«

»

এই লেখাটি 1,072 বার পড়া হয়েছে

Print this প্রকাশনা

ত্রিখণ্ডিত জুম্ম স্বাধিকার আন্দোলন: মুক্তি কোন পথে?

শত্রুতার দ্বারা শত্রুতার উপশম হয়না, মিত্রতার দ্বারাই শত্রুতার উপশম হয়, এটিই চিরকালীন ধর্ম। – মহামানব গৌতম বুদ্ধ

পটভূমিকা

পার্বত্য চট্টগ্রাম এখন আর আগের মতো ’ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড়’ নেই। সেখানে বহুকাল ধরে বৃহৎ নৃ-গোষ্ঠী বাঙালির জাতিগত আগ্রাসন চলছে। ঐ পরিবেশ দেশের অধিকাংশ বাঙালির জন্য স্বস্তির, সমৃদ্ধির, আনন্দের। কিন্তু পাহাড়ি আদিবাসীদের কাছে চিরস্থায়ী দারিদ্র্যের, উদ্বেগ আর আতঙ্কের। যদিও একসময় প্রকৃতির মতো স্বতঃস্ফুর্ত মধুর জীবন তাদেরই ছিল। পুরনো সেই সুদিন আজ সোনালী অতীত। বোকা পাহাড়িরা তবুও বৈসাবির দিনে, পূর্ণিমা তিথী বা রাজপূণ্যাহ্ দিনে আনন্দ উৎসবে মাতে। নেতৃত্ব কিংবা আদর্শের আতিশয্যে বিভ্রান্ত হয়ে পরষ্পরকে আক্রমণ করে।

আদর্শের নামে স্বজাতি-স্বজনের প্রাণও কেড়ে নেয়। ঠিক যেমন বুদ্ধের বিপ্রতীপে জ্ঞাতিভাই ও ছায়াশত্রু দেবদত্ত তীরবিদ্ধ করেছিলেন মুক্ত বিহঙ্গটিকে। মানে মানুষের স্বাধিকার তথা মুক্তির চেতনাকে। সিদ্ধার্থ গৌতম আহত পাখিটিকে পরম মমতায় সেবা-শুশ্রূষা দিয়ে সুস্থ করে তুলে অবশেষে মুক্ত আকাশে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর সুকঠিন মানবিক সিদ্ধান্তে হংস বলাকাটি আবারও তার মুক্ত জীবন ফিরে পেয়েছিল, যা এক অর্থে নতুন জীবনও। একাজ করতে গিয়ে তিনি দেবদত্তের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করেছিলেন। বলেছিলেন, জীবন যে কেড়ে নেয় সে নয়, বরং জীবন যে ফিরিয়ে দেয় সেই প্রকৃত বিজয়ী। ইতিহাসে তিনিই পূজনীয় বীর। অথচ পাহাড় সমতল নির্বিশেষে সারা দেশে আমরা বাংলাদেশিরা প্রতিনিয়ত কারও না কারও জীবন কেড়ে নিচ্ছি। আমাদের সমাজে সেই সিদ্ধার্থ-হৃদয় সংবেদনশীল মহৎ প্রাণের বড়ো আকাল। অনগ্রসর, অসচেতন জুম্ম সমাজে দেবদত্তদের ভূমিকাই বরং আনন্দে-উল্লাসে-সহিংসতায় প্রবলভাবে দৃশ্যমান ও গ্রাহ্য হয়। খাদ্য কিংবা অন্যতর প্ররোচনায় যেমনভাবে আনন্দ ও হিংস্রতার প্রকাশ ঘটিয়ে থাকে চিড়িয়াখানায় বন্দী সিংহ কিংবা ওরাং ওটাংরা। বিশেষ দাবি পূরণ অথবা অগ্রাহ্য হলে জেলখানার কয়েদিরা। নিজেদের মধ্যে অন্তর্কলহে এসব প্রাণীও জখম হয়, মর্যাদা রক্ষার কদর্য লড়াইয়ে কখনওবা জীবনেরও অপমৃত্যু ঘটায়। কিন্তু তারা যে লোহার বিরাট খাঁচায় পরাধীনতার শিকলে বন্দী হয়ে আছে, সে চেতনা বা অনুভূতি তাদের থাকেনা।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, পাহাড়ি আদিবাসীদেরও সে অনুভূতি ও সংবেদনশীলতা যেন হারিয়ে গেছে। তারা এখন পার্বত্য চট্টগ্রাম নামক সামরিকায়িত বিরাট খাঁচায় বন্দী হয়ে উল্লাসে-বেদনায়, হতাশা-হানাহানি ও নৈতিক অধঃপতনে বিভ্রান্তিকর এক জীবন যাপন করছে। ক্ষীণ চোখের, ক্ষীণ মনের দৃষ্টি আরও ক্ষীণতর হয়েছে। জুম্মদের বৃহত্তর জাতীয় সংহতির বদলে গোঝা-গোষ্ঠী-অঞ্চল বা দলপ্রীতি তাদের মনে প্রবলভাবে দানা বাঁধছে। (যেমনটি বাঙালি সমাজেও দেখা যায়, বাঙালিদের জেলাকেন্দ্রিক আত্মীয়তাবোধ কিংবা অঞ্চলভিত্তিক উপজাতীয় সংহতির প্রাবল্য অনেকটা জুম্মদের গোঝা-গোষ্ঠীপ্রীতির মতোই)। পাহাড়ি সমাজে এখন দেখা যায়, সব ক্ষেত্রে মাথার আগে দেহটি এগিয়ে যাচ্ছে। ধীশক্তি ও মেধা পরাজিত হচ্ছে গোঁয়ার্তুমি, দুর্নীতি ও প্রতিহিংসা প্রবণতার কাছে। বাঙালি সমাজ ও রাজনীতির অনুকরণে পাহাড়ি সমাজেও অনৈক্য, আত্মীয়তাবাদ, পরিবারতন্ত্র এবং পরশ্রীকাতরতা দিন দিন ব্যাপক আকার ধারণ করছে। না হলে লড়াকু জুম্ম জাতির নেতৃবৃন্দ আজকের আত্মঘাতি আদর্শে অনুপ্রাণিত হতেন না। বিভ্রান্তিকর এই আদর্শের নামে স্বজাতির শত শত তগবগে তরুণের জীবন কেড়ে নিতেন না। ঐতিহাসিকভাবে বিপন্ন, দরিদ্র কিংবা উদীয়মান জুম্মদের কাছ থেকে চাঁদাবাজি করে তাদেরকে হতোদ্যম এবং অধিকতর বিপন্ন করতেন না। অর্থনৈতিক মেরুদন্ড ভেঙে দিয়ে তাদের সন্তানদের শিক্ষা এবং উন্নয়নের স্বপ্ন ও সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করতেন না।

পার্বত্য চুক্তির পূর্বাপর: আজও রক্তাক্ত, অশান্ত পাহাড়ি জনপদ

বলাবাহুল্য, আদিবাসী জুম্মদের আগেকার প্রকৃতিলীন প্রশান্ত জীবন ও জনপদ অনেক ভাল ছিল। বয়স্করা আজও পুরনো সুদিনের কথা স্মরণ করে স্মৃতিভারাক্রান্ত হন। আদিবাসীদের গানে, কবিতায়ও সেই সমৃদ্ধ অতীত আর সুখস্মৃতির বিধুরতা আছে। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলেও প্রথাগত শাসন ব্যবস্থাসহ বেশ একটা স্বাধীন জীবন আদিবাসীদের ছিল। অর্থাৎ মাত্র পঁয়তাল্লিশ-পঞ্চাশ বছর আগেও তাদের সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ছিল কার্যতঃ স্বাধীন ও বাইরের নিয়ন্ত্রণমুক্ত। প্রকৃতির সান্নিধ্যে একটি সরল জীবনধারা ও জনপদ স্বতঃস্ফুর্ত স্বকীয়তায় বিকশিত হচ্ছিল। বাংলাদেশের জন্মের পর আদিবাসীদের উপর জাতিগত শোষণ-নিপীড়ন তীব্রতর হয়েছে। সেই সাথে সমতলের শাসক সমাজের নানা নেতিবাচক মূল্যবোধ, দুর্নীতি, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তপনা প্রকৃতিলীন জুম্ম সমাজকেও ধীরে ধীরে কলুষিত করেছে। দেশের মাত্র এক দশমাংশ অঞ্চল হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে এখন রাষ্ট্রের মোট সেনাশক্তির এক-তৃতীয়াংশ মোতায়েন রয়েছে। এই ডেপ্লয়মেন্ট সেখানকার আদিবাসীদের স্বার্থে নিশ্চয়ই নয়। ১৯৪১ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের মোট জনসংখ্যার ৯৭.৫% ছিল আদিবাসী পাহাড়ি। বাঙালি জনসংখ্যা ছিল মাত্র ২.৫%। পরে দেশ স্বাধীন হলে সমতলের জেলাগুলো থেকে হতদরিদ্র লোকজনকে নিয়ে এসে পাহাড়ে বাঙালির জনসংখ্যা সুপারসনিক গতিতে বাড়ানো হয়। বাংলাদেশ সরকার আদিবাসীদেরকে নিজ ভূমিতে সংখ্যালঘু করার পরিকল্পনা হাতে নেয়। বর্তমানে বাঙালিরা পাহাড়ের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫৫% (পঞ্চান্ন শতাংশ)। অনেকের অনুমান প্রকৃত সংখ্যাটি হবে ৬০% বা তারও বেশি। ভেবে দেখুন, ২.৫% থেকে বেড়ে এখন তাদের জনসংখ্যা ৬০%। মাত্র সাত দশকের ব্যবধানে জনমিতির এই দৃষ্টিকটু উল্লম্ফন একমাত্র বাংলাদেশেই হয়তো সম্ভব। স্বাধীনতার পর গত তেতাল্লিশ বছরে সারা দেশে জনসংখ্যা দ্বিগুণের অধিক বেড়েছে। এটি একটি ভীমরতিদুষ্ট জনবিস্ফোরণ তো বটে। অর্থাৎ সাত কোটি মানুষ এখন হয়েছে ষোল কোটি। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামে এসময়ে বাঙালির জনসংখ্যা দ্বিগুণ নয়, বেড়েছে প্রায় পাঁচ গুণ। আর ব্রিটিশ আমল থেকে ধরলে সাতটিমাত্র দশকে পাহাড়ে তাদের জনসমষ্টি প্রায় চব্বিশ গুণ বেড়েছে। বিপরীতে আদিবাসীরা সেভাবে বাড়েনি। বরং তাদের জন্মহার ও মৃত্যুহার এখন প্রায় কাছাকাছি। জনসংখ্যা ও সম্পদের দিক থেকে এক সময়ের মেজরিটি পাহাড়ি এখন নিরীহ মাইনরিটি। সরকারি পরিভাষায় তারা আজ ’ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’, আরও খারাপ অর্থে ’উপজাতি’। মানে কোন একটি জাতির বাই-প্রোডাক্ট। অতি বর্বর ও বিদ্বেষপূর্ণ মানুষকে হেয়, অসন্মানিত করার এই মানসভঙ্গি। দেশের আদিবাসীদেরকে একদিকে দ্রুত সংখ্যালঘু করে ফেলা হচ্ছে, অন্যদিকে সরকার আপন ইচ্ছেমতো তাদের আত্মপরিচয় নির্ধারণ করে দিচ্ছে। পাহাড়ের ও সমতলের আদিবাসীদের উপর বাঙালির জাতিগত আগ্রাসনের এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কী হতে পারে?

