«

»

এই লেখাটি 698 বার পড়া হয়েছে

Print this প্রকাশনা

ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত ও বৃহৎ নৃ-গোষ্ঠীর আগ্রাসন -পর্ব ১

লিখেছেন- সম্প্রীতি চাকমা

“এই মন্দ দুনিয়ায় কিছুই স্থায়ী নয়, এমনকি আমাদের সমস্যাগুলোও নয়।“ – চার্লি চ্যাপলিন, ব্রিটিশ অভিনেতা ও চলচিত্রকার

প্রাক-বয়ানঃ

বর্তমানে জুম্ম আদিবাসী সমাজে চলমান ভ্রাতৃঘাতি সংঘাত, কুটিল রাজনীতি ও সর্বগ্রাসী নৈতিক অবক্ষয় আমাদের জীবন ও মনোজগৎকে প্রতিনিয়ত দুঃস্বপ্ন তাড়িত করছে বললে নিশ্চয় অত্যুক্তি হবেনা। সেই সাথে কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রত্যক্ষ অপ্রত্যক্ষ নানান্ চাপ ও আগ্রাসনে পাহাড়ের মানুষের বিবেক ও চিন্তার স্বাধীনতা আজ সত্যি বিপন্ন, অবরুদ্ধ। আদিবাসী, উপজাতি, ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী, বৃহৎ নৃ-গোষ্ঠী, বাঙালি, বাংলাদেশি প্রভৃতি শব্দ নিয়ে অনাবশ্যক কুটতর্ক আর রাজনীতিও যেন শেষ হবার নয়। জাতিগত আগ্রাসনের মূল সমস্যা থেকে জনগণের দৃষ্টি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করাই এর আসল উদ্দেশ্য, যা রাষ্ট্রশক্তি সুকৌশলে এযাবৎ করে আসছে। দেশের বৃহৎ নৃ-গোষ্ঠীর শঠতাপূর্ণ জাত্যাভিমানের চোরাবালিতে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো প্রভৃতি জাতির আত্মপরিচয় ও মর্যাদার ক্রমবিলুপ্তি দেখে দেখে আদিবাসী মানুষের মন আজ বড় ক্লান্ত, সংক্ষুব্ধ। মানবিক মর্যাদাহীনতা ও বঞ্চনার বোধ তাদের হৃদয়-মনকে দিন দিন আচ্ছন্ন করে ফেলছে। সারা পৃথিবীজুড়ে আত্মসচেতন ও আত্মমর্যাদা বোধসম্পন্ন যে কোন আদিবাসী, প্রান্তিক মানুষই আজ অনুরূপ বেদনায় ভারাক্রান্ত।

জুম্ম সমাজের আত্মঘাতী মরণযাত্রা, শাসকগোষ্ঠীর আনন্দিত উসকানি আর সাধারণ মানুষের বিপন্নতা যে কোন সংবেদনশীল মানুষকে ব্যথিত উদ্বিগ্ন করছে বলে আমার বিশ্বাস। দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির নামে সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্রের সহায়তায় শাসকগোষ্ঠীর নানা রূপকল্প/স্বপ্নকল্প বাস্তবায়নের কাজও যথারীতি চলছে। সেখানে নিশ্চয়ই আদিবাসীদের বর্তমান দুরবস্থার বিষয়টি আগে থেকে নির্ধারিত আছে। না হলে পাহাড়ে সমতলে যে কোন অজুহাতে সাম্প্রদায়িক হামলা, ভূমি জবরদখল এবং আদিবাসী নারীর উপর সহিংসতার ঘটনা এত দ্রুত বাড়ছে কি করে? আর আমাদের সমাজে অপরিণামদর্শী ও কলহপ্রবণ মানুষের সংখ্যাও কি দিন দিন বেড়ে চলেছে? না হলে সবখানে কেন আজ এত ভাঙনের সুর? রাজনীতি, ধর্ম, শিক্ষা, বাণিজ্য, উন্নয়ন এমন কোন সেক্টর কি আছে যেখানে আমরা ঐক্য, সংহতি ধরে রাখতে পেরেছি? সামাজিক সংহতি, শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সামষ্টিক উন্নয়নের বিষয়গুলোকে এখন ঠিক করতে না পারলে কেমন হবে আমাদের আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যত? শাসকগোষ্ঠীর বহুমুখী আগ্রাসন ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে আমরা যেভাবে নানা কন্ঠে সোচ্চার হই তার চেয়ে জুম্ম জাতীয় ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠার কাজটি কি কম গুরুত্বপূর্ণ? আসলে ঐক্যবদ্ধ হতে না পারলে পার্বত্য চুক্তির বাস্তবায়ন হোক কিংবা পূর্ণ স্বায়ত্বশাসনই হোক, কোনটিই তো কখনও অর্জিত হবেনা। ঐক্য প্রসঙ্গে মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং সান সু চি’র একটি বক্তব্য এখানে স্মরণ করছি। নিজেদের অনৈক্য সম্পর্কে অনুসারীদের সতর্ক করে দিয়ে তিনি একবার বলেছিলেন, ’গণতন্ত্র (এখানে পড়–ন জুম্মদের স্বাধিকার) প্রতিষ্ঠায় জনগণকে অবশ্যই ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। এটি অত্যন্ত পরিষ্কার ও খোলাখুলি ব্যাপার। আমরা ঐক্যবদ্ধ হতে ব্যর্থ হলে কিছুই অর্জন করতে পারবো না।’ দক্ষিণ আফ্রিকার অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলাও তাঁর দেশের শতধাবিভক্ত রাজনীতিকে ঐক্যবদ্ধ করে জনগণের প্রকৃত মুক্তি ছিনিয়ে এনেছিলেন। জুম্ম জাতীয় মুক্তির প্রতীক প্রয়াত শ্রী মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাও নিজের জীবনের বিনিময়ে রাজনীতিতে ঐক্যের অপরিহার্যতাকে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন। তাহলে সেই ঐক্য কার বা কাদের প্ররোচনায় যুগ যুগ ধরে আমাদের কাছে সোনার হরিণ হয়ে থাকবে?

