«

»

এই লেখাটি 1,202 বার পড়া হয়েছে

Print this প্রকাশনা

ত্রিখণ্ডিত জুম্ম স্বাধিকার আন্দোলন: মুক্তি কোন পথে? -২

পূর্ব প্রকাশের পর……………
(পুর্ববর্তী লেখা)


আমাদের দুরবস্থার কারণ ও দায়ভার

বাংলাদেশে পাহাড় সমতল নির্বিশেষে আদিবাসীরা হলেন সবচেয়ে নিপীড়িত বিপন্ন জনগোষ্ঠী – একথা বলার অপেক্ষা রাখেনা। অনেকে বলবেন, বাঙালি সমাজের নদীভাঙা, মঙ্গাপীড়িত মানুষেরাই এদেশে সবচেয়ে বিপন্ন, অসহায় মানুষ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাঙালি সমাজের এই অসহায়, অন্ত্যজ মানুষেরাই পাহাড়ে গিয়ে ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সব পাহাড়ির উপর নির্দ্বিধায় ছড়ি ঘোরাতে পারে, পাহাড়ি নারীদেরকে উত্যক্ত, ধর্ষণ করতে পারে। প্রশাসনের সহায়তায় তাদের জমি, বাস্তুভিটা বেদখল করতে পারে।

বৈধ অবৈধ বিচিত্র সব ব্যবসা বাণিজ্যে জড়িয়ে, বনজ সম্পদ পাচার করে দিয়ে কয়েক বছরের মধ্যে বিপুল অর্থ-বিত্তের মালিক হতে পারে। সর্বোপরি রাজনীতিতে জড়িয়ে মেম্বার, চেয়ারম্যান, এমপি, মন্ত্রীও হতে পারে। কারণ তারা দেশের দন্ডমুন্ডের কর্তা, একচ্ছত্র অধিপতি বাঙালি জাতির সদস্য। ভুলে গেলে চলবেনা, তারা সরকারের সর্বাত্মক পৃষ্ঠপোষকতাতেই পাহাড়ে অভিবাসিত হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। তাই এক বনে বিচরণকারী নেকড়ে আর হরিণ শাবকের মানবাধিকার ও মর্যাদা সমান বলে সরলীকরণ করার সুযোগ নেই। যেটি বৃহৎ নৃগোষ্ঠীর মানুষ অর্থাৎ বাঙালিরা প্রায়শঃ করে থাকেন। হরিণ শাবককে বিশেষ সুরক্ষা দেওয়া না হলে তারা নির্বিচারে নেকড়ের মুখরোচক খাদ্যে পরিণত হতে বাধ্য। পার্বত্য চট্টগ্রাম তথা বাংলাদেশের আদিবাসী ও বাঙালির মানবাধিকারের বিষয়টি হলো ঠিক ’সিরাম পরিষ্কার’ একটি বিষয়। অর্থাৎ বাঙালি এদেশে শাসক জাতি, আদিবাসীরা শাসিত ও প্রান্তিক মানুষ। আর তুলনামূলকভাবে দুর্বল, আক্রান্ত জাতির মানুষকে বিশেষ সুরক্ষা ও সুবিধা দিয়ে উন্নয়নের মূলধারায় প্রতিষ্ঠিত করতে হয়। সভ্য সমাজে প্রচলিত এই ব্যবস্থাটির ইংরেজি নাম হলো ’পজিটিভ ডিসক্রিমিনেশন’ বা ’অ্যাফারমেটিভ একশন’। আধুনিককালের উন্নয়ন ডিসকোর্সে এর বাংলা অর্থ করা হয়েছে ’ইতিবাচক পক্ষপাত বা পক্ষপাতিত্ব’। জাতিগত ও সাংস্কৃতিক ভিন্নতা এবং ঐতিহাসিকভাবে স্বশাসিত অঞ্চল হওয়ার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের জন্য যে সামান্যতম রক্ষাকবচটুকু জেলা পরিষদ, আঞ্চলিক পরিষদ এবং রাজার প্রথাগত বিচার ব্যবস্থার নামে এখনও টিকে আছে, সেটিকেও সর্বগ্রাসী জাতীয়তাবাদের বাঙালি অনুসারীরা সহ্য করতে পারছেন না। আদিবাসী সমাজের এই ন্যূনতম স্বাতন্ত্র্যটিকেও ’দেশের ভেতরে দেশ’, ’সার্বভৌমত্ব বিপন্ন’ জাতীয় উস্কানিমূলক ধারণা বা অপপ্রচারণার শরে প্রতিনিয়ত বিদ্ধ ও বিতর্কিত করা হচ্ছে, যাতে অবশেষে ব্যবস্থাটিকে বাতিল করে দেওয়া যায়। পাশাপাশি বাঙালি জাতির ’সমঅধিকার’ ও ’দেশের সার্বভৌমত্ব’ রক্ষার অছিলায় তারা পার্বত্য অঞ্চলের সমগ্র পাহাড়-অরণ্য-ভূমি-ঝরণা নিজেদের ভোগদখলে নেওয়ার অপ্রতিরোধ্য তৎপরতাও অব্যাহত রেখেছেন। অর্থাৎ অন্যের অধিকারকে হরণ করে তারা সেখানে নিজেদের তথাকথিত ’সমঅধিকার’ প্রতিষ্ঠা করতে চান। বাস্তবে সেটি আসলে সমঅধিকারের নামে নাৎসিবাদ, ফ্যাসিবাদ কিংবা বর্তমান সময়ের ইহুদিবাদের মতো বর্বরতা ছাড়া আর কিছুই নয়। রাষ্ট্রের সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র এবং অধিকাংশ রাজনীতিবিদ আদিবাসী বিরোধী এই কট্টরপন্থীদের মতানুসারী বলেই পাহাড়িরা অতি দ্রুত তাদের প্রথাগত মালিকানাধীন ভূমি-বন হারিয়ে অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুতে পরিণত হচ্ছেন। শাসকশ্রেণীর কট্টরপন্থী অংশটির সহযোগিতায় বাঙালি জাতির অন্ত্যজ অধিকাংশ মানুষ পাহাড়ে এসে অসীম ক্ষমতার অধিকারী হয়েছে। আর পাহাড়ি সমাজের দরিদ্রতম মানুষেরা, যারা আবার সংখ্যাগরিষ্ঠ, আগে যেমনটি ছিল এখনও তাই আছে। যুগ যুগ ধরে তাদের অধিকাংশ আজও সেই জুমচাষি, বর্গাচাষি, ক্ষুদ্র কৃষক বা শ্রমিক। দেশের স্বাধীনতার এতো দশক পরেও তাদের দুরবস্থার তেমন কোন ইতরবিশেষ হয়নি। বরং দিন দিন আরও প্রান্তিক, সঙ্গীন হচ্ছে তাদের অবস্থা। সমতল ও পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, ম্রো, খুমী, গারো, সান্তাল, খাসি, হাজং বা মুন্ডাদের জন্য মহা’স্বপ্নবিলাসী’ জাতীয় বাজেটেও কোন সুবচন কিংবা অর্থ বরাদ্ধ থাকেনা। বাংলার ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক মহান রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবীরাও দেশের সংবিধানে, নীতি নির্ধারণী বা একাডেমিক পরিসরে এই অর্বাচীনদের স্বতন্ত্র কন্ঠস্বর ও জাতিগত ভিন্নতাকে নির্বিকার চিত্তে অস্তিত্বহীন করে দেন। এককথায় সর্বক্ষেত্রে তাদেরকে চুপিসারে হত্যা করে ফেলে রাখেন। যুগ যুগ ধরে রাষ্ট্রযন্ত্র বা শাসকগোষ্ঠীর এই যে বিমাতাসুলভ আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গী, জাতিগত যে নিপীড়ন ও আগ্রাসন, সেটিই আদিবাসীদের দুরবস্থা ও বিপন্নতার প্রধানতম কারণ। ১০ জুন ২০১৪ দিঘীনালার বাবুছড়ায় শিশুসহ আদিবাসী নর-নারীদের উপর সরকারি বাহিনীর হামলা ও গণমামলা দায়েরের ঘটনাটি জাতিগত আগ্রাসনের সাম্প্রতিকতম উদাহরণ। শোনা যাচ্ছে, ঐ অঞ্চলে এখন প্রায় দেড় লক্ষ বাঙালি সেটেলার পুনর্বাসনের গোপন তৎপরতা চলছে। আর আদিবাসীদের দুঃখ-যন্ত্রণার দ্বিতীয় প্রধান কারণটি হলো অবশ্যই ’আদর্শের নামে’ জুম্মদের ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত। বিগত বছরগুলোতে পরিচালিত শত শত হত্যাকান্ডসহ সম্প্রতি ’জুম্ম যোদ্ধা’দের কারসাজিতে পাহাড়ি মালিকানাধীন নাড়েইছড়ি বাজার পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাটি ভ্রাতৃঘাতি সংঘাতের একটি নিন্দনীয় করুণ দৃষ্টান্ত। জাতিগত আগ্রাসন ও ভ্রাতৃঘাতি সংঘাতের পাশাপাশি মোটাদাগে জুম্ম আদিবাসীদের দুর্দশার জন্য দায়ী অন্যান্য কারণগুলো হলো – কিছু কিছু ক্ষেত্রে সমাজে বিরাজমান সামন্ততান্ত্রিক ধ্যান-ধারণা, এর ছায়াসঙ্গী অনুদার আত্মীয়প্রীতি, গোষ্ঠীপ্রীতি ও পক্ষপাতদুষ্ট মনন-মানস; মধ্যযুগীয় পুরুষতান্ত্রিকতা এবং এর ফলস্বরূপ নারী সমাজের তুলনামূলক অনগ্রসরতা, অসচেতনতা ও ক্ষমতাহীনতা; গত দেড়-দুই দশকে বিশ্বায়নের স্রোতে ভেসে আসা পুঁজিবাদের ছায়াসঙ্গী লাগামহীন ভোগবাদ, ঘুষ-দুর্নীতি-চাঁদাবাজি-মাদক উৎসারিত সর্বগ্রাসী নৈতিক অবক্ষয়, সৃজনশীলতা ও মুক্তবুদ্ধির চর্চার অভাবে সমাজে জেঁকে বসা ধর্মীয়-সামাজিক কুসংস্কার ও কুপমন্ডুকতা, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন-উদার-প্রাজ্ঞ-সুদক্ষ-মানবিক নেতৃত্বের স্বল্পতা, বাস্তবসম্মত জাতীয় লক্ষ্য এবং ভবিষ্যত রূপকল্পের অনুপস্থিতি, প্রভৃতি।

