«

»

এই লেখাটি 1,010 বার পড়া হয়েছে

Print this প্রকাশনা

গনমাধ্যম, ধর্ম এবং শোষণ

 মিডিয়া বা গনমাধ্যমের সংজ্ঞা পর্যালোচনা করে জানা যাচ্ছে, “ যে মাধ্যম ব্যাপক মানুষকে প্রভাবিত করতে পারে বা করে তাকে গনমাধ্যম বলে” । এই সংজ্ঞা থেকে দেখা যাচ্ছে টিভি, রেডিও, নিউজ পেপার, ম্যাগাজিন, বই এমনকি হাল আমলের ফেসবুক, ট্যুইটার, স্কাইপি, ইউ টিউব ইত্যাদিও গনমাধ্যম । গনমাধ্যমকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে । ১। প্রিন্ট মিডিয়া ২। ইল্যেকট্রনিক্স মিডিয়া এবং ৩। নিউ এজ মিডিয়া । নিউজ পেপার, ম্যাগাজিন, বই প্রিন্ট মিডিয়াভুক্ত, টিভি, রেডিও ইত্যাদি ইল্যেকট্রনিক্স মিডিয়াভুক্ত এবং ইন্টারনেটভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, ইউ টিউব, স্কাইপি, ট্যুইটার ইত্যাদি নিউ এজ মিডিয়াভুক্ত ।

জ্ঞানার্জন, সারা পৃথিবীর খবরাখবর, বিনোদন সহ হাজারো সুযোগ সুবিধা নিয়ে গনমাধ্যম যেমন মানুষের উপকারে লাগছে তেমনি শাসক শ্রেণীর স্বার্থ উদ্ধার এবং শোষকের শোষনকে জায়েজ করার কাজেও ব্যবহৃত হচ্ছে গনমাধ্যম ।

গনমাধ্যমের মাধ্যমে জনগনের সাইকোলজি বা মনঃতত্বের উপর প্রভাব বিস্তার করে মানুষের মননকে তৈরি করা হচ্ছে শাসকের ইচ্ছানুযায়ী । বর্তমানে গনমাধ্যমের ভুমিকা এত ব্যপকতা পেয়েছে যে, আমরা যা খাচ্ছি, বলছি, করছি, চলছি, পরছি তার সব কিছুই ঠিক করে দিচ্ছে গনমাধ্যম । বাংলা-ইংলিশ-হিন্দির মিশেলে কথা বলা যেই FM জেনারেশনের কথা আমরা বলছি, সেই FM জেনারেশন হিন্দি-বাংলা-ইংলিশের মিশেলে কথা বলার এই ফ্যাশন শিখছে কোথায় ? শিখছে, FM রেডিও নামক গনমাধ্যমের কাছ থেকে । ট্রেন্ডি হওয়ার জন্য, ফ্যাশন্যাবল হওয়ার জন্য বিভিন্ন স্টাইলের কাপড়-চোপড় আমরা পরছি । এসব স্টাইলগুলি ঠিক করে দিচ্ছে কারা ? উত্তরঃ গনমাধ্যম । স্যাটেলাইট চ্যানেলের কল্যাণে রিমোটের বোটাম টিপলেই চোখের সামনে হাজির হচ্ছে হাজারো চ্যানেল, হাজারো প্রোগ্রাম । স্টার জলসা, স্টার প্লাসের সিরিয়াল দেখে এসব সিরিয়ালের অভিনেতা-অভিনেত্রীদের পরিহিত পোষাক-পরিচ্ছদকে আমরা নিজের মধ্যে ধারন করছি । ফিল্ম বা নাটকের ফাঁকে সাবানের বিজ্ঞাপন, বডি স্প্রের বিজ্ঞাপনসহ দৈনন্দিন জীবনের ব্যবহৃত সব পণ্যের বিজ্ঞাপন আমাদের মাথায় স্থান করে নিচ্ছে । মোট কথা, আমাদের জীবনের নিত্য ব্যবহৃত সব পন্যই ঠিক করে দিচ্ছে গনমাধ্যম । বর্তমান পুজিবাদের এই দুনিয়ায় খেলা, বিনোদন, চিকিৎসা, শিক্ষা সব কিছুই চলে গেছে পুজিপতিদের দখলে । পুজিপতিরাই এখন ঠিক করে দিচ্ছে আমরা কি করব, আমরা কি বলব, আমরা কি খাব, আমরা কি পরব । এই পুজিপতিরাই বর্তমানে, হয় সরাসরি রাষ্ট্রের হর্তাকর্তা অথবা পেছন থেকে রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারনকারী ।গনমাধ্যমের মাধ্যমে আমাদের চিন্তা-চেতনা-দৈনন্দিন যাপিত জীবনের সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করে দেওয়া হচ্ছে ।

এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার জন্য মগজ ধোলাই এবং এন্টি মগজ ধোলাই নিয়ে কিছুটা আলোচনা করা যাক । আমরা ছোটকাল থেকে কথা বলা থেকে শুরু করে বিভিন্ন আচার-আচরন শিখে বড় হতে থাকি । আরো একটু বড় হওয়ার পর স্কুল, কলেজের শিক্ষা, আত্মিয়-স্বজন, পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধবসহ বিভিন্ন মাধ্যমে আমরা প্রভাবিত হই এবং শিক্ষা লাভ করি । এরপর আরো একটু বড় হয়ে কেউ জাতিয়তাবাদী, কেউ সমাজতান্ত্রিক, কেউ সাম্যবাদী, কেউ মানবতাবাদী, কেউ ভোগবাদী, কেউ পশুপ্রেমী, কেউ ধার্মিক, কেউ নাস্তিক, কেউ রাজনীতি বিমূখ, কেউ রাজনীতিবীদ, কেউ বামপন্থী, কেউ ডানপন্থী ইত্যাদি বিভিন্ন প্রকার শত শত দর্শন এবং পন্থায় বিভক্ত হয়ে পরি । এগুলি সবই মগজ ধোলাই এবং এন্টি মগজ ধোলাইয়ের ফল ।

যে দেশের রাষ্ট্রযন্ত্র যে দর্শনে নিয়ন্ত্রিত সেই দেশের মিডিয়াও সেই দর্শনেই নিয়ন্ত্রিত হয় এবং সিংহভাগ জনগনও সেই দর্শনেই মগজ ধোলাইয়ের শিকার হয় । আবার সেই দেশেরই কিছু কিছু মানুষ সেসব দর্শনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে, মানুষকে বুঝানোর চেষ্টা করে, এসব কিছু ভুল, ভুল পথে চলছে দেশ, ভুল তত্ব-দর্শনে চলছে দেশ । এগুলিও আদতে একপ্রকার মগজ ধোলাই, মগজ ধোলাইয়ের বিরুদ্ধে এন্টি মগজ ধোলাই । পুজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের মগজ ধোলাইয়ের বিরুদ্ধে মার্ক্সবাদ-লেলিনবাদ-মাওবাদের এন্টি মগজ ধোলাই । মার্ক্সবাদ-লেলিনবাদ-মাওবাদের মগজ ধোলাইয়ের বিরুদ্ধে পুজিপতি-সাম্রাজ্যবাদীদের উদ্ভাবিত ধর্মনিরপেক্ষতা-সাম্যবাদী-উন্নয়ন তত্ব । ধর্ম আর কুসংষ্কারের বিরুদ্ধে বিজ্ঞানচেতনা-বিজ্ঞানচর্চা এ সব কিছুই এক তত্বের মগজ ধোলাইয়ের বিরুদ্ধে অপর তত্বের এন্টি মগজ ধোলাই । চলমান এই লেখাটির মধ্য দিয়ে যে বিষয় বা তত্বের অবতারনা করা হয়েছে তাও মগজ ধোলায় চেষ্টার অংশ । মিডিয়ার মাধ্যমে জনগনকে বোকা বানিয়ে কিভাবে শাসকগোষ্ঠী একের পর এক দূর্নীতি, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, গুম, হত্যা, একের পর এক অন্যায় করে চলেছে তার বিরুদ্ধে জনগনকে সচেতন করার, জাগানোর চেষ্টার এন্টি মগজ ধোলাই ।

