বারান্দায় বারান্দায় গিয়ে খুব একটা ঘোরাঘুরি করে না। আগেকার দিনে করতোই না বললে চলে।অর্থাৎ বর্তমানের তথাকথিত সরকারের সাহায্য ছাড়া আদিবাসীদের জীবন চলতো, এখনো চলে। এখনো এমন এমন এলাকা আছে, গ্রাম আছে সে জায়গাগুলোতে যারা বসবাস করে তাদের জীবনে কখনো বাংলা সরকারের সাহায্য বা সুবিধা যায় নি। তাদের কাছে ‘বাংলা সরকার’ একটি অর্থহীন শব্দ। তাদের কাছে এখনো আমাদের রাজা-হেডম্যান-কার্বারীরাই হলো সরকার। স্থানীয়ভাবে হেডম্যান কার্বারীরাই সামাজিক বিচার আচার ও সামাজিক শৃংখলা বজায় রাখেন। প্রথাগত শাসন ব্যবস্থার গুরুত্ব এবং ঐতিহাসিক ভিত্তি আছেই বলেই তো রাজা-হেডম্যান-কার্বারীদের ভূমিকা পার্বত্যচুক্তিতে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে।এখন শুধু প্রয়োজন এই প্রথাগত শাসন ব্যবস্থার সাথে আধুনিক গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় সাধন করে আদিবাসী বিশ্বাস ও মূল্যবোধের সাথে সংগতি রেখে একটা হাইব্রিড শাসন ব্যবস্থা কায়েম করা। এ রকম আদিবাসী সরকার/শাসন ব্যবস্থা দেশের ভৌগলিক সীমারেখার মধ্যেই সম্ভব। কেননা, দেশের সংবিধান বলে দিয়েছে, যে কোন সংগঠনে একত্রিত হওয়া প্রত্যেক নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার।আদিবাসীদের অধিকার আছে নিজেদের সরকার ব্যবস্থা নিজেদের নির্ধারণ করার।
:জ্যাঠাবাবু, আপনার বিকল্প সরকারের ধারনাটা ঠিক ধরতে পারছি না। গুদুঙ্যা বললো।
:আরে না বুঝার কী আছে?যেমন জেএসএস-র উদাহরণটা দেখো। জেএসএস যখন জঙ্গলে ছিলো তখন তো ওরা নিজেরাই একটা সমান্তরাল সরকার পরিচালনা করেছিলো। গ্রামপঞ্চায়েত ছিলো, সেক্টর ছিলো, বিচার বিভাগসহ বিভিন্ন বিভাগ ছিলো।গ্রামের লোকজন গ্রামপঞ্চায়েতের মাধ্যমে জেএসএস সরকারকে রাজস্ব দিতো। ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ কিংবা কোন গুরুতর সমস্যা দেখা দিলে যেগুলো গ্রামের কার্বারী বা হেডম্যানরা সমাধান দিতে পারতেন না সেগুলো জেএসএস-এর কাছে পাঠানো হতো।তখন তো ওরা এসব সমস্যার সমাধান করতো। তখন তারা একটা বিকল্প সরকার পরিচালনা করতে পারলে, এখন চুক্তি বাস্তবায়নের জন্যে সন্তুবাবু কিংবা জেএসএস কেন শুধু সরকারের দিকে তাকিয়ে আছেন? নিজেদের পূর্ব অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে কেন নিজেরাই নিজেদের জুম্ম সরকার গঠন করতে উদ্যোগী হচ্ছেন না? যখন ওরা জঙ্গলে ছিল তখন তো আর্মি-বিডিআরের ভয় ছিল। এখন তো সে ভয় নেই।গণতান্ত্রিক পন্থায় শান্তিপূর্ণ উপায়ে জনগণকে সংগঠিত করতে পারবেন।
ভেজালিবাপ আরো স্বগতোক্তির মতো বলে গেলো,
:সরকার সন্তুবাবুকে বিশ্বাস করে না। সন্তুবাবুও সরকারকে বিশ্বাস করেন না।চুক্তিবাস্তবায়ন হবে কীভাবে?
আমি ভেজালিবাপকে প্রশ্ন করলাম,
:তাহলে এই বিশ্বাসহীনতার মধ্যে করণীয় কী?
ভেজালিবাপ তৎক্ষণাত উত্তর দিলো
:কবিগুরু রবি ঠাকুর বলেছেন, মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ। এই পাপ হতে রক্ষা পেতে হলে অন্তত নিজের উপর বিশ্বাস রাখতে হবে সন্তুবাবুকে, আর জেএসএসকে।বেঈমান সরকারের সাথে গলাবাজি না করে নিজেদের জুম্ম সরকার গঠন করতে সন্তুবাবু আর জেএসএসকে গণমানুষের কাছে এখন ফিরে যেতে হবে।
গুদুঙ্যার প্রশ্ন করলো,
:সন্তুবাবু কী গণমানুষের কাছে ফিরে যেতে পারবেন?
ভেজালিবাপ শুধু মুচকি হাসি দিলো। সেই হাসির অর্থ বুঝা গেলো না। এর অর্থ ‘হ্যাঁ’ও হতে পারে, ‘না’ও হতে পারে।
মনে মনে আমারও প্রশ্ন জাগলো, পার্বত্য রাজনীতিতে চুক্তিকে ঘিরে জেএসএস-ইউপিডিএফ মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। কেউ কাউকে ছাড় দেয় না।তাদের নাছোড়বান্দা মারামারিতে পার্বত্য জনপদের গণমানুষের বিশ্বাস প্রতিনিয়ত ধর্ষিত হচ্ছে। এ পাপের প্রায়শ্চিত্ত কে করবে?
হ্যাল্যাপেদা তার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে হঠাৎ বলে উঠলো,
: কোন উত্তর নেই, কোন উত্তর নেই। কথারও শেষ নেই। চলো চলো।সময় চলে যায়।

বুঝলাম না, হাল্যাপেদা কার প্রশ্নের উত্তর দিলো।গুদুঙ্যার নাকি আমার মনের প্রশ্নের?

চললাম দূর পাহাড়ের গন্তব্যে ঔষধি চারার সন্ধানে।

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/839

Page 23 of 27« First...10...2122232425...Last »