রাষ্ট্রের আদিবাসী নির্মূলীকরণ নীতি সম্পর্কে আমরা কতটুকু সচেতন?

বিশ্বের দেশে দেশে শোভিনিস্ট জাতিরাষ্ট্রগুলো ’এথনিক ক্লিনজিং’ এর মাধ্যমে দেশের অপরাপর ভিন্ন জাতি ও সংস্কৃতির মানুষকে হয় পুরোপুরি ধ্বংস বা আত্মীকৃত করেছে নয়তো দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত করে ধুঁকে ধুঁকে মারছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। যুগ যুগ ধরে এদেশে আদিবাসীদের উপর দমন-পীড়ন চলছে। তবুও রাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারণী মহল থেকে শুরু করে একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবী এবং সাধারণ বাঙালি সমাজ মনে করে, আমরা তথাকথিত উপজাতিরা, বিশেষভাবে চাকমারা নাকি বেশ ভালো আছি। চাকুরি, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ রাষ্ট্র প্রদত্ত সকল সুযোগ সুবিধা হাতিয়ে নিয়ে আমরা নাকি এখন অনেক উন্নত। অথচ (বাঙাল-বিবেচনায়) এত উন্নতির পরও আনুমানিক পাঁচ লক্ষাধিক জনসংখ্যার চাকমাদের সন্মিলিত আর্থিক সম্পদ ঢাকার কারওয়ান বাজারের আড়তদারদের মোট পূঁজির সমপরিমাণ হবে কিনা যথেষ্ট সন্দেহ আছে। বসুন্ধরা, ট্রান্সকম, স্কয়ারের মতো শিল্পগোষ্ঠী কিংবা সারা দেশে রাজনীতিবিদ, মন্ত্রী-আমলাদের যেসব ব্যাংক এবং অন্যান্য শিল্প প্রতিষ্ঠান ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সেগুলোর সাথে তুলনা নাইবা করলাম। সেসব শিল্প প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটির মালিকানা হাতে পেলেও পুরো চাকমা জাতি বর্তে যেতো বলে আশা করি। চাকমাদের আরেকটি বড় অপরাধ হলো, দেশের অন্যান্য সকল জনগোষ্ঠীর তুলনায় তাদের শিক্ষার হার নাকি সর্বোচ্চ। রাজনীতি সচেতন হওয়ার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের যে কোন অধিকার আন্দোলনের মূল হোতা বা ষড়যন্ত্রকারী নাকি চাকমারাই। অন্যসব জাতিকেও তারা যুগপৎ সুবিধাবঞ্চিত ও বিপথে পরিচালিত করছে, এমন অভিযোগ এনে একশ্রেণীর ’দেশপ্রেমিক’ বাঙালি এখন চাকমা জাতির উপর সর্বান্তকরণে খড়গহস্ত। শিক্ষায় মোটামুটি অগ্রসরতার কারণে চাকমা সমাজে একটি চাকুরিজীবী মধ্যবিত্ত শ্রেণী ইতোমধ্যে গড়ে উঠেছে বটে। সেখানে কিছু ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, স্থপতি, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সামরিক-বেসামরিক আমলা, আইনজীবী, এনজিও কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, ব্যাংকার প্রভৃতি রয়েছেন। প্রশ্ন হলো, এই কয়েকজন কর্মকর্তাকে বিবেচনায় নিয়ে ঐতিহাসিকভাবে প্রান্তিক একটি জাতির আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন পরিমাপ করা কতটুকু যুক্তিসঙ্গত, যেখানে তাদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষকে আজও দারিদ্র্যসীমার নীচে বাস করতে হয়? শহরাঞ্চলের কিছু মানুষকে দেখে সাধারণ বাঙালি মানস এবং তাদের ’দেবোনা’ আক্রান্ত মন যদি সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, দেশের সকল চাকমা শিক্ষা-দীক্ষা-বিজ্ঞান-অর্থনীতিতে বাঙালিকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে এবং সেকারণে তাদের রাশ টেনে ধরতে হবে, তাহলে ধরে নিতে হবে মানবিক উদারতায় এবং তৃণমূলের সমাজ বাস্তবতার নির্মোহ শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে বাঙালি এখনও অনেক পিছিয়ে আছে। তাছাড়া এখানে ’বাঙালিরা দিচ্ছে’, ’আমরা দিচ্ছি’ জাতীয় প্রশ্ন উঠবে কেন? দেওয়ার মালিক তো রাষ্ট্র। রাষ্ট্র তার সব নাগরিকের জন্য মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করাসহ উন্নয়নের অনুকূল পরিবেশ ও সমসুযোগ সৃষ্টি করবে। আর সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নাগরিকগণ নিজেদের শ্রম, অধ্যবসায় ও সৃষ্টিশীলতা দিয়ে উন্নতির সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছানোর চেষ্টা করবেন। তাদের উন্নতির মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রও উন্নত, সমৃদ্ধ হবে। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, বাঙালি, গারো নির্বিশেষে এদেশের আপামর জনগণ বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নাগরিক। দেশের সংবিধান অনুযায়ী তাদের সকলেরই অধিকার সমান। কারও কম বা কারও বেশি নয়। নিজ নিজ জাতিভুক্ত প্রত্যেক সাবালক আদমির এক একটি ভোটের মর্যাদাও সমানে সমান। শাসক নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রত্যেক ভোটারের ক্ষমতা ও ভূমিকা সমান গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং ’আমরা তোমাদের সবকিছু দিচ্ছি’ জাতীয় অনুদার, আগ্রাসী দৃষ্টিভঙ্গি দেশের সংবিধান আর এ যুগের গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের ধারণার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। মূল কথা হলো, এখানে কেউ কাউকে যেচে কিছুই দিচ্ছেনা। সকলে নিজের চেষ্টায়, শ্রমে-ঘামে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। রাষ্ট্র কর্তৃক সমমর্যাদা ও সমসুযোগ নিশ্চিত করা হলে আদিবাসীরা আর্থ-সামাজিকভাবে সমৃদ্ধ এবং দেশমাতৃকার কল্যাণে আরও বেশি আত্মনিয়োগ করতে পারতো একথা নির্দ্ধিধায় বলা যায়। এই সমমর্যাদা ও সমসুযোগ সৃষ্টির দায়িত্ব দেশের বৃহৎ নৃ-গোষ্ঠীর উপরই বর্তায়। অথচ এর উল্টো-টিই এদেশে ঘটছে। তাই বৃহৎ নৃ-গোষ্ঠীর মানুষ হলে মনেও বড় হবে-এমন উদার মতবাদ সম্ভবত বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য নয়।

