«

»

এই লেখাটি 742 বার পড়া হয়েছে

Print this প্রকাশনা

ঘুণে ধরা জুম্ম আদিবাসী সমাজের কিছু কথা

য়েল য়েল আমা দেজ মোন-মুড়োগুন,
য়েল য়েল আমা দেজ ঝারানি,
রাঙা রাঙা মানজোর মনানি//
বঙ্গানুবাদঃ সবুজ সবুজ আমাদের দেশের পাহাড়-পর্বত,
সবুজ সবুজ আমাদের দেশের বন, রাঙা রাঙা মানুষের মন//

জনপ্রিয় এই চাকমা গানের মতই নির্ভেজাল আর সুন্দর ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষগুলোর মন । গেংহুলি গীতের মতই সরল ছিল মানুষের জীবন-যাপন । কিন্তু আজ সেই মনে ধরেছে পচন । চারদিকে ভোগবাদী চেতনা আর রাষ্ট্রযন্ত্র কর্তৃক আগ্রাসনে জুম্ম আদিবাসী সমাজের মধ্যে ধরেছে ভয়াবহ পচন । এই পচন রোধ করবে কে ?   ১৯০৮ সালে শ্রী সতিশ চন্দ্র ঘোষ “চাকমা জাতিঃ ইতিহাস ও ইতিবৃত্ত” বইয়ে লেখেন, “কিন্তু কেন জানি না, চাকমাদিগের চরিত্রে সংযমের একান্ত অভাব । অতি সহজে ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটে । স্কুলছাত্রদের মধ্যেও দেখিয়াছি, চাকমা বালকের অনেকে হইত অংক কষিতেছে, কিন্তু প্রথম চেষ্টা বিফল হইতেই “ন পারিম” বলিয়া ফেলিয়া রাখিল । বোধহয় সংযমেরই অভাবে চাকমাদিগের মধ্যে মিতব্যায়িতা একেবারেই নাই । নতুবা ইহারা যেরুপ পরিশ্রমী এবং উপার্জনক্ষম, বেশ সুখে স্বচ্ছন্দে সংসারযাত্রা নির্বাহ করিয়া যাইতে পারে । কিন্তু ভবিষ্যৎ চিন্তা ইহাদিগকে অতি সামান্যই আঘাত করে, তাহারা উপস্থিত সুখ-সম্ভোগে নিতান্ত ব্যগ্র হয় । শিক্ষিতদের মধ্যে কেহ কেহ সাক্ষাত বিলাতফেরত বাবু, চলা ফিরাও অনেকটা ইঙ্গবঙ্গদলসম্মত । ইহা ছাড়া, সাধারন চাকমাদিগের মধ্যেও এতদূর বিলাস ইচ্ছা প্রবেশ করিয়াছে যে, কেহ কেহ দোকানে উপস্থিত হইয়া প্রথমে “রাজা যে কাপড় পরেন” সেই পোষাক অনুসন্ধান করে ।” তিনি যদি সকল জুম্মদের নিয়ে লিখতেন তাহলে অবশ্যই এই মন্তব্যটি সকল জুম্ম আদিবাসীদের জন্যই করতেন । শ্রী সতিশ চন্দ্র ঘোষ ১৯০৮ সালে যেই কথাটি অনুধাবন করেছেন সেই কথাটি আমরা আজও অনুধাবন করতে পারিনি । তাইতো ভোগবাদী চেতনায় আকন্ঠ নিমজ্জিত থেকে আমরা ভুলতে বসেছি অধিকার কি জিনিস, কিভাবে অধিকার আদায় করতে হয় । এই ভোগবাদী চেতনা আগে এত পরিমাণে প্রকট ছিল না, কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্র খুব সূক্ষ কৌশলে এই চেতনাকে কাজে লাগিয়ে উন্মুক্ত আকাশ সংষ্কৃতির মাধ্যমে গোটা জুম্ম আদিবাসী সমাজকে করেছে অধিকার সম্পর্কে অসচেতন, আন্দোলন বিমূখ, ভোগবাদী আর জুম্ম যুব সমাজকে করেছে ট্রেন্ডি, ফ্যাশনেবল, নেশা ও জুয়ায় আকন্ঠ নিমজ্জিত আর জুম্ম রমনীরা স্টার প্লাস, স্টার জলসার সিরিয়াল বোঝে কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনী কর্তৃক সংগঠিত ১৩ টি গনহত্যার কথা বোঝে না, অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী ত্যুমাচিং মারমা, ক্লাশ ফোরের ছাত্রী সুজাতা চাকমাকে যখন ধর্ষনের পরে হত্যা করা হয় তখন তাদের আর্তচিৎকার জুম্ম রমণীদের হৃদয় স্পর্শ করে না । “কিন্তু এখনও তাহারা ইহা শিখিতে মনোযোগ দিতাছে না । প্রায় বিশ বৎসর পূর্বে অত্রত্য রাঙ্গামাতি গভর্নমেন্ট বিদ্যালয়ের তদানীন্তন হেডমাস্টার বর্তমানে পেন্সন প্রাপ্ত শ্রীযুক্ত রামকমল দাস মহোদয় এই স্কুলের শাখা স্বরুপে গভর্নমেন্ট ব্যয়ে কুম্ভকার, কর্মকার ও সূত্রধর নিযুক্ত করিয়া একটি শিল্পবিদ্যালয় খুলিয়াছিলেন । কিন্তু স্থানীয় কতিপয় সম্ভ্রান্ত লোকের ঔদাসিন্যে অচিরে তাহার অস্থিত্ব বিলুপ্ত হয় । হায় ! তাহা এতদিন জীবিত থাকিলে অনেক শুভফল প্রদান করতো । জাতীয় নেতৃবর্গের এই ত্রুটির নিমিত্ত সমাজকে আরও বহুকাল কষ্ট পাইতে হইবে (তথ্যসূত্রঃ চাকমা জাতিঃ ইতিহাস ও ইতিবৃত্ত) ।” শ্রী সতিশ চন্দ্র ঘোষ ১৯০৮ সালে মন্তব্য করে গিয়েছিলেন বহুকাল এই ত্রুটির ফল ভোগ করতে হবে । সেই ফল যে শত বছরেও শেষ হবেনা, তা যদি তিনি অনুমান করতে পারতেন তাহলে পুরো জুম্ম জাতিকে মাথায় গোবর ভরা বলদ ছাড়া অন্য কিছু মন্তব্য করতেন