«

»

এই লেখাটি 4,073 বার পড়া হয়েছে

Print this প্রকাশনা

আবার জলবিদ্যুৎ, আবার কান্না

দুই পাশে পাহাড়, মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে নাক্রাই ছড়া। আমরা দুইজন ছড়ার মাঝ বরাবর হাঁটছি। সাথে থাকা ত্রিপুরা মহিলাটি আমাদের হাত তুলে দেখিয়ে দিলেন কোথায় বাঁধ দেয়া হবে। এক পাহাড়ের প্রায় মাথা থেকে অপর প্রান্তের প্রায় মাথা সমান উচ্চতায় অংগুলি নির্দেশ করে জানালেন এবং এর ফলে আমরা কিছুটা আন্দাজ করলাম বাঁধের উচ্চতা কতটুকু হতে পারে। প্রায় ২০০ ফুট বা তার চেয়েও বেশি হওয়া অবাক কিছু নয়।

 

বলছিলাম খাগড়াছড়ির গুইমারায় সদ্য হাতে নেয়া নতুন একটি প্রকল্প, জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কথা। গুইমারা থেকে ৬-৭ কি.মি দূরে ২১২ নং বরইতলী মৌজা ও ২২৮ নং নাক্রাই মৌজার মাঝ বরাবর বয়ে যাওয়া নাক্রাই ছড়ার উপর বাঁধ দিয়ে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ হাতে নেয়া হচ্ছে। কিছুটা গোপনেই এটি সম্পন্নের তোড়জোড় শুরু হচ্ছে। কিছুদিন আগে কিছু ছাত্রের মারফতে এই তথ্য পেয়ে আমরা যোগাযোগ করি হাফছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান উশ্যেপ্রু মারমার সাথে। তাঁর দেয়া কিছু তথ্যের ভিত্তিতে হিল ব্লগার এন্ড অনলাইন একিভিস্ট ফোরামের আমরা দুই সদস্য ঘটনাস্থলে যাই সরেজমিনে বিষয়টি যাচাইয়ের জন্য। পুরো এলাকা ঘুরে দেখার সাথে সাথে তিনজন কার্বারি, দুইজন হেডম্যানের সঙ্গেও আমাদের কথা হয়। এছাড়াও কথা বলি গ্রামের সাধারণ মানুষদের সাথে।

বিষয়টি খুবই চাঞ্চল্যকর এবং উদ্বেগের। যেখানে প্রায় অনেক বছর আগেই এই ধরণের বিদ্যুৎ উৎপাদনকে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর এবং জনজীবনের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলার কারণে বাতিলের খাতায় ফেলে দেয়া হয়েছে সেখানে এই ধরণের প্রক্রিয়াকে নতুনভাবে পাহাড়ে প্রয়োগ করা হচ্ছে কেন? কাপ্তাই বাঁধের ইতিহাস আমাদের অজানা নয় তবুও কেন আবার তার পুনঃরাবৃত্তি করার চেষ্টা চলছে? আশেপাশের প্রতিটি গ্রামের মানুষের বিরোধীতা সত্ত্বেও কেন তা গ্রাহ্য করা হচ্ছে না? গ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তি বা কার্বারিদের সাথেও কেন এই বিষয়ে আলাপ করা হয়নি? এই প্রশ্নগুলো আজ সেখানকার মানুষের। মং সার্কেল চীফও এই বিষয়ে অবগত নন অর্থাৎ তাঁকে সম্পূর্ণ পাশ কাটিয়ে এটি করা হচ্ছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে রাষ্ট্রের গোপন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে আর্মিরা। যেখানে হাজার মানুষের জীবন ও জীবিকার প্রশ্ন জড়িত, সেই ইস্যুতে তাদেরকে উপেক্ষা করে গোপনে তা বাস্তবায়নের করা হচ্ছে। পাহাড়ের প্রতিটি বিষয়ে মূখ্য ভূমিকা রাখে আর্মিরা, এখানেও তাঁর ব্যতিক্রম নয়। সেই সাথে তাদের সহযোগী হিসেবে কিছু তাবেদার এই প্রজেক্ট বাস্তবায়নে কাজ করছে।