ছোটকাল থেকে সুপারম্যান, স্পাইডারম্যান সিরিজ দেখে দেখে বড় হওয়া একটা শিশু বড় হয়ে সুপারম্যান, স্পাইডারম্যানের মত অন্যের জীবন বাচানোর চেষ্টার পরিবর্তে চোখের সামনে কোন অন্যায়-অত্যাচার হতে দেখলেও চুপ করে থাকে । এখন আমরা অন্যায়, অত্যাচার, দূর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার পরিবর্তে কোন এক সুপার হিরোর প্রত্যাশায় থাকি । আশা করে থাকি, কোন এক সুপার হিরো হঠাৎ উপস্থিত হয়ে আমাদেরকে এই অবস্থা থেকে টেনে তুলবে । কেউ পানিতে ডুবে যেতে থাকলে এখন আমরা সেই ডুবন্ত ব্যক্তিকে বাঁচানোর চেষ্টার পরিবর্তে সবাই চিৎকার করে বলতে থাকি, “কেউ ওকে বাঁচাও” । সবাই গা বাঁচিয়ে চলার চেষ্টা করি । বর্তমানে এই অবস্থা সমাজের সর্ব ক্ষেত্রেই বিরাজমান । চোখের সামনে কাউকে খুন হতে দেখলেও চুপ করে থাকি । আমাকে তো কেউ খুন করছেনা ! এই চিন্তা নিয়ে চুপ করে থাকি । এগুলি সবই মস্তিষ্ক প্রসূত চিন্তা, আর এই জাতিয় চিন্তাশীল মস্তিষ্ক সৃষ্টিতে অন্যতম ভুমিকা রাখছে গনমাধ্যম ।

বর্তমানে এক দেশের বিরুদ্ধে অন্য দেশের নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠার জন্য অস্ত্রের ঝনঝনানির যেমন প্রযোযন হয় না, তেমনি একটি দেশের জনগনকে নিয়ন্ত্রন করার জন্য অস্ত্রেরও তেমন প্রয়োজন হয়না । একটি দেশ অন্য একটি দেশের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধের ময়দানে হাজির না থেকে ছায়া যুদ্ধের মাধ্যমে বিভিন্নভাবে নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠার যুদ্ধে লিপ্ত । আমেরিকা কিংবা চায়না, ইন্ডিয়ার সাথে ছায়া যুদ্ধে লিপ্ত ইন্ডিয়ার মধ্যেকার বিভিন্ন স্বাধিনতাকামী, স্বায়ত্বশাসনকামী সংগঠনকে সহায়তা প্রধানের মাধ্যমে । পাকিস্তান, ইন্ডিয়ার সাথে ছায়াযুদ্ধে লিপ্ত ইন্ডিয়ার মধ্যে ইসলামিক জঙ্গিবাদীদের সহায়তা প্রধানের মাধ্যমে । ইন্ডিয়া, বাংলাদেশের সাথে ছায়াযুদ্ধে লিপ্ত পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন সংগঠনকে সহায়তা প্রধানের মাধ্যমে । বাংলাদেশ সহায়তা দেয় ইন্ডিয়ার বিভিন্ন সংগঠনকে । এভাবে ছায়াযুদ্ধের মাধ্যমে পৃথিবীর এক দেশ অন্য দেশের কাছ থেকে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা আদায়ের জন্য স্বিয় স্বার্থের প্রয়োজনে অন্য দেশের ছোট ছোট সংগঠন গুলিকে ব্যবহার করছে । জীবাণু যুদ্ধ, ছায়া যুদ্ধ দিয়ে যেমন একটি দেশকে অন্য একটি দেশ বশে রাখতে পারে ঠিক তেমনি সাইকোলজিক্যাল নিয়ন্ত্রন দিয়েও একটি দেশ অন্য একটি দেশকে এবং একটি রাষ্ট্র, নিজের দেশের জনগনকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে । সমাজ ও রাষ্ট্র চরিত্র যতই জটিল হচ্ছে মগজধোলাইয়ের প্রয়োজনীয়তাও তত বাড়ছে । বর্তমানে সম্মুখ যুদ্ধ, ছায়া যুদ্ধ, জীবাণু যুদ্ধের চেয়েও সাইকোলজিক্যাল ওয়্যার বা সাইকোলজিক্যাল নিয়ন্ত্রন অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে প্রতিয়মান হয়েছে । বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্র আমেরিকার “মস্তিষ্ক যুদ্ধ” পরিকল্পনার পদক্ষেপ হলঃ