 

ইদানীং দেখা যাচ্ছে, পাহাড়ে আন্তঃসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সংহতির প্রতীক চাকমা রাজবংশকেও একশ্রেণীর বাঙালি বুদ্ধিজীবী এখন তাদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু করছেন (বিস্তারিত জানতে দেখুন: সৈয়দ ইবনে রহমতের লেখা – “চাকমা রাজ পরিবারের গোপন ইতিহাস’, সূত্র: www.parbattanews.com)। আদিবাসী বিদ্বেষী প্রচারণার অংশ হিসেবে চাকমাদের মর্যাদার, অহংকারের সব বিষয়কে এখন টার্গেট করা হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে অতি ’দেশপ্রেমিক’ বাঙালদের বেশ কয়েকটি ওয়েবসাইট, ব্লগ এবং অন্যান্য প্রচার মাধ্যম রয়েছে। সেখানে বাঙালি জাতিকে ’আদিবাসী’ হিসেবে প্রমাণের একটি মরিয়া, হাস্যকর প্রচেষ্টাও চলছে। পাশাপাশি গভীর নিষ্ঠার সাথে নানা আজগুবি ও সাম্প্রদায়িক উস্কানিমূলক তথ্য দিয়ে মূলতঃ চাকমা জাতি সম্পর্কে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। এসব কাজে বহু অর্থ, মেধা ও শ্রমের বিনিয়োগ হচ্ছে বলে প্রতীয়মান হয়। এদেশে চরম মৌলবাদী ও আদিবাসী বিদ্বেষী কিছু গবেষকও ইতোমধ্যে তৈরি হয়ে গেছে। উপরোক্ত প্রচার মাধ্যমগুলোতে তারা আদিবাসী নারী ও তরুণ প্রজন্মের বিরুদ্ধে নেতিবাচক ও তাচ্ছিল্যপূর্ণ নানা প্রচারণা চালাচ্ছেন। সেখানে স্থানীয় ফ্লেভারযুক্ত বিভিন্ন প্রলোভন, রগরগে প্রেম ও সহিংসতার কাহিনীও ছড়ানো হচ্ছে। আসলে এটি শাসকগোষ্ঠীরই পরিকল্পিত এক ধরনের অতি নোংরা মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। আদিবাসী ভবিষ্যত প্রজন্মের একটি ভোগবাদী, স্বার্থপর, জীবন ও রাজনীতি বিমুখ মানস-কাঠামো গড়ে দেওয়াই এর লক্ষ্য। এসব কাজের সাথে মধ্যপ্রাচ্যের প্যালেস্টাইন-ইজরায়েল সংঘাতের অদ্ভুত মিল। সেখানে ইহুদি এবং পশ্চিমা কর্পোরেট মিডিয়া বিশ্ববাসীর সামনে ফিলিস্তিনী শিশু-তরুণদেরকে প্রতিনিয়ত উচ্ছৃঙ্খল সন্ত্রাসী হিসেবে উপস্থাপন করছে। টিভির পর্দায় প্রায়শঃ দেখানো হয়, ফিলিস্তিনী শিশু-তরুণেরা সবসময় ইজরায়েলি সেনাদের লক্ষ্য করে পাথর বা গুলতি ছুঁড়ছে; বয়স্ক নারী-পুরুষেরা কোন শবদেহ কাঁধে নিয়ে বিক্ষোভে ফেটে পড়ছে। এভাবে পশ্চিমা স্বার্থের অনুগত বহুজাতিক কর্পোরেট মিডিয়া প্রমাণ করতে চায় এসব উচ্ছৃঙ্খল, যুদ্ধবাজ মানুষদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার অধিকার ইজরায়েলের আছে। সুতরাং নির্দিষ্ট বিরতিতে ফিলিস্তিনীদের ভূখ- দখল করে বসতি স্থাপন, কট্টরপন্থীদের বিদ্রোহ দমনের নামে সাধারণ মানুষকে হত্যা করা ইজরায়েলের জন্য জায়েজ। পার্বত্য চট্টগ্রামের বেলায়ও কি অতি সুক্ষভাবে প্রায় অনুরূপ একটি জাতিগত আগ্রাসন এখন চলছেনা? আসলে স্থানিক ভিন্নতা ছাড়া ইজরায়েলি আগ্রাসন আর পার্বত্য চট্টগ্রামে চলমান সামরিক-সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য নেই। প্যালেস্টাইনে সেটি চলছে ইহুদিদের অতি প্রাচীন পবিত্র রাজধানী ও ধর্মীয় ঐতিহ্য উদ্ধারের নামে। আর পার্বত্য চট্টগ্রামে এই আগ্রাসন চালানো হচ্ছে প্রতিবেশি বিধর্মী রাষ্ট্রের হাত থেকে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষাসহ এই অঞ্চলে পশ্চিমাদের ’খ্রিস্টান রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার ষড়যন্ত্রকে প্রতিরোধের নামে বাঙালি একাধিপত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে।