এখন পার্বত্য চট্টগ্রামের ত্রিসীমানায় ঢোকার পর বাসে, ট্রাকে, নৌকায়, রাস্তায়, দোকানে, মাঠে-ময়দানে এমনকি গহীন অরণ্য পর্যন্ত সবখানে বাঙালি সেটেলারদেরকেই বেশি দেখা যায়। প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা জনাব গওহর রিজভীও নাকি একবার রাঙ্গামাটি সফরকালে সর্বত্র বাঙালির আধিক্য আর পাহাড়ি মানুষের নগণ্য উপস্থিতি দেখে বেশ বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন। সমতলের জেলাগুলো থেকে প্রায় প্রতিদিন কোন না কোন বাঙালি পাহাড়ে এসে এখনও বসতি গড়ছে। বলার অপেক্ষা রাখেনা, বসতি স্থাপনকারীদের প্রায় সকলে মুসলিম বাঙালি। একসময়ের স্বাধীন পাহাড়িদের অস্তিত্ব এখন কিছু দুর্গম পার্বত্য এলাকায়, জেলা বা উপজেলা শহরের আশেপাশে এবং নদী-পাহাড়ের সংযোগ উপত্যকার কয়েকটি গ্রামে সীমাবদ্ধ। সংখ্যাধিক্য ও প্রশাসনিক ক্ষমতার জোরে বাঙালির এই উপচে পড়া বিশাল জনগোষ্ঠী বৈধ-অবৈধ নানা উপায়ে পাহাড়ের রূপ-যৌবন-সম্পদ সবকিছুকে দখলে নেওয়ার প্রতিযোগিতায় নামবে এতে আর আশ্চর্য কি? প্রকৃতিখেকো এসব মানুষ সারাদেশে তা-ই তো করে চলেছে। আর প্রকৃতিবান্ধব হয়েও আজীবন বৈষয়িকভাবে অসচেতন ও স্বাধীনচেতা পাহাড়িরা আধুনিক নানা আইন ও কালাকানুনের প্যাঁচে সবকিছু হারিয়ে দিন দিন আরও প্রান্তিক অবস্থানে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে তরুণ লেখক-গবেষক রওনক জাহান সম্প্রীতির একটি নিবন্ধের কয়েকটি লাইন এখানে উদ্ধৃত করছি। তিনি লিখছেন, ’যদি বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইনের অধীনে তিন পার্বত্য জেলায় কার্যক্রম পরিচালনা করা হতো, তাহলে পরবর্তী সময়ে আদিবাসীদের ভূমির ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠা সহজ হতো এবং রাষ্ট্রীয় মদতে তাদের ভূসম্পত্তি যুগ যুগ ধরে নির্বিবাদে কেড়ে নেয়া সম্ভব হতোনা। ১৯৭৯ সালে তৎকালীন সরকার পরিকল্পিতভাবে বাঙালিদের পার্বত্য অঞ্চলে সেটেলমেন্ট দিতে শুরু করে। ৩০ হাজার বাঙালি পরিবারকে প্রাথমিকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামে পুনর্বাসনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয় এবং এজন্য ৬৫ কোটি টাকা বরাদ্ধ দেয়া হয়। এই ৩০ হাজার বাঙালি পরিবারকে পুনর্বাসনের পর থেকেই মূলত পাহাড়ি-বাঙালি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট হওয়া শুরু হয়। সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ মদতে সেখানে শুরু হয় হত্যা, ধর্ষণ ও লুন্ঠন। আঞ্চলিক নিরাপত্তার নামে সেখানে বিপুল সংখ্যক সেনা ক্যাম্প (মোট সেনাবাহিনীর তিন ভাগের এক অংশ) নির্মাণ করা হয়, যা মূলত আদিবাসীদের দমনপীড়ন ও সরকারের ভূমিগ্রাসের নীল নকশা বাস্তবায়নে ভূমিকা রেখেছে এবং এখনো তা-ই করে যাচ্ছে। সেনা নিয়ন্ত্রিত কিংবা তথাকথিত গণতান্ত্রিক যে সরকারই আসুক না কেন, আদিবাসীদের নিধন কিংবা তাদের সম্পদ গ্রাস করার ক্ষেত্রে তাদের চরিত্র আলাদা করা সম্পূর্ণ অসম্ভব। এক্ষেত্রে রাষ্ট্র পরিচালনাকারীরা সবসময় একই রকম আচরণ করেছেন ও করছেন’ (তথ্যসূত্র: ’সাতকাহন’, একটি অনলাইন পত্রিকা, প্রকাশকাল: ২৫ জুন ২০১৪)।

মানবতাবাদী এই লেখিকা সম্ভবত একজন তরুণ আইনবিদ এবং সরল সত্যানুসন্ধানী। বিদেশী দাতাদের দেওয়া প্রকল্প ও অর্থের সাইজ অনুসারে উথলে ওঠা আদিবাসী-প্রেমের ধারক কিছু এনজিও কিংবা প্রায়শঃ একচোখা বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের দলভুক্ত নন তিনি। আসলে তাঁর মতো সংস্কারমুক্ত মনের নবীন বাঙালিরাই আগামীর বহু জাতি-ভাষা-ধর্ম-সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ আধুনিক বাংলাদেশের শ্রদ্ধেয় রূপকার। তিনি আদিবাসীদের উপর যুগ যুগ ধরে জারি থাকা রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন সম্পর্কে শতভাগ সত্য কথাটি বলেছেন। আরও সত্য হলো, এভাবে চলতে থাকলে আগামী দেড়, দুই দশকে পাহাড়ি-বাঙালির জন-অনুপাত হবে ১০:৯০। সে আলামত এখনই দৃশ্যমান। জাতিগত আগ্রাসনের এই প্রক্রিয়াতে ছোট ছোট জাতিগুলোকে পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত করা হয়েছে এবং হচ্ছে। পাহাড়িদের বর্তমান খাঁচাবন্দী নিষ্পেষিত অবস্থাটিই তো আসলে ’নিজ দেশে পরবাসী’ হওয়া, দেহে-মনে উচ্ছেদিত, ছিন্নমূল হওয়া। এককথায় ’দেশহীন মানুষ’ হয়ে পড়া। ভূমি, সংস্কৃতি হারিয়ে বৃহৎ নৃগোষ্ঠীর দেহে-মনে বিলীন হয়ে যাওয়া। এভাবে রাষ্ট্রের বহুমাত্রিক শোষণে, ষড়যন্ত্রে আদিবাসীরা প্রতিনিয়ত বিলীন হচ্ছেন। তবে আমাদের পূর্বপুরুষদের সকলে কিন্তু ভুল করেননি। জাতিগত আগ্রাসনের এহেন পটভূমিতে তাঁরা পাহাড়ে সশস্ত্র সংগ্রামের সূচনা করতে পেরেছিলেন। নিপীড়ন নিষ্পেষণ থাকলে প্রতিরোধও এর স্বাভাবিক পরিণতি। প্রকৃতির এই সরল নিয়মে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের অন্তরেও তাই দ্রোহের, প্রতিরোধের আগুন প্রজ্জ্বলিত হয়েছিল। পরে বহুধাবিভক্ত হলেও তাদের সত্ত্বার গভীরে সে আগুন এখনও জ্বলছে। আসলে তাদের প্রকৃতিদত্ত সারল্য ক্রমাগত নিষ্পেষণে বিস্ফোরিত হয়ে এদেশে জাতি-ধর্ম-ভাষা-সংস্কৃতি নিরপেক্ষ ন্যায্যতা ও মানবিক সমতা প্রতিষ্ঠার জন্য শাসকগোষ্ঠীর জাত্যাভিমানী তন্দ্রাকে ভাঙাতে চেয়েছিল। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বরের পার্বত্য চুক্তিটি এর একটি ’আপেক্ষিক’ পরিণতি। তবে চুক্তির দু’টি পক্ষ বাংলাদেশ সরকার এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে বৈরিতা আজও চলছে। চুক্তির পরেও তারা যেন পরষ্পরের শত্রুপক্ষ। কারণ চুক্তির মৌলিক ধারাগুলো সরকার বাস্তবায়ন করছেনা। বাঙালি ও পাহাড়িদের একটি বড় অংশের চুক্তি বিরোধিতাকে অজুহাত হিসেবে দেখানো হচ্ছে। অথচ দীর্ঘ আড়াই দশকের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে পার্বত্য সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান এবং পাহাড়ি আদিবাসীদের জন্য আঞ্চলিক স্ব-শাসন নিশ্চিত করা ছিল চুক্তি সম্পাদনের লক্ষ্য। শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মনে করে সাধারণ মানুষও এটিকে ’শান্তিচুক্তি’ হিসেবে গ্রহণ করেছিল। এখন দেখা যাক, এই শান্তিচুক্তি পাহাড়বাসীর জন্যে কী ধরনের শান্তি বয়ে নিয়ে এসেছে!

