«

»

এই লেখাটি 761 বার পড়া হয়েছে

Print this প্রকাশনা

সবার জন্য শিক্ষা দর্শন বাস্তবায়নে রাষ্ট্রীয় নীতির প্রাসঙ্গিকতা বিবেচনা

আমরা জানি, বাংলাদেশের১৬ কোটি জনসংখ্যার ৯৫ শতাংশের অধিক বাঙালি। অবশিষ্ট জনসংখ্যার মধ্যে রয়েছে ৪৫ টির অধিক ক্ষুদ্র জাতির মানুষ। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো, সাঁওতাল, মনিপুরী, রাখাইন, হাজং, কোচ, মুণ্ডা প্রভৃতি হচ্ছে এসকল ক্ষুদ্র জাতিসমুহের মধ্যে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য নাম; যারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ঐতিহাসিকভাবে বসবাস করে আসছে। এসকল ক্ষুদ্র জাতির মানুষেরা একসময় নিজস্ব সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিমণ্ডলে ছিল যথেষ্ট বলীয়ান ও সমৃদ্ধ। কিন্তু কালের বিবর্তে তারা আজ গভীর সংকটে নিমজ্জিত। ভাষা,
শিক্ষাদীক্ষা, ঐতিহ্য, সংস্কৃতিসহ অন্যান্য মানবিক নাগরিক অধিকার,শক্তি, সম্পদ ও সমৃদ্ধি প্রভৃতির ক্ষেত্রে তারা আজ বিরাট সংকটে পতিত, সমস্যায় জর্জরিত।

ভুলে গেলে চলবে না যে, নৃতাত্ত্বিকভাবে বাংলাদেশ বহুজাতিসত্তার আবাস্থল। নানা জাতির মানুষ, তাদের ভাষা, মূল্যবোধ, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি নিয়ে এদেশের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির ভিত্তি প্রোথিত এবং বিকশিত হয়েছে। বিভিন্ন জাতিসমুহের রীতিনীতি, মূল্যবোধ, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি দেশের সমৃদ্ধি অর্জনের পথে অনাবিল রসদ যুগিয়েছে, যুগিয়ে যাচ্ছে। এদেশ গঠনে সবার ভূমিকা রয়েছে।
আজ স্বাধীনতার চার দশকের অধিক সময় অতিক্রান্ত হয়েছে। এটি যেকোন দেশের জন্যে কখনো কম সময় নয়। এর চেয়েও অনেক কম সময়ে অনেক দেশ বা রাষ্ট্র বিশ্বের দরবারে সম্মানজনক স্থান করে নিয়েছে। সেসব দেশের সরকার নানা জাতির জনগণের ভাষা, শিক্ষা, মূল্যবোধ, সংস্কৃতি প্রভৃতি সুরক্ষা এবং বিকাশে যথোপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করে ইতোমধ্যে যথেষ্ট সাফল্য অর্জনের অনন্য নজির স্থাপন করেছে।
বাংলা ভাষার জন্যে বাংলাদেশের বাঙালি জাতি প্রাণ দিয়েছে। এটি পৃথিবীর প্রত্যেকটি মানব জাতির জন্য অত্যন্ত গৌরবের এবং সম্মানের। এই কাজটি করে বাঙালি জাতি মানব সভ্যতার ইতিহাসে যে অনন্য নজির স্থাপন করেছে তা প্রগতিশীল বিশ্ব স্বীকৃতি দিয়েছে। জাতিসংঘ এর স্বীকৃতিস্বরূপ ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করে থাকে। এটি আমাদের মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক পরম পাওয়া, অতিশয় আনন্দের ঘটনাও বটে। কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হল বাংলাদেশের পুঁজিবাদী সরকারসমূহ বা বৃহত্তর বাঙালি জাতি আভ্যন্তরীণ অন্য ক্ষুদ্র জাতিসমুহের ভাষা, শিক্ষা ও সংস্কৃতি সুরক্ষা বা বিকাশে কাঙ্ক্ষিত পদক্ষেপ নিতে সদা দ্বিধাগ্রস্ত, পশ্চাদমুখি নীতি অনুসরণে সিদ্ধহস্ত। অনেক ক্ষেত্রে পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর কায়দায় ক্ষুদ্র জাতিসমূহের ভাষা, শিক্ষা, সংস্কৃতি লুপ্ত করতে বাংলাদেশের শাসক শ্রেণী বা সরকার ও তার পৃষ্টপোষকেরা যথেষ্ট সদিচ্ছার প্রতিফলন ঘটিয়েছে।  যার কারণে আজ পর্যন্ত রাষ্ট্র কাঠামোর পরিমণ্ডলের কোন ক্ষেত্রেই সকল জাতির মানুষের সুষম অধিকার প্রতিষ্ঠা পায়নি। সংবিধান, জাতীয় শিক্ষানীতি বা জাতীয় উন্নয়নের অপরাপর নীতিমালা বা পরিকল্পনাগুলোতে নিপীড়িত নির্যাতিত বঞ্চিত সাধারণ জনমানুষের; বিশেষ করে ক্ষুদ্র জাতিসমুহের ভাষা, শিক্ষা, মূল্যবোধ,  সংস্কৃতি আজ চরমভাবে উপেক্ষিত, লাঞ্চিত, বঞ্চিত ও নিপীড়িত। আলোচ্য এ নিবন্ধে সবার জন্য শিক্ষা কর্মসূচীর প্রেক্ষিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র জাতিসমুহের শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার অধিকার সুরক্ষায় বর্তমান সংবিধান ও জাতীয় শিক্ষানীতির প্রাসঙ্গিকতা সংক্ষেপে পর্যালোচনা করা হবে।
সংবিধান ও জাতীয় শিক্ষানীতির আলোকে বাংলাদেশের শিক্ষা দর্শন চেতনা       
 
