«

»

এই লেখাটি 100 বার পড়া হয়েছে

Print this প্রকাশনা

বিশ্বাসের ভাইরাস-৪

লেখকঃ  জুম্মো এডিসন 

 

– তুঙ বাপ, ও তুঙ বাপ ঘরে আসেন নি ?

– হ্যা, আছিইইইই | একটু দাবা টানটেছিলাম | মা তুঙ দুইটা পিড়ি এনে দে তো | কিন্তু আপনাদেরকে তো, ঠিক চিনতে পারলাম না | কোন দরকারে এসেছেন নাকি ?

– তাহলে আগে পরিচয়টা দিই | আমরা শনখোলা গ্রাম থেকে আপনার কথা শুনে এসেছি | লোকে আমাকে সুমন্যে মা বলে ডাকে | এইটা আমার বড় ছেলে সুমন, কলেজে বিএ পড়ছে | গত এক সপ্তাহ যাবৎ রাঙা পীড়ায় (জন্ডিস) ভুগছে | আমার এক আত্মীয়, আপনার সন্ধান দিলেন | গত বছর, আমার সেই আত্মীয়ের রাঙা পীড়া হয়েছিল | শুনেছি, আপনার থেকে কয়েকবার মালিশ নিয়ে সে ভাল হয়েছে | তাই আপনার কাছে ছেলেটাকে নিয়ে আসলাম | যদি একটু উপকার করেন |

– হ্যা, হ্যা অবশ্যই | খুব ভাল কাজ করেছেন নিয়ে এসে | কিন্তু, আমি তো এমনি এমনি মালিশ করিনা | মালিশ করার আগে আমাকে পুজায় বসতে হয় | পুজার জন্য তিন রঙের তিন জোড়া ফুল আর তিন জোড়া মোমবাতি লাগে | সেগুলি এনেছেন ?

– হ্যা, হ্যা এনেছি | আগে থেকে সব যোগার করে নিয়ে এসেছি | তাহলে তো আর বলার কিছু নেই | খুব ভাল কাজ করেছেন | নাহলে এখন আবার খুজতে বের হতে হত | ঠিক আছে, তাহলে আপনারা একটু বসুন | আমি হাত-মুখ ধুয়ে পুজার সরঞ্জাম নিয়ে আসি |

এই বলে বাড়ির ভেতরে চলে গেলেন তুঙ বাপ ঔরফে নবীনচন্দ্র চাকমা | বড় মেয়ে তুঙ, তিন ছেলে রমেশ, রনেল, রাজেশ আর বউ হালাবিকে নিয়ে সংসার | নবীনচন্দ্র পেশায় বর্গাচাষী কৃষক আর ফাঁকে ফাঁকে তুকতাক ওঝাগিরি করা | তুঙ বাপ অনেক বিষয়ে ওঝাগিরি করলেও দুইটি জিনিসের কারনে নামডাকটা একটু বেশি | এক. শরীর মালিশ করে দিয়ে জন্ডিস ছাড়ানো দুই. পাগলা কুকুরে কামড়ালে পিতলের প্লেটের মাধ্যমে রোগীর শরীর বিষমুক্ত করে দেওয়া |

কিছুক্ষন পরে তুঙ বাপ ফিরলেন এক হাতে এক পাত্র পরিষ্কার পানি আরেক হাতে কয়েকটি কলাপাতা নিয়ে | তারপর সুমনের মায়ের কাছ থেকে মোমবাতি আর ফুলগুলি নিয়ে কলাপাতার উপর পুজার নৈবদ্য সাজালেন | তারপর মন্ত্র পড়া শুরু করলেন, “ওঁঙ তিলক তিলক, ঘিলক ঘিলক, রাঙা পিড়ে পিলক পিলক | ভুদো হরম, দেবেদা হরম বেক্কানি ওক ছিলক ছিলক | ওঁঙ চা ফো… (তিন বার)” | মন্ত্র পড়া শেষ হলে, উঠোনে দুইটি কলাপাতা বিছিয়ে তারউপর উপুড় হয়ে সুমনকে শুতে বললেন | তারপর “ওঁঙ তিলক তিলক, ঘিলক ঘিলক………” মন্ত্রের সাথে সাথে চলল সুমনের পিঠের উপর ডান হাত দিয়ে মালিশ করার কাজ | কিছুক্ষন মালিশ করে পানির পাত্রে ডুবালেন হাত | কি আশ্চার্য ! স্বচ্ছ পানির রঙ হয়ে গেল হলুদ !

– দেখলেন তো, মালিশ করে শরীর থেকে জন্ডিস বের করে দিলাম ?

– এজন্যই তো আপনার কাছে আসা | তুঙ বাপ, আবার কি আসতে হবে ? নাকি এক মালিশে হয়ে যাবে ?

