«

»

এই লেখাটি 321 বার পড়া হয়েছে

Print this প্রকাশনা

চতুরঙ্গ

এই ব্লগটি মূলত বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত ফেইসবুক পোষ্ট। পাহাড়ি সমাজের মানুষ এখন কি ভাবছে, কিভাবে ভাবছে, তাদের মানস, তাদের বৃত্তির সাথে জড়িত বুদ্ধিবৃত্তি ও মনোবৃত্তিকে আমি যেভাবে দেখছি- তার স্বরূপ এই ব্লগ। বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে সমাজের মানুষেরা বা সামাজিক চরিত্রগুলোর পারসেপশান, রিঅ্যাকশন আর অ্যাকশন কেমন হয় সেটা প্রতিফলন করতেই আমার ‘চতুরঙ্গ’ লেখা। এটা একটা চলমান লেখা। হয়তো এই সামাজিক চরিত্রগুলো কোন অভিন্ন উপসংহারে মিলতে পারে। হয়তো সমাজের খাপছাড়া মানসিকতার মতন এই লেখার পরিণতিও খাপছাড়া থেকে যেতে পারে। যাই হোক, একদম কথ্য ফ্যাশনে কিছু কথা বলতেই এই ব্লগ লেখা। আর কথা না বাড়িয়ে এবার তাহলে চতুরঙ্গ শুরু করা যাক———————-

চতুরঙ্গ -১
প্রকাশকালঃ ১৩ই ডিসেম্বর, ২০১৫।
————————————————————————-


(রিংকি আর রিংকু)

