«

»

এই লেখাটি 726 বার পড়া হয়েছে

Print this প্রকাশনা

‘নাম’ এর গুরুত্ব ও তাৎপর্য

‘নাম’ নামক এই বিশেষণটি প্রথম কোথায় এবং কবে জন্মলাভ করে বলা দুরুহ ব্যাপার । তবে মানব জাতির ক্রমবিবর্তনে সভ্যতা বিকাশের ধাপে ধাপে মুখের ঊচ্চারিত শব্দ থেকে কথা ও ভাষার জন্ম নেবার সাথে সাথে ‘নাম’ এর জন্ম হয় । এভাবে গাছপালা, পশুপক্ষী, ফলমূল ও ব্যবহার্য্য জিনিস পত্রাদির নাম করণ হতে থাকে । এভাবে সভ্যতা বিকাশের কোন এক পর্যায়ে পৃথিবীর মানুষ প্রত্যকে পৃথক ও স্বতন্ত্র পরিচয়ের প্রয়োজন বোধ করে এবং তাই এক এক ব্যক্তি এক এক নাম রাখতে শুরু করে । কালের আবর্তে ব্যক্তি বিশেষের নামে গোত্রের নাম জনপদের নামের সৃষ্টি হয় । এভাবে সভ্যতার ক্রমবিবর্তনে গতি পথে এক এক জাতির এক এক ভাষা, কৃষ্টি, রীতিনীতি ও ঐতিহ্যের জন্মলাভে প্রত্যেক জাতিসত্তা নিজস্ব স্বকীয়তা নিয়ে স্বতন্ত্রভাবে আত্মপ্রকাশ করতে থাকে । তাই এক জাতিসত্তার ভাষা, কৃষ্টি ও ঐতিহ্য অন্য এক জাতির ভাষা কৃষ্টি ও ঐতিহ্যর মধ্য বৈসাদৃশ্যতা লক্ষ্য করা যায় ।

ভাষার মাধ্যমে যেমন কোন এক জাতির পরিচয় পেতে পারি, তেমনি এক ব্যক্তির নামের মাধ্যমে ও সে ব্যক্তির জাতিসত্তার পরিচয় পেতে পারি । অর্থাৎ নাম শ্রবনেই ব্যক্তিটি কোন জাতিভুক্ত তা আমরা সহজেই অনুমান করতে পারি । এই ‘নাম’টিই কোন ব্যক্তির গোত্রের বা জাতির পরিচয়ের প্রধান বাহক বা পতাকা । সুতরাং অতি সহজেই উপলব্ধি করতে পারি । ‘নাম’ এর গুরুত্ব ও তাপর্য কতখানি রয়েছে ।

একটি জাতির জাতীয়তার পরিচয় তাদের কৃষ্টি, সভ্যতা, রীতিনীতি ও ঐতিহ্যের মাধ্যমে পেতে পারি । যেমন ভাষা, বেশভুষা বা পোষাক-পরিচ্ছদ ইত্যাদি সভ্যতা ও কৃষ্টির এক একটি অঙ্গ, তেমন নাম নামক বিশেষ্যটি সভ্যতা ও কৃষ্টির একটি গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য অঙ্গ । প্রত্যেকটি অঙ্গের পরিপুষ্টতা যেমন একটি সুন্দর ও সবল ব্যক্তির জন্য অপরিহার্য তেমনি প্রত্যেক জাতির সংস্কৃতি, কৃষ্টি, সভ্যতা ও ঐতিহ্যের সবলতা ও পরিপুর্ণতার জন্য তার প্রত্যেকটি অঙ্গের পরিপূষ্টতার প্রয়োজন । তবে কোন একটি অঙ্গের হানি হলে তাকে আর পরিপূর্ণ বলা যাবে না । তাই সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এই ‘নাম’ নামক অঙ্গের হানি হলেও কোন ব্যক্তি বা জাতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের হানি হয়েছে বললে মোটেই ভুল হবে না ।

