«

»

এই লেখাটি 1,042 বার পড়া হয়েছে

Print this প্রকাশনা

ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত ও বৃহৎ নৃ-গোষ্ঠীর আগ্রাসন -পর্ব ২

পূর্ব প্রকাশের পর-
লিখেছেন- সম্প্রীতি চাকমা


আদিবাসীদের বিপন্নতা বনাম নানা বর্ণের বাঙালি জাতীয়তাবাদ

আগেই বলেছি, ইদানীং বিভিন্ন ওয়েবসাইট, ব্লগে পার্বত্য চট্টগ্রাম ও দেশের আদিবাসী বিষয়ে বহু লেখক, গবেষক ও ভূ-রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞের রচনা চোখে পড়ে। তারা প্রায় সকলে একবাক্যে ভূমির অপ্রতুলতা বা ভূমি হারানোকে আদিবাসীদের বর্তমান দুরবস্থার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে থাকেন। চাকমা রাজা ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়ের রচনায়ও সেটি আলোচিত হতে দেখা যায়। পারতপক্ষে শুধুমাত্র মুসলিম বাঙালিদের জন্য দেশের সংবিধানের একক সত্ত্বাবিশিষ্ট সর্বগ্রাসী বাঙালি জাতীয়তাবাদকে সুপ্রতিষ্ঠিত করা এবং সে লক্ষ্যে আদিবাসী বিদ্বেষী সেনাকর্তৃত্বের সমন্বয়ে ’হিন্দু ভারতের’ প্রভাবমুক্ত একটি ’নিরাপদ রাষ্ট্র’ টিকিয়ে রাখাই যে দেশের নীতি নির্ধারণী প্রভাবশালী মহলের মূল উদ্দেশ্য সেটি এসব রচনায় আলোচিত হয়না। এই কিম্ভূত রাষ্ট্রীয় দর্শন বা স্বপ্নকে বাস্তবায়নের পথে ’ভারত অনুরাগী’ বা ধর্মীয় বিশ্বাসে ’অপর’ সকল জাতিসত্তা ও সম্প্রদায়কে নিয়ে এক ধরনের অস্বস্তি বা আক্রোশ তো মুসলিম জাতীয়তাবাদীদের থাকবেই। অনুদার এই রাষ্ট্রীয় দর্শনের চোরাবালিতে এখন প্রায় বিলীয়মান অবস্থায় হাবুডুবু খাচ্ছেন বাংলাদেশের তাবৎ আদিবাসী মানুষ ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী। এখানে শুধু বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দু ও বাঙালি বৌদ্ধদের বিষয়টি একটু আলাদাভাবে উল্লেখ করছি। আদিবাসীদের মতো এপার বাংলার রাজনীতিতে এই দুই সম্প্রদায়ও আজ সত্যি বড়ো বিভ্রান্ত ও দ্বিধাবিভক্ত জনগোষ্ঠী। বাঙালি হিন্দু ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের অধিকাংশ মানুষ জানেন না, ভারতের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন আওয়ামী লীগ সরকার রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকা সত্ত্বেও কেন তাদের ভিটেমাটি, উপাসনালয় নির্বিচারে আক্রান্ত হয়। তাদের ব্যবসাপাতি ও সাজানো সংসার পুড়ে ছাড়খার হয়ে যায়। একই বিভ্রান্তির কারণে বাঙালি হিন্দু ও বাঙালি বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের একটি বিরাট অংশ আবার বিএনপি (প্রকারান্তরে জামায়াত)-এর তুখোর সমর্থক এবং ভোটব্যাংক। মূলতঃ তাদের নেতৃত্বের দুর্বলতা বা পারষ্পরিক স্বার্থদ্বন্ধ এই বিভক্তির জন্য দায়ী। আওয়ামী ঘেঁষা হিন্দু ও বৌদ্ধ ভোটাররা মনে করেন তাঁদের নেত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা একজন অসাম্প্রদায়িক মানুষ, সুতরাং তাঁর নেতৃত্বাধীন অওয়ামী লীগও একটি অসাম্প্রদায়িক ও সংখ্যালঘুদরদী দল। কিন্তু তাদের নেত্রীকেও যে দেশের অতি ক্ষমতাধর সশস্ত্র মহলবিশেষ, মৌলবাদী ভোটব্যাংক, বিদেশী ত্রাতা বা শুভাকাঙ্খীদের নানা স্বার্থসংশ্লিষ্ট চাপ মোকাবিলা করে সবার জন্য আপাতঃ গ্রহণযোগ্য পদ্ধতিতে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হয় সেটি অনেকে হয়তো বুঝতে চান না। হিন্দুরা জানেন, ধর্মনিরপেক্ষ বা হিন্দু ভারতই তো বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে সর্বাধিক সহায়তা দিয়েছে। সুতরাং তারাও দেশের সাধারণ মানুষ তথা সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান জনগোষ্ঠীর মতো সমান ক্ষমতায়িত বা স্বাধীন। তারা হয়তো ভাবেন, সংবিধানের বাঙালি জাতীয়তাবাদ মানে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলমান বাঙালির সমানাধিকারের জাতীয়তাবাদ কিংবা হিন্দু বাঙালির কিঞ্চিত প্রাধান্যযুক্ত জাতীয়তাবাদ। কারণ একসময় শিক্ষা-দীক্ষায়, বাণিজ্যে-বিজ্ঞানে হিন্দু বাঙালি সত্যিই মুসলিম বাঙালির পথপ্রদর্শক ছিল। প্রবীণদের দ্বারা প্রভাবিত হিন্দু সমাজ আজও হয়তো অনুরূপ ফ্যান্টাসিতে ভুগছে। বাস্তবে সেক্যুলার শিক্ষায় শিক্ষিত বয়োঃজ্যেষ্ঠ কতিপয় নেতা-নেত্রী বাদে আওয়ামী লীগ দলটিও যে অতি মুনাফালোভী নব্য মুসলিম জাতীয়তাবাদীদের কব্জায় একপ্রকার বন্দী হয়ে পড়েছে তা অনেকে বুঝতে চান না। আওয়ামী লীগকে তার গণতন্ত্র, সমতা, ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে আসাটাই এখন আওয়ামী লীগের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর যারা বিএনপি করেন তারা হয়তো দলের সুবিধাভোগী নেতার অনুসারী হয়েই তা করেন। নেতা হয়তো বিশেষ বিশেষ অঞ্চলে সত্যিই তাদের নিরাপত্তা বিধান করতে পারেন। সুতরাং একদিকে ক্ষমতার অংশীদারিত্ব অন্যদিকে নিরাপত্তাহীনতার বোধ – এই দুইয়ের সংমিশ্রিত ও দ্বান্দ্বিক মনস্তত্ত্বই বাংলাদেশের হিন্দু (কিছু ক্ষেত্রে বাঙালি বৌদ্ধ) সমাজকে যুগপৎ আওয়ামী লীগ-বিএনপি এই দুই শিবিরে বিভক্ত করেছে বলে প্রতীয়মান হয়। এনজিওতে কর্মরত হিন্দু সম্প্রদায়ের এক তরুণী কর্মকর্তা এই লেখককে একদিন বলেছিলেন, ’বাংলাদেশে মুসলমান ভাইয়েরাই তো আমাদের নিরাপত্তা’। অনুরূপভাবে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে কর্মরত হিন্দু সম্প্রদায়ের একজন তুখোর এনজিও নেত্রী ঢাকায় বিদেশী দাতা পরিবেষ্টিত প্রকাশ্য সভায় বলেছিলেন, ’উপজাতিরা বাংলার খায়-দায়, বাংলায় কথা বলে, নানা সুযোগ-সুবিধা নেয়; অথচ বাঙালি হতে চায়না। এটি তো দেশের প্রতি চরম বিশ্বাসঘাতকতা এবং নিন্দনীয় ব্যাপার’। এই ’মহিয়সী’ হিন্দু রমণীর কাছে বাংলাদেশ ও বাঙালি সমার্থক। অর্থাৎ উপমহাদেশের হাজার বছরের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের ধারক-বাহক হয়েও তিনি একটি দেশের বহুজাতি, বহু সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্যম-িত সমানাধিকারের সৌন্দর্যকে অনুধাবনে অক্ষম। তেমনি আরেকজন সুপ্রতিষ্ঠিত মিডিয়া ব্যক্তিত্ত্বকে পেয়েছিলাম যে ভদ্রলোক (হিন্দু) নিজের স্বপ্নের বাংলোতে বসে প্রকৃতির অনাবিল সৌন্দর্য উপভোগ করবেন বলে পার্বত্য চট্টগ্রামে একটি যুৎসই পাহাড় বা জমি খুঁজে বেড়াচ্ছেন। খোঁজ নিয়ে জেনেছিলাম, প্রথমজন বিএনপির তুখোর সমর্থক এবং দ্বিতীয় ও তৃতীয়জন আওয়ামী লীগের। দ্বিতীয় জনের কথার প্রতিবাদ অবশ্য আমাকে করতে হয়নি। একজন আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত প্রগতিশীল মুসলিম (মানুষকে ধর্মীয় পরিচয়ে চিহ্নিত করতে আমি কুণ্ঠিত) তরুণই সেদিন সবার সামনে তার কুশিক্ষাজনিত ভুল ভাঙিয়ে দিয়েছিলেন। সুতরাং সর্বগ্রাসী বাঙালি জাতীয়তাবাদী আগ্রাসনের ভয় শুধুমাত্র মুসলমান বাঙালির তরফ থেকে নয়; বাঙালি হিন্দু ও বাঙালি বৌদ্ধরাও অনুকূল পরিস্থিতি সাপেক্ষে সমান আগ্রাসী হয়ে উঠতে পারেন। দুঃখজনক সত্য হলেও দেখা গেছে, পাহাড়ের বাঙালি হিন্দু এবং বাঙালি বৌদ্ধরাও (যাদের সাথে একসময় আদিবাসীদের গভীর হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক ছিল, যা অঞ্চল বিশেষে কোথাও কোথাও এখনও টিকে আছে) অবস্থা বুঝে আদিবাসী বিদ্বেষের অনুকূল লাভজনক স্রোতে নির্দ্বিধায় গা ভাসিয়ে দেন। তাই অবস্থাভেদে সম্পর্কের পারদ ওঠানামা করলেও সামগ্রিকভাবে আদিবাসীদের উপর বাঙালি জাতীয়তাবাদের সন্মিলিত আগ্রাসী তৎপরতা অদূর ভবিষ্যতে হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি নেই।

 

 

কেন চাকমা জনগোষ্ঠীকে আলাদাভাবে টার্গেট করা হচ্ছে?

