«

»

এই লেখাটি 649 বার পড়া হয়েছে

Print this প্রকাশনা

শিরোনামহীন

ঝিমিত ! এই ঝিমিত ! কিরে ডাকছি শুনতে পাচ্ছিস না ?

বন্ধু সমরের ডাকে সম্বিৎ ফিরে পায় ঝিমিত । নারে, একদম শুনতে পাইনি । এত আনমনা হয়ে ভাবনার বেড়াজালে ডুব দিয়েছিলাম একদম শুনতে পাইনি । তা তোরা কখন এলি ?

-এইতো এইমাত্র আসলাম, বলল রাহুল । হুলোরাম কাকার চায়ের দোকানে আড্ডা দিতে দিতে মনে হল তোর ফার্ম থেকে একটু ঘুরে আসি । তাছাড়া তোর গিটারটাও নাকি ফার্মে এনে রেখেছিস । সময় আর কাটছিল না চায়ের দোকানে তাই আড্ডার ফাঁকে ফাঁকে গান গেয়ে সময় কাটানোর জন্য আসলাম ।

-খুবই ভাল কাজ করেছিস । আজ সারাদিনের পরিশ্রম শেষে গোসল করে কিছুক্ষণ হল জুমঘরের ইঝোরে এসে বসেছি । সিগারেট টানতে টানতে পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিষ্টিতি নিয়ে একটু ভাবছিলাম, কিন্তু ভাবনায় এমনভাবে ডুবে গিয়েছিলাম তোরা যে কখন এসেছিস তাও খেয়াল করিনি । তোরা তো আবার সিগারেট খাস না, এখন তোদের কি খাওয়াই ! কমলা খাবি ? মিথুন দেখ তো আমার বিছানার পাশে একটা পলিথিনের ব্যাগে তিনটা কমলা আছে, সেগুলো নিয়ে আয় ।

-মিষ্টি আছে তো ? বলল জন ।

আমার ফার্মের কমলা । ছাগল ঘরটার পাশের গাছে এই বছর প্রথম ধরেছে । খেয়ে দেখ কেমন হয়েছে কমলাগুলি । বা ! বেশ মিষ্টি তো, একেবারে সাজেক্যে কমলার স্বাদ, মন্তব্য করল জন । আচ্ছা এইবার তোর খবর বল, তোর ব্যবসাপাতির খবর কি ? লেখালেখির খবর কি ? বলল মিথুন । ব্যবসার খবর দেখতেই তো পাচ্ছিস আর লেখালেখির খবর তো ফেসবুকের মাধ্যমেই পাচ্ছিস । হ্যা, তা ঠিক । তবে দোস্ত তুই কিন্তু দারুন লিখিছ আর ব্যবসাতেও তোরে সফল ব্যবসায়ি বলা যায় ।

-দেখ বন্ধু আমার এই সফলতার পেছনে রয়েছে একাগ্রতা, কঠোর পরিশ্রম, বই পড়ার নেশা, ঝুকি নেওয়ার প্রবণতা আর সমাজের মধ্যে গলার কাঁটার মত চেপে বসা ভ্রান্ত মানষিকতার সাথে যুদ্ধ করার প্রবৃত্তি । এগুলিই আমাকে দেখিয়েছে সফল হওয়ার রাস্তা । আমি স্কুলে পড়ার সময় থেকে কৃষিকাজ ও ব্যবসার প্রতি আগ্রহী ছিলাম, তা তোরা সবাই জানিস । তাছাড়া আমির খানের “ত্রি ইডিয়টস”মুভিটি আমাকে শিখিয়েছে, আমি কিসে ভালো সেই কাজটাকেই পেশা হিসেবে নেওয়ার সাহস । মনে আছে ত্রি ইডিয়টস মুভির সেই বিখ্যাত ডাইলগ ? “অল ইজ ওয়েল” । হ্যা, বন্ধু মনে আছে, সেই কবে দেখেছিলাম ! বলল সমর । আচ্ছা গল্প তো অনেকক্ষন হল এইবার কিছুক্ষন গান হোক না; মিথুন গিটারটা নিয়ে শুরু কর ।

