লাম্বা-বাদি’র ইতিহাসের পোস্ট মোর্টেম রিপোর্ট কার ঘরে ?

রাতের বেলায় জুম্ম চবাশালের অনেক মন্তব্যের সাথে ওদং দার অনুদিত এই মন্তব্যটি ও পড়েছিলাম। বাংলা হরপে লেখাটির এই সংস্কারটি আবারও পড়লাম। আশা করি, জুম্ম চবাশালের বাকী মন্তব্যগুলি নিয়ে আপনিও দেশবাসীকে আরো সুন্দর সুন্দর অজানা তথ্য উপহার দেবেন, উন্মোচন করবেন প্রকৃত সত্য। এই সম্পর্কে আমি যতদূর শুনেছিলাম মনে করতে পারি তারো অনেক কম। তারপরও ঘটনার পটভুমি থেকে অবস্থাকে দেখার চেষ্টা করছি এই ছোট্ট লেখার মাধ্যমে। বিস্তারিত পড়তে ক্লিক করুন.. »

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/1156

এম এন লারমার ২৮ তম মৃত্যু বার্ষিকী ও অন্যান প্রসঙ্গ

এম এন লারমার ২৮ তম মৃত্যু বার্ষিকী ও অন্যান প্রসঙ্গ

[রোমান হরফে বাংলা পড়তে অনেক সময় বেশ কষ্টদায়ক। তাই Jummo Chobachalএর লেখাটা রোমান হরফ থেকে বাংলায় ভাষান্তরিত করে পাঠকদের জন্যে এখানে পোস্ট করে দিলাম। লেখাটা পাঠকদের অনেক অজানা কৌতূহলের মীমাংসা করতে পারে।]

আজ ১০ নভেম্বর জুম্ম বলিষ্ঠ কন্ঠস্বর এম এন লারমার ২৮ তম মৃত্যু বার্ষিকী। তিনি যে পথ দেখিয়েছিলেন, তার [প্রতি]ফল আজ সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রামের ১০ ভাষাভাষী এগারটি জুম্ম জাতির ঘরে ঘরে বিরাজ করছে। তিনি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে জুম্ম জাতির প্রতিনিধি হিসেবে বিশাল ভোটে যে জয় করে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। তখনকার সময় জাতীয় সংসদে বসে যে দাবী তুলেছিলেন আজ পর্যন্ত জুম্ম জনগণকে সে দাবী আদায়ের জন্যে লড়াই ও সংগ্রাম করতে হচ্ছে। তাকে জুম্ম জাতীয় চেতনার অগ্রদূত বলা যায়। তিনি তখন রাঘব বোয়ালের টাপ্পর ছাড়াও পুঁতি মাছের টাপ্পরও খেয়েছিলেন। তখন তিনি চিন্তা করলেন, এভাবে দাবী আদায় করা যাবে না। তাই সৃষ্টি করলেন শান্তিবাহিনী। বিস্তারিত পড়তে ক্লিক করুন.. »

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/1152

পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘটিত গণহত্যা

পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘটিত গণহত্যা

[ ঈদের ছুটি শেষ হয়ে আসছে, আসছে পরীক্ষার মৌসুম। তাই সামনে ব্যস্ত দিনের কথা চিন্তা করে লেখাটি একটু আগে ভাগে ছেড়ে দিচ্ছি।]

১০-ই নভেম্বরের শোক কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই আবারও হৃদয়ে বেদনার রক্ত ক্ষরণের আভাস পেলাম। এই রক্ত ক্ষরনের রঙ গনহত্যা, ধর্ষন, দখল, লুটপাট, উচ্ছেদ সহ সকল রাস্ট্রীয় অন্যায়-অবিচার-নিপীড়ন-শোষন-শাসনের জাটাকলে পীষ্ট অভাগী-দূর্ভাগা জুম্মজাতির বেদনার বর্ন। এই বেদনার বর্নকে বর্ণীল করে চলছে রাস্ট্রীয় প্রশাসনের নাকের দগায় বসে নরঘাতকের হিংসার উল্লাসনৃত্য। উল্লাসের উচ্চারিত ধ্বনি জুম্ম পাহাড়বাসীকে বলে দিচ্ছে এই রাস্ট্র তাদের চায় না, চায় তাদের পাহাড়, ভুমি, সম্পদ! সাধয়ারনভাবে দেখলে এই রক্তক্ষরন পাহাডের জুম্মদের জীবনের সাথে এমনভাবে মিশে গেছে যে তাকে আর আলাদাভাবে দেখাটা অনেকের মনপূত নাও হতে পারে! তারপরও জুম্ম হিসেবে নিজের মানবিক চেতনা ও দায়িত্ববোধকে পাশ কাটিয়ে যেতে পারছি না বলে এই টুকরো টুকরো ইতিহাসকে স্মরন করতে বাধ্য হচ্ছি। প্রথমে খুব লজ্জার সাথে বলতে হচ্ছে যে, “পাহাড়ে এযাবত কালে কয়টি গনহত্যা শিকার হয়েছে আমাদের এই জুম্মজাতি/বা জুম্মদের বিরুদ্ধে উল্ল্যেখযোগ্য কয়েকটি গনহত্যার ইতিহাসের কথা”  এরুপ প্রশ্ন জানতে চাইলে আজকে আমাদের মত তরুন প্রজন্ম না জানার লজ্জায় মাধা নিচু করে থাকে! এই না জানার লজ্জাকে দূর করতে আমার এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা। বিস্তারিত পড়তে ক্লিক করুন.. »

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/1148

স্বর্গ দেশে যেতে ইচ্ছে করে !

স্বর্গ দেশে যেতে ইচ্ছে করে !


.

ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পরতে হয়েছে শৈশবে। উঠতে হয়েছে পরের ঘরে, কথনো ছাত্রাবাস, কখনো মেস এবং এভাবেই এখনো এই অধ্যায়ের ধারা চলমান, তাই শৈশব থেকে আমি আপনকে যেন করেছি পর, আর পরকে করেছি আপন! বোধ হয় আপন জনের কষ্টের কারন হয়েছি বহুবার, বারবার…! দ্বন্দ বার বার আমাকে পেয়ে বসে; এই দ্বন্দ শৈশবের শিক্ষার সাথে বাস্তবতার, অতীতের সাথে বর্তমানের, বর্তমানের সাথেও কি অনাগত ভবিষ্যতের দ্বন্দ হবে এই রকমভাবেই অবিরাম! বিস্তারিত পড়তে ক্লিক করুন.. »

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/1136

এমএন লারমাঃ বাংলাদেশের ইতিহাসে এক মহানায়কের নাম

CHTBDএমএন লারমা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক মহানায়কের নাম

[ব্যস্ততার কারণে লেখার সময় পাচ্ছি না। তাই গত ১০ নভেম্বর ২০১০-এ লেখা আমার এ প্রবন্ধটি এম এন লারমার স্মরণে এখানে পুন:প্রকাশ করলাম।]

আজ ১০ নভেম্বর। জুম্মজাতি তথা মেহনতি মানুষের জন্যে এক শোকাবহ দিন। এই দিনে আমরা জুম্মজাতির মহান নেতা মানবেন্দ্র নারায়ন লারমাকে হারিয়েছিলাম। ‘৮৩ সালে ১০ নভেম্বর জুম্মজাতির কুলাঙ্গার, অপরিণামদর্শী গিরি-প্রকাশ-পলাশ-দেবেন চক্র বুলেতের আঘাতে ঝাঝরা করে দিয়েছিল মহান নেতার বুক।এনএন লারমার মত মহান নেতা ও উজ্জ্বল এক নক্ষত্রকে হারিয়ে জুম্মজাতি আজও এক বিশাল শুন্যতায় দীন-হীন হয়ে আছে।মহান নেতাকে জানাচ্ছি অজস্র লাল সালাম ও শ্রদ্ধা।

মহান নেতা এম এন লারমা

আমি নতুন প্রজন্মের এক সদস্য।মহান নেতা এমএন লারমাকে চোখে দেখিনি। তবে আমি তার গুণমুগ্ধ।তিনি আমার স্বপ্নের নায়ক।তার স্বপ্ন আমারও স্বপ্ন।সে স্বপ্নটা হলো শোষণমুক্ত সমাজ ও মর্যাদাপূর্ণ মানবিক জীবন।

মানুষের মুখে তার কথা শুনেছি। বিভিন্ন কবিতা-প্রবন্ধ ও ইতিহাসের পাতায় তার কথা পড়েছি। তার জীবনী পড়েছি। যতই পড়েছি, ততই মুগ্ধ হয়েছি।আজও আমার এক বন্ধুর মেইলে পাঠানো এমএন লারমার সংসদীয় বিতর্কের পান্ডুলিপি পড়ছিলাম।বুঝার চেষ্টা করছি, সাংসদ হিসেবে তিনি কেমন ছিলেন। দেখলাম, তিনি কেবল পাহাড়ের পাহাড়ী জনগণের কথা বলেননি, বলেছিলেন কৃষক-শ্রমিক-রিক্সাওয়ালা-মাঝিমাল্লাসহ দেশের মেহনতি মানুষের কথা।আজকে আমার লেখার মাধ্যমে মহান নেতা এমএন লারমা’র জীবনের কিছুদিক জানার তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

এমএন লারমা যেই সময়ে জন্মগ্রহন করেছিলেন সেই সময়টা ছিল উত্তাল সময়। ১৯৩৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর রাঙামাটি জেলার মহাপুরুম গ্রামে এ মহান নেতার জন্ম।সে সময়ে চলছিল মহাসমরের মহাপ্রস্তুতি।ভারত উপমহাদেশে ইতিহাসের বাঁক বিভিন্ন দিকে পরিবর্তন হতে যাচ্ছিল। অথচ তখনও পর্যন্ত আমাদের জুম্মজাতি ঘুমিয়ে ছিল অন্ধকারে।মহান নেতার জন্ম যেন জুম্মজাতির ঘুম ভাঙানির গান শোনানোর জন্যে।

তিনি ধীরে ধীরে বেড়ে উঠলেন। স্কুলবেলা থেকেই নিপীড়িত ও অমানিশার অন্ধকারের মধ্যে মুহ্যমান জুম্মজাতির মুক্তির জন্যে কাজ করার স্পৃহা তারমধ্যে জেগেছিল। সেইভাবে তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন।

শিক্ষায় তিনি ছিলেন একজন আইনজ্ঞ। তবে তিনি পেশা হিসেবে আইনকে বেছে নেননি।টাকা উপার্জনের চেষ্টা করেননি। আলো জ্বালানোকে তিনি মহান ব্রত হিসেবে মনে করেছিলেন। তাই প্রথমে বেছে নিয়েছিলেন শিক্ষকতাকে।দীঘিনালা ও চট্টগ্রামে শিক্ষকতা করেছিলেন।পরে সময়ের দাবীতে পুরোপুরিভাবে রাজনৈতিক কর্মকান্ডে সক্রিয় হয়ে পড়েন। ছাত্রাবস্থায় পাকিস্তান সরকারের কাপ্তাই বাঁধের বিরুদ্ধে ছাত্র ও জুম্ম সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন। ফলে তাকে কারাবরণও করতে হয়েছিল ১৯৬৩ সালে।পাকিস্তান সরকারের শোষণ বঞ্চনা যখন বেড়ে যাচ্ছিল তখন নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে জুম্ম সমাজকে সংগঠিত করা ছাড়া কোন উপায় ছিল না।তাই তিনি নিরিবিলি সংসার জীবন নিয়ে ঘরে বসে থাকেননি।বেরিয়ে পড়লেন আপামর জুম্ম ছাত্র-জনতাকে জাগানোর কঠিন শপথ নিয়ে। ঘুরে বেড়িয়েছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রামের আনাচে কানাচে।শুনিয়েছিলেন মুক্তির বাণী, জুগিয়েছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার দূরন্ত সাহস। শিখিয়েছিলেন প্রতিবাদের ভাষা –

অধিকার কেউ কাউকে দেয় না, আদায় করে নিতে হয়

তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, ছোট ছোট পাহাড়ী জাতিসমূহকে বেঁচে থাকতে হলে সবাইকে এক হয়ে সংগ্রাম করতে হবে। উদাহরণ দিয়ে বললেন, “আমরা জনসংখ্যার বিচারে ছোট ছোট জাতি হতে পারি।কিন্তু আমাদের অসীম শক্তি আছে, সাহস আছে, সম্ভাবনা আছে। উপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার দৃষ্টান্ত আমাদের আছে। ইতিহাস আছে। একটি জাতির জন্যে যেসব শর্তাবলী দরকার তার সবই আমাদের আছে। আছে নিজস্ব ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ।কিন্তু আমাদের পাহাড় সভ্যতা তথাকথিত আধুনিক সভ্যতা থেকে অনেক দূরে বলে আমরা তার প্রকাশ ও বিকাশ ঘটাতে পারছি না।তবে এর জন্যে প্রয়োজন রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন।উপনিবেশিক শাসকরা আমাদের সেই রাজনৈতিক ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিল”।এমএন লারমা জুম্ম জনগণকে আরো বললেন, গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সেই রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন করতে হবে। তার নিজের হাতের আঙুল দেখিয়ে বললেন, “দেখো, পাঁচটি আঙুল। এক আঙুলে খোঁচা মারার চেয়ে এক মুষ্ঠিতে ঘুষি মারলে শক্তি ও জোর দু’টোই বেশি হয়”।  তিনি আরো বললেন, “আমাদের এই জোর-শক্তি লুকিয়ে আছে বৈচিত্র্যের ঐক্যতানে সমৃদ্ধ আমাদের জুম্ম সংস্কৃতির মধ্যে। শুধু প্রয়োজন সেই জোর-শক্তিকে সঠিকভাবে ও বুদ্ধিমত্তার সাথে কাজে লাগানো”।

তাই তিনি নিয়ে এলেন পার্বত্য চট্টগ্রামের এগারটি ছোট ছোট জাতিসমূহের মধ্যে ঐক্যের সেতু রচনার মূলমন্ত্র জুম্ম জাতীয়তাবাদ।তবে তিনি এও বলেছিলেন, এই জুম্ম জাতীয়তাবাদ সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ নয়। এ জাতীয়তাবাদের মূল আদর্শ হলো মানবতাবাদ, মানুষের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা। ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও নিজেদের পরিচিতি নিয়ে বেঁচে থাকার জন্যে এই জাতীয়তাবাদ। ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও নিজেদের পরিচিতি নিয়ে বেঁচে থাকা যে কোন মানুষের মৌলিক অধিকার। জুম্মজাতীয়তাবাদ এই অধিকারকে ধারণ করে ও বিশ্বাস করে। জুম্মজাতীয়তাবাদ কারোর অধিকার হরণ করার জন্যে নয়, জুম্মজাতীয়তাবাদ কারোর করুণার উপর নির্ভর করে বেঁচে থাকার জন্যে নয়, জুম্মজাতীয়তাবাদ হলো ছোট ছোট জাতিসমূহের মানবিক মর্যাদা ও সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার মূল ভিত্তি। তার এই মূলমন্ত্র পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম ছাত্রযুব সমাজের মধ্যে বিদ্যূৎবেগে ছড়িয়ে পড়লো।

বিভিন্ন শাসক-শোষক গোষ্ঠীর চরম অবহেলা ও শোষণ বঞ্চনার শিকার জুম্ম জনগণ খুঁজছিলেন এমন এক নেতার যার যোগ্যতা আছে, দক্ষতা আছে, যার স্বপ্ন আছে। নেতৃত্বহীনতার সেই তৃষ্ণার্থ সময়ে জুম্মজনগণের কান্ডারী হিসেবে আবির্ভূত হলেন এমএন লারমা।এমএন লারমার মত এক স্বপ্নবান নেতাকে পেয়ে জুম্মজনগণ বলীয়ান হয়ে উঠল। নতুন আশার দেখতে পেলো।

জুম্ম জনগণের পক্ষে সংসদে কথা বলার জন্যে যোগ্যতম প্রতিনিধি চাই। এ কাজে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্মজনগণ এমএন লারমাকে বেছে নিলেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিপুল ভোটে জুম্মজনগণ তাকে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত করলো।