গত সেপ্টেম্বর মাসের ১৩ তারিখে তাঁরা নাক্রাই ছড়া পরিদর্শনে যান এবং গোটা এলাকা ঘুরে আসেন। সাথে কিছু ছবিও তাঁরা তুলে নেন। এরপর ২৫ তারিখ গুইমারা ক্যাম্পে তাঁরা গোপন একটি বৈঠকে মিলিত হন এবং এখানে জনগণের কোন প্রতিনিধিকে রাখা হয়নি, যদিও প্রতিটি বৈঠকে তাঁদের আমন্ত্রণ করা হয়। এর আরো আগে ২০১২ সালে রামগড়ের এসিল্যান্ড ও কংজরী হেডম্যান এসে জায়গা দেখে গিয়েছিলেন।

প্রথমেই আমরা নাক্রাইছড়ার উজানে হাঁটতে থাকি এবং জুমে কাজ করা অবস্থায় কিছু গ্রামবাসীর সাথে দেখা হয়। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী আমরা জানতে পারি কোথায় বাঁধ নির্মাণ হতে পারে। বাঁধের উচ্চতা নিয়ে তাদের প্রবল ভীতি লক্ষ্য করার মত। এ বিষয়ে কথা হয় রসিক চন্দ্র চাকমার সাথে, বয়স আনুমানিক ৬৫। নাক্রাইছড়া থেকে মাত্র ৩০-৪০ ফুট উঁচু ছোট এক টিলায় তাঁর বাড়ি। তিনি জানালেন এখানে তিনি প্রায় পাকিস্তান পিরিয়ড থেকে বসবাস করে আসছেন। প্রায় ২০ কাঠা জমির উপর তাঁর বাড়ি, এছাড়াও তাঁর ৫ একরের মত বাগান আছে যা তাঁর বাড়ির আশেপাশেই। সেখানে তিনি লিচু, কাঠাঁল আর সেগুনের গাছ লাগিয়েছেন। জিজ্ঞেস করলাম, জায়গাটি বন্দোবস্তী কিনা। তিনি জানালেন ১৯৯৪ সালে তাঁরা রামগড় উপজেলার ভূমি অফিসে গিয়েছিলেন জায়গার শুনানি করতে। এর মাধ্যমে তিনি জায়গাটি বন্দোবস্তী নিতে পারতেন, কিন্তু শুনানির এখনো নিষ্পত্তি না হওয়ায় দখলীসূত্রে জায়গাটি ভোগ করছেন। তাই, বাঁধ নির্মাণ করা হলে তাঁর ভিটে ও বাগান পানিতে তলিয়ে গেলেও তিনি কোনরূপ ক্ষতিপূরণ পাবেন না। তাঁর মতে বাঁধের উচ্চতা ১০০০ ফুট।

এরপর আমরা যাই কালীমোহন চাকমার বাড়িতে। তিনিও একই কথা জানালেন। রসিকচন্দ্রের মত তিনিও একই আশংক্ষা প্রকাশ করলেন। এরপর আমরা হাঁটা দেই প্রবেশ কার্বারির বাড়ির দিকে। তিনি বরইতলী মৌজার চাকমা পাড়ার কার্বারি।

কার্বারির বাড়িতে পৌঁছাতে হলে পাহাড়ের মাথায় উঠতে হয়, সেখান থেকে পুরো এলাকা আমরা পর্যবেক্ষণ করলাম।

