«

»

এই লেখাটি 637 বার পড়া হয়েছে

Print this প্রকাশনা

রাষ্ট্রিক আগ্রাসন এবং চিরবধির বাংলাদেশঃ দিঘীনালায় বিজিবির ব্যাটেলিয়ন স্থাপন, মিডিয়া সেন্সরশিপ এবং কিছু অশ্রুত কন্ঠের জবানবন্দী

(হিল ব্লগার এন্ড অনলাইন এক্টিভিস্ট ফোরামের একজন সদস্য আজ দিঘীনালার বাবুছড়ায় গিয়ে ঘুরে এসেছেন। তিনি যত্ম মোহন কার্বারি পাড়াসহ দিঘীনালা হাসপাতাল ঘুরে আসেন। আর দিঘীনালা ভূমি রক্ষা কমিটির একজন সদস্যের সাথেও কথা বলেন। তার মুখ থেকেই শোনা যাক ঘটনাপ্রবাহ-)

জমির আইল ধরে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ করে চোখের সামনে ভেসে উঠল বিজিবি ক্যাম্প। ক্যাম্পের পাশে একটা একতলা পাকা দালান, পরে জানতে পারি দালানটি ২ নং বাঘাইছড়ি প্রাইমারি স্কুল। তার পাশে বিজিবি চেকপোস্ট এবং সেখানে একটি রাইফেল বসানো রয়েছে। আর সেই রাইফেল হাতে আমাদের উদ্দেশ্যে বাইনোকুলার দিয়ে তাকিয়ে রয়েছে একজন সদস্য। তার পাশাপাশি রয়েছে আরো ১০-১২ জন সদস্য। ভয়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে শরীরে, গুলি করে দেবে না তো!! হয়তো একটু পর কানে আসবে গুলির শব্দ বা কারোর গর্জে ওঠা কণ্ঠ  “হল্ট”!! কিন্তু এখন ভয়ের সময় নয়, তাই ভয়কে পাশ কাটিয়ে হাঁটতে থাকি নিজের পথে। আরো একটুখানি পথ, পথ পেরোলেই যত্ম মোহন কার্বারি পাড়া……

আজ ১২ জুন, দিঘীনালাস্থ বাবুছড়ার যত্ম মোহন কার্বারি পাড়া গিয়ে ঘুরে আসলাম। আপনারা সবাই ইতোমধ্যে অবগত হয়েছেন গত পরশুদিন এই গ্রামের নারীদের উপর সেটেলার-বিজিবি-আর্মি এই ত্রয়ী মিলে যৌথ হামলা করেছিল। তারই সরেজমিন তদন্ত করতে, খবরের সত্যতা যাচাই করতে, সেখানকার নিরীহ গ্রামবাসীদের অবস্থা অবলোকন করার জন্যই এই যাওয়া। পরে আরো দুইজন আমার সাথে সেখানে গিয়েছিলেন।

প্রথমেই কিছু কথা বলে নিতে হয়। আমাদের পেজের আগের পোস্টে আমরা যা বলেছিলাম তা ছিল ঘটনায় আহতদের বিবৃতির সূত্র ধরে, কিন্তু আজকের পোস্টটি আমার নিজের ঘুরে আসার অভিজ্ঞতা থেকে বর্ণনা করতে চাই।

আমরা তিনজন মোটরসাইকেল দিয়ে বাবুছড়া বাজারে গিয়ে প্রথমে একজন দোকানীর সাথে কথা বলে জানতে পারি যত্ম মোহন কার্বারি পাড়া যাওয়ার আগের রাস্তাটি বিজিবি বন্ধ করে দিয়েছে। প্রসঙ্গত, সে পাড়ায় যাওয়ার প্রধান রাস্তা ছিল সেটি এবং বর্তমানে যে জায়গাটি বিজিবি দখল করে রেখেছে তা পার হয়েই গ্রামে যেতে হয়। পথে হয়তো বিজিবি’র জিজ্ঞাসাবাদের সম্মুখীন হতে হবে তবুও আমরা সে রাস্তা ধরে যেতে চাইলে আমাদের বলা হয় পথে আরো পুলিশ চেকপোস্ট রয়েছে এবং সেখানে নিয়মিত জিজ্ঞাসাবাদ করাও হয়। তাই আমরা বিকল্প রাস্তা খুঁজতে থাকি এবং পেয়ে যাই।