পুতুলের দোকানে কোনটি কোন জাতির পুতুল বুঝবার জন্য ঐ জাতির পোষাক পরিচ্ছদ দেখেই স্বতন্ত্র চিহ্নিত করা হয় এবং ঐ পোষাক-পরিচ্ছদ দেখেই আমরা বুঝতে পারি যে কোনটি কোন জাতির পুতুল । শাড়ি পরিহিত কোন পুতুলকে চাইনীজ বা অন্য যে কোন জাতির পুতুল বলে যেমনি চালিয়ে দেয়া যাবে না এবং কোন বাঙ্গালী রমণীকে চাইনীজ রমণীর পোষাক পরিধান করলে সুন্দর লাগলেও যথার্থ লাগবে না, তেমনি কোন বাঙ্গালীর নাম ইংলিশ হলে ঠিক তদ্রুপ সুন্দর শোনাবে না । উপরন্তু উক্ত বাঙ্গালীর যথার্থ পরিচয় প্রকাশ পাবে না এবং তার এই অসংগতিপূর্ণ বেমানান বিদেশী নাম তার ও জাতির সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অঙ্গ হানি স্বরূপ । এই পৃথিবীর প্রত্যেক সভ্য জাতির নিজস্ব কৃষ্টি, ঐতিহ্য ও রীতিনীতি আছে । তাই প্রত্যেক জাতির মানুষের নাম ও ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে । যে জাতির নিজস্ব ভাষা ভিত্তিক কোন নাম থাকে না বা যাদের নিজস্ব ভাষা ভিত্তিক নাম নাই বা তা হারিয়েছে এবং তাই অন্য জাতির ঐতিহ্যগত ‘নাম’কে নিজেদের বলে গ্রহণ করেছে বা গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছে, সে জাতির মধ্যে অপসংস্কৃতির প্রবেশ এবং ঐতিহ্যগত কৃষ্টি নাশ হয়েছে বললে মোটেও অত্যুক্তি হবে না । কালের আবর্তে ইতিহাসের রূঢ় বাস্তব পদাঘাতে অনেক জাতির এহেন নিজস্ব কৃষ্টি ও ঐতিহ্যের তথা সভ্যতার বিনাশ বা বিলুপ্তি ঘটেছে এবং তদ্রুপ এখনো প্রতিনিয়ত ঘটতেছে । এইরূপ বিলুপ্তি বা ক্ষয়রোগ থেকে নিস্কৃতি পেতে হলে প্রত্যেক ব্যক্তিকে আত্ম-সচেতন হতে হবে । প্রত্যেক জাতির অন্তরে তাদের নিজস্ব কৃষ্টি, রীতিনীতি ও ঐতিহ্যের প্রতি দরদ, ভালভাসা ও শ্রদ্ধার বহ্নিশিখা জ্বালাতে হবে । আত্ম-সচেতনতাহীন যে কোন জাতি এভাবে কালের আবর্তে বিলীন হয়ে যাবে । তার অর্থ কৃষ্টি ও ঐতিহ্য বিহীন জাতি শিকড় বিহীন কোন পরগাছার মত, তা যতই সুন্দর ও মনোরম হোকনা কেন পরনির্ভরশীল ও মূল্যহীন বটে । এহেন জাতিসত্তার স্বতন্ত্র কোন স্বকীয়তা থাকে না হেতু অস্তিত্ব থেকেও অস্তিত্বহীন, জীবন থেকে ও মৃত ।