এযাবৎ বস্তুগত ও মননগত সব সম্পদ হরণের মাধ্যমে হীনমন্যতাবোধে আক্রান্ত করার একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় সারা বিশ্বজুড়ে ভিন্নতর প্রান্তিক জাতিসমূহের উপর অধিপতি জাতির ভূ-রাজনৈতিক ও আর্থ-সাংস্কৃতিক উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার কাজ সম্পন্ন হয়ে এসেছে। দুর্বল ও প্রান্তিক জাতির ভূমি, নারী, প্রকৃতি, সংস্কৃতি এবং খনিজ/জলজ সকল সম্পদ একসময় বিজয়ীর ভোগদখলে চলে যায়, যদি তারা নিজ জাতির অহংকারের, আত্মমর্যাদার বিষয়গুলোকে আঁকড়ে ধরে আগ্রাসী শক্তিকে প্রতিহত করতে না পারে। সবলের কাছে দুর্বলের এই আত্মসমর্পিত হওয়া প্রসঙ্গে উত্তর-উপনিবেশী তাত্ত্বিক ফ্রানৎস ফাঁনো বলেছেন, ভৌগলিক উপনিবেশের চেয়ে মনের উপর উপনিবেশের প্রভাব অধিকতর দীর্ঘস্থায়ী ও গভীর হয়ে থাকে। ভূ-রাজনৈতিক উপনিবেশের হাত থেকে একসময় মুক্তি মিললেও মনের উপনিবেশ মুক্তি আর সহজে মেলেনা। পার্বত্য চট্টগ্রামেও এখন সেই কা-টিই ঘটছে। বাঙালির ভূ-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আগ্রাসনে পাহাড়িদের ভূমি/বাস্তুসম্পদ যটটুকু বেদখল হচ্ছে তার চেয়ে বেশি বেহাত হয়ে যাচ্ছে মনের, মননের, সংস্কৃতির জমিন। পাঠক, একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখবেন, গত চার দশকে আমাদের পূর্বপুরুষের ভূমি হারানোর পাশাপাশি মনের দিক থেকে কত ব্যাপকভাবে এবং দ্রুততার সাথে আমরা বদলে গেছি। অর্থাৎ আমাদের মানস সম্পদগুলোকে হারিয়ে ফেলেছি। একদিকে বাঙালি প্রতিবেশি, বাঙালির সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস, চলন-বলন, রুচি-স্টাইলের প্রতি অনুকরণপ্রিয়তা ও নির্ভরশীলতা নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্ত নির্বিশেষে পাহাড়ি সমাজে যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, অন্যদিকে নিজেদের সমাজে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ, মানসিক দূরত্ব ও অবিশ্বাস গভীরতর হয়েছে। বাঙাল-প্রিয়তার দিক থেকে উচ্চবিত্তরা আরও এককাঠি এগিয়ে গেছে। এই মহলে কোথাও কোথাও এখন পাহাড়ি বধুর সাথে বাঙালি বরের সামাজিক বিয়ে মহাধুমধামে আয়োজিত হতে দেখা যায়। পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী সমাজে খুনীর সংখ্যাও কী দিনদিন বেড়ে চলেছে বা অতি সুকৌশলে মানুষকে খুনী বানানো হচ্ছে? কারণ কিছুদিন পরপরই সেখানে এখন খুনোখুনির ঘটনা ঘটে। দুই দশক আগেও ঢাকাসহ শহরাঞ্চলের রাস্তায় বা গণপরিবহনে কদাচিৎ দুই অপরিচিত আদিবাসী মানুষের সাক্ষাৎ হলে তারা সোৎসাহে পরষ্পরের সাথে কুশল বিনিময় করতেন। এক ধরনের গভীর আত্মীয়তা ও নিরাপত্তার বোধ তাদের পরষ্পরকে স্পর্শ করতো। এখন আর সেই অকৃত্রিম সহমর্মিতা বা সৌজন্য মানুষকে সেভাবে কাছে টানে না। আদিবাসীদের নিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রের নির্মম রাজনীতির খেলা মানসিকভাবে তাদেরকে পরষ্পর বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। ফলে এক জুম্ম ভাই হয়ে অন্য জুম্ম ভাইয়ের বুকে ছুরি বা গুলি চালানো এখন আর খুব কঠিন কাজ নয়। এই ’খুন’ খেলা বা খুনীদের সংখ্যা (রাজনীতির ভাষায় সৈনিক, যোদ্ধা যে নামে অভিহিত করা হোক না কেন) আদিবাসী সমাজে যত বাড়বে ততই শাসক জাতির আধিপত্য সুদৃঢ় হবে। একসময় হয়তো দেখা যাবে, উচ্ছৃঙ্খল ’উপজাতি’দেরকে নতুনভাবে মানবাধিকারের পাঠ দানের নামে বিদেশী কিংবা স্বদেশী অর্থায়নে বিভিন্ন ’মানবাধিকার’ প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে, একের পর এক পরিকল্পিত সাম্প্রদায়িক হামলা, খুন, ধর্ষণের মতো সহিংস ঘটনা ঘটিয়ে আদিবাসী মানুষের সংবেদনশীলতা বা চেতনাকে ভোঁতা বানিয়ে দেওয়ায় প্রয়াস চলছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, এসব সাম্প্রদায়িক আক্রমণ এখন যেন দেশের কোন সড়ক দুর্ঘটনা, ভবন ধ্বসে গার্মেন্টস শ্রমিকদের গণমৃত্যু কিংবা আফ্রিকার জঙ্গলে কোন চিতার হরিণশাবক শিকারের মতো স্বাভাবিক ঘটনা। কিছুদিন হৈ হল্লার পর সবকিছু কেমন যেন আগের মতো গা সওয়া, স্বাভাবিক হয়ে যায়। মানুষকে বুঝতে দেওয়া হয়না যে, এসব ঘটনা সামরিক-সাংস্কৃতিক আগ্রাসন বা শাসকগোষ্ঠীর ’এথনিক ক্লিনজিং’ এর অংশ। সাম্প্রদায়িক আক্রমণ সংঘটিত হওয়ার পর দেখা যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে যেন সবাই এক কাতারে দাঁড়িয়ে গেছে। সামরিক-বেসামরিক কর্তৃপক্ষ, সুশীল সমাজ, মিডিয়ার কর্তাব্যক্তি সবার মধ্যে যেন একটা প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায় কে আগে ঘরপোড়া, বাস্তুহারা মানুষকে ত্রাণসামগ্রী দেবে, তা নিয়ে। তাদের এসব জনদরদি কর্মকা- মিডিয়ায় গুরুত্বের সাথে প্রচারিত হচ্ছে কিনা সেদিকেও নিশ্চয় তাদের নেকনজর থাকে। ক্ষতিগ্রস্তদের দুঃখ ভুলিয়ে দেওয়ার জন্যে কখনওবা মহাধুমধামে পাঁচমিশেলি নৃত্য-বাদ্য-গানের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও আয়োজিত হয়। আদিবাসীরাসহ দেশের সাধারণ মানুষ ও বহির্বিশ্ব নিপীড়কের এই ’মহানুভবতা’ দেখে নিশ্চয়ই একটু আশ্বস্ত হয় এই ভেবে যে, দুর্ঘটনাক্রমে এবারের সহিংসতাটি ঘটলেও ভবিষ্যতে আর নিশ্চয় সেরকমটি হবেনা! এভাবে একেকটি হামলা চালানোর পর যথারীতি একই নাটক মঞ্চস্থ হয় এবং একসময় ক্ষতিগ্রস্তরা সেটিকে তাদের জীবনের স্বাভাবিক ঘটনা বলে মেনে নেয়। সর্প-ওঝার বহুরূপী চরিত্রের এই নাটক এখন সারা পৃথিবী জুড়ে উত্তর-উপনিবেশী জাতিগত আগ্রাসনের ট্রেডমার্ক চিত্র। একই উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের শাসকগোষ্ঠীও এখন আদিবাসীদের এই বিভ্রান্ত, সন্মোহিত ও জীবন্মৃত অবস্থাটিকেই মনে প্রাণে দেখতে চায়।

