«

»

এই লেখাটি 131 বার পড়া হয়েছে

Print this প্রকাশনা

অপ-ব্যাখ্যার গোলকধাঁধায় “আদিবাসী” ধারণা

গত ১৬ জুলাই ২০১৩ chtnews24.com সংখ্যায় প্রকাশিত একটি রিপোর্টে দেখলামঃ বান্দরবনে অতি সম্প্রতি কিছু রঙ্গিন প্রচারপত্র বিলি হয়েছে । সেই সঙ্গে দেয়ালে কিছু পোস্টারেও সাটাঁ হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম সচেতন নাগরিকবৃন্দের নামে প্রচারিত ঐসবন প্রচারপত্রও পোস্টারে যা বলবার চেষ্টা করা হয়েছে তা হলঃ ঐতিহাসিক তথ্য অনুসারে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতিয়রা বার্মা, ভারত ও চীন থেকে বিতাড়িত হয়ে মাত্র দুই থেকে আড়াই শত বছর আগে পার্বত্য চট্টগ্রামে আশ্রয় গ্রহণ করে । পক্ষান্তরে বাঙ্গালীরা হাজার বছর ধরে বৃহত্তর চট্টগ্রামে (পার্বত্য চট্টগ্রামেসহ ) বসবাস করে আসছে ।

সুতরাং উপজাতিয়রা নয় বাংগালিরাই পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী । সম্প্রতি উপজাতীয়রা যে নিজেদের উপজাতীয় হিসাবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবী জানাচ্ছে তা প্রচারপত্র বিলিকারিদের মতে অযোক্তিক, ষড়যন্ত্রমূলক ও বিভ্রান্তিকর । প্রচারপত্রের প্রেক্ষিতে এই মর্মে একটি বক্তব্যও নজরে আসে যে, এখন থেকে বাঙ্গালিরাই পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী হিসাবে স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবী জানাতে আন্দোলন শুরু করবে। সেই সঙ্গে এই অঙ্গীকারও করা হয় যে, আদিবাসী শব্দ ব্যবহার করে উপজাতীয়দেরকে কোন অবস্হাতেই এই দেশকে বিচ্ছিন্ন করতে দেয়া হবে না ।“ এই দেশকে বিচ্ছিন্ন করতে দেয়া হবে না” উক্তিটি্র মাধ্যমে কোন দেশকে বিচ্ছিন্ন করতে না দেয়ার কথা বলা হয়েছে তা কিন্তু স্পষ্ট নয় । যদি ইঙ্গিতটি বাংলাদেশকে নিয়ে করা হয় তা হ’লে আশংকার কি কোন কারণ আছে? বাংলাদেশ তো একটি স্বাধীন দেশ । একটি স্বাধীন দেশ আবার কোন দেশ হতে বিচ্ছিন্ন হতে যাবে! এছাড়া উপজাতিয়দের বিরুদ্ধে আরও কিছু গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে যা একজন যুক্তিবাদী ও বাস্তববাদী ব্যক্তি কখনই ভাবতে পারেন না । আসলেই এমন অভিযোগ আনাও ঠিক না যা অভিযোগকারীর জন্য বুমেরাং হয় ।