মিথুন গিটারটা হাতে নিয়ে বাজাতে থাকে আর সবাই মিলে গান ধরে । ওরা একের পর এক গান গেয়ে চলে; “গিভ মি সাম সানসাইন, গিভ মি সাম রেইন, গিভ মি এনাদার চান্স, ওয়ানা গ্রো আপ ওয়ান্স এগেইন”, “ঐ দূর পাহারের ধারে দিগন্তের কাছে, নিস্বঙ্গ বসে একটি মেয়ে গাইছে আপন সুরে”, “কফি হাউজের আড্ডাটা আজ আর নেই, আজ আর নেই”, “হাজলং যেবার পদেন্দি, বাচ্ছে তেদে তুই চিগোনবি, গাঙ পারদ আদি আদি, এম্বে ত’হাই মুই পরানবি”, “চোত মাসসে জুন পরদ গাই গাই ইঝোরদ বোই, চানান চেই চেই তরে ভাবি রেদ হাদাঙ্গে মুই”-সহ আরো অনেক গান । তিল তিল করে ঝিমিতের হাতে গড়ে ওঠা “ঝিমিত এগ্রো ফার্ম” এর জুম ঘরের ইঝোর থেকে ওদের পাঁচ বন্ধুর তারুন্যের উচ্ছাস ছড়িয়ে পরে ফার্মের প্রতিটি কোনায় । ওরা পাঁচ বন্ধু, ঝিমিত চাকমা, সমর চাকমা, রাহুল চাকমা, জন চাকমা ও মিথুন চাকমা একত্র হয়েছে কঠিন চিবর দানের ছুটিতে । ছোটবেলা থেকে একসাথে বড় হয়েছে, কিন্তু এসএসসি পাশ করার পরে সবাই আলাদা আলাদা জায়গায় চলে গেছে লেখাপড়া করার জন্য । রাহুল বরাবরই ধর্মভিরু ও বিনয়ী-ভদ্র । খাগড়াছড়ি কলেজ থেকে এইসএসসি পাশ করার পর প্রাইমারী স্কুলের চাকরি নিয়ে কৃষক পরিবারের হাল ধরেছে । পাঠ্য বইয়ের বাইরে অন্য বইয়ে চরম অনীহা । মিথুন ঢাকার একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স শেষ করে এখন একটি বেসরকারি প্রতিষ্টানে চাকরি করে । ব্যবসার প্রতি কিছুটা ঝোঁক আছে কিন্তু ইচ্ছাকে বাস্তবে প্রতিফলিত করতে পারে না । বন্ধুদের কাছে প্রেমিক পুরুষ হিসেবে পরিচিত সমর বরাবরই খেলাধুলার প্রতি দুর্বল । এলাকার কলেজ থেকে বিএ পাশ করে এখন একটি বেসরকারী প্রতিষ্টানে চাকরি করে । এক বড়ভাইয়ের অর্থায়নে মাঝখানে কিছুসময় পোলট্রি ফার্ম করেছিল কিন্তু এসবে ইচ্ছা না থাকায় পোলট্রি ফার্মের ব্যবসায় লস দিয়ে চাকরি শুরু করে । জন ছোটবেলা থেকেই লেখাপড়ায় ভাল ছাত্র হিসেবে পরিচিত । চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স শেষ করে বিসিএস সহ বেশ কিছুসময় সরকারি চাকরির চেষ্টা করেছিল কিন্তু চাকরির লিখিত পরীক্ষায় পাশ করতে পারলেও হাই স্কুলের কেরানি বাবা, লক্ষ টাকার ঘুষের টাকা জোগার করে দিতে না পারার কারনে মৌখিক পরীক্ষায় গিয়ে বার বার সরকারী চাকরির সম্ভাবনা থেকে হোঁচট  ফিরে আসার পর এখন একটি উন্নয়ন সংস্থাতে কর্মরত । পাঠ্য বই বাদেও অন্য বই পড়ার প্রতি আগ্রহ যথেষ্ট  রয়েছে । প্রাতিষ্টানিক  ধর্মের প্রতি অবিশ্বাসী ঝিমিত হাই স্কুলে পড়ার সময় থেকেই স্কুলের কৃষি শিক্ষা বইটি খুটিয়ে খুটিয়ে পড়ত । তার সবসময় আগ্রহ ছিল হাঁস-মুরগি পালন, গরু-ছাগল পালন, বাগান করার প্রতি । কিন্তু এসএসসি পাশের পর বাবার কথা অনুযায়ী ডিপ্লোমা পড়তে যায় এবং ডিপ্লোমা শেষে  বেশ ভাল বেতনের একটা চাকরিও করেছিল প্রায় তিন বছরের মত, কিন্তু ভাল বেতনের সেই চাকরিতে ওর মন টিকল না । আর টিকবেই বা কিভাবে, ওর শেখর যে অন্যখানে ! চাকরি ছাড়ার পর বাড়ি থেকে এক কিলোমিটার দূরে পারিবারিক সম্পত্তি এক একর জায়গাতে নিজের মাত্র পঞ্চাশ হাজার টাকা আর বাবার থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকা নিয়ে বিশটা ছাগল কিনে ছাগলের খামার করা শুরু করে । ছাগলের খামারের পাশাপাশি পাশের একটা বিল লিজ নিয়ে মাছ ও হাঁসের চাষ করা শুরু করে । প্রথম দিকে ঝিমিতের এই কাজে লোকজন হাসাহাসি করত, বলত ঝিমিত পাগল হয়ে গেছে, তা নাহলে চাকরি ছেড়ে দিয়ে কেউ এগুলি করে ! কিন্তু ঝিমিত এইসব উপহাসকে শক্তিতে পরিণত করে নিজের লক্ষে অবিচল থেকে কাজ করে গেছে । ঝিমিত জানত সফল হওয়ায় এইসব উপহাসের একমাত্র সমুচিত জবাব । এক একর জায়গা নিয়ে শুরু করা ফার্মের বিস্তৃতি এখন সাতাশ একর । বিশটা ছাগল থেকে এখন একশ সাতটি ছাগল । লিজ নেওয়া বিল কিনে নিয়ে সংষ্কার করার পরে এখন সেটি সাড়ে তিন একর আয়তনের লেক । লেকের পাড় জুড়ে রয়েছে নারিকেল গাছের সারি । লেকের মধ্যে এক হাজার মুরগির একটি পোলট্রি ফার্ম আর সাড়ে তিনশ হাঁসের একটি খামার । এক একর জায়গা জুড়ে সেগুন, মেহগনি, গামারি, কমলা, কাঠাল, লিচু ও জাম গাছের মিশ্র বাগান । বাকি জায়গা জুড়ে সবটাই লিচু বাগান । লিচু বাগানের ফাঁকে ফাঁকে কলা গাছের সারি আর রাস্তার দু ধারে কাঠাল গাছের সারি, দিয়েছে ঝিমিতের স্বপ্নের পরিপূর্ণতা । তাছাড়া পাবলাখালির জুমে রয়েছে বায়ান্নটি গরু, বাজারে একটি দোকান আর বিভিন্ন মৌসুমি ব্যবসা ।