সবার জানা, ‘৭০-এর নির্বাচনের পর ইতিহাসের বাঁক বদলে যায়। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেনি।বন্দুকের নলের মুখে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা বন্ধ করে দিয়েছিল। ক্ষমতার দম্ভে ধরাকে সরা জ্ঞান করেছিল। শুরু করেছিল বাংলার নিরীহ জনগণের উপর নির্মম অত্যাচার, দমনপীড়ন।শুরু করেছিল মা-বোনের ইজ্জত লুন্ঠনের হোলি খেলা।প্রতিবাদে ফেঁসে উঠে সারা বাংলা। সারা দেশে শুরু হয় পাকিস্তান হটাও আন্দোলন। শুরু হয় মহামুক্তিযুদ্ধ।এমএন লারমা নিশ্চিত ছিলেন পাকিস্তানের শাসন শোষণের শৃংখল হতে অতিশীঘ্রই বাংলার মানুষ মুক্ত হবে।দেশ স্বাধীন হবে।প্রহর গুনছিলেন, দেশের বৃহত্তর বাঙালি জনগোষ্ঠীর সাথে জুম্ম জনগণেরও মুক্তি আসবে।

‘৭১-এ ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলো।বিশ্বের মানচিত্রে স্থান পেয়ে গেলো লাল সবুজের পতাকার দেশ বাংলাদেশ। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। আহা! কী আনন্দ।সবার মুখে, “আমার সোনার বাংলা/আমি তোমায় ভালবাসি/চিরদিন তোমার আকাশ তোমার বাতাস/ আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি/আমার সোনার বাংলা”।

মুক্তির স্বাদ। সে কী আনন্দ!মানুষের মনে দোলা দিতে লাগল নতুন স্বপ্ন, নতুন প্রত্যয়। চোখেমুখে হাসির ঝিলিক, নতুন স্বপ্নে বিভোর সারা দেশের মানুষ। হাতছানি দিচ্ছিল কোটি মানুষের অমিত সম্ভাবনা। স্বপ্ন ছিল, গণমানুষের জন্যে বৈষম্যহীন ও শোষণমুক্ত সমাজ। পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে এমএন লারমাও সংসদে গেলেন বৈষম্যহীন ও শোষণমুক্ত সমাজ ও দেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে।

গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা তথা বৈষম্যহীন ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্যে প্রথম পদক্ষেপ হলো সুলিখিত ও সুচিন্তিত শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করা, যেই শাসনতন্ত্রে দেশের সব মানুষের আশা-আকাঙ্খা ও স্বপ্ন প্রতিফলিত হবে, মানুষের স্বপ্ন ও সম্ভাবনা বাস্তবায়নের কথা লেখা থাকবে।

ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে শাসনতন্ত্র রচনার কাজ শুরু করা হয়। যখন সংবিধানের খসড়া শেষ হয়, তখন তার উপর আলোচনার জন্যে সংসদে উত্থাপন করা হয়। খসড়া সংবিধানের উপর এক একটা অনুচ্ছেদ ধরে সংসদে আলোচনা চলতে থাকে। এমএন লারমা সাংসদ হিসেবে সক্রিয়ভাবে আলোচনায় অংশগ্রহণ নিতেন। উল্লেখ্য, সেই সময়ে গণপরিষদে হাতে গোনা দু’য়েক জন বাদে সবাই আওয়ামীলীগের সদস্য ছিলেন।সেই সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভীড় ঠেলে এমএন লারমা সংসদে বলিষ্ঠ কন্ঠে বক্তব্য রাখতেন। বিভিন্ন ধারার উপর মতামত দিতেন।সরকারী দল যা উপস্থাপন করে তার বিপরীতে কিছু মতামত দেওয়াই ছিল সেই সময়ে এক বড় সমস্যা।

খসড়া সংবিধান অধ্যয়ন করে এমএন লারমা দেখতে পেলেন “মা ও মাটি”র সাথে যেসব মানুষের ঘনিষ্ঠতা বেশি সেসব মানুষের কথা সংবিধানে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়নি।তাই একদিন তিনি দৃঢ় কন্ঠে সংসদে বলছিলেন,

আজ আমি দেখতে পাচ্ছি পদ্মা, মেঘনা, বুড়িগঙ্গা, মাথাভাঙ্গা, শংখ, মাতামুহুরী, কর্ণফুলী, যমুনা,কুশিয়ারা প্রভৃতি নদীতে রোদবৃষ্টি মাথায় করে যারা দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বৎসরের পর বৎসর ধরে নিজেদের জীবন তিলে তিলে ক্ষয় করে নৌকা বেয়ে, দাঁড় টেনে চলেছেন, রোদবৃষ্টি মাথায় করে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যারা শক্ত মাটি চষে সোনার ফসল ফলিয়ে চলেছেন, তাদেরই মনের কথা সংবিধানে লেখা হয়নি। আমি বলছি, আজকে যারা রাস্তায় রাস্তায় রিক্সা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে চলেছেন তাদের মনের কথা এই সংবিধানে লেখা হয়নি” (২৫ অক্টোবর ১৯৭২, সংবিধান বিলের উপরসাধারণ আলোচনায়)

এমএন লারমা’র এ বক্তব্য পড়ার পর সংবিধানের পাতা একটা একটা করে খুলে দেখলাম। মাঝিমাল্লা-রিক্সাওয়ালাদের কথা তো দূরের কথা, সংবিধানে কৃষকের কথাও তেমন নেই। শুধু ১৪ অনুচ্ছেদে দেখতে পেলাম। সেখানে বলা আছে, কৃষক ও শ্রমজীবি মানুষকে সকল প্রকার শোষণ হতে মুক্তিদান করাই হবে রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। কিন্তু কীভাবে কৃষক-শ্রমিক-মাঝিমাল্লা-রিক্সাওয়ালা শোষণ হতে মুক্ত হবে তার কোন দিক-নির্দেশনা সংবিধানে নেই।এরপর ১৬ অনুচ্ছেদে গ্রামীণ উন্নয়ন ও কৃষিবিপ্লবের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কীভাবে হবে তার কোন পথ নির্দেশনা নেই। এককথায়, কৃষক-শ্রমিকের শোষণমুক্তির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে সে ব্যাপারে রাষ্ট্রের কোন বাধ্যবাধকতা নেই।

এমএন লারমা আরো অনেক বিষয়ে বক্তব্য রেখেছিলেন।দেখলাম, যখনই তিনি কথা বলতে যান, তখনই তাকে বিভিন্নভাবে বাধাগ্রস্ত করা হয়। স্বাচ্ছন্দে তাকে কথা বলতে দেয়া হয়নি।স্পীকার সাহেবও কখনো কখনো তাকে বাধাগ্রস্ত করতেন।তার বক্তব্য চলাকালীন সময়ে অন্য সদস্যরা হস্তক্ষেপ করতেন।

৩১ অক্টোবর ১৯৭২। এক ঐতিহাসিক দিন। এইদিন সংবিধান বিলের উপর আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।ঐ দিন আঃ রাজ্জাক ভুঁইয়া নামে জনৈক সদস্য বাংলাদেশের সকল নাগরিককে বাঙালি করার প্রস্তাব দিলেন। তিনি প্রস্তাব দিলেন, অনুচ্ছেদ ৬-এ

বাংলাদেশের নাগরিকত্ব আইনের দ্বারা নির্ধারিত নিয়ন্ত্রিত হইবে”-এর পরেবাংলাদেশেরনাগরিকদের বাঙ্গালি বলিয়া পরিচিত হইবেন

এরপর আলোচনায় অংশ নিয়ে, উক্ত অনুচ্ছেদের উপর আপত্তি জানিয়ে এমএন লারমা বললেন, যদি এ অনুচ্ছেদ সংবিধানে সংযোজন করা হয় তাহলে আমাদের মত পাহাড়ী জুম্মজনগণের অস্তিত্ব ধ্বংস হয়ে যাবে। তিনি যুক্তি দিয়ে বললেন, আমরা বাংলাদেশের নাগরিক। নাগরিক হিসেবে আমরা বাংলাদেশী।তাই এ অনুচ্ছেদটি গ্রহণ করার আগে আরো পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানালেন।

প্রত্যুত্তরে স্পীকার সাহেব এমএন লারমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি বাঙ্গালি হতে চান না”?

এমএন লারমা উত্তরে বললেন,

বাংলাদেশের বাংলা ভাষায় বাঙ্গালিদের সঙ্গে লেখাপড়া শিখে আসছি। বাংলাদেশের সঙ্গে আমরাওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাংলাদেশের কোটি কোটি জনগণের সঙ্গে একযোগে বসবাস করে আসছি। কিন্তুআমি একজন চাকমা। আমার বাপ দাদা, চৌদ্দপুরুষ কেউ বলে নাই, আমি বাঙ্গালি।….আমরাআমাদেরকে বাংলাদেশি বলে মনে করি এবং বিশ্বাস করি। কিন্তু বাঙ্গালি বলে নয়

কিন্তু তার কথা কেউই কানে নেননি।সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে প্রস্তাবটি পাস হয়ে যায়।এর প্রতিবাদে এমএন লারমা সংসদ থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্যে ওয়াক আউট করলেন।এমএন লারমা’র এই প্রতিবাদ ইতিহাসের অংশ হয়ে গেল।

পরবর্তীতে এমএন লারমা নিয়মিতভাবে সংসদে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ২রা নভেম্বর ১৯৭২, সংবিধানে অনুচ্ছেদ ৪৭ এর সাথে নিম্নোক্ত অনুচ্ছেদটি ৪৭(ক)[মনে হয়, বর্তমানে সংবিধানে অনুচ্ছেদক্রম পরিবর্তিত হয়েছে] হিসেবে সংযুক্ত করার প্রস্তাব সংসদে উত্থাপন করেছিলেন,

পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি উপজাতীয় অঞ্চল বিধায় উক্ত অঞ্চলের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ধর্মীয় অধিকারের নিরাপত্তার জন্যে উক্ত অঞ্চল একটি উপজাতীয় স্বায়ত্বশাসিত অঞ্চল হইবে

এমএন লারমা তার এ প্রস্তাবের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করতে চেয়েছিলেন।কিন্তু “উপজাতীয় স্বায়ত্বশাসিত অঞ্চল” শব্দ শোনার সাথে সাথে বাঙালি জাতীয়তাবাদে অন্ধ সদস্যরা লাফিয়ে উঠলেন। একা একা এমএন লারমা। তাকে সমর্থন দেওয়ার করার মত আর কেউ ছিলেন না। তবে মাঝে মাঝে বিরোধী সদস্য হিসেবে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত আলোচনায় অংশ নিতেন। কিন্তু এমএন লারমাকে বিশেষ অঞ্চলের বিশেষ সমস্যার কথা বলতে হয়। সেজন্যে তার উপর শুরু হয় সরকার দলীয় সদস্যদের ‘আক্রমণ’।

স্বায়ত্তশাসনের কথা শুনে টাঙ্গাইলের লতিফ সিদ্দিকী ফ্লোর নিয়ে বললেন,

“এমএন লারমা আমাদের জাতীয়তাবাদের মূলভিত্তির প্রতি, আমাদের জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রতি অবৈধভাষায় বক্তৃত করেন

এমএন লারমা’র প্রস্তাবকে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি আঘাত হিসেবে অভিহিত করে অসৌজন্যমূলক ভাষায় বক্তৃতা শুরু করলেন। পরে স্পীকার লতিফ সিদ্দিকীকে নিবৃত্ত করেন।এরপর লতিফ সিদ্দিকীর বক্তব্য প্রত্যাহারের অনুরোধ জানিয়ে এমএন লারমা কিছু বলতে চাইলে, স্পীকার সাহেব এমএন লারমা’র উদ্দেশ্যে বললেন, “Please don’t create a pandemonium” (অনুগ্রহপূর্বক বিভ্রান্তি বা বিশৃংখলা সৃষ্টি করবেন না)। এভাবে এমএন লারমা’র কন্ঠ রোধ করার চেষ্টা করা হয় বারবার।

পরে দেখা গেলো, আরো অনেক সদস্য যখনই সুযোগ পেয়েছিলেন তখনই পুঁতি মাছের বড়শি’র টোপে টোক্কর মারার মত করে এমএন লারমার বিরুদ্ধে খোঁচা মেরে কথা বলতেন। জানিনা, সেসব মান্যগণ্য সদস্য এখনো বেঁচে আছেন কী না।তবে তাদের মধ্যে সাজেদা চৌধুরী এখনো অতি পরিচিত। এখনো সংসদে আছেন, এখন সংসদ উপনেতা।তিনিও পাহাড়ী জুম্ম জনগণকে বাঙালি জাতির অংশ মনে করেন। তাই একদিন তিনি স্পীকারের মাধ্যমে এমএন লারমার কাছে সংসদে প্রশ্ন রেখেছিলেন,

একটি উপজাতি হিসাবে স্বীকৃতি পাওয়ার চাইতে একটি জাতি হিসাবে স্বীকৃতি পাওয়া কি অধিকমর্যাদাজনক নয়”?

অর্থাৎ সাজেদা চৌধুরীও বাঙালি জাতি পরিচিতিটা সবার জন্যে অধিক ভালো বলে মনে করেছিলেন।

আরো একদিন, এমএন লারমা যখন পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস, জাতিবৈচিত্র্য, সংস্কৃতি ইত্যাদি তুলে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, বম, খিয়াং, পাংখোয়া খুমী ইত্যাদি জাতিসমূহের জন্যে সাংবিধানিক সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা সংসদে বলছিলেন, তখন জনৈক সদস্য বেগম তসলিমা আবেদ ফ্লোর নিয়ে বলে উঠলেন,

মাননীয় সদস্য [এমএন লারমা] পার্বত্য চট্টগ্রামের কয়েকটি জাতির নাম করলেন, [তারা] বাংলাদেশেমোট একটা জাতি, বাঙ্গালি

আরো মজা করে জনৈক সদস্য শওকত আলী খান বললেন,

দুইটি জাতিপুরুষ নারী

বা!বা! বেশ মজার বক্তব্য। নতুন তত্ত্বও বটে! এসব সংসদ সদস্যের বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, এমএন লারমা পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্মজনগণের কথা বলতে গিয়ে কতই না বাধার সম্মুখীন হয়েছিলেন। কেউ কেউ গরম গরম কথা বলে, আবার কেউ কেউ কুটতর্ক সৃষ্টি করে এমএন লারমাকে ঘায়েল করার চেষ্টা করেছিল। কেবল রাঘব-বোয়ালদের ছোবল নয়, পুঁতি মাছের টোক্করও খেতে হয়েছিল তাকে।

শুরুর দিকে বলেছিলাম, এমএন লারমা সংসদে কেবল পার্বত্য চট্টগ্রামের বিষয় নিয়ে কথা বলেননি। বলেছিলেন দেশের বিভিন্ন আইন, কৃষি, অর্থনীতি, শিল্পনীতি ইত্যাদি বিষয়ে। সেসব বিষয়ে বিস্তারিত বলার সুযোগ এখানে নেই। তবে এখানে একটা বিষয় অবশ্যই উল্লেখ করার মত। সেটা হলো দুর্নীতি নিয়ে। তখন ১৯৭৪ সাল। এমএন লারমার সংসদীয় বিতর্ক থেকে অনুধাবন করা যায় দুর্নীতি তখন কোন পর্যায়ে ছিল। তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। দুর্নীতি দমন করতে না পারলে তৎকালীন সরকারকে পদত্যাগ করারও অনুরোধ জানিয়েছিলেন।তিনি বলেছিলেন, দুর্নীতিবাজলোকরা সরকারকে ঘিরে রয়েছে। তারা তিন শ্রেণীর – ১) ব্যবসায়ী, ২) একশ্রেণীর রাজনৈতিক কর্মী ও ৩) একশ্রেণীর সরকারী কর্মচারী।তাই তিনি সরকারকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহবান জানিয়েছিলেন। দুর্নীতির ব্যাপকতা ও এর প্রভাব সম্পর্কে হুশিয়ার করে বলেছিলেন,

দুর্নীতির প্রশ্রয় দেওয়া কত বড় মারাত্মক তা বলে শেষ করা যায় না। দুর্নীতি যদি আমরা দূর করতে নাপারি, তাহলে সরকার যত রকমের আইনই করুক না কেন, যত কড়া নির্দেশনামাই দিক না কেন, কোনসুরাহা হবে না

