«

»

এই লেখাটি 665 বার পড়া হয়েছে

Print this প্রকাশনা

এপ্রিলফুল

লিখেছেন- মনোশীষ চাকমা
রুমেন আর সুমেন দুই ভাই। রাস্তার মোড়ে যেখানে তাদের এলাকার সঙ্গে পার্শ্ববর্তী সেটেলার বাঙালিদের এলাকার রাস্তাটা মিলেছে সেদিকে তৃপ্তিভরা চোখ নিয়ে তাকিয়ে আছে। এককালে ঐসব এলাকায় বাপ-দাদার ঘরবাড়ি জমি-জমা ছিল। ৭২ -এর পর থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে সেটেলার পুর্নবাসনের ফলে ধীরে ধীরে জায়গা-জমি হারাতে হারাতে তাদের ঐ এলাকাটিও সেটেলাররা দখল করে নেয়। আজ সেসব জায়গা তারা আবার ফিরে পাবে। অবশেষে দীর্ঘ ১৭ বছর পর অমায়িক বাংলাদেশ সরকার শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নিয়েছে। তারই অংশ হিসেবে আজ তাদের এই এলাকাটা সেটেলার মুক্ত হবে। এককথায় বলতে গেলে সেটেলাররা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ সরকারের চাপে আদিবাসীদের কাছ থেকে দখলকৃত জায়গা ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে।

রুমেন- “সুমেন দা, চলো আরেকটু কাছে গিয়ে দেখি।” “হাঁ, চলো দেখি।”
রাস্তার পাশে একটা সুবিধাজনক জায়গায় বসে তারা সেটেলার বাঙালিদের প্রত্যাবর্তন দেখতে লাগল। একটু পর তারা জাহিদ -কে দেখল। একটা বড়সড় ট্রাংক মাথায় করে আসছে। জাহিদকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে দুর্দান্ত বালক রুমেনের মাথায় আগুন জ্বলে উঠল। এই মুজাহিদের জন্য তার প্রিয় দিদি রুমি -কে হারাতে হয়েছে। গাঙে গিয়ে নিঁখোজ হওয়ার ২দিন পর জঙ্গল থেকে দিদির বিবস্ত্র লাশ উদ্ধার হয়েছিল। বাক প্রতিবন্ধী রাখাল বালক দুলুপেদা ছিল ঘটনার সাক্ষী। প্রথমদিকে আকার ইঙ্গিতে বুঝানোর চেষ্টা করেও কেউ তার সেই নিশ্চুপ সাক্ষ্য বুঝতে পারেনি, পরে লাশ পাওয়ার পর সব পরিস্কার হয়ে যায়। এরপর থানা পুলিশের সঙ্গে কত ঝামেলা, কিন্তু নির্লিপ্ত প্রশাসন জাহিদ আর ধর্ষণে সহযোগী ইমরানকে গ্রেফতারের কোন চেষ্টাই করেনি। রুমেন রাগের মাথায় একটা ইটের টুকরো তুলে নিল জাহিদকে ছুঁড়ে মারার জন্য। যেই ছুঁড়তে যাবে, অমনি রাস্তায় সেটেলারদের পাহারা দেয়া এক সেনাসদস্য তাকে থামাল। “বাবু, ঢিল ছুঁড়োনা। লেগে যাবে তো!” সেনাসদস্যটি এরপর রুমেনের কাছ থেকে তার আক্রোশের কারণ শুনল। সব শুনে সেনাসদস্যটি চোখের পানি মুছতে মুছতে রুমেনকে সান্তনা দিতে লাগল। মমতাভরা পরশে রুমেনও সেনাসদস্যটিকে জড়িয়ে কাঁদতে লাগল। তাদের দেখে অন্যান্য সেনাসদস্যরাও কাছে এসে জমাল। ঘটনা শুনে তারাও সেটেলারদের গালিগালাজ দিতে লাগল, আর কয়েকজন ভারাক্রান্ত হৃদয়ে রুমেন আর সুমেনকে কিছু টাকা দিল।

ঘটনার ৯দিন পর… শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের ২য় পরিকল্পনামতাবেক আজ সেনাবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে ক্যাম্প তুলে চলে যাচ্ছে। সেটেলারবিহীন পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী বাঙালি আর আদিবাসীরা দল বেধে এই মহান সামরিক বাহিনীকে বিদায় জানাতে হাজির হয়েছে। সেনাসদস্যরা বড়জনদেরকে কাঁদো কাঁদো মুখে প্রণাম করতে লাগল, আর সমবয়সীদের জড়িয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। এতকাল সম্প্রীতির বন্ধনে অবস্থান করার পর আজ সব ছেড়ে যেতে সত্যিই কষ্ট হচ্ছে। ক্যাম্প প্র্রধান স্নেহভাজন রুমেনকে জড়িয়ে কাঁদতে লাগল। সে রুমেনের পিঠে হালকাভাবে হাত চাপড়াতে চাপড়াতে বলল-

“ওই হালারপুত, আর কতক্ষণ ঘুমাবি? হোস্টেলে কি শুধু ঘুমানোর লাইগা আইছস নি?” রুমেন চোখ মেলে দেখল হোস্টেলের দাদাভাই আর দুই ক্লাসের বড় সাইফুল ভাই তার পিঠে চাপড় দিয়ে জাগাচ্ছে। ভয়ে তাড়াতাড়ি বিছানা থেকে উঠে টাইম দেখল, সকাল ৮টা বাজে। মোবাইলে টাইম দেখার সময় তারিখটাও দেখে নিল ০১ এপ্রিল, ২০১৪। এপ্রিলফুল ডে! স্বপ্নে দেখা কাহিনীটা মুহূর্তের মধ্যে তার মনটাকে আবার বিষাদে ভরে তুলল। স্বপ্নও মানুষকে এপ্রিলফুল দেয়!!!

About the author

সংবাদদাতা

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/2692

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>