প্রবেশ কার্বারির সাথে কথা বলে জানতে পারলাম প্রাথমিকভাবে ৩টি স্থান বাঁধ নির্মাণের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে এবং ছড়ার ভাটিতে এই বাঁধ নির্মাণ হবে। কারণ ছড়াটিতে পানির পরিমাণ তেমন বেশি নয় ও আরো বিভিন্নভাবে ছোট ছোট নালা বা ছড়া এসে নাক্রাই ছড়ায় এসে মিলেছে, ফলে ভাটিতে পানির পরিমাণ বাড়বে। তিনি জানালেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হলেও তাদের ভাগ্যে কোন পরিবর্তন আসবে না। এখানে উল্লেখ্য যে, সেখানে যাওয়ার মত কোন রাস্তা নেই এবং বিদ্যুতেরও কোন ছোঁয়া নেই, এসব গ্রামে যেতে হলে ছড়ার উজানে হেঁটে যেতে হয়। প্রবেশ কার্বারি পাড়ায় ৪০টি পরিবারের বাস রয়েছে বলে জানানো হয়। কার্বারি আরো জানালেন, হেডম্যান তাদের আশ্বাস দিয়েছেন জায়গাগুলোর যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে। তিনি নিজেও বসবাস করেন খাস জমিতে যা পরিমাণ ৮-১০ একর তাই অন্যদের মত তিনিও বিশ্বাস করেননা ক্ষতিপূরণের বিষয়ে। বরং তিনি বলেন, ক্ষতিপূরণ আমরা কেন নেব? আমাদের জায়গায় আমরাই থাকবো। এটা আমার বাপ-দাদার ভিটে। তিনি বাঁধ নির্মাণের জন্য কংজরী হেডম্যানকে দায়ী করেন। খাস জমি বিষয়ে তিনি বলেন তাঁরা ১৯৯৭-৯৮ সালে বন্দোবস্তীর জন্য জমিগুলো সম্পর্কে ভূমি অফিসে রিপোর্ট দেন কিন্তু এখন তা বাতিল হওয়ায় পথে সম্প্রতি তাঁরা জানতে পারেন।

প্রবেশ কার্বারিকে কংজরী হেডম্যান বলেছিলেন এই বাঁধের ফলে সৃষ্ট লেকে তিনি বিদেশি ব্যাঙ চাষ, মাছের চাষ করবেন। যদিও তিনি তা বিশ্বাস করেননি।

এরপর আমরা গোটা জায়গাটি হেঁটে ঘুরে দেখি। আমরা দেখতে পাই ছড়া থেকে ১০০ ফুট উচ্চতায় প্রায় অনেকগুলো বাড়ি রয়েছে। এসব বাড়ির পানি সংগ্রহের একমাত্র উৎস ছড়ার পাড়ে খুঁড়ে তৈরি করা কিছু কুয়া। এছাড়াও তাদের জীবনের বড় একটি অবলম্বন এই ছড়াটি।

ছড়ার গোড়ালিসম পানিতে আমরা হাঁটতে হাঁটতে সুবচন্দ্র ত্রিপুরা কার্বারির বাড়িতে গেলাম। তিনি নাক্রাই মৌজার ত্রিপুরা পাড়ার কার্বারি। তিনিও বাঁধ স্থাপনের বিপক্ষে। তিনি জানান, পাড়াবাসীর কেউই এটি চায় না। তিনি মনে করেন এতে তাদের ফসলী জমিতে পানি সেচের কাজে ব্যাঘাত ঘটবে। তাছাড়া, প্রবেশ কার্বারি পাড়াকে পানিতে তলিয়ে দেয়ার বিষয়টিও তাঁরা সহজভাবে নিতে পারছেন না। তাঁর পাড়ার মানুষদের সাথে কথা বলে তিনি বলেন, যদি কোন আন্দোলন গড়ে ওঠে বাঁধের বিপক্ষে তাহলে তাঁরা সরাসরি সেখানে যোগ দেবেন।

এরপর আমরা যাই কুকিছড়া পাড়ায়, যা প্রথমেই পেরুতে হয়েছিল। বাঁধের স্থান, নাক্রাই পাড়া ও গুইমারা থেকে যাওয়ার রাস্তার সংযোগস্থলেই কুকিছড়া পাড়া, যাকে বলা যায় এই এলাকার মেইন পয়েন্ট। সেখানে গিয়ে আমরা আচাই কার্বারির খোঁজ করি। পরে পাশের একটি দোকানে আমাদের আমন্ত্রণ জানানো হয় এবং সেখানে কিছু গ্রামবাসীর সাথেও আমাদের কথা হয়। চাইলাপ্রু মারমারসহ আরো কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানা গেল তারা খুব ভয়ের মধ্যে আছেন। বাঁধ দেয়া হলে সেখানে আর্মি ক্যাম্প বসানো হবে। আর্মির সাথে সাথে সেটেলারবাহিনীও পঙ্গপালের মত সেখানে এসে হাজির হবে। আরো কিছু তথ্য সেখানে আমরা পাই তা পরে বিশদভাবে আলোচনা করা হবে।