বলে আমার মনে হয় না । জুম্মদের নিত্য প্রয়োজনীয় ব্যবহার্য সামগ্রীর মধ্যে দা, বটি ইত্যাদি অন্যতম । অথচ আমাদেরকে আজও বাঙালিদের দ্বারস্থ হতে হয় এই সব সামগ্রী ক্রয় করার জন্য । যে জাতি অন্য জাতির মুখাপেক্ষি, নিজস্ব উৎপাদন ব্যবস্থাহীন সেই জাতি পৃথীবিতে বেশিদিন ঠিকতে পারেনা । এখন পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী জুম্ম আদিবাসীদের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করছে অনেকগুলো এনজিও, তাদের মধ্যেও জুম্ম কামার, কুমার তৈরির ব্যপারে তেমন কোন আগ্রহ দেখা যায় না । তাছাড়া, জুম্মদের মধ্যে যারা সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও আর্থিকভাবে সচ্ছল তাদের মধ্যেও তেমন কোন লক্ষন দেখা যায় না এই সমস্যাটির ব্যাপারে চিন্তা করতে । না জানি, সাধারন জুম্মদেরকে আরো কতবছর সেই আগেরকার বিত্তবানদের করা ভুলের মাশুল গুনতে হবে ! এরশাদ সরকারের সময় তিনি শিক্ষিত জুম্ম আদিবাসীদেরকে চাকরি নামক এক বাঁধনে আবদ্ধ করেছিলেন যাতে এই শিক্ষিত শ্রেণী শান্তিবাহীনিতে যোগ দিতে না পারে, যাতে মধ্যবিত্ত শ্রেণী নামে সুবিধাবাদী একটি শ্রেণী তৈরি হয় । তিনি অনুধাবন করেছিলেন শিক্ষিত জুম্মদেরকে চাকরির বন্ধনে যত বেশি পরিমাণে আবদ্ধ করা যাবে তত বেশি পরিমাণে ভোগবাদীতা এদের মধ্যে প্রবেশ করানো যাবে । মধ্যবিত্ত শ্রেণী না পারে সইতে আর না পারে আন্দোলন, প্রতিবাদ করতে । এরা সবসময় চেষ্টা করে ঝামেলা এড়িয়ে চলার । অন্যায়ের প্রতিবাদ করাটাকেও এই শ্রেণী মনে করে ঝামেলার অংশ । এরশাদের আমলে সেই শুরু হয়েছিলো যা আজো প্রবাহমান । বর্তমান শিক্ষিত জুম্ম আদিবাসী শ্রেণী এখন দৌড়াচ্ছে চাকরি নামক সোনার হরিনের পিছে । শিক্ষকতা পেশা একটি মহান ও সন্মানীয় পেশা । এম. এন. লারমা পার্বত্য চট্টগ্রামে বিপ্লব শুরু করেছিলেন প্রথমে শিক্ষকতা পেশা দিয়ে । তিনি বুঝতে পেরেছিলেন জুম্মরা যদি শিক্ষিত না হয় তাহলে চিরদিনই অধিকার সম্পর্কে অসচেতন থেকে যাবে; আর ঘটানুঘটিক শিক্ষার দ্বারা সেই সচেতনতা কোনদিনই আসবে না । তাই তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামে শিক্ষার আলো জ্বালানোর উদ্দেশ্যে হাতে তুলে নিয়েছিলেন শিক্ষা বিস্তারের মশাল । এম. এন. লারমা ও তার সহচরদের হাতে শিক্ষা পাওয়া ছাত্র-ছাত্রীরা হয়েছিল অধিকার সম্পর্কে সচেতন, পরবর্তীতে তাদের মধ্যে অনেকেই যোগ দিয়েছিলেন শান্তিবাহিনীতে । তাইতো এম. এন. লারমার হাত ধরে শুরু হওয়া সেই বিপ্লবের অন্য আর একটা নাম হয়ে গিয়েছিল টিচার্স রেভ্যুলেশন বা শিক্ষক বিপ্লব । কিন্তু বর্তমানে জুম্মদের কাছে শিক্ষকতা আর পেশা নয়, অন্য দশটা চাকরির মত একটা চাকরি । বর্তমান জুম্ম ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে এমন কাউকে খুজে পাওয়া যাবে না যার ভবিষ্যত লক্ষ্য শিক্ষক হওয়া । তার বদলে তাদের লক্ষ্য থাকে কিভাবে ডাক্তার হব, কিভাবে ইঞ্জিনিয়ার হব, কিভাবে উপজাতি কোটায় কোটাবন্ধি হয়ে বিসিএস ক্যাডার হব, কিভাবে দুই হাতে টাকা কামাব, গাড়ি-বাড়ি, ব্যাঙ্ক ব্যালেন্সের মালিক হব । তারপরেও জুম্মদের মধ্যে অনেকেই শিক্ষকতা করছেন । কিন্তু কারা করছেন ? একটাই উত্তর; যারা অন্য চাকরি জুটাতে পারেনি তারাই শিক্ষকতা করছেন । এখন বি. এ., এম. এ. পাশ করা জুম্মদের লক্ষ্যই থাকে কিভাবে ফুড অফিসে চাকরি পাব, কিভাবে ডিসি অফিসে চাকরি পাব, কিভাবে ব্যাঙ্কের ম্যানেজারের পদটি বাগিয়ে নেব এই জাতীয় চিন্তা ভাবনা । কারন এইসব চাকরিতে ঘুষ আছে যে ! শিক্ষকতা পেশায় তো ঘুষ নেই, বেতন কম । কিন্তু কেউ আর বুঝার চেষ্টা করেনা শিক্ষকতা পেশার মত মহান ও সন্মানের পেশা পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই । আমার আশেপাশের অনেকজনকেই দেখেছি যারা প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকের চাকরি পাওয়ার পরে দুর্গম এলাকায় স্কুল হওয়ার কারনে ঠিকমত স্কুলে যান না । তার বদলে