«

»

এই লেখাটি 776 বার পড়া হয়েছে

Print this প্রকাশনা

বিজয় দিবসের প্রাক্কালে…

কিছু অপ্রিয় কথা বলতে চাই । ঠিক-বেঠিক নির্নয়ের বিষয় না, আমি কি ভাবছি তাই বলা। নিতান্তই আমার ব্যক্তিগত বয়ান। ভরা মজলিশে বলতাছি না- নিজের ওয়ালে বলতাছি, খুব খিয়াল ! এর প্রত্যেকটা অক্ষরের দায়ভার আমার। পছন্দ করা বা লাইকানোর কিছু এখানে নাও পেতে পারেন ।

ছাত্রকালে আমি সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট করতাম । আমার বিশ্ববিদ্যালয় মানে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ছিলো শিবিরের দূর্গপ্রায় একটা ক্যাম্পাস । মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতার কথা বলতে হয় চুপে চুপে । সেই ক্যাম্পাসে আমিই প্রথম মুক্তিযুদ্ধের আলোকচিত্র প্রদর্শনী করি । নিজামী আর ইয়াহিয়ার মিটিং করার একটা ছবিও তার মধ্যে ছিলো । প্রদর্শনীর সময় খুব খেয়াল রাখতাম ছবিটার দিকে, পাছে নষ্ট না করে ফেলে শুয়োরগুলা । শিবিরের হিটলিস্টে আমার নাম ঢুকে গিয়েছিলো । ক্যাম্পাসের ছেলেপেলেরা আমার সাথে চা খায়, আমারে সাপোর্ট করে, দুই কদম হাঁটে আর দশ কদম পিছায় । পাহাড়ি ছেলেপুলেরা যারা সেখানে পড়তো তারা আমার সঙ্গ মেনে চলতো খুব টেকনিকালি। তারা হলে থাকতো, আমি থাকতাম কুষ্টিয়া শহরের মেসে । আমার সাথে উঠবস করলে তাদের হলে থাকায় খুব সমস্যা হয় । একবার শিবিরের কোন একটা নিউজ আমি পত্রিকায় লিক করে দিয়েছিলাম, তাতে ওরা ক্ষেপে গিয়ে সেখানকার পাহাড়ি ছেলেদের খুব ধমকিয়েছিলো ।

এভাবে একসময় আমি খুব একলা হয়ে গেলাম । একবার একুশে ফেব্রুয়ারীর রাতে আমার সাথে ফুল দেবার কেউ আর ছিলোনা । সংগঠনে যারা আমার আগের রিক্রুট ছিলো তারা ইন্যাকটিভ হয়ে গিয়েছিলো । আমি একাই সেদিন ফুল দিয়েছিলাম । যাঃস্লা ! আমবাগানে পুঁতে দিলেও আমি একাই স্লোগান দেবো ! তখন ছিলো বিএনপি-জামাতের সরকার । আমার একলা চলার, একলা বলার অভ্যাস তখন থেকে । আমি জানি আমার রাস্তায় লোকজনের হাঁকডাক সহজে আসে না । এখানে সহজে প্রিয়জন জোটেনা ।

কেমন একটা প্রচন্ড বলিষ্ঠ স্পিরিট নিয়ে চলতাম- আমার বিশ্বাস, আদর্শের প্রতি অটল আস্থা, সবকিছু দিয়ে আমি চারপাশের বৈরিতাকে অগ্রাহ্য করতে পারতাম । ছাত্রজীবন শেষ হবার পর সংগঠন থেকে অব্যাহতি নিয়ে চাকুরিতে ঢুকি । ঢাকায় এনভয় গ্রুপে দেড় বছর মার্চেন্ডাইজিং করার পর মেট্রোপলিটান স্বপ্ন ফেলে দিয়ে ফিরে আসি খাগড়াছড়িতে । জুলাই ২০১২ থেকে আজ পর্যন্ত এখানেই আছি । এখানে চাকুরি করতে এসে আমাকে অনেক দূর্গম জায়গাতে যেতে হয়েছে, থাকতে হয়েছে। গত দেড় বছরে আমি টের পেয়েছি আমি আর আগের মানুষটা নেই । খুব কাছ থেকে দেখেছি দেশের মানচিত্রের একটু এদিক ওদিক হওয়াতে মানুষের মানচিত্র, শোষণের চিত্র কেমন নিদারুণ পাল্টে যায় ।

যা বলার জন্য এত বড় ভূমিকাটা টানতে হলো সেই প্রসঙ্গে আসি এবার । এবার ‘আমি- তুমির ফারাকটা’ আসবে । আমি, এই আমি শিবিরের তোয়াক্কা না করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলেছি শিবিরের দূর্গে – আজ আমিই বলবো এই ফারাকের সিমানারেখা ।