তবে জাতিগত আগ্রাসন ও নিপীড়ন থেকে মুক্তির লক্ষ্যে জুম্মদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির আগ পর্যন্ত নানা ঘাত-প্রতিঘাত সত্ত্বেও মোটামুটিভাবে গ্রহণযোগ্য একটি ধারায় অগ্রসর হয়েছিল। জুম্ম জাতির মুক্তির অগ্রদূত শ্রী মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা বিভেদপন্থীদের অপ্রত্যাশিত আক্রমণে নিহত হওয়ার পর সেই অভিশপ্ত তালমাতাল সময়টাকে সামলে নিয়ে তাঁরই অনুজ শ্রী জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় (সন্তু) লারমার যোগ্য নেতৃত্বে জুম্মদের শোষণমুক্তির আন্দোলন একটি সুনির্দিষ্ট পরিণতির দিকে ঠিকই এগিয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির বাস্তবতায়, বিশেষ করে ভারতের বাণিজ্যিক ডিপ্লোম্যাসির কারণে পার্বত্য চুক্তিতে প্রতিশ্রুত অধিকারসমূহের চেয়ে বেশি অধিকার অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। এই বিষয়টি এবং চুক্তির কিছু সীমাবদ্ধতার বিষয় কারও বোধগম্য না হওয়ার কথা নয়। তার পরও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে প্রতিশ্রুত সব অধিকার নিশ্চিত করা গেলে সেটি অবশ্যই ’মন্দের ভালো’ হতো। অন্ততপক্ষে ব্যাঙের ছাতার মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সেনা ছাউনিগুলো চারটি সেনানিবাসে গুটিয়ে নেওয়া হলে পাহাড়বাসী তল্লাশীর নামে অনাবশ্যক হয়রানি ও নির্যাতনের আশঙ্কা থেকে মুক্ত হতো। চুক্তিতে উল্লেখিত অধিকারগুলো পর্যাপ্ত মনে না হলে অধিকতর মুক্তির জন্য পরবর্তীতে আর আন্দোলন করা যাবেনা এমন শর্ত নিশ্চয়ই পার্বত্য চুক্তিতে লেখা ছিলনা। তাই শুরুতেই চুক্তিবিরোধী অবস্থান নিয়ে জুম্ম সমাজকে চিরতরে বিভাজিত করে ফেলা এবং এভাবে চুক্তিভঙ্গের পক্ষে শক্ত একটি অছিলা শাসকগোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়া কতটুকু সুবিবেচনাপ্রসূত কাজ হয়েছে সেটি অবশ্যই মুক্ত মন নিয়ে পর্যালোচনার দাবি রাখে। বিভাজনের বীজ রোপন করে জুম্ম সমাজকে যে দুঃসহ যন্ত্রণাময় অবস্থায় এখন নিপতিত করা হয়েছে তার দায়ভার নেওয়ার সৎসাহস কি আমাদের কারও আছে? একদিকে শাসকগোষ্ঠীর জাতিগত আগ্রাসন অন্যদিকে তিন আঞ্চলিক দলের ক্রমবর্ধমান আর্থ-রাজনৈতিক চাপ, শোষণ ও সংঘাতে সাধারণ জুম্ম জনগণের এখন সত্যিই ত্রাহি মধুসুধন অবস্থা। খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই অবস্থা থেকে উত্তরণ অতীব জরুরি। না হলে জুম্ম জনগণ আক্ষরিক অর্থে ’সর্বহারা’ হয়ে বাংলার বৃহৎ নৃ-গোষ্ঠীর ’সব হারাদের মাঝে’ অচিরে বিলীন হয়ে যাবে। ইদানীং সে লক্ষণ অতি সুস্পষ্ট। বস্তুগত ও মননগত উভয় দিক থেকেই এই বিলুপ্তি ঘটবে। সমুদয় ভূমি-বন-সম্পত্তি হারিয়ে আদিবাসীরা প্রথমে ছিন্নমূল হবে। পরে স্বাধীনভাবে নিজের কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ধর্ম, মূল্যবোধের চর্চা ও লালন করতে না পেরে দেহে-মনে বাঙাল বা বাঙালি হবে। অধিকাংশ মানুষ হতাশাগ্রস্ত হয়ে নীতি-নৈতিকতা জাতীয় শব্দ বা মূল্যবোধগুলোকেই চিরতরে গঙ্গাজলে বা পাহাড়ি ঝরণায় বিসর্জন দেবে। তখন জুম্মদেরকে আর ’বাংলাদেশি’ হওয়ার প্রয়োজন পড়বেনা। আদিবাসী মন-মানস বাঙালি মননে রূপান্তরিত হলে এদেশে ’বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ ও ’বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ বিতর্কেরও স্বাভাবিক মৃত্যু ঘটবে। তখন বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদীদের ’বাঙালি জাতীয়তাবাদী’তে রূপান্তরিত হতে অথবা এর উল্টোটি ঘটতে খুব বেশি সময় লাগবেনা। হিন্দু বাঙালি এখানে কখনও বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াবেনা। কারণ তাদের প্রায় সকলে ইতিমধ্যে বাঙালি মুসলমানের চেয়ে অধিক মাত্রায় ’বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী’তে রূপান্তরিত হয়েছেন। আর উভয় জাতীয়তাবাদের ধ্বজাধারীরা তো ’হিন্দু-ভারতের’ আশীর্বাদপুষ্টই হতে চান, ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া কিংবা ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য।

এখন যে বৃত্ত ভাঙতে হবে

জুম্ম তরুণ সমাজ একযোগে যদি বিভাজনের রাজনীতিকে দৃঢ়ভাবে ’না’ বলে দেয় তাহলে সামনের দিনগুলোতে পাহাড়ে সূর্যকরোজ্জ্বল সোনালী প্রভাতের উদয় অবশ্যম্ভাবী। যদি এক দশক আগে সে কাজটি আমরা করতে পারতাম তাহলে বিশ্ব জুড়ে জুম্মদের ইতিবাচক ভাবমূর্তি এবং শ্রদ্ধার আসনটি আরও পাকাপোক্ত হতো। পার্বত্য চুক্তিতে স্বীকৃত অধিকারগুলো পাওয়া গেলেও এতোদিনে শিক্ষায়-বাণিজ্যে-উদ্ভাবনে, অর্থনীতি-সংস্কৃতি এবং উন্নয়নের রাজনীতিতে বহুদূর অগ্রসর হতে পারতাম আমরা। অন্ততঃপক্ষে ভূমি অধিকারের আধাআধি সমাধানসহ তরুণ প্রজন্মের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা গেলেও জাতি হিসেবে নড়বড়ে কাঠামোটি আরেকটু মজবুত হতো। তরুণ প্রজন্মের সহযোগিতা না পেলে আমাদের অভিজ্ঞ রাজনীতিকরা তাদের সামন্ততান্ত্রিক কাজিয়াকে প্রগতিশীল রাজনীতির মোড়কে বাজারজাত করতে পারতেন না। তরুণ সমাজের বোধোদয় ঘটলে এখনও তাঁরা সংযত, অহিংস এবং ঐকবদ্ধ হতে বাধ্য। সমস্যা হলো, ভ্রাতৃঘাতি রাজনীতিতে জুম্ম তরুণ সমাজ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সেই স্বপ্নভুক ক্ষতির ছোবলকে তারা এখনও গভীরভাবে অনুধাবন করতে পারছেন না। কতদিনে পারবেন সেটিও বোঝা যাচ্ছেনা। কারণ তরুণ প্রজন্মের অনেকে ভ্রাতৃঘাতি রাজনীতির দর্শনের সাথে নিজেকে বেশ মানিয়ে নিয়েছেন। মেধাবী কিছু তরুণ উভয় বা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে সক্রিয় থাকায় সদ্য কৈশোর পেরোনো স্বপ্নবিলাসী কিছু নবীনও তাদের অনুকরণে জুম্মদের শোষণমুক্তির স্বপ্ন দেখছে। বিভাজনের রাজনীতির একই বৃত্তে জড়িয়ে তারাও অবশেষে জুম্ম নিধনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অংশীদারে পরিণত হচ্ছে। এই বয়সে রাজনীতি, সমাজ ও ভবিষ্যত সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা অর্জন করা সহজ কাজ নয়। তবে প্রগতিশীল রাজনীতি বা নতুন যে কোন বিষয়ের প্রতি একধরনের আকর্ষণ, ধোঁয়াশাধূসর স্বপ্ন, উন্মাদনা ও রোমান্টিক প্রত্যয় নবীনদের মনে জাগ্রত তো হবেই। নাহলে কিসের মানুষ, কিসের তরুণ প্রজন্ম। আসলে তরুণ বয়সেই তো সকলে কোন না কোনভাবে বিপ্লবী হয়। শোষণ মুক্তি ও সমাজ বদলের স্বপ্ন দেখে। সবার হৃদয়ে কবিত্বের, প্রেমের স্পর্ধা বা সৌন্দর্যও জাগ্রত হয়। সত্তরের দশকে শান্তিবাহিনীর আন্দোলনের সেই উন্মাতাল দিনগুলোতে যারা কিশোর ও তরুণ ছিল তারা জানেন সমাজ বিপ্লব বা প্রগতিশীল রাজনীতির প্রতি আকর্ষণ কতটুকু দুর্দমনীয় হতে পারে। কিন্তু দুঃখজনক সত্য হলো, তরুণ সমাজের সেই আত্মপ্রত্যয়, অমূল্য স্বপ্ন ও সম্ভাবনাকে জাতীয় মুক্তির স্বপ্নদ্রষ্টা সকল প্রবীণ বা অর্ধপ্রবীণেরা আজ ভ্রাতৃঘাতি রাজনীতির কোন পঙ্কিলতায় নামিয়ে এনেছেন! সহিংসতা ও কুটতর্কের কোন অচলায়তনে বন্দী করে ফেলেছেন! ভ্রাতৃঘাতি সংঘাতে কি করুণভাবেই না অপচায়িত হচ্ছে অপরিসীম সম্ভাবনার জুম্ম তারুণ্য, নতুন প্রজন্মের সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী শক্তি। এখন ভ্রাতৃঘাতি আদর্শের, সন্মোহনের, প্রতিহিংসা ও অচলায়তনের এই বৃত্ত ভাঙতে হবে। ’কারার ঐ লোহকপাট’ ভাঙার কাজটি তরুণদেরকেই করতে হবে।

