«

»

এই লেখাটি 814 বার পড়া হয়েছে

Print this প্রকাশনা

আধো জাগরণে, আধো স্বপ্নে…….

এপ্রিল ১০, ১৯৯২। অমি সবেমাত্র ঘুম থেকে জেগে আড়মোড়া ভাঙছে। তার চোখে-মুখে আনন্দের ছাপ। আর মাত্র দুইদিন এরপরই চারদিকে বইবে খুশির উল্লাস। বিজু উৎসবে জেগে উঠবে পাহাড়ি ছোট গুচ্ছগ্রামটি। গতকালের প্রচন্ড বৃষ্টি কিছুটা চিন্তার উদ্রেক করলেও এখন সূর্য চারদিক তার কিরণ ছড়াচ্ছে। মাত্র ১ বছর আগে সে পদাপর্ণ করেছে বাংলাদেশে, এর আগে ১৯৮৬’র তান্ডবে তাকে ও তার পরিবারকে চলে যেতে হয়েছিল ভারতে, শরনার্থী হিসেবে। দেশে ফিরে এটাই প্রথম হবে তার বিজু পালন। বাবার কাছে আবদার করেছিল নতুন পোশাকের জন্য। দেখা যাক, বাবা তো বাজারে গিয়েছে। কিছুক্ষণ পরেই ফিরবে হাতে অমির জন্য নতুন পোশাক আর মায়ের জন্য ছোট্ট একটা হাদি নিয়ে।
তখন হঠাৎ করে সে শব্দ একটা শুনতে পায় কিন্তু আবছাভাবে শোনার কারণে বুঝতে পারল না। তাদের প্রতিবেশী সিমির বাবা এসে অমির মাকে ডাকতে থাকে। হঠাৎ করে চোখের সামনে অমির ভেসে ওঠে শত শত মানুষের হিংস্র মুখ আর মানুষের কান্না-আর্তনাদ। সে কি করবে বুঝে উঠতে পারেনা……

***************************
এটা শুধুই একটি গল্প হতে পারত। কিন্তু বাস্তব? বাস্তব কি বইয়ের গল্পের মতই??
এর পরবর্তী ঘটনা কেউ জানে না। অমির ভাগ্যে কি ঘটেছিল, তার বাবা কখনো বাড়ি ফিরতে পেরেছিলেন কিনা, তাদের প্রতিবেশীরাই বা বেঁচে ছিল কি?

না, আমরা কিছুই অনুমান করতে পারি না। ঘটনার ভয়াবহতা এতই তীব্র ছিল যে গল্পের মধ্য দিয়ে, কল্পনার চোখ দিয়ে তা আন্দাজ করাও কঠিন। কল্পনা করে দেখুন, আপনার বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে হাতে দা-রড-লাঠি নিয়ে তেড়ে আসছে কিছু অপরিচিত মানুষ যাদের মনুষ্যত্ব লোপ পেয়ে হয়ে গেছে পশুরও অধম। আপনার সামনেই আপনার মা-বাবাকে গলায় ছুরি চালিয়ে জবাই করা হল। আর আপনি ছেলে হলে আপনাকেও তা করার জন্য এগিয়ে আসছে বা মেয়ে হলে আপনাকে ধর্ষণ করার জন্য লোলুপ দৃষ্টিতে এগিয়ে আসছে কিছু হায়েনা। চারপাশ তখন ধ্বংসস্তুপ……… নাহ্, কেউ কল্পনা করতে পারুক আর নাই পারুক আমি আর অন্তত পারছি না।

আমরা সর্বদা সুখের কল্পনায় ভাসতে অভ্যস্ত, কষ্টের পৃথিবী হয়ে যায় সেখানে দূরের তারার মতো বিলীন। ফলে, কল্পনায়ও আসতে চায় না এসব কষ্ট, ভয়ের ঘটনা। নিহত লাশের সারি আমাদের তখন কল্পনা থেকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনে যেখানে ঘটে গেছে স্বাধীনতা পরবর্তী বৃহৎ একটি গণহত্যা।
নিজেকে অমি হিসেবে কল্পনা যেহেতু করতে পারি না তাই আসুন অমিত দার ব্লগের লেখাটা পড়ে নিই। http://chtbd.org/archives/2686#.U0WWtnZ9s_4
অথবা পড়ে নিতে পারেন বিপ্লব রহমান সাহেবের লেখাটি
http://mukto-mona.com/bangla_blog/?p=15587