বিকল্প রাস্তা ধরে চলার সময় খেয়াল করলাম রাস্তাটি চলে গেছে পূর্বদিকে এবং রাস্তার উভয় পাশে সেটেলারদের বানানো ঘর। একটু ভাল করে খেয়াল করলে বোঝা যাবে যে এটি একটি সেটেলার পাড়া। সেটেলার পাড়া ক্রস করে আমরা পৌঁছলাম নোয়াপাড়া, যেখানে পাহাড়ি অধ্যুষিত পাড়া। অর্থাৎ সেটেলার পাড়া আর নোয়াপাড়ার মাঝে দূরত্ব ৫০ মিটারের মতই। একটু পর গিয়ে রাস্তা শেষ হয়ে এল, এবার হাঁটা। প্রায় ২০ মিনিটের পথ পাড়ি দিয়ে আমরা পৌঁছলাম যত্ম মোহন কার্বারি পাড়া। একটা বিষয় এখানে লক্ষ্য করার মতো যে, পাড়াটি একটি ছোট কিন্তু লম্বা টিলার উপর ফলে ধানী জমি পার হয়েই গ্রামটিতে যেতে হয়। আর বিজিবি তার চেকপোস্টের পজিশন এমন জায়গায় স্থাপন করেছে, গ্রামে যেতে হলে তাদের চোখ এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। ফলে আমরা কোনভাবেই ক্যামেরা নিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাইনি আর পাইনি মোবাইলের ক্যামেরা দিয়ে ক্যাম্পের ছবি তোলারও। কারণ গ্রামের দিকে মুখ করে সর্বদা রাইফেল হাতে বিজিবি সদস্যরা পাহারা দিচ্ছে।

গ্রামে পৌঁছে প্রথম বাড়িতে কিছু বয়স্ক লোক আর একজন মহিলাকে দেখে সেখানে গেলাম। প্রচন্ড রোদে আমাদের পরিশ্রান্ত দেখে বসতে দিলেন আর পানি দিলেন। আমি প্রথমেই তাদের জিজ্ঞেস করলাম কেমন আছেন? প্রশ্ন শুনে তাদের অভিব্যক্তি দিয়েই তারা বুঝিয়ে দিলেন তারা কেমন আছেন, কিভাবে আছেন। পাঠক আপনাদের যেহেতু এই অভিব্যক্তি লেখা পড়ে বুঝা সম্ভব নয় তাই আপনাদের জন্য তাদের বলা কথাগুলো লিখলাম, “কেমন আর থাকবো? আছি কোনরকম। দিনে কাজ করতে পারি না, রাতেও ঘুমাতে পারি না। সবসময় একটা ভয়ের মধ্যে আছি”। আমি চট করে পাল্টা আরেকটি প্রশ্ন ছুড়ে দিলাম, “কেন? আশেপাশে এত নিরাপত্তা দেয়া হচ্ছে, এরপরও কেন?” বয়স্ক মহিলাটি বললেন, “ঘটনা জানো না? তাহলে আর কি বলবো? দিনে যেসব জমিতে কাজ করি সেগুলো তারা দখলে রেখেছে আর রাতে হামলার ভয়ে ঘুমই আসেনা”। তিনি জানালেন, ঘটনার দিন থেকে তারা রাতে এখনো পর্যন্ত ঘুমান নি। কখন যে আবার বিজিবি ও সেটেলাররা হামলা করে। তার উপর বিজিবি ক্যাম্পে পাহাড়ি নারীরা হামলা করেছে এই অভিযোগে গ্রামের মহেন্দ্র চাকমা ও তার স্ত্রীসহ প্রায় ৪০ জনের নাম উল্লেখ করে ২৫০ জনের বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছে বিজিবি কর্তৃপক্ষ। প্রেফতারের ভয়, প্রাণের ভয় মিলে তারা বর্তমানে দিন পার করছেন।

