«

»

এই লেখাটি 1,155 বার পড়া হয়েছে

Print this প্রকাশনা

পার্বত্য চট্টগ্রামে পর্যটনের সাতকাহন ! প্রসঙ্গঃ রুইলুই পর্যটন কেন্দ্র, সাজেক

খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা এই পাঁচটি মানুষের মৌলিক চাহিদা । এই মৌলিক চাহিদাগুলি পূরণের পরেই বিনোদন, ভ্রমণসহ অন্যান্য যৌগিক চাহিদাগুলির প্রসঙ্গ চলে আসে । কিন্তু, পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়িদের জন্য মৌলিক চাহিদাগুলি পূরনের চেয়ে যৌগিক চাহিদায় ডুবিয়ে রাখার দিকেই যেন রাষ্টযন্ত্রের বেশি আগ্রহ ! বিগত এরশাদ সরকারের সময়ে, রাষ্ট্রের “এনথিক ক্লিনজিং” পলিসির অংশ হিসেবে, পার্বত্য রাজনীতির উত্তাল অবস্থায়, শিক্ষিত/আধা-শিক্ষিত পাহাড়িদেরকে গনহারে চাকরি দিয়ে একটি ভুঁইফোড় মধ্যবিত্ত শ্রেণী সৃষ্টি করা হয় । এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৭ সালে সম্পাদিত পার্বত্য চুক্তি পরবর্তী থেকে শুরু হয়, “পর্যটন শিল্পের বিকাশ” নামের আড়ালে পাহাড়িদের সংষ্কৃতি, ঐতিহ্য ধ্বংসের পায়তারা, ভুমি আগ্রাসন

পর্যটকদের জন্য খুলছে, সাজেকের দরজা” (তথ্যসূত্রঃ দৈনিক প্রথম আলো, ১৪ ই নভেম্বর, ২০১৩) শিরোনামের একটি খবর প্রকাশিত হয় । খবরের তথ্যানূযায়ী গত ৬ নবেম্বর দুপুর ১২ টায়, রাঙ্গামাতি পার্বত্য জেলার অন্তঃগত সাজেক ভ্যালির রুইলুই নামক স্থানে পর্যটন কেন্দ্র নির্মানের ঘোষনা দেন চট্টগ্রাম ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল সাব্বির আহমেদ । এর মধ্যে পেরিয়ে গেছে এক বছরের বেশি সময়। এই সময়ের মধ্যে, লুসাই পাহাড়ে জন্ম নেওয়া কর্ণফুলির জল অনেক গড়িয়েছে, সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়েছে, মাধবী-মেনকা-রম্ভারা ধর্ষিত হয়েছে । তবুও থেমে থাকেনি, পর্যটন কেন্দ্র নির্মানের কাজ ।

স্থানীয়দের অমত থাকা সত্বেও, সেনাবাহিনীর সার্বিক তত্বাবধানে “রুইলুই পর্যটন কেন্দ্র” নির্মানের কাজ এখন প্রায় শেষ !

 

সেনা শাসনের বৃত্তে পার্বত্য চট্টগ্রামঃ

সারা বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের বিকাশের চিন্তার জন্য রয়েছে, “পর্যটন মন্ত্রনালয়” । কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন, পর্যটন, স্থানীয় প্রশাসন সব কিছুই যেন সেনাবাহিনী লিজ নিয়ে নিয়েছে । পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাকরনের প্রকৃয়া সেই জিয়াউর রহমান সরকারের আমলে শুরু হয়েছিল, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে এসেও পাহাড়িদের এখনো মেলেনি সেনা শাসনের বৃত্ত থেকে মুক্তির স্বাধ । যদিও, ১৯৯৭ সালে সম্পাদিত “পার্বত্য চুক্তি” অনুযায়ী সেনা জোনগুলি রেখে গুচ্ছ সেনা ক্যাম্পগুলি সরিয়ে নেওয়ার কথা । কিন্তু, চুক্তি সম্পাদনের ১৭ (সতের) বছর পার হয়ে গেলেও গুচ্ছ ক্যাম্পগুলি সরিয়ে নেওয়ার কোন উদ্যোগ নেওয়া তো হয়ই নি, বরং কিভাবে আরো বেশি করে বাড়ানো যায়, তেমনটি ইচ্ছে যেন রাষ্ট্রের !

উন্নয়নে উন্নয়ন, উন্নয়নে নির্মূলঃ

জন্মে টাকা, মরণে টাকা” । “অর্থই অনর্থের মূল” এই বাক্যদুটির মতই বলতে হয়, “উন্নয়নে উন্নয়ন, উন্নয়নে নির্মূল” । বাক্যটির বিশ্লেষনে, সাজেক প্রসঙ্গে ফিরে আসা যাক । সাজেক ভ্যালীর যে স্থানে, রুইলুই পর্যটন কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে তার আশেপাশের বেশিরভাগ অঞ্চলই সংরক্ষিত বনাঞ্চল । এখানকার স্থানীয় অধিবাসী ত্রিপুরা আর লুসাই জনগোষ্ঠী । এখানে জীবন মানে, যৌগিক চাহিদা পর্যটন নয় । এখানে জীবন মানে, মৌলিক চাহিদাগুলি পূরনে অনবরত সংগ্রাম করে বেঁচে থাকা । এখানে নেই পানিয় জলের সু-ব্যবস্থা, নেই শিক্ষার সু-ব্যবস্থা, নেই চিকিৎসার সু-ব্যবস্থা । মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলি শুধু নেই, নেই আর নেই !