আমি এখানে শুধুমাত্র ‘নাম’ নামক কৃষ্টির একটি অন্যতম অঙ্গকে নিয়ে আলোচনা করছি ।আসুন মারমা বা রাখাইন জাতির (মগ) ‘নাম’ নিয়ে কিছু আলোচনা করি । তাদের নাম অত্যন্ত তাপর্যপূর্ণ ও অর্থবহ । বহুপূর্বে বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাবে তাদের বিশেষত শাসকদের নাম ও পালি ভাষার ছিল । যেমন রাজা চন্দ্র সূর্য্য (প্রায় পাঁচশত খৃষ্ট পূর্বাব্দে), ষোল চন্দ্র সিংহ (দশম শতাব্দী) পরিবর্তীতে পালি ভাষার নাম মুছে গিয়ে নিজস্ব ভাষার নাম করণ হয় । যেমন মাংথী, বোমাংগ্রী কং হ্লা প্রু ইত্যাদি । রাখাইন/মারমাদের নামের বৈশিষ্ট্য সমূহ অত্যন্ত মার্জিত, শ্রুতিমধুর ও ঐতিহ্যপূর্ণ । পুরুষদের নামে শৌর্য বীর্য, গুণ কাঠিন্য, মহত্ব প্রভৃতি শব্দ সম্ভারের ব্যবহার দেখা যায় । আর মেয়েদের নামে ফুলের নাম, সৌন্দর্য্য, প্রেম- প্রীতি, কোমলতা, মনিমূক্তা প্রভৃতি শব্দের ব্যবহার দেখা যায় । সাধারণত পুরুষ ও স্ত্রী উভয়ের নাম তিন শব্দ বিশিষ্ট হয়ে থাকে । দুই শব্দ বিশিষ্ট নামও রয়েছে, তবে তা সাধারণত ডাক নামের বেলায় হয়ে থাকে । পুরুষদের নামের তিনটি শব্দের মধ্যে অন্তত দুইটি শব্দ শৌর্য বিষয়ক শব্দ হবেই এবং মেয়েদের নামের তিনটি শব্দের মধ্যে অন্তত দুইটি শব্দ, ফুল, মনিমুক্তা প্রভৃতি বিষয়ক শব্দ হবেই । নীচে পাঠকদের সহজ উপলব্দির নামের উদাহরণ দেয়া গেল । পুরুষের নাম—থোয়াইংঅংগ্য ।

থোয়াইং অর্থ প্রজ্বলিত, অং অর্থ সাফল্য এবং গ্য অর্থ অতিক্রম করা বা বিখ্যাত । অর্থাৎ পুরো নামের অর্থ প্রজ্বিলত বিখ্যাত সাফল্য । মেয়ের নাম- পাইং ক্রানু । পাইং ফুল, ক্রা- পদ্ম এবং নু কোমল/কচি । অর্থাৎ সম্পুর্ণ নামের অর্থ কোমল পদ্ম ফুল । কয়েক শব্দ উভয় লিঙ্গের নামে সমানভাবে ব্যবহৃত হয় । যেমন শোয়ে-সোনা (মূল্যবান অর্থে), প্র/ফ্রু শ্বেত, ফর্সা ( সুন্দর মনের অর্থে ) । তবে মং, কো শব্দ সমূহ শুধুমাত্র মেয়েদের নামে ব্যবহৃত হয় । করণ সে গুলোর অর্থ পুরুষ । আবার ‘মাঃ’ ও ‘মে’ এবং ‘ড’ শুধুমাত্র মেয়েদের নামে ব্যবহৃত হয় । কারণ তার অর্থ নারী ।

পরিবারের প্রথম সন্তানের (পুং/স্ত্রী ) নামের শুরুতে ‘উ’ শব্দটি প্রথম, অগ্রজ, প্রধান অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে । যেমন- উ ক্য জাই (পুং) উ মে নু (স্ত্রী) আবার কনিষ্ঠ সন্তানের নামে ‘থুই’ শব্দটি কনিষ্ঠ অর্থে নামের প্রথমে, মাধ্যমে বা শেষের যে কোন স্থানে ব্যবহৃত হয়ে থাকে । যেমন- থুই মং প্রু (পুং) এবং থুই মে প্রু (স্ত্রী) ।