এমএন লারমা একথাগুলো বলেছিলেন ৫ জুলাই ১৯৭৪ সালে। সেই ‘৭৪ থেকে ২০১০ সালের শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি।আজও তার কথা নির্ভেজাল সত্য। ৩৬ বছরেও দুর্নীতি কমেনি। ভাবতেই আশ্চর্য লাগে। সেই চেনা শ্রেণীর লোকগুলো আজও সরকারকে ভর করে দুর্নীতি করে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকবার দুর্নীতিতে প্রথম স্থান দখল করে ফেলেছে বাংলাদেশ।এটা লজ্জার সমগ্রজাতির জন্যে। কিন্তু সেই মা-মাটির সাথে যারা ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত তারা কী দুর্নীতি করে? না, সেই কৃষক, শ্রমিক, মাঝিমাল্লা ও খেতে মানুষগুলো কখনো দুর্নীতির সাথে জড়িত নয়। পাহাড়ী জুম্মজাতির সাধারণ জনগণও দুর্নীতির সাথে জড়িত নয়। পাহাড়ীদের ভাষায় দুর্নীতি শব্দেরও অস্তিত্ব নেই। অথচ সেই চিরচেনা শ্রেণীর দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ী, কর্মচারী ও বাজিকর রাজনৈতিক নেতারাই দেশকে চুষে খাচ্ছে। তাদের জন্যে কোটি কোটি মানুষের কপালে জুটছে দুর্নীতির তিলক।এটা সত্যিই লজ্জাজনক।

আজ ১০ নভেম্বর ২০১০। তিনি আমাদের মাঝে নেই। তবে তার কথাগুলো আছে। তার সংসদীয় বক্তব্য পড়ছি আর ভাবছি, সংসদে তিনি যা বলেছিলেন তৎকালীন সরকারের যদি শোনার ধৈর্য থাকতো, সেভাবে শাসনতন্ত্রে গণ মানুষের শোষণমুক্তির কথা লেখা হতো তাহলে বাংলাদেশের ভবিষ্যত আরো অনেক উজ্জ্বল হতে পারতো।

এমএন লারমাই প্রথম সংসদে নাগরিকত্ব প্রশ্নে বাংলাদেশের সকল নাগরিক বাংলাদেশী বলে গণ্য হবে বলেছিলেন।ভাবছি, আজ যারা বিভিন্ন সনদে নাগরিকত্ব হিসেবে ‘বাংলাদেশী’ লেখেন, তারা কখনো কী একবারের জন্যে হলেও এমএন লারমার নাম স্মরণ করেন?

এম এন লারমা যখন সংসদে জুম্ম জনগণের জন্যে স্বায়ত্বশাসনের কথা বলেছিলেন, তখন তাকে অনেকে সংসদে আক্রমণ করেছিলেন তীব্র কুরুচিপূর্ণ ভাষায়। তাঁর প্রস্তাবকে সার্বভৌমত্বের প্রতি, জাতীয়তাবাদের [বাঙালি জাতীয়তাবাদ] প্রতি আঘাত হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। ভাবছি, সেসব লোকগুলো এখনো সেকথা বলে কী না।

ইদানীং দেখা যাচ্ছে, এককালের উর্দিপরা জেনারেল, বর্তমানে বড় রাজনৈতিক নেতা হোমো এরশাদ প্রাদেশিক সরকারের তত্ত্ব বলে বেড়াচ্ছেন সারা বাংলাদেশে।এখন হোমো এরশাদের প্রস্তাবকে কেউ কী সার্বভৌমত্ব ও জাতীয়তাবাদের প্রতি হুমকী হিসেবে আখ্যায়িত করবেন? জানতে ইচ্ছে করে, এমএন লারমা যদি তৎকালীন সময়ে এরকম প্রাদেশিক সরকারের প্রস্তাব দিতেন তখন কী প্রতিক্রিয়া হতো? এমএন লারমা না হয়ে অন্য কেউ যদি স্বায়ত্তশাসন বা প্রাদেশিক সরকার ব্যবস্থার প্রস্তাব করতেন তখনো কী উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদের ধ্বজাধারীরা সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতার প্রতি হুমকীর গন্ধ পেতেন?

এমএন লারমা, তুমি আমাদের মাঝে না থাকলেও তোমার স্বপ্ন আমাদের মনের মণিকোঠায় আমরা সাজিয়ে রেখেছি। তুমি চেয়েছিলে জুম্ম জনগণের সাংবিধানিক স্বীকৃতি। সেই চাওয়া এখনো হারিয়ে যায়নি। পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণসহ সারা বাংলাদেশের আদিবাসী আজ ঐক্যবদ্ধ সাংবিধানিক স্বীকৃতি আদায়ের জন্যে। তোমার সাহসী বাণী আমরা এখনো ভুলিনি- অধিকার কেউ কাউকে দেয় না, আদায় করে নিতে হয়। অধিকার আদায়ের জন্যে আমরা এখনো ছুটছি তোমার প্রদর্শিত পথ ধরে। মনে প্রাণে বিশ্বাস করি, সব বাধাবিঘ্ন অতিক্রম করে আমাদের একদিন জয় হবে হবেই। চলার পথে অসীম সাহসে আমরা সুর ধরি আমরা করবো জয়, আমরাকরবো জয় একদিন

মহান নেতা এমএন লারমা তুমি অমর।তোমার কোন মৃত্যু নেই।তুমি জুম্মজাতির আকাশে লালসূর্য হয়ে অনন্তকাল আলো দেবে। তোমায় লাল সালাম।

মহান নেতা, তুমি যুগযুগ জিও।

————————–

অডঙ চাকমা

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/1131

আসুন জেএসএস এবং ইউপিডিএফের মরণব্যাধি “ভ্রাতৃহত্যা রোগ” থেকে পরিত্রাণ পেতে চেষ্টা করি

২৮ বছর বয়সী এবং এর নিচে সকল জুম্ম ভাই বোনদের কাছে আমার ব্যক্তিগত কিছু অভিব্যক্তি তুলে ধরছি । প্রথমে বলবো “ইউপিডিএফ এবং জেএসএসের কালো ভ্রাতৃহত্যা রাজনীতি থেকে দূরে থাকুন” । আমি আজ তরুণ যুব সমাজের ভবিষ্যত কান্ডারীদের নিরুৎসাহিত করছি –

“আপনারা ইউপিডিএফ এবং জেএসএসের বর্তমান যে রাজনীতি তা হচ্ছে মরণব্যাধি রোগ ক্যান্সারের সমতূল্য; এই মৃত্যুঘ্রাসী রোগকে চিকিৎসা করে রোগীদের সুস্থ করে তোলা আপনার আমার সকলের দ্বায়িত্ব ও কর্তব্য তাই তাদের ভ্রাতৃহত্যা রাজনীতিতে নিজেকে আক্রান্ত করবেন না” ।

আপনি আমি যদি আক্রান্ত হই তাহলে কোন রোগীর সুস্থ চিকিৎসা করাতে পারবো না । রোগীর স্বাস্থ্য চিকিৎসা করতে গিয়ে নিজের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কিন্তু বাড়াতে হয়; না হয় রোগীর সাথে নিজেও রোগী হয়ে গেলে রোগীর রোগতো ভালো হয় না বরং রোগীর সাথে রোগী হয়ে দুজনকেই মরণ যন্ত্রণা ভোগ করতে হয় । তাই বলছি আমাদের এখন রোগীদেরকে সুস্থ করে তুলতে যথাযথ পদক্ষেপ হাতে নিতে হবে এবং সাহায্যর হাত বাড়িয়ে দিতে হবে । এই পদক্ষেপে যারা বেশি অবদান রাখতে পারেন তারা হলেন আমাদের বয়সী আর যারা ভার্সিটি পড়ুয়া ছাত্র/ছাত্রী ।

এখন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কিভাবে বাড়াবেন ? ইউপিডিএফ এবং জেএসএসের ভ্রাতৃহত্যা রোগের প্রতিরোধ করতে চাইলে, তাদের মৌখিক নীতিআদর্শের প্রতি অন্ধ সমর্থন দেয়া থেকে বিরত থাকা । তবে এও নয় আপনাকে রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে হবে । আপনি প্যাক্টিক্যালি তাদের রাজনীতিতে না জড়াবেন বটে কারণ তারা মরণব্যাধি রোগে আক্রান্ত; তবে পার্বত্য চট্রগ্রামের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে আপনার ভালো ধারণা থাকা দরকার । তাহলে কিভাবে আপনার রাজনৈতিক জ্ঞান বাড়াবেন ? আপনি বসুন্ধরা/মধুমতি/বলাকা সিনেমা হলে ছবি না দর্শন করে দুই-একটা সুন্দর সুন্দর রাজনীতি/অর্থনীতিসমৃদ্ধ বই কিনে পড়তে পারেন । বইগুলো বন্ধু/বান্ধবীদের সাথে শেয়ার করুন । এভাবে জ্ঞানকে ছড়িয়ে দিন, ভাগাভাগি করুন । বিভিন্ন আড্ডা খানায় না গিয়ে প্রতিদিন দুই-এক ঘন্টা সময় শুধু বই পড়ার মাঝে নিবিষ্ট করুন। আলোচনা করুন এবং আলোচনাতে অংশ নিন । নিজের জ্ঞানকে শেয়ার করতে লজ্জাবোধ করবেন না । একদিন হাতিহাতি পাপা করে দেখবেন আপনি ও আলোচনা এবং তর্কে দক্ষতার সহীত অংশগ্রহণ করতে পারছেন । যখন আপনার যুক্তিবোধ এবং জ্ঞান এক অবস্থানে চলে যাবে তখন জ্ঞানের চক্ষু দিয়ে বুঝতে পারবেন ইউপিডিএফ এবং জেএসএসের যে মারামারি/হত্যা একধরণের পাগলামি ব্যতীত কিছুই নয় । অধিকার ভ্রাতৃহত্যা করে অর্জন হয় না । বড়জোড় ভ্রাতৃহত্যা করে ক্ষমতায় আরোহণ করা যায় । ক্ষমতা কোন অধিকার নয় । বেশিরভাগ ক্ষমতাশালী অধিকারের পক্ষে কথা বলার চেয়ে নিজের ক্ষমতা ঠেকিয়ে রাখতে বেশি ব্যস্ত থাকেন । পার্বত্য চট্রগ্রামে আমাদের অধিকার দরকার । অধিকার আদায়ের জন্য ভ্রাতৃহত্যা এক মরণব্যাধি ক্যান্সার ব্যতীত কিছু নয় । এটা হচ্ছে ইউপিডিএফ এবং জেএসএসের ঘাটকব্যাধি ভ্রাতৃহত্যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার সুস্থ পন্থা । আপনার যদি রাজনীতি সম্পর্কে ভালো ধারণা না থেকে থাকে তাহলে আপনি খুব সহজে অন্যর দ্বারা প্রভাবিত হতে পারেন । কারণ আপনি নিজের সীমিত জ্ঞানের সাথে অন্তঃকলহে লিপ্ত হয়ে যাবেন । সঠিক এবং বেঠিক বুঝা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে । যাচাই-বাচায়ের ক্ষমতা হারিয়ে যাবে । সর্বোপরি, আপনি রোগের প্রতিরোধের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলবেন । সত্যিকার রাজনীতি জ্ঞান না থাকলে যেকোন সময় ভ্রাতৃঘাতের রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যেতে পারে । অতঃপর আপনি ও সেই ভ্রাতৃঘাতি রোগে আক্রান্ত হয়ে মরণযন্ত্রণাতে ভুগতে বাধ্য হবেন ।

দেখুন, আমাদের সকলের মননে পরিবার/সমাজ তথা পুরো জাতির জন্য ভালো চিন্তাধারা থাকতে হবে । প্রতিটি মানুষই মূল্যবান তাই বেঁচে থাকা অতীব গুরুত্বপূর্ণ । আমরা জাতিগতভাবে নিপীড়িত এবং নির্যাযিত তাছাড়া সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠির সাথে জনসংখ্যার তুলনা করা পাগলামি ছাড়া বৈকি ? জনসংখ্যার দিক থেকে আমরা নগণ্য বটে তবে ভুলে যাবেন না আমরা ও এক সুন্দর বাংলাদেশ তথা এক পৃথিবী গড়াতে অনবদ্য অবদান রেখে চলেছি । শহীদ প্রয়াত নেতা মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা শুধু জুম্ম জাতীয়তাবাদের জনক ছিলেন না বরং তিনি বাংলাদেশ নামক ভূ-খন্ডে বসবাসরত সকল মেহনতি কেটেখাওয়া মানুষের কথা জাতীয়/আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরেছেন । আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সাথে যুক্ত আমাদের স্বজাতির কুটনৈতিকরা দেশের সম্মান ক্ষুন্ন করেছেন এমন নজির নেই । তারা ও দেশের জন্য নিরন্তর সততার সাথে কাজ করে যাচ্ছেন । বাংলাদেশের শাসকগোষ্ঠী এসবকিছু অস্বীকার করতে পারবে না । ডঃ অমিত চাকমার সাফল্য পুরো বাংলাদেশের গর্ভবোধ । টুম্পা চাকমার স্পীন বোলিংয়ের খ্যাতি শুধু জুম্মজাতিগোষ্ঠীর নাম নয় বরং বাংলাদেশের সুনাম । সাফ গেম্সে এক মারমা মেয়ের স্বর্ণ বিজয় শুধু মারমা জাতিকে খ্যাতি কুড়িয়ে দেয়া নয় সেটা পুরা বাংলাদেশের খ্যাতি । জাতিসংঘের আদিবাসী ফোরামে ব্যরিস্টার দেবাশীষ রায়ের নেতৃত্ব শুধু বাংলাদেশে বসবাসরত আদিবাসী জাতিসম্প্রদায়ের নেতৃত্ব দেয়া নয় বরং বাংলাদেশের সুনাম বিশ্বের পরিসরে পরিচিতি লাভ করিয়ে দেয়া । এতসব কিছুর পরও আমাদেরকে অপবাদ শুনতে হয় “পাহাড়ীরা বিছিন্নতাবাদী” হিসেবে । কারণ হলো আমরা বাংলাদেশ শাসকগোষ্ঠীর কাছে সৎসন্তানের তুল্য । তাই জুম্মজাতির ক্ষ্রান্তিলগ্নে শাসকগোষ্ঠী রেফারি ভুমিকায় থেকে মজা লুটবে তা স্বাভাবিক । জুম্মজাতির ভ্রাতৃঘাতের মতো জঘন্য মরণব্যাধির চিকিৎসা শাসকগোষ্ঠী কখনো করবে না । সেই পদক্ষেপ আপনাকে এবং আমাকে নিতে হবে । অস্ত্র দিয়ে যুদ্ধ করে ইউপিডিএফ এবং জেএসএসকে কোনঠাসা করার ক্ষমতা আমাদের নেই, তাই আমাদেরকে উপায়ের সাথে তাদের মরণব্যাধি থেকে পরিত্রানের যথাযোগ্য পন্থা খুঁজতে হবে । তা হলো সরাসরি ইউপিডিএফ এবং জেএসএস কে না বলা; তাদের ভ্রাতৃহত্যাকে না বলা । আমার ভাই/বোনেরা আপনারা যারা জুম্মজাতির জন্য চিন্তা করছেন, আমাদের ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তা থাকলে এমনই পদক্ষেপ নিতে হবে । আমাদের অনাগত ছোট ভাই/বোনরা ও এমন ভ্রাতৃহত্যা রোগ থেকে যাতে মুক্তি পাই এমন চেতনার বীজ গজিয়ে দিতে হবে । যেনো কোন শিশু আর অনাথ না হয়; কোন মা/বোন যাতে বিধবা -সন্তানহারা না হন ।