বাংলাদেশে সরকারি-বেসরকারি নানা মহল, অভিজাত ও সাধারণ লোকজনের কথাবার্তায় আজকাল চাকমা বিদ্বেষী এবং ঈর্ষাকাতর বহু বক্তব্য শোনা যায়। দুই দশক আগেও যে চাকমা জাতি সম্পর্কে সাধারণ বাঙালি মানসে উপজাতি, আদিম, বর্বর হিসেবে একধরনের তাচ্ছিল্যের আসন পাকাপোক্ত ছিল সেই চাকমারা কোন জাদুমন্ত্রবলে আজ এতোখানি (বাঙাল-বিবেচনায়) উন্নত, সভ্য এবং দেশের প্রচলিত কোটাব্যবস্থার অনুপযুক্ত হয়ে গেল তা বোধগম্য নয়। কারণ চাকমাদের জন্য কোটার প্রয়োজন নেই এমন দাবিও এখন শোনা যাচ্ছে। আসলে ’এথনিক ক্লিনজিং’ বা নিঃস্বায়নের জন্য যে নয়া-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রীয় প্রকল্প এদেশে বাস্তবায়িত হচ্ছে তার প্রেক্ষিতে নতুন ও সুক্ষ এই ষড়যন্ত্রের তৎপরতাগুলোকে বুঝতে হবে। বলাবাহুল্য, নানা ভ্রান্ত সমীকরণ ও স্বার্থদ্বন্দ্বে দল-উপদলে বিভক্ত বাংলাদেশের সংখ্যালঘু ও আদিবাসী সমাজে চাকমারা এতোদিন সত্যিই তাদের ব্যতিক্রমী একীভূত অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। সে কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামে জুম্ম স্বাধিকারের সংগ্রাম একসময় মুকুলিত হতে পেরেছিল। এই সংগ্রাম আজও বাংলাদেশের সকল মুক্তিকামী আদিবাসী, এমনকি বহু প্রগতিশীল বাঙালির কাছেও আরাধ্য সম্পদ। বিশ্বের জাতিগোষ্ঠীগত বিপ্লবের ইতিহাসেও জুম্মদের বিদ্রোহ একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। সে কারণে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা বিদ্রোহী জনসংহতি সমিতির সাথে চুক্তিতে উপনীত হওয়ার পর ইউনেস্কো শান্তি পুরস্কার লাভ করেছিলেন। নানা আঞ্চলিক দল উপদলে বিভক্ত হওয়ার কারণে পার্বত্য আদিবাসীদের ইতিবাচক ভাবমূর্তি এখন কিছুটা ক্ষুন্ন হলেও জাতিগত শোষণ নিপীড়নের বিরুদ্ধে তাদের সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ দেশে বিদেশে স্বীকৃত ও প্রসংশিত হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, আদিবাসী জুম্মদের এই সংগ্রামকে, সংগ্রামের গৌরবময় অর্জনকে কেন আজ চাকমাদের বাড়বাড়ন্ত বা ’ষড়যন্ত্র’ বলে ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়ার আয়োজন চলছে? এর পেছনের রাজনীতিকে অবশ্যই আমাদের বুঝতে হবে, উপরে আলোচিত মায়োপীয় রাষ্ট্রীয় দর্শনের আলোকে।

এই বঙ্গদেশসহ ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসন প্রায় দু’শ বছর ধরে বহাল ছিল। সেই দীর্ঘ শাসনামলে ব্রিটিশরা চাকমা জাতিকে খ্রীস্টধর্মে দিক্ষিত করার আপ্রাণ চেষ্টা করেও সফল হতে পারেনি। লুসাই, গারো,মিজো, গারো, নাগা, খাসি, সান্তালসহ বাংলাদেশ এবং অবিভক্ত ভারতের অনেক জাতিগোষ্ঠীকে অতি সহজে তারা খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করতে সক্ষম হয়েছে। চাকমা জাতির ক্ষেত্রে কেন তারা সফল হতে পারেনি সেটি নির্মোহ দৃষ্টিতে বিবেচনার দাবি রাখে। ছোটবেলায় মিজো জাতির মানুষকে খ্রিস্টধর্মের অনুগামী করার জন্য ব্রিটিশ সেনাপতিকে কি ধরনের কুটকৌশলের আশ্রয় নিতে হয়েছিল তার গল্প গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠদের মুখে শুনেছি। ব্রিটিশ সেনাপতি মিজো সমাজের ’লালফা’র হাতে তার গুলিভর্তি রাইফেল (আসলে বারুদ ছাড়া সেখানে কোন গুলি ছিলনা) তুলে দিয়ে বলেছিলেন, ’চালাও, আমাকে গুলি করো।’ সেই ’লালফা’ দেখলেন, একের পর এক জলজ্যান্ত গুলি ছোঁড়ার পরেও ব্রিটিশ সেনা কুপোকাত হয়না; শুধু যীশু, গড ইত্যাদি শব্দ বলে ধ্যানস্থ হয়ে যায়। এভাবেই হয়তো ব্রিটিশরা তাদের নানা চাতুর্যপূর্ণ আধ্যাত্মিক শক্তি জাহির করে একসময় মিজোসহ অন্যান্য আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে সহজে বশীভূত করতে সক্ষম হয়েছিল। অন্যদিকে চাকমাদের বেলায় ঘটেছে ঠিক তার উল্টো। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে তারা রীতিমত চারবার যুদ্ধ করেছে। চাকমাদের মহিয়সী রাণী কালিন্দী ব্রিটিশদেরকে ’সাদা বাঁদর’ বলতেও কুন্ঠিত হননি এবং ব্রিটিশ রাজের প্রতিনিধিকে তার সাথে সাক্ষাতের অনুমতি পর্যন্ত দেননি। খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ তো অনেক দূরের ব্যাপার। গ্রামের বয়স্কদের মুখে শোনা একটি গল্প বলি। খ্রিস্টীয় যাজকদের প্রচারণা ও প্রলোভনের ফাঁদে পড়ে চাকমাদের কেউ কেউ খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হন। যেদিন তাদের দীক্ষা হয় ঠিক তার পরের দিন মলিন মুখে বৌদ্ধ মন্দিরে গিয়ে কিংবা গৃহের একপাশে সযতনে রাখা বুদ্ধমূর্তির সামনে আনত হয়ে তাদেরকে প্রার্থনা করতে শোনা যায়, ’হে পরম করুণাময় বুদ্ধ, তুমি আমায় ক্ষমা করো; আমি দারিদ্রের কারণে, নানা প্রলোভনের ফাঁদে পড়ে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হওয়ার অভিনয় করেছি, সাময়িক এই বিচ্যুতির জন্য আমাকে ক্ষমা করে দাও, আমাকে পুনরায় গ্রহণ করো’ ইত্যাদি। এই হলো চাকমাদের ধর্মবিশ্বাস, যা তাদের উৎপত্তির ইতিহাসের সাথেও সঙ্গতিপূর্ণ। চাকমাদের বদ্ধমূল বিশ্বাস, তারা মহামানব গৌতম বুদ্ধের বংশধর। এই অকৃত্রিম বিশ্বাসই হয়তো ধর্মীয় নানা প্রচারণা ও প্রলোভনের এই যুগে তাদেরকে এখনও গৌতম বুদ্ধের গোঁড়া অনুসারী হিসেবে টিকিয়ে রেখেছে।