রাখাইন/মারমাদের নামের সাথে বার্মিজ নামের কিছুটা অমিল লক্ষ্য করা যায় । প্রথমতঃ বার্মিজদের নাম সাধারণত দুই শব্দ বিশিষ্ট হয়ে থাকে । ‘উ’ শব্দটিকে বার্মিজরা শুধুমাত্র বয়োজ্যেষ্ঠ বা সম্মানীত ব্যক্তিদের নামের আগে ইংরাজীর মিষ্টার, বাংলায় শ্রী বা জনাবের মত ব্যবহার করে থাকে । প্রথমা কন্যার নামে ‘উ’ শব্দটি ব্যবহার করা হলেও তা নামের শেষে সংযোজন করা হয় । যেমন- টিং টিং উ । বার্মিজ বয়োজ্যেষ্ঠ মহিলাদের নামের পূর্বে ‘ড’ শব্দটি ব্যবহৃত হয় বাংলার জনাবা/শ্রীমতীর মত । অন্যদিকে রাখাইন/ মারমাদের মেয়েদের যে কোন বয়সে ‘ড’ ব্যবহৃত হতে পারে । বার্মিজদের পুরুষের বয়স বাড়ার সাথে সাথে ( বয়স ৩০-৪০ বৎসর হলে ) ‘মং’ থেকে ‘কো’ শব্দটি লেখা হয় । তবে কো’ শব্দ না লেখে ঐ বয়সে উচ্চ পদে আসীন হলে ‘উ’ লিখা হয় । মেয়েদের বেলায়ও ঠিক তেমনি ‘মাঃ’ পরে ‘ড’ ব্যবহৃত হয় । কিন্তু মারমা/রাখাইনদের নামে বয়স ভেদে বা শ্রেণী ভেদে কোন শব্দের ব্যবহার নেই । তা সাম্যতার পরিচায়ক বটে । তবে ইদানীং কোন কোন অঞ্চলের রাখাইন মারমারা বার্মিজদের উক্ত রীতিনীতি সমূহকে অনুকরণ করতে দেখা গেছে । এহেন অনুকরণের প্রবনতা সত্যিই প্রশংসনীয় নয় । পূর্বে ইংরেজ আমলে গুটিকয়েক ব্যক্তি ইংরেজী স্কুলে পড়াশুনা করতে গিয়ে ইংলিশ নাম রেখেছে এবং পরবর্তীকালে সেই প্রভাব তার পরবর্তী বংশধরদের উপরেও পড়ে এবং তাদের নাম ও ইংলিশ রাখা হয়েছে এবং ইংলিশ নাম রেখে তারা শিক্ষিত ও শ্রেষ্ঠতর প্রমাণের চেষ্টা করেছে । অনেককে বাংলা নামও বেশ গর্বের সাথে রাখতে দেখা গেছে । এই ব্যক্তিগণ একদিকে যেমন নিজস্ব কৃষ্টি ও ঐতিহ্যের প্রতি ঘৃণা ও অশ্রদ্ধা দেখিয়াছেন এবং অন্যদিকে পরকৃষ্টি ও ঐতিহ্যকে উৎকৃষ্টতর, শ্রেষ্টতর, মনে করে নিজের অঙ্গে নিজে ক্ষত সৃষ্টি করে কলঙ্ক লেপন করেছেন ।

ইতিহাসের পাতা থেকে দেখা যায় যে পরাধীন জাতিরা শাসক জাতিদের প্রভাবে তাদের সংস্কৃতিকে শ্রেষ্ঠতর মনে করত এবং এভাবে শাসিতরা শাসকদের সবকিছুকে অন্ধ-অনুকরণ করতে গিয়ে নিজেদের ঐতিহ্যেগত ‘নামকে’ পর্যন্ত মুছে দিয়ে শাসক জাতির নামকে সগর্বে ধারণ করত । অথবা কোন অধীন রাজা তার বশ্যতা স্বীকারের প্রমাণে উপরিস্থিত রাজার দেয়া উপাধি ও খেতাব অথবা নাম ধারণ করত এবং শাসিতগন বৃহৎ জাতি গোষ্ঠীর কৃষ্টি ও পারিপার্শ্বি কতার প্রভাবে তাদের নিজস্ব সব কিছুর জলাঞ্জলি দিতে বাধ্য হত । এভাবে তারা কোন এক সময়ে নিজেদের ঐতিহ্যগত ‘নাম’ ভুলে যেত আর অনেকে তা জেনে শুনেও মান মর্যাদার ভয়ে নিজেদের ভাষা ভিত্তিক প্রকৃত ঐতিহ্যগত নাম রাখতে লজ্জা ও কুণ্ঠা বোধ করত । এভাবে তারা বৃহৎ জাতি গোষ্ঠীর ছায়ায় রূপান্তরিত হয় ।