আচাই কার্বারি জানান, তিনি এসবের কিছুই জানতেন না, তাঁকে জানানোও হয়নি। কিন্তু তিনি বিভিন্ন মানুষের সাথে কথা বলে বিষয়টি জেনেছেন। তিনি বলেন তাদের একমাত্র অবলম্বন ধানীজমিগুলো শুকিয়ে যাবে ছড়ায় পানির অভাবে। বাঁধ দেয়া হলে মৌজার বিভিন্ন পাড়ার মধ্যে যে আত্মিক বন্ধন রয়েছে তা নষ্ট হয়ে যাবে। তিনি জানান, সৌর বিদ্যুৎ নিয়ে তাঁরা ভালোই আছেন এবং তাদের এই ধরণের বাঁধের কোন প্রয়োজন নেই।

এরপর আমরা যাই নাক্রাই পাড়ার হেডম্যান মশিপ্রু চৌধুরীর কাছে। পথে পরিচয় হয় হাফছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য থোয়াইমং মারমার সাথে। তাদের সাথে কথা বলে কিছুটা মতের ভিন্নতা আমরা লক্ষ্য করি। মশিপ্রু হেডম্যানের স্পষ্ট কোন বক্তব্য আমরা পাইনি। তাঁর মতে, যেহেতু বাঁধের স্থানটি কংজরী বাবুর সীমানায় তাই এটি তাঁর বিষয়। কংজরী বাবুর মতই তাঁর মত, আলাদা করে তিনি কিছু বলতে চাননি।

তবে, তাঁর কিছু বিষয়ে থোয়াইমং বাবু দ্বিমত পোষণ করলেন। তিনি বলেন, সব কিছুরই ভালো-মন্দ দিক আছে, তাই বাঁধ হলে একদিকে ভালো আবার আরেকদিকে খারাপ। কিন্তু তাঁর মতে ভালোর চেয়ে খারাপ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি, তাই তিনি বাঁধের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তিনি জানান, ক্ষতিপূরণ বা কোন ক্ষতি না হওয়ার যে শর্ত কংজরী বাবু বা জোন কমান্ডাররা দিচ্ছেন তাতে তাঁর আস্থা নেই। তিনি বলেন জালিয়াপাড়ায় হাসপাতালের নামে কাজ শুরু হলেও শেষে দেখা গেছে সেখানে মাত্র একটি ভবন হাসপাতাল করা হয়েছে তাও আবার বিজিবি হাসপাতাল। বাকি ভবনগুলো বিজিবি ব্যবহার করছে এবং সেখানে তারা সেক্টর সদর দপ্তর স্থাপন করেছে। তাই তাদের কোন আশ্বাসই এই এলাকার মানুষদের স্পর্শ করতে পারেনি।

গোটা বিষয়টি নিয়ে আমরা খোঁজ নেয়ার জন্য কংজরী হেডম্যানের সাথে দেখা করার জন্য যাই। কিন্তু তিনি ঢাকায় অবস্থান করার কারণে দেখা করা সম্ভব হয়নি। ফোনে তাঁর সাথে এ বিষয়ে কথা হয়। তিনি জানান, সার্ভে করা শেষ হয়েছে এখন শুধু টেকনিশিয়ান ও ইঞ্জিনিয়ারসহ সেখানে মাপজোকের কাজ শুরু করার কথা। নেটওয়ার্কের ঝামেলার কারণে তখন আর কথা বলা যায় নি। পরে যোগাযোগ করা হলে ব্যস্ত বলে ফোন রেখে দেন। পরেরদিন আমরা আবার ফোন করি এবং এ বিষয়ে তাঁর মতামত চাইলে তিনি এড়িয়ে যান এবং কোন কথা বলবেন না বলে ফোন কেটে দেন। এরপর মং সার্কেল চীফ সাচিংপ্রু চৌধুরীকে ফোন করে বিষয়টি নিয়ে আলাপ করি। তিনি বলেন কংজরী হেডম্যান তাঁকে কিছুই জানায়নি এবং বিষয়টি দেখবেন বলে জানান।