এ সম্পর্কে ধারণা লাভের জন্যে আমাদের সংবিধান ও জাতীয় শিক্ষানীতি খতিয়ে দেখা দরকার। সংবিধানের ৩, ১৫ ও ১৭ নং ধারায় বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা দর্শনের মূল  বীজ বা চেতনা নিহিত। শিক্ষাকে সংবিধানে নাগরিকদের অন্যতম মৌলিক চাহিদা বা অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। ৩ নং ধারা অনুসারে, দেশের একমাত্র রাষ্ট্র  ভাষা হল বাংলা। যদিও বাংলা ছাড়া এদেশে আরও অনেকগুলো ভাষা (চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা…)রয়েছে। নাগরিকদের মৌলিক প্রয়োজনের ব্যবস্থা সম্পর্কে সংবিধানের ১৫ নং ধারায় রাষ্ট্রীয় বক্তব্য লিপিবদ্ধ আছে। সেখানে বলা হয়েছে,  রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হবে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক বিকাশের মাধ্যমে উৎপাদনশক্তির ক্রমবৃদ্ধিসাধন এবং জনগণের জীবনযাত্রার বস্তুগত ও সংস্কৃতিগত মানের দৃঢ় উন্নতিসাধন, যাতে নাগরিকদের জন্য অন্ন, বস্ত্র,আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা করা যায়। অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা  বিষয়ে ১৭ নং ধারায় বলা হয়েছে,  “রাষ্ট্র- (ক) একইপদ্ধতির গণমুখী ও সার্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত সকল বালক-বালিকাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাদানের জন্য; (খ) সমাজের প্রয়োজনের সহিত শিক্ষাকে সঙ্গতিপূর্ণ করিবার জন্য এবং সেই প্রয়োজন সিদ্ধ করিবার উদ্দেশ্যে যথাযথ প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত ও সদিচ্ছা-প্রণোদিত নাগরিক সৃষ্টির জন্য; (গ) আইনের দ্বারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিরক্ষরতা দূর করিবার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন” ৷ জাতীয় সংস্কৃতি সম্পর্কে ২৩ নং ধারায় বলা হয়েছে, “রাষ্ট্র জনগণের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার রক্ষণের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন এবং জাতীয় ভাষা, সাহিত্যও শিল্পকলাসমূহের এমন পরিপোষণ ও উন্নয়নের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন, যাহাতে সর্বস্তরের জনগণ জাতীয় সংস্কৃতির সমৃদ্ধিতে অবদান রাখিবার ও অংশগ্রহণ করিবার সুযোগ লাভ করিতে পারেন” ৷ অন্যদিকে দেশে প্রচলিত আইনগুলোর মধ্যে সংবিধানের প্রাধান্য সম্পর্কে উল্লেখ করতে গিয়ে ৭৷(১) ধারায় বলা হয়েছে যে,  “প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ; এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে ৷ (২) জনগণের অভিপ্রায়ের পরমঅভিব্যক্তিরূপে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন এবং অন্য কোন আইন যদি এই সংবিধানের সহিত অসামঞ্জস হয়, তাহা হইলে সেই আইনের যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হইবে”৷ এর অর্থ হল, জাতীয় শিক্ষানীতির যে অংশগুলো সংবিধানেরসাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় সেসব বাতিল বা অকার্যকর হবে।