পাঠক আপনারা আরো জানেন, গ্রামের টয়লেটগুলো সচরাচর একটু বাড়ি থেকে দূরে হয়, এ্যাটাচড হয় না। রাতে তারা টয়লেটেও যেতে পারেননা, কারণ টর্চের আলো দেখলে বিজিবি ক্যাম্প থেকে হুইসেল বাজানো হয়, চিৎকার-চেঁচামেচি করা হয়। ফলে নৈত্য-দৈনন্দিন কাজের তীব্রভাবে ব্যাহত হচ্ছে তাদের। চোখে-মুখে আতঙ্কের ছাপ দেখে কথাগুলোর সত্যতা যাচাই করার কোন প্রয়োজনবোধ আমি আর করি না। এরপর তাদের জিজ্ঞেস করি গ্রাম থেকে ভারত সীমান্ত কতদূর? একজন উত্তর দিলেন, পূর্বদিক ধরে continuous এবং জোরে হাঁটলেও দেড় থেকে দুইদিন লাগবে। আশেপাশে আরো নিরাপত্তা চৌকি আছে কিনা জানতে চাইলাম। তারা বিজিবি ক্যাম্প থেকে একটু দূরে অবস্থিত আর্মি ক্যাম্পটি দেখিয়ে দিলেন। ক্যাম্পটি দূর থেকে যাচাই করে যতটুকু আন্দাজ করে নেয়া যায় তা হল ক্যাম্পটি মোটামুটি বড়সড় এবং পুরো একটি টিলা তারা ব্যবহার করছে ক্যাম্পের কাজে।

এরপর জমিসংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে তাদের সাথে আলাপ হল দীর্ঘসময়। তাদের সাথে কথা বলে জানতে পারলাম বিজিবি প্রায় ৪৪ একর জায়গা দখল করেছে যার মধ্যে ২৯.৮১ একর বন্দোবস্ত জমি। স্কুলের জন্য তারা ২ একর জায়গা ছেড়ে দিয়েছে। এর আগে ইউ.এন.ও বলেছিলেন শুধুমাত্র খাস জমিতে ক্যাম্প তৈরি করা হবে, বন্দোবস্ত জমির এক ইঞ্চিও নেয়া হবে না। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি। বন্দোবস্তকৃত জমিতে কলাগাছ লাগাতে গিয়েই পরশুদিন গ্রামের নারীদের উপর হামলা ঘটনাটি ঘটে। বিজিবি হেলিপ্যাড সহ তাদের ক্যাম্পটি একটি বড়সড় টিলার উপর স্থাপন করেছে যেখানে ৩০-৩৫ পরিবার বাস করে। এসব পরিবার এখন ঘরছাড়া। তাদের বাড়িগুলো এখন শুধুমাত্র কাঠামোর উপর টিকে আছে। টিলার আশেপাশে রয়েছে অসংখ্য ধানী জমি এবং এর জন্য নিয়মিত গ্রামের মানুষরা ৫১ নং দিঘীনালা মৌজা হেডম্যানকে খাজনা দিয়ে থাকে। এমনকি আর্মি ক্যাম্পটিও বন্দোবস্ত জায়গায় হওয়ার কারণে আর্মিরা নিয়মিত জমির মালিককে এর ভাড়া পরিশোধ করে থাকে। কিন্তু বিজিবি’র তা সেসব কিছু মানা হচ্ছে না। খাস জমি তো বটেই, এর চারপাশে বন্দোবস্তী ধানী জমিগুলিকেও তাদের দখলে নিয়েছে লাল পতাকা পুতেঁ। দখলকৃত পুরো জায়গাটি তারা এখন কাঁটাতারের বেড়া দিচ্ছে এবং ক্যাম্পের জন্য পাহাড়িদের মালিকানাধীন সেগুন গাছ ও বাঁশবন কেটে উজাড় করছে। সেসব সেগুন গাছ ও বাঁশবনের মালিক কমলা রতন চাকমা। তিনি বর্তমানে গ্রামের অন্য অংশে অবস্থান করার কারণে তার সাথে কথা বলা সম্ভব হয় নি। আর আমাদের সেখানে যাওয়ারও সুযোগ ছিল না বিজিবি সদস্যদের কড়া নজরদারির কারণে।

