«

»

এই লেখাটি 1,150 বার পড়া হয়েছে

Print this প্রকাশনা

মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী গণহত্যাঃ প্রসঙ্গত পাহাড়

আগের ব্লগপোস্টে উল্লেখ করেছিলাম, ১৯৮০ সালের ২৫ মার্চ ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ড,পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম গণহত্যা (কলমপতি হত্যাকাণ্ড)। বিভিন্ন পাঠক মহল বিভিন্ন রকমের প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। কেউ কেউ বলছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে এটিই প্রথম গণহত্যা নয়। লেখার শুরুতেই আমি এ বিষয়ে কিছু বলতে চাইছি।

 ইতিহাস

১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বন করেছিলেন। তিনি ছিলেন আইয়ুব খানের খুবই ঘনিষ্ট ব্যক্তিদের একজন। ফলে ৬০ সালের কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণকালে তিনি কোনরূপ বিরোধিতা করেননি। মুক্তিযুদ্ধেও তিনি পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বন করায় চাকমাদের মধ্যে বিভাজন দেখা দেয়। মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে এবং মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান করার মধ্য দিয়ে অনেকে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেন। আবার কিছু সংখ্যক পাহাড়ি যুবক রাজাকার, মুজাহিদ এবং সিভিল আর্মড ফোর্সে ভর্তি হয়ে ট্রেনিং নেয়ার মাধ্যমে পাকিস্তানী বাহিনীর সহযোগী হিসেবে কাজ করতে শুরু করে। মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর চাকমা রাজার মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতার কারণে, চাকমা জাতিসত্তার সবাইকে রাজাকার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। আর এর ফলশ্রুতিতে,পার্বত্য চট্টগ্রামে সাধারণ-নিরীহ চাকমাদের ওপর মুক্তিবাহিনী ধরপাকড় থেকে শুরু করে লুণ্ঠন, অগ্নি সংযোগ,হত্যাযজ্ঞ চালাতে থাকে। ’৭১-এর শেষ দিকে এবং ’৭২ সাল পর্যন্ত এ সকল হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। গ্রেফতার করা হয় প্রায় শত শত চাকমা যুবককে এবং পরবর্তীতে শেখ মুজিবের সাধারণ ক্ষমার আওতায় তাদের মুক্তি দেয়া হয়।

১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন করা হয়। এর আগে ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি এম এন লারমার নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল ৪ দফা দাবি সম্বলিত সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক দাবিনামা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবের কাছে পেশ করেন। এর প্রত্যুত্তরে শেখ মুজিব পাহাড়ের প্রতিটি জাতিসত্তাকে বাঙালি হয়ে যেতে বলেন। পরবর্তীতে, সংসদে সংবিধানের উপর বক্তব্য রাখতে গিয়ে এম এন লারমা সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবি জানান এবং এর প্রতিবাদে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন। সংসদে তার পক্ষে বক্তব্য রাখেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। একই বছর নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গঠন করা পার্বত্য চট্টগ্রাম নির্বাচন পরিচালনা কমিটি জনসংহতি সমিতি নামে আত্মপ্রকাশ করে। ’৭৩ সালে রাঙ্গামাটিতে এক নির্বাচনী জনসভায় শেখ মুজিব আবারও পাহাড়িদের বাঙালিতে পরিণত করার ঘোষণা দেন। এরপরই শুরু হয় শান্তিবাহিনী গঠনের প্রক্রিয়া। পাহাড়ের জাতিসত্তাসমূহ জুম্ম জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে ওঠে এবং মুক্তির লড়াইয়ে সংগ্রামে অবর্তীণ হয়।

 