যেভাবেই হোক, রিংকি তালুকদারের মাথায় এটা এঁটে গেছে যে ফেইসবুকে লেখালেখি করা ঠিক না। লেখালেখির জন্য কত্ত জায়গা আছে- একাডেমিক এসাইনমেন্ট, জার্নাল, ব্রাহ্মণ পত্রিকা, নমঃশূদ্র ম্যাগাজিন ইত্যাদি… ফেইসবুক একটা লেখার জায়গা হলো নাকি!?
ফেইসবুক হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়া, যাকে বলে সামাজিক কার্যকলাপের জায়গা- এখানে অসামাজিক কোন কিছু, যেমন রাষ্ট্রবিরোধী কথাবার্তা বলা ঠিক না। রিংকি সিডনীতে পড়াশোনা করে। সে সিডনী, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, ফ্রান্স… সব বৈদেশিক জ্ঞাতির সমতূল্যে তূলনীয় একটা দৃষ্টিভঙ্গি আয়ত্ত করে ফেলেছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী ফেইসবুক, ইন্সটাগ্রাম, টুইটার সব জায়গাতে শুধু ভালো ভালো ছবি আপলোড করা উচিৎ। ভালো ছবি মানে ভালো থাকার ছবি-
যেমন Bondi Beach এ স্নান, মেক্সিকান খাবার খাওয়া, লেইট নাইট পার্টি… ইত্যাদি। যারা ফেইসবুকে ফাউ ফাউ চ্যাঁচামেচি করে তারা খুব খারাপ। ফালতু। তারা ফালতু সময় নষ্ট করে। রিংকির সাথে রিংকুর খুব তর্ক হয়। রিংকুর মতে, বাংলাদেশের মতো জায়গা যেখানে মানুষ দিনের বেশিরভাগ সময় ফেইসবুকের হোমপেইজে চোখ বুলিয়ে কাটিয়ে দেয় সেখানে কিছু না বলাটাই মুর্খের কাজ।
রিংকু, মানে রিংকু ত্রিপুরা ছাত্রকালে রাজনীতি করেছে। সে এখন শুধুই পড়ে আর লেখে। তার আরেকটা কাজ হচ্ছে সাফল্যের সাথে পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া। রিংকি আর রিংকুর চিন্তায় যেমন যোজন যোজন ফারাক তেমনি তাদের একাডেমিক রেজাল্টেও যোজন যোজন ফারাক। রিংকু কোনমতে পাস করে আর রিংকি ফাটিয়ে রেজাল্ট করে। রিংকুর সাথে রিংকির চিন্তার মৌলিক পার্থক্য এই ফেইসবুকেই দেখা যায়-
রিংকু মাঝ রাস্তায় গলা ফাটিয়ে বক্তৃতা দেবার ঢঙয়ে অবিরত ইন্টারনেটে লিখে যায় আর রিংকি শুধু সুখী সুখী ছবি আপলোড করে। রিংকুর মতে আমরা কি এমন ভালো আছি যে ভালো ছবি আপলোড করতে হবে? আমরা কি এমন সুখে আছি যে সুখে থাকার ছবি আপলোড করতে হবে? এর নাম কি সুখে থাকা?
জাতিগতভাবে কি আমরা ভালো আছি? হ্যাঁ, মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ, যারা Diaspora তারা ভালো আছে বটে। পাহাড়ে আরও দশটা গণহত্যা হলেও তাদের কিচ্ছু যাবে আসবে না- তারা এমনই Apolitical, apathetic.
ঠিক গত বছরের ডিসেম্বরে রাষ্ট্রীয় ইন্ধনে জাতিগত দাঙ্গা বাঁধার উপক্রম হয়েছে। ঠিক এক বছর আগেই নানিয়ারচর-বগাছড়িতে আদিবাসীর ৬০ টা ঘর পুড়েছে। তার কি কোন বিচার হয়েছে? যাদের ঘর পুড়েছে তারা কি ঘর-বাগান-মাটি ফিরে পেয়েছে? রাষ্ট্রীয় আয়োজনেই প্রতিনিয়ত মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে পাহাড়ে। সেখানে বেঁচে থাকাটাই যেন জীবনের কাছে এক প্রহসন। অবচেতনেই সবাই যেখানে অস্তিত্ব সংকটের শংকায় ভোগে সেখানে কিছু মুষ্টিমেয় মানুষের ভালো থাকার মানে জীবন বিচ্ছিন্নতা।
তাদের কথা ভুলে গিয়ে নিজে সুখে থাকার ছবি আপলোড করার মানে শিক্ষা- সংস্কৃতি-মানবতার অপমান। যদ্দিন না এই জংলী রাষ্ট্রে এইসকল অনাচারের বিচার হচ্ছে তদ্দিন তাদের কথা ভুলে নিজে সুখে থাকার মানে আর কিছু নয়… জীবন থেকে পালিয়ে থাকা। কেননা তারা ভিন্ন কেউ নয়- তাদের কথা অস্বীকার করার মানে নিজেকে অস্বীকার করা… এভাবেই রিংকু চিন্তা করে। এ কথা সত্য যে রিংকুর মত চিন্তা করা লোকের সংখ্যা খুবই অকিঞ্চিৎকর। রিংকিরাই সংখ্যায় বেশি। ফেইসবুকে রিংকিরাই বেশি লাইক পায় আর রিংকুরা চিৎকার করে যায়…
কে ঠিক আর কে বেঠিক, কার কেমন আচরণ হওয়া উচিৎ, সময়ের প্রয়োজনে কার কি ভূমিকা পালন করা উচিৎ তার বিচার ইতিহাস করবে। ইতিহাস একদিন রিংকুদের ভূমিকা আর রিংকিদের ভূমিকা সবার কথাই বলবে।
রিংকুরা বেঁচে থেকে জীবনের স্বাক্ষর রেখে যায় আর রিংকিরা বেঁচে মরে যায়।

(২)
(চৌধুরীরা)