১। যারা শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত, বুদ্ধিজীবি তাদের নিয়ন্ত্রনে রাখতে পারলেই দেশকে নিয়ন্ত্রনে রাখা যাবে ।

২। উন্নতিশীল ও অনুন্নত দেশগুলিতে যেখানে শতকরা ৭০-৮০ ভাগ মানুষ গরিব, সেখানে সবাইকে ঠিকমত বাঁচতে দেওয়া অসম্ভব । এই গরিব মানুষগুলি যাতে তাদের দাবীদাওয়ার কথা তুলতে না পারে সেই ব্যবস্থা করতে হবে ।

৩। উচ্চবিত্তদের ক্যারিয়ারিস্ট করার আন্তরিক চেষ্টা করতে হবে । শতকরা ১০ ভাগ এগিয়ে থাকাদের জন্য সমস্ত সুযোগ-সুবিধা দিয়ে দাও । সাজানো ফ্লাট-গাড়ি-বিদেশী মদে ডুবিয়ে রাখো । প্রথমে তার চিন্তা থেকে সমাজ বাদ যায় । এরপর বাকি থাকে শুধুমাত্র পরিবার । কারন, আর যাই হোক ক্যারিয়ারিস্ট শেষ পর্যন্ত শুধুমাত্র নিজের কথায় ভাবে ।

৪। তরুন এবং মধ্যবিত্তদের নিরন্তর উত্তেজনার মধ্যে ডুবিয়ে রাখতে হবে । তরুনদেরকে উত্তেজিত রাখতে হবে নাচ, গান, যৌনতা ইত্যাদি বিষয়ে । মধ্যবিত্তদের জন্য খবরের কাগজ থেকে টিভি চ্যানেলে গঠনমূলক খবরের চেয়ে নেতিবাচক খবরে জোর দিতে হবে । যুদ্ধ, ধর্ষন, খুন ইত্যাদি নেতিবাচক খবরে জোর দিতে হবে । আর এক শ্রেণীর অতি নিরীহ মধ্যবিত্তদের মজিয়ে রাখতে হবে ধর্ম, স্বর্গ-নরক, ভাগ্য ইত্যাদি বিষয়ে । এর জন্য প্রচার মাধ্যমগুলিতে এসব কিছু গুরুত্বের সাথে প্রচার করতে হবে ।

৫। যারা শোষিত-বঞ্চিত মানুষদের ঘুম ভাঙাচ্ছে, তাদেরকে দেশদ্রোহী, বিচ্ছিন্নতাবাদী, উগ্রপন্থী ইত্যাদি বলে জেলে পুরে দিতে হবে । প্রচার করতে হবে রাষ্ট্রের অখন্ডতা প্রেমিরাই দেশপ্রেমী । দেশের শোষিত বঞ্চিত মানুষদের জন্য যারা লড়াই করে তাদেরকে এনকাউন্টারে শেষ করে দিয়ে প্রচার করতে হবে তারা কি ভয়ঙ্কর রকমের উগ্রপন্থী ।

৬। কায়েমী স্বার্থ রক্ষার জন্য বাকি দেশবাসীদের মগজধোলাইয়ের জন্য সম্ভাব্য সব পথই গ্রহণ করতে হবে ।

আমেরিকার মস্তিষ্ক যুদ্ধ পরিকল্পনার পদক্ষেপগুলি পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, এই পরিকল্পনার প্রতিটি পদক্ষেপেই মিডিয়া বা গনমাধ্যমের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে । উপরোক্ত পরিকল্পনার উপর ভিত্তি করেই বর্তমানে উন্নয়নশীল এবং অনুন্নত দেশসমূহের রাষ্ট্রপ্রধানরা সেদেশের জনগনের মগজ ধোলাই করে চলেছে আর আমেরিকাও সেসব দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদেরকে হাতের মুটোয় রেখে তার স্বিয় স্বার্থ বাস্তবায়ন করে চলেছে ।