নাম নামক এই পরিচয়ের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম বা পরিচয়পত্রকে কি কখনো এভাবে হারানো উচিত ? এখন যদি প্রশ্ন রাখা হয় যে, ‘উৎপল’ নামক ব্যক্তিটি কোন জাতিভূক্ত বা কোন দেশীয় ? কেউ কেউ বলবেন বাঙ্গালী, ভারতীয় । আবার কেউ কেউ বলবেন মনিপুরী, গারো, চাকমা, সাওতাল,ত্রিপুরা বা বড়ুয়া । তাহলে এই ‘উৎপল’ নামটি কতকগুলি জাতিস্বত্তার নাম হিসাবে পরিচয় দিচ্ছে তবে একজন বাঙ্গালী বুক ফুলিয়ে নিঃসংকোচে বলবেন ‘উৎপল’ নামটি বাঙ্গালীর ঐতিহ্যবাহী নাম । তার এই উত্তরের বিরুদ্ধে কেউ কি আপত্তি করতে পারবেন ? কখনো না । কারণ তার দাবীই সত্য । সে জন্য এই ‘উৎপল’ নামের পেছনে কয়েক জাতিগোষ্ঠী তাদের প্রকৃত পরিচয় দেবার জন্য নিজস্ব জাতির (গোত্র ) নাম লিখতে বাধ্য হয় এবং তা না লেখলে তার পরিচয় অসম্পূর্ণ রয়ে যায় । তাহলে বলা যায় যে ‘উৎপল’ শব্দটিই প্রকৃত বা মূল নাম তার পেছনে জুড়ে দেয়া নামটি মূল নামের পদাশ্রিত অলংকার মাত্র । সুতরাং এভাবে অপরের সংস্কৃতিকে নিজের মনে করে গ্রহণ করার ফলাফল কি হতে পারে বা কি হয়েছে তার আর বিস্তারিত বলার প্রয়োজন নেই । আমি শুধুমাত্র একটি সত্য কথাই বলব, তা হলো, এতে আত্মসচেতনতা, আতআত্মমর্যাদা ও স্বজাতি প্রেম বিলুপ্ত হয় । অর্থাৎ এগুলিই কোন সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য তথা সমগ্র জাতির বিলুপ্তির অন্যতম কারণ সমূহ ।