পাঠক, আপনারা পত্রিকায় খবর পড়েছেন, ইলেকট্রিক মিডিয়ায় খবর দেখেছেন। অনেকভাবে অর্থাৎ অতিরঞ্জিত আকারে খবরগুলো সাজানো হয়েছে। তবে আমি স্বীকার করতে চাই তাদের বর্ণনাকৃত ঘটনা আংশিক সত্য। হ্যাঁ, তবে পুরোপুরি নয়। পরিস্থিতি তাদের অনূকূলে রাখার জন্যই তারা আংশিক সত্যের আড়ালে বিশাল মিথ্যাকে ব্যবহার করেছে।

কেন আংশিক সত্য তা জানতে হলে প্রথমে কিছু কথা বলতে হয়। ১৪ মে রাতের আঁধারে বিজিবি জমি বেদখল করার পর তারা টিলার দুইপাশ পূর্ব ও পশ্চিমে দুইটি বাশেঁর গেইট স্থাপন করে। গ্রামবাসীরা যখন বাজারে যায় বা স্কুলে বাচ্চারা যখন আসা যাওয়া করে তখন প্রতিনিয়তই বিজিবি সদস্যরা তাদের দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে। ফলে স্কুলের বাচ্চারা ভয়ে স্কুলে যেতে চায় না। এদিকে স্কুলে শুরু হচ্ছে ২য় সাময়িক পরীক্ষা এবং এ কারণে স্কুলে অধিকসময় ধরে তাদের পড়ানো হয়। একটু রাত হলেই বিজিবি সদস্যরা গেইট খুলতে চায় না, বাধা দেয়। তাই যখন পরশুদিন কলাগাছ রোপণ নিয়ে ঝামেলার সূত্রপাত ঘটে তখন গ্রামের নারীরা বিজিবি কমান্ডারের সাথে কথা বলতে যায়। কোন প্রতিকার না পেয়ে তারা পূর্বপাশের গেইট ভেঙ্গে ফেলে। কারণ এই গেইটেই তাদের সন্তানদের প্রতিনিয়তই হয়রানি করা হচ্ছে এবং তাদের মননকাঠামোতে ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে- এ ক্ষোভ থেকেই তারা কাজ করে। এরপর কিছু বিজিবি সদস্য তাদের মোবাইল ফোনে দৃশ্য ধারণ করে আর কিছু অল্পবয়সী পাহাড়ি মেয়েদেরও ছবি তুলতে থাকে। এরপর পাহাড়ি নারীরা কেন ছবি তুলছে এই প্রশ্ন তুলে একজন বিজিবি সদস্যকে ধাওয়া দেয়। সদস্যটি পিছু হটে তাঁবুর ভিতরে প্রবেশ করে এবং পাহাড়ি ৩ জন নারী তাকে অনুসরণ করে। সে তাঁবুটি ছিল খাবার দাবারের জন্য সংরক্ষিত। প্রসঙ্গত তাদের হাতে কোন কিছুই ছিল না। এরপরই সেখানে ক্যাম্প তৈরির কাজে থাকা সেটেলার এবং বিজিবি সদস্যরা মিলে মেয়েদের ঘিরে ফেলে। ঘটনাস্থলে কিছু আর্মি ও পুলিশও উপস্থিত ছিল। তারা সবাই মিলে মেয়েদের উপর হামলা শুরু করে। প্রথমে সেটেলাররা নিরস্ত্র মেয়েদের উপর ইট নিক্ষেপ করে এবং এরপরই বিজিবি-পুলিশ-আর্মিরা রাইফেলের বাঁট, বড় লাঠি, ছোট রড দিয়ে মেয়েদের পেটাতে থাকে। গ্রামের পুরুষরা মেয়েদের বাঁচাতে এগিয়ে আসতে চাইলে তাদের