ধর্ম এবং শোষনঃ

“খনিতে যে করে শ্রম,

যেন তারে ডরে যম ।

খালি পেটে নাহি ক্ষেদ,

বেশি খেলে বাড়ে মেদ ।

ধন্য শ্রমিকের দান,

হীরকের রাজা ভগবান ।”

হ্যা, সত্যজিত রায়ের কালজয়ী চলচিত্র “হীরক রাজার দেশে” চলচিত্রের কথা বলছি । ধর্মের জিগির তুলে মানুষকে বোকা বানিয়ে কিভাবে ধর্মের মাদকতায় নিমজ্জিত করে রাখা হয় তার রুপক চিত্রায়ন করা হয়েছে হীরক রাজার দেশে চলচিত্রের মাধ্যমে । মাত্র কয়েকশত বছর আগেও ধর্মিয় পুরোহিতদের দিয়ে প্রচার করা হত, রাজা হল ইশ্বরের প্রতিনীধি, আর ইশ্বরের প্রতিনীধির অবমাননা মানেই স্বয়ং ভগবানের অবমাননা । বিনিময়ে পুরোহিতরা পেত রাজার আনুকুল্য এবং অঢেল ধন-সম্পদ অর্জনের সুযোগ । রাজারা ইচ্ছেমত কর আদায় করলেও, ধর্মিয় জুজুর ভয়ে কেউ রাজার বিরুদ্ধে টু শব্দটি পর্যন্ত করার সাহস করত না । ফলে রাজার গদি নড়বড়ে হওয়ার মত কোন আন্দোলনও হত না ।

You may fool all people some of the time, you can even fool some of the people all the time, but you can not fool all of the people all the time.

অনুবাদঃ

সকল মানুষকে কিছু সময়ের জন্য বোকা বানানো যায়, কিছু কিছু মানুষকে সব সময়ের জন্য বোকা বানানো যায়, কিন্তু সব মানুষকে সব সময়ের জন্য বোকা বানানো যায় না ।-আব্রাহাম লিঙ্কন ( আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট )

সমাজবিজ্ঞান আর নৃ-বিজ্ঞানের আধুনিক গভেষণা থেকে আমরা জানতে পারি আদিম-অসহায় মানুষদের অজ্ঞতা, কল্পনা আর ভয়ভীতি থেকেই ধর্মের উৎপত্তি । আজ থেকে আনুমানিক প্রায় আড়াই লক্ষ বছর আগে মানুষের পূর্বপ্রজাতি লিয়ান্ডার্থাল প্রজাতির মধ্যে প্রথম ধর্মিয় আচার-আচারন পালনের নিদর্শন পাওয়া যায় । সময়ের পরিক্রমায় মানুষের যেমন ক্রমবিকাশ ঘটেছে, তেমনি চিন্তা-চেতনারও স্পুরন ঘটেছে বিভিন্ন আঙ্গিকে । বিচ্ছিন্ন মানুষ বনে-জঙ্গলে হিংস্র পশুর আক্রমন থেকে নিজেকে রক্ষার জন্য, খাদ্য সংগ্রহের সুবিধার্থে, ভয়াবহ প্রাকৃতিক দূর্যোগ থেকে বেঁচে থাকতে গিয়ে গোষ্ঠীবদ্ধ হয়েছে, গোষ্ঠী থেকে সমাজ, সমাজ থেকে রাষ্ট্রীয় কাঠামো তৈরি হয়েছে । এই সমাজ কাঠামো ঠিকিয়ে রাখতে গিয়ে নিজেদের মত করে কিছু নিয়ম-নীতি তৈরির প্রচেষ্টা চালিয়েছে । সে সময়কার মানুষের জীবন ও জগৎ সম্পর্কে বিশ্লেষনী জ্ঞান না থাকার দরুন তাদের মধ্যে বিভিন্ন পেক্ষাপটে প্রাক-ধর্মিয় চেতনা বিস্তার লাভ করে । নৃ-বিজ্ঞান, প্রত্নতত্ব, মনোবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞানের বিভিন্ন গভেষণা থেকে প্রমাণিত সত্য যে, বর্তমানে প্রচলিত ধর্ম এবং ধর্মিয় শাস্ত্রগুলি কঠোর পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিতে রচিত । বাইবেল, কোরান, বেদ, ত্রিপিটক ইত্যাদি তথাকথিত ধর্মিয় শাস্ত্রগুলি নির্মোহভাবে পাঠ করলে বোঝা যায় এগুলি সেসব ধর্ম প্রবর্তকদের এবং পরবর্তীতে পুরোহিত-মোল্লা-পাদ্রীদের চিন্তাধারা-দৃষ্টিভঙ্গিরই স্পুরন এবং সন্নিবেশন । নিজেরা যেভাবে জগতকে দেখতেন, বিচার করতেন, তেমনি কায়েমি স্বার্থ রক্ষার তাগিদেই হোক কিংবা নিজের উদরপূর্তির জন্যই হোক কিংবা নিজের ভয়-ভক্তি-বিশ্বাস থেকে উদ্ভুত ভ্রান্ত ধারনার বশবর্তী হয়েই হোক কিংবা সৎ উদ্দেশ্য থেকেই হোক কিংবা মানষিক ভ্রান্তিজনিত রোগের কারনেই হোক, তারা শাস্ত্রগুলির বক্তব্যকে সৃষ্টিকর্তা বা সর্বশক্তিমান ইশ্বরের নামে প্রচারের চেষ্টা করেছেন । যে ধর্ম একসময় ছিল মানুষের কল্পিত আশ্রয়স্থল, হতাশ মানুষদের নিরাপত্তার আচ্ছাদন, দুর্বল চিত্তের মানুষদের ভ্রান্ত অবলম্বন, সেই ধর্মই আজ শোষিত মানুষের চোখে ধুলো দিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকার , শাসকগোষ্ঠীর সর্বনাশা ব্যবহার, অতি ধুরন্ধর কিছু লোকের পরিশ্রম না করেও পায়ের উপর পা তুলে বসে খাওয়ার আশ্রয়স্থল ।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক বলে ধরা হয় যাকে সেই নিকোলো ম্যাকায়াভেলি ধর্মিয় রাষ্ট্র প্রসঙ্গে বলেন, “শাসকের, ধার্মিক হওয়ার চেয়ে ধার্মিকের ভান করাটা বেশি গুরুত্বপূর্ন ”। ধর্মিয় পুরোহিতরা যখন শাসকের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে যায় তখন সেখানে ধর্মিয় পুরোহিতরাই শাসকের প্রতিদন্ধি হিসেবে আবির্ভুত হয় । এজন্য শাসককে, ধর্মিয় পুরোহিতদেরকে নিজের নিয়ন্ত্রনে এবং স্বিয় স্বার্থে ব্যবহারের চেষ্টা করতে হবে । ধর্মকে ব্যবহার করে, ধার্মিকের ভান করে পাঁচমিশেলি রাজনীতির ইতিহাস এই উপমহাদেশে বেশি দিনের পুরনো কোন ইতিহাস নয় । মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, শেখ মুজিব, ইন্দিরা গান্ধী থেকে শুরু করে হাল আমলের শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া, এরশাদ প্রত্যেকেই ধর্মকে, নিজেদের ক্ষমতার মসনদ পাকাপোক্ত করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করেছেন ।

১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধান রচনার সময় “ধর্মনিরেপেক্ষতা” সন্নিবেশন করা হয় । কিন্তু সন্নিবেশন করা হয় “ধর্মনিরেপেক্ষতা”-র কোনরুপ সংজ্ঞা নির্দেশ ব্যতীত । জিয়াউর রহমান আর হুশেইন মুহম্মদ এরশাদ সংবিধানে সন্নিবেশন করলেন “বিসমিল্লাহ” আর “রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম” । হাসিনা সরকার ৭২ এর সংবিধানে ফিরে গিয়ে একদিকে নিয়ে আসলেন “ধর্মনিরপেক্ষতা” আর অন্যদিকে বহাল রাখলেন “রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম” । সংবিধানের, এ যেন এক অঙ্গে কত রুপ !

পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের সংবিধানেও ১৯৭৫ সালে “ধর্মনিরপেক্ষতা”-র সন্নিবেশন করা হয় কোনরুপ সংজ্ঞা নির্দেশ ব্যতীত । এলাহবাদ কোর্টের রায়ে হেরে গিয়ে শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর গদি যখন তালমাতাল, সেই তাল সামলাতেই সংবিধানে সন্নিবেশন করা হয় “ধর্মনিরপেক্ষতা” । তারপর সব ধর্মের ধর্মস্থানগুলিতে মাথা ঠেকিয়ে ধর্মকে নামালেন ভোটের রাজনীতিতে !

ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের সংবিধানে “ধর্মনিরপেক্ষ” (secular) শব্দের সংজ্ঞায় স্পস্থভাবে বলা আছে, “ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের রাষ্ট্রনীতি, রাজনীতি, শিক্ষানীতি হবে সম্পূর্ণ ধর্মবিবর্জিত । রাষ্ট্রনায়কগণও কোনভাবেই প্রকাশ্যে ধর্ম-আচরন করতে পারবে না ।

কিন্তু আমাদের মগজে “ধর্মনিরপেক্ষতা”-র সংজ্ঞা গেথে দেওয়া হয়েছে এভাবে, “দেশের মধ্যে বিদ্যমান সব ধর্মকে সমান চোখে দেখবে রাষ্ট্র । রাষ্ট্র সব ধর্মের লোকদের নিজ নিজ ধর্ম পালনে উৎসাহ দেবে এবং ধর্ম পালনে সহায়তা করবে ”।

এ যে কত বড় মিথ্যাচার ! তার প্রমাণ পাওয়া যায়, চারদিকের ঘটনাবলী অবলোকন করলে । রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রকদের বেশিরভাগ যখন মুসলিম ধর্মানুসারী, তখন তাদের কাছে অন্য সব ধর্মকে সমান চোখে দেখার আশা করাটা যেমন বোকামি তেমনি রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রকদের বেশিরভাগ যখন হিন্দু বা বৌদ্ধ বা খৃস্টান ধর্মানুসারী হয় তখন তাদের কাছে অন্য সব ধর্মকে সমান চোখে দেখার আশা করাটাও বোকামি । কারন পৃথিবীর সব ধর্ম এবং ধর্মানুসারী নিজেদের স্ব স্ব ধর্মকে খাটি এবং সত্য ধর্ম বলে মেনে চলে । রাষ্ট্রপ্রধানরা জনগনের এসব সেন্টিমেন্টকে কাজে লাগিয়ে কেউ সাজে ধর্মনিরপেক্ষতার অবতার, আর কেউবা সাজে খাটি ধার্মিকের অবতার । আদতে আসলে এরা প্রত্যেকেই যতটা না ধার্মিক, ভান করে তার চেয়ে বেশি । উদ্দেশ্য একটাই, ধর্মের হেমলক বিষে জনগনকে চুবিয়ে রেখে ইচ্ছেমত দূর্নীতি, সন্ত্রাস, বিচার বহির্ভুত হত্যাকান্ডের পরেও জনগন যাতে সেসবের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে না পারে সেই ব্যবস্থা করা ।

তথ্যসূত্রঃ

Insurgent Crossfire: North-East India, Writer ( Subir Bhaumik )

The Prince, Writer ( Niccolo Machiavelli )

মনের নিয়ন্ত্রণ যোগ-মেডিটেশন, লেখক (প্রবীর ঘোষ)

যে কথা বলা হয়নি, লেখক (আকাশ মালিক)

আলো হাতে চলিয়াছে আধারের যাত্রী, লেখক ( অভিজিৎ রায় )

বিবর্তনের পথ ধরে, লেখক ( বন্যা আহমেদ )

About the author

জুম্মো এডিসন

আমি বস্তুবাদী নাস্তিক ।

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/2795

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>