 

ঝিমিত দা ! ঝিমিত দা ! প্রণবের ডাকে ওদের গান গাওয়ায় ছেদ পরে । আজ রাতে কি কি রান্না হবে ঝন্টু কাকা জিজ্ঞেস করতে বলেছে ।

-ফ্রিজে রুই মাছ আর মুরগির মাংস রয়েছে সেগুলি রান্না করতে বল । মুরগির মাংস একটু ঝাল করে রান্ন করতে বলিস । ওর যদি আরো অন্য কোন আইটেম করতে মন চাই তাহলে করতে পারে । আজ আমার বন্ধুরা এসেছে, এরা চারজন আজ রাতে খাবে । আর হ্যা খবরটা দিয়ে পড়তে বসবি ।

-আচ্ছা ঠিক আছে বলেই দৌড় দিয়ে চলে গেল প্রণব ত্রিপুরা । বয়স মাত্র এগার বছর । মা মারা গেছে কয়েক বছর হল । বাবা আরো একটা বিয়ে করেছে  আর দিন- রাত মদ খেয়ে মাতাল হয়ে পরে থাকে । অভাবের কারনে ক্লাশ ত্রিতেই লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায় । সেখান থেকে নিয়ে এসে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেয় ঝিমিত । এক বছর হল ফার্মে এসেছে প্রণব, এখন সে ক্লাশ ফোর এ পড়ে । ফার্ম থেকে স্কুলে যাতায়াত করে আর টুকটাক কাজে সাহায্য করে । ঝিমিত বাদে ফার্মের নিয়মিত সদস্য সংখ্যা এগার জন । ফার্মের ম্যানেজার দেবেশ চাকমা, প্রণব ত্রিপুরা, রাধুনি ঝন্টু চাকমা, শ্রমিক ডেঙা চাকমা, হিনেরাম চাকমা, জ্ঞান প্রিয় চাকমা, শান্তি প্রিয় চাকমা, দারোয়ান এবং নাইট গার্ড তুষার চাকমা, কান্তি চাকমা, সুভাস চাকমা ও ননীগোপাল চাকমা । এই এগার জন হল ঝিমিত এগ্রো ফার্মের নিয়মিত সদস্য । এরা সবাই ফার্মের পূর্ব সাইডের হাফ ওয়ালের একটি টিনশেড বাড়িতে থাকে । ফার্মের দক্ষিণ সাইডের বাঁশ আর কাঠ দিয়ে তৈরি দোতলা জুম ঘরে মাঝে মাঝে দুই একদিন এসে রাত কাটিয়ে যায় ঝিমিত । আজ দুই দিন হল ফার্মে রয়েছে ঝিমিত । তাছাড়া সপ্তাহের বেশিরভাগ দিনগুলি ব্যবসার কাজে আজ এখানে, কাল ঐখানে করে কাটাতে হয় । ফার্মে সপ্তাহে দুই-তিনদিন এসে খোজ খবর নিয়ে যায় আর তাছাড়া বাকি সময়টা মোবাইলেই খবর নেয় ।