বন্দুকের ভয় দেখিয়ে থামিয়ে দেয়া হয়। এরপর গ্রামের আরো নারী এবং পুরুষরা প্রাণের ভয় ত্যাগ করে হামলা প্রতিরোধ করতে চাইলে তাদের উপর টিয়ার শেল নিক্ষেপ করা হয়। ১৫-১৭ রাউন্ড রাবার বুলেট, ছররা গুলিও করা হয়। যদিও বলা হয়েছে তাদের উপর কোন গুলি বর্ষণ করা হয়নি। কিন্তু গ্রামবাসী একজন জানালেন আনন্দবালা চাকমা নামের একজন নারীর উরুতে দুইটি গুলি লেগেছে। আমি সত্যতা জানতে চাওয়াতে বলা হয়, আনন্দবালা চাকমার ক্ষত থেকে প্রচুর রক্ত ক্ষরণ হচ্ছিল। পরে ডাক্তার ক্ষত পরিষ্কার করতে গিয়ে গুলি দুইটি দেখতে পান এবং তাকে জানান যে, গুলি দুইটি বের করতে হলে পুলিশের কাছে রির্পোট করতে হবে, এছাড়া তিনি করতে পারবেন না। ফুল রানী চাকমা যিনি এখন গুরুতর আহত অবস্থায় খাগড়াছড়ি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, তাকে এমনভাবে পেটানো হয়েছে যে, ঘটনার পরপরই তিনি রক্তবমি করে অজ্ঞান হয়ে যান। এছাড়াও আরো কয়েকজনকে নিমর্মভাবে পেটানো হয়েছে তার মধ্যে রয়েছেন গ্রামের কার্বারিও। তাকে বাঁট দিয়ে এবং পা দিয়ে মাড়িয়ে ক্রমশ পেটানো হয়েছে। তার দোকান লুঠ করে ভাঙচুর চালানো হয়েছে, তার বাড়ি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।  এরপরও বিজিবিরা পরবর্তীতে তাদের ক্যাম্পে হামলা অভিযোগ আনে এবং নিজেরাই মিডিয়ার সামনে ঘটনার শিকার বলে দাবি করে। সমকাল পত্রিকায় দাবি করা হয় হামলার ঘটনায় ৫ জন বিজিবি সদস্য নাকি আহত হয়েছে!!! যদিও গ্রামবাসীরা এ অভিযোগকে মিথ্যা বলে অভিহিত করেছেন। এছাড়াও, বিভিন্ন মিডিয়ায় ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টায় অনেকে বিজিবি জড়িত রয়েছে বলে অভিযোগ করেন।

এরপর একজনের কাছে ফোন আসে যে, দিঘীনালা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন ১৪ জনকে তাদের বেড থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। এ কথার সূত্র ধরে পরে সেখানে যাই, তা একটু পরে আসছি।

কার কার জমি দখল হয়ে গিয়েছে তা জিজ্ঞেস করতেই সুদর্শনা চাকমা জানালেন তার বাড়ি এবং প্রায় ৩ বিঘার মতো জমি হারিয়েছেন (এখানে ৩ বিঘা= ১ একর হিসেবে)। এছাড়া গ্রামের কার্বারির পরিবারসহ প্রায় ৩০-৩৫টি পরিবার কমবেশি জমি হারিয়েছেন যার অধিকাংশই খাজনাকৃত বন্দোবস্তী জমি।