ধর্মবিশ্বাসে গোঁড়া বৌদ্ধ এই জাতিসত্তা খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী পশ্চিমাদের পাল্লায় পড়ে পার্বত্য অঞ্চলে খ্রিস্টান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় লালায়িত হবে এমন কল্পনা শুধুমাত্র অপ্রকৃতিষ্ঠ মানুষের পক্ষেই সম্ভব। আর ১২০ কোটি মানুষের পরাশক্তিধর রাষ্ট্র ’হিন্দু’ ভারত নিজের নাকের ডগায় এ ধরনের একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অনুমতি দেবে সেটি মেনে নেওয়া পাগল ছাড়া কারও পক্ষে সম্ভব নয়। বিশেষ করে যেখানে খ্রিস্টধর্ম প্রচারের অপরাধে ভারতের কোন কোন অঞ্চলে এখনও যাজকদের জ্যান্ত পুড়িয়ে মারার ঘটনা ঘটে। তবে হ্যাঁ, চাকমা জাতির অধিকাংশ মানুষ এখনও নিজেদেরকে হাজার বছরের ধর্মনিরপেক্ষ ভারতীয় সভ্যতা, সংস্কৃতির উত্তরাধিকারী মনে করে। তাদের কাছে পরম পবিত্র বৌদ্ধ তীর্থগুলোর অধিকাংশ ভারত ভূখণ্ডে পড়েছে, কয়েকটি পড়েছে নেপালে। তাছাড়া চাকমাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ভারতের মিজোরাম, ত্রিপুরা, আসাম, অরুণাচল ও পশ্চিমবঙ্গে অবস্থান করছে। মিজোরামে তো পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক পরিষদের চেয়েও শক্তিশালী একটি স্ব-শাসিত চাকমা জেলা পরিষদ আছে, যার বাজেট ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার থেকে সরাসরি বরাদ্ধ দেওয়া হয়। প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, রাজীব গান্ধী থেকে শুরু করে সময় সুযোগমতো রাষ্ট্রের রথী-মহারথীদের চাকমা অটোনমাস ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিল পরিদর্শনের রেওয়াজ আছে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী তো একবার মিজোরামের রাজধানী আইজল থেকে নিজে ড্রাইভ করে শত শত মাইলের সর্পিল পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে চাকমা ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিলে পৌঁছেছিলেন বলে প্রচার আছে। আর চাকমা রমণীদের সাথে ঐতিহ্যবাহী পিনোন-হাদি পড়ে দাপুটে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর তোলা সেই উজ্জ্বল ছবিটিতো আজ ইতিহাসের অংশ। বাংলাদেশের বর্তমান ও প্রাক্তন দুই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার সাথে অনুরূপ হৃদ্যতাপূর্ণ মেলামেশার সুযোগ এদেশের চাকমা বা অন্যান্য আদিবাসীদের ভাগ্যে কখনো কি জুটেছে বা জুটবে? তাছাড়া মিজোরামে রাজ্য সরকারের মন্ত্রীসভায় একজন চাকমা জনপ্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করার রেওয়াজ বহুদিন ধরে প্রচলিত আছে। ভারত ছাড়াও ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা, জাপান, কোরিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বর্তমানে বহু চাকমা বসতি গেড়েছেন। দেশে বিদেশে চাকমাদের এই অবস্থানের কারণেই কি বাংলাদেশের কোন কোন কায়েমি স্বার্থগোষ্ঠী চাকমাদের বিরুদ্ধে অবিশ্বাসের, কল্পিত বিচ্ছিন্নতাবাদের ধুয়ো তুলছে? বাঙালিরাও তো পৃথিবীর বহু দেশে যুগ যুগ ধরে অবস্থান করছেন। তাহলে একই যুক্তিতে তারাও কি বিচ্ছিন্নতাবাদী, দেশদ্রোহী?

