«

»

এই লেখাটি 1,053 বার পড়া হয়েছে

Print this প্রকাশনা

পার্বত্য চট্টগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন ও কিছু প্রশ্ন

লেখকঃ ইলিরা দেওয়ান

(লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল ৯ সেপ্টেম্বর, ২০০৯, দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের শিক্ষক ড. তারেক শামসুর রেহমানের একই পত্রিকায় ১ সেপ্টেম্বর. ২০০৯ তারিখের এক নিবন্ধের প্রতিক্রিয়া হিসেবে লেখক এই লেখাটি লিখেছিলেন)

প্রতিক্রিয়াঃ

গত ১ সেপ্টেম্বর দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় ড. তারেক শামসুর রেহমানের নিবন্ধটি পড়লাম। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সরাসরি শিক্ষক ছিলেন। তার পাঠদান পদ্ধতি ব্যক্তিগতভাবে আমার খুব ভালো লাগে। স্যার দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলীতে বিশদ জ্ঞান রাখেন সন্দেহ নেই।

বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা বা যৌক্তিকতা কতটুকু তা দিয়ে পার্বত্যবাসীদের মধ্যে বিতর্ক থাকা স্বাভাবিক। কেননা, যে কোন উন্নয়ন প্রকল্পই হোক বা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনই হোক, তার পারিপার্শ্বিক পরিবেশকে ধারণ ও লালন করার ক্ষমতা সে এলাকার জনগোষ্ঠীর মধ্যে সবসময় নাও থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে তাদের যুক্তিগুলোকেও অবশ্যই বিবেচনায় আনা উচিত। স্যার তার নিবন্ধে যে যুক্তি দাঁড় করিয়েছেন তার সঙ্গে আমি কিছুটা দ্বিমত পোষণ করছি। কেননা, পার্বত্য চট্টগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের পক্ষে তিনি যে যুক্তিগুলোকে উপস্থাপন করেছেন সেগুলোকে আপাততভাবে যৌক্তিকই মনে হতে পারে। কিন্তু এখানে কিছু মৌলিক প্রশ্ন থেকে গেছে। এখানে মনে রাখা দরকার, পার্বত্য চট্টগ্রামে এ পর্যন্ত যত রকমের উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে কখনও স্থানীয়দের মতামত নেয়া হয়নি এবং তাদের পাশ কাটিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে।

ইতিহাসে দেখা গেছে, এই উন্নয়নের জোয়ারে (!) পাহাড়িরা বারবার প্রতারিত হয়েছে। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি ক্রমে জটিল হয়ে পড়েছিল। এক্ষেত্রে ১৯৬০ সালে নির্মিত কাপ্তাই বাধেঁর কথা, ১৯৬৩ সালে কাপ্তাইয়ে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ সুইডিশ পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটের কথা, চন্দ্রঘোনা পেপার মিলের কথাই ধরা যাক। ১৯৬০ সালে কর্ণফুলী নদীর উপর বাঁধ দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের মোট আবাদি জমির ৪০% জমিকে পানির নিচে তলিয়ে দিয়ে তৎকালীন পূর্ববাংলাকে আলোকিত করা হয়েছিল। অথচ তিন দশক পর্যন্ত পাহাড়ে কোন ধরণের বিদ্যুৎ সুবিধা দেয়া হয়নি। বাঁধ নির্মাণের ৫০ বছর পরও এখনও পাহাড়ের বৃহৎ অংশকে বিদ্যুৎ সুবিধার আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। আর চন্দ্রঘোনা পেপার মিলে ৩২৯০ জন শ্রমিকের মধ্যে মাত্র ১৪ জন পাহাড়ি কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছে। অন্যদিকে কাপ্তাই সুইডিশ পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটে আদিবাসী ছাত্রছাত্রীদের জন্য মাত্র ৮ টি কোটা সংরক্ষণ রাখা হয়েছে। কাজেই পার্বত্য চট্টগ্রামে উন্নয়নের অতীত অভিজ্ঞতা পাহাড়ির জন্য মোটেও সুখকর নয়।