চুক্তির আগে সেনাবাহিনীর সাথে সম্মুখ যুদ্ধে যেসব জুম্ম দেশপ্রেমিক বা গেরিলা যোদ্ধা মৃত্যুবরণ করেছেন তাদের সংখ্যা অঙ্গুলিমেয়। তবে পুনর্বাসিত সেটেলার বাঙালি ও সেনাবাহিনীর আক্রমণে নিহত সাধারণ পাহাড়িদের সংখ্যা নিঃসন্দেহে হাজারে হাজার। ধর্ষণসহ যৌন সহিংসতার শিকার হওয়া জুম্ম নারীর সংখ্যাও কয়েক হাজার। ভিটেমাটি, জীবিকা এবং অন্যান্য সহায়-সম্বল হারানো ক্ষতিগ্রস্ত পাহাড়ি মানুষের সংখ্যা কয়েক লক্ষ। কল্পনা চাকমার মতো নিবেদিতপ্রাণ সংগঠক, বিপ্লবী যোদ্ধাকেও সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা অপহরণ করেছে। অপহরণের পর দীর্ঘ আঠার বছর পেরিয়ে গেলেও জুম্ম স্বাধিকার চেতনার বহ্নিশিখা এই বিপ্লবী নেত্রীর হদিশ আজও মেলেনি। তাঁর পরিবারের সাক্ষ্য অনুযায়ী, লেফটেন্যান্ট ফেরদৌস-এর নেতৃত্বে ১৯৯৬ সালের ১১ জুলাই গভীর রাতে একদল সেনাসদস্য তাঁকে অপহরণ করে। পাহাড়িদের জীবনের এতসব ক্ষয়ক্ষতি, ধর্ষণ, অপহরণ ও হত্যাকান্ডের একটিরও বিচার হয়নি। হত্যাকারী, ধর্ষক, অপহরণকারী ও এসবের পরিকল্পনাকারীরা এযাবৎ দায়মুক্তি পেয়ে এসেছে। চাকুরিতে প্রমোশনসহ অন্যান্য সরকারি সমর্থন ও সুবিধা পেয়েছে। এতসব অপরাধ সংঘটনের পরেও এরা বৃহত্তর বাঙালি সমাজে, রাজনীতিতে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং হচ্ছে। অনেকে আদ্যপান্ত সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী হওয়া সত্ত্বেও রাতারাতি বাঙালি সমাজের বৃহৎ বুদ্ধিজীবী বা পার্বত্য চট্টগ্রাম বিশেষজ্ঞ বনে গেছেন। এর পেছনে এক বা একাধিক কারণ থাকতে পারে। হয় দেশের সাধারণ বাঙালি সমাজ জানেনা, যে পাহাড়িদের উপর যুগ যুগ ধরে এমন অমানবিক উৎপীড়ন, অনাচার চালানো হচ্ছে। অথবা সবকিছু জেনেও এই অত্যাচার-নিপীড়নকে তারা সমর্থন করে যাচ্ছেন ধর্মীয় ও জাতিগত বিদ্বেষের কারণে। অথবা দু’টি কারণই সমানভাবে দায়ী। একসময় যেমনটি ঘটেছিল জগতের অন্যতম শান্তিবাদী রাষ্ট্রনায়ক নেলসন ম্যান্ডেলার দক্ষিণ আফ্রিকায়। পার্বত্য চুক্তির সূত্রে সংঘটিত আপাতঃমসৃণ কিছু পরিবর্তন এবং বাঙালি সেটেলারদের একপেশে প্রোপাগান্ডায় বিভ্রান্ত হলে পাহাড়ের প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝা যাবেনা। ’শান্তিচুক্তি’র পরে পার্বত্য অঞ্চলে সেনা এবং শান্তিবাহিনীর মধ্যে সম্মুখ যুদ্ধের পরিস্থিতি এখন আগের মতো না থাকলেও রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রত্যক্ষ অপ্রত্যক্ষ সমর্থনে বাঙালি সেটেলারদের দ্বারা পাহাড়ি ভূমি-বসতি জবরদখলের প্রক্রিয়া যথারীতি চালু আছে। যুগ যুগ ধরে যেমন চলে আসছে ইজরাইলের আগ্রাসী জায়নবাদী ইহুদি শাসকদের দ্বারা, বর্তমান প্যালেস্টাইনে। অনুরূপভাবে জুম্ম নারীদের ওপর যৌন নিপীড়ন এবং সহিংসতাও দিন দিন বাড়ছে। সাধারণ পাহাড়িদের উপর নির্দিষ্ট বিরতিতে সশস্ত্র বাহিনীর হামলা-মামলা-নির্যাতন-হয়রানি পূর্ববৎ চলছে। অতি সুক্ষভাবে বৃহৎ নৃ-গোষ্ঠী বাঙালির সাংস্কৃতিক একাধিপত্য ও ভাবাধিপত্য প্রতিষ্ঠার কাজটিও জারি আছে। আদিবাসীদের পবিত্র মন্দির, মূর্তি, সংস্কৃতিকেন্দ্র, গীর্জা, সমাধিক্ষেত্র, আত্মপরিচয় প্রভৃতি নানাভাবে আক্রান্ত, লাঞ্চিত হচ্ছে।