আইনের শাসনের অভাবে সমাজে খুন, ধর্ষণের মতো সহিংসতা ও নির্লিপ্ততার সংস্কৃতি সর্বস্তরে সংক্রমিত হচ্ছে। আর যে কোন যুদ্ধ, সহিংসতা যা সমূলে বিনষ্ট করে দেয় সেটি হলো মানুষের বিবেক ও মানবিকতা। পার্বত্য চট্টগ্রামে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি জিইয়ে রেখে শাসকগোষ্ঠী আদিবাসী সমাজের নৈতিক-আদর্শিক মেরুদ-কে চিরতরে ভেঙে দিতে চায়, যাতে এই জাতি মেধা-মননে-মানবিকতায় আর কোনদিন নিজের পায়ে দাঁড়াতে না পারে। প্রেক্ষাপট একটু ভিন্ন হলেও পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীও ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ বুদ্ধিজীবী হত্যার মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতিকে তাই করতে চেয়েছিল। শহীদ বুদ্ধিজীবীরা বেঁচে থাকলে বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতি আজ এত সহিংস, ভোগসর্বস্ব নিশ্চয় হতোনা। মেধা-মননে পঙ্গু করার উদ্দেশ্যে পাকিস্তানীরা বাঙালিকে শারীরিকভাবে হত্যা করেছে, আর সেই বাঙালি শাসনক্ষমতা পেয়ে এখন হত্যা করছে আদিবাসীর দেহ, মন উভয়কে। কখনও সরবে, কখনও নীরবে। বিশ্ব মিডিয়া ও মানবাধিকার কর্মীদের শ্যেন দৃষ্টি না থাকলে এই নিধন প্রক্রিয়া হয়তো অচিরেই পাকিস্তানীদের মতো গণবিধ্বংসী হয়ে উঠতো। যা’হোক, এভাবে চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে একটি ’নীতি-বিসর্জিত, আত্মঘাতী ও বিভক্ত আদিবাসী সমাজ’ এই মানবাধিকারের যুগে কিভাবে স্বমহিমায়, সগৌরবে টিকে থাকবে সেটি এক বড় প্রশ্ন। শাসকগোষ্ঠীর ক্রমবর্ধমান আগ্রাসনের প্রেক্ষাপটে নিজেদের অস্তিত্বের স্বার্থে এই বিষয়গুলোর প্রতি গভীর মনোযোগ দেওয়ার সময় কি এখন আসেনি? কবে আমরা উপজাতীয় গোষ্ঠীগত অহংকার, অপরিণামদর্শিতা আর বদমেজাজ লালনের পরিবর্তে আপাদমস্তক আধুনিক, মানবাধিকারবাদী, গণতান্ত্রিক এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন একটি সাবালক জাতির মতো আচরণ করবো?