নিবন্ধে রাঙ্গামাটিতে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা না গেলে সেক্ষেত্রে খাগড়াছড়ি বা বান্দরবানে স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এখানে একটি বিষয় পরিস্কার হওয়া দরকার, স্থান কোন ফ্যাক্টর নয়, মূল ফ্যাক্টর হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার জন্য যে দক্ষতা, জনবল প্রয়োজন সেটি সেখানকার লোকদের মধ্যে আছে কিনা? নাকি পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে থেকেই এই জনবল পূরণ করা হবে? এখানেও কি অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো আদিবাসীদের জন্য সীমিত আসন সংরক্ষণ থাকবে কিনা এ বিষয়গুলো আগে সরকারকে পরিস্কার করা উচিত। পার্বত্য চট্টগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা অবশ্যই আছে। কিন্তু তার আগে সেখানে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে ন্যূনতম শিক্ষার সুযোগ করে দেয়া জরুরি। কেননা বর্তমান প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে এই জনগোষ্ঠীগুলো সমানভাবে এগিয়ে যেতে পারছে না। তাদেরকে আগে মাতৃভাষার মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষাটা দিতে হবে। এজন্য সরকার আলাদাভাবে শিক্ষাকাঠামো তৈরি করতে পারে। বর্তমানে শিক্ষাকাঠামোর মধ্যে পরিবর্তন আনয়ন ছাড়া পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে মূলস্রোতধারায় আনা অত্যন্ত কঠিন হবে।

ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে ভিন্ন। তাই এ অঞ্চলের জন্য বিশেষ শিক্ষা কৌশল অবলম্বর করতে হবে। পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোকে প্রাথমিক শিক্ষার বিষয়টি হস্তান্তর করা হলেও পাঠ্যসূচি প্রণয়ন, একাডেমিক ক্যালেন্ডার প্রস্তুতকরণ ইত্যাদি বিষয় পরিষদগুলোর এক্তিয়ারের বাইরে রয়ে গেছে। ফলে, পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিবেশ, প্রকৃতি ও সংস্কৃতির সঙ্গে এ বিষয়গুলো সাংঘর্ষিক হয়ে পড়ে। আর এর যাঁতাকলে পড়ে শিশুরা প্রাইমারি স্কুল থেকে অকালে ঝরে পড়ছে।

এছাড়া, তিন জেলায় যেসব সরকারি-বেসরকারি স্কুল-কলেজ রয়েছে, সেগুলোতে আগে সংস্কার করতে হবে। কেননা পার্বত্য জেলার কলেজগুলোতে শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি অবকাঠামোগত সংকটও রয়েছে। আর সবচেয়ে হতাশাব্যঞ্জক বিষয়টি হল- যেসব শিক্ষককে সমতল থেকে পার্বত্য জেলাসমূহে বদলি করা হয় তারা কখনও নিজেদের সেখানে মানিয়ে নিতে পারেন না। দিনের পর দিন অনুপস্থিত থেকে বদলির তদবিরে ব্যতিব্যস্ত থাকেন। ফলে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের মাঝে দূরত্ব থেকেই যায়। এছাড়া স্কুল-কলেজগুলোতে স্টাফ প্যার্টান অসম্পূর্ণ থাকার কারণে শিক্ষক সংকটও প্রকট। কাজেই এ বিষয়গুলোকে আগে বিবেচনায় আনতে হবে।

নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হলে সেখানে পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীরাই বিনা বেতনে পড়বে। খুবই যৌক্তিক দাবি। কিন্তু তাদের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত যেতে হলে আগে স্কুল-কলেজের গন্ডি পেরিয়েই তো আসতে হবে। এখানে তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন সেখানে এমন জাতিগোষ্ঠীও রয়েছে যারা এখনো মাধ্যমিক শিক্ষার গন্ডিও অতিক্রম করতে পারেনি। তাই আমাদেরও দাবি হল সবার আগে স্কুল-কলেজগুলোতে সংস্কার করতে হবে, শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে স্থানীয়দের অগ্রাধিকার দিতে হবে, শিক্ষক কর্মচারীদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা দরকার যাতে তারা দুর্গম এলাকায় গিয়েও নিজেকে নিরাপদ ভাবতে পারে এবং বেসরকারি কলেজগুলোতে সম্ভব না হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের সব সরকারি কলেজে যেন অনার্স ও মাস্টার্স কোর্স চালু করা হয় এবং সেই অনুপাতে শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। আর নয়তো রাঙ্গামাটি কেন, চিম্বুক পাহাড়ে বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুললেও পিছিয়ে থাকা জাতিগোষ্ঠীগুলো শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিতই থেকে যাবে।