প্রথমে যে বৃত্তটিকে ভাঙতে হবে সেটি দেহের নয়, মনের। একপেশে রাজনৈতিক দর্শন ও অন্ধ আনুগত্যের। সেটি তরুণদের নিজের সাথে নিজের যুদ্ধও বটে। এই যুদ্ধে জিততে হলে অনেক কিছু জানতে হবে, পড়তে ও বুঝতে হবে। কিছু কিছু ত্যাগও অবশ্যই স্বীকার করতে হবে। নিজের মেধা-মননকে নিবিড়ভাবে কাজে লাগিয়ে প্রতিনিয়ত এর উন্নতি ও সমৃদ্ধি ঘটাতে হবে। প্রধানত ব্যাপক পড়াশুনোর মাধ্যমে চেনার, জানার বিপুল ঘাটতি ও শুন্যতা দূর করতে হবে। আমাদের রাজনীতি ও জাতির আদ্যপান্ত ইতিহাস, বর্তমান দুরবস্থার জন্য পূর্ব-প্রজন্মের ভূমিকা, মানব সভ্যতা-সমাজ ও সংস্কৃতির বিকাশধারা, পুঁজিবাদ-সমাজতন্ত্র-গণতন্ত্রের বিকাশ-গতিধারা ও ভবিষ্যত, বিশ্ব সভ্যতা-সংস্কৃতির সংকট ও সংঘাত, বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির হাল-হকিকত, বিশ্বের উন্নত ও উন্নয়নশীল অর্থনীতিসমূহের হালচাল, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক কুটনীতি, বর্তমান সময়ের বিশ্ব সন্ত্রাসবাদ-মৌলবাদ-জাতিরাষ্ট্র-শোষণমুক্তির আন্দোলন, বিশ্বশক্তিগুলোর ক্ষমতার মেরুকরণ ও প্রতিযোগিতা, বিশ্বের উষ্ণায়ন এবং প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের ভবিষ্যত, জেন্ডার বৈষম্য ও নারীর ক্ষমতায়ন, বিশ্বসাহিত্য, দর্শন ও ধর্মত্বত্ত্ব; প্রযুক্তির বিপ্লবসহ অন্যান্য একাডেমিক ও কারিগরি বিষয়সমূহ, তরুণ প্রজন্মের উদ্ভাবনী শক্তি-সম্ভাবনা ও ভবিষ্যত, আমাদের ভবিষ্যত করণীয় প্রভৃতি বিষয় সম্পর্কে গভীর জ্ঞান আমাদের তরুণ প্রজন্মকে অর্জন করতে হবে। সমাজ বদলের, শোষণমুক্তির স্বপ্ন দেখি বলে শুধুমাত্র কিছু লাল পতাকা চিহ্নিত রক্তিম পুস্তকের আফিম সেবন করে একটি ইস্পাতকঠিন রোবোটিক মাথা ও মন তৈরি করলে তো চলবেনা। জগতের অন্যান্য জ্ঞানকা-, পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতি, সমাজ বাস্তবতা ও চাহিদার সাথে পঠিত বা অর্জিত জ্ঞানকে মিলিয়ে দেখার উদারতাও অর্জন করতে হবে। বিশেষ একটি রাজনৈতিক দর্শন দিয়ে মস্তিষ্ক ও হৃদয়ের সব জানালাগুলো বন্ধ করে দিলে চিন্তন বা মননজগত অন্ধকারাচ্ছন্ন হওয়াটাই স্বাভাবিক। জ্ঞানের মুক্ত চলাচল ব্যাহত হলে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে বাধ্য। এতে হৃদয়-মন, দৃষ্টিভঙ্গি বা বিচারধারাও ভীষণ রোবোটিক ও একপেশেই হবে। তাই প্রয়োজন বুদ্ধির মুক্তি। সংস্কৃতির ব্যাপক চর্চা, পঠন-পাঠন ও বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকা-ের মাধ্যমে একটি ব্যাপকভিত্তিক ও সাড়াজাগানিয়া মুক্তবুদ্ধির গণআন্দোলন সৃষ্টি করতে হবে। আসলে সেটি হবে হৃদয়-মনের অচলায়তন ভাঙার এক বৈপ্লবিক আন্দোলন। অন্তরের দিগন্ত প্রসারিত হলে কালক্রমে সহিংসতা ও ভ্রাতৃঘাতি সংঘাতের বলয় থেকে জুম্ম জাতির দেহ-মনকে মুক্ত করা অবশ্যই সম্ভব হবে।

বিশ্ব পুঁজিবাদের বিপরীতে সমান তৎপর সাম্যবাদী চিন্তাবিদ এবং মার্কিন বিবেকের বিশুদ্ধ কন্ঠস্বর অধ্যাপক নোয়াম চমস্কির একটি চমৎকার ও প্রাসঙ্গিক উক্তি এখানে স্মরণ করা যাক। তিনি বলেছেন, ”মানুষকে নিষ্ক্রিয় এবং অনুগত রাখার চাতুর্যপূর্ণ কৌশলটি হলো মতপ্রকাশের গ্রহণযোগ্য পরিসরটাকে কঠোরভাবে সঙ্কুচিত করে দেওয়া এবং সেই সীমায়িত পরিসরের মধ্যে অত্যন্ত প্রাণবন্ত বিতর্ক চালিয়ে যেতে জনগণকে উৎসাহিত করা।” পাঠক এখন মিলিয়ে দেখুন, বাংলাদেশের আদিবাসীদের জীবনে, বিশেষত পার্বত্য রাজনীতির ক্ষেত্রে তাঁর এই উক্তি শতভাগ সত্য হিসেবে প্রতিভাত হচ্ছে কিনা। একদিকে ’আদিবাসী-উপজাতি-ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ নামকরণ নিয়ে তীব্র বিতর্ক উস্কে দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে জুম্ম রাজনীতিকদের মধ্যে ’আপোষকামিতা-আপোষহীনতা’র মতাদর্শ নিয়ে উত্তপ্ত বাকযুদ্ধসহ ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত জিইয়ে রাখা হয়েছে। এসব চলছে একটি প্রবলভাবে সামরিকায়িত মনস্তত্ত্ব ও ভয়ের সংস্কৃতির ঘেরাটোপের মধ্যে। মাঝখানে শাসকগোষ্ঠী ও মূলধারার (বাঙালি) জনগণ এর সর্বাত্মক সুফল ঘরে তুলছেন। আদিবাসীদের ভূমি-বন-প্রশাসন-বাণিজ্য-সংস্কৃতি-মানসকাঠামো-কর্তৃত্ব-সম্ভাবনা সবকিছুকে পরিকল্পনামতো আত্মস্থ ও কুক্ষিগত করছেন। নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষে সিদ্ধহস্ত হলেও শাসকগোষ্ঠীর ক্ষমতা ও তৎপরতার কাছে পাহাড়ের বিবদমান সব আঞ্চলিক দল চমস্কির মতানুযায়ী বাধ্যতামূলকভাবে ’অনুগত ও নিষ্ক্রিয়’। মাঝে মাঝে কিছু বক্তৃতা-বিবৃতি-মানববন্ধন-শ্লোগান-সেমিনার চললেও রাষ্ট্রযন্ত্র জানে কোথায় তাদের হাত-পা-কন্ঠ বাঁধা আছে। কতদূর যাওয়া, বলা বা লেখা সম্ভব হবে। কিংবা তাদের এতসব কথা, লেখনী, হুমকি বা রাজনীতি দেশের চিরবধির জনমনে কতটুকু গ্রাহ্য হবে। কারণ পাহাড়ে পুনর্বাসিত সেটেলার বাঙালিরা শাসক মহলের আন্তরিক পৃষ্ঠপোষণায় দেশে-বিদেশে পাহাড়িদের বিরুদ্ধে আরও স্বাধীনভাবে ব্যাপক তৎপরতা ও প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে কি পাহাড়ে কি সমতলে বাঙালির আদিবাসী ও সংখ্যালঘু বিরোধী জাতিগত আগ্রাসনের একটি উদ্যোগকেও এখন আর প্রতিহত করা যাচ্ছেনা।

সাম্যবাদী সমাজব্যবস্থা: স্বপ্নে সুন্দর, বাস্তবে কি রক্তগন্ধময়!