জেএসএস এবং ইউপিডিএফের কর্মীরা এখন রোগে আক্রান্ত । এমুহূর্তে তারা ভ্রাতৃহত্যার পরিণাম কি বুঝে উঠতে পারবে না কারণ তারা জঘন্যভাবে রোগে রোগাগ্রস্ত। এখন উগ্রতা তাদের কাছে শোভিত পুষ্প; মনের জ্বালা নিবারণের মহাঔষধ । তাদের চিন্তায় এখন বেঁচে থাকা নয় বরং ইউপিডিএফের কর্মী নতুবা জেএসএসের কর্মী হত্যা করা । হত্যা করতে পারলেই শুধু তাদের জ্বালা নিবারণ হয় । আমরা অভাগা, যারা এমনই নিষ্ঠুর সময়ে দাঁড়িয়ে আছি । তবে এও জ্ঞাত থাকবেন “রোগীদের সাথে সামনা-সামনি কখনো খারাপ ব্যবহার করতে নেই; কারণ তারা শুধু শারিরীকভাবে নয় মানসিকভাবে ও রোগাগ্রস্থ; সামনা-সামনি খারাপ ব্যবহার করলে যেকোন সময় অঘটন যে না ঘটাবে এমন নিশ্চয়তা নেই” । তাই সতর্ক থাকুন । জেএসএস এবং ইউপিডিএফের কর্মীরা এখন জাতির ভাই নামে কিছু চিনে না এবং জানে না; তারা এখন চিনে এবং জানে সে জেএসএস আমি ইউপিডিএফ অথবা আমি জেএসএস -সে ইউপিডিএফ । এটাই তাদের রোগের বাস্তবতা । তবে আমরা তাদেরকে অস্বীকার করবো না । আমাদের অবশ্যই তাদেরকে কাছে টেনে নিতে হবে; ভালোবাসা দিতে হবে; তবে তাদের অন্ধজগতে নিজেকে বিসর্জন দিতে নয় । সেজন্য বলছি রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা বাড়িয়ে তুলতে । কারণ রোগের প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকলে আপনি যেকোন পরিবেশ তথা আবহাওয়াতে ও সুস্থভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবেন ।

মেধাবী এবং শিক্ষিতদের বলছি, জেএসএস এবং ইউপিডিএফের ভ্রাতৃহত্যাকে আর “হ্যাঁ” বলে জাতিকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিতে যাবেন না । আপনাদের সামনে এখনো উজ্জ্বল ভবিষ্যতের হাতছানি । এইমুহূর্তে জেএসএস এবং ইউপিডিএফের ভ্রাতৃহত্যাকে “হ্যাঁ” বলা মানে জাতিকে ভবিষ্যত অন্ধকার জগতে ধাবিত করা ব্যতীত কিছু নয় । বৃদ্ধরা কালের আবর্তে হারিয়ে যাবে কিন্তু অনাগত প্রজন্ম তাদের রেখে যাওয়া অভিশাপে শতবছর অভিশক্ত হয়ে জ্বালা-যন্ত্রণাতে ভোগ করবে । সময় এসেছে, সময় এসেছে । সময় আর হারিয়ে দিতে নেই ।

ভ্রাতৃহত্যার অভিশাপ সম্পর্কে নিজে বুঝুন এবং অন্যদের ও বুঝান । নিজে নিরুৎসাহিত হউন এবং অন্যদের ও নিরুৎসাহিত করুন ।

অবশেষে, এক কন্ঠে বলে উঠুন “আর না ভ্রাতৃহত্যা এবার চাই নিরাপত্তা !”

সবাইকে সংগ্রামী শুভেচ্ছা আর যুক্তিবুদ্ধিমূলক প্রতিবাদ দীর্ঘজীবি হউক -এই কামনায় ।

অমিত হিল

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/1121

রাজা দেবাশীষ রায়ের কাছে ঘুম ভাঙানির গান চাই

রাজা দেবাশীষ রায়ের কাছে ঘুম ভাঙানির গান চাই

চাকমা সার্কেলের রাজা বলে নয়, নিজ গুণে, দক্ষতায় ও যোগ্যতায় রাজা দেবাশীষ রায় দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বনাম ধন্য ব্যক্তিত্ব।কেবল নিজের দেশের আদিবাসীদের জন্যে নয়, তিনি বিশ্বের সমগ্র আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর জন্যে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাচ্ছেন।তার সম্পর্কে নতুন করে বলার কিছুই নেই। আমার বিশ্লেষণে, এই মুহুর্তে পাহাড়ে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, যার কন্ঠস্বর সময়ের সাথে অধিকতর সামঞ্জস্যপূর্ণ ও আদিবাসী অধিকারের পক্ষে শক্ত যুক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। আজকের দৈনিক প্রথম আলো’র মাধ্যমে জানতে পারলাম, তিনি দীঘিনালায় সফরে গিয়ে তিনি এক সংবর্ধনা সভায় পাহাড়ের ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত বন্ধের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট পক্ষসমূহকে আহবান জানিয়েছেন। বিস্তারিত পড়তে ক্লিক করুন.. »

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/1111

শরণার্থী জীবনঃ একটু পেছন ফিরে দেখা (২য় পর্ব)


আমাদের আগে যারা শরণার্থী হয়েছিলো, অর্থাৎ যারা ৮৬ সালে শরণার্থী হয়েছিলো তাদেরকে দেশে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছিলো।তারিখটা আমার সঠিক মনে নেই। সম্ভবত ছিলো ১৫ ফেব্রুয়ারী।১৫ ফেব্রুয়ারী পুরনো শরণার্থীদের ফেরত পাঠানো হবে। তাদেরকে ফেরত পাঠানোর আগ মুহুর্তে আমরা গিয়ে হাজির হলাম।

এদিকে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত, অন্যদিকে আরো নতুন করে শরণার্থীর আগমণ ঘটছে। ওদিকে পুরনো শরণার্থীদের দাবী বাংলাদেশ সরকারের সাথে পাকাপোক্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত তারা দেশে ফিরবে না। তারা বলতে লাগলো, জীবন যদি দিতে হয় তাহলে ভারতে জীবন রেখে দেশে ফিরবে, তবুও সেটেলার বাঙাল ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর হাতে অমর্যাদাকরভাবে জীবন হারাতে দেশে ফিরবে না। এ অবস্থায় ভারত সরকার সিদ্ধান্তহীনতায় পড়ে গেলো কী করবে।ভারত সরকারের এই সিদ্ধান্তহীনতার সময়ে আমরা নতুন করে সেখানে শরণার্থী হিসেবে উপস্থিত হলাম। যেহেতু সরকারের উচ্চ পর্যায়ে কোন সিদ্ধান্ত নেই, সেহেতু আমরা যারা নতুন গিয়ে হাজির হলাম তাদের জন্যে শিবিরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কোন কর্মকর্তা সিদ্ধান্ত দিতে পারছিলেন।

তারপর আমাদের শুরু হলো শরণার্থী হিসেবে তালিকাভুক্ত হওয়ার অপেক্ষার পালা। কোন রেশন নেই।এক অনিশ্চিত যাত্রা।কোথায় খাবো, কোথায় থাকবো, আর কোথায় পায়খানা করবো? চাকমা ভাষায় একটা কথা আছে, “খানার আগে আঘিবার চিদে গরা পড়ে” (খাওয়ার আগে পায়খানার চিন্তা করতে হয়)।এ কথাটা পুরোপুরিভাবে আমাদের জন্যে প্রযোজ্য হয়েছিলো। আশেপাশে কোন পায়খানা বা প্রস্রাবখানা নেই। কিছু লম্বা লাইনের গণ শৌচাগার ছিলো। সেগুলোর বর্ণনা এখানে সম্ভব নয়। নতুন জায়গায় ভিন্ন খাবার ও পানি সবার জন্যে উপযোগী ছিলো না। বিশেষ করে গুড় আর চিড়া খেয়ে অনেকের পেটের অবস্থা খারাপ হয়ে গেলো। অনেকের পাতলা পায়খানা শুরু হলো। এই অবস্থায় আমাদের, বিশেষ করে মহিলাদের অবস্থা সবচেয়ে করুণ।পাতলা পায়খানা হলে কীভাবে দৌঁড় দিতে কমবেশি সবার অভিজ্ঞতা আছে বলে মনে করি। পাতলা পায়খানার বেগ আসলে কোথায় দৌঁড়াবে! আ! এই করুণ দশা তো ভাষায় বোঝানো যায় না। যে ভুক্তভোগী কেবল সেই বুঝে। যাহোক, এই করুণ অবস্থার মধ্যেও একটু সহায় ছিলো শিবির ক্যাম্প অফিসের পাশে শরণার্থীদের জন্যে একটা স্বাস্থ্যকেন্দ্র। সেখান থেকে বিনামূল্যে প্রাথমিক চিকিৎসা পাওয়া যেতো। সেখান থেকে ঔষুধ নিয়ে আর সেবিকাদের পরামর্শ নিয়ে কোনমতে পাতলা পায়খানার দুর্দশা হতে অনেকে মুক্ত হয়েছিলো।আজকে সেই সেবিকাদের কর্মব্যস্ত চেহারাগুলোও চোখের সামনে ভেসে উঠছে।ধন্যবাদ সেই সেবিকাদের।

দিন যায়, দিন আসে। কিন্তু আমরা শরণার্থী হিসেবে তালিকাভুক্ত হতে পারছিলাম না। হাতে যা টাকা ছিলো সেগুলো চাল ডাল কিনতে শেষ হয়ে আসতে লাগলো। শরণার্থী হিসেবে তালিকাভুক্ত হতে  না পারলে, আর রেশন না পেলে কী খেয়ে থাকবো – এই নিয়ে এক বড় দুশ্চিন্তার মধ্যে পড়ে গেলাম।ছোট ছিলাম। সে হিসেবে তখন হয়তো সংসারের দুঃখ নিজের কাঁধে বহন করতে হয়নি। কিন্তু বয়স কম হলেও মা-বাবা ও দাদু-দাদীদের আলাপন থেকে ও তাদের ফ্যাকাসে মুখগুলো দেখে বুঝতে পারি, মর্মে মর্মে অনুভব করতে পারি, তাদের যাতনাগুলো। রেশন না পেলে কী খাবে পরিবার পরিজন ও ছোট ছোট নাতিপুতি। সেখানে কোন আত্মীয়স্বজন নেই ধারকর্জ করে হলেও কিছুদিন পার করা যাবে। একগুচ্ছ ধানের চারা রোপন করা নেই, কিছুটা আশা নিয়ে বসে থাকা যেতো।একটা কোন গরু, ছাগল, শুকর কিংবা মোরগ-মুরগী নেই সেটা বিক্রি করে ধান চাল কেনা যাবে।অথচ পেছনে ফেলে যেতে হলো গোলভরা ধান, অনেক গরু আরো অনেক কত দামী দামী ঘরের জিনিসপত্র।আর এখন গোলাভরা ধান পেছনে ফেলে ভাতের চিন্তা করতে হচ্ছে মা-বাবা ও দাদু-দাদীদের। এটা কী যে করুণ অবস্থা ভাষায় বর্ণনা করা কঠিন। এককথায় বললে, এক অনিশ্চিত যাত্রা।কোথায় শুরু হয়ে কোথায় শেষ হবে কেউ জানে না।

খোলা আকাশের নীচে না হলেও রাতের বেলায় ঘুমাতাম খোলা জায়গায়।ঠাকুমবাড়ী শরণার্থী ক্যাম্প অফিসের সামনে গোলঘরে।এছাড়া কিছু ঘর ছিলো, যেগুলোকে বলা হতো “কাউন্টার ঘর”। এসব কাউন্টার ঘরগুলো শরণার্থীদের রেশন বিতরণের জন্যে ব্যবহৃত হতো। আমরা অনেক সময় সেসব কাউন্টার ঘর খুঁজে নিতাম। বস্তা অথবা “চট” (বাঁশের বেত দিয়ে বোনা পাটি) বিছিয়ে ঘুমাতাম। এই কাউন্টার ঘরগুলোর চারদিকে কোন বেড়া নেই। চারদিক থেকে বাতাস আসতো। আগেই বলেছি, ফেব্রুয়ারী মাস, তখনও শীতকাল ছিলো। সঙ্গে করে যা কাপড়চোপড় নিতে পেরেছিলাম সেগুলো দিয়ে কোনমতে শীত নিবারনের চেষ্টা চলতো।

এই অনিশ্চিত যাত্রার মধ্যেও একটু সহায় ছিলো আমাদের কিছু আত্মীয়। তারা দীঘিনালা হতে ৮৬ সালে শরণার্থী হয়েছিলো। দিনের বেলায় ঐ আত্মীয়দের বাসায় রা্ন্না হতো। পালা করে খেয়ে আসতাম। আর গোলঘরে গিয়ে বসে থাকতাম। কখন ডাক পড়বে আমাদেরকে শরণার্থী হিসেবে তালিকাভুক্ত করবে সে আশায়। সারাদিস গোলঘরে বসে থাকা। আর রাতের বেলায় ঘুমানোর জন্যে কাউন্টার ঘর খুঁজে বের করা। এভাবে দিনগুলো কেটে যাচ্ছিলো।

সামনে ১৫ ফেব্রুয়ারী আসতে আরো কিছুদিন বাকী। ১২ কি ১৩ ফেব্রুয়ারী, সেদিন আরো একটা দল এসে উপস্থিত হলো দীঘিনালা থেকে।লোকজন বলে “মাইনীকূল” থেকে। ঐ দলের পর আরো পর পর কয়েকটা দল এসে হাজির হলো। চারদিকে আরো প্রচার হয়ে গেলো বাংলাদেশে সেটেলার বাঙাল ও সেনবাহিনীর অত্যাচার তীব্র আকার ধারন করেছে। লোকজন নিজেদের জায়গায় আর থাকতে পারছে না। পর পর আরো কয়েকটা দল আসাতে লোকের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেলো। শোনা গেলো, ভারত তার সীমান্তে কড়া নিরাপত্তা জোরদার করেছে। বাংলাদেশ থেকে যাতে আর লোকজন ভারতে প্রবেশ না পারে তার জন্যে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করার নির্দেশ জারি করা হয়েছে। কিন্তু তারপরেও লোকজনের আসা বন্ধ হয়নি। এখনো চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি, দীঘিনালা থেকে একদল শরণার্থী ভারতে প্রবেশ করার সময় বিএসএফ-এর মুখোমুখি হয়। বিএসএফরা তাদেরকে দেশে পুশব্যাক করতে চাইলে শরণার্থীরা সবাই মিলে বিএসএফ-এর প্রতিরোধ ভেঙে ভারতে প্রবেশ করে। ধাক্কাধাক্কি করে কিছু বিএসএফ-এর সৈন্যকেও তারা আহত করে। ফলে বিএসএফরা চরম ক্ষুব্ধ হয়। তারা সম্ভবত তাদের উর্ধ্বতন কতৃপক্ষকে জানিয়েছিলো।

ঐ শরণার্থীরা যখন পরদিন ভোরে ঠাকুমবাড়ী শরণার্থী শিবিরে এসে পৌঁছলো তখন কিছুক্ষণ পরে বিএসএফ-এর সৈন্যরা এসে হাজির। তারপর শুরু হলো শরণার্থী দলের পালের গোদা খুঁজা। বেছে বেছে দলের নেতাদের বের করা হলো। দুই একটা থাপ্পড় খেতে হয়েছিলো।পাগড়ীওয়ালা বড় বড় শিখ সৈন্যদের লাঠি ঘোরানো তখন দেখেছিলাম।“বাগো, বাগো” বলে তাড়িয়ে দিতে চেয়েছিলো। কিন্তু শরণার্থী শিবিরের এত জন সমুদ্রের মধ্যে তাদের করার কিছুই ছিলো না। তবে তারা ঐ শরণার্থী দলের নেতাদের কোথায় যেন ধরে নিয়ে গিয়েছিলো।

অবশেষে এলো সেই প্রতীক্ষার দিন, ১৫ ফেব্রুয়ারী। শরণার্থী নেতাদের কড়া নির্দেশ ঐ দিন কেউ ঘর থেকে মানে নিজেদের শিবির থেকে বের না হয়। সরকার যদি ফেরত চায় সবাই রাস্তায় রাস্তায় শুয়ে থাকবে। জান দেবে গাড়ীর চাকায়, তবুও কোন চুক্তি ছাড়া বাংলাদেশে ফেরত আসবে না। ঐ দিন আমরাও যারা নতুন গিয়েছিলাম, তারাও একটু সাবধানে ছিলাম। দুপুরের দিকে দুই একটা ট্রাক এসেছিলো শিবির ক্যাম্পে।কেন এসেছিলো জানি না। তবে গভীর উৎকন্ঠার মধ্যে ১৫ ফেব্রুয়ারী কেটে গেলো।

তারপর আমাদের অপেক্ষার পালা শেষ।এক সময় আমাদের ডাক পড়লো শরণার্থীতে তালিকাভুক্ত হতে। এরপর লাইনে গিয়ে দাঁড়ালাম এক এক পরিবার করে।দীর্ঘ প্রতীক্ষার শেষে নাম লেখালাম শরণার্থী হিসেবে। পরিবারগুলোকে কাউন্টারে ভাগ করা হয়। আমাদের কাউন্টারে কয় পরিবার ছিলো এখন মনে নেই। তবে আমাদের কাউন্টার নম্বর হলো ১২। ১২ নং কাউন্টারে অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেলাম। যেদিন তালিকাভুক্ত হলাম, সম্ভবত তারপরের দিন রেশন দেওয়া হলো আমাদের। এর মধ্য দিয়ে শরণার্থী জীবন শুরু হলো।

রেশনের মধ্যে কী কী ছিলো ঠিক মনে নেই। তবে এখনো আছে, শক্ত সিদ্ধ চাল, ডাল, চিড়া, গুড়, কিছু মরিচ ও ভোজ্য তেল। রান্নার সময় যতই পানি দেওয়া হোক না কেন, ভাতগুলো কখনো নরম হয় না। স্টীলের প্লেটে ভাত তুলে একবার ডালের ঝোল নিলে শেষ পর্যন্ত ঐ ডালের ঝোল দিয়ে ভাত খাওয়া যায়। শক্ত সিদ্ধ চালের ভাত খাওয়া দিয়ে শুরু হলো শরণার্থী জীবনের আরো এক নতুন যাত্রা।

চলবে………..

