«

»

এই লেখাটি 1,281 বার পড়া হয়েছে

Print this প্রকাশনা

বাবুছড়ায় রাষ্ট্রীয় দখলবাজীর বর্তমান পরিস্থিতি

হিল ব্লগার এন্ড অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরামের পক্ষ থেকে বর্তমান পরিস্থিতি যাচাইয়ের জন্য আমরা আবার সরেজমিনে গিয়েছিলাম বাবুছড়ায়। গত ১০ তারিখে বিজিবি-আর্মি-সেটেলার কর্তৃক পাহাড়ি গ্রামবাসীদের উপর হামলা সংঘটিত হওয়ার পর পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে হয়েছে। আপনারা জানেন, গত ৭ জুলাই রাঙ্গামাটিতে সম-অধিকার আন্দোলন, বাঙালি ছাত্র পরিষদসহ ৬টি সংগঠন সিএইচটি কমিশনের উপর হামলা করে। এর আগে দিঘীনালা ভূমি রক্ষা কমিটির ডাকে দীর্ঘ ১০ কিমি মানববন্ধন প্রোগ্রামটি নিরাপত্তার অজুহাতে ১৪৪ ধারা জারি করে বাতিল করে দেয় প্রশাসন। ঘটনার মোড় বর্তমানে অন্যদিকে প্রবাহিত করার প্রচেষ্টা আমরা অবিরত  দেখতে পাচ্ছি অনলাইন থেকে শুরু করে ব্লগসাইট ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের অপপ্রচারের মাধ্যমে। অন্যদিকে সাধারণ মানুষের দৃষ্টি এখন রাঙ্গামাটিতে সংঘটিত হামলার ঘটনার উপরেই নিবদ্ধ। ফলে ঘটনার সূত্রপাত অনেকটা আড়ালেই চলে গিয়েছে। তাই বিষয়টিকে আবার সামনে নিয়ে আসার জন্য আমরা গিয়েছিলাম বাবুছড়া হাইস্কুলে যেখানে বর্তমানে ২১টি পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে। এছাড়া পরবর্তীতে যত্ম মোহন কার্বারি পাড়ায় গিয়ে বিজিবি ব্যাটেলিয়ন দপ্তরও তার আশপাশের এলাকাও ঘুরে এসেছি।

শুরুতে আমরা যাই বাবুছড়া হাইস্কুলে। স্কুলে গিয়ে দেখতে পেলাম ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারগুলো বর্তমানে দুর্বিসহ দিন কাটাচ্ছে। আনুমানিক ৫০’×৩০’ আকারের দুইটি শ্রেণীকক্ষে ২১টি পরিবার গাদাগাদি করে অবস্থান করছে। এই পরিবারগুলোর জন্য পর্যাপ্ত কোন ব্যবস্থা নেই। একটি কক্ষে আমরা হামলার ঘটনায় আহত গোপা চাকমার দেখা পেলাম। ১০ জুনের হামলায় তাঁর হাত ভেঙে গিয়েছিল, এখনো পুরোপুরি সুস্থ নন তিনি। পাশে তার মেয়ে অপ্সরী চাকমা, মাত্র কয়েকদিন আগে তার জামিন মঞ্জুর করা হয়েছে। সবেমাত্র এস.এস.সি পাশ করা ছোট্ট এই মেয়েটিকে বিজিবি’র দায়ের করা মামলায় হয়রানির শিকার হতে হয়েছিল। কক্ষের একপাশ জুড়ে চাটাই বিছানো, সেখানে রাত্রিযাপন করতে হয় তাদের, সেখানে রয়েছে বালিশের সংকট। যদিও প্রতিটি পরিবারের জন্য আলাদা মশারির ব্যবস্থা রয়েছে। বর্ষা মৌসুম হওয়ার কারণে পয়ঃনিস্কাশন ব্যবস্থায় কিছুটা অসুবিধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। এছাড়া রয়েছে সাপের উপদ্রব। আমরা জিজ্ঞেস করি, এ ক্ষেত্রে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে কিনা। তারা জানান, অর্থসংকট এবং আরো বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত হওয়ার কারণে তারা এই বিষয়ে নজর দেয়ার সুযোগ পাননি।

