«

»

এই লেখাটি 412 বার পড়া হয়েছে

Print this প্রকাশনা

লোগাং হত্যাকান্ডের বর্ণনা দিতে গিয়ে-

রবীঠাকুরের সোনার তরী কবিতাটি আমাকে প্রায়ই আনমনা করে -শৈশবের স্মৃতি্গুলোকে জাগিয়ে তুলে দিয়ে যায় -কি জটিল লেখার তুলি; এক কথায় অতুলনীয়-।

 

গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা।

কূলে একা বসে আছি, নাহি ভরসা।

রাশি রাশি ভারা ভারা

ধান কাটা হল সারা,

ভরা নদী ক্ষুরধারা

খরপরশা।

কাটিতে কাটিতে ধান এল বরষা।

 

চেঙ্গী নদীর পাশে আমাদের ছোট্র গ্রামটি কুল ঘেষে… প্রকৃতির …সাথে নীরবে কথা বলে। আমি এর এক জীবন্ত সাক্ষী -হয়ত সেই প্রবাহমান ক্ষরস্রোতা জানে না। যে মায়ের স্নেহ – মমতায় আমাকে বড় করেছে -তাঁহার শীতল জলে আমাকে স্নানের তৃপ্তি যুগিয়েছে; মনে পড়ে যায় সেই মাতৃময়ী “চেঙ্গী” নদীকে। আমি বারবার মোহিত হয়েছি; আবেগে আপ্লুত হয়েছি। বরষার সময় যখন নদীর পানি উপসে গিয়ে খালবিলে পরিপূর্ণ হয়ে যেতো -আমার বয়সী শিশু-কিশোররা কলা গাছের বেলা বানিয়ে ভাসাতাম। আর আনন্দের বন্যা চলতো। কখনোবা ঘুরিঘুরি বৃষ্টির ফোঁটা আমাদের আনন্দকে দ্বিগুণ উৎসাহে বিহ্বলিত করে তুলতো। পড়ন্ত বিকেলের শেষে যখন সন্ধ্যা নামে আমি তাড়াতাড়ি ভাত খেয়ে নদীর পাশে যে এক দ্বীপ রয়েছে সেখানে অনেক্ষণ ধরে বসে থাকথাম আর উদাসমনে রং বেরংয়ের স্বপ্নের জাল বুনথাম। আমি খুব ছোট্রকাল হতে খুবই আবেগপ্রবণ এবং স্বপ্নবিলাসী ছিলাম। আমার দূর্বলতা হচ্ছে পানিতে। পানিকে যেমন ভয় লাগে তেমন আবার ভালোও লাগে। আমাকে যদি সারাদিন কোনো পানিপূর্ণ খাল-বিল-নদী-সাগরের পাশে কিংবা খোলামাঠে শাস্তি দেয়া হয়, আমি কখনো ক্রোধে অভিশক্ত হবো না -বিনিময়ে আমার ভালোবাসার বৃদ্ধি ঘটবে। এমনটা স্বভাব হয়েছে আমার বেড়ে উঠা প্রকৃতির কারণে। সকালে ঘুম থেকে উঠার পরপরই চোখ মিলে একপলকের জন্য প্রবাহমান চেঙ্গী নদীকে দেখথাম -তারপর কিছু খেয়ে পড়তে বসথাম একাকী। পড়ার শেষে স্নানের জন্য অগ্রসর হতে হৈ-হৈল্লোলে পরিপূর্ণ হয়ে যেতো পুরোগ্রামটি। একে অপরকে ডাকাডাকি করতাম। নদীর বালির চরে চলতো নানারকম খেলার আসর। কেউ-কখনো হারতে রাজী থাকতাম না -জয়ী হওয়া চাই-চাই। দুপুর গড়ায় তবুও আমাদের বালুর যুদ্ধ শেষ হয় না। প্রথমে মা’র ডাকের শব্দ শুনি “বাবু” কখন আসবে -আমাদের খাওয়া শেষ -কতক্ষণ পর আসলে আর খেতে পাবিনে। তারপর দিদিরা ডাকা শুরু করে দেন “চিজি” এসো খাবে। আর দাদীমা “পরান্নে” তোর দিদিরা সব খেয়ে যাচ্ছে -এসো এসো। আমার ডাকনামের যেনো শেষ নেই। এত ভালোবাসার টান, আবেগের স্মৃতিময় সন্ধিক্ষণ যার সাথে -সেই চেঙ্গী নদীর সাথে পরিচয় ঘটে ৬ বছর বয়সের পর, যখনই শরনার্থী থেকে প্রত্যাবর্তন করি।

 