– না, না এক মালিশে হয় নাকি ! যতদিন পর্যন্ত ভাল নাহয়, ততদিন পর্যন্ত প্রতি সপ্তাহে একবার করে মালিশ করে যেতে হবে | হলুদ খাওয়া যাবেনা মোটেই | মশলা, হলুদ আর তেল জাতীয় কোন খাবার খাওয়া যাবেনা | এসব বাদে সব খাবারই খাওয়া যাবে কিন্তু বেশি ঘুরাফেরা করা যাবেনা | যতদিন পর্যন্ত অসুখ ভাল হবেনা ততদিন পর্যন্ত কোন ভারী কাজ করা যাবেনা | বাড়িতে বসে বিশ্রাম নিতে হবে | জানেন তো, এই রোগে অনেক মানুষ মারাও যায় | সুতরাং, রোগটাকে ছোট ভাববেন না | যেহেতু আমার কাছে এসেই পড়েছেন, সুতরাং কোন চিন্তা করবেন না | আমাকে দেখে রাঙা পীড়ার বাপ পর্যন্ত পালিয়ে যায় | প্রায় মরতে বসেছিল, এমন কত রোগীকে যে ভাল করে তুললাম।

বলেই তুঙ বাপের চোখেমুখে খেলা করে আত্মতৃপ্তির হাসি |

– শুধুমাত্র আমার কথা অনুযায়ী চলবেন আর ঠিকমত মালিশ নিলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই জন্ডিসের বাপও পালিয়ে যাবে |

– ঠিক আছে, ঠিক আছে | কিন্তু আপনাকে এখন কত দিতে হবে ?

– আমি রোগ সারিয়ে মানুষের সেবা করি | সামান্য ওঝাগিরি করে কারোর উপকার করতে পারাতাই আমার সবচেয়ে বড় পাওনা | কেউ দেয় ১০০ টাকা, কেউ দেয় হাজার টাকা | আমি কারোর প্রতি জোর করিনা | তাছাড়া সবার একই রকম সামর্থ্যও থাকেনা | সুতরাং, আপনাদের সামর্থ্য অনুযায়ী এখন যা দেবেন তাই হবে আমার প্রণামী | শুধুমাত্র, রোগীর রোগ ভাল হয়ে গেলে শেষ মালিশের দিনে আমার দেবতার উদ্দেশ্যে পাঁচ হাজার টাকা প্রণামী দিলেই হবে |

– ঠিক আছে তুঙ বাপ, তাহলে এখন আমরা উঠি | আর এগুলি রাখেন আপাতত |

বলেই তুঙ বাপের হাতে ১০০ টাকার একটা নোট গুজে দিলেন সুমনের মা |

-তাহলে এখন আমরা উঠি | দুপুর তো হয়েই গেল |

– তা শাকপাতা দিয়ে দুটো ভাত খেয়ে গেলে হয়না ? যা আছে তা দিয়ে নাহয় খেয়ে যাবেন আরকি |

– না, না দেরি হয়ে যাবে | আপনারা থাকেন আমরা বরং উঠি | চল, সুমন | ও আচ্ছা, তুঙ বাপ, আবার কবে আসতে হবে ? জিজ্ঞেস করতে ভুলেই যাচ্ছিলাম |

– আগামী সপ্তাহের মঙ্গলবার-বুধবার করে আসলেই হবে | যতবার মালিশ চলবে ততবারই কিন্তু ফুল আর মোমবাতি আনতে হবে | এই কথাটি সবসময় মনে রাখতে হবে কিন্তু |

এভাবে চার সপ্তাহ পর্যন্ত মালিশ দেওয়ার পরে জন্ডিসের কবল থেকে পুরোপুরি মুক্ত হয় সুমন | অলৌকিকভাবে মন্ত্রের মাধ্যমে রোগমুক্তি সম্ভব এই বিশ্বাসটা আরও পোক্ত হয় সুমনের মায়ের | লেখাপড়া করলেও সুমন বিশ্বাস করে, পৃথিবীতে অলৌকিক বলে কিছু তো আছেই | নিজেই তো এর জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ ! তুঙ বাপের প্রচার বাড়ে, সেই সাথে বাড়ে পসারও | বাড়ে শিক্ষিত-অশিক্ষিতের মধ্যে অলৌকিক বিশ্বাস !