সংবিধানিক লক্ষ্য অর্জনের তাগিদে ১৯৭২ সালে শিক্ষাবিদ ড. খুদরাত-ই-খুদা’র নেতৃত্বে দেশে সর্বপ্রথম একটি শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৫ সালের পরে বাংলাদেশে আরও কয়েকটি শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়। এর সর্বশেষ সংযোজন হল জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী’কে চেয়ারম্যান করে গঠিত শিক্ষা কমিশন। এই কমিশন দেশে একটি শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেযা ‘জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০’ নামে অভিহিত। প্রথমে বলে রাখা দরকার, এই শিক্ষানীতি চক চক করলে যে সোনা হয়না তার একটি বাস্তব প্রমাণ হতে পারে।  কারণ এই শিক্ষানীতিতে এমন ভালো ভালো কথা বলা হয়েছে যার কারণে অনেকের কাছে সেটা স্বর্ণ প্রতীয়মান হলেও বাস্তবে আসলে মরীচিকায় পূর্ণ। এই শিক্ষানীতি সবক্ষেত্রে এতটা চাতুর্যটায় পূর্ণ যে বাংলাদেশের সংবিধান জানা না থাকলে যে কাউকে রীতিমত ধাঁধায় পড়তে হতে পারে।
এই শিক্ষানীতির তথাকথিত নানা প্রশংসনীয় দিকগুলোর মধ্যেএকটি হচ্ছে দেশের ক্ষুদ্র  জাতিসত্তা আদিবাসী শিশুদের শিক্ষার প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেয়া। যদিও গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এর বিভিন্ন দিকগুলোর মধ্যে নানা বৈসাদৃশ্য এবং গলদ রয়েছে, যেগুলো সংশ্লিষ্ট ক্ষুদ্র জাতিসমুহের মাতৃভাষায় শিক্ষা লাভের জন্যে কখনোই সহায়ক নয়। উদাহরণ হিসেবে বলা  যায়, জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০- এ বলা হয়েছে যে, “আদিবাসী শিশুরা যাতে স্কুলে তাদের মাতৃভাষা শিখতে পারে তার ব্যবস্থা করতে হবে” (জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ : ২, ৭)। প্রশ্ন হচ্ছে ‘মাতৃভাষা শেখা’ না ‘মাতৃভাষায় শেখা’? ভাষা যদি শিক্ষার একটি মাধ্যম হয় তাহলে কথাটা হওয়া উচিত ছিল, “মাতৃভাষায় শেখার ব্যবস্থা করতে হবে”।
জাতীয় শিক্ষানীতির মুখবন্ধে বলা হয়েছে, “…এটা কোন দলীয় শিক্ষানীতি নয়- জনগণ তথা জাতির আকাংখা ও প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটিয়ে তৈরি করা হয়েছে জাতীয় শিক্ষানীতি”। সেখানে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, “শিক্ষানীতির মূলে প্রতিফলিত হয়েছে জনগণের রায় ও প্রত্যাশা এবং আমাদের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, লক্ষ্যও আদর্শের প্রতিফলন এবং আমাদের সংবিধানের মূল দিকনির্দেশনা…”।