সেভেন-এইট পাশ কাউকে মাসিক কিছু টাকার বিনিময়ে শিক্ষকতার চাকরি বর্গা দিয়ে দেন । অথচ সকাল হলেই নমঃ নমঃ সন্ধ্যা হলে নমঃ নমঃ । স্কুলে ঠিকমত না পড়িয়ে মাস শেষে বসে বসে বেতন তোলাটা তাদের কাছে পাপ বলে মনে হয় না, নিজের দায়িত্ব ঠিকমত পালন না করে দুর্নীতি করে মাস শেষে বেতন তোলাটা তাদের কাছে অপরাধ বলে মনে হয় না । এরা দুর্ণীতির মাধ্যমে আয় করা পাপের টাকা ধর্মিয় প্রতিষ্টানে দান করে, ধর্মের প্রলেপ দিয়ে দুর্নীতিটাকে হালাল করার জন্য । আর তাদের দেখে লোকজনও বাহবা দেয় আঃহা কত বড় ধার্মিক ! এদের এই ধরনের কার্যকলাপ দেখে মনে হয় দুর্ণীতির মাধ্যমে আয় করা পাপের টাকাকে জায়েজ করার জন্য ধর্মিয় প্রতিষ্টানে ঘুষ দিচ্ছে । অথচ এদের দায়িত্ব হল ছাত্র-ছাত্রীদেরকে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষের মত মানুষ হিসেবে তৈরি করা । শিক্ষকতার মত মহান পেশার সাথে জড়িতদেরই যদি এই অবস্থা হয় তাহলে সেই জাতি উন্নত হবে কিভাবে ? মানুষগুলো অধিকার সচেতনই বা হবে কিভাবে ? এইসব শিক্ষকের দ্বারা শিক্ষা পাওয়া ছাত্র-ছাত্রীগুলোও কোনদিনই সুশিক্ষা পাবে না, শিক্ষার নামে যা পাবে তা হল সার্টিফেকেট সর্বোচ্চ শিক্ষা । শিক্ষার উদ্দেশ্য হল জ্ঞান অর্জন, আর শিক্ষকের কাজ একজন শিক্ষার্থীকে জ্ঞানার্জনে সাহায্য করা । কিন্তু বর্তমানে জুম্ম আদিবাসীদের কাছে শিক্ষার অর্থ হল মোটা মোটা নাম্বার যোগে কিছু সার্টিফিকেট জোগাড় করা যাতে পরবর্তীতে মোটা বেতনের একটা চাকরি যোগাড় করা যায় । শিক্ষকদের কাজও যেন, জ্ঞানার্জনে সাহায্য করা নয়, শিক্ষার্থীদেরকে পাঠ্যবই মুখস্ত করিয়ে পরীক্ষার খাতায় উগড়ে দিতে সাহায্য করা । জ্ঞানার্জন নয়, সার্টিফিকেট অর্জনই এখন মূল কথা । বর্তমান জুম্ম আদিবাসী সমাজের কাছে হাজার হাজার বই পড়ে জ্ঞান অর্জন করা একজনের চেয়ে শুধুমাত্র পাঠ্যবই পড়ে সার্টিফিকেট অর্জন করা একজন বলদের মূল্য অনেক বেশি । তাই সবাই ছুটছে রেসের ঘোড়ার মত, চাকরি নামক সোনার হরিনের পিছে । যে কোন আন্দোলনের সাথেই অর্থ নামক শব্দটি ঔতপ্রোতভাবে জড়িত । শুধুমাত্র আবেগ আর প্রেম দিয়ে কোন আন্দোলন সফলতা পেতে পারেনা । আপনি সশস্ত্র বিপ্লব বা রাজপথের আন্দোলন যেই পথেই হাটেন না কেন সেই আন্দোলন বিফলে যেথে পারে শুধুমাত্র পর্যাপ্ত অর্থ না থাকার কারণে । ভারত, মায়ানমার, আমেরিকা, চিন, রাশিয়া, পাকিস্তান যেই দেশই আপনাকে সাহায্য করুক না কেন নিঃস্বার্থভাবে কেউই আপনাকে সাহায্য করবেনা । অর্থ, অস্ত্র যা দিয়েই সাহায্য করুক না কেন, আপনি পরিনত হবেন তাদের ক্রীড়ানকে, করতে হবে তাদের স্বার্থের বাস্তবায়ন । তখন আপনার আন্দোলন চলবে তাদের আঙুলের ইশারায় । আপনাকে বাঁয়ে হেলতে বললে বাঁয়ে হেলতে হবে আর ডানে হেলতে বললে ডানে হেলতে হবে । কিন্তু আপনার যদি আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ থাকে তখন আপনার সাহায্যকারী বন্ধুর যেমন অভাব হবে না, তেমনি অস্ত্রেরও অভাব হবে না । সেই জন্য প্রয়োজন জুম্মদের অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করা । অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করার জন্য প্রয়োজন চাকরির পাশাপাশি জুম্ম ব্যবসায়ী শ্রেণী সৃষ্টি করা । জুম্মদের মধ্য থেকে যে সব ব্যবসায়ী রয়েছেন তাদের সংখ্যাও অতি নগণ্য । বর্তমান শিক্ষিত শ্রেণী ব্যবসার কথা বললে, বলে পুজি নেই । আমরা স্কুল-কলেজে পড়ে আসা শিক্ষাকে জীবনে কাজে লাগায় না আর সার্টিফিকেট সর্বোচ্চ শিক্ষিত হওয়ার কারণে ভুলে যায়, “ছোট ছোট বালুকণা, বিন্দু বিন্দু জল, গড়ে তোলে মহাদেশ, সাগর অতল” । আমার এক বন্ধুকে বলেছিলাম, বিএ পাশ করে বেকার বসে আছিস কেন ? ব্যবসায় নেমে পর । যদি পাঁচ হাজার টাকা পুজি থাকে তো সেই পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে ব্যবসায় নেমে পর । প্রয়োজনে মরিচের ব্যবসা শুরু কর । আমার সেই বন্ধুটি উত্তর দিয়েছিল, বিএ পাশ করেছি