যাই হোক, নিজেদের সমাজের নানা ঘাত-প্রতিঘাত ও রাষ্ট্রীয় বৈরিতাকে মোকাবিলা করে চাকমাদের নেতৃত্বে (অবশ্য মারমা, ত্রিপুরা নেতৃবৃন্দও ছিলেন) একটি সুসংগঠিত গেরিলা বিদ্রোহ পার্বত্য চট্টগ্রামে পরিচালিত হয়েছে যার সফল সমাপ্তি ঘটে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকারের সাথে সম্পাদিত ’শান্তিচুক্তি’র মাধ্যমে। এই বিদ্রোহের সূত্রে পৃথিবীর নানা দেশে চাকমাদের বহু শুভানুধ্যায়ী, বন্ধু-স্বজন বা সমর্থকগোষ্ঠী গড়ে ওঠে যা তাদের গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনার দক্ষতা এবং বর্তমান পৃথিবীতে আধুনিক জাতি হিসেবে তাদের গঠনমূলক দৃষ্টিভঙ্গি, যোগাযোগ দক্ষতা ও কূটনৈতিক সামর্থ্যকে প্রতিষ্ঠিত করে। এখন বাংলাদেশে বাঙালিদের পরে চাকমারাই অন্যতম প্রধান জাতি যারা আজ পৃথিবী জুড়ে সুপরিচিত। শোনা যায়, ভারতের মিজো, নাগা, খাসি, অহমিয়া বা ত্রিপুরা প্রভৃতি জনগোষ্ঠীর কাছেও বিশ্বজুড়ে চাকমাদের এই ব্যাপক পরিচিতি নাকি একটি বিস্ময়। তাদের অনেকে সেই প্রশ্ন করে থাকেন। কারণ এসব জাতিসত্তার নিজেদের নামে স্বতন্ত্র রাজ্য এবং বৃহৎ জনসংখ্যা থাকলেও রাজ্যপাটহীন চাকমাদের নামই নাকি বাইরের জগতে বেশি শোনা যায়। অথচ এদেশে চাকমারাসহ প্রায় ৪৫টি অ-বাঙালি হতভাগ্য জাতির সাংবিধানিক স্বীকৃতি আজও অর্জিত হয়নি। সাংবিধানিক এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে যিনি সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সংসদে দাঁড়িয়ে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন তিনি চাকমা জাতি থেকে নির্বাচিত পার্বত্য চট্টগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা প্রয়াত শ্রী এম. এন. লারমা, যার নেতৃত্বে পরে স্বাধীন বাংলাদেশে সর্বপ্রথম আদিবাসীদের স্ব-শাসন প্রতিষ্ঠার আন্দোলন সূচিত হয়। চাকমাদের এই সংগ্রামী ঐতিহ্য আর ইতোপূর্বে আলোচিত আদিবাসী/সংখ্যালঘু বিদ্বেষী রাষ্ট্রীয় দর্শন ও সার্বভৌমত্ব বিপন্নতার তত্ত্ব সর্বাংশে পরষ্পর বিরোধী। সেকারণে বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর প্রভাবশালী ও ভারত বিরোধী অংশটি চাকমা জাতিকে শতধাবিভক্ত করে তার সাংগঠনিক ও সৃজনশীলতার শক্তিকে নিঃশেষ করে দিতে সচেষ্ট বলে নানাবিধ তৎপরতায় প্রতীয়মান হয়। ফলশ্রুতিতে আজ চাকমাদের আঞ্চলিক রাজনীতি ত্রি-ধারা বিভক্ত এবং তারা প্রবলভাবে পরষ্পরের সশস্ত্র প্রতিপক্ষ। এছাড়া আছে জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিভাজন। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, বাম দল ও নিরপেক্ষতাবাদীদের হিসেবে ধরলে চাকমা সমাজের রাজনৈতিক শক্তি এখন কমপক্ষে আট থেকে দশ ভাগে খণ্ডিত তার উপর আছে মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, ম্রো প্রভৃতি জাতির সাথে চাকমাদের দূরত্ব তৈরির উস্কানিমূলক সরকারি-বেসরকারি তৎপরতা। কারণ এই বিভাজন তৎপরতায় সকল কায়েমি গোষ্ঠীর স্বার্থ নিহিত আছে। চাকমা জাতিকে নিষ্ক্রিয় নিঃশেষিত করা সম্ভব হলে অন্য জাতিগোষ্ঠীকে বাঙালি জাতির মধ্যে আত্মীকৃত করা সহজ হবে। ইতোমধ্যে মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, রাজবংশী প্রভৃতি জাতিসত্তা নাকি চাকমাদের তুলনায় অনেক বেশি বাঙাল-অনুরক্ত বলে নিজেদেরকে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। অন্ততঃ অনেক বাঙালি জাতীয়তাবাদীর এমনটিই অভিমত। আসলে চাকমা বিলুপ্তিকরণ প্রকল্প সফল হলে আখেরে অন্য কোন আদিবাসী জাতি আদৌ লাভবান হবে না। সরকারি-বেসরকারি নানা প্রচারণা ও প্রলোভনের ফাঁদে পড়ে সেই চরম সত্যটি আজ আমরা যেন বুঝতে অক্ষম। কারণ রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারকদের চিন্তায় যতদিন পর্যন্ত হিন্দু ভারত, বৌদ্ধ মিয়ানমার এবং খ্রিস্টান পাশ্চাত্যের জুজুর ভয়সহ আত্মকেন্দ্রিক মুসলিম বাঙালি জাতীয়তাবাদের দর্শন কাজ করবে ততদিন পর্যন্ত কোন আদিবাসী বা সংখ্যালঘু জাতির পক্ষে আত্মপরিচয় ও মানবিক মর্যাদা নিয়ে এদেশে বসবাস সম্ভব হবেনা। এযাবৎ আদিবাসীদের উপর আক্রমণ বা ধর্ষণের যত ঘটনা ঘটেছে তার শিকার শুধু চাকমারাই হননি; মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, গারোসহ প্রায় সব আদিবাসী জনগোষ্ঠীই এই তালিকায় রয়েছেন। অবশ্য বিশ্বের ক্রমপরিবর্তনশীল ভূ-রাজনীতি এবং ভারত, চীন, পাকিস্তান, ইরান, মিয়ানমার, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া প্রভৃতি দেশের প্রভাবে এই ভূখণ্ডের রাজনীতিতে আদিবাসীদের পক্ষে নাটকীয় কোন পরিবর্তন ঘটলে সেটি ভিন্ন কথা।