অনেক সময় দেখা গেছে যে, কোন কোন ব্যক্তি ধর্মান্তরিত হলে নিজের পিতামাতার দেয়া ঐতিহ্যগত নামকে মুছে ধর্ম গুরুদেবদের প্রদত্ত নতুন নামকে গ্রহণ করে নতুনভাবে পরিচয় দিয়েছে । শুধু তাই নয়, গুরুদেবদের সংস্কৃতিকেই শ্রেষ্ঠতম মনে করে তাদের অন্ধ- অনুকরণ করেছে । ধর্মান্তর একদিন, এক ঘন্টার মধ্যে হতে পারে কারণ তা’ নিতান্তই কোন ব্যক্তির ব্যক্তিগত বিশ্বাস মাত্র । কিন্তু সে ব্যক্তি তার পিতৃ পরিচয় একদিনে কেন সারাজীবনে ও পরিবর্তন করতে পারবেনা । তাই পিতার কৃষ্টি ও ঐতিহ্য তথা সমগ্র জাতির কৃষ্টি ও ঐতিহ্য ধর্মান্তরের কারণে মুছে ফেলা উচিত নয় । কোন সাঁওতাল খৃষ্টান ধর্মে দীক্ষিত হলেও সে কখনো তার ধর্মগুরুর জাতিকে রূপান্তরিত হবে না । তাই সে সাহেবদের দেয়া নাম ‘ফিলিপ’ রাখলেও কোনদিন সাহেব ফিলিপ হবে না । সে আজীবনই সাওতাল ফিলিপ হয়ে থাকবে । তার পিতৃরক্ত তার পরবর্তী কয়েক জেনেরেশন পর্যন্ত অপরিবর্তিত থাকবে । কাকের গায়ে ময়ুর পেখম কখনো সাজে না । বরং তা বিদ্রুপের বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়ায় এবং তা’ নিঃসন্দেহে আত্মঘাতী চেতনা ও মনোবৃত্তি ।

আমাদের দেশেও অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিসত্তা বিভিন্ন কারণে তাদের ঐতিহ্যগত ‘নাম’কে হারাতে চলেছেন । দেশে দেশে এই যে ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও তা’র মূল্যবোধের অবক্ষয়তা রোধ করতে না পারলে অপসংস্কৃতি ও পরসংস্কৃতি অলংকারের ভারে সকল জাতি কুঁজো হয়ে যাবে এবং অন্ধঅনুকরণের ফলে জাতি হবে পথভ্রষ্ট ও পরিশেষে বিলুপ্ত ।

পৃথিবীর সকল জাতিসত্তার প্রতি আহবান হলো- সংস্কৃতি, কৃষ্টি, সভ্যতা, ঐতিহ্য ও ইতিহাস বিকৃতকারী ও জাতি বিধ্বংসী এ সকল অপসংস্কৃতি অবচেতনা, ও মোহ পরিত্যাগ করে মুক্ত হোন, নিজেদের লুপত ঐতিহ্যকে পুনরুদ্ধার, সংস্কার করে তাকে মহিমাণ্বিত করুণ এবং তাকে হারানো মর্যাদায় পুনঃ প্রতিষ্ঠা করুন এবং তার জয় কীর্তনে নিজেদেরকেও গৌরবাণ্বিত করুন । কৃষ্টি ও ঐতিহ্যের একটি অঙ্গ ‘নাম’ নামক এই বিশেষ্যটির গুরুত্ব ও মহিমা পৃথিবীতে যুগে যুগে, কালে কালে, কখনো ম্লান হয়নি এবং তা ভবিষ্যতেও ম্লান বা মলিন হবে না, কারণ ইহাই তো পৃথিবীর সভ্যতার ইতিহাসের প্রতিটি ঘটনার ‘নায়ক’ ছিল এবং এভাবে নায়ক সেজে থাকবে যুগে যুগে, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ।

লেখকঃ উ চ হ্লা

এল, এল, বি (সম্মান)

এল,এল, এম,

বি,সি,এস, বিচার)

W.O.M. S. এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি

B.M.B.A. এর প্রতিষ্ঠাতা,সাংস্কৃতিক ও সাংগঠনিক সম্পাদক(বর্তমানে সহ সম্পাদক)

B.A.T.W.F এর অস্থায়ী নির্বাহী কমিটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য

Royel Marma Cultural Group এর প্রতিষ্ঠাতা, আহবায়ক ।

v  বিঃ দ্রঃ –লেখাটি প্রকাশকাল ১লা বৈশাখ- ১৪ই এপ্রিল ১৯৮৫ ইং সালে ‘’নবোদয়’’ ম্যাগাজিন নামক, সাহিত্য বিভাগ, উপজাতীয় নবোদয় সংঘ (উনস) বান্দরবান কর্তৃক প্রকাশিত হয়েছিল ।

About the author

জুম্মো ব্লগার

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/2904

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>