একটু পিছনে ফিরে দেখা আর বর্তমানের সাথে তার সংযোগ স্থাপন

আপনাদের একটু অতীতে ফিরিয়ে নিয়ে যাই। ১৯৭৯ সালে সর্বপ্রথম রাষ্ট্রের উদ্যোগে সেটেলার পুনর্বাসনের কাজ শুরু হয় এবং তা দীর্ঘদিন পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। যদি বর্তমানেও তা চলমান রয়েছে তবে তা অদৃশ্য। আগে যেভাবে সেটেলারদের সরাসরি জমিতে বসিয়ে দেয়া হত তা আর নেই কিন্তু তার রেশ এখনো বিরাজমান। মাঝে মাঝে হঠাৎ করেই আর্মি কনভয়ে দেখা যায় গাড়িভর্তি মানুষ। হয়তো প্রতিদিনই এসব কনভয়ভর্তি হয়ে সেটেলার আসে পাহাড়কে আরো অশান্ত করতে।

আনুমানিক স্বাধীনতার পর গুইমারা রিজিয়ন ক্যাম্প বসানো হয়েছিল। এরপর ১৯৮২ সালে এই রিজিয়নের আর্মিদের সহায়তায় প্রায় শত সেটেলার পরিবারকে নাক্রাইপাড়া, কুকিছড়া পাড়ায় বসিয়ে দেয়া হয়েছিল। আমরা যখন অলিন্দ্র ত্রিপুরার মোটরসাইকেলে চড়ে কুকিছড়া পাড়ায় যাচ্ছিলাম তখন তিনি আমাদের সেসব জায়গা দেখিয়ে দেন। প্রায় ৩৫০-৪০০ একর জায়গা জুড়ে সেটেলার বসতি ছিল যার প্রকৃত মালিক ছিল মারমা ও ত্রিপুরারা। এটি বরইতলী মৌজার অন্তর্গত কুকিছড়া পাড়া থেকে ১ কিমি দূরে। গুইমারা থেকে কুকিছড়া পাড়ায় আসতে হলে বাঙালি পাড়াটি আগে অতিক্রম করতে হত। আর্মিরা সেটেলারদের নিয়ে আসার সাথে সাথে প্রতিটি পরিবারকে ১ একর জমি ভিটের জন্য আর ৫ একর জমি দেয়া হয় চাষের জন্য। কিন্তু সেখানে স্থান সংকুলান না হওয়ায় আরো কিছু দূরে সুবচন্দ্র কার্বারি পাড়ার বিশাল একটা জায়গা বরাদ্দ দেয়া হয়। পরবর্তীতে শত পরিবার প্রায় ৪০০ পরিবারে উন্নীত হয়। সেটেলার পাড়ার আশেপাশেই সবসময় আর্মি ক্যাম্প রাখা ছিল যা পাহাড়ের নিরাপত্তার এক হাস্যকর নমুনা। পার্বত্য চুক্তির আওতায় এই আর্মি ক্যাম্পগুলো ২০০৬ সালের দিকে সরিয়ে নেয়া হয়। এরপর ২০০৯-১০ সালের দিকে পাহাড়িদের সাথে সেটেলারদের দ্বন্দ্ব শুরু হয় এবং তা সংঘাতে রূপ নেয়। পাহাড়িরা একজোট হয়ে সেটেলারদের সেখান থেকে উৎখাত করে এবং দখলে যাওয়া মারমা ও ত্রিপুরা অধ্যুষিত এলাকাটি পুনঃরুদ্ধার করে। সেটেলারদের সাথে সংঘাত চলাকালে আর্মি একটি ক্যাম্প বসানোর চেষ্টা সেখানে করা হলেও পাহাড়িরা তা ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেয়। এরপর আর আর্মিরা সেখানে তাদের যাতায়াত কমিয়ে দেয়।