Chtnews24.com­_ এ প্রকাশিত সংবাদের দুটি বিষয় যথেষ্ট গুরুত্ব সহকারে আলোচনার দাবী রাখে । একটি হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রামে ঐতিহাসিক পটভুমি আর আন্যটি হ’ল এখানকার সংখ্যাস্বল্প জাতিসত্তাভুক্ত জনগোষ্ঠী্রা আদিবাসী না উপজাতি – এ বিষয়ক আলোচনা । পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পরকে যে ইতিহাস সাধারণ্য প্রচলিত আছে তা প্রকৃত নয়, একটি খন্ডিত ইতিহাস এবং কোন কোনক্ষেএে সত্ত্যের অপলাপ মাত্র । প্রকৃত ইতিহাসের থোক বিবরণ এখনও অধিকাংশ মানুষের অজানা । প্রকৃত ইতিহাস সম্পরকে সম্যক ধারণা না থাকায় পার্বত্য চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের ভিন্নভাষী সংখ্যাস্বল্প জাতিরগোষ্ঠীর পরিচয় নিয়ে রাজনীতির কূটকৌশলের আশ্রয় নিয়ে পরিস্থিতিকে ঘোলাটে করার অপচেষ্টা ক্রমশঃ বেড়ে চলেছে । তাই পার্বত্য চট্টগ্রামে শুভাকাঙ্খী ও বিরোধী উভয় পক্ষের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রকৃত ইতিহাসকে তুলে ধরার কোন বিকল্প নেই। কিন্ত আন্তরজাতিক আদিবাসী দিবস উদযাপন লগ্নে বাংলাদেশে চলমান “ আদিবাসী ও অ- আদিবাসী বিতক ’’ অগ্রাধিকারের বিবেচনায় তুলনামুলক গুরুত্বের দাবী রাখে । ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস” ও ‘আদিবাসী –অ-আদিবাসী বিতক ” – এই উভয় আলোচনার জন্য স্হান সংকুলান এই বক্ষ্যমান নিবন্ধে সম্ভব নয় বিধায় শুধুমাত্র শেষোক্ত বিষয়ে আলোচনাকে সীমিত রাখা হ’ লো । তবে এটাও বলে রাখা জরুরী যে, ভৌগো্লিক, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে উপমহাদেশের ইতিহাসের একটি নির্দিষ্ট সন্ধিক্ষণ পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব বজায় ছিল । বারান্তরে এই বিষয় নিয়ে লেখার ইচ্ছা থাকলো ।

আসুন এবার আমরা ‘আদিবাসী ও অ- আদিবাসী’ বিষয়ে দৃষ্টি নিবন্ধ করি। আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উদযাপনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই একটি মহল পার্বত্য চট্টগ্রামের সংখ্যাস্বল্প জাতিগোষ্ঠী্রা আদিবাসী নয়, বাঙ্গালিরাই এদেশের আদিবাসী এমন দাবী জানাতে শুরু করেছে । বাঙ্গালী কর্তৃক ‘আদিবাসী’ পরিচিতির দাবী “কারা আদিবাসী” – এই বিতর্কে একটি নতুন মাত্রা যোগ করলো । আগের বছরগুলোতে কিন্তু এই দাবী নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙ্গালিরা মাঠে নামে নি ।

২০১০ সাল থেকেই আমরা হঠাৎ করে লক্ষ্য করে আসছি যে, বাংলাদেশের সংখ্যাস্বল্প ভিন্ন সংস্কৃতি ও ভাষার জাতিগোষ্ঠীদেরকে আদিবাসী হিসাবে অভিহিত করার ক্ষেত্রে সরকারের একাংশে ও একটি বিশেষ মহলে তিব্র এলার্জি কাজ করে । এর আগে যারা স্বচ্ছন্দেই এদেশের আদিবাসীদের অধিকার নিয়ে কথা বলেছে তাদের মধ্যে কিছু সংখ্যক হঠাৎ করে সুর ও অবস্হান পাল্টে বলতে শুরু করলো ।এদেশের কোন আদিবাসী নেই । যারা আছে তারা উপজাতি । উপজাতি উপনিবেশবাদীদে্র দ্বারা বিজিত ও সামাজিক বিবর্তনের ধারায় পিছিয়ে থাকা সংখ্যাস্বল্প জাতিগোষ্ঠীদের দেয়া নাম । এদেরকে শুধু উপজাতি নয়, primitive(আদিম), savage(বর্বর), ও aboriginal(আদিম) ইত্যাদি নামেও ডাকা হ’ তো । এগুলো বিজয়ী কর্তৃক বিজিতদের জন্য দেয়া অবজ্ঞা ও বঞ্চনা ঔপনিবেশিক শোষন প্রক্রিয়ার একটি অংশ । ঔপনিবেশিক যুগ শেষ হয়েছে বহুকাল আগে । আমাদের উপমহাদেশের ১৯৪৭ সালে উপনিবেশবাদী

১ ইংরেজী ‘tribe’ এর বাংলা প্রতিশব্দ হিসাবে ব্যবহারের যথাররথতা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে ।

বৃটিশরা বিদায় নিলে পাকিস্তান ও ভারত নামে দু’ টি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হয় ।