জন্ডিসের কারন: “বিলিরুবিন” নামক হলুদ রঙের একটি রঞ্জক পদার্থের কারনে জন্ডিস হয় | সাধারনত মানুষের রক্তে বিলিরুবিনের স্বাভাবিক উপস্থিতি প্রতি ১০০ সি.সি -তে ০.১ বা ১ মিলিগ্রাম | বিলিরুবিনের এই উপস্থিতি স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি হলেই আমরা বলি জন্ডিস হয়েছে | জন্ডিস হলে প্রথমে প্রসাব হলুদ হয় এবং ক্রমে চোখের সাদা অংশ এবং শরীরও হলুদ হয় | রক্তে বিলিরুবিনের পরিমাণ বিভিন্ন কারনে বাড়তে পারে কিন্তু বেশিরভাগই হয় ভাইরাসজনিত কারনে | “স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকলে, চর্বি জাতীয় খাদ্য না না খেলে এবং বিশ্রাম নিলে সাধারনত কিছুদিনের মধ্যে জন্ডিস ভাল হয়” | পিত্তনালীতে পাথর, টিউমার, ক্যানসার হলেও রক্তে বিলিরুবিনের পরিমাণ বেড়ে জন্ডিস হতে পারে | লোহিত রক্ত কণিকা বেশি পরিমানে ভাঙতে থাকলেও জন্ডিস হতে পারে | এজন্য ডাক্তারের শরনাপন্ন হয়ে জন্ডিসের কারন জেনে সেই অনুযায়ী চিকিৎসা করাই উত্তম | কারন, জন্ডিসকে অবহেলা করে অনেকে তুকতাক কিংবা বৈদ্য-ওঝার আশায় থাকেন যা মোটেও উচিত নয় | কারন, সঠিকভাবে চিকিৎসা না করলে ভাইরাসজনিত জন্ডিসের কারনেও যকৃত নষ্ট হতে পারে এমনকি মস্তিষ্কে বিলিরুবিনের উপস্থিতির কারনে মস্তিষ্কের স্নায়ুরোগ এমনকি মৃত্যুও হতে পারে |

বি:দ্র:- উপরে উল্ল্যেখিত গল্পে সুমনের জন্ডিসের কবল থেকে মুক্ত হওয়ার পেছনে তুঙ বাপের কোন মন্ত্রের জোর কাজ করেনি | পরিমিত বিশ্রাম আর সঠিক খাদ্যাভাস মেনে চলার কারনেই সুমন মুক্ত হতে পেরেছে জন্ডিসের কবল থেকে | এখানে তুঙ বাপ শুধুমাত্র মানুষের সহজ-সরল বিশ্বাসকে পুঁজি করে ঠকিয়ে মাঝখান থেকে কিছু টাকা হাতিয়ে নিয়েছে | আমাদের চারপাশে এমন অনেক তুঙ বাপ রয়েছেন যারা স্রেপ কিছু না করে শুধুমাত্র মুখের বুলির সাহায্যে ভুত-প্রেত-দেবতার ভয় দেখিয়ে মানুষের সহজ-সরল বিশ্বাস নিয়ে ব্যবসা করে খাচ্ছেন | তাদেরকে চেনার-জানার মাধ্যমে সবার সামনে মুখোশ উন্মোচন করুন |

পদ্ধতি: একটি পাত্রে পরিষ্কার পানি নিন | এরপর পানির মধ্যে চুন দিন | পানি আর চুন ভালকরে মিশিয়ে নিয়ে নাড়াচাড়া না করে ঘন্টাখানিক রেখে দিন | ঘন্টাখানিক রেখে দেওয়ার পরে দেখা যাবে, চুন পাত্রের তলানিতে জমা হয়েছে আর উপরে রয়েছে পরিষ্কার স্বচ্ছ পানি | উপরের স্বচ্ছ পানিকে অন্য একটি পাত্রে তুলে রাখুন | কেউ দেখলে বুঝতেই পারবেনা, এটা চুন মিশ্রিত পানি | এরপর আম গাছের এক টুকরো বাকল তুলে হাতে ভাল করে ঘষে নিয়ে হাতটা শুকিয়ে নিন | শুকানোর পরে হাতে কোনকিছু লাগানো আছে বলে কারোর মনেই হবেনা |

এখন, হাতটা সেই চুন গোলানো স্বচ্ছ পানিতে ধুয়ে ফেলুন | দেখবেন, কোন জাদুমন্ত্রবল ছাড়াই পানিটা হলুদ হয়ে গেল ! আমরা পৃথিবীর অনেক কিছুর ব্যখা দাঁড় করাতে ব্যার্থ হই তাই অলৌকিক বলে চালিয়ে দিই | অনেকে আবার কেন হল, কিভাবে হল, এর মধ্যে কারসাজিটা কি এসব কারন খুজতে যায়না তাই খুব সহজেই অলৌকিকতার রঙ লাগিয়ে দিই | কিন্তু, ভাল করে অনুসন্ধান করলেই দেখা যাবে এর মধ্যে কোন অলৌকিকতা নেই, সবই লৌকিক | ” দর্শকের মনোরঞ্জনকারীরা হয় ম্যাজেশিয়ান, আর ঠকবাজরা হয় জাদুকর”- দুজনের মধ্যে তেমন কোন পার্থক্য না থাকা সত্বেও একটা হয় লৌকিক আর অন্যটা অলৌকিক !

 

 

About the author

ব্লগ লেখক

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/3129

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>