গ্রামবাসী ও কার্বারিদের সাথে কথা বলার সময় সবাই বাঁধ নির্মাণের নামে সেটেলার প্রবেশের সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন। তাদের সবার মতে, বাঁধ নির্মিত হলে সেখানে আর্মি ক্যাম্প বসানো হবে। রাস্তার উন্নয়নের পাশাপাশি এলাকায় কিছু সুযোগ-সুবিধাও বাড়বে। কিন্তু তারা তা চান না। তারা এখন যেভাবে আছেন সেভাবেই থাকতে চান। সেটেলাররা তাদের এলাকায় প্রবেশ করে নতুন করে ঝামেলা সৃষ্টি করবে বলে তারা আশংক্ষা প্রকাশ করেন। তারা মনে করেন, পাহাড়ি গ্রাম হওয়ার কারণে এখন যেভাবে পাহাড়ি মেয়েরা রাস্তায় চলাফেরা করে, বনে-জঙ্গলে কাজ করে সেটেলারদের আগমন ঘটলে তা আর সম্ভব হবে না। আর্মি কমান্ডাররা হয়তো বাঁধ দেয়ার নামে সেখানে আবার সেটেলারদের ফিরিয়ে আনবে, কারণ কার্বারিদের মুখে শুনলাম বিভিন্ন মিটিঙে সেটেলাররা আর্মিদের কাছে তাদের জমি ফিরিয়ে দেয়ার দাবি করে। পাহাড়িরা এর জোর প্রতিবাদ জানালে সেখানে পরিস্থিতি অশান্ত হওয়ার উপক্রম হয়। আর্মি-পুলিশ-প্রশাসন সবসময় সেটেলারদের পক্ষে কাজ করেছে এবং এখনো করছে বলে তারা আমাদের কাছে জোর দাবি করেন।

আরো একটি বিষয়ঃ পর্যটন

গোটা এলাকা ঘুরে দেখা গেছে এখানকার পরিবেশ খুব সুন্দর। প্রকৃতির সাথে নিবিড়ভাবে একাত্ম হওয়ার মতোই জায়গাটি। তাই, বাঁধ নির্মাণ হলে সেখানে যে লেকটি সৃষ্টি হবে তার পুরোপুরি সদ্ব্যবহার করবে আর্মিরা। তখন তারা সেখানে তৈরি করবে আরো একটি নীলগিরি, আরো একটি সাজেক। পার্শ্ববর্তী পাহাড়িরা ভিটে হারিয়ে পাহাড়ের আরো ভিতরে চলে যাবে আর তখন তাদের কঠোর পরিশ্রমের জীবিকার ছবি তুলে কুমিরের অশ্রু বিসর্জন ঘটবে দেশের সুশীলরা। কংজরী হেডম্যান যে বিদেশি ব্যাঙ, মাছ চাষের কথা বলেছেন ত হয়তো পরবর্তীতে পর্যটনেরই একটি অংশ হয়ে যাবে।

এলাকার মানুষ উন্নয়ন চায়, নিজেদের জীবনযাত্রার উন্নতি চায় তবে নিজেদের বিপদে ফেলে নয়। এই বাঁধ তাদের জীবনে অভিশাপ নিয়ে আসবে, পুরোনো রাঙ্গামাটির ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তাদের সতর্ক হতে শিখিয়েছে। আমরা হিল ব্লগার এন্ড অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরাম এই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি এবং পরবর্তীতে এর বিরুদ্ধে গণআন্দোলন গড়ে তুলতে আমরা বদ্ধ পরিকর এই দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করছি।

About the author

সংবাদদাতা

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/2909

4 comments

8 pings

Skip to comment form

  1. U Khing Saing Marma

    এই সবের মানে হচ্ছে পাহাড়ীদেরকে নিজ ভূমি থেকে বিতাড়িত করা। কাপ্তাই জলবিদুৎ এর অর্থ ছিল লাখ লাখ পাহাড়ীদের উচ্ছেদ হওয়া। আর আমাদের ভূমিতে কাপ্তাই জলবিদুৎ থেকে আমরা তো সবাই বিদুৎ ব্যবহার করতে পারছি না। তাহলে আমাদের ভূমিতে আরেকটি কাপ্তাই এর মত জলবিদুৎ হল পাহাড়ীদের নিষ্ক্রিয় করার আর একটি পন্থা। তাই আমাদের সকলকেই এটির তৈরিতে প্রতিরোধ করতে হবে।