পর্যালোচনা

আমরা দেখতে পাই, ’৭২ সালে তখনো পর্যন্ত পাহাড়িদের হত্যা হচ্ছিল রাজাকার নিধনের নামে, এই নিধন বিহারীদের ওপরও করা হয়েছিল। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিহারীদের হত্যা করা হয়। ফলে বিহারীদের হত্যা ও পাহাড়ের হত্যাগুলো মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীদের প্রতি প্রতিহিংসাপরায়ণতারই পরিচয় দেয়। এরপর পাহাড়িদের সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত না হওয়ায় তাদের মাঝে জাতীয়তাবাদ গড়ে ওঠে এবং এই জুম্ম জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে পাহাড়িরা সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত হয়। অর্থাৎ, পাহাড়িদের মাঝে জাতীয়তাবাদের ধারণা গড়ে ওঠে ১৯৭৩ সালের দিকে। এর পরবর্তী ১৯৮০ সালের কলমপতি হত্যাকাণ্ডই পাহাড়িদের জাতীয়মুক্তির আন্দোলন স্তব্ধ করে দেয়া এবং পাহাড়ের সংগ্রামী জনগোষ্ঠীগুলোকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার প্রথম ধাপ। কারণ, এর আগে ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের সময়ে হাজার হাজার সেটেলারদের পাহাড়ে পুনর্বাসনের পরিকল্পনা করা হয় এবং একই বছর প্রায় ৩০ হাজার পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়। এসময় রাষ্ট্রের নীতি ছিল “মানুষ চাই না, জমি চাই”। ফলে রাষ্ট্রীয় মদদে এবং একটি আন্দোলনকে বন্ধ করে দেয়ার চক্রান্ত হিসেবে পাহাড়ের ধারাবাহিক গণহত্যাগুলোর প্রথমটি হিসেবে ঘটানো হয়েছিল রাঙ্গামাটির কাউখালিতে, যার ঘটনাস্থল ছিল কলমপতি ইউনিয়নে। এ প্রসঙ্গে একটু উল্লেখ করা যাক প্রখ্যাত সাংবাদিক চিন্ময় মুৎসুদ্দীর লেখা “অশান্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম ও অন্যান্য প্রসঙ্গ” বইয়ের কথা। বইটিতে তিনি কলমপতির গণহত্যাকে চিহিৃত করেছেন এভাবে “…..স্থানীয় পাহাড়ি জনগণ এবং পুনর্বাসিত বাঙালিদের মধ্যেকার বিরোধের প্রথম বিস্ফোরণ ঘটে বর্তমান কাউখালি উপজেলায়, ১৯৮০ সালের ২৫ মার্চ…..“ (তথ্যসূত্রঃ গ্রন্থ সমালোচনা- অম্লান দেওয়ান, হিল রিভিউ, প্রকাশকাল নভেম্বর ১৯৯২)। এছাড়াও পাক্ষিক চিন্তা ১ম বর্ষ ২২ সংখ্যায় “পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যাঃ শান্তি কোন পথে?” প্রবন্ধের উপর খোলামেলা আলোচনা করতে গিয়ে লেখক নির্মল জ্যোতি চাকমাও কমলপতি গণহত্যাকে প্রথম হিসেবে ধরে নিয়েছেন।

এছাড়াও, এই গণহত্যায় দেখা গেছে আর্মির মদদে হামলায় প্রত্যক্ষভাবে সেটেলারদের অংশগ্রহণ, যা পাহাড়ের ইতিহাসে আগে ঘটেনি। এর পূর্বেকার গণহত্যাগুলো সংঘটিত হয়েছিল মূলতঃ মুক্তিবাহিনী এবং মুজিববাহিনীর মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী প্রতিক্রিয়া হিসেবে।

 

ইনসারজেন্সি পিরিয়ডের আগে সংঘটিত কিছু হত্যাকাণ্ড

১. ১৯৭১ সালের ৮ ডিসেম্বর বুধবার খাগড়াছড়ির পানছড়ি বাজারে ত্রিপুরা রাজ্য থেকে আগত মুক্তিবাহিনী, পাহাড়িদের গুলি করে হত্যা করতে শুরু করে। পরে গ্রাম ঘেরাও করে লুটপাট চলতে থাকে এবং বাড়ি-ঘরে আগুন দেয়া হয়। এতে মারা যান তারক চন্দ্র চাকমা, সুধা প্রিয় চাকমা, রনেন্দু চাকমাসহ আরো অনেক পাহাড়ি এবং অনেকে মারাত্মক আহত হন। পানছড়ির হেডম্যান চাই থং প্রু চৌধুরীর দুই ভাই মুক্তিবাহিনী কমান্ডারের কাছে এ বিষয়ে নালিশ জানালে উল্টো কমান্ডার তাদের শাসিয়ে চলে যেতে বলেন।

২. ৯ ডিসেম্বর একই বাহিনী পানছড়ি থেকে খাগড়াছড়ি যাওয়ার পথে গাছবান গ্রামের রাস্তায় ভূগলেশ্বর চাকমা, শের বাপসহ কয়েকজনকে গুলি করে হত্যা করে।

৩. ১০ ডিসেম্বর রাঙ্গামাটির ছোট হরিণায় সোনাধন চাকমা, ভাইপো প্রসন্ন কুমার চাকমাসহ আরো দুইজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। যদিও এই এলাকায় মনীষ দেওয়ান (বাচ্চু) এবং করুণা মোহন চাকমা মুক্তিবাহিনীর সদস্য ছিলেন।