তবে এত কিছুর পরেও পার্বত্য চুক্তি পরবর্তী সময়ে জুম্ম জনগণ সবচেয়ে ভয়াবহ যে চক্রান্তের জালে এখন আটকা পড়েছে, সেটি হলো নিজেদের মধ্যে ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত। এই সংঘাতের উন্মাদনায় তাদের মনন-মানস-চেতনা আজ দিগভ্রান্ত, সন্মোহনগ্রস্ত। তারা বুঝেও বুঝতে পারছেনা সংঘাতটি নীলনকশা অনুযায়ী অতি সুক্ষভাবে রাষ্ট্রযন্ত্রের রোপন করা একটি রাক্ষুসে ’রক্তবীজ’, যা ভেতরে ভেতরে পুরো জুম্ম সমাজদেহে বিষক্রিয়া ঘটাচ্ছে। আমাদের সামন্ততান্ত্রিক চেতনাদুষ্ট গোত্রীয় অহংবোধ, সাধারণ জনগণের বোকামি ও অর্ধপক্ক চৈতন্য (যা আসলে গোঁয়ার্তুমি, আত্মীয়প্রীতি আর অল্পবিদ্যার সমষ্টি) এবং পাহাড়ের ত্রিসীমাবদ্ধ প্রবল দেশপ্রেম বা জুম্মপ্রেমের গুপ্ত চেতনাকে উস্কে দিয়ে অতি সুকৌশলে এ সংঘাত বাধানো হয়েছে। এর পরিকল্পনাকারী ও গবেষকরা ঠিকই জানেন কোন সুইচটি কখন টিপলে বিভক্তির চোরাবালিতে আটকে পড়া জুম্ম জাতীয়তাবাদী চেতনার আলো জ্বলবে, নিভবে কিংবা বাল্বসুদ্ধ বিস্ফোরিত হয়ে এর চেতনাধারীদেরকে আত্মঘাতি ’অজাতশত্রু’তে পরিণত করবে। বোদ্ধা পাঠকের নিশ্চয় মনে আছে, ষাটের দশকে শান্তিবাহিনীর প্রবল আক্রমণ সত্ত্বেও সরকারি গবেষকেরা জুম্মদের স্বাধিকার আন্দোলনকে সেসময় ’স্কুলমাস্টারদের আন্দোলন’ নামে অভিহিত করেছিলেন। এর সত্যাসত্য বা যাথার্থ্য নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু যে কোন বেসরকারি গবেষকের মনে প্রশ্নটা জাগা স্বাভাবিক যে, পৃথিবীর দ্রুত পরিবর্তনশীল ভূ-রাজনীতি এবং বিশ্বায়নকালের বহুমুখী জুম্ম স্বার্থকে এই আন্দোলন একত্রে ধারণ করতে পারেনি বলেই কি সেটি আজ ভ্রাতৃঘাতি সংঘাতে রূপ নিয়েছে? দেখা যাচ্ছে, রাজনীতিকদের যুগ যুগ ধরে লালিত ধ্রুপদী আদর্শের সুক্ষাতিসুক্ষ কুটতর্ক আজ স্বার্থের, অহংকারের, প্রতিহিংসার অব্যর্থ বুলেট হয়ে জুম্ম জাতির দেহ-মনকে প্রতিনিয়ত বিদীর্ণ করছে। এখন পাহাড়িদের অবস্থা রামায়ন-মহাভারত যুগের সেই তমসাচ্ছন্ন মৌষল পর্বের সাথে তুলনীয়। মহাভারতের সেই মৌষল কালে সত্যকে সত্য বলে চেনার, জানার উপায় ছিলনা। জগতের সককিছুই হয়ে পড়েছিল বিভ্রান্তিকর, মায়া ও প্রহেলিকাময়। রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাসও পৃথিবীর আনাচে কানাচে অস্তিমান এরূপ শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি ও বিপন্নতাকেই একদিন নিজের সহজাত অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে নির্ভুলভাবে প্রত্যক্ষ করেছিলেন। জুম্মদের ভ্রাতৃঘাতি পরিস্থিতির সাথে কী গভীর মিল কবির এই অন্তর্দৃষ্টিজাত সরল উপলব্ধির! আমাদের মতো আত্মঘাতি জাতি বা প্রাণীদেরকে উদ্দেশ্য করেই হয়তো তিনি নীচের বিখ্যাত কবিতাটি রচনা করেছিলেন –

”অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ,

যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দেখে তারা;

যাদের হৃদয়ে কোন প্রেম নেই-প্রীতি নেই-করুণার আলোড়ন নেই

পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।

যাদের গভীর আস্থা আছে আজো মানুষের প্রতি,

এখনো যাদের কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হয়

মহৎ সত্য বা নীতি, কিংবা শিল্প অথবা সাধনা

শকুন ও শেয়ালের খাদ্য আজ তাদের হৃদয়।”

[প্রসঙ্গতঃ চাকমা, বাংলা, ইংরেজি এবং অন্যান্য ভাষায় পারদর্শী, সত্যানুসন্ধিৎসু, মানবতাবাদী এবং আধুনিকতম-শুদ্ধতম চাকমা কবি শ্রী দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান জীবনানন্দ দাসের ’অদ্ভুত আঁধার’ শিরোনামের কবিতাটি একসময় চাকমা ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন। মৃত্যুর ক’বছর আগে পার্বত্য রাজনীতির ভবিষ্যত সম্পর্কে তিনিও জীবনানন্দের মতো প্রায় অনুরূপ একটি ’দৈববাণী’ উচ্চারণ করেছিলেন, যা শোনার সৌভাগ্য এই লেখকের হয়েছে। পরবর্তীতে তাঁর জীবন ও কবিতা নিয়ে ভিন্ন একটি আলোচনায় তাঁকে সম্যকরূপে জানার এবং জানানোর আন্তরিক প্রয়াস থাকবে। কবিতাটির সূত্রে এখানে বরং প্রাসঙ্গিক বিষয়টি উল্লেখ করি। সামাজিক যোগাযোগ ও গণমাধ্যমের বদৌলতে এযাবৎ জুম্ম ভ্রাতৃঘাতি সংঘাতে নিহতদের মধ্যে রূপক চাকমা, অভিলাষ চাকমা, সুদীর্ঘ চাকমার মতো তরুণদের মেধা, সাহিত্য-শিল্পরুচি ও সৃজনশীল মানবিক আদর্শের প্রতি অনেকের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে। সিএইচটিবিডি নামক ব্লগে প্রকাশিত তরুণ কবি ও অনলাইন একটিভিস্ট হেগা চাকমার একটি লেখায় অকালে কেড়ে নেওয়া নবীন প্রাণ সুদীর্ঘ চাকমার কবিতাটি পড়ে যাদের চোখ অশ্রুসিক্ত হবেনা তারা নিশ্চয়ই মনুষ্য পদবাচ্য নন। মানুষ তো আসলে খুনী হয়ে জন্মায় না। তাদেরকে খুনী বানানো হয়। সমাজ, রাজনীতি তাদেরকে খুনী বানায়। আমাদের দুর্ভাগ্য, চিরায়ত সত্যের কবি জীবনানন্দ কথিত এইসব খুনী ’শকুন ও শেয়ালের’ সংখ্যা দেশ, জাতি ও দলমত নির্বিশেষে পৃথিবীর জনসমাজে যেন দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর তাদের হাতে প্রতিনিয়ত খুন হচ্ছেন রূপক, অভিলাষ, সুদীর্ঘ চাকমার মতো ’মহৎ সত্য, শিল্প অথবা সাধনায়’ গভীরভাবে আস্থাশীল মানুষ। অহিংসা, প্রেম, প্রীতি, প্রজ্ঞার আলো ছড়িয়ে নতুন প্রজন্মকেই এ ’অদ্ভুত আঁধার’ দূর করতে হবে। আশা করি খুব দ্রুতই আমাদের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের অন্তরেও চিরন্তন মানব প্রেম, সম্প্রীতি-চেতনা ও শুভবোধ জাগ্রত হবে।]

সাম্প্রতিক ক্ষয়ক্ষতি ও আদর্শিক বিভ্রান্তি

আদর্শের যে সঙ্গীতই বাজানো হোক না কেন প্রকৃত সত্য হলো, পার্বত্য চট্টগ্রামে তিনটি আঞ্চলিক দলের সশস্ত্র সংঘাতে বহু জুম্ম ভ্রাতা-পিতা-সন্তানের জীবন অকালে ঝরে পড়ছে। বহু মাতা-ভগ্নী-কন্যার কোল খালি হচ্ছে। তাদের জীবন ও জগৎ প্রতিনিয়ত বিপন্ন, সংকুচিত হয়ে পড়ছে। স্বাধিকার অর্জনের চিন্তা বা কৌশল নির্ধারণের চেয়ে রাজনীতিতে সক্রিয় জুম্ম ভাই-বোনেদেরকে প্রতিপক্ষ ভ্রাতা-ভগ্নীদের আক্রমণ সামলাতে ব্যতিব্যস্ত থাকতে হচ্ছে। তিন চারটি দলকে চাঁদা দিতে গিয়ে জুম্ম সমাজের ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ সকলে ক্রমশঃ নিঃস্বতর হচ্ছেন। সামাজিক সুসম্পর্ক রক্ষাসহ তিনটি দলের সদস্যদের মন জুগিয়ে চলতে গিয়ে সাধারণ জনগণের দৈনন্দিন সংসার খরচও অনেক বেড়ে গেছে। কারণ সামাজিক সৌজন্যের খাতিরে হলেও তিনটি দলের মানুষকে এখন আলাদাভাবে আপ্যায়ন করতে হয়। সকলে মিলে পূর্ববৎ একসাথে, একজায়গায় ওঠাবসা কিংবা খোশগল্পে মেতে ওঠার বিষয়টি এখন যেন অলীক স্বপ্ন। আগে সবাইকে সাথে নিয়ে সামাজিক সুসম্পর্ক ও সৌজন্য রক্ষা করা যেতো। ঢাকা শহরে দুই তিন বছর আগেও এই সম্প্রীতিপূর্ণ অবস্থাটি ছিল। এখন খোদ রাজধানীতেও সেই সুদিন আর নেই। বিভাজনের রাজনীতি পর্যায়ক্রমে সবকিছুকে, সব অঞ্চলকে দূষিত করেছে এবং এখনও করছে। এই অনৈক্যের সুযোগ নিয়ে ভূমি জবরদখলসহ আদিবাসীদের উপর সেটেলার বাঙালিদের সহিংসতাও আগের তুলনায় বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে আদিবাসী নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা, মানবাধিকার চরমভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে। আর সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র তো মহানন্দে একের পর এক জুম্মবিরোধী পরিকল্পনা ও প্রকল্প তৈরির মোচ্ছবে মেতেছে বলে প্রতীয়মান হয়। পাহাড়িদের প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও রাঙ্গামাটিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ স্থাপনের তোড়জোর চলছে। প্রাথমিক শিক্ষার মান এবং স্কুল-কলেজগুলোর বেহাল দশা, অবকাঠামোর অপ্রতুলতা ও জনবলের প্রবল সংকট জারি রেখেও সরকার তথা আমলাতন্ত্র ’ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী’র উন্নয়নের নামে বাঙালি জনবসতি ও আধিপত্য সম্প্রসারণের এই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে। উল্লেখ্য, ’শান্তিচুক্তি’র পর বাঙালির স্বার্থ-পরিপন্থী যুদ্ধ-পরিস্থিতি তো এখন আর পাহাড়ে নেই। পূর্বপুরুষের ভূমি-প্রকৃতি-নীলাকাশ আর নব প্রজন্মের সমুজ্জ্বল ভবিষ্যতকে কোরবানির বিনিময়ে যুদ্ধের মরণ খেলাটিও এখন লুফে নিয়েছে খাঁচাবন্দী পাহাড়িরা। ফলে বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প, বনজ সম্পদ কিংবা পর্যটন ব্যবসা থেকে নিরাপদ উপার্জন হস্তগত করার মোক্ষম সুযোগ এখন বাঙালির জন্য তৈরি হয়েছে। পাহাড়ে কর্মরত কিংবা অবসরপ্রাপ্ত সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তাদের নিজেদের গ্রামে/নগরে গড়ে তোলা সম্পদের পাহাড়, গৃহসজ্জায় সেগুন বা অন্যান্য মহামূল্যবান আসবাবের বনেদিয়ানা পরিমাপ করে দেখলে এর সত্যতা মিলবে। অন্যদিকে পাহাড়িদের কেউ কেউ নিজেদের বাগানের মূল্যবান সেগুন, গামার ইত্যাদি বিক্রি করলেও দিনশেষে সেই কপর্দকশুন্যই থেকে যাচ্ছেন, চাঁদাবাজিসহ আমলা এবং মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের শোষণ ও দৌরাত্ম্যের কারণে।