জাতীয় শিক্ষানীতির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অংশে বলা হয়েছে,“…এই শিক্ষানীতি সংবিধানের দিকনির্দেশনা অনুযায়ী দেশে গণমুখী, সুলভ, সুষম,সর্বজনীন , সুপরিকল্পিত, বিজ্ঞান্মনস্ক এবং মানসম্পন্ন শিক্ষাদানে সক্ষম শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার ভিত্তি ও রণকৌশল হিসেবে কাজ করবে”। এর সর্বমোট ৩০ টির মধ্যে ২৩ নং ধারায় দেশের আদিবাসীসহ সকল ক্ষুদ্র জাতিসত্তার সংস্কৃতি ও ভাষার বিকাশ ঘটানোর কথা বলা হয়েছে। এ থেকে বুঝা যায়, অগ্রাধিকারের বিবেচনায়ও শিক্ষানীতিতে বাঙালি ব্যতীত অন্যদের অবস্থান একেবারেই তলানিতে রয়েছে।
“জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০” প্রণীত হবার পর ২০১১ সালে বাংলাদেশে নতুন সংবিধান প্রবর্তিত হয়। এতে দেশের অন্যান্য অবাঙালি অর্থাৎ ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোকে (চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা…) বাঙালি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যার মানে দাঁড়ায়- বাংলাদেশে বাঙালি ব্যতীত অপর কোন জাতির অস্তিত্ব নেই। এতে সহজে অনুমিত হয় যে, বাংলা ভাষা ব্যতীত এদেশে অপর কোন ভাষাও নেই। অর্থাৎ এখানে জনগণের একমাত্র মাতৃভাষা হল বাংলা । অঞ্চল ভেদে জনগণ (কি বাঙালি, কি চাকমা, মারমা…) যেসকল ভাষায় কথা বলে থাকে সেগুলো প্রত্যেকটিই হল বাংলা ভাষায় একেকটি আঞ্চলিক বা উপভাষা।
সংস্কৃতির অন্যান্য ক্ষেত্রেও সংবিধানের মূল চেতনা এর ব্যতিক্রম নয়। সংবিধানে জাতীয় সংস্কৃতি বলতে বাঙালি সংস্কৃতির কথা দৃঢ়ভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে। সেটির সুরক্ষা ও বিকাশের দিক নির্দেশনা সংবিধানে বিবৃত রয়েছে। এর মানেই হল দেশে বাঙালি সংস্কৃতি ব্যতীত অপর কোন জাতির সংস্কৃতির অস্তিত্ব নেই। বাঙালিই সত্য, অন্য কিছু নয়। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা প্রভৃতি উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী থাকলেও জাতিতে সকলে বাঙালি। এখানে বাঙালি জাতির সংস্কৃতি ভিন্ন অপর কোন আদিবাসী বা জাতিসত্তার সংস্কৃতি নেই। সংবিধানের এই চেতনা বা ধারা জাতীয় শিক্ষানীতির আদিবাসীবা জাতি, ধর্ম, গোত্র প্রভৃতি শব্দের সাথে কিছুটা বিপরীতমুখী এবং সাঙ্ঘরশিক প্রতীয়মান হলেও কিংবা ক্ষুদ্র জাতিসত্তাসমূহের কাছে কিছুটা আশাব্যঞ্জনার উদ্রেক ঘটালেও শিক্ষা দর্শনের মূল চেতনা,  লক্ষ্য,আদর্শের দিক থেকে সংবিধান ও জাতীয় শিক্ষানীতির মধ্যে মৌলিক কোন তফাৎ  নেই। এটা আমাদের সকলকে স্বীকার করতে হবে বা মেনে নিতে হবে। শিক্ষানীতি