কি মরিচ ব্যবসা করার জন্য ? আমরা এক লাফে গাছে উঠতে চাই, যার কারণে ব্যবসার প্রতি আমাদের এই মানষিকতা । তোমার যদি পাঁচশ টাকা পুঁজি থাকে তাহলে সেই পাঁচশ টাকা দিয়ে ব্যবসায় নেমে পর । এমন একটা ব্যবসা খুজে বের কর যেই ব্যবসাটা পাঁচশ টাকা দিয়েও শুরু করা যায়, আস্তে আস্তে বড় হতে দোষ কোথায় ? বর্তমানে বাংলাদেশের যত বড় বড় শিল্পপতি রয়েছেন তাদের সবাই শূন্য থেকে আস্তে আস্তে আকাশ ছুয়েছেন । চোখের সামনেই রয়েছে এমন অনেক উদাহরণ । স্কয়ার গ্রুপের মালিক প্রয়াত স্যামসন এইস চৌধুরি ঔষদের ব্যবসা শুরু করেছিলেন মাত্র কয়েক হাজার টাকা দিয়ে, অথচ আজ তার কোটি কোটি টাকার ব্যবসা । আবুল খায়ের গ্রুপের মালিক বিড়ি বানিয়ে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করতেন, অথচ আজ তার নামে শাহ সিমেন্ট, আবুল খায়ের স্টিল সহ অনেকগুলো ব্যবসা । আজাদ প্রোডাক্টের মালিক তার ব্যবসা শুরু করেছিলেন মাত্র আট টাকা দিয়ে । মোল্লা সল্ট, ক্রাউন সিমেন্টের মালিক খবিরউদ্দিন মোল্লা তার ব্যবসা শুরু করেছিলেন কাগজের টোঙ্গা বানিয়ে । বিআরবি ক্যাবল ও কিয়াম মেটালের মালিক মজনু মিঞা তার ব্যবসা শুরু করেছিলেন একটা ভাঙরির দোকান থেকে । আকিজ গ্রুপের মালিক তার ব্যবসা শুরুর প্রথম দিকে হাত দিয়ে বিড়ি বানিয়ে বিক্রি করতেন; অথচ আজ আকিজ ফুড, আকিজ সিমেন্টসহ অনেকগুলো ব্যবসার মালিক । এমন আরো অনেক উদাহরণ রয়েছে চোখের সামনে, তবুও কেন পুঁজি নিয়ে চিন্তা ? পার্বত্য চট্টগ্রামে সেটেলার বাঙালিরা একটা মাত্র বালিশ আর ছেড়া কম্বল নিয়ে এসেছিল, অথচ ব্যবসা করে আজ তাদের অনেকেই কোটিপতি । তাহলে আমরা জুম্ম আদিবাসীরা এই পার্বত্য চট্টগ্রামের ভুমিজ সন্তান হয়েও কেন ব্যবসা করে সুফল পাবো না ? এর উত্তর খুঁজে নিতে হবে আমাদেরকেই । পার্বত্য চট্টগ্রামের মধ্যে রয়েছে অপার প্রাকৃতিক সম্পদ । বাঁশ, কাঠের যেই ব্যবসাটা রয়েছে সেই ব্যবসাটাও ঠিকমত ধরতে পারিনি আমরা । জঙ্গল থেকে বাঘ-ভাল্লুকের আক্রমণ, সাপ-মশার কামড় উপেক্ষা করে বাঁশ, কাঠ কেটে নিয়ে এসে যেই লোকটি বিক্রি করছে সে একজন জুম্ম । কেটে নিয়ে এসে বিক্রি করা সেই জুম্মটির কাছ থেকে কিনে নিচ্ছে অপর একজন মধ্যসত্বভোগী জুম্ম আদিবাসী ব্যবসায়ী; তারপর সেই ব্যবসায়ীটি বিক্রি করছে একজন বাঙালি ব্যবসায়ীর কাছে; আর সেই বাঙালি ব্যবসায়ীটি কম দামে কিনে ঢাকা, চট্টগ্রামে নিয়ে গিয়ে চড়া দামে বিক্রি করছে । ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক সম্পদ দিয়ে ব্যবসা করে টাকার পাহাড় গড়ে তুলেছে সেটেলার বাঙালিরা । আর জুম্ম ব্যবসায়ীদেরকে মধ্যসত্বভোগী ব্যবসায়ী হয়েই তুষ্ট থাকতে হয়েছে সব সময় । শুধুমাত্র বাঁশ-কাঠের ব্যবসায় নয়, ঝাড়ু, কাঠাল, আনারস, আদা, হলুদের ব্যবসার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রজোয্য । এখন প্রশ্ন হল সেটেলার বাঙালিরা পারলে আমরা কেন পারছিনা ? কারন হল ব্যবসার প্রতি জুম্মদের মানষিকতা, সেটেলারদের প্রতি রাষ্ট্রযন্ত্রের সহায়ক ভুমিকা আর জুম্ম আদিবাসীদের চাকরির পেছনে দৌড়ানো । যেই সব মধ্যসত্বভোগী জুম্ম ব্যবসায়ী রয়েছেন তাদের বেশির ভাগই অশিক্ষিত; ফলে ঢাকা বা চট্টগ্রামে গিয়ে ব্যবসা করাটা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠে না । ঢাকা বা চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী শ্রেণী সংখ্যাগুরু বাঙালি সম্প্রদায়ের লোক হওয়ার কারনে জুম্ম ব্যবসায়ীদের ঢাকা বা চট্টগ্রামে তাদের শুভাকাঙ্খি বাঙালি বন্ধু-বান্ধব না থাকার কারণে তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না পার্বত্য চট্টগ্রামের গন্ডি পেরিয়ে ঢাকা বা চট্টগ্রামে গিয়ে ব্যবসা করা । অন্য দিকে জুম্ম সমাজের মধ্যে বিয়ের বাজারে চাকরি ওয়ালা জামাইদের কদর বেশি হওয়ার কারনে শিক্ষিত যুব সমাজের লক্ষ্যই থাকে মোটা বেতনের একটা চাকরি যোগাড় করা । তাছাড়া