আদিবাসীদের ভূমি অধিকার বনাম রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বঃ

অধিপতি জাতি তার নিপীড়নমূলক কর্মকান্ডের সপক্ষে সবসময় কোন না কোন দর্শন বা যুক্তি উপস্থাপন করে থাকে। আদিবাসীরা পাহাড়ে সমতলে নিজেদের পূর্বপুরুষের প্রথাগত ভূমি-বন জবরদখল হয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে দেশের সুশীল সমাজের একটি অংশকে (মূলতঃ এনজিও) নিয়ে বহুদিন ধরে মৃদুমন্দ আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে এই এনজিওদের দাবি যাই হোক না কেন, আদিবাসীদের ভূমি-বিচ্ছিন্নতা, ভূমিকেন্দ্রিক মিথ্যা মামলার বোঝা ও হয়রানি, আদিবাসী নারীর উপর যৌন নিপীড়ন ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতার মাত্রা বাড়ছে বই কমছে না।

অন্যদিকে এনজিওনির্ভর আদিবাসী ভূমি আন্দোলনকে প্রতিহত করার জন্য শাসকগোষ্ঠীর হাতে রয়েছে একটি শক্তিশালী মারণাস্ত্র। সেটি হলো, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, দেশপ্রেম এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার তত্ত্ব। দেশের সুশীল সমাজও মূলতঃ শাসকগোষ্ঠী এবং সমাজের উপরতলার অংশ বলে তাদের অনেকে জাতীয়তাবাদ, ধর্ম, সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার প্রশ্নে বিভ্রান্ত, দ্বিধাবিভক্ত এবং শাসক মহলের অনুগামী। আদিবাসীরা যে ’বহিরাগত, বাঙালিদের মতো দেশদরদি বা বিশ্বস্ত নয় এবং সুযোগ পেলে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব বিপন্ন করে দিতে পারে’ সে আশংকা প্রমাণ করতে রাষ্ট্রযন্ত্র এবং অনুগামী কর্পোরেট মিডিয়া নানা উস্কানিমূলক সাম্প্রদায়িক প্রচারণা নিজ নাগরিকদের বিরুদ্ধে চালিয়ে যাচ্ছে। আদিবাসী-বৈরী এই দেশপ্রেম, জাতীয়তাবাদ ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে অনেক ’সুশীল’ও উপরে উল্লেখিত কারণে নৈতিকভাবে দুর্বল এবং আপোষকামী। তাই থেমে থেমে আদিবাসী নিধন বা বিতাড়নের ঘটনা ঘটলেও তারা রাষ্ট্রযন্ত্রের আদিবাসী বিদ্বেষী ভ্রান্ত নীতির বিরুদ্ধে দৃঢ়তার সাথে রুখে দাঁড়াতে পারেন না।