সাধারণত যে কোন দুঃখের একটি শেষ থাকে, অন্ধকার সুরঙ্গের শেষ প্রান্তে থাকে আলোর দিশা। কিন্তু জুম্ম জাতির সামষ্টিক দুঃখ যেন কখনও শেষ হবার নয়। পাহাড়ে পরষ্পরের জীবন সংহারে ব্যস্ত আমাদের আঞ্চলিক রাজনীতির নেতা-কর্মীরা নিজেরাও জানেন না কী করুণ পরিণতির দিকে তারা নিজের জাতি, সমাজকে পরিচালিত করছেন। জুম্মকে দিয়ে জুম্ম নিধনের এই চক্রান্তে বিগত দেড় দশকে প্রায় আট শতাধিক তাজা প্রাণ অকালে ঝরে গেছে। সেই হিসেবে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৬০ জনের জীবন কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। অথচ ১৯৮৩ পরবর্তী চার বছর স্থায়ী ’লাম্বা-বাধি’র রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে উভয় পক্ষে নিহতের সংখ্যা ছিল মাত্র ১৪০ জন। এখন যে হারে ভ্রাতৃনিধন চলছে, জুম্ম সমাজের এই অপূরণীয় ক্ষতি ও আত্মিক ক্ষতের উপশম কি কখনও সম্ভব হবে? যদি হয়, তাহলে কিভাবে হবে? প্রধানত পরিবারের সুস্থ সবল উপার্জনক্ষম ব্যক্তিরাই এই সংঘাতের বলি হচ্ছেন। তার মানে এ পর্যন্ত প্রায় আট শতাধিক জুম্ম পরিবারকে ধনে-জনে-মনে সর্বস্বান্ত করা হয়েছে। এভাবে পরিবারের অন্য সদস্য এবং আত্মীয়-পরিজনদের অন্তরে জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে ক্ষোভ, প্রতিশোধ ও বিভাজনের আগুন। সেই আগুন দ্রুতগতিতে সমাজের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে। এর দহনে স্বপ্ন, জীবিকা, সম্ভাবনা ও অন্তরের দিক থেকে হাজার হাজার আদিবাসী মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ভ্রাতৃঘাতি সংঘাতে নিহতের এই সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। সেনাবাহিনীর উৎপীড়নসহ জুম্ম যোদ্ধা কর্তৃক অপহরণ-নির্যাতন-হয়রানির ভয়ে শহর ও গ্রামে বসবাসরত অনেক পাহাড়ির জীবন ও চলাচল দিন দিন সঙ্কুচিত হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত বাঙালি সেটেলারদের বিচরণ অবাধ ও সর্বত্রগামী হয়েছে। সেনাবাহিনী ও সশস্ত্র পাহাড়িদের হাতে নিগৃহীত হওয়ার আশঙ্কা থেকে সৃষ্ট এক জটিল ভয়ের সংস্কৃতিতে আবর্তিত হচ্ছে সাধারণ পাহাড়িদের জীবন ও মনোজগত। পাহাড়ি বাঙালি নির্বিশেষে যারা অস্ত্রধারী তাদের পক্ষে ভুক্তভোগীদের এই অসহায়ত্ব ও মর্মযাতনা উপলদ্ধি করা সম্ভব নয়। এখন অস্ত্রের ভাষা, অস্ত্রবাজির সংস্কৃতি এবং এর চোরা জৌলুস স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েদের কচি মনগুলোকেও ধীরে ধীরে প্রভাবিত করছে। পড়াশোনায় অনাগ্রহী অনেক ছাত্র-ছাত্রী অস্ত্র ও দলবাজির দাপট দেখিয়ে স্কুল-কলেজের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক-শিক্ষিকাদেরকে অপমানিত-নিগৃহীত করতেও পিছপা হচ্ছেনা। অথচ পাহাড়ি সমাজে সাম্প্রতিক বা দূর অতীতে এ ধরনের আচরণ ছিল অকল্পনীয়। ইদানীং দেখা যাচ্ছে, পাহাড়ি ’মুক্তিসেনা’রাই কোথাও পুড়িয়ে দিচ্ছে জুম্ম স্বজনের বহু কষ্টে-সৃষ্টে গড়ে তোলা কোন দোকানপাট বা ঘরবাড়ি। যেমন ৩ মে ২০১৪ জুম্ম যোদ্ধাদের নেতৃত্বে পোড়ানে হয়েছে পাহাড়িদের উল্লেখযোগ্য ব্যবসাকেন্দ্র নাড়েইছড়ি বাজার। ভ্রাতৃঘাতি সংঘাতের বলি হিসেবে শুধুমাত্র জানুয়ারি-মে ২০১৪ পর্যন্ত ’৫ মাসে খুন হয়েছেন ৩৫ জন, অপহরণের শিকার হয়েছেন ৬০ জন। সংঘর্ষে আহত হয়েছেন আরো প্রায় শতাধিক ব্যক্তি’ (সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক, ৯ জুন ২০১৪)। এধরনের অনেক হত্যাকান্ডে কিংবা সহিংসতায় হয়তোবা দলগুলোর কেন্দ্রীয় কমান্ডের কোনরূপ নিয়ন্ত্রণও নেই। অন্যদিকে ১০ জুন ২০১৪ দিঘীনালার বাবুছড়ায় রাষ্ট্রের পুলিশ ও বিজিবি আদিবাসী নারী-শিশু-পুরুষদের উপর হামলা ও মামলা করেছে। বিজিবি-র ৫১ ব্যাটেলিয়ন সদর দপ্তর নির্মাণের নামে স্থানীয় আদিবাসীদের বসতি ও কৃষিজমি জবরদখলের জন্য এসব রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন চালানো হচ্ছে। দীঘিনালা থেকে সাজেক পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চলের আদিবাসী ভূমি-বসতি জবরদখলের একটি পরিকল্পনা প্রায় দুই যুগ আগে গৃহীত হয়েছিল বলে জনমনে জল্পনা-কল্পনা রয়েছে। প্রশ্ন হলো, বাঙালি ও পাহাড়ির এই দ্বিমুখী বা বহুমুখী বিচিত্র আক্রমণ হজম করে সাধারণ জুম্ম জনগণ কি নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারবে? আপাতত পারলেও আর কতদিন পারবে?