-বন্ধু তোর কথায় ঠিক ছিল, যদি চাকরির পেছনে না দৌড়িয়ে পোলট্রি ফার্মটাতে মনোযোগ দিয়ে কাজ করতাম তাহলে আজকে অন্যের গোলমগিরি করে বেঁচে থাকতে হত না । তুই আমাকে সে সময় কত উৎসাহ দিয়েছিলি আর এদিকে আমি ছিলাম শুধুই চাকরির প্রতি মোহাবিষ্ট । পোলট্রি ফার্মটা করার সময় আমার কোন পুজি লাগেনি, সব টাকা দিয়েছিলো জ্ঞান প্রকাশ দাদা । দাদাও আমাকে বলেছিল চাকরি মানেই অন্যের গোলামগিরি আর ব্যবসা হল নিজের স্বাধীন মত চলার পথ । এত উপদেশ, এত উৎসাহ সে সময় কিছুই মাথায় প্রবেশ করেনি । তখন আমার একটাই চিন্তা ছিল চাকরি । চাকরি করলে সমাজে মূল্য পাব, আর আমাদের সমাজে বিয়ের বাজারে চাকরিওয়ালা ছেলের কদর বেশি, যার কারনে পোলট্রি ফার্ম করলেও আমার যাবতীয় আশা, আখাংকা ঘিরে ছিল একটা চাকরি যোগার করা । বাড়িতে বউ রয়েছে যার কারনে এখন না পারছি চাকরি ছাড়তে আর না পারছি নতুন করে ব্যবসায় নামতে । চাকরি করে মাস গেলে বেতন পাচ্ছি তা দিয়ে কোনরকমে পরিবার চলছে কিন্তু এখন চাকরি ছেড়ে ব্যবসায় নামলে পরিবার চলবে কিভাবে আর ব্যবসার উন্নতিই বা হবে কিভাবে ।

-তোকে তো আগেই বলেছিলাম ব্যবসায় মনোযোগ দে, পোলট্রি ফার্মটা মনোযোগ দিয়ে কর । বউ নাই, বাচ্চা নাই সমাজ কি ভাবল না ভাবল তা চিন্তা করে লাভ নাই । ব্যবসায় সফল হতে পারলে বিয়ের বাজারে অবশ্যই চাকরিওয়ালা ছেলের চেয়ে বেশি দাম পাবি । কিন্তু তুই বলতি আগে চাকরি খুজবো, যখন চাকরি পাবোনা তখন ব্যবসায় নামবো । তোকে তখন এত বুঝিয়েছি যা করবি এখন থেকেই কর । চাকরি খুজতে খুজতে স্যান্ডেল ক্ষয় হয়ে যাবে আর যদি চাকরি পেয়েও যাস আর চাকরি পাওয়ার পরে বিয়ে করিস তাহলে কোনদিন আর ব্যবসায় নামতে পারবিনা । কারন বিয়ে করার পরে ব্যবসায় নামলে সেই ব্যবসায় সহজে উন্নতি করা যায় না । ব্যবসায় উন্নতি করার শর্তই হল, লভ্যাংশকে মূলধন বানিয়ে ব্যবসায় খাটানো । বিয়ে করার পরে ব্যবসায় নামলে লাভ করবি ঠিকই কিন্তু লাভের অংশ চলে যাবে পরিবারের ভরণ-পোষন করার পেছনে । ব্যবসা যেখান থেকে শুরু হবে সেখানেই থাকবে কিন্তু আয়তনে বাড়বে না; হয়তো এমনও হবে ব্যবসায় খাটানো মুলধনও চলে যাচ্ছে পরিবারের খরচ দিতে । তাছাড়া আমাদের পাহাড়িদের মাঝে কারোর পারিবারিক অবস্থা এমন নয় যে, কোটি টাকা দিয়ে ব্যবসা শুরু করব । কোটি টাকা ইনভেস্ট করে লক্ষ টাকা লাভ হবে আর লাভের কিছু অংশ দিয়ে পরিবার চালাবো আর বাকি অংশ ব্যবসায় খাটাবো । যদি ব্যবসা করার মানষিকতা থাকে তাহলে সময় থাকতেই ব্যবসায় নেমে পরতে হবে এবং তা বিয়ে করার আগেই । বিশ্বের অন্যতম একজন ধনী ওয়ারেন বাফেট স্কুলে পড়ার সময় থেকেই খবরের কাগজ বিক্রির টাকা জমিয়ে শেয়ার ব্যবসা শুরু করেছিলেন । তোকে এসব কথা কত বলেছি কত উদাহরন দিয়েছি ! তবুও এখনো সময় আছে, চাকরির পাশাপাশি ছোটখাটো কোন ব্যবসা করতে পারিস কিনা দেখ । আমি যথাসম্ভব সাহায্য করার চেষ্টা করব ।

