«

»

এই লেখাটি 698 বার পড়া হয়েছে

Print this প্রকাশনা

জাতীয় সংসদ নির্বাচন: একটি ছোট চাওয়া

ফেসবুকেও নির্বাচনী প্রচারনার হাওয়া লেগেছে জোরেশোরে। ইতোমধ্যে দু’টো দল – জেএসএস (সন্তু লারমা) ও ইউপিডিএফ নির্বাচনী ইস্তেহার প্রকাশ করেছে। দু’দলই ১০ দফা করে প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেছে।ফেসবুক ও ব্লগের সৌজন্যে তাদের নির্বাচনী ইস্তেহার পড়ার সুযোগ পাচ্ছি। জেএসএস (এম এন লারমা)-র নির্বাচনী ইস্তেহার এখনো চোখে পড়েনি।আশা করছি, তারাও তাদের ইস্তেহার প্রকাশ করবেন।

উভয় দলের নির্বাচনী ইস্তেহার পড়ে দেখলাম। এর পাশাপাশি সব দলের (জেএসএস এম এন লারমাসহ) পোস্টার ও স্লোগানগুলো পড়ে দেখলাম। এখানে তাদের ইস্তেহার ও পোস্টারে উচ্চারিত স্লোগান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করার সময় নেই বলে কেবল দু’একটা মন্তব্য করছি।

জেএসএস (সন্তু লারমা) ও ইউপিডিএফ – উভয় দলের ইস্তেহারে কিছু কিছু ক্ষেত্রে তেমন কোন পার্থক্য নেই। যেমন, উভয় দল উগ্র জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ, ধর্মান্ধতা ও দুর্নীতিকে বিরোধিতা করবে। তবে জেএসএস ‘সন্ত্রাস নির্মূলের’ কথাও বলেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রেক্ষাপটে জেএসএস ‘সন্ত্রাস নির্মূলকরণ’ মানে কী হতে পারে সেটা সহজে অনুমেয়। গোটা বিশ্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট তার আধিপত্য বিস্তার করতে ‘সন্ত্রাস’ শব্দটি যে অর্থে ব্যবহার করে থাকে, আমি দৃঢ়ভাবে মনে করি, জেএসএস-এর কাছে সেই অর্থ বহন করবে না। প্রেক্ষাপট ভিন্ন। জেএসএস (সন্তু লারমা)-র ‘সন্ত্রাস নির্মূলীকরণ’-এর অর্থ কী তাদের কাছ থেকে ব্যাখ্যা পেলে ভালো হতো। শুধু জেএসএস (সন্তু লারমা) নয়, বাংলাদেশ সরকার তথা তৃতীয় বিশ্বের অনেক রাষ্ট্র মার্কিন ব্লকের শক্তিসমূহকে খুশী রাখতে কিংবা তাদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার অভিপ্রায়ে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান জাহির করে থাকে। তবে তারা ‘সন্ত্রাস নির্মূলীকরণ’ প্রত্যয় ব্যবহার করে না, তারা বলে ‘সন্ত্রাস দমন’। ‘নির্মূলীকরণ ও দমন’ পরস্পরের সাথে সমার্থক নয়। সে কারণে জেএসএস-এর ‘সন্ত্রাস নির্মূলীকরণ’ কথা শুনে আমার শংকা লাগে।কেন সেটার ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই।নির্মূলীকরণ-এর ফলাফল আমরা প্রতিনিয়ত দেখতে পাচ্ছি।

জেএসএস (সন্তু লারমা) ও ইউপিডিএফ-এর অবস্থান আরো কয়েকটি বিষয়ে অভিন্ন।যেমন, নারীর সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা ও যুব উন্নয়ন, পাহাড়ী বাঙালির মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়ন বিষয়ে উভয় দলই একমত।

জেএসএস (সন্তু লারমা)চুক্তি বাস্তবায়নে জোরালো ভূমিকা রাখার কথা বললেও এ ব্যাপারে তারা কী করবেন সে ব্যাপারে সুস্পষ্ট কোন কর্মসূচীর কথা বলা নেই। বিশেষ করে চুক্তির মৌলিক বিষয় ভূমি অধিকার প্রতিষ্ঠা, সেনা প্রত্যাহার, আভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু পুনর্বাসন ইত্যাদি ব্যাপারে নীরব। তবে জেএসএস শিক্ষা সংস্কৃতি, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কুটির শিল্প ইত্যাদি ব্যাপারে অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে।

তবে ব্যক্তিগতভাবে এই জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে জুম্ম রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে বেশি কিছু চাওয়া নেই। আমার ব্যক্তিগত চাওয়া হলো, এই নির্বাচনে সব দল পারস্পরিক সহনশীলতার পরিচয় দেবে, রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ইতিবাচক ধারা সূচনা করবে। আত্মঘাতী ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত বন্ধে তারা অঙ্গীকার করবে।

ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত বন্ধের অঙ্গীকার ভুলে যাবেন না।

ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত বন্ধের অঙ্গীকার ভুলে যাবেন না।

ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত বন্ধে কোন দল কী বলেছে সেটা বুঝার চেষ্টা করেছি। সত্যি কথা বলতে কী, জেএসএস (সন্তু লারমা)-এর এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট বক্তব্য নেই। তবে এটাকে তাদের ‘সন্ত্রাস নির্মূলীকরণ’ কর্মসূচীর সাথে মেলানো যেতে পারে। কেননা, জেএসএস (সন্তু লারমা) ইউপিডিএফকে রাজনৈতিক দল হিসেবে স্বীকার করে না। সন্ত্রাসী দল হিসেবে তা নিষিদ্ধ করতে সরকারের কাছে দাবী জানিয়ে আসছে। ইউপিডিএফর পাশাপাশি নতুন করে যুক্ত হয়েছে জেএসএস (এম এন লারমা)। উভয় দলই জেএসএস (সন্তু লারমা)-র কাছে সমান হিসেবে বিবেচিত। তা না হলে জেএসএস (এম এন লারমা)-র কর্মীরা নির্মূলীকরণ কর্মসূচীর আওতায় আসতো না।

এদিকে ইউপিডিএফ তার নির্বাচনী ইস্তেহারে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত বিষয়কে ‘পাহাড়ীদের মধ্যেকার রাজনৈতিক বিরোধ’ হিসেবে অভিহিত করেছে।ইউপিডিএফ অঙ্গীকার করেছে, যাতে এই বিরোধ উস্কে দিয়ে জুম্মদের অস্তিত্ব বিলুপ্ত করার ধ্বংসাত্মক নীতি বন্ধ করা হয় সে ব্যাপারে সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করবে। কিন্তু ইউপিডিএফ ঐক্যের জন্যে আহবান জানালেও তাদের নির্বাচনী ইস্তেহারে এরকম অস্পষ্ট অঙ্গীকার দেখে আমার খটকা লাগছে্। প্রথমত, আমার কাছে এই বিরোধটা ‘পাহাড়ীদের মধ্যেকার রাজনৈতিক বিরোধ’ নয়। সাধারণ পাহাড়ীরা এই বিরোধের সাথে জড়িত নয়। তারা রাজনৈতিক দলগুলোর বলির পাঁঠা মাত্র। এই বিরোধ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেকার বিরোধ। সংকীর্ণ অর্থে বললে, নেতাদের ব্যক্তিগত অহংবোধ ও জেদাজেদি থেকে সৃষ্ট বিরোধ, যেই বিরোধটাকে রাজনৈতিক বিরোধ হিসেবে লেবেল দেওয়া হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, এই ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত বন্ধে কেবল সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করে কোন ফল হবে বলে মনে হয় না। সরকার নিজেই চায়, এই সংঘাত জিইয়ে থাকুক। কাজেই আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, ইউপিডিএফ-এর নির্বাচনী ইস্তেহারে আত্মঘাতী ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত বন্ধে আরো স্পস্ট অঙ্গীকার থাকা উচিত ছিলো।

শুরুতে বলেছি, এখনো জেএসএস (এম এন লারমা)-র নির্বাচনী ইস্তেহার এখনো পড়ার সুযোগ হয়নি। তবে তাদের একটি পোস্টারে “পার্বত্য চট্টগ্রামের চলমান রাজনৈতিক সংঘাত’ বন্ধের কথা বলা হয়েছে। জেএসএস (এম এন লারমা) চলমান রাজনৈতিক সংঘাত বন্ধ করে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তুলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে নিজেকে দাবী করে। কিন্তু এই সংঘাত কীভাবে বন্ধ করা হবে সে ব্যাপারে কোন ইঙ্গিত নেই, যেহেতু তাদের নির্বাচনী ইস্তেহার এখনো পড়তে পাইনি।

পরিশেষে বলতে চাই, প্রত্যেক পার্টির কাছে প্রত্যেকের নিজস্ব আশা আকাংখা থাকতে পারে। সেটাই স্বাভাবিক। তবে সাধারণ নাগরিক আমার চাওয়া খুবই ছোট। সেই ছোট চাওয়া হলো – সব দল আত্মঘাতী ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত বন্ধে স্পষ্ট অঙ্গীকার করুক। যেই দল বা প্রার্থী এ ব্যাপারে স্পষ্ট অঙ্গীকার করবে সেই পার্টি বা প্রার্থীকে ভোট দেবো এবং ভোট দেওয়ার আহবান জানাই। এই নির্বাচনের মাধ্যমে পাহাড়ের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা হোক, মানবতার জয় হোক সেই কামনা করি।

 

অডঙ চাকমা

২৮ ডিসেম্বর ২০১৩

About the author

অডং চাক্‌মা

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/2520

2 pings

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>