আমরা অবশ্যই একটি সমতাপূর্ণ, ন্যায্য, আলোকিত ও সমৃদ্ধ সমাজ চাই। সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাই সেক্ষেত্রে কাঙ্খিত আদর্শ। জাতীয় মুক্তি তথা শোষণমুক্তির সংগ্রামে জুম্ম জনগণ তাই সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শকেই আঁকড়ে ধরেছেন। সমস্যা হলো, সমাজতান্ত্রিক সাম্য স্বপ্নে বা কল্পনায় অপূর্ব সুন্দর একটি ব্যবস্থা হলেও বাস্তবে ভীষণ স্বৈরতান্ত্রিক এবং আবশ্যিকভাবে রক্তগন্ধময়। অর্থাৎ মানব সমাজে এর প্রয়োগটি সমস্যাপূর্ণ। এক্ষেত্রে একটি সহজ প্রশ্ন করা যায়। রক্তের সিঁড়ি বেয়ে কী কখনও আদর্শ সমাজে উত্তরণ সম্ভব? অতীতে কিংবা বর্তমানে রক্তাক্ত যুদ্ধগ্রস্ততা ও সহিংসতায় আচ্ছন্ন মানুষেরা কী কখনও আদর্শ সমাজ গড়তে পারে? পৃথিবীতে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো দশকের পর দশক ধরে এখনও হতদরিদ্রই রয়ে গেল। কাঙ্খিত উন্নয়ন ও সমৃদ্ধ সমাজ উপহার দিতে পারলো না। তাই তো সমাজতন্ত্রের ধারণাটি এখন খোদ সমাজতান্ত্রিক বিশ্বেই দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে। তবুও চিন্তায়-মননে আমরা কেন আজও একশত বছর পেছনে পড়ে আছি সেটি একটি বিস্ময়। কয়েকটি উদাহরণ টেনে এই প্রসঙ্গের পরিসমাপ্তি ঘটাবো। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার দুই বছর পর ১৯১৭ সালে রাশিয়ায় পৃথিবীর সর্ববৃহৎ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন হয়েছিল। সমাজতন্ত্রের অগ্রযাত্রার সেই শুরু। এরপর একে একে, চীন, কিউবা, উত্তর কোরিয়া, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, পূর্ব ইউরোপ ও ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশ, এমনকি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও কেরালা উপকুল পর্যন্ত এর ঢেউ এসে আছড়ে পড়েছে। এসব দেশে সমাজতান্ত্রিক উত্তরণের পথ কুসুমাস্তীর্ণ ছিলনা। অধিকাংশ দেশে রক্তক্ষয়ী জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব সাধিত হয়েছিল। প্রধান যুদ্ধটা ছিল ঔপনিবেশিক শক্তি বা তাদের দোসরদের বিরুদ্ধে। স্বজাতিভুক্ত শ্রেণীশত্রু, প্রতিক্রিয়াশীল, বুর্জোয়া বা পেটিবুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে যুদ্ধটা ছিল গৌণ। কারণ এসব দেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যুদ্ধে শুধুমাত্র মেহনতি মানুষ, শ্রমিক/মজদুরেরা সামিল হননি। মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত, আমলা নির্বিশেষে কমবেশি সকল শ্রেণী-পেশার মানুষ এই যুদ্ধে সামিল হয়েছিলেন। না হলে সংগ্রামের প্রকৃতি জনগণতান্ত্রিক হবে কী করে? শুধুমাত্র রাশিয়া ও চীনের বিপ্লবের ইতিহাস এবং এই দু’টি দেশের বর্তমান শাসন কাঠামো ও আর্থ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি গভীরভাবে অনুধাবন করলে প্রশ্নের উত্তর মিলবে। তাদের রাজনীতিক, আমলা, বুদ্ধিজীবী, ব্যবসায়ী, শিক্ষক, অভিনেতা, কবি, মজদুর সকলে মিলে সমাজতন্ত্র কায়েম করেছিলেন। শুধু মজদুরেরা একা সেটি করেননি। আজ যুগের চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে তাদের সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা কী অবিশ্বাস্য দ্রুততায় পাল্টে গেছে এবং যাচ্ছে। পুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা দু’টিই ব্যাপক ছাড় দিয়ে এখন পরষ্পরের কাছাকাছি আসার চেষ্টা করছে। কিন্তু দুঃখজনক সত্য হলো, আমরা পাহাড়ের সমাজতন্ত্রীরা বিপ্লবের জনগণতান্ত্রিকতায় প্রাধান্য না দিয়ে তথাকথিত ’শ্রেণীশত্রু’ খতমের খেলাকে সবসময় প্রাধান্য দিয়েছি এবং দিচ্ছি। যেমনটি করেছিলেন কম্বোডিয়ার অপরিণামদর্শী সমাজতন্ত্রী কমরেড পলপট ও তার সহযোগিরা। তারা স্বজাতির প্রায় ত্রিশ লক্ষ ভাই-বোনকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিলেন। পাপমোচনের উপায় হিসেবে সেদেশে মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচার এখনও চলছে। অথচ বদলে যাওয়া সময়, বিশ্বরাজনীতি ও সামাজিক বিবর্তন থেকে আমরা কিছুই শিখিনি। আধুনিক চীনের বাস্তববাদী নেতৃবৃন্দ যেখানে তাদের জাতির জনক মাও সেতুংয়ের ভুলত্রুটিগুলো জনসমাজে প্রকাশ্যে তুলে ধরছেন, সেখানে আমরা আজও তাঁর প্রচারিত ’বন্দুকের নলই সকল ক্ষমতার উৎস’ কিংবা ’গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরাও করো’ জাতীয় অবাস্তব তত্ত্বে মজে আছি। বিজ্ঞানের, সমরাস্ত্রের, কুটনীতির বৈপ্লবিক উন্নয়ন ও যাদুমন্ত্রে শ্রীলংকার এলটিটিই-র মতো অপ্রতিরোধ্য গেরিলা শক্তিও যে ফুঁৎকারে উড়ে গেলো, তার উদাহরণ থেকে যেন আমাদের কিছুই শেখার নেই। খেয়াল করুন, এলটিটিই’র প্রতি শ্রীলংকা এবং ভারতের তামিলদের জনসমর্থনের তো কোন ঘাটতি ছিলনা।

পুরনো ধাঁচের সমাজতান্ত্রিক দর্শনের আচ্ছন্নতা নতুন প্রজন্মের চেতনাকেও প্রভাবিত করছে বলে তারাও এখন সমাজের সর্বত্র কেবল ’শ্রেণীশত্রু’ই দেখছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। শান্তিচুক্তির আগে শান্তিবাহিনীর অনেক সদস্যও নিশ্চয় সেভাবে দেখতেন। পার্বত্য চট্টগ্রামে তুলনামুলকভাবে স্বচ্ছল গৃহস্থ, ব্যবসায়ী, ঠিকাদার, উচ্চ বেতনের চাকুরিজীবী, ভূ-স্বামী প্রভৃতিকে পার্টির অনেকের কাছে বুর্জোয়া, শ্রেণীশত্রু হিসেবে বিবেচিত হতে দেখা গেছে। এ যুগের প্র্যাগম্যাটিস্টদের চিন্তাধারা অনুয়ায়ী সেটি আসলে ছিল সমাজতান্ত্রিক কারখানায় তৈরি চেতনানাশক লাল বটিকা সেবনের ফলে মস্তিষ্কে সৃষ্ট এক ধরনের ’হ্যালুসিনেশন’। অর্থাৎ ’দড়ি দেখে সর্পভ্রম’ হওয়ার মতো অবস্থা। কারণ দুই প্রজন্ম আগে, অর্থাৎ যে সময় শান্তিবাহিনীর তৎপরতা বেশ তুঙ্গে ছিল, সেসময় আমাদের সমাজটি আরও অধিক সমশ্রেণী-বিশিষ্ট ছিল। বলতে গেলে ৯৮% মানুষই ছিলেন প্রোলেতারিয়েত। বরং সমাজতান্ত্রিক আদর্শের সুক্ষাতিসুক্ষ শ্রেণীভেদ যত বেশি আমদানি হয়েছে সমাজে সামন্ততান্ত্রিকতা তত বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি ’ধর্মীয় নবজাগরণ’ বা বৌদ্ধ ধর্ম অনুশীলনের নামে মূলতঃ নানাবিধ কুসংস্কার, কুপমন্ডুকতা ও পরকালভীতিও এখন পাহাড়ি সমাজে জেঁকে বসছে। শোনা যাচ্ছে, এখন পাহাড়ে ধর্ম বিতরণকারী এবং সমাজতন্ত্রের অনেক প্রচারকের মধ্যে বেশ গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান। অর্থাৎ আমরা এখন সমাজতন্ত্র ও ধর্মের আফিম দুটোকেই একসাথে পাচ্ছি ও সেবন করছি। ফলে বদহজমও হচ্ছে আর অন্তর্ঘাতে আমরা প্রাণোচ্ছল অনেক তরুণকে অবলীলায় হারিয়ে ফেলছি। কারণ নকল বা বিষমুক্ত সমাজতন্ত্র ও ধর্ম কোনটাই তো আমরা পাইনি। হৃদয়-মন, চৈতন্যও তো যুগের চাহিদা অনুযায়ী সভ্য, পরিশুদ্ধ হয়নি – যা প্রকৃত সমাজতন্ত্র ও ধর্মের বিশুদ্ধতা বোঝা বা ধারণ করার জন্য একান্ত প্রয়োজন। সমাজতন্ত্রের নামে আমরা একদিকে যেমন হানাহানি করছি, অন্যদিকে তেমনি বৌদ্ধ ধর্মের বৈপ্লবিক সমতার দর্শন, ইহজাগতিক কর্মবাদ, মৈত্রী, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির জন্য তথাগতের উপদেশিত ’মধ্যপথ’ বা সংহতির (লিচ্ছবি জাতিকে দেওয়া উপদেশসমূহ দেখুন) বাণীগুলোকে উপেক্ষা করে পরকালের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, স্বর্গ-নির্বাণ নিয়ে ভ্রান্তিবিলাসে মজে আছি। অর্থাৎ আমরা তথাগত বুদ্ধের অতি উন্নত লৌকিক দর্শনকে উপেক্ষা করে লোকোত্তর বা পারলৌকিক জীবনের মায়াবী অন্ধকারে পথ হাতরে ক্লান্ত হচ্ছি।