পুরো গ্রামবাসীরা ৮৯ সালে শরনার্থী হয়েছিল এবং ৯৭’এর পার্বত্য চুক্তির পর দেশে ফিরে আসে। ফিরে এসে চুক্তির আওতায় তাদের দুই একর করে জমি দেয়া হয়। সুদর্শনা চাকমা বলেন, “এখন আবার ভিটেমাটি হারা হলাম, যাওয়ার আর কোন রাস্তা নেই আমাদের”। তার চোখে অন্ধকার নেমে আসে, তিনি বর্তমানে গ্রামের এক আত্মীয়ের বাড়িয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি আরো জানালেন ভয়াবহ এক তথ্য। তার একমাত্র সন্তানের নাম নয়ন। বিজিবি সদস্যরা সুদর্শনার স্বামীকে দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করে, “নয়নের মা কোথায়? কি করছে এখন?” শুধু তাকে নয়, আরো কয়েকজনের নামে এভাবে জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে প্রতিনিয়ত। তার মনে ভয়, খারাপ কিছু কি ঘটতে যাচ্ছে সামনে??

গ্রামবাসীরা আরো জানালেন, বিজিবি ক্যাম্পটি অনুমোদন দেয়া হয়েছিল বাবুছড়া ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত এলাকায় কিন্তু যেখানে বর্তমানে দখল করা হয়েছে তা ৪ নং দিঘীনালা ইউনিয়নের অন্তর্ভু্ক্ত, যদিও তা বাবুছড়া বাজার থেকে মাত্র ১ কিলোমিটার পূর্বে।

গতকাল বিভিন্ন মিডিয়ার সাংবাদিক ঘটনাস্থল ঘুরে গিয়েছেন এই সংবাদ আমাদের কাছে ছিল তাই জিজ্ঞেস করলাম, “আমাকে যা বলছেন তা সাংবাদিকদের বলেননি?” তারা বললেন, কোন সুযোগই পাননি। কারণ, বিজিবি ক্যাম্প পর্যন্ত তাদের কার্যক্রম ছিল মাত্র, সীমানা পার হয়ে কেউ গ্রামে প্রবেশের সাহস দেখাননি। একজন বলেন, ক্ষমতা তাদের হাতে, বন্দুক তাদের হাতে, মিডিয়াও তাদের হাতে।

তাহলে এখানে প্রশ্ন করা যায়, গ্রামবাসীদের বক্তব্য বাদ দিয়ে শুধুমাত্র বিজিবি’র কথা অনুসারে কতটুকু সত্যবান্ধব খবর প্রকাশ করা সম্ভব??? একজন সত্যান্বেষী সাংবাদিকও কি সেখানে ছিলেন না?? তাদের মনে কি একবারও প্রশ্ন জানে নি যে গ্রামবাসীদের বক্তব্য ধারণ করা উচিত?? তাহলে কি ধরে নেব পাহাড়ের প্রেসক্লাব সাংবাদিকদের কবরখানা??? এছাড়াও, হাসপাতালে আহত একজনের সাথে মিডিয়া কথা বলতে যায়। কিন্তু তিনি ভালো বাংলা বলতে না পারায় ভুলভাবে কিছু সংবাদ ইলেকট্রিক মিডিয়ায় প্রকাশ পেয়েছে যা হলুদ সাংবাদিকতারই নামান্তর।

এরপর আমি গ্রামটি একটু ঘুরে দেখি। গ্রামটি মোটামুটি বড়ই বলা যায়। ৫০-৬০ পরিবারের একটি গ্রাম। এই গ্রামটির একটি খন্ডকে বর্তমানে দখল করে সেখানে ক্যাম্প তৈরির প্রচেষ্টা হচ্ছে যার বলি হচ্ছে প্রায় অর্ধেক গ্রামবাসী। উন্নয়নের নামে, নিরাপত্তা দেয়ার নামে এই শরনার্থী ফেরত গ্রামবাসীদের কেন আবার উচ্ছেদ করা হচ্ছে???