যেখানে দায়সারাভাবে আদিবাসী জনগণের মাতৃভাষা শিক্ষালাভের ব্যবস্থা করার কথা বলছে, সেখানে সংবিধান দেশে বাঙালি ব্যতীত অপর কোন জাতির অস্তিত্বকে অস্বীকার করেছে বা হরণ করেছে। এই অবস্থায় দেশে ক্ষুদ্র জাতিগুলোর মাতৃভাষায় শিক্ষার অধিকার দেবার বা স্বীকৃতি বিদ্যমান থাকার কথা বলা যেমন অবান্তর, তেমনি অপ্রাসঙ্গিকও। এই কারণে সবার জন্য শিক্ষার কথা বলাও নিঃসন্দেহে অযৌক্তিক এবং এক ধরণের পক্ষপাতদুষ্ট রাজনৈতিক ভণ্ডামির ফসল। কারণ সংবিধান হল দেশের সরবচ্চ আইন। সেখানে বাংলা ভাষা ব্যতীত অন্য কোন ভাষার স্বীকৃতি নেই। তারপরও যারা ক্ষুদ্র  জাতিসমুহের মাতৃভাষায় শিক্ষার ব্যবস্থা করার বাপদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলছেন বা সরকার আন্তরিক বলেই নিয়ত যে সাফাই গাইছেন বা বর্তমান সাংবিধানিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় আচ্ছন্ন থেকে ক্ষুদ্র জাতিসমূহের মাতৃভাষায় শিক্ষা ব্যবস্থা কায়েমের দিবাস্বপ্ন দেখছেন তারা আসলে হয় বোকার স্বর্গে বসবাস করছেন, নয়তো জনগণের সাথে স্বার্থগত প্রতারণা,  বিশ্বাসঘাতকতা করছেন। এর মধ্যে দিয়ে তারা  সরকারকে অহেতুক ওয়ার্ক ওভার দিয়ে অপরাধের বা সত্যকে লুকোনোর পাল্লা ভারি করছেন। শুধু তাই নয়, এই ধরণের রাষ্ট্রীয় জগাখিচুড়ী  ব্যবস্থায়, সবার জন্য শিক্ষা কর্মসূচীর লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য নির্ধারণ, কর্মসূচী বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় অংশ হিসেবে  নীতি, কর্মকৌশল, পরিকল্পনা প্রণয়নে নানা বিভ্রান্তি ও জটিলতা তৈরি হয়েছে, হচ্ছে, হবেই। এই সমস্ত দুর্বলতার কারণে শিক্ষার মৌলিক নীতি ও কৌশলের জায়গাগুলোতে এখনও নানা বিভ্রান্তি, অস্পষ্টতা, বৈপরীত্য, দুর্বলতা, ও বৈষম্য থেকে গেছে এবং দিন দিন সেগুলোর মাত্রা আশংখাজনক হারে বাড়ছে। আগামীতে সেগুলো আরও যে জটিল আকার ধারণ করবে তাতে কোন সন্দেহ নেই| যেগুলো সবার জন্য শিক্ষা লাভের পরিবেশ বা অধিকার প্রতিষ্ঠায় সহায়ক না হয়ে প্রতিবন্ধক হিসেবে ক্রিয়াশীল থাকবে। এর পরিণতিতে সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করা তো দুরের কথা, বাংলা ভাষা ও বাঙালি ইসলামী সংস্কৃতির আধিপত্যে বা দৌরাত্ত্বে চাকমা, মারমাসহ অন্য ক্ষুদ্র জাতিগুলোর ভাষা, শিক্ষা ও সংস্কৃতি সুরক্ষা এবং বিকাশের চেতনা পথ অবধারিতভাবেই রুদ্ধ হতে  থাকবে- যদি সময় থাকতে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব না হয়। কারণ বাংলাদেশের সংবিধান ও জাতীয় শিক্ষানীতি আমাদের কেবল বাঙালির ভাষা, শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি সুরক্ষা, মর্যাদা এবং বিকাশের শিক্ষাদীক্ষা দেয়।
কেন এমন হল ?      
 