  2. Manasvi Prasad Chakma

    আমরা আর সহ্য করবোনা । আমাদের জন্মের আগে আজুরা আশ্রয় নিয়েছিলেন ভারতে । আমরা আর তা করবোনা । কঠোর আন্দোলন হবে পত্যেক ইউনিয়নে, প্রত্যেক উপজেলায়, প্রতেক কলেজে, প্রত্যেক ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে, যেখানে আমদের মত জুম্ম প্রতিনিধি আছে । আমরা রুখবই ।

  3. nidarshan khisa

    তথাকতিত উন্নয়নের নামে পাহড়ি উচ্ছেদের বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলা ছাড়া আমাদের আর কোন বিকল্প পথ নেই।

  4. একজন অঘটন-ঘটন-পটায়কের জন্য

    পাহাড়ের অলিখিত লতাপাতায় ছাপা হওয়া জৈবনিক অভিধানে বাঙালি শব্দটার অর্থ একটাইঃ 'সেটেলার', 'দখলবাজ'। একে অস্বীকার করে যে মিথ্যুকেরা, তাদেরকে ঘৃণা ছাড়া অন্য কিছুই জ্ঞাপন করবার নেই।

  5. Nostalgic Nishan

    we have to protect our jummoland….

  6. mongshai

    এটা কি ব্যক্তিগত উদ্যোগে নাকি সরকারী উদ্যোগে বুঝলাম না,আমি নিবাহী প্রকৌশলীকে জিজ্ঞাস করেছি তিনি কিছুই জানেন না বলেছেন,নাকি কংজরী বাবুর ব্যক্তিগত,বিস্তারিত জানিনা,তবে নিঃসন্দেহে প্রতিরোধ করতে হবে ।

  7. Sabina Reza Lishu

    দাদা আমি আপনাদের সাথে আছি । অবশই এ প্রকল্প হতে দেয়া যাবেনা ।

  8. Monimoy Khisa

    unity is strength

  9. Monimoy Khisa

    unity is strength

  10. Sowhardya Dewan

    কিছু চিহ্নিত লেজুর আর উশ্চিষ্টভোগীর উচ্চবিলাসী স্বপ্ন পুরনের শিকার হয় নিরিহ জুম্মরা।পাকিস্তান সরকার ক্ষতিপুরন আর বিনামুল্যে বিদ্যুতের লোভ দেখিয়ে ৫৪ হাজার একর আবাদি জমি পানির নিচে তলিয়ে দিয়েছে।সাথে কেড়ে নিয়েছে পুর্বপুরুষের আকড়ে ধরা ভিটেমাটি।
    আজ প্রায় ৬০ বছর পর একি কায়দায় ভিটেমাটি কেড়ে নেওয়ার পায়তারা চলছে।
    আমরা এমন উন্নয়ন চাইনা যে উন্নয়ন মানুষের বেচে থাকার স্বপ্ন ধুলিস্যাৎ করে দেয়।

  11. Trackless Chakma Bukku

    কাপ্তাই জলবিদ্যুত দিয়ে বাংলাদেশের সবচচাইতে বড় জেলা রাংগামাটি ডুবিয়ে লাখখানেক আদিবাসী উচ্ছেদ করা হলো, নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে যুদ্ধ ঝিইয়ে রেখে চালানো জাতিগতভাবে সেনা আগ্রাসন আর নিপীড়ন, সেটেলার দিয়ে নিজ ভুমি হতে আমাদের উৎখাত করা হলো, সর্বশেষ যে মাটিটুকু আকড়ে ধরে এখনও এদেশের নাগরিকত্ব কোনরকম বাঁচিয়ে রেখেছি, তখন শুরু হলো আরেক কর্নফুলীর কান্না বাস্তবায়নের নতুন চক্রান্ত

  1. গুইমারায় জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নামে পাহাড়ি উচ্ছেদের পাঁয়তারা! - chtnews.com

    […] সূত্রে ও জুম্মো ব্লগের (chtbd.org) সরেজমিন এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, […]

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>