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমি দেখা করি দিঘীনালা ভূমি রক্ষা কমিটির সদস্য, উদোল বাগান স্কুলের শিক্ষক শাক্যমুনী চাকমার সাথে। তিনি বলেন, সম্পূর্ণ অবৈধভাবে এই কার্যক্রমটি পরিচালিত হচ্ছে। কমিটির প্রধান ইউপি চেয়ারম্যান পরিতোষ চাকমা থানায় বিষয়টি নিয়ে মামলা করতে গেলে পুলিশ তা নিতে অস্বীকার করে। তাই কমিটি সিদ্ধান্ত নেয় আজ আদালতে গিয়ে অধিগ্রহণ কার্যক্রমের উপর স্থগিতাদেশ আবেদনের। এর আগে তারা জেলা প্রশাসকের সাথে দেখা করেন। জেলা প্রশাসক তাদের সাথে চরম দুর্ব্যবহার করেন এবং তাদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। যদিও খবর এসেছে, আদালত জেলা প্রশাসককে তলব করেছেন এবং দখলকৃত এলাকা বিজিবি মুক্ত করার আদেশ দিয়েছেন। কিন্তু এ আদেশ অগ্রাহ্য করা হবে তা বলাই বাহুল্য। যেখানে হাইর্কোটের রিট অনুযায়ী অধিগ্রহণকৃত জায়গাটি এখনো মামলাধীন থাকা অবস্থায় তা দখল করে আইন লঙ্ঘন করা হয়েছে তাই আবার যে আদালত অবমাননা করে তা অব্যাহত রাখা হবে সেটা আসলে যে কেউ সহজেই বুঝতে পারবেন।

কমিটির কার্যক্রম বর্তমানে অব্যাহত রয়েছে। ঘটনার পরদিনই দিঘীনালায় কমিটির উদ্যোগে প্রতিবাদ মিছিলের আয়োজন করা হয়। এছাড়াও, আজকে দুপুর ১২টায় বাবুছড়ায় অবস্থান ধর্মঘট আহ্বান করা হয়েছিল কিন্তু পরিস্থিতির কারণে তা স্থগিত করা হয়। আগামী রবিবার খাগড়াছড়িতে অর্ধদিবস সড়ক অবরোধ পালন করা হবে এবং এরপর পরবর্তী কর্মসূচী ঘোষণা করা হবে বলে শাক্যমুনী চাকমা জানান।

এরপর আমি দিঘীনালায় আহতদের সাথে দেখা করতে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যাই। গিয়ে দেখলাম, মাত্র ৪ জন রোগী ভর্তি আছেন বাকি ১০ জনকে রিলিজ করে দেয়া হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, আজকে সকালে এক আর্মি অফিসার এসে ডাক্তারকে তলব করে এবং কিছুক্ষণ পরে ১৪ জন ভর্তি রোগীর সবাইকে প্রেসক্রিপশন দিয়ে রিলিজ করে দেয়া হয়। রোগীরা এবং তাদের আত্মীয়রা এর প্রতিবাদ করাতে পরবর্তীতে ৪ জনকে পুনঃভর্তি করা হয় আর বাকিদের রিলিজ করে দেয়া হয়। তারা অভিযোগ করেন, আর্মিদের যোগসাজসে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এ কাজ করেছে। পরবর্তীতে খবর আসে, বাকি ১০ জনকে বাবুছড়া স্কুলে অস্থায়ী হাসপাতাল স্থাপন করে সেখানে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছে ইউ.এন.ও। এরপর আর বুঝতে বাকি থাকে না ঘটনার অন্তরালে কাদের হাত রয়েছে। হাসপাতাল জুড়ে তখন আহতদের আত্মীয়স্বজনরা ক্ষোভে ফেটে পড়েন। তাদের ভাষ্য, সামরিক বাহিনী নিরস্ত্র নারীদের নির্দয়ভাবে মারার পর চিকিৎসাসেবা পর্যন্ত নিতে দিচ্ছে না। রাষ্ট্রযন্ত্রের নিশ্চুপতা প্রশ্ন তৈরি করছে তাদের মনে, তারা বলছেন রাষ্ট্র কি এতই অমানবিক, এতই পাশবিক চরিত্রের????