আসলে হিংসা-প্রতিশোধের আগুন একবার জ্বালানো হলে তা প্রশমনের কাজটি সত্যিই দুরূহ। কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, চীন, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা থেকে শুরু করে পাকিস্তান, আফগানিস্তান, প্যালেস্টাইন, মিসর, সিরিয়া, লিবিয়া, ইরাক, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার অধিকাংশ দেশ এবং ইউরোপ আমেরিকার জনগণ বহু আগে এই দুঃসহ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। ইউক্রেনের জনগণসহ আমরা এবং অন্য অনেকে এখন সেটি করছি। দুই বিশ্বযুদ্ধে মানুষের নৃশংসতা কোন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল সেটি আমরা নাৎসি হিটলারের ইহুদি নিধনযজ্ঞ বা ’হলোকাস্ট’ থেকে কিছুটা আঁচ করতে পারি। পৃথিবীতে এইসব হত্যা বা ধ্বংসযজ্ঞ কিন্তু পরিচালিত হয়েছিল বা হচ্ছে কোন না কোন মহৎ আদর্শের নামে। নিজের মর্জিমতো সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে তৎকালীন সোভিয়েত অধিপতি যোসেফ স্ট্যালিন স্বদেশের প্রায় পাঁচ কোটি মানুষের জীবন সংহার করেছিলেন। বৌদ্ধধর্মের অন্যতম পীঠস্থান কম্বোডিয়ায় শ্রেণীশত্রু নির্মূলের নামে কমরেড পলপটদের নেতৃত্বে প্রায় ত্রিশ লক্ষ স্বদেশবাসীকে ঠান্ডা মাথায় খুন করা হয়েছিল। এতসব হিংসা-প্রতিহিংসা ও আদর্শিক বিভ্রান্তির বিপরীতে আমরা চাইলে পৃথিবীর একটি আধুনিক জাতি হিসেবে অবশ্যই ভিন্ন উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারি। জগতে মানুষ পর্যায়ক্রমে স্বার্থপর, প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়ে ওঠে বলেই তথাগত বুদ্ধ জগৎবাসীকে সংযত মন ও মনন, অন্তরের পবিত্রতা, অপরিমেয় মৈত্রী ও অহিংসা লালনের পরামর্শ দিয়েছিলেন। অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, সমাজে রাজনৈতিক বা আদর্শিক দ্বন্দ্ব থেকে সৃষ্ট সংঘাত ও সহিংসতা সহজে বা আপনা আপনি প্রশমিত হয়না। এতে কায়েমি স্বার্থ বা রাষ্ট্রীয় উস্কানি যুক্ত হলে তো কথাই নেই। এর বিপরীতে সমাজের শুভশক্তি চিরন্তন মানবতাবাদ, আত্মিক সংহতি ও শুভবোধের মশালগুলো নানা সৃজনশীল কর্মকান্ডের মাধ্যমে সুকৌশলে জ্বালিয়ে দিতে পারলে ধীরে ধীরে সহিংসতা প্রশমিত হতে পারে। কিন্তু জুম্ম সমাজে শুভবাদী সেসব তৎপরতা আজও খুব সীমিত বা ক্ষীণপ্রাণ। এর পেছনের কারণটিও সহজবোধ্য। আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক নানা সীমাবদ্ধতা এবং বোধবুদ্ধির সঙ্কট তো আছেই। সেই সাথে জুম্ম সমাজের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীটির বয়সও বেশি দিনের নয়, যারা ”নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর” দুঃসাধ্য এই কর্মটি সাধন করবে। বিরাজমান এই বাস্তবতায় এখন গুম, খুন, অপহরণের যে অপরিণামদর্শী প্রবল রাজনীতি সেটিকেই জুম্ম জাতীয় মুক্তির পরম আদর্শ মনে করে এর অনুসারীরা বিভ্রান্ত হচ্ছেন। ’আপোষকামিতা’ আর ’আপোষহীনতা’, ’জুম্ম মুক্তিসেনা’ আর ’সন্ত্রাসী’ এই দুই ধারার মতাদর্শের ধোঁয়াশা জাতিকে দ্বি-খ-িত করেছে এবং প্রতিনিয়ত করছে। বলা হচ্ছে, পার্বত্য চুক্তিপন্থীরা আপোষকামী আর চুক্তির বিরোধিতাকারী বা পূর্ণ স্বায়ত্বশাসনপন্থীরা আপোষহীন যোদ্ধা। তারা জুম্ম জাতির মুক্তির অগ্রদূত। আবার চুক্তিপন্থীরা বলছেন, চুক্তিবিরোধীরা হলো সন্ত্রাসী, জুম্ম জাতির বর্বর হন্তারক। খ-িতভাবে বাজারজাতকৃত এই দু’টি মতাদর্শই আসলে কৃত্রিম, বাস্তবতা বিবর্জিত এবং জুম্ম স্বার্থের পরিপন্থী। আদর্শের এই ভেজাল আফিম খাইয়ে জুম্ম সমাজে স্থিতধী, অহিংস বিপ্লবী তৈরি করা যাবেনা। অথচ এখন সেই বিপ্লবীদেরই বড় প্রয়োজন আমাদের। যেমন ছিলেন, আছেন মার্টিন লুথার কিং, নেলসন ম্যান্ডেলা, মার্শাল টিটো, প্যাট্রিস লুমুম্বা, ফিডেল ক্যাস্ট্রো, এমনকি মহাত্মা গান্ধী থেকে শুরু করে বাবাসাহেব আম্বেদকর, রাহুল সাংকৃত্যায়ন, এম এন লারমা এবং অং সান সু চি পর্যন্ত। বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতেও এই মানবতাবাদীদের অহিংস স্পিরিটটিই আজ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। এদেশে শান্তির, অহিংসার সেই কাঙ্খিত স্পিরিটটি রাজনীতির মূলধারায় কখনও ছিলনা। দাঁতের বদলে দাঁত, চোখের বদলে চোখ নেওয়ার বীভৎস রাজনীতি কখনও জনগণের মুক্তি আনবেনা। কারণ সময় তো এখন আর মধ্যযুগে থেমে নেই। পৃথিবীতে মানবাধিকারের ধারণা আর প্রযুক্তিতে অভাবিতপূর্ব অনেক পরিবর্তন ঘটে গেছে। বেঁচে থাকলে এখন কার্ল মার্ক্স, লেনিন আর মাও সেতুংও হয়তো অনেক বদলে যেতেন। শুধুমাত্র রক্তাক্ত শ্রেণী সংগ্রামের তত্ত্বে পড়ে থাকতেন না। যুদ্ধ ও মৈত্রী, হিংসা ও ক্ষমার অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়ে তাঁরা মানব জাতিকে আরও অনেক মানবিক করে তুলতেন। পর্যায়ক্রমে এবং চূড়ান্তভাবে তাঁরা অহিংস মানবতাবাদীই হতেন। নিজেদের বিপ্লব-তত্ত্বের সংস্কার, পরিমার্জন করতেন। কারণ অবিমিশ্র রক্তাক্ত সংগ্রামের তত্ত্ব স্পেনের বর্ণান্ধ ষাঁড়দের মতো একরোখা সহিংস ’বিপ্লবী’ সৃষ্টির জন্য অব্যর্থ মহৌষধ। এরা অনেকটা বর্তমান সময়ের ধর্মান্ধ জিহাদী আল-কায়েদা, হামাস, তালেবান বা বোকো-হারাম যোদ্ধাদের মতোই। উস্কানি পেলে এই ষাঁড়েরা নিজের প্রশিক্ষক বা গুরুকেও নির্দ্বিধায় শিং মেরে কুপোকাত করে দিতে পারে।

বর্তমানে পাহাড়ের জুম্ম সমাজেও অনেকটা সেরকম ব্যাপারই ঘটছে। এখানে বয়স্ক, প্রাজ্ঞ, নেতা, গুরুজন কারও প্রতি কারও কোন ধরনের সমীহ, শ্রদ্ধাবোধ আর পরিলক্ষিত হয়না। আমাদের আত্মঘাতি হাবভাব দেখে বাঙালিরা, বিদেশিরা হাসছেন। কিন্তু আমাদের কোন লজ্জ্বা নেই, অনুশোচনা বা দুঃখবোধ নেই। আসল কথা হলো, ভ্রান্ত আদর্শের রঙিন চশমা এঁটে নিজেদের মধ্যে ঝগড়াঝাটি করে কোন লাভ হবেনা। জুম্মদের অস্তিত্বের স্বার্থে পার্বত্য চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন আর পূর্ণ স্বায়ত্বশাসন দু’টোই আমাদের প্রয়োজন। এই দু’টি আরাধ্য বস্তু একে অপরের পরিপূরক, সাংঘর্ষিক মোটেও নয়। যেটি আগে পাওয়া যাবে সেটিই লাভ। বাকিটার জন্য সন্মিলিতভাবে দীর্ঘমেয়াদি প্রচেষ্টা চালাতে হবে। নিজেদের মধ্যে ঢুসাঢুসি করে কোনটাকে পাওয়া যাবেনা। এই সহজ সত্যটি সাধারণ জনগণকে বোঝানো হয়না। বরং তাদেরকে বিভাজনের রাজনীতির আদর্শে উদ্বুদ্ধ করে ’জাতীয় মুক্তি’র অলীক স্বপ্ন দেখানো হচ্ছে। অনুসারীরা নিজের দলটিকে অন্য দলগুলোর চেয়ে শ্রেষ্ঠ দাবি করে জনগণকে সংশ্লিষ্ট দলে ভিড়তে অনুপ্রাণিত করছেন। কেউ অনুরূপ আদর্শে উদ্বুদ্ধ, সহমত না হলে তাকে সন্দেহ করা হচ্ছে। সুবিধাবাদী, প্রতিক্রিয়াশীল, দালাল জাতীয় তকমাও তাদের ভাগ্যে জুটছে। মূলতঃ গ্রামাঞ্চলের মানুষ এবং দরিদ্র নিরীহ ছাত্র-ছাত্রীদের উপর খন্ডিত আদর্শের এই স্টীমরোলার চালানো হচ্ছে। এতে সমাজে বিভাজন বাড়ছে বই কমছেনা। কারণ কিছু অসহায়, নিরুপায় মানুষ ও ছাত্র-ছাত্রী কোন না কোন দলে ভিড়তে একপ্রকার বাধ্য হচ্ছেন। ভ্রাতৃঘাতি রাজনীতি থেকে বাঁচতে অভিভাবকদের পরামর্শে অনেকে শহরাঞ্চলে এসে গার্মেন্টস কর্মীর কষ্টকর জীবনও বেছে নিচ্ছেন। আমরা এখন শ্রেণীযুদ্ধে ক্ষত-বিক্ষত কয়েকবছর আগের কম্বোডিয়ায় যেন বাস করছি। পার্বত্য চট্টগ্রাম যেন মিনি কম্বোডিয়া। তাদের সাথে ধর্ম ছাড়াও আমাদের চেহারায় রয়েছে অদ্ভুত মিল। নাকচ্যাপ্টা মোটাবুদ্ধির একরোখা প্রাণী আমরা। স্যার রোনাল্ড জোফে’র ’দ্য কিলিং ফিল্ডস’ সিনেমাটি দেখলে তাদের সাথে আমাদের রাজনীতি ও বুদ্ধির এই মিলটি বোঝা যাবে। ইদানিং পার্বত্য চট্টগ্রামে হত্যা, গুম, অপহরণ, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি দিন দিন বেড়ে চলেছে। একসময় সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার নামে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে ’সর্বহারা’দের উৎপাতের ধরণও এমন ছিল। এর সাথে পাহাড়ের পরিস্থিতির আশ্চর্যজনক সাদৃশ্য বেশ কৌতুহলোদ্দীপক। স্মরণ করুন, দক্ষিণবঙ্গে ’জনদরদী’ এই সর্বহারাদের দমনের জন্য সরকার একসময় ’অপারেশন ক্লিন হার্ট’, ’অপারেশন স্পাইডার ওয়েব’ পরিচালনায় বাধ্য, প্ররোচিত বা উদ্বুদ্ধ হয়েছিল। পার্বত্য চট্টগ্রামে র‌্যাবের ’পাহাড়ি ব্যাটেলিয়ন’ কি অনুরূপ পরিস্থিতিতে বা উদ্দেশ্যে গঠিত হতে যাচ্ছে? বিষয়টি নিয়ে নিজেকে প্রশ্ন করলে উত্তরও সহজে না পাওয়ার কোন কারণ নেই।