………………………………

অডঙ চাকমা, ২৫ অক্টোবর ২০১১

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/1103

ফেসবুক আলোচনা বিষয়ঃ এম এন লারমার বাণী ও অন্যান্য প্রসঙ্গ

ক্ষমা গুণ, শিক্ষা গ্রহণের গুণ পরিবর্তিত হওয়ার গুণএই তিন গুণের অধিকারী না হলে

প্রকৃত বিপ্লবী হওয়া যায় না

——————————-

গত ৯ অক্টোবর ২০১১ আমার ফেসবুক স্টাট্যাসে এম এন লারমার উপরে উল্লেখিত বাণীটি লিখেছিলাম।এই বাণীর শেষে একটা প্রশ্ন রেখেছিলাম, “বর্তমান জেএসএস নেতাদের মধ্যে ক’জনের এ গুণগুলো আছে?” এ স্ট্যাটাসে অনেকে আলোচনায় অংশ নিয়েছেন। এ লেখাটি যখন সাজাচ্ছিলাম তখন পর্যন্ত ১০২টি টি মন্তব্য এসেছে।বোধয় এ যাবত আমার ফেসবুক স্টাটাসে এগুলো হলো সর্বোচ্চ সংখ্যক মন্তব্য।আলোচনায় এম এন লারমার বাণী বিশ্লেষণে তেমন কোন বক্তব্য না থাকলেও পাহাড়ের সমসাময়িককালের রাজনীতি, রাজনীতিকেন্দ্রিক ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত ও সংঘাতের কারণ ইত্যাদি বিষয় আলোচনায় এসেছে। দু’একটা ব্যতিক্রম বাদে আলোচনা বেশ শান্তিপূর্ণ ও যুক্তিপূর্ণ হয়েছিলো বলা যায়।এক অর্থে এ আলোচনাটা সবচেয়ে প্রাণবন্ত মনে হয়েছে।

আলোচনায় অনেকে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তাদের মধ্যে রাজনীতিতে সুপরিচিত কিছু চেনাব্যক্তিত্বও অংশ নিয়েছিলেন। যেমন, এককালের তুখোর ছাত্রনেতা ও ইউপিডিএফ-এর অন্যতম সংগঠক ও প্রতিষ্ঠাতা সঞ্চয় চাকমা, বর্তমান ইউপিডিএফ-এর অঙ্গসংগঠন যুব ফোরামের নেতা মিথুন চাকমা, এবং জেএসএস সমর্থিত পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের নেতা বুলবুল চাকমা। আরো গুরুত্বপূর্ণ আলোচক ছিলেন ছিলেন রনুখাঁ, রাহুল চাকমা, জুম্ম চাকমা ও জেরবুঅ রাম কার্বারী।তাদের সাথে আরো যারা অংশগ্রহণ নিয়েছিলেন তারা হলেন হেগাবগা চাঙমা, অভি চাকমা, অমিত হিল চাকমা, চাঙমা হুয়েন, কালারলেস রেইনবো, ডেবা পেরাগ, জনি চাকমা, রিভিউ চাকমা, এবং অডঙ চাকমা।

উদ্বোধনী বক্তা ছিলেন আমাদের অত্যন্ত পরিচিতি ব্যক্তিত্ব সেদামপাঞ্জা চাকমা, যিনি দীর্ঘ সময় ধরে ফেসবুকে চাকমা ভাষা ব্যবহারে যুব সমাজকে নীরবে নিভৃতে উৎসাহ যুগিয়ে যাচ্ছেন এবং চাকমা ভাষার শব্দ রচনা ও ব্যবহারে নিরলসভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।সেদামপাঞ্জা চাকমার মন্তব্যের মধ্য দিয়ে ফেসবুক আলোচনা শুরু হয়। বিদগ্ধ আলোচকগণ এম এন লারমার বাণী ও পাহাড়ের রাজনীতি নিয়ে বিভিন্ন আঙ্গিকে বিশ্লেষণ করেছেন।অনেক প্রাণবন্ত আলোচনা হয়েছিলো। অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছিলো। তাই আলোচকদের বক্তব্য ও বিশ্লেষণের ভিত্তিতে এ লেখাটা লেখার লোভ সামলাতে পারলাম না। আর লেখা ও বিশ্লেষণের সাথে যে কারোর দ্বিমত থাকতে পারে। তাই অনুরোধ রাখছি ফেসবুক বন্ধুরা যুক্তি নিয়ে আরো প্রাণবন্ত আলোচনায় অংশ নেবেন।

১। প্রথমে এম এন লারমার বাণী ও কিছু কথা

ক্ষমা গুণ, শিক্ষা গ্রহণের গুণ পরিবর্তিত হওয়ার গুণএই তিন গুণের অধিকারী না হলে প্রকৃত বিপ্লবী হওয়া যায় না – এম এন লারমার এই বাণীটা আমার স্ট্যাটাসে থাকলেও বাণীর উপর তেমন কোন ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ হয়নি। আলোচনার বিষয়গুলো অন্য জায়গায় চলে গেছে। সে প্রসঙ্গে পরে আসা যাবে। তবে আলোচকরা এম এন লারমার বাণী নিয়ে তেমন কোন আলোচনা না করলেও আমি এ বিষয়ে কিছু বলার চেষ্টা করছি।

এম এন লারমার এ বাণীর গভীরতা অনেক। এখানে তিনি একজন বিপ্লবীর তিনটি গুণের কথা বলেছেনঃ ১) ক্ষমা গুণ; ২) শিক্ষা গ্রহণের গুণ এবং ৩) পরিবর্তিত হওয়ার গুণ। এ গুণগুলো বিশ্লেষণ করতে গেলে অনেক সময়ের প্রয়োজন হবে এবং আলোচনার পরিধিও অনেক বড় হবে। সে যা হোক, আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে যতটুকু পারি ঐ গুণগুলো নিয়ে বিশ্লেষণের চেষ্টা এখানে থাকবে। (জেএসএস-এর কেউ এম এন লারমার এ বাণীর ভাবসম্প্রসারণে এগিয়ে আসলে আরো ভালো হবে)।

ক্ষমাগুণ প্রসঙ্গে

প্রথমে আসি ক্ষমা গুণ প্রসঙ্গে। কথায় বলে, ক্ষমা মহত্তের লক্ষণ। একজন মানুষের ক্ষমা গুণ না থাকলে সে হৃদয়হীন ও মনুষ্যত্বহীন দানব ছাড়া কিছু হতে পারে না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এম এন লারমা এক বিপ্লবীর মধ্যে কীভাবে ক্ষমাগুণটা দেখতে চেয়েছিলেন? যারা অস্ত্র হাতে নেয়, যুদ্ধের ময়দানে ধ্বংসের খেলায় মেতে উঠে সেখানে একদিকে অস্ত্র আর অন্যদিকে ক্ষমা একটু প্যারাডক্সের মত বলে মনে হয়। সে যাহোক, এই ক্ষমাগুণের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ কেবল রাজনীতির প্রেক্ষাপট থেকে নয়, মনস্তাত্ত্বিক কিংবা ধর্মীয় দিকে থেকেও থেকে হতে পারে।

বৌদ্ধ ধর্মে “ক্ষমা”র সমার্থক শব্দ হলো “করুণা” (compassion) ও “ক্ষান্তি” (patience/forbearance)।করুণার অর্থ হলো “সকল বোধ সম্পন্ন প্রাণীর প্রতি সক্রিয় প্রগাঢ় সহানুভূতি” (karuna is active sympathy extended to all sentient beings)। অন্যদিকে “ক্ষান্তি” শব্দের অর্থও অনেক ব্যাপক। এর সমার্থক শব্দ হলো, শান্তি, ধৈর্য, উদারতা ইত্যাদি। বুদ্ধ প্রতি জন্মে ক্ষান্তিবাদী ছিলেন। অর্থাৎ, ক্ষান্তিবাদী হিসেবে তিনি সবসময় বোধিসত্ত্ব, মানে বোধি বা জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। যেই কুলে জন্মগ্রহণ করেন না কেন, তিনি বোধির বলে সব সময় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। আর বৌদ্ধধর্ম অনুসারে বোধিসত্ত্ব বা ক্ষমাগুণের অধিকারী হতে হলে দশটি পারমী বা গুণ অনুশীলন করতে হয়। সেগুলো হলো, দানশীলতা/উদারতা, শীল/চরিত্র, ত্যাগ, দূরদর্শীতা, কর্ম উদ্যোগ, ধৈর্য, সত্যবাদিতা, দৃঢ় সংকল্প, মৈত্রী ও উপেক্ষা। (এখানে ‘উপেক্ষা’ মানে হলো মানে হলো, সুখদুঃখ, যশ-অযশ, নিন্দা-প্রশংসা, লাভ-অলাভ –এসবে অবিচলিত থাকা)। এখানে যে গুণসমূহের কথা বলা হলো, সেগুলো জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে যে কোন বিবেকবোধ সম্পন্ন মানুষের জন্যে কাম্য। কেবল একজন সংসারত্যাগী সন্ন্যাসীর কাছে এ গুণসমূহ থাকবে তা নয়, একজন অস্ত্র হাতে তুলে নেওয়া প্রকৃত বিপ্লবীরও এগুলো থাকতে হবে। একজন অস্ত্রধারী সমাজবিপ্লব প্রত্যাশী ব্যক্তির যদি উদারতা, দূরদর্শীতা, কর্ম উদ্যোগ, ধৈর্য, সত্যবাদিতা, দৃঢ় সংকল্প, মৈত্রী ও উপেক্ষা ইত্যাদি গুণাবলী না থাকে, তাহলে সে নির্দয়, নির্মম ও পাষাণ হৃদয় ছাড়া মানুষ বলে পরিগণিত হতে পারে না। আমার মনে হয়, এম এন লারমা বৌদ্ধ দর্শনের এ ক্ষমাগুণগুলোর ব্যাপারে সচেতন ছিলেন।তাই একজন বিপ্লবীর কাছে “ক্ষমাগুণ”টি তিনি দেখতে চেয়েছেন।

কেবল ধর্মীয় শাস্ত্রে নয়, রাজনীতির ক্ষেত্রেও ‘ক্ষমা’ (political forgiveness) জিনিসটা রয়েছে।রাজনৈতিক পরিভাষায় হয়তো বিভিন্ন নাম দেওয়া হয়, যেমন সন্ধিস্থাপন, শান্তিস্থাপন, শত্রুতা ভুলে গিয়ে পরস্পরের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন (reconciliation) ইত্যাদি। রাজনৈতিক হানাহানি, যুদ্ধ, ধ্বংস ইত্যাদির জটিল সমস্যার সমাধান করতে হলে ক্ষমা নীতি প্রয়োগ ছাড়া শান্তি স্থাপন সম্ভব নয়। ক্ষমা জিনিসটা না থাকলে শান্তি নামক কোন শব্দ অভিধানেও থাকতো না, কোন চুক্তিও হতে পারতো না । কিন্তু প্রশ্ন হলো, রাজনৈতিক ক্ষমা জিনিসটা কী? বিভিন্ন সংজ্ঞা, ধারনা ও মতবাদ    আছে। জনৈক M. R. Amstutz (2004: Human Rights and Promise of Political Forgiveness) তার এক প্রবন্ধে রাজনৈতিক ক্ষমা সম্পর্কে বলেছেন,

“political forgiveness is not the neglect of memory, but a means by which the legacy of past wrongdoing is redeemed – thus making possible the healing of personal and interpersonal injuries” (রাজনৈতিক ক্ষমা মানে স্মৃতিশক্তিকে অবহেলা করা নয়; বরং এটি অতীতের ভুলভ্রান্তি সংশোধনের একটি উপায়, যার মাধ্যমে ব্যক্তিগত ও পারস্পরের মধ্যে ঘটে যাওয়া ক্ষতগুলোর উপশম করা)।

এর অর্থ হলো, রাজনৈতিক ক্ষমা হলো এমন একটি সহায়ক প্রক্রিয়া যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যারা দ্বন্দ্বসংঘাতে লিপ্ত ছিলেন, পরস্পরকে আঘাত করেছিলেন, বা কোন না কোন ভাবে ক্ষতি করতে উদ্যত ছিলেন – সেই অতীতের আঘাত ও দুঃসহ স্মৃতিগুলোকে মন থেকে ঝেরে ফেলে পরস্পরের সাথে সহনশীল হয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ রচনা করা। অতীতের ভুলগুলো দিয়ে যদি মনকে সবসময় বিষাক্ত করে রাখা হয়, তাহলে সেখানে শান্তির পথে এগিয়ে যাওয়া সহজ নয়। সেজন্যে বিবদমান পক্ষগুলো যদি সত্যি সত্যি সামনে এগিয়ে যেতে চায়, সমাজ পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে চায়, তাহলে তাদের মনকে প্রশমিত করে ক্ষমার মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।এটাই হলো ক্ষমাগুণের তাৎপর্য।

ক্ষমা নীতির প্রয়োগ আমরা বিভিন্নভাবে দেখতে পাই।এ নীতি ছাড়া সামনে এগিয়ে যাওয়ার কোন বিকল্প নেই। সেজন্যে যুদ্ধবিগ্রহের মধ্য দিয়ে অর্জিত স্বাধীনতা, অথবা শান্তিচুক্তি সম্পাদনের মধ্য দিয়ে অর্জিত অধিকার কিংবা বিপ্লবের মধ্য দিয়ে অর্জিত ক্ষমতা – তা সুসংহত করার এবং সামনে এগিয়ে চলার লক্ষ্যে, যারা বিবেচক ও বুদ্ধিমান রাষ্ট্রনায়ক তারা ক্ষমতা নেওয়ার পর পরই প্রথমে জোর দেন দেশের বিভিন্ন দল ও গোষ্ঠীর মধ্যে সুসম্পর্ক (reconciliation) স্থাপনে। কারণ, তা করা না হলে অতীতের ক্ষতগুলো পরাজিতদের মন কুরে কুরে খেতে পারে, এবং যে কোন সময় দেশ বা সমাজ সংঘাতের দিকে যেতে পারে। সেজন্যে রাষ্ট্র বা সমাজ গঠনে সমাজের মধ্যে ক্ষমা বা সুসম্পর্ক স্থাপন অপরিহার্য। যেমন, দক্ষিণ আফ্রিকায় কালোরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যাওয়ার পর সাদা চামড়াদের ধরে ধরে মারেনি। বরং ক্ষমা করেছিলো। নেলসন ম্যান্ডেলার সরকার ট্রুথ এ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন গঠন করে এর মাধ্যমে অতীতের দুঃখগুলো, আর ভুলগুলো শান্তিপূর্ণভাবে শোধরানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সদ্য স্বাধীন দেশ পূর্ব তিমূরও দেশের শান্তি বজায় রাখা ও সামনে এগিয়ে চলার স্বার্থে ইন্দোনেশিয়ার সাথে ক্ষমা করো, ভুলে যাও নীতি অবলম্বন করছে।যদি “চোখের বদলে চোখ”- এই নীতি গ্রহণ করতো তাহলে ইন্দোনেশিয়ার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ধর্ষণ, খুন, অপহরণ ইত্যাদি মানবাধিকার লংঘনের দায়ে মামলা করতে হবে। কিন্তু পূর্ব তিমূর সে পথে যাচ্ছে না বা যেতে পারছে না প্রতিবেশির সাথে শান্তির স্বার্থে, সামনে এগিয়ে যাওয়ার স্বার্থে।আরো অনেক উদাহরণ আছে। আমাদের বাংলাদেশেও দেখেছি, তত্তাবধায়ক সরকার দুর্নীতিবাজদের সাথে একটা সমঝোতার পথ সৃষ্টি করতে বা দুর্নীতি প্রশমনে “ট্রুথ কমিশন” গঠন করেছিলো (যদিও ঐ কমিশন আদালতের রায়ে বাতিল করা হয়)। আর আমাদের পার্বত্য চুক্তির উদাহরণটাও নিতে পারি। এখানেও দেখতে পাই “ক্ষমা করো, ভুলে যাও নীতি”।চুক্তিতে যে অধিকার থাকুক না কেন, যদি জেএসএস সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লংঘনের বিচারের দাবী নিয়ে অনড় থাকতো কিংবা সরকারও যদি শান্তিবাহিনী সদস্যদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা না করার মনোভাব নিয়ে কাজ করতো, তাহলে কী চুক্তি হতে পারতো? অবশ্যই, কখনোই সম্ভব হতো না।