কিছুকাল পরে পাকিস্তানের পূর্বাংশে বসবাসরত বাঙ্গালীরা পাকিস্তানের বিরূদ্ধে ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণের অভিযোগ এনে পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশ নামে নতুন একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম দেয় । কিন্তু যারা পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক নিগড় থেকে বেরিয়ে আসার জন্য সশস্ত্র লড়াই করেছে তারাই নিপিড়ক উপনিবেশকারীদের ব্যবহৃত অবজ্ঞাসূচক নামের পরিচয়ে এদেশের সংখ্যাস্বল্প জাতিসত্তাভূক্ত জনগোষ্ঠীদেরকে পরিচিত করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে । কাউকে অবজ্ঞাসূচক অভিধায় অভিহিত করার অধিকার কারো নেই ।

‘ আদিবাসী ’ শব্দের (কিংবা ধারণার ) যে অর্থ করে এদেশের সংখ্যাস্বল্প জাতিসত্তার অন্তর্ভূক্ত মানুষদেরকে আদিবাসী নয় মর্মে বিতর্কিত করা হচ্ছে সেই অর্থে ‘ আদিবাসী ’ ধারণাকে ব্যবহার করা হয় না । আসুন তা’ হলে দেখা যাক কা’দের বোঝানোর জন্য আন্তর্জাতিকভাবে ‘ আদিবাসী’ ধারণাটি ব্যবহৃত হচ্ছে ঃ

আইএলও কনভেশন ১০৭ ঃ

‘আদিবাসী’ তারাই যারা –

স্বাধীন রাস্ত্রসমূহের আদিবাসী ও ট্রাইবাল জনগোষ্ঠীর সদস্য যাদের সামাজিক ও অর্থনৈ্তিক অবস্থা জাতীয় জনসমষ্টির অন্যান্য অংশের চেয়ে কম অগ্রসর;

যারা সম্পূর্ণ কিংবা আংশিকভাবে তাদের নিজস্ব প্রথা কিংবা রীতি- নীতি বা বিশেষ আইন বা প্রবিধান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত;

রাজ্য বিজয় কিংবা উপনিবেশ স্হা্পনকালে এই দেশে কিংবা যে ভৌগলিক ভূ-খন্ডে দেশটি অবস্থিত সেখানে বসবাসকারীদের উত্তরসূরী যারা জাতীয় আচার ও কৃষ্টির পরিবর্তে ঐ সময়কার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আচার ব্যবহারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ জীবনযাপন করে ।

আইএলও কনভেশন ১৬৯ ;

২ আদিবাসী ও ট্রাইবাল জনগোষ্ঠী কনভেশন, ১৯৫৭ (নং ১০৭ ) ও আদিবাসী ও ট্রাইবাল জনগোষ্ঠী কনভেশন, ১৯৮৯ (নং ১৬৯ ); আন্তর্জাতিক শ্রমসংস্থা, ঢাকা ২০১০ ।

৩ এই কনভেনশনে ট্রাইবাল বলতে ঐ গোষ্ঠী ও ব্যক্তিদের বুঝাবে যারা তাদের ট্রাইবাল বৈশিষ্ট্য হারানোর প্রক্রিয়ায় রয়েছে এবং জাতীয় জনসমষ্টির সাথে একীভূত হয়নি ।

৪ আদিবাসী ও ট্রাইবাল জনগোষ্ঠী কনভেশন, ১৯৫৭ (নং ১০৭ ) ও আদিবাসী ও ট্রাইবাল জনগোষ্ঠী কনভেশন, ১৯৮৯ (নং ১৬৯ )ঃ আন্তর্জাতিক শ্রমসংস্থা, ঢাকা ২০১০ ।

আদিবাসী তারাই যারা-

স্বাধীন দেশসমূহের ট্রাইবাল জাতিগোষ্ঠী যাদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা জাতীয় জনসমষ্টি থেকে ভিন্ন এবং যারা সম্পূর্ণ কিংবা আংশিকভাবে নিজস্ব প্রথা কিংবা ঐতিহ্য অথবা বিশেষ আইন বা বিধি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত;