’শ্রেণীশত্রু’ সম্পর্কে আমাদের সমাজতান্ত্রিক ধারণাটিকেও আরেকটু যাচাই করে দেখার অবকাশ আছে বলে মনে হয়। বর্তমান পৃথিবীতে সকল প্রান্তিক সমাজ বা সম্প্রদায়েও (যেমন, বাংলাদেশের জেলে, কামার বা তাঁতী সম্প্রদায়) আপাতদৃষ্টিতে অর্থশালী-অর্থহীনের মধ্যে তুলনামূলক তারতম্য বা বৈষম্য চোখে পড়ে। তাহলে সারা বিশ্বে মোটামুটিভাবে যারা স্বচ্ছল তাদের তুলনায় একেবারে রিক্ত এসব সম্প্রদায়েও কি শ্রেণীশত্রুতার সমাজতান্ত্রিক তত্ত্ব প্রয়োগ করতে হবে? যেমন টাকার অঙ্কে পাহাড়ি ’শ্রেণীশত্রু’দের সম্পদের পরিমাণ ঢাকা বা চট্টগ্রামের একজন মাংস বা ফল বিক্রেতার (মানে শহুরে প্রোলেতারিয়েতের) আয়-উপার্জনের সমতুল্য ছিল কিনা তা খতিয়ে দেখার সদিচ্ছাও হয়তো আমাদের কমরেডদের কোনদিন ছিলনা, এখনও নেই। মাত্র পাঁচ/ছয় লাখ জুম্ম জনসংখ্যার মধ্যে এভাবে সমাজতান্ত্রিক দর্শন প্রয়োগ করতে গেলে দেখা যাবে ’ঠগ বাছতে গা উজার’ অবস্থা হয়ে গেছে। রাশিয়া বা চীনের প্রোলেতারিয়েতদের ব্যক্তিগত যে সম্পদ ছিল তার তুলনায় আমাদের সমাজের স্বচ্ছল মানুষেরাও একেবারে নস্যি গণ্য হবেন। সুতরাং সমাজতান্ত্রিক ধারণা সকল সমাজে হুবহু একইভাবে প্রয়োগ করতে গেলে মানুষের প্রতি বড়সড় ভুল বা অবিচারের সম্ভাবনা থেকেই যায়। সেই হিসেবে পাহাড়ের আপামর জনগণ চিরকাল জাতিগত নিপীড়নের পাশাপাশি সমাজতান্ত্রিক শোষণ-উৎপীড়নেরও শিকার হয়েছেন বা হচ্ছেন কিনা, সেটিও নিশ্চয় সর্বোচ্চ উদারতার সাথে বিবেচনা করা দরকার।

ঐতিহাসিকভাবে প্রান্তিক একটি জনগোষ্ঠীর সকলে প্রোলেতারিয়েত হিসেবে গণ্য হওয়ার অধিকার রাখেন। মুষ্টিমেয় কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে পাহাড়ের নিপীড়িত জনগণের মাঝে শ্রেণীশত্রু খুঁজতে যাওয়াটা তাই বিভ্রান্তিকর প্রতীয়মান হতে পারে। সম্পদের, সুযোগের কিছু তারতম্য মানে এই নয় যে তারা সামাজিক সমতা ও সমাজতন্ত্রের পথে বাধা। আমাদের আসল শত্রু হলো রাষ্ট্রীয় শোষণ, নিপীড়ন। না হলে আদিবাসীরা সকলে সমানভাবে স্বচ্ছল, সম্পদশালী হতে পারতেন। সমাজতান্ত্রিক রাশিয়া ও চীনের আজ সেটিই লক্ষ্য। জনগণের জীবন-মানের সর্বোচ্চ উন্নয়ন ঘটাতে হবে। এখন নিজ দেশের জনগণের জন্য আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন উন্নয়নই চাই গোটা সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব। এর কম হলে জনগণ প্রতিযোগিতাপূর্ণ বিশ্বে নিজেদেরকে উন্নত দেশের নাগরিকদের মতো সন্মানিত বোধ করবেনা এবং হীনমন্যতায় ভুগবে। যেমন ভুগছে ল্যাটিন আমেরিকার অনেক দেশের মানুষ। তারা প্রতিনিয়ত ’মুক্তি’র জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হলেও দলে দলে পাড়ি জমাচ্ছে ’সব পেয়েছির দেশ’ আমেরিকায়। সমাজতন্ত্রের স্বর্গোদ্যান কিউবার মানুষও এদের দলে রয়েছে। সুতরাং আমাদের আসল শত্রু শাসকগোষ্ঠীর নিপীড়নকে না চিনে নকল ’শ্রেণীশত্রু’ নির্মূলের পিছনে সময় ব্যয় করলে অবশেষে আম, ছালা দুটোই যাবার প্রবল সম্ভাবনা আছে। আর দারিদ্র্যকে গ্লোরিফাই করার কোন কারণ দেখিনা। আদিবাসীদের সবাইকে সমানভাবে ধনী, সম্পদশালী হতে হবে। মানসম্মত শিক্ষা, চিকিৎসা, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান পেতে হবে। তাই পুরনো সব ধ্যান-ধারণাও পাল্টাতে হবে। নিজের চেয়ে তুলনামূলকভাবে স্বচ্ছল ব্যক্তিটিকে শ্রেণীশত্রু ভাবা যাবেনা। একটু সংবেদনশীল পর্যবেক্ষণে দেখা যাবে, কল্পিত সেই ’শ্রেণীশত্রু’টি তার যাবতীয় ধন-সম্পদ, স্বচ্ছলতা দিয়েও পরিবারের সব সদস্যের জন্য মানসম্মত শিক্ষা, চিকিৎসা ইত্যাদি মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হিমশিম খাচ্ছেন। মানে বাইরে থেকে সজীব, স্বচ্ছল মনে হলেও ভেতরে তার ঘরের ’ইঁদুর উঠছে আর পড়ছে’। সুতরাং চিন্তা-চেতনায় আমাদেরকে আরও উদার, সংবেদনশীল হতে হবে। বর্তমান বাজারের, শিক্ষার, চিকিৎসার ভয়ানক খরচটি অনুধাবন করার মতো ঔদার্য ও সংবেদনশীলতা হৃদয়ে ধারণ করতে হবে। তাই দারিদ্র্যকে, অসহায়ত্বকে আর গ্লোরিফাই না করে বিনা বাক্যব্যয়ে ঘৃণা করুন। সামাজিক ও জাতীয় পুঁজি বৃদ্ধিতে সহায়ক শক্তি হোন। কাউকে সৎভাবে ধনী, সুপ্রতিষ্ঠিত হতে দেখলে উৎসাহিত করুন। কারণ অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও প্রযুক্তির শক্তিই এ যুগে জাতির প্রকৃত মেরুদ-। অর্থনীতি সবল না হলে শিক্ষাকেও খুব বেশি ধারে-কাছে পাওয়া যায়না। নাকচ্যাপ্টা, মোটাবুদ্ধির প্রাণী আমরা অর্থনীতি, প্রযুক্তিকে আজীবন অবহেলা করে এসেছি। অথচ অর্থনীতি, শিক্ষা ও প্রযুক্তির বুনিয়াদকে মজবুত করেই রাশিয়া, ইউরোপ-আমেরিকা, জাপান উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছে আজ বাকি বিশ্বের উপর ছড়ি ঘোরাচ্ছে। একই পথে এখন দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে চীন, ভারত, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ কোরিয়া প্রভৃতি দেশ। চোখের সামনে ঘটতে থাকা এসব উন্নয়ন, শক্তির মেরুকরণ ও ভূ-রাজনীতির বিবর্তন আমাদের চোখ খুলে দিক, হৃদয়কে প্রসারিত করুক। আমাদের বিচারবুদ্ধি ও মননের বন্দিত্ব, অচলায়তন ভেঙে দিক। চিরাচরিত আলস্য, পলায়নস্পৃহা ও সংকীর্ণ অহংবোধের কবল থেকে আমাদের বুদ্ধি-বিবেক-মননশীলতা মুক্ত হোক।