ব্যবসা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকা আর সার্টিফিকেটের যোগ্যতা অনুযায়ী পছন্দমত ব্যবসায় নেমে পরার মত পুজির অভাবেও শিক্ষিত জুম্মদের মধ্য থেকে ব্যবসায়ী তৈরি হচ্ছে না । অথচ হাঁস-মুরগির খামার, গরু মোটা-তাজাকরন, ছাগলের খামার ইত্যাদির মাধ্যমেও জুম্ম ব্যবসায়ী শ্রেণী তৈরি হতে পারত । কিন্তু জুম্মরা লেখাপড়া শিখে মানুষ না হয়ে ফুলবাবু হওয়ার কারনে ব্যবসা করার মত শিক্ষিত জুম্ম আদিবাসী ব্যবসায়ী শ্রেণী তৈরি হচ্ছে না । চলতি ম্যাগাজিনের সম্পাদক সাহেব আমাকে বার বার বলেছিলেন আমি যেন ধর্মের বিষয়ে না লিখি, কারণ এটি খুবই স্পর্শকাতর ইস্যু । কিন্তু আমাকে যে লিখতেই হবে, হতে হবে সত্যের মুখোমুখি । কারন ঘুণে ধরা জুম্ম আদিবাসী সমাজের কথা বলতে গেলে ধর্মের কথাটিও আসবে অবধারিতভাবেই । পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম আদিবাসীদের বেশির ভাগই বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী ফলে বৌদ্ধ ধর্মের কথাটিই আসবে প্রথমে । বর্তমান পৃথিবীর মধ্যে যতগুলো ধর্ম আছে তার মধ্যে অন্যতম নিরীহ আর শান্তির ধর্ম হল বৌদ্ধ ধর্ম । যদিও বৌদ্ধ দর্শন আর বৌদ্ধ ধর্মের মধ্যে অনেক তফাৎ । অনেকের মতে বুদ্ধ কোন ধর্ম প্রচার করেননি, তিনি দর্শন প্রচার করেছিলেন যা পরবর্তিতে ধর্মে রুপান্তর করা হয় । বৌদ্ধ দর্শনে বুদ্ধ মুর্তির পুজা, আত্মা ইত্যাদি অলৌকিক বিষয়কে অস্বীকার করা হয়েছে । আর ধর্ম অনেক অলৌকিক ব্যাপারে সমর্থন দান করে । বৌদ্ধ দর্শন মতে বুদ্ধের মূল সিদ্ধান্ত চারটি । ১. ইশ্বরকে অস্বিকার করা; অন্যথায় “মানুষ স্বয়ং নিজের প্রভু”-এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা হয় । ২. আত্মাকে নিত্য স্বীকার না করা, অন্যথায় নিত্য একরস মানলে তার পরিশুদ্ধি এবং মুক্তির কোনো প্রশ্নই ওঠে না । ৩. কোনো গ্রন্থকে স্বঃত প্রমাণ হিসেবে স্বীকার না করা, অন্যথায় বুদ্ধিবৃত্তি এবং অভিজ্ঞতা মূল্যহীণ হয়ে পড়ে । ৪. জীবনপ্রবাহকে এই শরীরের মধ্যেই সীমিত মনে করা, অন্যথায় জীবন এবং তার নানা বৈচিত্র কার্য-কারন প্রকৃয়ার মাধ্যমে উৎপন্ন না হয়ে স্রেফ এক আকস্মিক ঘটনা রুপে প্রতিভাত হবে (তথ্যসূত্রঃ বৌদ্ধ দর্শন) । বৌদ্ধ ধর্মের মূলমন্ত্র হল, “অহিংসা পরম ধর্ম” । নিয়ম নীতির মধ্যে রয়েছে প্রাণী হত্যা মহাপাপ, প্রাণী ব্যবসা করা মহাপাপ । কেউ যদি তোমার একগালে চড় লাগায় তাহলে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ করবে না, প্রয়োজনে অন্য গালটিও এগিয়ে দাও চড় মারার জন্য । ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতায় সিদ্ধার্থ গৌতম নিজে জিতলে দেবদত্বের সাথে শত্রুতা বাড়বে বলে তিনি দেবদত্বকে জিতিয়ে দিয়ে নিজে হেরে যান । শত্রুতার দ্বারা শত্রুতার উপশম হয় না, একমাত্র মৈত্রীতার দ্বারায় শত্রুতার উপশম সম্ভব । সহিংস হয়ো না, মৈত্রীভাব পোষন কর এমন শিক্ষায় পাচ্ছি সিদ্ধার্থ গৌতমের জীবনী থেকে । তাই আমরাও হব অহিংসার এক একজন মূর্ত প্রতীক; সেটেলার বাঙালিরা জবাই করলেও বলব মৈত্রী মৈত্রী মৈত্রী । সেটেলাররা বাড়ি সুদ্ধ পুরো পাড়াটি জ্বালিয়ে দিলেও বলব মৈত্রী মৈত্রী মৈত্রী । আশা করে থাকব সেটেলাররা তাদের কৃতকর্মের শাস্তি অবশ্যই পাবে । ইহজনমে না হলেও পরজন্মে অবশ্যই পাবে । আর আমাদের এরুপ মানষিকতা দেখে শাসকগোষ্ঠী হাততালি দেয়, বলে, সাব্বাস জুম্ম জনতা; এই মৈত্রীভাবটাকে ধরে রাখ, আরো বেশি বেশি মৈত্রীভাব পোষন কর, যাতে তোমাদেরকে ধ্বংস করতে আমার বেশি বেগ পেতে না হয় । মুসলিম শাসক ইকতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বকতিয়ার খিলজি যখন ভারতবর্ষ আক্রমন করেন তখন বৌদ্ধ ধর্মানুসারীরা সেই আক্রমন প্রতিহত করার চেষ্টা করেনি আর বৌদ্ধ ভিক্ষুরাও বুদ্ধ মুর্তির সামনে ছিল ধ্যানে মগ্ন । যার ফলে ইকতিয়ারের কোন সমস্যা হয়নি শত শত বৌদ্ধ ভিক্ষুর শিরচ্ছেদ করতে । পরবর্তিতে যারা বেঁচে ছিল তারা বাধ্য হয় ইসলাম