«

»

এই লেখাটি 975 বার পড়া হয়েছে

Print this প্রকাশনা

বিস্মৃতির এক হত্যাকান্ডঃ মাল্যে গণহত্যা

৯২ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ। লংগদু বাজারের দিন, চারদিকে চলছে জমজমাট বাজার। একজন পাহাড়ি কাঁচা তরকারির খুপড়ি নিয়ে বাজারের দিকে হেঁটে আসছে। বাজারে প্রবেশ করার পর একটি জুতসই জায়গার খোঁজ করছে সে। হঠাৎ করে খেয়াল করলো একজন সৈনিক এসে তার খুপড়ির মাঝে কি যেন রেখে দিচ্ছে। একটু পরে সে বুঝতে পেরে “বোমা” “বোমা” বলে চিৎকার করে উঠল। চারপাশে মানুষ জড়ো হয়ে গেল এবং সে সৈনিকটিকে হাতেনাতে ধরা হল। ধরা পড়ার পর সৈনিকটিকে শাস্তি প্রদান করল তার অফিসার। শাস্তিঃ কানে ধরে উঠাবসা!

এটি একটি ছোট ঘটনা, কিন্তু যদি নিরীহ পাহাড়িটি বুঝতে না পারতো কি রেখে দেয়া হচ্ছে তাহলে হয়তো পত্রিকায় শিরোনাম হত “সন্ত্রাসবাদী সংগঠন শান্তিবাহিনীর বোমা হামলায় নিহত ….” বা আরো অন্য কিছু। ঘটনার অন্তরালে কি হয়েছিল বা কি ঘটেছিল তা আড়ালেই থেকে যেত। উপরের উল্লেখিত ঘটনাটি কিন্তু কোন মিডিয়াতেই আসে নি কারণ বড় কোন ঘটনা নয়। কিন্তু এই ঘটনাই পরবর্তীতে হতে পারত সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের আরেকটি উদাহরণ।

এবার ’৯২ এর একই মাসের ২ তারিখে যে ঘটনাটি ঘটেছিল তার বর্ণনা দেই। ঘটনাটি ঘটেছিল রাঙ্গামাটির মারিশ্যায়। মারিশ্যা থেকে রাঙ্গামাটিগামী বোটে দুইটি বোমা বিস্ফোরিত হয়। এতে দুইজন নিহত হয়, একজন হিন্দু এবং একজন পাহাড়ি। এরপর ঘটনার সঠিকতা না জেনে শুধুমাত্র সন্দেহের বশে সেদিন সেটেলারের হামলায় মারা গিয়েছিল ৩০ জন পাহাড়ি। পরবর্তীতে প্রকৃত ঘটনাটিকে অন্যদিকে মোড় ঘুরানোর জন্য ভিন্নভাবে সংবাদ প্রকাশ করা হয়। বলা হয়েছে “যাত্রীবাহী বোটে বিস্ফোরণের জন্য শান্তিবাহিনী তথা জনসংহতি সমিতি দায়ী”। কিন্তু শান্তিবাহিনী এই ঘটনার দায়দায়িত্ব অস্বীকার করে।

মূল ঘটনাঃ

রাঙ্গামাটি থেকে আশেপাশের উপজেলায় যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম নদীপথ। মারিশ্যাও এর ব্যতিক্রম নয়। মারিশ্যা থেকে রাঙ্গামাটি যেতে বিরতিহীন লঞ্চে সময় লাগে ৬ ঘন্টা, আর লোকাল লঞ্চে আরো সময় লাগে। বিস্ফোরণ ঘটেছিল এই লোকাল একটি লঞ্চে।

তৎকালীন সময়ে নদীপথে যাতায়াতের ক্ষেত্রে কঠোর নিরাপত্তা বজায় রাখা হত। মারিশ্যা লঞ্চঘাটের খালি লঞ্চগুলো আর্মি-পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রাখা হত। যাত্রীদের লঞ্চে উঠার সময় লাইন করে তাদের তল্লাসী করে তোলা হত। যে লঞ্চে বিস্ফোরণ ঘটেছিল তার ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হয়নি। এছাড়া, প্রতিটি স্টপেজেও তল্লাসী করে যাত্রী তোলা হত।