মোট কথা, জাতির অগ্রযাত্রা ও সমৃদ্ধির জন্য সবাইকে আমাদের প্রয়োজন। আমলা, বুদ্ধিজীবী, ব্যবসায়ী, সংস্কৃতিকর্মী, শিক্ষক, চিকিৎসক, কবি, ধর্মগুরু, দার্শনিক, সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ, শ্রমজীবী সবাইকে। সব শ্রেণী-পেশার মানুষকে নিয়ে একটি পরিপূর্ণ জাতি চাই, যেখানে সবাই যার যার নির্ধারিত দায়িত্ব সর্বান্তকরণে পালন করবেন। এখানে আমরা কেউ কারও প্রতিদ্বন্দ্বী বা শত্রু নই। বরং সকলেই একে অপরের পরিপূরক শক্তি। সবার সন্মিলিত বহুমাত্রিক ভূমিকায় একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও মানবিক জাতি সর্বাত্মক বৈচিত্র্য নিয়ে পৃথিবীর আলো বাতাসে স্বাধীনভাবে বিকশিত হবে, অন্য আর দশটি উন্নত জাতির মতো। ভেবে দেখুন, শান্তিচুক্তি মোতাবেক সীমিত আকারে আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসন কিংবা ইউপিডিএফ-এর দাবি অনুযায়ী পূর্ণ স্বায়ত্বশাসন পেলে আমাদের কি কি সামর্থ্য বা সক্ষমতার প্রয়োজন হবে এবং অবশ্যই থাকতে হবে। অন্ততঃ ধারণাগত স্বচ্ছতা ও যুক্তির খাতিরে আমি বিষয়টির অবতারণা করছি। একটি পরিপূর্ণ রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থায় যা যা থাকা প্রয়োজন তার সবগুলোই স্বায়ত্বশাসনের পরিধি অনুযায়ী সীমিত আকারে এখানে থাকবে, সেটিই কাঙ্খিত। সুতরাং এখানে সিভিল সার্ভিস অর্থাৎ বেসামরিক আমলাতন্ত্র যেমন থাকবে, তেমনি আর্মি-পুলিশ-আইন-আদালতও থাকবে। সবার উপরে রাজনীতিবিদেরা তো থাকবেনই। তাহলে শুধুমাত্র শ্রমজীবী, মজদুর শ্রেণী নয়; আমাদের সকলকে প্রয়োজন হবে। আমলা, সৈনিক, পুলিশ, জজ-ব্যারিস্টার, দুনিয়ার মজদুর, রাজনীতিবিদ সবাইকে সাথে নিয়ে আমাদের চলতে হবে। এসব শ্রেণী-পেশার মানুষ তো আর পূর্ণ স্বায়ত্বশাসন পাওয়ার সাথে সাথে হুট করে গজাবেন না। এখন থেকেই ধীরে ধীরে তাদেরকে গজাতে হবে। তাই এসব মানবসম্পদ (হিউম্যান রিসোর্স) ও সক্ষমতা (ক্যাপাবিলিটি) পেতে হলে আমলা বিদ্বেষ, শ্রেণী বিদ্বেষের পুরনো ধারণাগুলোকেও বদলে ফেলতে হবে। এটি মনে করার কোন কারণ নেই যে, সমাজে একমাত্র আমিই বিপ্লবী আর বাকি সব প্রতিবিপ্লবী। আমিই একমাত্র সমাজের মঙ্গল চাই, বাকিরা চায় অমঙ্গল। আমার মতাদর্শই একমাত্র খাঁটি, বাকিদের মতবাদ চকচকে হলেও বিষাক্ত ফর্মালিনযুক্ত। চিন্তার এই রেজিমেন্টেশন সামাজিক অনৈক্য ও ভেদবুদ্ধির সুতিকাগার। মোট কথা একটু উদার, সহনশীল, মানবিক ও পরমতসহিষ্ণু না হলে তো সমাজ বাঁচবেনা। হানাহানি, রেষারেষি ও সন্দেহ বাতিকগ্রস্ততায় আক্রান্ত হবে। কারণ মানুষ হিসেবে আমাদের প্রত্যেকের মতামত, বিশ্বাস বা দর্শন আপেক্ষিক হতে বাধ্য। মনুষ্যলোকে ’অ্যাবসলিউট ট্রুথ’ বা চূড়ান্ত সত্য বলে যে এখনও কিছু নেই!!

পাকিস্তানের তৎকালীন সেনাপ্রধান (পরে রাষ্ট্রপতি, বর্তমানে কাঠগড়ায়) জেনারেল পারভেজ মোশাররফ ১৯৯৯ সালে যখন ভারতের সাথে কারগিল যুদ্ধ বাধিয়ে ফেলেন, তখন নয়াদিল্লীতে বিজেপির বাজপেয়ি সরকার ক্ষমতায়। ঐ সময় ইংল্যা-ের ভারতীয় বংশোদ্ভূত স্বনামধন্য ব্যবসায়ী লর্ড স্বরাজ পাল অটল বিহারী বাজপেয়ির সরকারকে অভয় দিয়ে বলেছিলেন, ’যুদ্ধ চালিয়ে যান, আমি এর সমুদয় খরচ একা বহন করব’। ভারতের জাতীয় পুঁজির এমনই শক্তি যে, শুধুমাত্র একজন ব্যবসায়ী পারমাণবিক শক্তিধর অন্য একটি দেশের সাথে সংঘটিত যুদ্ধের সম্পূর্ণ খরচ একা বহন করতে পারেন! আমাদের ভেবে দেখা দরকার, বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে সম্ভাব্য একটি উন্নত রাষ্ট্রের নাগরিক বা সমাজের সদস্য হিসেবে নিজেদের অর্থনৈতিক শক্তিকে সন্ধিগ্ধ শ্রেণী-চরিত্রের কোন চৌকাঠ পর্যন্ত ঠেকিয়ে রাখা উচিত। তীর-ধনুক বা গাদাবন্দুক কেনার সামর্থ্যরে মধ্যে, নাকি লর্ড (সমাজে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ব্রিটেনের রাণী কর্তৃক প্রদত্ত উপাধি) স্বরাজ পালের মতো অত্যাধুনিক একটি যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা ও সাহস অর্জনের বীরোচিত অভিপ্রায়ে? কিংবা বিষয়টিকে শুধুমাত্র যুদ্ধের মধ্যে সীমায়িত না রেখে এখন ঘুরিয়ে দিন অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসার দিকে। ভেবে দেখুন, ন্যূনতম এসব মৌলিক অধিকার পরিবারের সকল সদস্যের জন্য মানসম্মতভাবে নিশ্চিত করতে এই কলিকালে আপনার কতটুকু সামর্থ্য বা সম্পদ থাকা প্রয়োজন। তারপর ভাবুন, আপনি কেবল সিধু-কানু, বীরসা মুন্ডার মতো বীরদের বীরত্বগাথায় সন্মোহিত থাকবেন কিনা। তীর-ধনুকে বলীয়ান স্থানীয় ’জনগণের শক্তিতে’ আস্থাশীল হয়ে স্বজাতির পৃথিবীময় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শক্তি, সামর্থ্য ও সদিচ্ছাকে সমন্বিত করার কাজটি উপেক্ষা করবেন কিনা। প্রতিবেশি রাষ্ট্র ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় শুভাকাঙ্খী, মানবাধিকার রক্ষায় সোচ্চার প্রভাবক শক্তিগুলোকে আর কতদিন অবহেলা করা হবে? নাকি কেবল ভুখা-নাঙা স্থানীয় ’জনগণের শক্তি’, পাহাড়ের রাজপথে, বনে-বাদারে লড়াকু কিছু পদযাত্রীর মানববন্ধন ও সংঘর্ষ, কিছু স্বপ্নবিলাসী বাম বুদ্ধিজীবী আর শাসক মহলের সহযোগী বর্ণচোরা কিছু এনজিও নেতা ও বুদ্ধিজীবীর কৃপায় আমরা জুম্মদের শোষণমুক্তি বা সমাজ বিপ্লব ঘটাতে পারবো। রাষ্ট্রযন্ত্র তো প্রতিনিয়ত এখন সেভাবে দাবার ঘুটি সাজিয়ে জুম্ম জাতিকে সন্মোহিত রাখার প্রয়াস পাচ্ছে বলে প্রতীয়মান হয়, যা নোয়াম চমস্কির ’নিষ্ক্রিয় ও অনুগত’ তত্ত্বের সপ্রমাণতাকেই প্রতিষ্ঠিত করছে। আসলে আদিবাসী অধিকারের পক্ষে নমনীয়ভাবে সক্রিয় উল্লেখিত সকল উপাদান বা হিতবাদীরা মূলতঃ আমাদেরকে ’নিষ্ক্রিয় ও অনুগত’ রাখতে ভূমিকা পালন করছেন। চমস্কি কথিত ’মত প্রকাশের সীমিত গণ্ডির মধ্যে তীব্র বিতর্ক বা বাক-বিতন্ডায় সংশ্লিষ্টদেরকে জড়িত ও উৎসাহিত করার’ মাধ্যমে। না হলে দেশের এসব প্রগতিশীল বা সুশীলেরা জুম্ম জাতির মানবাধিকার ও স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নিজেদের রাজনৈতিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক দলের ব্যানারে এবং উদ্যোগে রাজপথে কিংবা নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে তীব্র যুদ্ধ বা আন্দোলন সংগঠিত করতেন। তা না করে তাঁরা মূলতঃ আদিবাসীদের নিজেদের প্রতিবাদ সমাবেশ, মানববন্ধন ইত্যাদিতে সৌজন্যমূলক সংহতি জানাতে আসেন। আদিবাসীদের অস্তিত্ব রক্ষায় এখন দেশের বৃহত্তর বাঙালি সমাজের মধ্য থেকে স্বতঃস্ফুর্ত তীব্র গণআন্দোলন দরকার। কারণ এটি শুধু আদিবাসীদের জীবন মরণের প্রশ্ন নয়, বাংলাদেশের মানবাধিকারের রেকর্ড এবং বহির্বিশ্বে বাঙালি জাতির ইতিবাচক মানবিক ভাবমূর্তি বা মর্যাদা রক্ষার লড়াইও বটে। এখন আমাদের প্রয়োজন আরও আন্তরিক, নির্ভেজাল, দ্বিধাহীন ও বিবেকতাড়িত অন্ধ সহযোগী। দেশের চেয়ে বহির্বিশ্বেই তাদের সংখ্যাটি বেশি হওয়া স্বাভাবিক। কারণ বহির্বিশ্বে সংঘটিত ভয়াবহতম যুদ্ধ ও ধ্বংসযজ্ঞগুলোর প্রায় সমান্তরালে মানবাধিকারের তীব্র আন্দোলনও গড়ে উঠেছিল, বহুযুগ আগে। আর আমরা বাংলাদেশে মানবাধিকার শব্দটির অর্থ বুঝতে শুরু করেছি মূলতঃ বাঙালির উপর পাক-বাহিনীর চালানো বর্বর গণহত্যা, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও জাতিগত নিপীড়নের সূত্রে। স্বাধীনতা লাভের দীর্ঘ তিন যুগেরও পরে বাংলাদেশে একটি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু এর ঠুঁটো জগন্নাথতুল্য সীমিত কর্মকান্ড থেকে আসলে প্রকৃত মানবাধিকারের প্রতি এদেশের শাসকগোষ্ঠীর একধরনের অবজ্ঞা ও তাচ্ছিল্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিই প্রকাশ পায়। তাই আমাদের ভাবতে হবে, রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রকাশ্য ও গোপনীয় প্রবল আক্রমণের মুখে দেশের এসব দুর্বল মানবাধিকার সংগঠন বা রক্ষকদেরকে আমরা কিভাবে, কতটুকু ভরসা করবো। এখন প্রয়োজন পৃথিবীময় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা জুম্ম অনুরাগী সহযোগী শক্তিগুলোকে সমন্বিত, ঐকবদ্ধ করার কাজটি এগিয়ে নেওয়া। যদি যুদ্ধে যেতেই হয় তাহলে শিক্ষা-অর্থনীতি-সংস্কৃতি-বাণিজ্যে-বিজ্ঞানে বলীয়ান হয়ে শোষণমুক্তির লক্ষ্যে সর্বাধুনিক একটি যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করা। যদিও এ যুদ্ধ তথাকথিত ’স্বাধীনতা’র বা দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার যুদ্ধ নয়। স্বতন্ত্র জাতিগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয় নিয়ে জন্মভূমির সাথে আরও বেশি সম্পৃক্ত, সমন্বিত হওয়ার যুদ্ধ। তবে যদি বলেন, আগে রাজনৈতিক মুক্তি আসুক, তারপর অন্য সব অধিকার আপনা আপনি চলে আসবে, তাহলে সর্বনাশ। রাজনৈতিক মুক্তিকে ত্বরান্বিত করার জন্যই তো শিক্ষা, অর্থনীতিসহ অন্যান্য সহায়ক শক্তিগুলোর সমর্থন প্রয়োজন। অন্ততঃ এখনও যেটুকু সুযোগ আছে সেটিকে পরিপূর্ণভাবে কাজে লাগানো দরকার – শিক্ষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও বাণিজ্যের উন্নয়নে। যেমন ধরুন, বাংলাদেশে আগামী পাঁচশ’ বছরেও সমাজতন্ত্র কায়েম হবেনা। কিন্তু আগামী দুই তিন দশকের মধ্যে এদেশে আদিবাসীরা সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারেন। সমগ্র বাংলার মেহনতি মানুষের সমাজতান্ত্রিক সমতার জন্য অপেক্ষা করলে একটি জাতি হিসেবে আমরা পৃথিবী থেকেই চিরতরে হারিয়ে যাবো। কারণ শাসক ও শাসিত জাতির লক্ষ্যমাত্রা বা মুক্তি অর্জনের সময়সীমা কখনও একরকম হতে পারেনা। আর সংখ্যার হিসাবটিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। এত কম জনসংখ্যা দিয়ে বিশাল একটি আগ্রাসী জাতির ক্রমবর্ধমান লোভ ও দখলদারিত্ব থেকে কিভাবে, কতদিন নিজেকে রক্ষা করবেন? সুতরাং এই পরিস্থিতিতে স্বজাতির অস্তিত্ব রক্ষা বা সামগ্রিক মুক্তির জন্য কি করণীয়, সে বিষয়ে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিচক্ষণতা ও প্রজ্ঞা একান্তভাবে নিজেদের ভেতর থেকেই উৎপন্ন হতে হবে। দেশের প্রচলিত জাতীয় রাজনীতি, এমনকি বড় বড় সুশীল ও বাম বুদ্ধিজীবীরাও জুম্মদের মুক্তির তরিকা বাতলে দিতে পারবেন না। তাঁরা কেবল আমাদেরকে সাথে নিয়ে নিজেদের দলকে ভারী ও বৈচিত্র্যপূর্ণ করার চেষ্টা করেছেন এবং ভবিষ্যতেও করে যাবেন।

