«

»

এই লেখাটি 1,190 বার পড়া হয়েছে

Print this প্রকাশনা

দিঘীনালার বাবুছড়ায় যা ঘটছেঃ বিজিবি ক্যাম্প স্থাপন ও পাহাড়িদের জমি বেদখল

প্রথমেই বলে রাখা ভালো chtnews.com থেকে পাওয়া তথ্যসূত্রে এই লেখাটি লেখা হয়েছে। সমস্ত বিষয়টিকে একটি ফরম্যাটে সাজিয়ে সবার কাছে পৌছেঁ দেয়ার জন্য আমার ফেইসবুকের কয়েকদিন আগের স্ট্যাটাসটি rewrite করে ব্লগে দিলাম।

 

পাহাড়ে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার নামে প্রতিনিয়ত স্থায়ী-অস্থায়ী ক্যাম্প তৈরির ঘটনা নতুন নয়। খাগড়াছড়ি যাওয়ার পথে বা রাঙ্গামাটি-খাগড়াছড়ি রোডের দুইপাশে একটু তাকালেই বুঝা যায়। এছাড়াও কিছু কিছু অস্থায়ী বড় ক্যাম্পগুলোতে প্রতিনিয়ত চেকিং এর নামে হয়রানির ঘটনাও নতুন নয়। পাহাড়ের মানুষ প্রতিনিয়ত এসব ঘটনার সম্মুখীন হয়। এছাড়া আবার দেখা যায়, কোন ছোট টিলার মত অংশ দখল করে সেখানে ক্যাম্প তৈরি করা হচ্ছে যদিও এর মালিককে কোন প্রকার ক্ষতিপূরণ দেয়া হচ্ছে না। দেয়া হলেও না নামেমাত্র। প্রতিবাদ করা হলে নেমে আসে সামরিক অত্যাচারের খড়্গ।

অনেক দিন আগে থেকেই এসব চলে আসছে পাহাড়ে। যার সর্বশেষ ঘটনা ঘটেছে খাগড়াছড়ির দিঘীনালা উপজেলার বাবুছড়া এলাকায়। জায়গাটি বাবুছড়া বাজার থেকে এক কিলোমিটার পূর্বে যত্ম মোহন কার্বারি পাড়ায়। বিজিবি নবগঠিত ৫১ নং ব্যাটেলিয়নের সদর দপ্তর স্থাপনের নামে সেখানে ২৯.৮১ একর জমি দখল করা হয়েছে। দখলকৃত জমির মালিক ১১ জন। গত ১০ এপ্রিল জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে তাদের নোটিশ পাঠানো হয়। বিজিবি যেহেতু তাদের জমি অধিগ্রহণ করছে তাই সে জমির ক্ষতিপূরণ গ্রহণের জন্য নোটিশে উল্লেখ করা হয়। নোটিশে জেলা প্রশাসকের পক্ষে ভূমি হুকুম দখল কর্মকর্তা মোঃ আলী আফরোজ স্বাক্ষর করেন।

এর আগে আরো একটি বিষয় লক্ষ্যণীয় যে, ২০০৫ সালে সর্বপ্রথম বিজিবি এই জমি দখলের প্রচেষ্টা চালায়। সে সময়ও তারা জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে নোটিশ জারি করেছিল। এরপর জমির মালিকগণ নোটিশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট আবেদন পেশ করেন যার মামলা নং ৩৪৫৫/২০০৫। এরপর হাইকোর্ট উক্ত নোটিশ কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না এই মর্মে রুল জারি করেন এবং রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত অধিগ্রহণ কার্যক্রমের উপর স্থগিতাদেশ দেন।

পার্বত্য অঞ্চলে জমি দখলের ক্ষেত্রে জেলা পরিষদের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদ আইন, ১৯৯৮ সালের ৬৪ নং ধারার ১ নং উপধারায় বলা হয়েছে আপাততঃ বলবৎ অন্য কোন আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন-(খ) ধারায় উল্লেখিত রয়েছে “পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ও আওতাধীন কোন প্রকারের জমি, পাহাড় ও বনাঞ্চল পরিষদের সহিত আলোচনা ও উহার সম্মতি ব্যতিরেকে সরকার কর্তৃক অধিগ্রহণ ও হস্তান্তর করা যাইবে না”। কিন্তু সমস্ত অধিগ্রহণ করা হয়েছে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে। এখানে জেলা পরিষদের ভূমিকা পালন করার কথা থাকলেও জেলা প্রশাসককে ব্যবহার করা হয়েছে।