শ্রেণী-বিভ্রান্তি এবং তরুণ প্রজন্ম-মানস

লক্ষ্যণীয় বিষয়টি হলো, তুলনামূলকভাবে সচ্ছ্বল ও শহুরে পরিবারের জুম্ম সন্তান-সন্ততিরা সাধারণত ভ্রাতৃঘাতি কুটিল রাজনীতির কানাগলিতে ঢুকতে অনিচ্ছুক। ফলে রাজনীতিতে সক্রিয়দের দ্বারা তারাও প্রায়শঃ কটুকাটব্যের শিকার হন। চলমান রাজনীতির প্রতি তাদের বিতৃষ্ণাকে দেখা হয় স্বদেশ বা স্বজাতিপ্রেমের অভাব হিসেবে। পার্বত্য চট্টগ্রামে যাদের জন্ম ও বেড়ে ওঠা তাদের মধ্যে রাজনীতি সচেতনতা বা দেশপ্রেম নেই, এমন অভিযোগ হয়তো বাস্তবসম্মত নয়। অর্থাৎ কচি মনগুলো এখানেও নিজেদের অজান্তে বিভাজনের রাজনীতির শিকার হচ্ছে। তুলনামূলকভাবে সৌখিন জীবনধারায় অভ্যস্ত হলেও সমাজের স্বচ্ছল শ্রেণীটির মধ্যে দেশপ্রেম বা স্বাজাত্যবোধের অভাব আছে এমন সরলীকৃত বিভাজন জুম্ম জাতির সামগ্রিক স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর ও একপেশে মূল্যায়ন নিঃসন্দেহে। কারণ পাহাড়ে যখন ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক আন্দোলন ছিল তখন বনেদি ও স্বচ্ছল পরিবারের অনেক সন্তান স্বেচ্ছায় শান্তিবাহিনীতে যোগদান করে অনিশ্চিত জীবন বরণ করেছিলেন, এমন বহু নজির আছে। অনেকে জেল-জুলুমসহ অবর্ণনীয় অত্যাচার সহ্য করেছেন। কেউ কেউ যুদ্ধে, আততায়ীর গুলিতে মৃত্যুবরণ করেছেন। সম্পদ, চাকুরি, আর্থ-সামাজিক প্রতিষ্ঠা এবং দেশে-বিদেশে উন্নত জীবন গড়ার সুযোগ প্রভৃতি নির্দ্বিধায় অগ্রাহ্য করেছেন। তাদের সন্তান-সন্ততিরা এখন রাজনীতিবিমুখ হয়ে থাকলে তার জন্য বর্তমান ভ্রাতৃঘাতি রাজনীতিই মূলতঃ দায়ী। রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন না ঘটলে জোর-জবরদস্তিমূলক মতবাদ চাপিয়ে দিয়ে তাদের সক্রিয় সম্পৃক্ততা নিশ্চয় আদায় করা যাবেনা। কোন মানবিক বোধসম্পন্ন সুস্থ মানুষ স্বজাতির ভাই বা বোনকে হত্যা করার জন্য রাজনীতি করতে পারেনা। তাই এখানে বাম আদর্শের সেই ’ডি-ক্লাশড’ হওয়া বা করার ধারণাটিকে নিয়ে আসারও যৌক্তিকতা নেই। পদবী বা সম্পদের দিক থেকে নয়, মনের দিক থেকে ’ডি-ক্লাশড’ হওয়াটা বেশি জরুরী। মতের অমিল হলে কারও উপর হামলে পড়া বা চিরতরে কন্ঠরোধ করে দেওয়ার মানসিকতা তো আসলে সামন্ততান্ত্রিকতাই। ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত বন্ধ হলে দেখা যাবে অধিকাংশ মানুষ মনের দিক থেকে সমশ্রেণীতে অবস্থান নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে স্বাধিকার আন্দোলনে সামিল হয়েছেন। তাছাড়া স্বজাতির, পিতৃভূমির গৌরবগাথা কিংবা নিজের সমাজ-সংস্কৃতি-ঐতিহ্য নিয়ে প্রেরণাদায়ী অধিকাংশ গান, কবিতা, সাহিত্য ও শিল্পকর্ম অপেক্ষাকৃত স্বচ্ছল, শহুরে এবং শিক্ষায় অগ্রসর মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সন্তানদের দ্বারাই সৃষ্ট বলা চলে। জাতীয় মুক্তির আন্দোলনে সফলতার জন্য এসব সৃজনশীল কর্মযজ্ঞ ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা রাজনীতিতে অবশ্যই পরিপূরক উপাদান। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধসহ দেশে দেশে শোষণমুক্তির আন্দোলনে যুদ্ধাস্ত্রের পাশাপাশি শিল্পকলা, কবিতা, গানও ছিল অব্যর্থ হাতিয়ার এবং জনসংহতির রাখিবন্ধনী। পাহাড়ের রাজনীতিতে ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হলে ধনী-দরিদ্র, অগ্রসর-অনগ্রসর নির্বিশেষে সকলেই আগের মতো ঝাঁপিয়ে পড়বেন বলেই তো সুকৌশলে বিভাজনের রাজনীতি জারি রাখা হয়েছে। এছাড়া আন্তঃসাম্প্রদায়িক বিভাজন সৃষ্টির গভীর ষড়যন্ত্রও চলছে। সুতরাং এই বিভাজনের রাজনীতির ভেতরে থেকে এর পেছনের নীলনকশা ও কুটকৌশলগুলো বোঝা দুঃসাধ্য। রহস্য উন্মোচন বা রাজনীতির পেছনের রাজনীতিকে বুঝতে হলে অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে চিরচেনা বৃত্তের বাইরে তাকাতে হবে। তোতাপাখিকে শেখানো বুলির মতো খন্ডিত রাজনৈতিক চেতনার যে বৃত্তে এ যুগের কিছু তরুণ-তরুণী ঘুরপাক খাচ্ছেন সে বৃত্ত কি তারা কোনদিন ভাঙতে পারবেন বা ভাঙতে দেওয়া হবে? তাহলে তো জুম্মকে দিয়ে জুম্ম বা আদিবাসীর মেরুদন্ড ভেঙে দেওয়ার কাজটি আর সফল হবেনা। তবুও অচলায়তন ভাঙার আন্তরিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। বিভাজনের জন্য দায়ী বিষয়গুলিকে প্রশান্ত চিত্তে, প্রজ্ঞা ও অন্তর্দৃষ্টির আলোয় গভীরভাবে বিশ্লেষণ, চিহ্নিত ও অপসারণ করে জুম্ম জাতীয় সংহতিকে ফিরিয়ে আনতে হবে। সেটি যে নামে, অহিংস যে পদ্ধতিতে হোক না কেন। আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে ’মরা গরুর বাঘ’-এর মতো আত্মঘাতি দাপট দেখিয়ে সংহতি প্রতিষ্ঠা করা যাবেনা।