সেখানে পর্যটন কেন্দ্র কার স্বার্থে ? কার লাভ ?

অনেকেই বলবেন, কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে । মানুষের আয় রোজগার বাড়বে । এলাকার উন্নয়ন হবে ইত্যাদি । কিন্তু ঘটনার গভিরে গিয়ে একটু চিন্তা করলেই বুঝা যাবে, এই পর্যটন কেন্দ্র নির্মান হচ্ছে কার স্বার্থে, কিসের স্বার্থে ?

প্রথমেই বাড়বে, যানবাহনের আনাগোনা । যানবাহনের আনাগোনা বৃদ্ধির সাথে সাথে বাড়বে শব্দ দূষণ, গাড়ির কালো ধোয়া আর এসবের বিরুপ প্রভাব পরবে আশেপাশের প্রকৃতিতে । ঢাকা-চট্টগ্রামসহ সারা দেশ থেকেই পর্যটক আসবে । পর্যটকরা যেসব যানবাহনে চড়ে আসবে, সেসব যানবাহনের মালিকও নিশ্চয় কোন পাহাড়ি নয় ?

পর্যটক আনাগোনা ও ভিড়ভাট্টা বেশি হলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের যোগানদার, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের আনাগোনাও বেড়ে যাবে । পাইকারি ও খুচরা পণ্যের এইসব যোগানদারেরা নিশ্চয় পাহাড়িরা হবেনা ?

তাহলে স্থানীয়দের লাভটা কোথায় ? হ্যা, স্থানীয়দেরও লাভ আছে । এই পর্যটনকেন্দ্র পাহাড়িদের মধ্যে সৃষ্টি করবে কিছু খুচরো দোকানদার, কিছু ছোট হোটেলের মালিক, কিছুসংখ্যক মদের দোকানদার আর সৃষ্টি করবে কিছু বেশ্যা আর বেশ্যার দালালের ।

বিভিন্ন চরিত্রের, বিভিন্ন স্বভাবের পর্যটকের আগমন ঘটবে । কেউ আসবে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগে, কেউ আসবে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি পাহাড়ি দো-চুয়ানি আর সম্ভব হলে পাহাড়ি মেয়েছেলের স্বাধ নিতে ।

কথায় আছে, “চাহিদায় যোগান সৃষ্টি করে” । পর্যটকদের মধ্যে মদের এই চাহিদা মেটাতে গিয়ে পেটের দায়ে হোক কিংবা উন্নত জীবনের আশায় হোক, রুইলুই পাড়ার সেই ত্রিপুরা/লুসাই পরিবারটি মদের দোকান খুলে বসবেনা তার নিশ্চয়টা কি ? দল বেধে ঘুরতে আসা পর্যটকদের দ্বারা কোন পাহাড়ি রমনী ধর্ষিত হবেনা, তারই বা নিশ্চয়টা কি ? লুসাই বা ত্রিপুরা মেয়েটি পেটের দায়ে কিংবা উন্নত জীবনের আশায়, দেহপসারিনীর চোরাগলিতে নামবেনা তারই বা নিশ্চয়টা কি ?

স্থানীয়দের কথাঃ

রুইলুই পর্যটন কেন্দ্র নির্মাণের ঘোষনা দেওয়ার পর, কি ভাবছে স্থানীয় জনগন ? এই উত্তর খুজতে গত ১৯/১১/২০১৩ ইং তারিখে গিয়েছিলাম রুইলুই আর কংলাক মৌজায় ।

পথিমধ্যে পরিচয় হয়েছিল, কংলাক মৌজার হেডম্যান চংমিং থাঙা লুসাই এর সাথে । প্রশ্ন করেছিলাম, পর্যটন কেন্দ্রটি নিয়ে আপনার ভাবনা কি ? উত্তরে তিনি বলেন, আমরাতো পর্যটন কেন্দ্র চাই না । আমাদের প্রথমে প্রয়োজন পানীয় জলের সু-ব্যাবস্থা, শিক্ষা এবং চিকিৎসার সু-ব্যাবস্থা ।

কংলাক মৌজার অপর এক বাসিন্দা রবিন্দ্র ত্রিপুরা বলেন, হয়তো বাঙালি বসতি স্থাপনই মূল উদ্দেশ্য ।