কাজেই, এসব উদাহরণ থেকেও ক্ষমা জিনিসটা রাজনীতিতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা সহজে অনুধাবন করতে পারি। এম এন লারমার ঐ উক্তি থেকে অনুধাবন করতে পারি, তিনি রাজনীতিবিদ হিসেবে, বিপ্লবী রাজনৈতিক হিসেবে ক্ষমাগুণ নিয়ে সচেতন ছিলেন। আর ক্ষমানীতি ছাড়া দ্বন্দ্বসংঘাতে লিপ্ত ও বহুধা বিভক্ত সমাজে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সুসম্পর্ক বা পুনরেত্রিকরণ কখনো সম্ভব হতে পারে না; আর তা না হলে সামনে এগুনোও কঠিন। এ সত্য উপলব্ধি করেছিলেন এবং সে কারণে লাম্বা-বাদির দ্বন্দ্ব নিরসনে “ক্ষমা করো, ভুলে যাও” নীতি গ্রহণ প্রয়োগ করতে চেয়েছিলেন। ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, বর্তমান জুম্মদের দ্বন্দ্ব-সংঘাতের রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এ ক্ষমাগুণের উপযোগিতা আরো বেশি আছে। [যদিও এখন অনেকে বলে থাকেন, এম এন লারমার এ নীতি সঠিক ছিলো না।কিন্তু ঐ নীতির উপাদান (elements of forgiveness), দ্বন্দ্বের মূল কারণগুলোর সঠিক নিরূপন, নীতি প্রয়োগ পদ্ধতি ও প্রয়োগ প্রক্রিয়ার হর্তাকর্তা (actors)কারা ছিলেন এবং তাদের ভূমিকা কী ছিলো ইত্যাদি বিশ্লেষণ ছাড়া এম এন লারমার এই “ক্ষমা করো” নীতি “বেঠিক ছিলো” এমন একটি সাধারণ সিদ্ধান্তে আসা কঠিন]।

শিক্ষা গ্রহণের গুণ

ছোটবেলায় আমাদের এক আদর্শ শিক্ষক বলতেন, “একজন শিক্ষক আজীবনই ছাত্র”। তার বিনয়বোধ ছিলো অত্যন্ত প্রখর। তিনি সবকিছু জানেন তেমনটা ভাব দেখাতেন না। বলতেন, তিনিও ছাত্র-ছাত্রীদের কাছ থেকে অনেক শিখছেন। মানে হলো, তিনি আজীবনই ছাত্র থাকবেন। ঐ শ্রদ্ধেয় শিক্ষকের কথার সুরের সাথে তাল মিলিয়ে বলতে হয়, একজন রাজনৈতিক কর্মী বা বিপ্লবীকেও আজীবন শিখতে হবে। প্রতিনিয়ত যদি তিনি জনগণের কাছ থেকে শিখতে না পারেন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি, অর্থনীতি ও বিশ্বব্যবস্থা সম্পর্কে শিখতে না পারেন, তাহলে তিনি সমাজের জন্যে কোন কিছু দিতে পারবেন না। বদ্ধ চিন্তা দিয়ে বড়জোর মৌলবাদ কায়েম করা যাবে, কিন্তু কখনো সমাজ বিপ্লব সম্ভব হবে না। এ সত্যটা এম এন লারমা মরমে মরমে অনুধাবন করেছিলেন বলে মনে হয়। তা না হলে তিনি এত বড় একটা সত্য বাণী উচ্চারণ করতেন না।

এখন প্রশ্ন হলো একজন বিপ্লবীর কী কী শেখা দরকার? আমার মত নগন্য মানুষের পক্ষে প্রেসক্রিপশন দেওয়া মানায় না – কোনটা শেখা দরকার আর কোনটা দরকার নয়। তবে আমি মনে করি, একজন বিপ্লবীর প্রথম শিক্ষণ হওয়া উচিত জনগণের সুখদুঃখ, সমাজ কাঠামো, সমাজের লোকজন কীভাবে চলছে আর ফিরছে, তাদের অর্থনীতি ইত্যাদি জানা। সমাজের লোকজন তাদের আশাআকাংখাগুলো কীভাবে প্রকাশ করে, কীভাবে তাদের স্বপ্নগুলো দেখতে চায় আর বাস্তবায়ন করতে চায় সেগুলো জানা অপরিহার্য। জনগণের আশা-আকাংখা ও স্বপ্ন জেনে এবং শিখে নিয়ে একজন বিপ্লবীকে সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন সাজাতে হবে। কেননা, বিপ্লবীর সমাজস্বপ্ন (vision) যদি সংখ্যা গরিষ্ঠ জনগণের আশা আকাংখা ধারন করতে না পারে, তাহলে তার পক্ষে কোন বিপ্লব ঘটানো সম্ভব নয়। আর দ্বিতীয় শিক্ষণটা হওয়া উচিত বিপ্লবী সংগঠন কীভাবে গড়ে তুলতে হয়, কীভাবে সঠিক নেতৃত্ব দিয়ে কাংখিত স্বপ্ন অর্জন হবে সেসব নিয়ে। শুধু কাগজে কলমে স্বপ্ন, নীতি আদর্শ লেখা হয়ে গেলে লক্ষ্য অর্জিত হবে তা নয়। চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্যে, সমাজের পরিবর্তনশীল চাহিদা ও আশা আকাংখা বুঝা ও বিশ্লেষণের জন্যে বিপ্লবী কর্মীদের জ্ঞান, দক্ষতা ও যোগ্যতা অর্জন করতে হবে প্রতিনিয়ত। সহজভাবে বলা যায়, এক বিপ্লবী কর্মীর সংগঠনের নীতি আদর্শ অধ্যয়ন করা, নিজেকে সেগুলো রপ্ত করা ও অনুশীলন করা যেমন প্রয়োজন এবং তেমনি প্রয়োজন সেগুলোর সঠিক প্রয়োগ বা বাস্তবায়ন। শিক্ষণ থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত সংগঠনের কোন নীতি, কোন কর্মসূচী সঠিক পথে গেলো, আর কোনগুলো ভুল পথে গেলো – সেগুলোরও মূল্যায়ন প্রয়োজন। ভুলশুদ্ধ মূল্যায়ন করে সঠিক শিক্ষা (lessons learnt) গ্রহণ করতে হবে এবং ভুলগুলো এড়িয়ে ভবিষ্যত করণীয় নির্ধারণ করতে হবে। একজন বিপ্লবীকে আজীবন এ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। তা করতে না পারলে তার মধ্যে কোন সৃজনশীলতা আসবে না। আর সৃজনশীলতা না থাকা মানে হলো “চিন্তার জড়তা” যেটা কোন বিপ্লবীর গুণ হতে পারে না।

এখানে আরো বলতে হয়, শিক্ষার তিনটি ক্ষেত্র (domains) আছে। অর্থাৎ সে একজন ছাত্র হোক, বিপ্লবী হোক কিংবা যে কারোর শিক্ষার জন্যে তিনটা দিকের প্রতি জোর দেওয়া হয়।যথা, জ্ঞান (knowledge), মনোভঙ্গি (attitudes) ও দক্ষতা (skills)।এই তিনটা ক্ষেত্রের অনেক ব্যাখ্যা আছে। এখানে জ্ঞান বা knowledge একজন মানুষের মনের দক্ষতাকে (mental skills)নির্দেশ করে। অর্থাৎ জানাকে ধারন করে মন। তাই জ্ঞান বৃদ্ধি মানে হলো বই পড়ে কিংবা বিভিন্ন মাধ্যমে মনের পরিধিকে বাড়ানো। আর মনোভঙ্গি বা attitude-টা মানুষের আবেগ, অনুভূতি বা কারোর প্রতি কী রকম মনোভাব পোষণ করা হয় সেদিকগুলোকে নির্দেশ করে। যেমন উদাহরণ হিসেবে জেএসএস ও ইউপিডিএফ-এর কথা বলা যায়। ইউপিডিএফ-এর প্রতি জেএসএস-এর মনোভঙ্গি হলো “ইউপিডিএফ একটি সন্ত্রাসী সংগঠন”। জেএসএস-এর নেতারা তাদের নতুন কর্মী বা সমর্থকদের মধ্যে এই মনোভঙ্গি ঢুকিয়ে দিচ্ছে। সেভাবে জেএসএস-এর নতুন কর্মী/সমর্থক বা আন্ডানেতারা ইউপিডিএফ সম্পর্কে শিখছে। ঠিক তেমনিভাবে জেএসএস-এর প্রতি ইউপিডিএফ-এর মনোভঙ্গি হলো জেএসএস জুম্ম স্বার্থ সংরক্ষণে ব্যর্থ। চুক্তির মধ্য দিয়ে জুম্মস্বার্থ জলাঞ্জলি দেওয়া হয়েছে। ঠিক সেভাবে ইউপিডিএফ-ও তার নতুন কর্মী বা সমর্থকদের মধ্যে এই মনোভঙ্গি ঢুকিয়ে দিচ্ছে। আর তৃতীয় ক্ষেত্রটি হলো দক্ষতা বা skills, এটি মূলতা হাতের বা কায়িক দক্ষতাকে নির্দেশ করে। যেমন, একজন সৈনিক ড্রিল বা মার্শাল আর্টে দক্ষ হতে পারেন; অস্ত্র চালনায় কিংবা লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে দক্ষ হতে পারে; লেখালেখিতে দক্ষ হতে পারেন ইত্যাদি।

একজন মানুষের শিক্ষা এই তিনটি ক্ষেত্রের সমন্বয়ে হতে হবে।ঐ তিনটি ক্ষেত্রের মধ্যে সমন্বয় না থাকলে প্রকৃত শিক্ষা অর্জন হতে পারে না। আরো একটা বিষয় খেয়াল রাখতে হবে, শিক্ষা কোন অনেক সময় একপেশে হতে পারে। আর কোন কিছু অনপেক্ষ নয়। সেজন্যে একজন বিপ্লবীকে যুক্তিবাদী হয়ে সত্যমিথ্যা যাচাই করে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে।এই গুণটা না থাকলে একজন সমাজ বিপ্লবীর শিক্ষা পরিপূর্ণ হতে পারে না। আমার মনে হয়, এম এন লারমা এইদিকগুলো নিয়ে সচেতন ছিলেন। তাই তিনি একজন বিপ্লবীর কাছে শিক্ষাগ্রহণের গুণ দেখতে চেয়েছিলেন।

পরিবর্তিত হওয়ার গুণ

এ গুণ নিয়ে বিশদ বলার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। এই গুণটা শিক্ষাগ্রহণের গুণের সাথে সম্পর্কিত। বিভিন্ন পদ্ধতিতে শিক্ষা গ্রহণ করে যে কর্মী বা ব্যক্তি নিজেকে পরিবর্তন করতে পারেনা, সে কখনো বিপ্লবী হতে পারে না। সে বড়জোর হতে পারে মৌলবাদী বা গোঁড়া। আমার মনে হয়, এম এন লারমা তার দলের কোন কর্মীকে গোঁড়া হিসেবে দেখতে চাননি। কোন মৌলবাদী নেতা বা অন্ধ গোঁড়া দিয়ে সমাজ বিপ্লব হতে পারে না।

এম এন লারমার বাণী নিয়ে সারসংক্ষেপ

এম এন লারমার বাণী নিয়ে অনেক কথা এলোমেলোভাবে বলা হয়ে গেলো।উপরে আলোচনা থেকে বলা যায়, একজন রাজনৈতিক বিপ্লবীকে বা নেতাকে অবশ্যই এম এন লারমা নির্দেশিত তিনটি গুণের অধিকার হতে হবে। সেই হিসেবে আমরা এম এন লারমার উত্তরসূরী হিসেবে জেএসএস-এর বিপ্লবী নেতৃত্বের কাছে নিম্নোক্ত গুণগুলো প্রত্যাশা করি। সেভাবে ইউপিডিএফ-এর নেতাদের কাছেও সেই প্রত্যাশা করি।

১) ক্ষমাগুণের অংশ হিসেবে তাদের নেতাদের মধ্যে উদারতা, দূরদর্শীতা, কর্ম উদ্যোগ, ধৈর্য, সত্যবাদিতা, দৃঢ় সংকল্প, ও মৈত্রী ভাব থাকতে হবে। ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত নিরসনে এ গুণগুলো প্রয়োগ করতে হবে।

২) নিজেদের অতীতের ভুলভ্রান্তি গ্রহণে মানসিকতা থাকতে হবে এবং অতীত শিক্ষা হতে সেই ভুলভ্রান্তিগুলো সংশোধনের ব্যবস্থা করতে হবে।

৩) জেএসএস-ইউপিডিএফ-এর অনেক নেতাকর্মীর মধ্যে অনেক জ্ঞান ও দক্ষতা আছে, কিন্তু মনোভঙ্গিগত সমস্যা আছে। জনগণের কথাবার্তা, আশা-আকাংখাগুলোকে শ্রদ্ধা করে তাদের মনোভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে।

২। অন্যান্য প্রসঙ্গ

উপরে উল্লেখিত এম এন লারমার বাণী ছাড়াও ফেসবুক আড্ডায় আরো অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়। আলোচনায় যে প্রশ্নগুলো এসেছিলো, তাদের মধ্য হতে উল্লেখযোগ্য কিছু প্রশ্ন সম্পর্কে এই অধ্যায়ে আলোচনা করার চেষ্টা করছি।

১) কোনটার অভাবঃ মতবাদের নাকি বিবেকের? নাকি দু’টোই?

এম এন লারমার বাণীর বিশ্লেষণ দিতে জনৈক ফেসবুক বন্ধু ও জেএসএস-এর অংগ সংগঠনের নেতা বস্তুর পরিবর্তনের তত্ত্ব হাজির করেন। তিনি বলেন, বস্তুর পরিবর্তন প্রভাবিত হয় আভ্যন্তরীণ শর্ত দ্বারা। বাইরের শর্ত প্রভাবক মাত্র। তিনি আরো বলেন, বিপ্লব মানে পরিবর্তন আর সেই পরিবর্তন সূচিত হয় নিজের ভেতর থেকে। তার এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট না হয়ে জনৈক আলোচক অভিমত দেন, আমাদের জুম্ম সমাজে বুদ্ধি ও মতবাদের অভাব নেই। যেই জিনিসটার বড় অভাব সেটা হলো বিবেক। তিনি প্রশ্ন করেন, এই “বিবেক” ঠিক রাখার জন্যে পাহাড়ের সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলো কী করছে?