ঘটনাস্থল দুরছড়ি ঘাট থেকে আমতলী ঘাটঃ

মারিশ্যা থেকে দুরছড়ি ঘাটে এসে পৌঁছলো লঞ্চটি। তখন আবার তল্লাসীর মাধ্যমে দুইজন নতুন যাত্রী (সঠিকভাবে জানা যায় নি, পাহাড়ি না সেটেলার) উঠেন। লঞ্চটিতে কিছু তামাকের গুঁড়ার টিন ছিল এবং পাশেই বসা ছিল অধিকাংশ সেটেলার। দুই যাত্রী সেখানে বসে পড়েন। দুরছড়ি ঘাটের পর আসে আমতলী ঘাট। সে ঘাটে ব্যক্তিদ্বয় লঞ্চ থেকে নেমে যান। এরপর লঞ্চটি আবার রওনা দেয়। রওনা দেয়ার কিছুক্ষণ পর একটি বাঁক পেরোনোর সময় লঞ্চে বিস্ফোরণ ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শী বাঘাইছড়ি উপজেলার ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প সংস্থার দারোয়ান লাল মিয়া ঘটনার বর্ণনা দেন এবং তার ধারণা বিস্ফোরণটি তামাকের গুঁড়ার টিনের পাশেই ঘটেছে। বিস্ফোরণে দুই যাত্রী মারা যায়, একজন হিন্দু ও একজন পাহাড়ি। বিস্ফোরণের পর লঞ্চটি অকেজো হয়ে ডুবে যায় এবং বাকি যাত্রীরা সাঁতরে তীরে উঠে আসে। এরপরপরই ঘটে যায় পার্বত্য ইতিহাসে আরেকটি গণহত্যার কাহিনী যার নাম “মাল্যে গণহত্যা”।

সেটেলারদের হামলাঃ

লঞ্চটি যেস্থানে বিস্ফোরিত হয়েছিল তার পাশেই ছিল মাল্যে সেটেলার গ্রাম। সেই গ্রাম থেকে সেটেলাররা দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে পাহাড়িদের আক্রমণ করে। এখানে ঘটনাস্থলেই নিহত হয় ১১ জন। এ ঘটনায় মোট ৩০ জন পাহাড়ি নিহত হয় যার মধ্যে মাত্র ১৪ টি লাশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। কয়েকটি শিশুকে কাদায় নাক ডুবিয়ে মেরে ফেলা হয়। মারিশ্যা এলাকার দুইটি পাহাড়ি পরিবারের সবাই এই হামলায় মারা যায় এবং অনেকের লাশও পাওয়া যায়নি পরবর্তীতে। এই ঘটনার বর্ণনা দেন লংগদুর মানিক্যছড়ার কিশোর রাজমোহন। তার ভাষ্য- “বিস্ফোরণের পর সাঁতরিয়ে কূলে উঠতে গিয়ে যখন পাহাড়িদের আক্রান্ত হতে দেখলাম তখণ আমি কচুরিপানার ভেতর লুকিয়ে থাকি। এভাবে দুই ঘন্টা ছিলাম। ওখানেও আমার দিকে লাঠি ও পাথর ছুড়ে মারা হয়”। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই হামলা রুখে দাঁড়ানোর কোন সহযোগিতাই পাওয়া যায়নি।

ঘটনার পরঃ

বিস্ফোরণটি ঘটেছিল লংগদু ও বাঘাইছড়ি থানার কাছাকাছি। কিন্তু এই দুই থানাকে অবহিত না করে নিহতদের লাশগুলো রাঙ্গামাটিতে নিয়ে আসা হয়। তখন অনেক শিশুরই নাকে, মুখে এবং গলায় কাদা লেগে থাকতে দেখা গেছে। কিন্তু লাশগুলোর পোস্টমর্টেম ভালভাবেও করা হয়নি। এ বিষয়ে ডাক্তারদের সাথে কথা বলতে গেলে ডাক্তার কিছু জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

ঘটনার পরপরই প্রশাসন কোনরূপ প্রমাণ ছাড়াই শান্তিবাহিনীকে দায়ী করে। ঘটনাস্থলে নিহত ১১ জন পাহাড়িসহ মোট ১৪ জনকে তারা লঞ্চ বিস্ফোরণে নিহত বলেও প্রচার করে। কিন্তু শান্তিবাহিনী দৃঢ়ভাবে এই ঘটনার দায়দায়িত্ব অস্বীকার করে। ফলে হামলার ঘটনা নিয়ে ধুম্রজাল সৃষ্টি হয়।