জমির মালিকগণ উক্ত নোটিশকে আমলে নেননি কারণ হাইকোর্টে বিষয়টি এখনো বিচারাধীন রয়েছে। তাই ক্ষতিপূরণ গ্রহণে তারা আগ্রহও দেখাননি। এর পর গত ১৪ মে তারিখে বিজিবি উক্ত জমি জোরপূর্বক দখলে নিয়ে নেয়। তাদের সাথে যোগ দেয় স্থানীয় আর্মি ক্যাম্পের সদস্যরাও। তারা জমির মালিকদের সেখান থেকে বের করে দেয় এবং উক্ত দখলকৃত জমির চারদিকে লাল পতাকা পুতেঁ জমির সীমানা নির্ধারণ করে দেয়। সেখানে স্থানীয় অধিবাসী ও জমির মালিকদের ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। এর পরেরদিন অর্থাৎ ১৫ মে জেলা প্রশাসকের একজন প্রতিনিধি বিজিবি কর্মকর্তাদের হাতে উক্ত বেদখলকৃত জমি হস্তান্তর করেন। বর্তমানে সেখানে বিজিবি সদস্য সার্বক্ষণিক ভাবে অবস্থান করছে ৬টি তাঁবু খাটিয়ে।

এর প্রতিবাদে দিঘীনালায় তীব্র আন্দোলন শুরু হয়েছে। সেখানে গঠন করা হয়েছে দিঘীনালা ভূমি রক্ষা কমিটি। এর উদ্যোগে সেখানে নিয়মিত কর্মসূচী পালন করা হচ্ছে। ১৯ মে ভূমি রক্ষা কমিটির আহ্বানে এলাকার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিসহ সর্বসাধারণের অংশগ্রহণে উপজেলা সদরে এক শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন পালন করা হয়। এরপর ২৭ মে ক্ষতিগ্রস্থ জমির মালিকগণ ইউএনও অফিসের সামনে অবস্থান ধর্মঘট পালন করার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপিও পেশ করা হয়। এর পাশাপাশি তারা একটি লিফলেটও প্রচার করে ভূমি রক্ষা কমিটির নামে ৩১ মে তারিখে।

 

যে সকল কারণে বিরোধীতা করা হচ্ছে তা উল্লেখ করা হলঃ

জমির মালিকগণ সবাই ভারত প্রত্যাগত শরনার্থী। বিজিবি উক্ত জমি দখল করার কারণে পার্বত্য চুক্তির স্পষ্ট লঙ্ঘন হয়ছে। কারণ চুক্তির (ঘ) খন্ডের ৩ নং ধারায় বলা হয়েছে দুই একরের কম বা ভূমিহীন পাহাড়িদের জমি বন্দোবস্ত করে দেবে সরকার, যদি জমি পাওয়া না যায় তাহলে টিলা জমির ব্যবস্থা করা হবে। ফলে এখানে শরনার্থীদের পুনর্বাসন না করেই বরং উচ্ছেদ করা হচ্ছে। এর আগে ১৯৮৫ সালে বাবুছড়া এলাকায় সেনাবাহিনী সাবজোনের জন্য জমি দখল করা হলে বেশ কয়েকটি পরিবার উচ্ছেদের সম্মুখীন হয় এবং তারা পরবর্তীতে ভারতে শরনার্থী হিসেবে চলে যেতে বাধ্য হয়।