৪. ১৯ ডিসেম্বর পানছড়ির কালানালায় পাহাড়িদের গ্রামে ঢুকে হত্যাযজ্ঞ শুরু করে মুক্তিবাহিনী। এতে প্রায় ৪৭ জন নিহত হয় এবং গুরুতর আহত হয় প্রায় ৪ জন।

৫. ২২ ডিসেম্বর খাগড়াছড়ির দিঘীনালায় মধ্য বোয়ালখালি গ্রামে ঢুকে মুক্তিবাহিনীরা প্রথমে লুঠতরাজ চালায় এবং গ্রাম জ্বালিয়ে নিরীহ পাহাড়িদের গুলি করে হত্যা করে। এতে ভদ্রসেন চাকমা, প্রযুত কুমার চাকমা, দীন কুমার চাকমাসহ আরো কয়েকজন মারা যান। মারাত্মক আহত অবস্থায় বেঁচে যান পূর্ণমাসী চাকমা ও বাসুদেব চাকমা। তারা বর্তমানে পঙ্গু অবস্থান জীবনযাপন করছেন।

৬. ২৪ ডিসেম্বর বাঘাইছড়িতে লতিফ মুন্সির নেতৃত্বে মুজিববাহিনী স্লোগান দিতে দিতে তুলাবান গ্রামে প্রবেশ করে বাঘাইছড়ির হেডম্যান সূর্য কুমার খীসার বাড়িসহ প্রায় আরো কয়েকটি বাড়ি পুড়িয়ে দেয়।

এছাড়াও, ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাঙামাটি থেকে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার করা হলে বিডিআর সদস্যরা বিস্তৃর্ণ পাহাড়ে দফায় দফায় অপারেশন চালিয়ে হত্যা, ধর্ষণ ও লুটতরাজ করে। এরমধ্যে ২২ মার্চ ধালিয়া গ্রামে, ২২ ও ২৩ এপ্রিল বরইরাগি বাজারে, ৩০ এপ্রিল মাইচছড়িতে, ৮ মে খাগড়াছড়ির তারাবনিয়া, লোগাং বাজার অপারেশন উল্লেখযোগ্য। ২৯ মার্চ ১৯৭২ সালে প্রায় ২০০ জন সশস্ত্র সন্ত্রাসী রামগড়ের মানিকছড়ি, চিকনপাড়া, সাঙ্গুপাড়া, পাক্কামুড়া ও গোদাতলা গ্রামে একযোগে অপারেশন চালায়।

 

পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ

মুক্তিবাহিনীর এসব নারকীয় হত্যাকাণ্ডের খবর আগরতলার শরনার্থীরা অবগত হয় এবং পরবর্তীতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নিকট এ সম্পর্কিত একটি স্মারকলিপি পেশ করেন তৎকালীন পাহাড়ের জাতীয় নেতা স্নেহ কুমার চাকমা। এরপরই পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন অংশে তিব্বতী বাহিনীর আগমন ঘটে এবং একই সাথে প্রবেশ ঘটে বিভিন্ন ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের। এ সময় মুজিব বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল ওবান সিংও আসেন। তিনি বাংলাদেশ ত্যাগ করার সময় অনুপস্থিত চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়ের মা বিনীতা রায়সহ পুরো রাজপরিবারকে নিরাপত্তার স্বার্থে ভারতে নিয়ে যান। এরপর পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে মুক্তিবাহিনীকে সরিয়ে সেখানে তিব্বতী বাহিনীকে নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত করা হল। এভাবে ধীরে ধীরে পাহাড়ে হত্যাযজ্ঞ থেমে যায়। যদিও পরবর্তীতে ইনসারজেন্সি পিরিয়ডে জাতিসত্তার উপর হামলা হিসেবে পাহাড়ি জনসাধারণের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়।।

 

তথ্যসূত্র

১. জীবনালেখ্য (জীবন, সংগ্রাম ও সংঘাতময় দিনগুলির কথা), লেখক -স্নেহ কুমার চাকমা

২. National Integration Problem in Bangladesh, লেখক -ডঃ হায়াত হোসেন, প্রাক্তন অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

৩. বিপ্লব রহমানের ব্লগ, রাঙাবেলঃ পাহাড়ের মুক্তিযুদ্ধ, অন্য আলোয় দেখা।

About the author

অজল দেওয়ান

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/2857

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>