রুইলুই মৌজার বাসিন্দা চা দোকানদার ময়া লুসাই বলেন, বাংলাদেশ সরকারের কাছে অনেক ক্ষমতা । পর্যটন কেন্দ্রটির কারনে যদি উচ্ছেদ হতে হয় তবে আমাদের তো কিছুই করার থাকবেনা । হয়তো দেশান্তরি হয়ে ভারতের মিজোরাম চলে যাবো । এছাড়াতো আর কোন উপায় নেই ।

ছবিঃ অরণ্যে ইট-সুরকির ছোয়া

ছবিঃ অরণ্যে ইট-সুরকির ছোয়া

ছবিঃ রুইলুই পাহাড়ে সুউচ্চ অট্টালিকা

ছবিঃ রুইলুই পাহাড়ে সুউচ্চ অট্টালিকা

পরিশেষঃ

রুইলুই পর্যটন কেন্দ্রের সর্বশেষ পরিষ্টিতি জানতে গত ৩০/০৭/২০১৪ ইং তারিখে আবার যাওয়া হয় রুইলুই পর্যটন কেন্দ্রে । এক বছর আগে দেখা রুইলুই আর বর্তমানের রুইলুইয়ের মধ্যে যেন আকাশ-পাতাল ব্যাবধান ! রাস্তাঘাট ঝকঝকে-তকতকে হয়েছে, গগনচুম্বী অট্টালিকা হয়েছে, রঙিন রঙিন দালান তৈরি হয়েছে, লাইব্রেরী হয়েছে । কিন্তু, স্থানীয়দের জীবন যাত্রার কোন উন্নতি হয়নি । পানির অভাব, শিক্ষার অভাব, সু-চিকিৎসার অভাবগুলিতে লাগেনি কোন উন্নতির ছোয়া । অনেক খুজেও ময়া লুসাইয়ের চা দোকানটিকে আর খুজে পায়নি । চা দোকানটির জায়গায় সেখানে দাঁড়িয়ে গেছে রঙিন টিনের ছাদযুক্ত “গণ পাঠাগার”, “রুইলুই জুনিয়র হাই স্কুল” । একজন স্থানীয় বাসিন্দার কাছে জানতে পারলাম, ময়া লুসাই এখন দেশান্তরী !

adsdsdsdsfdfdff

 

আমরা অনেকেই রুইলুই যায়, নীলগিরি-নীলাচলের কৃত্রিম সৌন্দর্যে মুগ্ধ হই, ছবি তুলি, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে শেয়ার করি, লাইক পাই, প্রশংসা পাই ।

কিন্তু, কেউই জানতে চেষ্টা করিনা, কতজন ময়া লুসাইয়ের চোখের পানিতে ভিজে আছে এইসব পর্যটন কেন্দ্রের মাটি, কতগুলি মুরং পরিবারকে উচ্ছেদ হতে হয়েছে এইসব নীলগিরি, নীলাচলের কারনে । আমরা শুধুমাত্র পাহাড়ের বাহ্যিক সৌন্দর্যটাই দেখি কিন্তু পাহাড়ের কান্নার ধ্বনি যে এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে ধ্বনিত হয়, কতজন পাহাড়ির রক্তপ্রবাহের ঝর্ণাধারা বহমান তা আমরা কেউই জানতে চেষ্টা করিনা ।

ময়া লুসাইদের উচ্ছেদ করে তৈরিকৃত গন পাঠাগার, রুইলুই জুনিয়র হাই স্কুল দেখে খুশি হওয়ারও কিছু নেই । হয়তো ভাবছেন, এসব তো স্থানীয়দের স্বার্থেই হয়েছে । কিন্তু, আমি বলব এসব রাষ্ট্রের-সেনাবাহিনীর আই-ওয়াশ প্রকৃয়ার অংশ, পর্যটন কেন্দ্র নির্মাণকে বৈধতা দেওয়ার প্রকৃয়ারই অংশ এসব !

যেখানে প্রাইমারী স্কুল থেকে জেএসসি পরীক্ষার্থি থাকে হাতেগোনা পাচঁ থেকে সাতজন । প্রাইমারী স্কুলগুলিতে শিক্ষকের অভাবে ঠিকমত পাঠদান হয় না, সেখানে জুনিয়র হাই স্কুল করে কি বোঝাতে চায় রাষ্ট্র ?

গাছের গোড়াটিকে দূর্বল রেখে, আগায় পানি ঢালার অর্থটাই বা কি ?

 

Udsdsdntitled

 

হে প্রজন্ম, হে রাষ্ট্র ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করেনা । একদিন ঠিকই ইতিহাস তোমাকে ধিক্কার জানাবে । হে প্রজন্ম চাক, মুরং, লুসাই, চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, হাজং, সাওতালদের কান্না আর রক্তে ভেজা মাটিতে দাঁড়িয়ে তুমি যেই সেলফিটা তুলেছো তার জন্য তুমিও দোষি হয়ে থাকবে ইতিহাসের কাছে । ইতিহাস আমাদের কাউকেই ক্ষমা করবেনা, কাউকেই না……………..!!!!!!!!!!!!!!!!

About the author

জুম্মো এডিসন

আমি বস্তুবাদী নাস্তিক ।

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/3000

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>