রাজ্য বিজয় বা উপনিবেশ স্হা্পন অথবা বর্তমান রাষ্ট্রের সীমানা নির্ধারন হওয়ার সময়ে এই দেশে কিংবা যে ভৌগোলিক ভূ-খন্ডে দেশটি অবস্থিত সেখানে বসবাসকারী জাতীগোষ্ঠীর বংশধর যারা তাদের আইনগত মর্যাদা নির্বিশেষে তাদের নিজস্ব সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ কিংবা আংশিকভাবে অক্ষুণ্ন রাখে ।

আদিবাসী হিসাবে চিহ্নিত হবার ক্ষেত্রে আত্মপরিচিতিই হ’লো মৌলিক উপাদান ।

বিশ্ব ব্যাংক কর্তৃক ব্যবহৃত ‘আদিবাসী’ ধারণা ;

একটি স্বতন্ত্র আদিবাসী সংস্কৃতির অধিকারী জনগোষ্ঠী হিসাবে যারা নিজেদের মনে করে এবং অন্যরাও এ পরিচয়ের স্বীকৃতি দেয় ;

ভৌগোলিকভাবে পৃথক আবাসভূমি অথবা বংশানুক্রমিকভাবে ব্যবহৃত ভূ-খন্ড এবং এতদঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদের সাথে যাদের যৌথ সম্পৃক্ততা রয়েছে;

তাদের প্রথাগত সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের প্রধানতম সমাজ ও সংস্কৃতি থেকে স্বতন্ত্র; এবং

একটি আদিবাসী ভাষা রয়েছে যা দেশের সরকারী ভাষা বা উক্ত অঞ্চলের প্রচলিত ভাষা থেকে আলাদা ।

উপরে বিবৃত ধারণাগুলোর পর্যালোচনা থেকে আমরা বৈশিষ্ট্য বিন্যস্ত করতে পারিঃ

উপনিবেশ পূর্ব সমাজের সঙ্গে ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা (যেমন পূর্বপূরুষের জমি পুরো বা অংশতঃ দখল করে আছে ;ভূমির যৌথ মালিকানা ও সময়ের মধ্যে অনাধিপত্যের চর্চা রয়েছে ইত্যাদি );

জনগোষ্ঠীর মধ্যে ঔপনিবেশিক আগ্রাসনের ইতিহাস রয়েছে;

উপনিবেশ স্হাপনের পূর্ব থেকে বা বর্তমান রাষ্ট্র গঠনের সময়কাল থেকে ঐ অঞ্চলে বসবাস করে আসছে;

একটি ভূ-খন্ড ও তৎসংলগ্ন সম্পদের সঙ্গে গভীর যোগসূত্র রয়েছে;

যারা এখনও তাদের স্বতন্ত্র সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্হা কিছুটা হ’লে ও বজায় রেখেছে;

স্বতন্ত্র ভাষা, সংস্কৃতি ও বিশ্বাস রয়েছে;

যারা অধিপতি জনগোষ্ঠীর তুলনায় প্রান্তিক;

রাষ্ট্র গঠন প্রক্রিয়ায় ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যাদের কোন অংশগ্রহণ নেই;

আদিবাসী হিসাবে ব্যক্তি পর্যায়ে আত্ম-পরিচিতি এবং কম্যুনিটি কর্তৃক ঐ কম্যুনিটির সদস্য হিসাবে স্বীকৃতি ।