বাংলাদেশের নাগরিক মানেই কি বাঙালি?

আন্তর্জাতিক কূটনীতির পরিম-লে আদিবাসী ইস্যুতে জ্ঞাত কারণে বাংলাদেশ আজ এক হাস্যকর ভূমিকা পালন করছে। সারা পৃথিবী একদিকে হাঁটলেও বাংলাদেশ হাঁটছে ঠিক তার উল্টোদিকে। সারা পৃথিবী বলছে, ঐতিহাসিকভাবে যারা বিপন্ন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী তারাই আদিবাসী; দেশভেদে ’আদিবাসী’ শব্দটি যে অর্থই বহন করুক না কেন। বাংলাদেশ বলছে বিপন্ন, প্রান্তিক না হয়ে শাসক জাতি হওয়া সত্ত্বেও বাঙালিরাই বাংলাদেশের ’আদিবাসী’ (Indigenous People)কারণ আদিবাসী বলতে বাংলায় ’আদি বাসিন্দা’ বোঝায়। সুতরাং বাঙালি নিজেদের ডিকশনারি বহির্ভূত ভিন্ন কোন অর্থ মেনে ’আদি বাসিন্দা’ হওয়ার দাবি ছাড়তে নারাজ। ’আদি বাসিন্দা’ প্রমাণের জন্য নানা বিকৃত ঐতিহাসিক দলিল দস্তাবেজ হাজিরের মরিয়া প্রচেষ্টাও চলছে। সাম্প্রতিককালে আবিস্কৃত উয়ারী বটেশ্বরের প্রত্ননিদর্শন প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। কি হাস্যকর গোঁয়ার্তুমি! আন্তর্জাতিক যত সনদ, নীতিমালা ও আইন এখানে বাঙাল গোঁয়ার্তুমির কাছে পরাজিত এবং লজ্জ্বায় অবগুণ্ঠিত।

প্রকৃত অর্থে, বাংলাদেশে নাগরিকত্ব ও জাতীয়তা প্রশ্নে মূল সমস্যাটি হলো হৃদয়ের সংকোচন-প্রসারণের, অন্তরের অনুদারতার, জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা বা কুপমণ্ডুকতার। অন্যভাবে বললে, দেশের ভিন্ন নৃ-গোষ্ঠীর মানুষকে, তাদের জাতিগত ও সংস্কৃতিগত স্বাতন্ত্র্যকে সমান মানবিক মর্যাদায় গ্রহণ করতে না পারার অক্ষমতার। যেমন ধরা যাক, পৃথিবীর বহু দেশে অভিবাসী হিসেবে বাঙালিরা অবস্থান করছেন। সেখানে নাগরিক হিসেবে তাদের ব্রিটিশ, আমেরিকান, ফরাসী, জার্মান, ক্যানাডিয়ান ইত্যাদি পরিচয় আছে; কিন্তু তাদের নৃতাত্ত্বিক পরিচয় একটিই। সেটি হলো ’বাঙালি’। সেদেশের কেউ তাদেরকে নিশ্চয়ই বলেনা তোমার ’বাঙালি’ পরিচয় ভুলে গিয়ে এখন তুমি ফ্রেঞ্চ, ইংলিশ, জার্মান, ইহুদি ইত্যাদি পরিচয়ে বিলীন হয়ে যাও। নাহলে যেখান থেকে এসেছ সেখানেই চলে যেতে হবে, এদেশে তুমি থাকতে পারবেনা। অথবা ক্রমাগত আগ্রাসনের মাধ্যমে তোমাকে নিঃশেষ করে দেওয়া হবে। তাহলে প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশে কেন তার উল্টোটি ঘটে? কেন এদেশে বসবাস করতে হলে ভিন্ন জাতিসত্তার মানুষকে বাঙালি পরিচয়ে আত্মীকৃত হওয়ার আশংকায় উদ্বিগ্ন থাকতে হয়? চাইনিজ, মঙ্গোলদের রক্ত বাঙালির শরীরে একসময় মিশেছিল বলে একজন চাইনিজকে বা অনুরূপ চেহারার চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা জাতির মানুষকে ’বাঙালি’ হয়ে যেতে হবে, শুধুমাত্র এদেশে বসবাসের কারণে? একটি উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম অবশ্য আছে। সেটি হলো, একই বাঙালি হওয়া সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু বা মুসলিম বাঙালির কেউ চাকমা বা অন্যান্য সংখ্যালঘুদেরকে বাঙালি হয়ে যেতে বলছেন না। বরং ভারতের সংবিধান অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গেও চাকমা এবং অন্যান্যরা স্বতন্ত্র জাতিসত্তা হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতিসহ নাগরিক সমানাধিকার ভোগ করছেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো সেনাশাসনের ভয়াবহতা সেখানে একটি কল্পনাতীত ব্যাপার।