স্কুলে আশ্রয় নেয়া ভিক্তিমদের একাংশ

স্কুলে আশ্রয় নেয়া ভিক্তিমদের একাংশ

আরেক কক্ষে গিয়ে আমরা বিনয় চাকমা, সুদর্শনা চাকমা, দেবতরু চাকমাসহ আরো কয়েকজনের দেখা পেলাম। তাদের সাথে কথা বলে জানা গেল পরনের কাপড় ছাড়া কোন প্রকার সহায় সম্পত্তি তারা সঙ্গে আনতে পারেননি। ফলে এককাপড়ে তাদের দিন যাপন করতে হচ্ছে। ছোট ছোট বাচ্চাদের পরনের কাপড় র্জীণ হয়ে গিয়েছে। পাশে একটি বৌদ্ধ বিহার রয়েছে, সেখান থেকে কিছু বাসন-কোসন, পানির জগ, হাড়ি-পাতিল দিয়ে কোন রকমে খাবারের আয়োজন করা হয়। প্রতিদিন প্রায় ২১টি পরিবারের ৮৩ জনের খাবার একসাথে রান্না করা হয় এবং পরিবারগুলোর সদস্য সংখ্যা অনুযায়ী তা ভাগ করে দেয়া হয়। এভাবে প্রতিদিন খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। শিশু আর গর্ভবতী মহিলাদের জন্য কোন বাড়তি খাবারের কোন ব্যবস্থা নেই।

কক্ষের একপাশে দেখতে পেলাম চাউলের একটি বস্তা আর কিছু মশারি। জানা গেল জেলা পরিষদের উদ্যোগে ২১টি মশারি দেয়া হয়েছে। চাউল এবং কাঁচা তরকারি শেষ হয়ে গেলে গ্রামবাসীদের সহায়তায় তা বিভিন্ন পরিবার থেকে সংগ্রহ করা হয়। কয়েকদিন আগে ব্যক্তি উদ্যোগে প্রতিটি পরিবারকে ১ হাজার টাকা দেয়া হলেও বর্তমানে তাদের অর্থসংকট চলছে। প্রয়োজনীয় কোন সামগ্রী অর্থের অভাবে তারা কিনতে পারছেন না। প্রায় প্রতিটি পরিবার কৃষিনির্ভর হওয়ার কারণে আয়-উপার্জন করার অন্য কোন পথ তাদের নেই। যাদের জমি বিজিবি’র দখলে যায় নি তারা জমি চাষ করছেন, আর যারা ভিটেবাড়ি হারানোর পাশাপাশি জমিও হারিয়েছেন তারা বর্তমানে বেকার দিন কাটাচ্ছেন।

আমরা তাদের প্রশ্ন করি, প্রশাসনের পক্ষ থেকে কেউ খোঁজ খবর নিতে এসেছে কিনা। তারা জানান, ইউএনও বা জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে কেউ আসেনি। তবে আর্মি এবং বিজিবি’র পক্ষ থেকে প্রায় কয়েকবার এসেছে কিছু সদস্য। এক্ষেত্রেও হয়রানির ঘটনা ঘটেছে। প্রায় সময় রাত ৯-১০টার দিকে তাদের আগমন ঘটে এবং কোনপ্রকার অনুমতি ছাড়াই কক্ষে প্রবেশ করে মশারি গুটিয়ে ভিক্টিমদের গণনার কাজ শুরু করে। এতে শরনার্থীদের মাঝে কিছুটা আতঙ্ক এবং ক্ষোভেরও সৃষ্টি হয়। দেবতরু চাকমা জানান, সর্বশেষ যেদিন আর্মিরা এসেছিল তারা দরজা খুলতে চাননি। কিন্তু পরবর্তীতে দরজায় ধাক্কাধাক্কির কারণে খুলতে বাধ্য হন এবং এসেই আবার লোকসংখ্যা গণনা করতে শুরু করে। এরপর গোপা চাকমা জানতে চান কেন তারা এসেছেন। উত্তরে আর্মির একজন সদস্য বলেন, সিও সাহেব তাদের পাঠিয়েছেন অবস্থা পর্যবেক্ষণ এবং খোঁজখবর নেয়ার জন্য। গোপা চাকমা এভাবে ক্রমাগত হয়রানির প্রতিবাদ করে বলেন, ভদ্রতার সাথে এসে যেন খোঁজখবর নেন, নইলে তারা রুখে দাঁড়াবেন। এরপর আর আর্মিরা আসেনি হাইস্কুলে।