মুক্তি বা উত্তরণ কোন পথে?

পাহাড়ের বা সমতলের আদিবাসীদের বর্তমান দুরবস্থা থেকে মুক্তির বিষয়টি খুব সহজসাধ্য না হলেও একেবারে অসম্ভব কিছু নয়। আপাততঃ একবাক্যে মুক্তির প্রধানতম হাতিয়ারগুলো হলো শিক্ষা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন। কোনটি আগে কোনটি পরে সে কুটতর্ক অনাবশ্যক, অর্থহীন। দু’টোকেই একসাথে চাই। শিক্ষা ও অর্থনৈতিক শক্তিতে বলীয়ান হলে বাকী অধিকারগুলোও ধীরে ধীরে হস্তগত হবে। চাকমা প্রবাদে আছে, কড়ি থাকলে ব্যাঘ্রনয়নও নাকি খরিদ করা সম্ভব। পুরো একটি দেশও অনায়াসে কিনে ফেলা যায়। যেমনটি কিনেছিলেন বিশ্বময় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ইহুদিরা। বর্তমানে প্যালেস্টাইনের নিরীহ জনগণের উপর ইজরায়েলের যে বর্বর আক্রমণ চলছে, তাকে সমর্থন দেওয়ার কোন প্রশ্নই আসেনা। শুধুমাত্র অর্থের শক্তিমত্তার পক্ষে যুক্তি হিসেবে এখানে ইজরায়েলের প্রসঙ্গটি টানছি। ইজরায়েল রাষ্ট্রটিকে প্রতিষ্ঠার জন্য ইহুদিরা প্যালেস্টাইনের স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে একে একে বহু জমি কিনে নিয়েছিলেন। পাশাপাশি অনেক জমিও জবরদখল করেছিলেন, সে নির্লজ্জ্ব আগ্রাসন আজও অব্যাহত আছে। বহু ইহুদির শ্রম ও কড়ি দিয়ে কেনা ভূখ-ে তাদের প্রথম রাষ্ট্রপতি (প্রতিষ্ঠাতা পিতা) ডেভিড বেন গুরিয়ন ১৯৪৮ সালের ১৪ মে ইজরায়েলকে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করেন। অনুরূপভাবে কড়ির জোরে এখন ইচ্ছেমতো ভূমি কিনছেন আরব অঞ্চলের শেখ-সুলতানরা; নিউজিল্যা-ে, অস্ট্রেলিয়ায়, কানাডায়। সুতরাং অর্থনৈতিক শক্তি ও সামর্থ্যকে অবহেলা করার কোন কারণ নেই। আর শিক্ষা তো সময়ের ব্যবধানে সব অসম্ভবকেই সম্ভব করে দেয়। সর্বরোগের মহৌষধ একমাত্র শিক্ষার মধ্যেই পাওয়া সম্ভব। এমনকি মুক্তি, স্বাধীনতাও। হৃদয়ের মুক্তি যেমন, তেমনি রাজনীতি আর অর্থনীতিরও।