আসলে বহুজাতি, বহুসংস্কৃতির সন্মিলিত বৈচিত্র্যকে অন্তরে ধারণ ও শ্রদ্ধা করতে না পারার কারণে ’ভিন্ন’ জাতিগত পরিচয় ও বৈশিষ্ট্যের মানুষকে ’অপর’ মনে হয় এবং তাকে মূলধারার সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি বিদ্বেষভাবাপন্ন বলে গণ্য করা হয়। অথচ দেখা হয়না যে, দোষটা ভিন্ন জাতির মানুষটির নয়, তাকে নিয়ে যারা ’ভিন্নভাবে’ ভাবছে তাদের। সেক্যুলার শিক্ষা, প্রকৃত গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, নানা জাতি-সংস্কৃতির বহুমাত্রিকতার সৌন্দর্যকে অনুধাবনের জন্য উদার গণতান্ত্রিক মানস ও উচ্চমার্গীয় সাংস্কৃতিক চেতনা সংখ্যাগুরু জনগণের মাঝে বিকশিত না হলে বাংলাদেশে এই সমস্যার সমাধান সহজে হবেনা। বলাবাহুল্য, এই অসাধ্য সাধনের জন্য বৃহৎ নৃ-গোষ্ঠীর আলোকিত জনসমাজ, সেক্যুলার শিক্ষায় শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী ও তরুণ প্রজন্ম এবং সংস্কৃতিকর্মীদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে।

শেষ কথা

বাংলাদেশে আদিবাসীরা নিজ নিজ জাতিগত ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য নিয়ে মর্যাদাপূর্ণ জীবন যাপন করতে পারবেন কিনা সে প্রশ্নের ইতিবাচক উত্তর পেতে হলে প্রয়োজন হবে একটি অভাবিতপূর্ব সাংস্কৃতিক বিপ্লবের এবং বাঙালির মানস কাঠামোর পুনর্বিন্যাসের। আগেই বলেছি, সেটি সম্ভব শুধুমাত্র একটি আধুনিক, সেক্যুলার ও গণতান্ত্রিক শিক্ষায় আলোকিত জনসমাজের মাধ্যমে, যেখানে শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতি কর্মীরা মূল ভূমিকা পালন করবেন। তারা বিবেকায়িত আপোষহীন আন্দোলনের মাধ্যমে আদিবাসীসহ দেশের সকল মানুষের সমমর্যাদা ও সমানাধিকার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রযন্ত্রকে বাধ্য করবেন। শুধুমাত্র ইস্যুভিত্তিক আবেদন নিবেদন বা সভা সেমিনারের মধ্যে নিজেদের সদিচ্ছাকে সীমায়িত রাখবেন না। কার্যকর গণসংগঠন ও সাংস্কৃতিক গণআন্দোলন গড়ে তুলবেন। গণমুখী বিপ্লবী সংগঠনগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করবেন এবং সার্বিক সহযোগিতা দেবেন। মনে রাখতে হবে, চাকমারা এবং দেশের অন্যান্য আদিবাসীরা বাংলাদেশ থেকে, দেশের সংবিধান থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চান না। তাদের একমাত্র কাম্য বাঙালি জাতির পাশাপাশি নিজেদের জাতিগত এবং সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যও সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত হোক। স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে রাষ্ট্রের কাছে তাদের চাওয়া হলো সমমর্যাদা, বৈষম্যহীনতা ও সমানাধিকার। সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে বাংলাদেশকে বহু জাতি, বহু সংস্কৃতি, বহু ভাষার বৈচিত্র্যপূর্ণ ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। কাউকে বঞ্চনা নয়, বরং যারা এখনও সংবিধানের বাইরে রয়ে গেছেন তাদেরকে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে রাষ্ট্রের সংহতি জোরদার করতে হবে। এক্ষেত্রে এক্সক্লুশান নয়, ইনক্লুশানই হবে রাষ্ট্রের নীতি। তবে অবশ্যই আদিবাসীদের জাতিগত স্বাতন্ত্র্য ও সমমর্যাদাকে অক্ষুন্ন রেখে। মানুষের জন্যই তো সংবিধান, সংবিধানের জন্য মানুষ নয়। সুতরাং বঞ্চিতদের কল্যাণের জন্য অবশ্যই আরেকবার সংবিধানটি সংশোধন করতে হবে। ঐতিহাসিক এই বঞ্চনার অবসান ঘটানো কি এতোই কঠিন, যেখানে জাতিসংঘের বিভিন্ন ফোরামে বাংলাদেশ অন্যান্য দেশের জাতিগত সমস্যাগুলোর সমাধানে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে?