লেখাগুলো পড়তে পড়তে হঠাৎ করে বুকের পাশে কষ্টের তীব্র অনুভূতি সৃষ্টি হয়। গায়ের লোম কাঁটা দিয়ে ওঠে, চোখের কোণে অশ্রুর বিন্দু এসে দৃষ্টিকে ব্যাহত করে। মানবতার বুলি এখানে স্রেফ কথার কথা, তখনকার পাহাড়ি গুচ্ছগ্রামগুলো মনে করিয়ে দেয় সাদা চামড়ার মানুষ কর্তৃক রেড ইন্ডিয়ানদের জন্য রিজার্ভেশন ক্যাম্প তৈরির কথা। রেড ইন্ডিয়ানদের রক্তের উপর দাড়িয়েঁ পৃথিবীর বৃহত্তম পরাশক্তি আজকের আমেরিকা। আর, বাংলাদেশ? পাহাড়ের সন্তানদের রক্তের উপর দাড়িয়েঁও তারা যেন পরাক্রম দেখাচ্ছে নিজেদের, নিজস্ব বাঙালি জাতিয়তাবাদের শক্তি। গুচ্ছগ্রামগুলোতে লাশের সারি যেন মনে করিয়ে দেয় হিটলারের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের কথা, মনে করিয়ে দেয় schindler’s List মুভির কথা যেখানে লক্ষ লক্ষ লাশকে ইটভাটার চুল্লিতে পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে। ভয়াবহ সে দৃশ্য!! আধুনিক সভ্যতা আজ যেন মেতেছে উগ্র জাতীয়তাবাদের মাতমে।

    আমি ঘৃণা করি আপনার, আপনাদের সে উগ্র জাতীয়তাবাদ। আমরাও আজ উগ্র জাতীয়তাবাদী চরিত্র হয়ে যাচ্ছি কিন্তু এমন হয়ে যেতে চাইনি।

জাতীয়তাবাদের সীমা পেরিয়ে আমরা চেয়েছিলাম আন্তর্জাতিকতাবাদী কিন্তু অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্নে আমাদের রুখে দাঁড়াতে হয়েছে পাহাড়ি জাতীয়তাবাদের উগ্রতাকে প্রশ্রয় দিয়ে হলেও। কারণ, জাতীয়তাবাদের ধুয়া তুলে হিটলার, মুসোলিনিরা যা করেছিলো আজ বাঙালি জাতিয়তাবাদের ধুয়া তুলে সেটা দেশের আর অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীগুলোর উপর করা হচ্ছে নতুন রূপে। অনেকটা “সুই হয়ে ঢুকে ফাল হয়ে বের হওয়া”র মতই।
আজ আমরা প্রায়ই বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম ভুলে যাচ্ছি লোগাং হত্যাকান্ড বলে একটা ঘটনা ঘটেছিল, যার আজকে ২২ বছর পূর্ণ হলো। বৈসাবির ঝলমলে অনুষ্ঠান আর রাতভর সুরার নেশা আমাদের জাগিয়ে দিচ্ছে ভোগের সত্ত্বাকে। পাহাড়ের গণহত্যাগুলো আজ প্রায় বিস্মৃতির পথে, লোগাংও তার ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু লোগাং-এর মাটি ভুলে যায় নি, ভুলে যায় নি ভাঙা-চোরা পরিত্যক্ত সে স্কুলঘরটি যার স্কুলমাঠে ঘটেছিল নারকীয় এসব ঘটনা। ভুলে যায়নি গ্রামের বৃদ্ধ-বৃদ্ধা আর ভুক্তভোগীরা। তাদের কষ্টে আজো গুমরে কাদেঁ লোগাং এর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া লোগাং নদী।

আরো একটা কথা, লোগাং শব্দের অর্থ “রক্তের নদী”।

About the author

অজল দেওয়ান

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/2702

2 pings

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>