এ সকল বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন জনগোষ্ঠীরাই মূলতঃ আদিবাসী । ‘আদিবাসী’ ধারণার সঙ্গে ‘কে আগে, কে পরে এসেছে’ প্রত্যয় কোনভাবেই সম্পর্কিত নয় । আদিবাসী প্রত্যয়কে বিবৃত করে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে এ যাবৎ যতগুলো ধারণা প্রচলিত হয়েছে, কোনটাতেই ‘আগে- পরে আসা’ ও ‘আদিবাসী’ শব্দকে সমার্থক করা হয়নি । অর্থাৎ আদিবাসী বা তার ইংরেজী প্রতিশব্দ Indigenous এর আভিধানিক শব্দার্থ ‘স্থানীয়ভাবে উদ্ভূত’ অর্থে পৃথিবীর অনেক জনগোষ্ঠীকেই তাদের আদি বসবাসের সূত্রে আদিবাসী বলার সুযোগ নেই । কারণ পৃথিবীর প্রায় সব জনগোষ্ঠীই এখন যেখানে বসতি গড়ে আছে দেখা যাবে তাদের পূর্বপুরুষরা কোন না কোন সময় পৃথিবীর কোন না কোন প্রান্ত থেকে এসে বর্তমান স্থলে স্থিতু হয়েছে । সুতরাং আদিবাসী বা Indigenous অর্থে কোন জনগোষ্ঠীকে একটি ভূ-খন্ডের প্রাচীন অধিবাসী বা তাদের বংশধর মনে করার কোন যুক্তি নেই । আইএলও সনদের ১০৭ ধারা (বাংলাদেশ কর্তৃক অনুস্বাক্ষরিত ) ও ১৬৯ ধারা অনুসারে কোন জনগোষ্ঠীকে আদিবাসী হিসাবে পরিচিতি পেতে হাজার বছর ধরে কোথাও বসতি করে থাকার প্রয়োজন নেই । যেটা গুরুত্বপূর্ণঃ (১) কোন ভূ-খন্ডের উপনিবেশায়ন বা দখলধীন হওয়ার প্রাক্কালে কথিত জনগোষ্ঠীর সেখানে বসতি থাকা ও (২) উপনিবেশপূর্ব সময়ের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের অনুগামী রীতি ও প্রথার অনুযায়ী হওয়াই আদিবাসী হিসাবে পরিগণিত হওয়ার আবশ্যকীয় শর্ত ।

যে ভ্রান্ত আদিবাসী ধারণার ভিত্তিতে বাঙ্গালীরা নিজেদের আদিবাসী হিসাবে দাবী করে তার ভিত্তিতেও তাদের আদিবাসী হিসাবে কষ্টকল্পনাতেও আনা দুষ্কর । বাঙ্গালীরা পার্বত্য চট্টগ্রামে ঊনবিংশ শতাব্দীর আগে স্থায়ীভাবে বাস করতো বলে জানা যায় না । তদুপরি, আদিবাসীরা বাংলাদেশের যেখানেই এবং যখনই বসতি করেছে সে সব অঞ্চল কখনই বাঙ্গালী অধ্যুষিত ছিল না। বাংলাদেশের কোথায়ও আদিবাসীরা বাঙ্গালীদের উচ্ছেদ করে বসতি গেড়েছে এমন প্রমাণও কোথাও নেই । বরং উল্টেটাই অতীতে ঘটেছে, এখনও ঘটছে ।

chtnews24.com- এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বেশ কিছু ভিত্তিহীন অভিযোগ আনা হয়েছে । বলা হয়েছে যে, এদেশের সংখ্যাস্বল্প জাতিসত্তার মানুষগুলোকে ‘আদিবাসী’ নামে আখ্যায়িত করা হলে-

(১) পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমির উপর বাংলাদেশ সরকারের কোন এখতিয়ার থাকবেনা;

(২) উপজাতীয়দের অনুমতি ব্যতীত পার্বত্য চট্টগ্রামে দেশের সার্বভৌমত্ব এবং ভৌগোলিক অখন্ডতা রক্ষায় কোন সামরিক কর্মকান্ড পরিচালনা করা যাবে না;

(৩) কোন অপরাধের জন্য উপজাতীয়দেরকে দেশের প্রচলিত আইনে বিচার করা যাবে না;

(৪) পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক সম্পদের উপর বাংলাদেশ সরকারের কোন নিয়ন্ত্রন থাকবে না; এবং

(৫) প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশের এক- দশমাংশ এলাকার (পার্বত্য চট্টগ্রাম ) উপর বাংলাদেশ নিয়ন্ত্রন হারাবে ।

চলুন দেখা যাক ‘আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর অধিকার বিষয়ক জাতিসংঘ ঘোষণাপত্র ২০০৭’ – এ কী লেখা আছে । ৮ অনুচ্ছেদের ২. (খ) – তে বলা হয়েছে, আদিবাসীদের ভূমি, ভূ-খন্ড অথবা সম্পদ থেকে বিতাড়িত করার লক্ষ্য অথবা প্রভাবিত করে এমন যে কোন কার্যক্রম নিবৃত্ত ও প্রতিকারের জন্য রাষ্ট্র কার্যকরী কর্মকৌশল গ্রহন করবে ।

# লিখেছেন, প্রফেসর মংসানু চৌধুরী

About the author

Mongshinu mogh

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/2901