ভারতবর্ষ যখন ব্রিটিশ শাসনাধীনে ছিল তখন সরকারি প্রতিনিধিদেরকে মাঝে মাঝে নিজ অঞ্চলের ’প্রজা’সাধারণের সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে অবহিত করতে হতো। ভারতের তৎকালীন ব্রিটিশ প্রতিনিধি রবার্ট ক্লাইভও ১৭৭২ সালের ৩ মার্চ ইংল্যা-ের হাউজ অব কমন্স-এ গিয়ে একটি বিবৃতি দেন যেখানে বাঙালি জাতি সম্পর্কে কিছু তীর্যক মন্তব্য ছিল, যার মধ্য দিয়ে বাঙালি চরিত্রের অনুদারতা ও নীচতা প্রকাশ পেয়েছে। তিনি বলেছিলেন, ”ভারতবর্ষের সরকার বরাবরই একটি চরম স্বৈরাচারী সরকার। এখানকার অধিবাসীরা, বিশেষত বাংলার মানুষেরা অধস্তন অবস্থায় ক্রীতদাসসুলভ, স্বার্থপর, আজ্ঞাবহ ও বিনয়ীর মতো আচরণ করে থাকে। কিন্তু উচ্চস্তরে আসীন হলে তারা হয়ে ওঠে অত্যন্ত আরামপ্রিয়, নারী-লোলুপ, জুলুমবাজ, প্রতারক, অর্থলোভী এবং নিষ্ঠুর।” অনুরূপভাবে শিখ সম্প্রদায়ের ব্যাপারেও ব্রিটিশদের কিছু নেতিবাচক পর্যবেক্ষণ ছিল যার কারণে এখনও ভারতের সাথে ব্রিটিশ সরকারের টানাপোড়েন চলছে। রবার্ট ক্লাইভের বঙ্গ বিদ্বেষী সেই সব বিশেষণ পেশ করা হয়েছিল আজ থেকে প্রায় আড়াইশ’ বছর আগে। এখন প্রশ্ন হলো, এতো দীর্ঘকাল ধরে বাঙালি কি আজও তার সেই হীন মানসিকতা এবং লোভী, নিষ্ঠুর চরিত্র ধরে রেখেছে? আধুনিক শিক্ষার আলোকোজ্জ্বল উদারতা ও মানবিক সংবেদনশীলতা কি এতোদিনে তার হৃদয়কে একটুও প্রসারিত করেনি? দেশের আদিবাসীদের বঞ্চনা বা অধিকারহীনতা কি বাঙালি মন ও মননের সেই অনুদারতারই প্রতিচ্ছবি? এমন সরলীকৃত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সত্যিই কঠিন। যেখানে হাজার বছরের সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, অসাম্প্রদায়িক সহজিয়া জীবন দর্শন, পীর-দরবেশ থেকে শুরু করে লালন-রবীন্দ্র-নজরুল-জীবনানন্দের মনন ও সৃষ্টিতে সমৃদ্ধ সাহিত্য ও মানবিকতার মুক্ত আকাশ রয়েছে। সঙ্গত কারণে প্রশ্নটা এখানেই। কেন বাঙালি আজও অন্যের অধিকার হরণ করে? কিংবা অন্যকে তার প্রাপ্য অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার কথা উঠলে নিজেরটা হারানোর অমূলক আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন, ঈর্ষান্বিত হয়ে ওঠে? কেন সবকিছুকে সে নিজের ভোগদখলে রাখতে চায়, যেখানে তার নিজেরও শোষণমুক্তির সংগ্রামের বহু গৌরবজনক ঐতিহ্য আছে?

মানবিকতা, সমতা, ন্যায্যতার পক্ষে মানুষের সৃজনশীল ও কল্যাণকামী চিন্তাধারা অধিকতর সমতার স্বপ্নে দিন দিন বিকশিত হচ্ছে। এখন সমাজতত্ত্ব, দর্শন, নৃ-বিজ্ঞান প্রভৃতি জ্ঞানকা-ের প্রচলিত ডিসকোর্সে এযাবৎ স্বীকৃত বিভিন্ন মানবধারার স্বতন্ত্র অস্তিত্ত্বকেও মানুষ আর মেনে নিতে চাইছেনা। তারা বলছে, পৃথিবীতে একটিই মানবধারা এবং সেটি হচ্ছে ’মানুষ’। অন্য সব বিভাজন কৃত্রিম এবং কিছু মানুষের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিজাত। জগতের সকল মানুষ এবং ক্ষুদ্র বৃহৎ সকল জাতি ও সংস্কৃতি সমানে সমান। কেউ কারও চেয়ে বড় বা ছোট নয়। শুধু সম্পদের ক্ষেত্রে সমতা নয়, মানুষের চিন্তায়, মননেও অন্য যে কোন মানুষের প্রতি সমতার, সমমর্যাদার বোধকে জাগ্রত ও লালন করতে হবে। মানুষের মর্যাদা ও স্বীকৃতির প্রশ্নে উন্নত সমাজে এই যখন চিন্তাধারা বা স্বপ্ন, সেখানে আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতির ক্ষেত্রে আমরা বাংলাদেশে আজও কোন অন্ধকার যুগে বিচরণ করছি? কবে এদেশে সেই মহিমান্বিত সাংস্কৃতিক নবজাগরণ সম্ভব হবে যার উজ্জ্বল আলোকধারায় এই ব-দ্বীপের সব মানুষের তথাকথিত সঙ্কুচিত হৃদয় আবারও প্রসারিত ও আলোকিত হয়ে উঠবে? কবে তারা সকলে মিলে অকৃত্রিম ভালোবাসা ও সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দেবে এদেশের সকল মানুষের স্বমর্যাদা, সমানাধিকার নিশ্চিত করার প্রত্যয়ে? আমরা বাংলাদেশের আদিবাসীরা আগামীর কোন সোনালী প্রভাতে বাঙালি মানসের সেই আলোকিত উদ্বোধনের প্রতীক্ষায় পথ চেয়ে আছি।

About the author

সংবাদদাতা

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/2737

4 pings

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>