আমাদের বুঝতে হবে যে, বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে আওয়ামীলীগের নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। বাঙালি জাতীয়তাবাদ কেন্দ্রিক যে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে সেখানে ক্ষুদ্র জাতিরসমুহকে সম্পৃক্ত করবার মৌলিক চেতনাগত কোন তাগিদ ছিল না। সাম্প্রদায়িক আওয়ামীলীগের কথা না হয় বাদই দিলাম। এই লড়াইয়ে তৎকালীন বাম নেতৃত্বসহ প্রগতিশীল শক্তি বিরাট ভূমিকা পালন করলেও তাদের রাজনৈতিক অবস্থান ছিল বিভ্রান্তিতে ভরপুর। তখনকার সময়ের বাম নেতৃত্ব আওয়ামীলীগ বা অন্যদের মত কট্টর না হলেও তাদের রাজনৈতিক দর্শন ছিল অবশ্যই সাম্প্রদায়িক। যার ধারাবাহিকতায় আজ আমরা তথাকথিত প্রগতিশীল বাম নেতৃত্ব কিংবা চেতনাকে দেখতে পাই। বাংলাদেশের বর্তমান বাম নেতৃত্ব রাজনৈতিকভাবে এখন এতই অস্বচ্ছ, অধঃপতিত, পঙ্গু, সুবিধাবাদ, দেউলিয়ায় আচ্ছন্ন যে তাদের কার্যকলাপগুলোকে হিতাহিত জ্ঞানশুন্য, আত্বঘাতি বললে অতিশয় কম বলা হবে। সত্যি বলতে কি, কিছু ব্যতিক্রম বাদে বর্তমান বাম নেতৃত্ব ক্ষমতার পদলেহনে এখন চাটুকারের ভুমিকায় অবরতিন। তাই তারা একদিকে যেমন বাংলাদেশে আদিবাসী আছে বলে প্রকাশ্যে লোক দেখানো বক্তব্য বিবৃতি দিয়ে ক্ষান্ত থাকে, অন্যদিকে আবার সাম্প্রদায়িক ও বৈষম্যমূলক সংবিধান, তথাকথিত জাতীয় শিক্ষানীতি প্রবর্তনের জন্যে প্রতিক্রিয়াশীল সরকারের ভূয়সী প্রশংসা গুণকীর্তন করে। তাই তাদের পক্ষে ক্ষুদ্র জাতিসমূহের অধিকারের প্রশ্নে মৌলিক বা শক্তিশালী কোন রাজনৈতিক সাংগঠনিক কর্মসূচীর (হরতাল, অবরোধ…) ডাক দেয়া সম্ভব হয় না। তেল, গ্যাস, বন্দর, সুন্দরবন রক্ষা প্রভৃতি ইস্যু তাদের কাছে জাতীয় রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে প্রতিপন্ন হলেও সমতল কিংবা পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরীহ দুর্বল ক্ষুদ্র জাতির জনমানুষের উপর শাসক শ্রেণী সেনা, সেতেলার বাঙালিদের উপরজুপুরি আক্রমণ, মানবতাবিরোধী অপরাধসমুহ খাটো বা গুরুত্বহীন বিবেচিত হয়। সেসব নিয়ে তাদের হাহুতাশ, বক্তব্য, বিবৃতির ধরণ পর্যালোচনা করলে তা স্পষ্ট হবে। এর মধ্যে দিয়ে বামরা আসলে সেসব প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ না নিয়ে পরোক্ষভাবে আরও জোরালো হামলা, আক্রমণের সুযোগ তৈরি করে দেয়। তারা ভাবতে পারে না যে, এটা বাংলাদেশের