আদিবাসী বর্জিত এই একপেশে ও ভ্রান্ত সার্বভৌমত্ব তত্ত্বের কারণেই বাংলাদেশের প্রান্তিক মানুষেরা এথনোসাইডের শিকার হচ্ছেন। এক্ষেত্রে সহজতম উপায় হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে তাদের ভূমি জবরদখল এবং নারীদের উপর যৌন নিপীড়নকে। শুধু ভূমি বা অন্যান্য সম্পদের উপর বৃহৎ নৃ-গোষ্ঠীর কিছু মানুষের লোভ ভেবে বিষয়টিকে সাধারণীকরণ করার সুযোগ নেই। অবচেতনে আদিবাসী বা হিন্দু-বিদ্বেষ না থাকলে তাদের ভূমি-নারীর উপর সংখ্যাগুরু মানুষের শোষণ এত প্রবলভাবে কায়েম হতোনা। পাহাড়ের ক্ষেত্রে আদিবাসী নির্মূলীকরণের অংশ হিসেবে প্রকৃতি-ভূমি-সংস্কৃতি বেদখলসহ সেনাকর্তৃত্ব এবং মুসলিম বাঙালির আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রকাশ্য ও গোপন তৎপরতা তো সবার জানা। নতুন উৎপাত হিসেবে এখন যুক্ত হয়েছে ’হিন্দু ভারত’ ও ’বৌদ্ধ মিয়ানমার’-এর সম্ভাব্য আগ্রাসন এবং পশ্চিমা বিশ্বের ’খ্রিস্টান রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার কল্পিত ষড়যন্ত্রকে নস্যাৎ করে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার কিম্ভূত তত্ত্ব। এর অংশ হিসেবে বিভিন্ন গণমাধ্যমে জুম্ম বিদ্বেষী প্রচারণার পাশাপাশি বাঙালি জাতিকে ’আদিবাসী’ প্রমাণের জোর প্রচেষ্টাও চলছে, যা আগে উল্লেখ করেছি। তাই শুধু ভূমি চাই, ভূমি চাই বলে চিৎকার করে আদিবাসীদের সমস্যার সমাধান হবেনা। সত্য কথাটি খোলাসা করে বলার সময় এসেছে। আসলে প্রতিবেশি দেশের কল্পিত আগ্রাসন বা পশ্চিমাদের দূরভিসন্ধি প্রতিহতের নামে পাহাড়কে মুসলিম বাঙালির অবাধ চারণভূমি ও বর্মে পরিণত করাই হলো আসল লক্ষ্য। এর জন্য নিরবচ্ছিন্নভাবে সেটেলার বাঙালিদের পুনর্বাসনসহ যা যা প্রয়োজন তা করতে টনটনে সার্বভৌমত্বপন্থীরা পিছপা হবেন না। মধ্যপ্রাচ্যের পেট্রো ডলারের সহায়তায় পার্বত্য চট্টগ্রামসহ ভারতের আসাম-মেঘালয়ের কিছু অংশ এবং মিয়ানমারের আরাকানকে নিয়ে সুদূর ভবিষ্যতে শরিয়া আদর্শের একটি ’ইসলামিক রিপাবলিক’ গড়ার খায়েশও তাদের অনেকের মনে আছে বলে প্রকাশ। এসব লক্ষ্য পূরণে এথনিক ক্লিনজিং এর অংশ হিসেবে আদিবাসীদের ভূমি-নারী-সংস্কৃতি-অর্থনীতিকে আত্মীকরণের কথা আগে বলা হয়েছে। পরবর্তী ধাপে এখন রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় নেতৃত্বের ভেতরে বিভাজন সৃষ্টি, টার্গেটেড কিলিং, গোপনে স্থানীয় জনগণের স্বাস্থ্যহানি ও বন্ধ্যাকরণ এবং আদিবাসীদের গৌরব ও অহংকারের সব বিষয়কে কলুষিত ও প্রশ্নবিদ্ধ করার কাজটি চলছে। এছাড়া ঘুষ-দুর্নীতি-মাদকদ্রব্য-চাঁদাবাজিকে প্রশ্রয় দান ও প্রসারের মাধ্যমে নৈতিক অবক্ষয়কে ত্বরান্বিতকরণ, প্রতিবাদী যুবসমাজকে (নারী-পুরুষ নির্বিশেষে) ভোগবাদিতায় প্রলুব্ধ করে চরিত্রহীনতা ও নির্লিপ্ততায় ডুবিয়ে দেওয়ার কাজও প্রায় সম্পন্ন। এরপর আছে শারীরিক ও মানসিক নিপীড়নের মাধ্যমে আদিবাসীদের দেহ-মনের সমুদয় শক্তি, মুক্তবুদ্ধি এবং সমতার স্বপ্ন ও আকাঙ্খাকে নিঃশেষ করার আয়োজন। সবশেষে মূলধারার সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মাধ্যমে আদিবাসীদের দেহ-মনের উপর বাঙালির শ্রেষ্ঠত্ব এবং ভৌগলিক-মানসিক-সাংস্কৃতিক উপনিবেশকে চিরস্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত করার কাজটি সম্পন্ন হবে। সমতলের বিভিন্ন আদিবাসী অঞ্চলে এবং বিশেষ করে পাহাড়ে সামরিক-বেসামরিক ব্যবস্থাপনায় উপরে উল্লেখিত নিপীড়ন প্রক্রিয়াসমূহের উৎপাদন ও পুনরুৎপাদন নিরবচ্ছিন্নভাবে চলছে। ফলে নতুন নতুন রাস্তাঘাট, পর্যটন কেন্দ্রের চাকচিক্য দেখে আপাতঃ উন্নয়নের গোলকধাঁধায় বিভ্রান্ত হয়ে আদিবাসীরা নিজেদের অজান্তে দিন দিন প্রান্তিক অবস্থানে চলে যাচ্ছেন। রাষ্ট্রযন্ত্রের সুপরিকল্পিত সামরিক-সাংস্কৃতিক-মনস্তাত্ত্বিক আগ্রাসনের কুফল আমরা পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীরা কি এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিনা? ভ্রাতৃঘাতি সংঘাতে আমাদের জনসংখ্যা এবং সুশিক্ষিত জনশক্তি ধীরে ধীরে হ্রাস পাচ্ছে। সমাজে