শ্রীযুক্ত বাবু মংক্য চৌধুরী খুব সংস্কৃতিবান মানুষ। যদিও সংস্কৃতিবান শব্দটা নিয়ে নিংসা মারমা, মানে পারহেলিওনের খুব আপত্তি আছে। সংস্কৃতিবান মানে কি অ্যাঁ? রবীন্দ্র সংগীত শুনলে খুব সংস্কৃতিবান হওয়া যায় আর ফুটপাতে যেসব গান বাজে তা শুনলে কি অসংস্কৃতিবান হয়ে যায়? “আমার পরান যাহা চায়” শুনলে কালচারাল আর “কইলজার ভিতর বান্ধি রাইক্যুম তুঁয়ারে” শুনলেই কেউ এগ্রিকালচারাল হয়ে যায়-
এমন সরলীকৃত বিচারে পারহেলিওনের ঘোর আপত্তি আছে। মানুষ যেভাবে বাঁচে তার প্রকাশিত রুপটাই সংস্কৃতি। এটাই সংস্কৃতির একাডেমিক সংজ্ঞা । এখানে কারোর সংস্কৃতিবান হওয়া না হওয়া আসলে ব্যক্তির শ্রেণি অবস্থানের বিষয়। নিংসা এভাবেই সবকিছু বিবেচনা করে। যেদিন বাবুছড়ার ২১টা পরিবার ভিটেহারা হলো সেদিন নিংসা রাস্তায় মিছিল করেছিলো। সেদিন রাতেই সে দেখে যে চোধুরীবাবু ইউটিউবের লিংক শেয়ার করেছেন- “এবার নিরব করে দাও মুখর কবি রে…”
নিংসা তার নীচে কমেন্ট করেছিলো, “নিরব কবির মায়েরে…” এমন অসংস্কৃত আচরণ সংস্কৃতিবান চৌধুরী সাহেব বরদাস্ত করেননি। তিনি নিংসা ওরফে পারহেলিওনকে ব্লক করে দেন।
নিংসা মংক্য চৌধুরীর মত বাবুসমাজের কীর্তি কলাপ দেখলেই নবারুন ভট্টাচার্যের কোটেশান করে- “বানচোতগুলো মানুষ নাকি এমিবা…”
বাবু মংক্যচিং এর মতন অসংখ্য চৌধুরী এখন পাহাড়ি কমিউনিটিতে আছেন। সব চৌধুরী মিলে একটা আস্ত বাবুসমাজ তৈরি হয়েছে এখন…
(চৌধুরীদের নিয়ে আরও পড়তে চাইলে এখানে ক্লিক করুন। )

চতুরঙ্গ-২

প্রকাশকাল- ১৯ জানুয়ারি, ২০১৬

————————————————————————————————————————–

পাহাড়ের প্রথম লিটল ম্যাগাজিন বের হবে। এই খবরটা কোন না কোন ভাবে পাড়ার মন্টুদা জেনেছে। মন্টুদারা পাড়ার দোকানে আড্ডা দেয়। রুটিন করে গার্লস স্কুল ছুটি হবার সময় রাস্তার মোড়ে উদাস মুখে দাঁড়িয়ে থাকে। মহল্লায় রাস্তা কিংবা ভবন হলে ঠিকাদারের কাছে বখরা নেয়। সাহিত্য পত্রিকার সাথে মন্টুদার কোন সম্পর্ক থাকার কথা না তবু তিনি যেহেতু পাড়ার ভালো মন্দ দেখেন, তো সাহিত্য চর্চা ঠিক ঠাক চলছে কি না, সেটাও তাদের দেখার বিষয়। আমাদের ম্যাগাজিন বের হচ্ছে জেনে সেদিন হাতের সিগারেটটা এগিয়ে দিয়ে হাসতে হাসতে বললেন,

“তোরা ম্যাগাজিন বের কচ্চিস, আমাকে বলবি না? আমি একটা কবিতা দিয়ে দিতাম। হে হে হে… মহাজন পাড়ার কবিতাকে চিনিস? হে হে হে… আরে তোদের বৌদি হবে আর কি হ্যা হ্যা হ্যা… আমি তো ওকে নিয়ে দুই পাতা কবিতা লিখে ফেলেছি হাহাহা… তোদের ম্যাগাজিনে কবিতাটা ছাপিয়ে দিবি হাহাহা… চা খাবি? আরে চা খাবি না মানে কি… চা খা, বিড়ি খা আর কবিতা খা হাহাহা…”