এই প্রশ্নের প্রেক্ষিতে ঐ জেএসএস সমর্থক আলোচক তার উত্তরে বলেন, “জুম্মদের বুদ্ধি আর মতবাদের অভাব নেই সত্য কিন্তু সঠিক বুদ্ধি ও মতবাদের যথেষ্ট অভাব রয়েছে”।তিনি জোর দিয়ে বলেন, “বিবেকের” অভাব নয়, বরং জুম্ম সমাজের সমস্যাটা হলো “সঠিক বুদ্ধি ও মতবাদের” অভাব।

এই প্রেক্ষিতে প্রশ্ন জাগে কোনটা সত্যঃ রাজনীতিবিদদের “বিবেকের” অভাব নাকি “সঠিক বুদ্ধি ও মতবাদের অভাব? বিবেকের অভাব, বা এম এন লারমা ব্যাখ্যাকৃত “ক্ষমাগুণের” অভাবের প্রতিফলন বা উপসর্গ আমরা ইতোমধ্যে অনেক দেখতে পেয়েছি। কয়েক মাস আগের দৈনিক ‘প্রথম আলো’র একটি প্রতিবেদন অনুসারে জেএসএস-ইউপিডিএফ-এর মধ্যে খুনোখুনি ও পাল্টাখুনোখুনির কারণে ইতোমধ্যে ৭০০-এর জুম্ম খুন হয়েছে; আহত হয়েছে পাঁচ শতাধিক। অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের মত জঘন্য ঘটনা ঘটেছিলো অহরহ। মৃত্যুর মিছিলের তালিকায় কিছুদিন আগেও কয়েকজন যুক্ত হয়েছিলেন। গত সপ্তাহের প্রথম আলোর প্রতিবেদনে চোখে পড়লো, জেএসএস অভিযোগ করেছে, ইউপিডিএফ ইতোমধ্যে ২২ জনের অধিক প্রাক্তন শান্তিবাহিনী সদস্যকে খুন করেছে।অন্যদিকে জেএসএসও অনেক ইউপিডিএফ সদস্যকে খুন করেছে।এগুলো হলো জেএসএস-ইউপিডিএফ নেতৃত্বের বিবেকহীনতা ও ক্ষমাহীনতার চরম প্রতিফলন।

এখন জেএসএস সমর্থক ফেসবুক বন্ধু “সঠিক বুদ্ধি ও মতবাদের অভাব” বলতে কী বুঝিয়েছেন সে ব্যাপারে আরো বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে। আশা করি, তিনি এ ব্যাপারে আরো ব্যাখ্যা নিয়ে হাজির হবেন। তবে তার এ বক্তব্য আমার কাছে কয়েকটা অর্থ বহন করে। যেমন, ১) জেএসএস এবং সেভাবে ইউপিডিএফ যে মতবাদ নিয়ে আন্দোলন সংগ্রাম করছে, সেখানে গলদ আছে; ২) এই “গলদপূর্ণ তত্ত্ব বা মতবাদ” দুই দলের ‘বুদ্ধির অভাবে ভোগা’ নেতা/আন্ডানেতা ও কর্মীরা অন্ধহীনভাবে অনুসরণ করছেন। সেই অন্ধ অনুসরণের কারণে তারা নিজেদের মতবাদটাই “সবচেয়ে সত্য”, ও “সবচেয়ে শুদ্ধ” বলে চাপিয়ে দিতে চাচ্ছে সাধারণ জনগণের উপর; ৩) এই অন্ধ অনুসরণ মৌলবাদের জন্ম দিয়েছে, যেই মতবাদ অনুসারে একটির অধিক ‘মত’ বা ‘পথ’ থাকতে পারে না। তাই তো আমরা “এক বনে একাধিক বাঘ থাকতে পারে না” কিংবা “আমারটাই সঠিক, ওরটা বেঠিক” এর মত মতবাদ শুনতে পাই; এবং ৪) প্রশ্নহীনভাবে অন্ধ অনুসরণের কারণে ‘বিবেকহীনতা’র জন্ম দিয়েছে। ‘বুদ্ধির অভাবে ভোগা’ জেএসএস-ইউপিডিএফ নেতা/আন্ডানেতা ও সমর্থকদের সেই চরম বিবেকহীনতার কুফল আমরা ইতোমধ্যে জুম্ম সমাজের পরতে পরতে দেখতে পাচ্ছি।

উপরের এ আলোচনা থেকে এটা স্পস্ট, যে দু’জন আলোচক “বিবেকহীনতা” ও “সঠিক বুদ্ধি ও মতবাদের অভাব” বলে অভিমত দিয়েছেন, সেটা জেএসএস-ইউপিডিএফ-এর কর্মযজ্ঞে সত্য বলে প্রমাণিত। এটা হওয়ারও অন্যতম কারণ হলো, তারা এম এন লারমার মত “ক্ষমা গুণ ও শিক্ষা গ্রহণের গুণ” ধারন করতে পারেনি, তার শিক্ষা হতে তারা অনেক দূরে সরে গেছে। এম এন লারমার ব্যাখ্যাকৃত বিপ্লবী গুণগুলো তাদের মধ্য হতে হারিয়ে গেছে। ফলে রাজনৈতিক মতবাদের নামে যা চলছে তা হলো “অন্ধ মৌলবাদ”, যার চরম মূল্য জুম্মজনগণকে এখন দিতে হচ্ছে।

২) আদর্শঃ ব্যক্তি আদর্শ বনাম সামগ্রিক আদর্শ – রাজনীতি থেকে সরে গেলে ব্যক্তি আদর্শের কী মৃত্যু ঘটে?

রাজনীতিবিদদের বিবেক, বুদ্ধি ও সঠিক মতবাদের অভাব নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে একজন আলোচক আদর্শের কথা পাড়লেন। তিনি কোন প্রেক্ষিত থেকে আদর্শের প্রসঙ্গ নিয়ে এসেছিলেন, তা স্পষ্ট করা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেছেন, “একজন ব্যক্তির আদর্শের মৃত্যু হতে পারে, কিন্তু সামগ্রিকভাবে সমাজের ভেতর থেকে আদর্শের কখনো মৃত্যু হয় না”। “আদর্শ”, “ব্যক্তিগত আদর্শ” ও “সামগ্রিক আদর্শ” বলতে তিনি বুঝাতে চেয়েছিলেন সে ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি ব্যাখ্যা দিয়েছেন এভাবে –

“সাধারণভাবে আমরা রাজনৈতিক আদর্শকে কোন নির্দিষ্ট রাজনৈতিক চিন্তাধারাকে বুঝে থাকি।….ব্যক্তিগতভাবে আমি যদি সংগ্রাম থেকে সরে আসি আন্দোলন বিমুখ হই, তার মানেই হলো আমার ভিতর জুম্ম জাতীয়তাবাদী আদর্শের মৃত্যু। কিন্তু সামগ্রিকভাবে সমাজের ভিতর আন্দোলনের আকাংখা শেষ হতে পারে না। কারণ, জুম্মজাতি তার অস্তিত্বের প্রয়োজনে এই জাতীয়তাবাদী আন্দোলন চালিয়ে যাবে যতদিন পর্যন্ত অধিকার প্রতিষ্ঠা হবে না। তাই সমাজের ভিতর থেকে আদর্শের কখনো মৃত্যু হয় না।”

পাঠকবন্ধুরা, উপরে উদ্ধৃতিতে নীচে দাগ দেওয়া শব্দগুচ্ছগুলো দেখতে পারেন। যেই নেতা “সঠিক বুদ্ধি ও মতবাদের অভাব” বলে প্রেসক্রিপশন দিচ্ছেন, তার কাছ থেকে আমরা “সঠিক মতবাদ” বা শিক্ষা পাচ্ছি কীনা সে ব্যাপারে আপনাদের মতামত ও বিশ্লেষণ পাওয়ার জন্যে আমি এখানে এই উদ্ধৃতিটা আপনাদের সামনে আবারো তুলে ধরলাম। ঐ নেতার উপরের “সঠিক মতবাদ” থেকে দু’টো বিষয় আপনাদের আলোচনার জন্যে তুলে ধরার প্রয়াস পাচ্ছি।

১) তার মতে আদর্শ মানে হালো রাজনৈতিক চিন্তাধারা।

২) তার মতে, নিজে আন্দোলন থেকে সরে গেলে বা আন্দোলন বিমুখ হলে জুম্ম জাতীয়তাবদী আদর্শের মৃত্যু। এর মানে দাঁড়ায়, কেউ যদি আন্দোলন বিমুখ হয় অথবা আন্দোলন থেকে সরে পড়েন তাহলে তাঁর ব্যক্তি আদর্শের মৃত্যু ঘটে।

এখন পাঠকদের কাছে প্রশ্নঃ আপনারা কী মনে করেন উপরের দু’টো ব্যাখ্যা “সঠিক”? আপনাদের কাছ থেকেও উত্তর ও ব্যাখ্যা আশা করছি।

পাঠক বন্ধুরা, আমিও আমার ব্যাখ্যাটা দিয়ে গেলাম।

আদর্শ মানে হালো রাজনৈতিক চিন্তাধারা প্রসঙ্গে

আমি মনে করি, এ ব্যাখ্যা পুরোপুরি সঠিক নয়। বলা যায় গোঁজামিল। আমার মনে হয়েছে, তিনি “আদর্শ” কাকে বলে এবং “রাজনৈতিক চিন্তাধারা” কাকে বলে এই দু’টো ধারনা সম্পর্কেও যথাযথভাবে অবগত নন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে রাজনৈতিক “আদর্শ” ও “চিন্তাধারা” সম্পূর্ণ আলাদা ধারনা। আমি যেভাবে বুঝি সেটা হলো, রাজনৈতিক আদর্শ মানে হলো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্বাস, নীতি ও নৈতিকতা (ideals), মত (doctrines) ইত্যাদি। যেমন, প্রচলিত রাজনৈতিক পরিভাষায় বললে, পুঁজিবাদী আদর্শ, সমাজতান্ত্রিক আদর্শ। রাজনৈতিক আদর্শ বুঝতে হলে অন্তত দু’টো দিক স্পষ্ট করতে হবেঃ একটা হলো লক্ষ্য আর অন্যটা হলো পদ্ধতি। যেমন, আমরা কী রকম সমাজ চাই? কেউ হয়তো বলবেন শোষণহীন সমাজ। এখানে শোষণহীন সমাজ হলো লক্ষ্য। এখন এই লক্ষ্য অর্জনে কোন পদ্ধতি অনুসরণ করতে চাই? গণতন্ত্র, পুঁজিবাদ, সমাজতন্ত্র নাকি অন্যকিছু? এই লক্ষ্য অর্জন করতে এবং পদ্ধতি প্রয়োগ করতে গিয়ে সেখানে অনেক মূল্যবোধ (values), নীতি, কৌশল ইত্যাদি অনুসরণ করার প্রয়োজন হয়। এগুলোই হলো আদর্শের দিক। অন্যদিকে, রাজনৈতিক চিন্তাধারা হলো রাজনৈতিক তত্ত্বের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ। যেমন, সক্রেটিস, চানক্য, ম্যাকিয়া্ভ্যালি কিংবা মহাত্মাগান্ধী রাষ্ট্র ব্যবস্থা নিয়ে কী বলেছেন, এবং কী কী তত্ত্ব দিয়ে গেছেন, সেগুলো হলো “রাজনৈতিক চিন্তাধারা”র অংশ।

কাজেই, জেএসএস সমর্থক বিজ্ঞ আলোচক রাজনৈতিক আদর্শের যে ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছেন, তার সাথে আমি কখনো একমত নই। কাজেই তাঁর ব্যাখ্যাকে “সঠিক” বলে গ্রহণ করার কোন কারণ দেখি না।

ব্যক্তির রাজনৈতিক আদর্শের মৃত্যু প্রসঙ্গে

জেএসএস সমর্থক বিজ্ঞ আলোচক “ব্যক্তি আদর্শ” ও সমাজের “সামগ্রিক আদর্শ” সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিতে বলেছেন, কেউ আন্দোলন থেকে সরে গেলে বা আন্দোলন বিমুখ হলে ঐ ব্যক্তির আদর্শের মৃত্যু ঘটে।এই যুক্তি জীবনে শুনিনি। বেশি ব্যাখ্যায় যাওয়ার প্রয়োজন নেই। তর্কের খাতিরে তার কথা সত্য বলে ধরে নিলেও প্রশ্ন করতে হয়ঃ তাহলে এখন কী এম এন লারমার ব্যক্তি আদর্শের মৃত্যূ ঘটেছে? কারণ, তিনি এখন ইহ জনমে নেই। শারীরিকভাবে তিনি এখন আন্দোলনেও নেই। ঠিক সেভাবে আরো প্রশ্ন করতে হয়, মার্ক্স যে সাম্যবাদের আদর্শের কথা বলে গিয়েছিলেন, তাহলে সেগুলোরও আর কোন অস্তিত্ব নেই? সমাজতান্ত্রিক আদর্শ বলতে বর্তমানে আর কিছু কী আছে? মাওবাদ বলতে কোন কিছু কী আছে? কারণ, মাও এখন আন্দোলনেও নেই, শারীরিকভাবেও ইহ জীবনে নেই।

এসব প্রসঙ্গ থেকে এখানে শেষ প্রশ্নঃ জেএসএস সমর্থক বিজ্ঞ আলোচক কী আমাদের “সঠিক মতবাদের” শিক্ষা দিচ্ছেন কী? তাঁর এই ব্যাখ্যা কারা কারা মেনে নিচ্ছেন বিনা প্রশ্নে?

চলবে…………..

………………………………………..

অডঙ চাকমা, ২২ অক্টোবর ২০১১

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/1094

শরণার্থী জীবনঃ একটু পেছন ফিরে দেখা

কিছুদিন আগে জনৈক দেবাশীষ চাকমা আমাকে তির্যকভাবে একটা মন্তব্য দিয়েছিলো।শরণার্থী জীবন নিয়ে অনেক তীর্যক কথা শুনেছিলাম।দুঃখ কারে কয় সেটা শরণার্থী না হলে কাউকে বোঝানো খুবই কঠিন। শরণার্থী পরিচিতি মুছে ফেলতে অনেকদিন লেগেছিলো। তবে আমাকে কেউ যদি শরণার্থী বলে ডাকতো তাতে আমার কোনদিন দুঃখবোধ হয়নি। এখনো হয় না। বরং শরণার্থী হওয়ার মধ্যে এখন এক ধরনের গর্ববোধ হয়। শরণার্থী হয়ে আমরা যে ত্যাগ স্বীকার করেছিলাম সেই ত্যাগ অবশ্যই বিরল। আমাদের এই বিরল ত্যাগ না হলে শান্তিচুক্তি হতো কী না সন্দেহ আছে। যারা আজকে শান্তিচুক্তি নিয়ে নিজেদের ত্যাগের মহিমার কথা শোনাতে চান, তাদের উচিত হবে আমাদের মত শরণার্থীদের ত্যাগের কথা ভুলে না যাওয়া। অন্তত একবারের জন্যে হলেও তাদের শরণার্থীদের ত্যাগের কথা কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করা উচিত।

মনে পড়ছে সেই দুঃসহ দুর্যোগের দিনগুলো। আমরা দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছিলাম ১৯৮৭ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে। তারিখটা মনে নেই। তবে বারটা মনে আছে। সেদিন ছিলো মঙ্গলবার। কেন দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছিলাম, তার পুরোকাহিনী বলা এখন কঠিন হবে। কারণ, ছোট ছিলাম বলে দুঃখের বড় বড় বোঝাগুলো বহন করতে হয়েছিলো মা-বাবা ও দাদু-দাদীদের। ছোট থাকলেও একেবারে অবুঝ ছিলাম তা নয়। দুঃখগুলো বুঝার মত বোধশক্তি ছিলো।

১৯৮৬ সালে দীঘিনালা ও পানছড়ি এলাকা হতে অনেককে শরণার্থী হতে হয়েছিলো।কেউ সেটেলার বাঙালের হাতে কাটা খেয়ে, সেনাবাহিনীর গুলি খেয়ে, ঘরবাড়ী পোড়া খেয়ে জীবন বাঁচানোর তাগিদে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলো। ওরা ইতোমধ্যে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে বিভিন্ন শিবিরে অবস্থান করছিলো।