আদিবাসীদের শিক্ষা অধিকার নিয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই ‘কোটা’ প্রসঙ্গটি সামনে চলে আসে। কিন্তু আদিবাসীদের জন্য ‘কোটা ব্যবস্থা’টি আদৌ সঠিকভাবে প্রয়োগ হয় কিনা খতিয়ে দেখা উচিত। এক্ষেত্রে ২২/০৪/১৯৯৭ সালের শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের একটি সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই, সমগ্র বাংলাদেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আদিবাসী ও পার্বত্য অঞ্চলের নন-আদিবাসীদের (বাঙালি) জন্য ৩২৫টি আসন সংরক্ষণ করা হয়েছে। এখানে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের উদাহরণ উল্লেখ করা যেতে পারে- ৮টি মেডিকেলে ২০ টি আসন সংরক্ষণ করা আছে, তার মধ্যে ৬টি নন-আদিবাসী (বাঙালি) এবং বাকিগুলো অপরাপর ৪৫টি জাতিসত্ত্বার জন্য সংরক্ষিত! কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬টির মধ্যে পার্বত্য অঞ্চলের আদিবাসীদের জন্য ৩টি, নন-আদিবাসীদের (বাঙালি) জন্য ২টি এবং ১টি সমতলের আদিবাসীদের জন্য সংরক্ষিত! বুয়েটেও অনুরূপভাবে ৯টির মধ্যে ৩টি বাঙালি ছাত্রছাত্রীদের জন্য বরাদ্দ আছে। কাজেই দেখা যাচ্ছে আদিবাসীদের জন্য যে কোটা সংরক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে তাতেও বাঙালি ছাত্রছাত্রীদের জন্য এক-তৃতীয়াংশ আসন বরাদ্দ আছে। এছাড়া পিএসসি’র (পাবলিক সার্ভিস কমিশন) নিয়োগকৃত সব ক্যাডার ও নন-ক্যাডারভুক্ত চাকরিতেও ৫% কোটা আদিবাসীদের জন্য সংরক্ষণের বিধান আছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, ৫% কেন, ১% করে কোটা সংরক্ষণ করলেও এ পর্যন্ত ২৭টি বিসিএস পরীক্ষায় বিভিন্ন ক্যাডারে দেড় হাজারের বেশি আদিবাসী বিসিএস কর্মকর্তা নিয়োগ পাওয়ার কথা। কাজেই কেবল ‘সুযোগ দেয়া হচ্ছে’ এ যুক্তিটি না দেখিয়ে, কোটা সঠিকভাবে প্রয়োগ হচ্ছে কিনা তা মনিটর করতে হবে।

নিবন্ধে সংবিধানের ২৮ (১) ধারার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। হ্যাঁ, পবিত্র সংবিধানে ‘রাষ্ট্র কোন নাগরিকের প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করিবেন না’ বলে উল্লেখ আছে। অথচ আমরা কি দেখতে পাচ্ছি? স্বাধীনতার পর থেকে আদিবাসীদের প্রতি দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকের মতো আচরণ করা হচ্ছে। সংবিধানে এখনও তাদের স্বীকৃতি নেই। তাই স্যার যদি বৈষম্য হ্রাসের জন্য শিক্ষার বিষয়টি না টেনে, আগে সংবিধানে জাতিসত্ত্বাদের স্বীকৃতির দাবিটি উত্থাপন করতেন তাহলে তার একজন ছাত্রী হিসেবে আমিই সবচেয়ে বেশি গর্বিত হতাম।

পরিশেষে বলতে চাই, কেবল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করে পার্বত্য চট্টগ্রামের শিক্ষার অনগ্রসরতার সমাধান খোঁজা যুক্তিযুক্ত নয়। এজন্য প্রথমেই সরকারকে পিছিয়ে পড়া জাতিগোষ্ঠীগুলোর জন্য আলাদা শিক্ষা কাঠামো প্রণয়ন করতে হবে। সেখানকার অভিজ্ঞ প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও স্থানীয় নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে এই কাঠামো প্রস্তুত করা যেতে পারে। আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষার শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করে তাদের শিক্ষার ভিত্তিটাকে মজবুত করে দিতে হবে। সর্বোপরি পার্বত্য চট্টগ্রামের স্কুল-কলেজগুলোতে সংস্কার সাধন করে শিক্ষার পরিবেশ অনূকূলে আনতে হবে এবং কলেজসমূহে অর্নাস ও মাস্টার্স কোর্স চালু করে উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাটাকে সহজতর করতে হবে। সেই সঙ্গে সাংবিধানিক স্বীকৃতির মাধ্যমে আদিবাসীদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

ইলিরা দেওয়ানঃ গবেষক ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক, হিল উইমেন্স ফেডারেশন

[email protected]

About the author

ব্লগ লেখক

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/2756

3 pings

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>