আমি তাদের কোন উত্তর দিতে পারিনি। এরপর আর কথা না বাড়িয়ে আমি হাঁটা দেই স্টেশনের উদ্দেশ্যে। শহরে ফিরতে হবে, লেখা তৈরি করতে হবে, সবাইকে জানাতে হবে। মনে পড়ল, কার্বারি পাড়ায় তাদের সবাইকে বলে এসেছিলাম, “আমি আপনাদের সাহায্য করতে পারবো সে ক্ষমতা আমার নেই, আপনাদের কষ্টকে লাঘব করে দিতে পারবো এমন কাজও আমি করতে পারবো না। কিন্তু আপনাদের দুঃখ, কষ্টকে বুকে ধারণ করে সবার কাছে পৌছেঁ দিতে পারবো লেখার মাধ্যমে। সীমানা পেরিয়ে আপনাদের এই কষ্টকে ছড়িয়ে দিতে পারবো হাজারো মানুষের মনের মাঝে। এ টুকু ছাড়া আমার আর কোন ক্ষমতা নেই। আমাকে ক্ষমা করুন”।

এক অধমের আর্তনাদ ছাড়া আমার আর কিছুই বলার ছিল না। খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে গাড়ির ছাদে চড়ে বসি। আসার পথে আর্মির বিশাল বহরের দেখা মিলল। অনেকগুলো কনভয়, সামনের কনভয়ের চারপাশে পর্দা দেয়া। কিন্তু পরের কনভয়গুলোতে দেখে ভয়ে শিউরে উঠে। সেখানে আর্মি সদস্য না দেখে দেখতে পেলাম বিভিন্ন বয়সী সেটেলারদের!! আর্মির কনভয়ে তারা কি করছে?? হয়তো তাদের নির্মাণ কাজের জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বা সেটেলার পুশইন করার যে রাষ্ট্রীয় চক্রান্ত তা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। কিন্তু কোথায় যাচ্ছে তারা??  দিঘীনালা?? নারেইছড়ি?? বাঘাইছড়ি?? মারিশ্যা??? মেরং??? না অন্য কোথাও? হয়তো ধারণা ভুল হতে পারে। কিন্তু আমরা যে ঘরপোড়া গরু, সিদুরে মেঘ দেখে ভয় পাই।

About the author

সংবাদদাতা

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/2788

1 ping

  1. নাজমুল আহসানের পাহাড় টুয়েন্টিফোরে প্রকাশিত এক ব্লগ পোস্টে পাহাড় বিষয়ক কিছু মিথ্যাচারের জবাবে…

    […] প্রথম আলোসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশকে তিনি বলেছেন মিথ্যা। অথচ তারাও বিষয়টা জানতেন না। ভিক্টিম পরিবারগুলো আমাকে ফোন করেছিলেন আগে এবং আমি এ নিয়ে ফেইসবুকে স্ট্যাটাসও দিয়েছিলাম। এরপর আমি পাইচিমং দাদাকে বিষয়টা জানাই। তিনি তার এক সাংবাদিক বন্ধুকে অবহিত করার পর তারা সবাই মিলে সেখানে যান। পরে জানতে পারি বিপ্লব রহমানও নাকি সেখানে গিয়েছিলেন। সাংবাদিক সৈকত দেওয়ান সম্পর্কে আমার ভাই। আমি ফোন করে নিশ্চিত হতে পারি যে তিনিসহ আরো সাংবাদিক সেখানে গিয়েছিলেন। আরো নিশ্চিত হওয়ার জন্য ভিক্টিমদের ফোন করি। তারাও একই কথা বলেন। তাহলে, এখানে মিথ্যা বলছে কে?? লেখক না সব পাহাড়িরা???http://chtbd.org/archives/2788#.U7vHvkB5E_4 […]

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>