এখানে বিজিবি ১৯৫৮ সালের ভূমি অধিগ্রহণ প্রবিধান অনুযায়ী উক্ত জমিটি দখল করে। কারণ, ১৯০০ সালের রেগুলেশন এ্যাক্ট ১ নং প্রবিধান অনুযায়ী জেলা প্রশাসককে জমি অধিগ্রহণের ক্ষমতা দেয়া হলেও তা করা যায় না। ২০০৩ সালে এসে উক্ত রেগুলেশন এ্যাক্ট ১নং প্রবিধান রদ করা হয় এবং জেলা পরিষদের আইন কার্যকর করা হয়। জেলা পরিষদের আইন মোতাবেক উক্ত জমি অধিগ্রহণ করা হয়নি এবং ১৯৫৮ সালের আইনে যেহেতু জেলা প্রশাসককে জমি অধিগ্রহণের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে তাই উক্ত জমি দখলে তারা তা ব্যবহার করে এবং সম্পূর্ণ খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদকে পাশ কাটিয়ে। এটি সম্পূর্ণ পার্বত্য আইনের লঙ্ঘন।

ক্যাম্পটি একটি ঘনবসতি পূর্ণ এলাকায় করা হচ্ছে এবং এতে স্থানীয় অধিবাসীদের মতামতের কোন তোয়াক্কা করা হয়নি। বরং জোরপূর্বকভাবেই তা সম্পন্ন করা হচ্ছে। বিজিবি’র প্রতিদিনকার প্র্যাকটিস, শ্যুটিং এবং ভারী যানবাহনের কারণে স্থানীয় অধিবাসীরা ক্ষতিগ্রস্থ হবে। যেসব এলাকায় ব্যাটেলিয়নের সদর দপ্তর স্থাপন করা হয় সেখানে বিশাল এলাকা জুড়ে শ্যুটিং প্র্যাকটিসের জায়গা বরাদ্দ করতে হয়। যেমন উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, খাগড়াছড়ি সদরের সেনাবাহিনী ব্যাটেলিয়নের জন্য কয়েকটি টিলা রাখা হয়েছে শ্যুটিং এর জন্য এবং এর আশেপাশে কোন বাড়িঘর নেই। কিন্তু যেহেতু ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বিজিবি ক্যাম্পটি করা হচ্ছে সেক্ষেত্রে স্থানীয় অধিবাসীরা হুমকির সম্মুখীন।

সর্বোপরি, যেস্থানে বিজিবি ব্যাটেলিয়নের সদর দপ্তর স্থাপন করা হচ্ছে তার আশেপাশেই রয়েছে অনেকগুলো আর্মি ও বিজিবি ক্যাম্প। মাত্র ১ কিলোমিটার দূরেই রয়েছে আর্মির বাবুছড়া সাবজোন, উত্তরে জারুলছড়া আর্মি ক্যাম্প-নারেইছড়ি বিজিবি ক্যাম্প, দক্ষিণে আনসার ব্যাটেলিয়ন ক্যাম্প, দক্ষিণ-পশ্চিমে কাটারুংছড়া আর্মি ক্যাম্প। এছাড়াও, দিঘীনালায় রয়েছে আর্মিদের স্থায়ী একটি সেনানিবাস এবং পাশেই বাঘাইছড়িতে রয়েছে ব্যাটেলিয়ন সদর দপ্তর। খাগড়াছড়ি সদরে সেক্টর দপ্তর তো রয়েছেই। এই ক্যাম্পগুলো ছাড়াও তাদের রয়েছে ছোট ছোট ঝুপড়ির মতো ক্যাম্প যেগুলো সেখানে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা হয়েছে। একটি মাত্র জায়গায় এতগুলো আমি-বিজিবি-আনসার ক্যাম্প থাকা সত্ত্বেও কেন আবার নতুন করে সেখানে জোরপূর্বক জমি দখলের মাধ্যমে ব্যাটেলিয়ন ক্যাম্প স্থাপনের কাজ চলছে????