বাস্তবতা হলো, জাতীয় মুক্তির মন্ত্রণায় উজ্জীবিত হয়ে আদর্শবাদী কিছু তরুণ-তরুণী স্বেচ্ছায় এখনও বিভাজিত পার্বত্য রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ছেন। সশস্ত্র দাপট কিংবা স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা হিসাব-নিকাশ ও রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করতেও নিশ্চয় অনেকে জড়াচ্ছেন। জাতীয় পরিসরে বাংলাদেশের ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতিতে যা ঘটছে পাহাড়ের পরিস্থিতিও অনেকটা তারই প্রতিরূপ। তবে মোহভঙ্গ হয়ে অনেকে জুম্ম রাজনীতি থেকে বেড়িয়েও যাচ্ছেন। কালক্রমে নিষ্ক্রিয় বা হতাশাগ্রস্ত হচ্ছেন। কিন্তু পাহাড়ের অধিকাংশ মানুষ জানেন, বোঝেন যে সংঘাতমুখর ও আত্মঘাতি এই রাজনীতি দিয়ে জুম্ম জাতির মুক্তি কখনও সম্ভব নয়। সমাজে এই অংশটিই সংখ্যাগরিষ্ট এবং জুম্ম রাজনীতিতে ঐক্যের প্রত্যাশী। বিবদমান রাজনৈতিক দলগুলো তাদেরকে সুবিধাবাদী হিসেবে চিহ্নিত করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। নানা অপবাদে অভিষিক্ত হলেও জনগণ আসলে এই পক্ষহীনদের পক্ষেই। কারণ জনগণ এত বোকা নয়। খন্ডিত, একদেশদর্শী মতবাদ দিয়ে কিছু মানুষকে কিছুদিনের জন্য হয়তো বিভ্রান্ত করা যায়। কিন্তু অধিকাংশ মানুষকে বেশিদিন ভুল বুঝিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা যায়না। অস্ত্রের, নিপীড়নের ভয়ে সংখ্যাগরিষ্ট মানুষ খুব বেশি উচ্চবাচ্য হয়তো করছেন না। তবে তারা নিশ্চিত জানেন যে, জুম্ম রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠিত না হলে পাহাড় ও সমতলের আদিবাসীদের মুক্তি নেই।

বর্তমান ফেইসবুক প্রজন্মের চিন্তাধারাগুলো পর্যবেক্ষণ করলেও কিছু হতাশাজনক মানস বৈপরীত্য পরিলক্ষিত হয়। সুবিধাবাদের রাজনীতির পক্ষে-বিপক্ষে তুমুল তর্ক-বিতর্কের মধ্যে মূলতঃ আমাদের চাকুরিজীবী মধ্যবিত্ত শ্রেণী, তাদের সন্তান-সন্ততি ও চাকুরিপ্রার্থীরা একধরনের ’হেইট ক্যাম্পেইন’ বা বিষোদগারের শিকার হচ্ছেন। রাজনীতিবিমুখ, সুবিধাবাদী, প্রতিক্রিয়াশীল হিসেবে চিত্রিত করে তাদেরকে ব্যাপক সমালোচনা করা হচ্ছে। তুলনামুলকভাবে প্রাগ্রসর, উচ্চশিক্ষিত তরুণ প্রজন্মের অনেকে সে কাজটি করছেন। প্রশ্ন হলো, সেটি কতটুকু বাস্তবসম্মত, যুক্তিসঙ্গত এবং উদারতাপ্রসূত কাজ হচ্ছে। আমাদের কি আর্থিকভাবে স্বচ্ছল, চৌকস, বুদ্ধিদীপ্ত ও প্রাণোচ্ছল তরুণ বা তারুণ্যের প্রয়োজন নেই? বিশেষ করে বিশ্বায়নের, প্রতিযোগিতার, ইকোনমিক ডিপ্লোম্যাসির এই যুগে? সত্য যে, আমরা ঔপনিবেশিক যুগের হাজং বিদ্রোহ, মুন্ডা বিদ্রোহ, চাকমা বিদ্রোহ প্রভৃতি গণসংগ্রামের গৌরবগাথায় আজও উদ্দীপ্ত, গর্বিত হই। বিপন্ন, সহায়-সম্বলহীন সেই সাহসী পূর্বপুরুষেরা বেনিয়া রাষ্ট্রশক্তির নিষ্পেষণে ধৈর্যের শেষ সীমায় পৌঁছে নিজেদের অস্তিত্ব ও মর্যাদা রক্ষায় মরণপণ বিদ্রোহে সামিল হয়েছিলেন। ইতিহাসে তাদের বীরত্ব ও আত্মত্যাগ স্বীকৃতি পেলেও বাস্তবে বিপন্ন জনগোষ্ঠীর সেসব মহানায়কেরা পরাজিতই হয়েছিলেন। ইংরেজদের তুলনামূলকভাবে আধুনিক সমরাস্ত্রের আঘাতে তাদের হাজার হাজার মানুষ সেসব যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন এবং বাকিরা লজ্জ্বাজনক হার স্বীকার করে আরও প্রান্তিক ও নিরস্তিত্ব হয়েছেন। বিদ্রোহের আগে তারা যেমন উপান্তবাসী হতদরিদ্র মানুষ ছিলেন, বিদ্রোহের দুই/আড়াইশত বছর পরেও তারা আজও সেই বিপন্ন, প্রান্তিক জনধারাই রয়ে গেলেন। খেয়াল করে দেখুন, মূলধারার ইতিহাসে তারা কিন্তু আজও প্রান্তিক বীর, শোষণমুক্তির সংগ্রামের প্রধান মহানায়ক নন। তাদের অসহায়, দারিদ্র্যক্লিষ্ট ও নস্টালজিক বীরত্বের গৌরবগাথায় আমাদের চেতনাকে আজও আচ্ছন্ন করে রাখার প্রয়াস পান মূলধারার বৃহৎ নৃগোষ্ঠীর মানুষেরা, তাদের বুদ্ধিজীবীরা। এক্ষেত্রে বরাবরের মতো এগিয়ে থাকেন, আছেন বামপন্থী রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবীরা। কিন্তু আমাদের এখন বোঝা উচিত, পৃথিবীতে বহু আগে থেকে দিনবদল শুরু হয়েছে। ঘুণেধরা সেই কৃষক-সামন্তের অসম স্বার্থযুদ্ধের আটপৌরে বিপ্লবীয়ানার যুগও শেষ। এখন কৃষকের স্বার্থরক্ষার যুদ্ধও হয় অত্যাধুনিক একে ৪৭, মর্টার, মিসাইল প্রভৃতি সমরাস্ত্র দিয়ে। পুরনো বীরদের তীর-ধনুক দিয়ে নয়। কারণ শ্রমিক বা কৃষকেরও মূল শত্রু এখন আর সামন্তরা নন। তাদের আসল শত্রু এখন বহুজাতিক কোম্পানী তথা বিদেশী পুঁজি ও বাজারের আগ্রাসন। সামন্তরাও এখন বহুজাতিক পুঁজির আগ্রাসনে সর্বহারাদেরই দলভুক্ত। তাই পুরনো আদর্শ, কৌশল, পুরনো বিপ্লবীয়ানার ফ্যান্টাসিতে আচ্ছন্ন থাকলে এখন আর চলবেনা। নতুন প্রজন্মকে নতুন ধারায় চিন্তা করতে হবে। আমাদের পূর্বপুরুষদের চিন্তার দীনতা, ধ্যান-ধারণা ও বৃদ্ধ অচলায়তন ভেঙে বেরিয়ে আসতে হবে। সেটি সমাজতন্ত্র, পুঁজিতন্ত্র, গণতন্ত্র, মিশ্র রাষ্ট্রব্যবস্থা যে দর্শনের ক্ষেত্রেই হোক না কেন। মোটকথা আপনি যে মতবাদ বা দর্শনেরই অনুসারী হোন না কেন, চিন্তার ক্ষেত্রে আধুনিকতা চাই, উদারতা চাই, সংবেদনশীলতা ও মানবিকতা চাই। নতুন যুগের নতুন সময়ের রোগ, ব্যথা, দারিদ্র্য নিরসনকারী সর্বাধুনিক বিপ্লবীয়ানা চাই।

চলবে………

আসছে-

আমাদের দুরবস্থার কারণ ও দায়ভার

এখন যে বৃত্ত ভাঙতে হবে

সাম্যবাদী সমাজব্যবস্থা: স্বপ্নে সুন্দর, বাস্তবে কি রক্তগন্ধময়!

 

নোটঃ বিজয় থেকে ইউনিকোডে কনভার্ট করায় কিছু বানানে ভূল থাকতে পারে।

About the author

জুম্মো ব্লগার

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/2921

1 comment

3 pings

  1. স্বাধীন

    অনেক সংবেদনশীল বিষয় উপস্থাপিত হয়েছে। লেখাটি পড়ে নতুন অনেক কিছু জানলাম এবং বুঝতে পাড়লাম। একজন স্বাধীন নাগরীক হিসেবে আমার কর্তব্য কি কি, এই দেশ ও জাতীর জন্য সেটি অনুভব করতে পারলাম।

  2. Gazi Salah Uddin Shadin

    অনেক কিছু জানলাম বুঝলাম…..

  3. Odong Chakma

    লেখা চলতে থাকুক। পরবর্তী পর্বের অপেক্ষায় রইলাম। “..আপনি যে মতবাদ বা দর্শনেরই অনুসারী হোন না কেন, চিন্তার ক্ষেত্রে আধুনিকতা চাই, উদারতা চাই, সংবেদনশীলতা ও মানবিকতা চাই”।

  1. মুক্তি কোন পথে? | ।।জুম্মো ব্লগ।।

    […] […]

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>