ধর্ম গ্রহনে আর বাকিরা মিশে যায় হিন্দু ধর্মের সাথে (তথ্যসূত্রঃ ভারতে বৌদ্ধ ধর্মের উত্তান আর পতন) । পার্বত্য চট্টগ্রামেও জুম্ম আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য এমন কোন মূহুর্ত ধেয়ে আসছে না তো ? মৈত্রী নিয়ে পরে থাকা বৌদ্ধ ধর্মানুসারী জুম্মদের কাছে প্রশ্নটি তোলা রইল । বর্তমানে বৌদ্ধ ধর্মানুসারী কিছু কিছু জুম্মদের মধ্যে মৈত্রীভাব এতই প্রবল যে, এরা মানব দেহের জন্য ক্ষতিকারক মশাটিও পর্যন্ত মারে না । এমন মৈত্রীভাব পোষনকারী একজনের কাছে প্রতিবাদ, প্রতিরোধ, প্রতিশোধ আশা করাটা নিশ্চয় বোকামির পরিচায়ক । যখন কেউ তোমার ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে দিচ্ছে, তোমার বোনটিকে ধর্ষন করছে তখনও এমন মৈত্রী নিয়ে পরে থাকা নপুংসকতার পরিচয় ছাড়া অন্য কিছু হতে পারে না । ভারতবর্ষ আরো অনেক আগে ব্রিটিশদের পরাধীনতা থেকে মুক্ত হতে পারত; পারেনি একমাত্র অহিংসার মুখোশধারী মহাত্মা গান্ধীর কারনে । তিনি ছিলেন সুবিধাবাদী, ব্রিটিশদের সোল এজেন্ট । যখন সারা ভারতবর্ষ জুড়ে বিপ্লবীদের হাতে ব্রিটিশরা মার খেতে খেতে পর্যুদস্ত ঠিক তখনই অহিংসার বানী নিয়ে আবির্ভাব ঘটে মহাত্মা গান্ধীর । যার কারণে আন্দোলনে পরে ভাটা, হয়ে যায় স্থিমিত । গান্ধী ব্রিটিশদের এজেন্ট ছিলেন বলেই ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের সূর্যসন্তান নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু, মাস্টারদা সূর্যসেন, ক্ষুদিরামের মত বীর সেনানিদের আখ্যায়িত করেছিলেন সন্ত্রাসী হিসেবে । পরে জনগন আস্তে আস্তে ফুঁসে উঠছে দেখে ব্রিটিশরা তরিগড়ি করে ভারতবর্ষ ছেড়ে চলে যায় আর গান্ধীও হয়ে উঠেন অহিংস আন্দোলনের এক অন্য নাম । ভারতবর্ষ স্বাধীন হওয়ার পেছনে গান্ধীর অহিংস আন্দোলন নয়, মূল কারন ছিল জনগনের মনে দানা বাঁধা অনেক দিনের ক্ষোভ (তথ্যসূত্রঃ গান্ধীজির অপকর্ম) । বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামে একদিকে কট্টরপন্থী মুসলিম জনগোষ্ঠীর উত্তান আর অন্যদিকে বন ভান্তে, নন্দপাল ভান্তে, উছালা ভান্তে ইত্যাদি ভান্তের সংস্পর্শে এসে জুম্ম জনগোষ্ঠীর মধ্যে মৈত্রীময় বৌদ্ধ ধর্মের বিস্তার । ফলে জুম্ম আদিবাসীরা আন্দোলন, সংগ্রামের দিকে না ঝুকে, বেশি ঝুকছে বৌদ্ধ মন্দিরে গিয়ে প্রার্থণা করার দিকে । এতে লাভ হচ্ছে কতটুকু তা আমাদেরকে অবশ্যই ভেবে দেখতে হবে । বর্তমান চাকমা রাজা ব্যারিষ্টার দেবাশিষ রায় একবার বক্তব্য দিতে গিয়ে বলেছিলেন, “পার্বত্য চট্টগ্রামে অফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদ না থাকতে পারে কিন্তু যা আছে সেই সম্পদের যথাযথ ব্যবহার যদি আমরা নিশ্চিত করতে পারি তাহলে পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিশ্বের উন্নত শহরগুলোর মত শক্তিশালি অর্থনৈতিক ভিত্তির একটি এলাকায় পরিণত করতে বেশি দিন সময় লাগবে না” । হ্যা, আমরা যদি আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদের যথাযত ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারি তাহলে অবশ্যই বেশি দিন সময় লাগবে না পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি শক্তিশালি অর্থনৈতিক ভিত্তির একটি এলাকায় পরিণত করতে । ফলজ বাগান, ঔষুধি গাছের বাগান, শাক-সবজির ক্ষেত করতে হবে । কোন জমি যেন পতিত না থাকে সেই দিকে নজর দিতে হবে । যেই জমিতে যা উপযোগী তা চাষ করতে হবে । পার্বত্য চট্টগ্রামে যে পাহাড়, বন রয়েছে সেখানে ঘাসের যথেষ্ট প্রাচুর্যতা রয়েছে । ঘাসের এই প্রাচুর্যতাকে কাজে লাগিয়ে আমরা গরু, ছাগলের খামার প্রতিষ্টা করেও মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামের চেহারা পাল্টিয়ে দিতে পারি । কিন্তু এখানেও বাধ সেধেছে বৌদ্ধ ধর্ম । ভান্তেরা বলছেন, প্রাণী ব্যবসা মহাপাপ । ধর্ম বাঁচলে জাত বাঁচবে । তাই আমরা গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি পালন করব না । প্লিজ ধর্মকে অন্যপাশে সরিয়ে রাখুন । ধর্ম বাঁচলে কখনোই জাত বাঁচে না, জাত বাঁচলেই না তবে ধর্ম পালন করার মানুষ থাকবে । আর জাতই যদি না বাঁচে তাহলে ধর্মটা পালন করবে কে ? ভারতে প্রবল পরাক্রমে প্রতিষ্টা পাওয়া বৌদ্ধ ধর্মের দীপ আজ কেন নিভু নিভু সেই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে হবে আমাদের । তা নাহলে জুম্ম জাতির ধ্বংস অনিবার্য । জাতির অস্থিত্ব রক্ষার প্রয়োজনেই আমাদেরকে এগুলো করতে হবে । আজ অব্দি জুম্মদের মাঝে তেমন কোন উদ্দোক্তা ব্যবসায়ী সৃষ্টি হয় নি । জুম্মদের মাঝে উদ্দোক্তা ব্যবসায়ীরা দাঁতের মাজনের গন্ডি আজ অব্দি পেরোতে পারেনি । ব্যবসাতে নামার আগে দেখি কোন ব্যবসাটা বর্তমান বাজারে চলছে বেশি; যাচাই বাচাই করে আমরা সেই ব্যবসাতেই ঝাপ মারি । নিজের মেধা আর বুদ্ধি খাটিয়ে আমরা নতুন কোন ব্যবসা উদ্ভাবন করতে পারি না; তাই উদ্দোক্তা সৃষ্টি থেকে যায় অধরাই । আগে এদেশের কেউ চিন্তাও করেনি পানি বিক্রি হতে পারে । অথচ মিনারেল ওয়াটারের বোতল আজ আমাদের নিত্যসঙ্গি । আগে এদেশের কেউ চিন্তাও করেনি মানুষের চুলের বিকিকিনি হতে পারে । অথচ আজ চুল দিয়ে পরচুলা তৈরি করে বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে । আগে এদেশের কেউ চিন্তাও করেনি দেখলেই গা গিনগিন করা কেঁচোর ব্যবসা হতে পারে । অথচ আজ কেঁচোর ব্যবসা করে খুলনার একজন কেঁচো চাষী লাখ টাকার মালিক । আগে এদেশের কেউ চিন্তাও করেনি কচুর লতি বিদেশে রপ্তানি করে কোটি টাকা আয় করা সম্ভব । অথচ এখন প্রতি বছর বিদেশে কচুর লতি রপ্তানি করে কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা আয় হচ্ছে । আগে এদেশের কেউ চিন্তাও করেনি রান্নার পরে ফেলে দেওয়া ছাই বিক্রি হতে পারে । অথচ আজ ঢাকায় গ্রামীণ ছাইয়ের প্যাকেট কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে দেদারছে । তাহলে আমাদের জুম্মদের মধ্যে কেন উদ্দোক্তা সৃষ্টি হবে না ? চিন্তা করুন, মাথাটাকে কাজে লাগান । এমন একটা ব্যবসা উদ্ভাবন করুন যা বাজারে চলবে ভাল অথচ আজ অব্দি সেই ব্যবসাতে কেউ হাত দেয়নি । বন্যপ্রাণী সংরক্ষন আইনের একটি বিধিতে হরিনের বানিজ্যিক খামার স্থাপনের কথা বলা হয়েছে । বন্যপ্রাণী সংরক্ষন আইনের বিধি মোতাবেক চলে বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে লাইসেন্স নিয়ে হরিনের খামার স্থাপন করা যায় কিনা যাচাই করে দেখুন । সেমে আলু(কাসাভা) দিয়ে অন্য কোন কিছু প্রস্তুত করা যায় কিনা ভাবুন । শুকরের মাংস প্রকৃয়াজাত করে বিদেশে রপ্তানি করা যায় কিনা যাচাই করুন । প্রতি বছর সংরক্ষণাগারের অভাবে প্রচুর পরিমাণে আম, কাঠাল, আনারস নষ্ট হয়ে যায় । তাই পার্বত্য চট্টগ্রামে একটি সংরক্ষণাগার স্থাপন করার কথা বিবেচনা করুন । পার্বত্য চট্টগ্রামের নদী আর ছড়াগুলি হাইড্রো ইলেকট্রিক পাওয়ার প্লান্ট স্থাপনের পক্ষে অত্যন্ত উপযোগী । তাই এইসব খরস্রোতা ছড়ায় ছোট আকারের হাইড্রো ইলেকট্রিক পাওয়ার প্লান্ট বসানোর কথা চিন্তা করুন । মোট কথা উদ্যোগ নিন, উদ্দোক্তা হোন । অর্থনৈতিক মুক্তি ছাড়া আন্দোলন যেমন গতি পাবে না, তেমনি সাহায্যকারী শক্তির বলয় থেকে বেড়িয়ে আসাও সম্ভব হবে না । আমরা জুম্মরা চারদিকে অনেক অনুপ্রেরনার গল্প শুনি, পড়ি আর অনুপ্রাণিতও হই কিন্তু সেই অনুপ্রেরনার গল্পগুলি বাস্তব জীবনে কাজে না লাগায় না ফলে ব্যবসাতে নামার স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায় । আমাদেরকে এইসব অনুপ্রেরনার গল্প থেকে শিক্ষা নিয়ে বাস্তবে মাঠে নামতে হবে, করতে হবে স্বপ্নের সার্থক বাস্তবায়ন । নিম্নের জাতকটি অনেকেই পড়েছেন আবার হয়তো এখনো অনেকেই পড়েন নি । যারা পুজি নিয়ে চিন্তা করছেন, যারা ব্যবসাতে নামবেন বলে চিন্তা করছেন তাদের অনুপ্রেরনার উৎস হোক নিচের এই জাতকটি; জাতকটি পাঠকের জন্য সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরলাম ।