জাতীয় সমস্যা, সমগ্র মানব সমাজের সমস্যা। এই জঘন্য অপরাধ প্রবণতা নির্মূল করতে না পারলে তার রোষানল থেকে একসময় নিজেরা অর্থাৎ সমগ্র বাংলাদেশও যে রক্ষা পাবে না তারা সেটা ভুলে যায়। তারা ভুলে যায় যে, সেটা বাম রাজনীতির বা প্রগতিশীলতার কোন কর্ম নয়। আধুনিক প্রগতিশীল অসাম্প্রদায়িক বিজ্ঞানমনস্ক মুক্ত চেতনা বা দর্শনের বহিঃপ্রকাশ হল সুবিধাবাদ, বৈষম্য, বঞ্চনার অবসানে দ্বান্দিক বস্তুবাদী ভূমিকায় অবরতিন হওয়া। সামাজিক ন্যায় বিচার ও মানবতাবাদ প্রতিষ্ঠায় সুদৃঢ় শক্তিশালী অবস্থান নেয়া। দেশে এ চেতনা লালিত হলে আজ আমরা একটি অসাম্প্রদায়িক ও বৈষম্যমুক্ত আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক প্রগতিশীল মানবিক জনকল্যাণমুখী সংবিধান পেতাম! তারই আলোকে বৈষম্যমুক্ত শিক্ষানীতি পেতাম, যার মাধ্যমে দেশে সকল শিশুর জন্য মাতৃভাষায় শিক্ষা বা জ্ঞান অর্জনের বৈষম্যহীন শিক্ষা ব্যবস্থা কায়েম করতে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা পাওয়া যেত! যার মূল চেতনা হত মানুষের জন্যে শিক্ষা, শিক্ষার জন্যে মানুষ নয়। কোন এলাকায় একজন শিশু থাকলেও তার জন্যে মাতৃভাষায় শিক্ষার ব্যবস্থা করা- প্রকৃতঅর্থে সবার জন্য শিক্ষা দর্শনের মূলমন্ত্র; যেখানে সকল জাতির, সকল  ভাষার মানুষের ভাষা, শিক্ষা,সংস্কৃতিকে সমানভাবে গুরুত্বারোপ করে সেসব সংরক্ষণ ও বিকাশের লক্ষ্যে অসাম্প্রদায়িক এবং বৈষম্য মুক্ত প্রয়াস পরিলক্ষিত হত। ক্ষুদ্র জাতির জনগণের দুর্ভাগ্য হল এই যে, এদেশে অনেকগুলো রাষ্ট্রীয় ভাষা, জাত, ধর্ম, ইতিহাস, ঐতিহ্য, মূল্যবোধ, সংস্কৃতি হাজার বছরের অধিক সময়ব্যাপী লালিত পালিত হয়ে আসলেও কেবল বাংলাই হল রাষ্ট্রীয় ভাষা! বাঙালিই হল একমাত্র জাতি বা বাঙালি সংস্কৃতিই হল দেশের একমাত্র জাতীয় সংস্কৃতি! এর মধ্যে যে কতটা শুভঙ্করের ফাঁকি লুকায়িত তা কেবল মননে বিকার হলেই না বুঝা বা মেনে নেয়া সম্ভব। এই ধরণের রাষ্ট্রীয় সাম্প্রদায়িক ধ্যানধারণা বা প্রবণতা মানব সভ্যতার জন্যে কতটা যে ভহাবহ বিপর্যয় ডেকে নিয়ে আসতে পারে তা তথাকথিত প্রগতিশীল সাম্প্রদায়িক বাঙালি শাসক গোষ্ঠীর পক্ষে আজও বুঝা অসম্ভব বলেই প্রতীয়মান হয়।
২৯।০৬।২০১৪

About the author

উৎপল খীসা

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/2812

1 ping

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>