একটু বিশ্লেষণঃ

প্রথমেই আসা যাক হামলাকারী কে বা কারা? প্রশাসন এখানে শান্তিবাহিনীকে দায়ী করলেও তারা তা অস্বীকার করেছে। কিন্তু অতীতে শান্তিবাহিনীর পক্ষ থেকে হামলা সংঘটিত হয়েছে তার প্রতিটি দায়িত্ব তারা স্বীকার করেছে। শুধুমাত্র এই প্রথম তার ব্যতিক্রম ঘটলো।

এরপর হামলায় নিহতদের প্রসঙ্গে। প্রশাসন দাবি করেছে হামলায় ১৪ জন নিহত হয়েছে যার অধিকাংশই পাহাড়ি। তাহলে কি শান্তিবাহিনী পাহাড়িদের মারার জন্যই এ হামলা করেছিল? আর লঞ্চের যে অংশে বিস্ফোরণটি ঘটে যেখানে বসা ছিল অধিকাংশই সেটেলার। কিন্তু নিহতের সংখ্যায় দেখা গেছে অধিকাংশই পাহাড়ি। কিভাবে তা সম্ভব??

প্রথমেই বলেছি প্রতিটি লঞ্চে কঠোর তল্লাসীর মাধ্যমে যাত্রী তোলা হত। তাহলে কিভাবে আর্মি-পুলিশের চোখ, কড়া নজরদারি এড়িয়ে লঞ্চে বিস্ফোরক পদার্থ নিয়ে ওঠা সম্ভব??

আবার উক্ত ঘটনায় কিছু সেটেলারকেও আহত দেখানো হয়েছিল। তাদের চিকিৎসা করানো হয় রাঙ্গামাটি সদর হাসপাতালে। অথচ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ পাহাড়িদের স্থান হয় লংগদুর প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত রাবেতা আল-ইসলাম হাসপাতালে। এই চিকিৎসা বিভাজনের মধ্যেই কি প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশিত হয় না?????

শেষ কথাঃ

লঞ্চে বোমা হামলা কে করেছে এটা নিয়ে বির্তকের কোন সূরাহা হয়নি। কিন্তু পাহাড়িদের দল শান্তিবাহিনী উক্ত হামলা করেছে এই অজুহাত তুলে মেরে ফেলা হলো পাহাড়িদের। কারোর কোন বিচার হলো না। প্রথমেই একটি ঘটনা উল্লেখ করেছিলাম। হয়তো বিক্রেতা পাহাড়িটি যদি বোমাটি দেখতে না পেত তবে পাহাড়ের ইতিহাসে আরো একটি গণহত্যার কাহিনী যুক্ত হতো। সে যাত্রা রক্ষা পেলেও এই সাধারণ ও নিরপরাধ ৩০ জন পাহাড়ির ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিলনা। ফলে তাদের নিরস্ত্র ও অসহায় অবস্থায় মৃত্যুকে বরণ করে নিতে হলো। এভাবেই অজ্ঞাত উৎস থেকে সন্ত্রাসী হামলা চালানোর পর পাহাড়ি হত্যা যেন ফরজ হয়ে দাড়িয়েঁছে। হামলাকারীদের খুজেঁ পায়নি প্রশাসন, তাদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোরও কোন ইচ্ছে যেন তাদের নেই। তাহলে কি প্রশাসন হামলাকারীদেরই মদদ দিয়েছিল?? আর্মিদের এত তল্লাসীর পরও কিভাবে বিস্ফোরণ পদার্থ লঞ্চে পৌঁছতে পারে? তাহলে কি হামলাকারীদের সাথে আর্মিদের যোগসাজস ছিল??

অনেক প্রশ্ন রয়েছে কিন্তু উত্তর খুজেঁ পাওয়া দুস্কর। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রশাসন বা আর্মিরা কোনদিনই দেয়নি। ঘটনার সঠিক তদন্ত না করে ঢালাওভাবে শান্তিবাহিনীর উপর দায় চাপিয়ে যেন প্রশাসনই মুক্ত হতে চায় ঘটনার দায়ভার থেকে। এত উত্তরবিহীনের মাঝেও ঘটে গেল পাহাড়ের আরেকটি গণহত্যা। এ যেন শেষ নেই!! এ ইতিহাসও ধীরে ধীরে আজ বিস্মৃতির পথে চলে যাচ্ছে। হয়ে পড়ছে অন্যগুলোর মত বিস্মৃতির আরেক গণহত্যারূপে।

About the author

অজল দেওয়ান

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/2896

2 pings

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>