                                     চুল্লশ্রেষ্ঠী জাতক

পুরাকালে ব্রম্মদত্ব রাজার সময়ে বোধিসত্ব এক শ্রেষ্ঠী পরিবারে জন্মগ্রহন করেন । তখন তিনি চুল্লশ্রেষ্ঠী উপাধি পান । তিনি পরম বিদ্ধান ও বুদ্ধিমান ছিলেন এবং গ্রহ নক্ষত্রের অবস্থান দেখে গনণা করতে পারতেন । একদিন রাজদর্শন করতে যাওয়ার সময় পথে একটি মৃত ইদুর দেখে বলে উঠলেন, যদি কোন সদ্ববংশজাত ব্যক্তি এই মৃত ইঁদুর তুলে নিয়ে যায় তাহলে সে ব্যবসায় উন্নতি করবে । এই সময় ভদ্রবংশের এক নিঃস্ব যুবক বোধিসত্বের এই কথা শুনে মৃত ইঁদুরটি তুলে নিলেন । এই সময় এক দোকানদার তার পোষা বিড়ালের জন্য খাবার খুঁজছিল । সে এক পয়সা দাম দিয়ে যুবকের কাছ থেকে ইঁদুরটি কিনল । যুবক তখন এক পয়সার গুড় কিনে আর এক কলসী জল নিয়ে যে পথে মালাকারেরা বন হতে ফুল তুলে ফেরে সেই পথে বসে রইলেন । মালাকারেরা ক্লান্তভাবে সেখানে এসে বসলে যুবকটি তাদের প্রত্যেককে একপাত্র জল ও একটু করে গুড় খেতে দিল । তা খেয়ে তৃপ্ত হয়ে মালাকারেরা প্রত্যেকে এক মুঠো করে ফুল দিল । যুবকটি তখন সেই ফুল বিক্রি করে আরো বেশি গুড় কিনে পরদিন বাজারে গিয়ে মালাকারদেরকে গুড় ও জল খাওয়াল । মালাকারেরা তখন তাকে কতগুলি ফুটন্ত ফুলের গাছ দিল । এইভাবে ফুল ও ফুলের গাছ বিক্রি করে চারদিনের মধ্যেই তার আট টাকা পুঁজি হল । তারপর একদিন খুব ঝরবৃষ্টি হলে রাজার বাগানের অনেক গাছের ডালপালা ভেঙে পরল । বাগানের মালী সেইসব ডালপালা একা পরিষ্কার করতে পারছিল না । তারপর যুবক মালীর কাছে গিয়ে বলল, তুমি যদি আমাকে বিনামূল্যে এইসব ডালপালা দিয়ে দাও তাহলে আমি বাগান পরিষ্কার করে দেব । মালী তাতে রাজি হয়ে গেল । যুবক তখন পাড়ার ছেলেদের একটু করে গুড় খেতে দিয়ে বলল, তোমরা আমার সঙ্গে এস, বাগানটা পরিষ্কার করে দিই । ছেলেরা খুশি হয়ে যুবকের সঙ্গে ডালপালা পরিষ্কার করে রাস্তায় এনে জড়ো করে রাখল । কুম্ভকারেরা কাঠের অভাবে হাঁড়ি-কলসী পুড়তে পারছিল না । তারা নগদ ষোল টাকা ও কিছু হাঁড়ির বিনিময়ে ডালপালাগুলি কিনে নিল । সমস্ত খরচ বাদ দিয়ে যুবকের তখন চব্বিশ টাকা হাতে রইল । তখন বারাণসীতে পাঁচশ ঘেসেরে বাস করত । ঘেসেরেরা প্রতিদিন ঘাস কাটতে যেত । একদিন ঘেসেড়ারা ঘাস কাটতে গিয়ে পিপাসার্থ হয়ে পরলে যুবক তাদেরকে জল খাওয়াল । ঘেসেড়ারা বলল, ভাই তুমি আমাদের এত উপকার করেছ, বল আমরা তোমার কি উপকার করতে পারি ? যুবক বলল, এখন নয়, প্রয়োজন হলে বলব । এর মধ্যে যুবকের সঙ্গে এক স্থলপথ বণিক ও এক জলপথ বণিকের বন্ধুত্ব হয় । একদিন স্থলপথ বণিক যুবককে জানাল, কাল এক অশ্ব বিক্রেতা নগরে পাঁচশ অশ্ব নিয়ে আসবে । এই কথা শুনে যুবক ঘেসেড়েদের কাছে গিয়ে বলল, ভাইসব তোমরা কাল প্রত্যেকে আমাকে এক আঁটি করে ঘাস দেবে আর আমার ঘাস বিক্রি শেষ না হলে তোমরা কেউ ঘাস বিক্রি করবে না । ঘেসেড়ারা যুবকের কথামত কাজ করল । অশ্বব্যবসায়ী কোথাও ঘাস না পেয়ে যুবকের কাছ থেকে এক হাজার টাকা দাম দিয়ে পাঁচশ আঁটি ঘাস কিনে নিল । একদিন জলপথ বণিক জানাল, আগামীকাল একটি বড় জাহাজ মালপত্র নিয়ে বন্দরে আসবে । যুবক তখন দিন ভাড়ায় একটি গাড়ি নিয়ে তাতে চড়ে বন্দরে গিয়ে উপস্থিত হল । সেখানে সে জাহাজের সব মালপত্রের দাম ঠিক করে নিজের নামাঙ্খিত আংটি দিয়ে বায়না করল । অর্থাৎ সেই জাহাজের কোন মালামাল কিনতে হলে তার কাছ থেকেই কিনতে হবে । যুবকটি এবার বন্দরে তাঁবু খাটিয়ে শিবির করে কয়েকজন অনুচর নিয়ে থাকতে লাগল । সে তার অনুসরদের বলে দিল, কোন বণিক তার সাথে দেখা করতে আসলে যেন একজন একজন করে তিনজন আর্দালি সঙ্গে নিয়ে ভিতরে আনা হয় । এদিকে বন্দরে বড় জাহাজ এসেছে শুনে প্রায় একশো বণিক বন্দরে এসে উপস্থিত হয় । কিন্তু এসে শুনল কোন এক মহাজন একাই সমস্ত মালামাল বায়না করেছেন । তখন তারা খোজ নিয়ে যুবকের শিবিরে এসে উপস্থিত হল । বণিকেরা যুবকের শিবিরে এসে শিবিরের শিবিরের ঘটা আর আর্দালির ছড়াছড়ি দেখে ভাবল, এই যুবক নিশ্চয় অতুল সম্পদের অধিকারী । তারা এক একজন করে যুবকের সাথে দেখা করল এবং মালের এক এক অংশ পাবার জন্য এক হাজার টাকা লাভ দিতে রাজি হল । তারপর যুবকের নিজের যে অংশ ছিল সেই অংশও এক লক্ষ টাকা লাভে বিক্রি করে দিল । যুবক দুইলক্ষ টাকা লাভ করে বারাণসীতে ফিরে গেল । এভাবে সেই যুবক একটি মরা ইঁদুর দিয়ে ব্যবসা শুরু করে মাত্র চার মাসের মধ্যে বিপুল ধন লাভ করল । পরে সেই যুবক বারাণসীর মহাশ্রেষ্ঠীর খেতাব অর্জন করেন

:(তথ্যসূত্রঃ জাতক সমগ্র) ।

লেখাটি আমাদের লিটল ম্যাগাজিন হুচ্‌ -এ প্রকাশিত

About the author

জুম্মো এডিসন

আমি বস্তুবাদী নাস্তিক ।

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/2547

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>