দেবতরু চাকমা ২নং বাঘাইছড়ি সরকারি প্রাইমারি স্কুল কমিটির সভাপতি ছিলেন। তিনি জানান, স্কুলটি বন্ধ করে দেয়ার কারণে ৫ম শ্রেণী পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াশুনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার জোগাড় হয়েছে। প্রায় ১৫ জন ছাত্র-ছাত্রী পি.এস.সি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারবে কিনা এ বিষয়ে তিনি সংশয় প্রকাশ করেন।

আমরা তাদের সাথে ত্রাণের বিষয়ে কথা বলতে চাইলে তারা বলেন ত্রাণ বিষয়ক যে কোন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সেখানে ৩ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি কাজ করছে। কমিটির সমন্বয়ক মৃণাল কান্তি চাকমাকে এ বিষয়ে ফোন করা হলে তিনি প্রথমে ব্যস্ততার অজুহাতে কথা বলতে চাননি। পরবর্তীতে আমাদের পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে তিনি কথা বলেন। তিনি জানান, অচেনা নম্বরে তিনি কথা বলতে ভয় পান। তাই প্রথমে আমাদের তিনি এড়িয়ে গিয়েছিলেন।

এরপর আমরা রওনা দিই যত্ন মোহন কার্বারি পাড়ার উদ্দেশ্যে, সাথে গ্রামবাসী একজন। তিনি জানান, তার একমাত্র সম্বল জমিটুকু তিনি হারিয়েছেন বিজিবি’র দখলের কারণে। যাওয়ার পথে তিনি কাঁটাতারের ঘেরা দেওয়া তার একমাত্র জমিটি আমাদের দেখিয়ে দেন।

আমরা সেখানে পৌছেঁ বিজিবি ক্যাম্পের ছবি তোলার চেষ্টা করি। পার্শ্ববর্তী টিলা থেকে আমাদের একজন সদস্য ছবি তুলতে গিয়ে বিজিবি সদস্য কর্তৃক দৃষ্টি আকর্ষিত হয়ে পড়েন। বিজিবি সদস্যটি চিৎকার করতে শুরু করে এবং আমরা খুবই দ্রুত সে স্থান ত্যাগ করি। অবশেষে আমরা আবার হাইস্কুলে এসে শরনার্থীদের সাথে কিছুক্ষণ কথা বলি এবং এরপর বাবুছড়া ত্যাগ করি।

দখলকৃত জমিতে বিজিবির অবস্থান (দূর থেকে নেয়া ছবি)

দখলকৃত জমিতে বিজিবির অবস্থান (দূর থেকে নেয়া ছবি)

 এখনো পর্যন্ত এই হল সর্বশেষ পরিস্থিতি। বিজিবি ক্ষতিগ্রস্থদের কোনোরূপ সহায়তা না করে তাদের ক্যাম্প স্থাপনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। আর ক্যাম্পের চারপাশে কড়া নজরদারি রাখা হয়েছে। শোনা যাচ্ছে পার্শ্ববর্তী খালি কিছু এলাকায় নাকি সেটেলারদের পুনর্বাসন দেয়া হবে। এ নিয়ে গ্রামবাসীদের মাঝে কিছুটা আতংক কাজ করছে। তারা বর্তমানে তাদের ভবিষ্যত নিয়ে শংকিত। এইভাবে ক্রমাগত ভূমি দখলের মাধ্যমে পাহাড়ে শুরু হয়েছে পাহাড়ের ভূমিপুত্রদের উচ্ছেদের রঙ্গমঞ্চ। আমরা দেখতে পাই শুধু ক্যাম্প নয়; পর্যটনের নামে, সংরক্ষিত বনায়নের নামে, উন্নয়নের নামে এই উচ্ছেদ কার্যক্রম চালানো হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এর শেষ কি পাহাড়ের সাধারণ মানুষ দেখতে পাবে না?

 

About the author

সংবাদদাতা

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/2833

1 ping

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>