১৯৮৬ সালে আমাদের পরিবারের লোকেরা যখন ভারতের শরনার্থী শিবিরে চলে যান তখন আমার বয়স ১ বছরের কিছু বেশি। অভিজ্ঞতা হয়নি কিভাবে বন-জঙ্গল ডিঙিয়ে ভারতে শরনার্থী হতে হয়েছে, কারণ অবুঝ শিশু ছিলাম। কিন্তু শরনার্থী জীবন কাহাকে বলে তা শিরায় শিরায় উপলব্দি করেছিলাম। মা বলতেন করুণ এক কাহিনী আমি নাকি সেসময় যখন শরনার্থীতে যাচ্ছিলাম কারোর কো্লে যেতাম না -শুধু নাকি মাকে খুঁজতাম, না দেখলে কাউমাউ করে কাদঁতাম। আমি যখন কলেজে পড়ি মা জিজ্গেস করেন এখন লজ্জা করেনা এসব শুনতে (?) আমি বলি লজ্জা পাবো কেনো -তখনতো একেবারে অবুঝ শিশু ছিলাম। মা হাসেন আর বলেন তোমাকে “বাবু” ডাকি কি জন্যি জানিস -আমি বলি নাতো। মা বলতে থাকেন তোমাকে একদিন বহুত বড় হতে হবে -উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হতে হবে -ডাক্তার -ইন্জিনিয়ার, উনারা বুঝেন এসব হওয়া মানে “বাবু” (ইংরেজিতে যাকে জেন্টলম্যান বলে) হয়ে যাওয়া -আর মানুষের প্রশংসা কুড়াঁনো। আর উনারা মৃত্যুর আগে বৃদ্ধবয়সে যেন সুখে জীবন অতিবাহিত করতে পারেন। আমার শুনতে ভালো লাগলে ও, এক ধরণের দ্বায়িত্বের গুরুভার বলে মনে হয়। তবুও মার কথা না বলি কিভাবে -বলি হ্যাঁ দেখো মা -আমি একদিন সত্যিই অনেক বড় হবো, দেশে-বিদেশে ঘুরবো, লোকজনের প্রশংসা কুড়াঁবো -মা শুনে খুশি হন, আনন্দ পান। এরপর পরই মা কী জানি চিন্তা করতে গিয়ে শিহরে উঠেন, চোখগুলো অশ্রুর জলে জলজল হতে দেখি। বলেন তোমার কী মনে পড়ে লোগাং গণহত্যার কথা -সাবরুংয়ের কথা। আমি উত্তর দিই অবশ্যই মনে পড়ে। মা বলেন -বলোতো দেখি কী কী মনে করতে পারো। আমি সরলমনে একের পর এক বলতে থাকি। ১৯৯১-এর জুনের দিকে যখন বাংলাদেশে আসতে চাইছিলাম, আমাদেরকে ফেরানো হয়েছে -বলতে শুনেছি স্বায়ত্বশাসন অর্জিত না হলে আমরা কেউ বাংলাদেশে যাবো না -সেহেতু তোমাদের ও যাওয়া নিষেধ। আপনারা (মা-বাবা) আমাদের পড়াশুনা নিয়ে সদা চিন্তায় নিমগ্ন থাকতেন -কারণ বড় দাদা সেসময় ম্যাট্রিক পাশ করে একাকী বাংলাদেশে বসবাস করতেছিলেন, তাই আপনারা যেখোনোভাবে হলেও দেশে আসতে চেয়েছেন। অবশেষে ১৯৯১ এর নবেম্ভারে ত্রিপুরার সাবরুংয়ের (যেটি খাগড়াছড়ির রামগড়ের কাছাকাছি) হয়ে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করি। খাগড়াছড়ি ব্রিগেডে গিয়ে আমাদের পরিচয়াদি নথিভুক্ত করেছিলাম। আমি ভয় পেয়েছিলাম পিপঁড়ার মতো ঝাকঁঝাকঁ আর্মিদের অস্ত্রের মহড়া দেখে।

 

তারপর, মা শুরু করেন পুনরায় – বলেন আমাদের সাথে যে বৃদ্ধ দম্পতিটি এসেছে তোমার মনে পড়ে, যাদের তুমি নানা-নানি ডাকতে –আমি বলি খুব মনে পড়ে আর উনাদের আমার বয়সী নাত্নিকে। মা মৃদুস্বরে বলেন জানো উনারা আর বেঁচে নেই –লোগাং হত্যাকান্ডের সময় উনারা ও শহীদ হয়েছিলেন আর উনাদের নাত্নিটি কোনোরকম ভারতে পুনরায় পালিয়ে বাঁচে। নাত্নিটি নাকি বর্ণনা দিয়েছিল কতো নৃশংসভাবে ওর আজু-নানিদের হত্যা করা হয়েছিল, বৃদ্ধ হওয়াতে দৌঁড়াতে পারেননি উনারা –তারপর লম্বা দা দিয়ে নাকি একের পর এক জখম করা হয় দুজনের সারা শরীরে –নানিমা নাকি বেশ কয়েকবার চেঁচিয়েছিলেন বাঁচাও বাঁচাও বলে –তখন নাত্নিটি লুকিয়ে ছিল পাশের কলাবাগানে। আর ওর আজুকে (বাংলায়-দাদু) নাকি প্রথমে গোপন লিঙ্গে ধরে কেটে দেওয়া হয় –তারপর কান কেটে দেওয়া হয়। সেসব দেখতে-দেখতে নাত্নি অজ্ঞান হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে, ঘন্টা খানেকপর জ্ঞান ফিরে দেখে বাড়িটি আগুনে দাউদাউ করে জ্বলে যাচ্ছে –কিন্তু আজু-নানুকে আর দেখা মিলে না। যখন স্বন্ধ্যা নামে আর সবকিছু নীরব হয়ে যায় তখনই ছোট্র নাত্নিটি ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের পথ ধরে পালিয়ে যায়।

About the author

জুম্মো ব্লগার

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/60

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>