সুতরাং খাদের কিনার থেকে মৃতপ্রায় জাতিকে তুলে আনতে চাইলে এবার জুম্ম জাতীয় ঐকের প্রতি নজর দিন। বিবদমান আঞ্চলিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্য গড়ে উঠলে অর্ধেক মুক্তি আপনা আপনি অর্জিত হবে। এই ঐক্যের প্রাথমিক শর্ত হিসেবে আপাততঃ পারষ্পরিক সমালোচনা ও বিষোদগারের পরিসমাপ্তি এবং যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করুন। পাশাপাশি বিবদমান আদর্শের অনুসারীদের মধ্যে সামাজিক মেলামেশা ও পারষ্পরিক সৌজন্য প্রদর্শনকে আগের মতো উৎসাহিত করুন। ’আপোষকামিতা’, ’আপোষহীনতা’ শব্দসম্বলিত কুটতর্ক ও বিতর্কিত বিশ্বাস মন থেকে মুছে ফেলুন। কারণ আমাদের অগ্রগতির স্বার্থে শান্তিচুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন যেমন দরকার, তেমনি প্রয়োজন বৃহত্তর স্বায়ত্বশাসনেরও। একটিকে অন্যটির পরিপূরক হিসেবে গ্রহণ করুন। বিবদমান তিন দলের দাবিনামা ও ইস্তেহারগুলোকে সমন্বিত করে জাতীয় মুক্তির একটি পঞ্চবার্ষিক ও দশমবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজটি যথাশীঘ্র শুরু করুন। শীর্ষ নেতৃবৃন্দ এজন্য মধ্যম সারির নেতা-নেত্রীদেরকে কাজটি এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব অর্পণ করতে পারেন। সুশীল সমাজও এতে শ্রম ও সহযোগিতা দিতে পারে। দেশের মাটিতে না হলেও সুবিধাজনক অন্য একটি দেশে সংহতির এই শুভ সূচনাটি করা যেতে পারে। পাশাপাশি দেশে বিদেশে স্বজাতির ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা শক্তিগুলোকে সমন্বিত, ঐকবদ্ধ করুন। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরাদের একটি বিপুল জনসংখ্যা ও সমর্থকগোষ্ঠী ভারত ও মিয়ানমারে রয়েছে। মিজো, মনিপুরি, গারো, খাসি, হাজং, মু-া প্রভৃতি জাতির বিশাল জনগোষ্ঠীও ভারতে বসবাস করছে। ভারত, মিয়ানমার ছাড়াও ইদানীং চাকমা, মারমা, ত্রিপুরারা ইউরোপ, আমেরিকাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছেন। ঐসব দেশে কমবেশি তাদেরও একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তিবলয় তৈরি হয়েছে এবং হচ্ছে। সেসব শক্তিকে সমন্বিত করুন। তাদেরকে জাতীয় মুক্তির আন্দোলনে সম্পৃক্তকরণের ব্যবস্থা নিন। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিশ্বসম্প্রদায়ের সাথে সক্রিয় সম্পৃক্ততা, সুসম্পর্ক ও অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে সচেষ্ট হোন। জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিসরে জুম্মদের সংস্কৃতি ও ইতিবাচক ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠায় জোর প্রচেষ্টা নিন। কোন ধরনের উস্কানিতে প্ররোচিত না হয়ে পাহাড়ে এবং সমতলে আদিবাসী জাতিগুলোর মধ্যে আন্তঃসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সুসম্পর্ক জোরদারে মনোযোগী হোন। অন্যদিকে বৃহত্তর বাঙালি মানসেও মানবতাবাদের, সম্প্রীতির একটি অন্তঃসলিলা শুভধারা প্রবহমান রয়েছে। না হলে মহান ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও গণতন্ত্রের সংগ্রামগুলো সফল হতোনা। মনীষীরা বলেছেন, ফাঁকি দিয়ে কোন বড় কাজ হয়না। মুক্তি, স্বাধীনতা, অসাম্প্রদায়িকতা, মানবিক সম্প্রীতি ও সহমর্মিতার উজ্জ্বল আলোকশিখা দেশের বৃহৎ নৃগোষ্ঠীর একটি বিরাট অংশের হৃদয়কে প্রজ্জ্বলিত করেছিল বলেই বাংলাদেশ স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ফিরে পেয়েছে। আমাদেরকে বাঙালির সেই শুভচেতনা ও সম্প্রীতিবোধকেও স্পর্শ করতে হবে। তার আত্মশুদ্ধি, শুভমানস ফিরে পাওয়ার নিরন্তর সংগ্রামে সহযোগী হতে হবে। কারণ বাঙালি জাতিও তার সঠিক আত্মপরিচয়, অন্তঃস্থিত জাতীয় আদর্শগুলো খুঁজে পেতে আজও মরিয়া অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে। আমরা এখন জানি, মোটাদাগে পৃথিবী আজ শুভ-অশুভ দুই শক্তিতে বিভক্ত। স্বৈরতন্ত্র-সন্ত্রাসবাদ-মৌলবাদ-সহিংসতার যে কোন দর্শন অবশ্যই অশুভ শক্তি। আর মানবতাবাদ-সাম্য-স্বাধীনতা-অহিংসা-অসাম্প্রদায়িকতার যে কোন দর্শন বা বিশ্বাস শুভশক্তির প্রতিনিধি। বাংলাদেশে অব্যাহত শান্তি, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের জন্য এই শুভশক্তিরই নির্বাধ উদ্বোধন চাই। তাহলে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণও তাদের মানবাধিকার ও মৌলিক অধিকারগুলো ফিরে পেতে কিছুটা আশাবাদী হয়ে উঠতে পারবে।

অন্যদিকে মাঠ পর্যায়ে আঞ্চলিক দলগুলো নিজেদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্য একটি অভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিতে পারে। সেটি হলো পারষ্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে নিজেদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলগুলোতে কৃষি, বনায়ন ও সমন্বিত গ্রামোন্বয়নের ক্ষেত্রে সমবায় ব্যবস্থা চালু করা। গ্রামের অনেক বেকার তরুণ-তরুণী যথাযথ উৎসাহ-অনুপ্রেরণা, সঠিক চিন্তা ও পরিকল্পনার অভাবে অর্থকরি ও উৎপাদনমূলক কর্মকান্ডে না জড়িয়ে হেসেখেলে দিন গুজরান করেন। তাদেরসহ গ্রামের সাধারণ জনগণকে সংগঠিত করে সমবায় পদ্ধতিতে কৃষিকাজ, বনায়ন, আম-লিচু-কাঁঠাল-কলাসহ স্থানীয় নানাবিধ ফলের বাগান সৃষ্টি, মৎস্য, পোল্ট্রি ও গবাদি পশুর চাষ, ঔষধি বৃক্ষ ও ঔষধি ফলের বাগান ইত্যাদি গড়ে তোলার ব্যাপক কর্মযজ্ঞে হাত দেওয়া যেতে পারে। পাহাড়ি ছড়া, ঝিরি-ঝরণা বা নদের উপত্যাকায় কোন ভূমি, বন বিরান পড়ে থাকলে সেগুলো দখলে নিয়ে তাতে প্রকৃতিবান্ধব চাষাবাদ চালু করা যেতে পারে। ………. এতে করে জনগণ যেমন সচেতন ও সংগঠিত হবে, তেমনি গ্রামীণ অর্থনীতিও মজবুত হবে। এসব কর্মকান্ড ধীরে ধীরে ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত নিরসনেও কার্যকর ভূমিকা রাখবে। সমবায়ের আদর্শে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করে নিজেদের নিয়ন্ত্রিত এলাকার গ্রামগুলোকে এক একটি ’মডেল ভিলেজ’রূপে গড়ে তোলার মাধ্যমে গ্রামজীবনে আমূল সামাজিক রূপান্তর সাধন করা যেতে পারে। পাশাপাশি জুম্মদের জাতীয় মুক্তি ত্বরান্বিত করতে হলে তরুণ সমাজকে অবশ্যই তথ্যপ্রযুক্তিসহ নানা কারিগরী ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তিজ্ঞানে সমৃদ্ধ হতে হবে। ব্যাপক কারিগরী ও বৈজ্ঞানিক দক্ষতা অর্জন করতে হবে। শুধুমাত্র রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ না থেকে জীবনের ও জ্ঞানকা-ের নানা ক্ষেত্রে বিকশিত হতে হবে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে ও মাধ্যমে সৃজনশীলতার স্বাক্ষর রাখতে হবে। তাহলেই আমরা সৃজনশীল ও মেধাবী একটি জাতি হিসেবে বিশ্বসভায় শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত হতে পারবো। শুধুমাত্র পার্বত্য জনপদে পারষ্পরিক হানাহানি কিংবা বৃহৎ নৃগোষ্ঠীর কিছু ’সুশীল’ এর প্ররোচনায় শহর নগরের রাজপথে কিছু শ্লোগান, মানববন্ধন, সভা-সেমিনার করে জুম্মদের মুক্তি আসবেনা। এর জন্য প্রয়োজন হবে বহুমাত্রিক, সৃজনশীল ও সমন্বিত কর্মতৎপরতা এবং বিশ্বসমাজের অকুন্ঠ সমর্থন। কারণ আমরা আজ বাস করছি বিশ্বায়নের যুগে। সমাজতান্ত্রিক আদর্শের বাস্তবানুগ পুনর্জন্মের যুগেও। সংস্কৃতির স্বতঃস্ফুর্ততা ও মানবমনের স্বাধীনতায় নিয়ন্ত্রণ আরোপ এবং উদ্দেশ্য সাধনে সহিংসতার প্রয়োগকে সমাজতন্ত্রের দর্শন থেকে এখন সম্পূর্ণরূপে ছেঁটে ফেলতে হবে। চিরন্তন মানবতাবাদ, অহিংসা, মানবাধিকার, সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতা, ধর্মনিরপেক্ষতা, স্বপ্ন ও মননের বহুমাত্রিকতা, বিশ্বজনীনতা, উদারনৈতিক গণতন্ত্র ও শান্তির আদর্শে পৃথিবীর জনমুখী সব রাজনৈতিক দর্শনের পুনর্গঠন এখন সময়ের দাবি। না হলে এই পৃথিবীতে হানাহানি, রক্তপাতের অবসান কখনও ঘটবেনা। উপরোক্ত মানবিক আদর্শের আলোকে এখনই আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি, চিন্তাধারা ও রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব হলে অদূর ভবিষ্যতে জুম্ম জাতির জন্য স্বশাসন বা মুক্তি অবশ্যই মিলবে।

নোটঃ বিজয় থেকে ইউনিকোডে কনভার্ট করায় কিছু বানানে ভূল থাকতে পারে।

About the author

জুম্মো ব্লগার

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/2926

1 comment

1 ping

  1. Asish Kumar Das

    It was a very good writing but unfortunately people need to be smart enough to understand the essence otherwise it would just fall on the deaf ears …

  2. Chaakaa.com-চাকা

    thanks for detail

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>