হিংসা-হানাহানি এবং আন্তঃসাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও দূরত্ব বেড়েছে। মানুষে মানুষে অবিশ্বাস ও সন্দেহপ্রবণতা বাড়ছে। সমাজে দুর্নীতি ও নৈতিক অবক্ষয় দ্রুতগতিতে বেড়ে চলেছে। তরুণ-তরুণীদের একটি বিরাট অংশ আজ মাদকাশক্ত, জীবন ও রাজনীতিবিমুখ। বাকিরাও মূলতঃ শেকড় বিচ্ছিন্ন এবং আধুনিক ভোগবাদিতার গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দিয়েছেন। আদিবাসীদের সংগ্রামী ঐতিহ্য, গৌরবগাথায় তারা আর তেমন গর্বিত, উজ্জীবিত হননা। স্বজাতির জন্য অহংবোধ, মেধা ও মুক্তবুদ্ধির চর্চাও সমাজে যেন দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। নানা মনস্তাত্ত্বিক, আর্থ-সাংস্কৃতিক কারণে একশ্রেণীর তরুণী এখন শারীরিকভাবেও পাহাড়ি-বাঙালির ভেদাভেদ যেন ঘুচিয়ে দিয়েছে। সকল আদিবাসী রাজনীতিবিদ, সামাজিক ও ধর্মীয় নেতৃবৃন্দও আজ পরষ্পর বিচ্ছিন্ন কিংবা শত্রুভাবাপন্ন। নিজেদের প্রায় সকল কাজে তারা আজ যেন বাঙালি নেতৃবৃন্দ ও প্রশাসনের উপর নির্ভরশীল বা আস্থাশীল। তাহলে আদিবাসী/ শোষিতের দেহ-মনের উপর বাঙালি বা শোষকের ভূ-রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উপনিবেশ তো ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েই আছে। প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, বেগম খালেদা জিয়া, এরশাদ এবং আওয়ামী লীগের সরকার সকলে উপরে আলোচিত পদ্ধতিতে পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের আদিবাসী অঞ্চলে মুসলিম বাঙালির আধিপত্য বিস্তারের কাজটি নিপুণভাবে করে গেছে। এখন শুধু ’ভাগ কর, শাসন কর’ নীতির ভিত্তিতে আদিবাসীদের দিয়ে আদিবাসী নির্মূলীকরণের শেষ আয়োজনটুকু সম্পন্ন হতে চলেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে এখন আর সেনাবাহিনীকে ’বিপথগামী বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসী শান্তিবাহিনী’র খোঁজে কষ্ট করে বনে বাদাড়ে ঘুরে বেড়াতে হয়না। এক সময়ের কট্টর জুম্ম জাতীয়তাবাদী সশস্ত্র যোদ্ধারাই এখন কৃত্রিমভাবে আরোপিত বিভাজন রেখা ধরে নিজের সহযোদ্ধা ভাইকে গ্রাম-শহর-অরণ্যে তন্ন তন্ন করে খুঁজে বিজাতীয় সেনাদের চেয়েও নিষ্ঠুরভাবে নিশ্চিহ্ন করছে। কখনও আদর্শের নামে, কখনও সেফ্র ক্ষমতার দাপট প্রদর্শনের অভিপ্রায়ে। নিজেরাই যদি নিজেদেরকে এভাবে শেষ করে দেবো তাহলে আর স্বতন্ত্র জাতীয় পরিচয় বা নিজেদের কৃষ্টি-সংস্কৃতির পক্ষে সংগ্রামের বুলি আওড়িয়ে কী লাভ? কেনই বা হাজার হাজার মানুষকে উদ্বাস্তু, শরণার্থী বানিয়ে অনিশ্চিত জীবনের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল (যাদের অনেকে আজও সহায়-সম্বলহীন)? কেন জুম্ম জাতীয়তাবাদের জনক, নিপীড়িত মানুষের অবিসংবাদিত নেতা এম. এন. লারমাসহ হাজারো মানুষ যুদ্ধে, গণহত্যায় নির্বিচারে আত্মাহুতি দিলেন? তাদের আত্মত্যাগকে, স্বপ্নকে কী আমরা সন্মান জানাবো না? তাঁরা কি শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর বিনামূল্যের নিউজপ্রিন্ট কাগজের বুলেটিনে কিংবা এনজিও অর্থানুকূল্যে আয়োজিত কৃত্রিম স্মরণসভায় ’সাম্প্রদায়িক সংঘাতে’ নিহত ব্যক্তিদের তালিকা হয়ে থাকবেন? তাঁদের এবং আমাদের অকুতোভয় সংগ্রামী পূর্বপুরুষদের আত্মার শান্তির জন্যে, আগামী প্রজন্মের নিরাপদ সুখী ভবিষ্যত নিশ্চিত করার প্রত্যয়ে সব ভেদাভেদ-ঘৃণা-বিদ্বেষ-অভিযোগ ভুলে আমরা আবারও একবার ঐক্যবদ্ধ হবো না?

 

চলবে………………

About the author

সংবাদদাতা

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/2726

1 comment

1 ping

  1. Mgjhdfsjf Jgafe

    চাকমারা, তো মঙ্গোলিয়ান উচ্ছিষ্ট বীর্যের সামান্য অপচয় এবং Burma এর রিফিউজি, তোদেরকে এক লাধ্ধি মাইরা Burma পাঠাইয়া দেওয়া দরকার ।

  2. Nilu BD

    চাকমারা, তো মঙ্গোলিয়ান উচ্ছিষ্ট বীর্যের সামান্য অপচয় এবং Burma এর রিফিউজি, তোদেরকে এক লাধ্ধি মাইরা Burma পাঠাইয়া দেওয়া দরকার ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>