তুমি কে, আমি কে ? -বাঙালি, বাঙালি ?? নো স্যার । আই এম নট বাঙালি । যতক্ষন তুমি বাঙালি ততক্ষন আমি মারমা-জুম্ম। যখন তুমি মানুষ- হ্যাঁ, তখন আমিও মানুষ । তোমার “জয় বাংলাতে” আমার কোন অবজেকশান নাই । এই যে এই দেশটা, আমিও একে সমান ভালোবাসি । তাহলে এই দেশটা- দেশ মানে কি ? কি ?? কি বলেনতো ??? -জ্বী এখানে মাটি- মানে ভুখন্ড, সার্বভৌমত্ব, সংবিধান, সরকার, প্রতিরক্ষা… এসব আছে। মানে এটা একটা স্টেট বা রাষ্ট্র । তো এই রাষ্ট্রটা ৭২ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত ক্যান আমারে মাটি থেকে তাড়াইতে চায় ? ক্যান আমারে আমার মাটিতে সংখ্যালঘু বানাইতে চায় ? ক্যান এই রাষ্ট্র আমার পাহাড়ে সেটেলার বাঙালি ঢুকায়া দিয়া আমার মাটি কাড়ে ? এই কৃমিগুলা আমার মা-বোনের ইজ্জত মারে আর রাষ্ট্র এই পরজীবিগুলারে রেশন দিয়া পুষে। আমার বাপ-মাসি-নানি-কাকা-দাদাদের হাজারে হাজারে মারছিলো এই কৃমি আর সার্বভৌমত্বের রক্ষকেরা মিলে । স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক হয়াও আমরা রিফিউজি হয়া যাই-ভারত পালাইতে হয় । এই স্বাধীন বাংলাদেশেই আমাদের একদম শেষ করার জন্য গণহত্যা করছে এই বানচোতগুলা । এটা জানেন আপনারা ? জ্বি, এখানে প্রায় তেরোটা গনহত্যা হইছে । লোগাং, নানিয়ারচর, কলমপতি, মাটিরাঙ্গা, পানছড়ি, দীঘিনালা… এইসব বনজংলার মধ্যে রক্ত-হাড়গোড়-মাংস লুকায়ে রাখসে। এই ইতিহাস এখনো লুকানোই আছে। এটা এই বাংলাদেশ করছে।

বাংলার মানুষ ৪২ বছর আগে স্বাধীনতা পেয়েছে কিন্তু মুক্তি পায়নি । আর আমরা স্বাধীনতা-মুক্তি তো দূরের কথা, আমরা আজও জানমাল বাঁচানো নিয়েই শংকিত। আমরা অস্ত্বিত্বের সংকট, আত্মপরিচয়ের সংকট, স্বীকৃতির সংকট নিয়ে হাঁচড়ে পাঁচড়ে বেঁচে আছি । তবু অদ্ভুতভাবে ভালো আছি ! আমাদের খারাপ থাকার বোধটাও মেরে দেয়া হয়েছে বলে আমরা এখন ব্যথায় কঁকিয়ে উঠিনা, রেগে কেঁপে উঠিনা, বিদ্রোহে ফেটে পড়িনা । “শান্তি-সম্প্রীতি-উন্নতি”র আফিম খেয়ে আমরা সুখে আছি এবং সুখে থাকার জন্য দখলবাজ সেটেলারের হাতে সব ছেড়ে দিয়ে পালাচ্ছি । পালাচ্ছি, পালাচ্ছি এবং পালাচ্ছি !!!

আজ ১৬ই ডিসেম্বর । বাংলাদেশের জন্মদিন। আজ আমি সেদিনের ছাত্রজীবনের কথা স্মরন করছি আর আজকের কথা ভাবছি । আমিতো সেদিনের মানুষটাই আছি, জয় বাংলাতে আমার আপত্তি নেই। বাংলাদেশ আমারও দেশ কিন্তু আমি সেই আগের আবেগটা আর পাচ্ছিনা । কেমন অন্যতার অনুভূতি আমাকে মুক্ত গলায় ‘জয় বাংলা’ বলতে নিষেধ করে ! মন হয়, তোমার মুক্তি মানে আমার মুক্তি নয় ! তোমার জীবন আর আমার জীবন এক নয় ! তোমার মুক্তির স্লোগান আর আমার মুক্তির স্লোগান এক নয় ! তোমার আমার ঠিকানা- পদ্মা, মেঘনা, যমুনা নয় !!! যদি আমার মুক্তি আর তোমার মুক্তি এক মোহনায় মিলতো তাহলে আজ আমাকে এরকম স্ট্যাটাস লিখতে হতো না । এই পাহাড়ি জনপদের প্রত্যেক আদিবাসী ভেতরে ভেতরে একটা শংকা নিয়ে বেঁচে আছে, যেন জীবন থকে পালিয়ে পালিয়ে বেঁচে আছে । -“আমরা আমাদের ভিটেমাটিতে আমাদের সন্তান সন্তুতিদের নিয়ে আর দশ-পনেরো বছর বাঁচতে পারব তো ?!” -“আমাদের জীবন দেশের দশটা সাধারন মানুষের মতো হবে তো ?? আমাদের কি স্বাভাবিক জীবন এবং স্বাভাবিক মৃত্যুর ভাগ্য আছে ???”

আমি জানি, এই দেশকে আমি যত ভালোবেসেই আলিঙ্গন করতে যাই, দেশ আমাকে বিষমাখা ক্যাকটাসের কাঁটায় বিদ্ধ করবেই । আমি এই বাংলাদেশের মধ্যে সেই পাকিস্তানের ছায়া দেখতে পাই ।

বিজয় দিবসে আর কিছু চাই না, এই দেশটা আমাদেরও হোক । আমরা মানুষের মতো বাঁচতে চাই । আমাদের বাঁচতে দেন । আর না হলে আমারে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ করে আরেক বিজয় দিবস আনতে হবে ।

About the author

পাইচিংমং মারমা

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/2515

2 pings

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>