এ তো গেলো মন্টুদার কথা, এবার ঝন্টুদা কি বলে শোনেন-
“তোরা ম্যাগাজিন বের করছিস তো লিডারের কাছে গেছিস অ্যাঁয়? লিডারের বাণী নিয়েচিস? কালকে পার্টির জনসভায় আসবি। চুক্তি না হলে কি তোরা এসব সাহিত্য করতে পারতিস অ্যাঁ? পার্টির কথামত সাহিত্য করবি বুঝছিস? চুক্তি ছাড়া সাহিত্য হয় নাকি অ্যাঁয়? জানিস রবীন্দ্রনাথ কি বলেছে? “দেবে আর নেবে মিলাবে মিলিবে, যাবে না ফিরে’” মানে কি – অ্যাঁয়???
মানে হলো যে তুরা লিডারের বানী নিবি, লিডারের অর্ডার নিবি আর চুক্তি মিলিয়ে চলবি। না হলে আমরা ফিরবো না। তোদেরকে পিটিয়ে বাড়ি ফিরিয়ে দেবো। বুঝছিস?
বল, আমাদের নেতা, জিন্দাবাদ- জিন্দাবাদ।।
ফিল্ডে নামতে হবে, বুঝছিস? ফিল্ডে না নেমে খালি এসব বড় বড় কথা বললে কি জাতের উদ্ধার হবে নাকি অ্যাঁ?পরশু আমাদের নেতা জনসভায় আসতেছেন। ঐদিন তোদের সবাইরে যেন জনসভায় দেখি। না হলে এসব সাহিত্য-ফাহিত্য তোদের পুন দিয়ে ঢুকিয়ে দেবো।”

মন2, ঝন2 এর পর এবার সেন্টু কি বলে শুনেন-
“পূর্ণ সাহিত্য শাসন ছাড়া কোন সাহিত্য চর্চা হতে পারে না। এ বিষয়ে হো চি মিন বলে গেছেন যে, “আপোষ চুক্তি লাত্থি মারো, পাপোষ হয়ে মাটিতে শুয়ে পড়ো !” সুতরাং তুমরা তুমাদের ম্যাগাজিনে আমাদের নেতার বিপ্লবী বানী ছাপাইবে। ফিল্ডে নামতে হবে, বুঝছো? ফিল্ডে না নেমে খালি এসব বড় বড় কথা বললে কি জাতের উদ্ধার হবে নাকি অ্যাঁ?পরশুদিনের জনসভায় নেতা আসতেছেন। ঐদিন তুমাদের সবাইরে যেন জনসভায় দেখি। না হলে এসব সাহিত্য-ফাহিত্য তুমাদের পাছা দিয়ে ঢুকিয়ে দেবো।”

এবার কুসংস্কারপন্থী রন্টু কি বলে পড়েন-

“সবকিছুর সংস্কার দরকার। এ প্রসঙ্গে মহান নেতা মাইকেল হ্যামিল্টন বলে গেছেন যে, সংস্কারই সকল কুসংস্কারের মূল! মানে কি? অ্যাঁয়?? মানে হচ্ছে আপনারা সবাই সাহিত্যের সংস্কার করবেন। সাহিত্যের সংস্কার ছাড়া কিচ্ছুর সংস্কার হবে না। ফিল্ডে নামতে হবে, বুঝছেন? ফিল্ডে না নেমে খালি এসব বড় বড় কথা বললে কি জাতের উদ্ধার হবে নাকি অ্যাঁ? সামনের মাসে আমাদের জনসভায় নেতা আসতেছেন, ঐদিন আপনারা সবাই জনসভায় আসবেন। না হলে এসব সাহিত্য-ফাহিত্য সংস্কার করে একদম মহান নেতার গু বানিয়ে দেবো। বুঝছেন কিছু?”

উপরের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সবার আগে দরকার ফিল্ডে নামা। ফিল্ড মানে মাঠ। গড়ের মাঠে নেমে কে কি করে সেটা দেখার দরকার নাই- কে মাঠে হাগু করে, কে মাঠে ক্যালকুলাস করে আর কে দিনের পর দিন একই স্লোগানে একইভাবে মিছিল করে সেটা বড় কথা নয়-
লেখক, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবি, চাকুরিজীবি, বালজীবি, আবালজীবি, পরজীবি… সবাইকে মাঠে নামতে হবে। কাজ না থাকলেও মাঠে নেমে কাজ দেখাতে হবে। সব মাঠে মারা গেলেও মাঠে নেমেই মরতে হবে।
(চলবে… )

About the author

পাইচিংমং মারমা

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/3085

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>