আমরা ৮৭ সাল ব্যাচের শরণার্থী। আমাদের গ্রামের আশেপাশে সেটেলার ছিলো না, তবে ছিলো সেনাবাহিনী, বিডিআর ও আনসার বাহিনী।তখন একসাথে তিনবাহিনীর সৈন্য থাকতো। সেনাবাহিনীরা তখন গুচ্ছগ্রাম প্রকল্প হাতে নিয়েছিলো। গুচ্ছগ্রাম মানে হলো, শান্তিবাহিনীর কাছ থেকে জনগণকে বিচ্ছিন্ন করার কৌশল হিসেবে ক্যাচমেন্ট এলাকার সব গ্রাম/পাড়াগুলোকে সরিয়ে সেনা ক্যাম্পের আশেপাশে এক জায়গায় জড়ো করা। মনে আছে, সেনাবাহিনীরা আল্টিমেটাম দিয়েছিলো, দুই সপ্তাহের মধ্যে আশেপাশের সবগুলোকে গুচ্ছগ্রামে আসতে হবে। প্রতি পরিবার থেকে কমপক্ষে একজন করে গিয়ে জঙ্গল সাফ করতে যেতে হয়েছিলো।সেনাবাহিনীর টহল নিয়মিত ছিলো।

এদিকে, শান্তিবাহিনীর কড়া নির্দেশ গুচ্ছগ্রামে যাওয়া যাবে না।যদি কেউ গুচ্ছগ্রামে যায়, তাহলে তাদের পরিণতি করুণ হবে। ফলে গ্রামবাসীরা দোটানায় – কী করবে? কী সিদ্ধান্ত নেবে। অন্যদিকে সেনাবাহিনীর অপারেশন চলছিলো তীব্রভাবে। যুবকদের গ্রামে থাকা কঠিন। কখন কাকে ধরে নিয়ে যায়। সেনাবাহিনীর কাছ থেকে কিছু দিনের জন্যে পালিয়ে থাকা যাবে। কিন্তু শান্তিবাহিনীর কাছ থেকে কোথায় পালিয়ে থাকবে লোকজন? সেনাবাহিনী বলে, “গুচ্ছ গ্রামে আসতে হবে দুই সপ্তাহের মধ্যে। তা না হলে পিঠের চামড়া থাকবে না”। অন্যদিকে, শান্তিবাহিনীরা বলে, “গুচ্ছগ্রামে গেলে খবর আছে। গুচ্ছগ্রামে গেলে গ্রামবাসীদের নিজেদের জীবনের দায় নিয়ে যেতে হবে”। উভয় সংকট। সাধারণ গ্রামবাসী কোথায় যাবে? চারদিকে থমথমে পরিস্থিতি। মাঝেমাঝে গোলাগুলির শব্দ যায়। বাজার অনেকটা বন্ধ। সেনাবাহিনীরা দ্রব্যসামগ্রী কেনাকাটায় বিধিনিষেধ আরোপ করেছিলো। আধা কেজির অধিক শুটকি কেনা যাবে না, আধপোয়ার অধিক তেল কেনা যাবে না। বেশি কেনার প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট ক্যাম্প কমান্ডারের অনুমতি নিতে হবে। প্রেসক্রিপশন ছাড়া ঔষুধ কেনা যাবে না।গ্রামে কোথায় ডাক্তার! বৈদ্য বা হাতুড়ে ডাক্তাররা ছিলেন একমাত্র সম্বল। অন্যদিকে, শান্তিবাহিনীর নির্দেশ ছিলো ধানচাল বাজারে বিক্রি করা যাবে না, বাজার বয়কট হবে, জুম্মরা জিনিসপত্র না কিনলে বাঙাল ব্যবসায়ীরা কী খেয়ে থাকবে। সেনাবাহিনী ও শান্তিবাহিনীর মধ্যে জেদাজেদি। এই জেদাজেদিতে মানুষের জীবন যায় যায়। জীবনের নাভিশ্বাস।এই টানাটানি হতে বাঁচার জন্যে শেষ পর্যন্ত গ্রামের লোকজন সিদ্ধান্ত নিলো শরণার্থীতে যাওয়ার।

তারপর দেশছাড়ার পালা। পূর্বেই উল্লেখ করেছি, সেদিন ছিলো মঙ্গলবার। ফেব্রুয়ারী মাস।শীত ছিলো। একখানা লাল চাদর গায়ে দিয়ে বের হয়েছিলাম। শীতের সন্ধ্যায় অজানা গন্তব্যে রওনা দিয়েছিলাম।

প্রথম রাত কাটিয়েছিলাম ডম্বুর লেকের ধারে। রইস্যাবাড়ী থেকে বেশি দূরে নয়।জমাতিয়া পাড়া কাছে ছিলো।বিএসএসফ-এর ভয়ে দিনে ২/৩ বার জায়গা বদল করতে হয়েছিলো।

পরদিন রাতে নৌকা ভাড়া করে আরো এক অজানা গন্তব্যে রওনা হলাম। মনে করতে পারছি না, কে আমাদের গাইড হয়েছিলো। শুধু শুনেছিলাম, “জারবোগুনে এচ্চোন” (জঙ্গলের লোকগুলো এসেছিলো। মানে শান্তিবাহিনীরা এসেছিলো)। আমরা জায়গা চিনি না। সেজন্যে হয়তো “জারবো”রা এসেছিলো। জ্যোস্না রাত ছিলো। নৌকায় করে যাচ্ছিলাম। কোনদিন সেরকম লেকের পানি দেখিনি। একদিকে শরণার্থী হওয়ার বেদনা, অন্যদিকে জ্যোস্না রাতের শুভ্র সুন্দর রজনী। সে অন্যরকম অনুভূতি। অনেক লোক থাকলেও সবাই চুপচাপ। কোন শব্দ নেই। কাশি পেলেও বেগ চাপিয়ে রাখতে হতো। কড়া সাবধান বাণী, “সাড়া শব্দ বেশি করা যাবে না”। চলন্ত নৌকায় বৈঠার শব্দ ছলছে।চপ চপ্ । একটু একটু বাতাস। চাঁদের আলোর ঝলক ঢেউয়ের তালে তালে খেলছিলো। সে এক অন্য যাত্রা।

কত সময় লেগেছিলো বলতে পারবো না।অনেক সময় লেগেছিলো। অবশেষে আমরা একটা জায়গায় গিয়ে পৌঁছলাম। নৌকা ঘাটে ভিড়লো। জায়গাটার নাম এখন ঝাপসা ঝাপসা করে মনে আসছে আর যাচ্ছে। নামটা সম্ভবত রামভদ্র ছিলো। ঐ ঘাটের পাশে একলোক ছিলো। তার নামটাও সম্ভবত বাগান ফা। ঐ বাগান ফা’র ঘাটে গিয়ে নামলাম।

তারপর উঁচু পাহাড় বেয়ে উপরে উঠা। এত উঁচু পাহাড় উঠতে উঠতে জান কাহিল। যখন পাহাড় উঠছিলাম তখন চাঁদ মামা পশ্চিম আকাশে ডুবু। ফলে চারদিকে অন্ধকার নেমে এলো।অনেক শিশু বৃদ্ধা ও মহিলা ছিলো। আমাদের গ্রামে একজনের তো আশি বছরের বৃদ্ধ বাবা ছিলেন। বৃদ্ধবাবাকে কাপড়ে করে পিঠে করে বহন করে নিয়ে যেতে হয়েছিলো। এত ঘোর অন্ধকারে কীভাবে লোকজন ঐ পাহাড় বেয়ে উপরে উঠেছিলো এখন ভাবলে গা শিউরে উঠে।

পাহাড় উঠার পর কিছুদূর গিয়ে বিশ্রাম নিলাম। গাছতলায় বিশ্রাম নিলাম।সঙ্গে করে যা চাল ছিলো সেগুলো রান্না করে নিলো মহিলারা। ভাগাভাগি করে খেয়ে নিলাম লবন দিয়ে।কিছুটা পেটের ক্ষুধা নিভিয়ে তারপর আবার পথ চলা। দুপুর বেলা।হাঁটতে লাগলাম। কিছুদূর গিয়ে দুই তিন জন ‘জারবো’র সাথে দেখা হলো। উনারা এসেছেন আমাদেরকে গাইড করতে।

উঁচু নিচু পাহাড়ী পথ। জঙ্গল ছিঁড়ে পথ চলা। অবশেষ বিকেল বেলায় একটা ত্রিপুরা গ্রামের অদূরে গিয়ে থামলাম। সেখানে বিকেল বেলার খাবার রান্না হলো। পাক চলাকালীন সময়ে আমাদের দলনেতারা “জারবো’দের সাথে পরামর্শ করে নিলেন – কীভাবে ঠাকুমবাড়ী শরণার্থী শিবিরে পৌঁছানো যাবে।

পরে সিদ্ধান্ত এলো দ্রুত স্থান ত্যাগ করতে হবে। বিএসএফ আসতে পারে। আরো সিদ্ধান্ত এলো সূর্য ডোবার আগে গোমতী নদী পার হতে হবে। যা নির্দেশনা, তা অনুসরণ করা ছাড়া কোন উপায় নেই। যা ভাত রান্না হয়েছে, সবাই মিলে তাড়াতাড়ি খেয়ে নিলাম। তারপর আবার পথ চলা।

চলতে চলতে এক সময় গোমতী নদীর পায়ে গিয়ে পৌঁছলাম। স্রোতস্বিনী নদী। এরকম বড় খরস্রোতা নদী এই পথ দেখা। কীভাবে নদী পার হবো তা নিয়ে অনেকে ভয়ের মধ্যে ছিলাম।

দু’টো নৌকা প্রস্তুত করে রাখা আছে। মাঝিরা এসে এক এক করে আমাদের নদী পার করে দিলো। জানিনা, নৌকা ভাড়া কত দিতে হয়েছিলো। নদী পার হওয়া শেষ হলে আবার পথ চলা শুরু হলো।

এক সময় সূর্য ডুবে গেলো। আস্তে আস্তে করে অন্ধকার নেমে এলো। আমরা হাঁটছিলাম। সোজাপথে নয়। সবসময় ঘোরানো পথে যেতে হয়েছিলো, যাতে স্থানীয় লোকজন দেখতে না পায়, পুলিশ কিংবা বিএসএফরা টের না পায়।

হাঁটছি আর হাঁটছি। এক সময় গিয়ে পড়লাম একটা ছোট নদীতে। নদীটার নাম [বোধয়] দুলুছড়ি। নদী বেয়ে হাঁটা। আহা! রাতের অন্ধকারে নদী পথে হাঁটা, সে অন্য এক অভিজ্ঞতা। কতক্ষণ হেঁটেছিলাম জানা নেই।হাঁটতে হাঁটতে মনে হয়, এই পথের বুঝি আর শেষ নেই!

একসময় নদী পথ শেষ হলো। সামনে বড় রাস্তা। রাস্তা পার হওয়ার আগে অগ্রবর্তী কয়েকজন ছিলেন। তারা জায়গাটা রেকি করে এলেন। বললেন, “আপাতত নিরাপদ, বিএসএফ-এর টহল নেই। তবে দৌঁড়ে তাড়াতাড়ি রাস্তা পার হতে হবে”।যেভাবে নির্দেশনা, সেভাবে চলা। গ্রুপ গ্রুপ করে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। বড় রাস্তায় উঠার সাথে সাথে ভোঁ দৌঁড়। ৪০০ – ৫০০ গজের মতো রাস্তা ছিলো। সেটা দৌঁড়ে পার হওয়া। রাস্তা পার হওয়ার পর আবার জঙ্গলের পথ।বড় রাস্তা পার হয়ে আবার হাঁটা। কিছুদূর গিয়ে সবাই জড়ো হলাম। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলাম। আমাদের “জারবো” গাইডরা বললেন, “ঠাকুমবাড়ী শিবির আর বেশিদূর নেই। কিছুক্ষণ হাঁটলে শিবিরের শব্দ শোনা যাবে”। তারা আমাদের দলনেতাদের কী কী করতে সে ব্যাপারে ব্রিফিং দিলেন। সম্ভবত সেখান থেকে “জারবো” গাইডরা বিদায় নিয়েছিলেন।

তারপর আমরা চললাম। চলতে চলতে এক সময় দূর থেকে মানুষের শব্দ শুনতে পেলাম। পাহাড় থেকে নেমে কিছু জমি। জমি পার হয়ে একটু উচুঁ টিলা। টিলা বেয়ে যখন উঠলাম, তখন আমরা একটা ত্রিপুরা গ্রামে পৌঁছলাম। ঐ গ্রামের পাশ ঘেঁষে শরণার্থী শিবির। ইতোমধ্যে খবর হয়ে গেছে, “আরো লোক শরণার্থীতে আসছে”।এই খবর পেয়ে কিছু যুবক এগিয়ে এসেছিলেন পানি জগ হাতে নিয়ে। ত্রিপুরা গ্রামে পানি খেয়ে নিলাম। তারপর ঐ যুবকরা আমাদের নিয়ে গেলো।

৪/৫ মিনিট হাঁটার পর প্রবেশ করলাম শরণার্থী শিবিরে। ঢুকামাত্র নাকমুখ বন্ধকরা মলমূত্র গন্ধ পেলাম। সে কী গন্ধ, জীবনে সেরকম মলমূত্রের গন্ধ পাইনি। বোধয় এই মলমূত্রের গন্ধ দিয়ে আমাদের শরণার্থী জীবনে বরণ করে নেওয়া হলো।

যখন শিবিরের ভেতর পৌঁছলাম, তখন রব পড়ে গেলো, “এত্তোন, আরো এত্তোন” (আসছে, আরো আসছে)। দেখলাম, আমাদের দেখার জন্যে রাস্তার দুইপাশে মুহুর্তের মধ্যে শত শত লোক দাঁড়িয়ে গেলো।

আমি দাদুর হাত ধরে লাল চাদর গায়ে জড়িয়ে হাঁটছি।অবশেষে পৌঁছলাম সেই শেষ গন্তব্য ঠাকুমবাড়ী শরণার্থী শিবিরের “গোলঘর” যেখানে গিয়ে নবাগতরা প্রথম আশ্রয় নেয়। বটগাছের নীচে সেই গোলঘর। সেখানে গিয়ে সবাই বসে পড়লাম। গোলঘরের সামনে শরণার্থী শিবিরের অফিস।আমরা বসে পড়লাম, কেউ কেউ মাটিতে শুয়ে পড়লো, কেউ কেউ কাপড় বিছিয়ে নিলো। কিছু যুবক স্বেচ্ছাসেবক ছিলেন। তারা পানি নিয়ে এলেন। পানি খাওয়াতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পর চিড়া আ গুড় নিয়ে এসে সবাইকে বিতরণ করতে লাগলেন।

অনেকে এলেন, খোঁজ খবর নিচ্ছিলেন কোথা হতে আমরা গিয়েছিলাম। নাম-গ্রামের কথা শুনে অনেকে আত্মীয়স্বজনের সন্ধানে এলেন।যারা পুরনো গেছে, তারা অনেকে অনেক পরামর্শ দিচ্ছিলেন। শরণার্থী নেতারাও পরামর্শ দিচ্ছিলেন – সরকারের লোকজন আসলে কী করতে হবে, আর কী বলতে হবে। অভয়বাণী দিচ্ছিলেন।

কিছুক্ষণ পর পুলিশ এলো। অবশ্য পুলিশরা আমাদের কিছু করেনি। শুধু মুরুব্বিদের খোঁজ করলো। মুরুব্বিদের অফিসে ডেকে নিয়ে বিভিন্ন জেরা করলেন, স্টেটমেন্ট নিলেন। পরবর্তী নির্দেশ না আসা পর্যন্ত গোলঘরে থাকার নির্দেশ দিয়ে গেলেন।

আমরা গোলঘরের আশেপাশে যেখানে সেখানে শুয়ে পড়লাম। আধো জাগা, আধো ঘুম – এভাবে কেটে গেলো শরণার্থী জীবনের প্রথম রাত।

ভোর হলো। তারপর আরো নতুন দিনের অপেক্ষায় বসে রইলাম ঠাকুমবাড়ী শরণার্থী শিবিরের গোলঘরের বটতলায়।

….চলবে………….

———————————

অডঙ চাকমা, ১৭ অক্টোবর ২০১১

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/1075

Page 22 of 27« First...10...2021222324...Last »