এ প্রশ্নের উত্তর আসলে আমাদের জানতে হলে একটু পিছনে ফিরে যেতে হবে। ২০১৩ সালের খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলার তাইন্দং এর ঘটনার কথা মনে আছে তো? শুধুমাত্র একজন বাঙালি মোটরসাইকেল আরোহী নিখোঁজ হয়েছেন এই মিথ্যা খবরের সূত্র ধরে কয়েকটি পাহাড়ি গ্রামে হামলা করা হয়েছিল এবং এখানে সেটেলারদের প্রত্যক্ষভাবে সাহায্য করেছিল বিজিবি। সেস্থানে আর্মিদের কোন ক্যাম্প ছিল না এবং সীমান্তবর্তী এলাকা বলে ছোট ছোট কিছু বিজিবি ক্যাম্প ছিল। সে ক্যাম্পের সদস্যরা পাহাড়ি নেতৃবৃন্দকে আটকে রেখে হামলায় অংশগ্রহণ করেছিলেন।  এ ঘটনায় প্রায় ৩০০০ মানুষ ভারতে পালিয়ে গিয়েছিল। ঘটনার পর সেখানে খবর সংগ্রহ করতে গেলে দুইজন বাঙালি সাংবাদিককে আটক করে বিজিবি এবং পরবর্তীতে তাদের মানবাধিকার কমিশনের চাপে ছেড়ে দেয়। এ সম্পর্কে জানতে পড়তে পারেন কল্লোল মুস্তফার http://chtbd.org/archives/2220#.U5DH40B9s_4 এবং এই লেখক ও তার বন্ধু সুমেধ তাপসের যৌথ লেখা http://chtbd.org/archives/2208#.U5DH5EB9s_4

গোটা দেশের প্রেক্ষাপটে বিজিবি সীমান্ত রক্ষার কাজে নিয়োজিত রয়েছে। সম্প্রতি মায়ানমারের সীমান্তরক্ষীর হামলায় একজন বিজিবি সদস্যও প্রাণ দিয়েছেন। সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী বলে খ্যাত এই বাহিনীর কাজ পার্বত্য অঞ্চলে সম্পূর্ণ ভিন্ন। সীমান্তে টহল দেয়ার নামে বিভিন্ন পাহাড়ি গ্রামে ঢুকে তাদের অত্যাচারের ঘটনা পাহাড়ের প্রতিটি মানুষ জানে।

তাছাড়া, সরকার ঘোষণা দিয়েছে অবিলম্বে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন করবে। আর সে মোতাবেক সরকারকে অস্থায়ী আর্মি ক্যাম্পগুলো সরিয়ে নিতে হবে। কারণ, চুক্তির (ঘ) খন্ডের ১৭ (ক) ধারায় বলা আছে, বিজিবি ও স্থায়ী সেনানিবাস (তিন জেলা সদরে তিনটি এবং আলিকদম, রুমা ও দিঘীনালা) ব্যতীত সামরিক বাহিনী, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সকল অস্থায়ী ক্যাম্প সরিয়ে স্থায়ী নিবাসে ফেরত নেয়া হবে। তাই, আর্মিক্যাম্পগুলো সরিয়ে ফেলার আগে সরকার সেসব স্থানে বিজিবি ক্যাম্প স্থাপনের দিকে নজর দিচ্ছে কারণ বিজিবি ক্যাম্পগুলো চুক্তির আওতার বাইরে। ফলে, স্পষ্টতই বিজিবি ক্যাম্পটি শাসকশ্রেণীর পাহাড়ে যে নির্যাতনের প্রকৃতি তার ধারাবাহিকতা রক্ষার একটি ধাপ। শুধুমাত্র আর্মির বদলে বিজিবি সদস্যদের এখানে ব্যবহার করা হবে।

 

ইতিহাস থেকে দেখা গেছে, স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে যে ১৩ টি গণহত্যার ঘটনা ঘটেছিল তার প্রতিটি ঘটনার পিছনে রয়েছে আর্মিদের মদদ থেকে শুরু করে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ। কিন্তু ধীরে ধীরে আর্মিদের এই কর্মকান্ড অন্যখাতে মোড় নিতে শুরু করে। তারা শুরু করে শিক্ষা ক্ষেত্রের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের চেতনার বিস্মৃতিকরণ এবং পাহাড়ের প্রতিটি উন্নয়নমূলক কাজে আর্মিদের কর্মকান্ডের বিস্তৃতি। কিন্তু মাঠপর্যায়ে সরকারের চিন্তা বাস্তবায়নের জন্য আর্মিদের কর্মকান্ড এখন ধীরে ধীরে হস্তান্তর করা হচ্ছে বিজিবির হাতে। নতুন ব্যাটেলিয়ন গঠন করে জমি দখলের মাধ্যমে সরকার আমাদের  কোন বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে?????

 

লিংকঃ http://www.chtnews.com/?p=7325

http://www.chtnews.com/?p=7310

About the author

অজল দেওয়ান

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/2779

2 pings

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>