-আচ্ছা সেসব পুরনো কথা বাদ দে । বিয়ে কবে করছিস বল ? বলল মিথুন । নাকি এখনো পরানির আশায় বসে আছিস ? পাঁচ বছর হল তোদের রিলেশনটা ভেঙে গেছে, কিন্তু তুই এখনো তার ফিরে আসার আশায় রয়েছিস । খোজ নিয়ে দেখ, এখন সে হইতো অন্যজনের সাথে বেশ সুখে আছে । আমরা তো সবাই বিয়ে করে সংসারি হলাম, আমাদের বন্ধুদের মধ্যে একমাত্র তুই এখনো বিয়ে করিস নি । তারাতারি বিয়েটা কর, আমরাও পেট ভরে খায়, কালে কালে বয়স তো আর কম হল না । আমার একটা শালি আছে দেখতে সুন্দর, ঢাকায় লালমাতিয়া মহিলা কলেজে অনার্স থার্ড ইয়ারে পড়ে, নাম তিন্নি । তুই যদি রাজি থাকিস তাহলে কথা বলে দেখতে পারি । আর তাছাড়া তিন্নিকে তো আমার বাড়িতে দেখেছিস অনেকবার ।

-মিথুনের শালিটাকে পছন্দ না হলে আমার ফুফাতো বোন স্নিগ্ধাকে দেখতে পারিস, বলল জন । স্নিগ্ধা এখন রাঙ্গামাতি সরকারী কলেজে অনার্স ফাইনাল ইয়ারে পড়ে । রাঙ্গামাতি শহরের মধ্যে তিনতলা একটা বাড়ি, বাবা ব্যঙ্কের ম্যানেজার আর মা প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষিকা । তোদের পরিবারের সাথে মানাবে বেশ ভাল ।

-কিরে ! তোরা কি ঘটকালির দোকান খুলে বসেছিস নাকি ? একবারও জিজ্ঞেস করলিনা আমি কি ধরনের মেয়ে পছন্দ করি ! আর এখনো পরানির আশায় রয়েছি কথাটি সত্যি নয় । ওর সাথে রিলেশনটা ভাঙার পরে ওকে ভুলে যাওয়ার জন্য আমার সব মনোযোগ দিলাম লেখালেখি আর ফার্মের দিকে । লেখালেখি আর ফার্ম নিয়ে এত ব্যস্ত হয়ে পরলাম যে, পরানির সাথে রিলেশন ব্রেক আপের বয়স কিভাবে কিভাবে পাঁচ বছর হয়ে গেল বুঝতেই পারলাম না !

টিং টিং, টিং টিং, টিং টিং শব্দে ঝিমিতের মোবাইলটা বেজে উঠল, রিসিভ করতেই ঐ প্রান্ত থেকে ফার্মের ম্যানেজার দেবেশ বলল, ঝিমিত দা, খাবার রেডি । আপনারা ডাইনিং এ খেতে আসবেন, নাকি খাবারটা জুম ঘরে পাঠিয়ে দেব ? থাক পাঠানোর দরকার নেই । আমরা ডাইনিং-এ এসে খেয়ে যাব । তুমি ডাইনিং-এ খাবার দিতে বল, আমরা এক্ষুনি আসছি ।

এই চল, খাবার রেডি । ভাত খেয়ে একটু ফেসবুকে বসতে হবে । অনেকদিন হল ফেসবুকে বসা হচ্ছে না, মেইলও একটু চেক করতে হবে । তাছাড়া আগামীকাল আবার ব্যঙ্কে যেতে হবে । গতবছর দশ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলাম সেই ঋণের কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে খাগড়াছড়ি যেতে হবে ।

জুম ঘরের দোতলা থেকে নেমে আসল পাঁচ বন্ধু । সবাই ফার্মের মাঝখান দিয়ে চলে যাওয়া ইট বিছানো রাস্তা দিয়ে হেটে চলল ডাইনিং রুমের দিকে ।

আকাশে একফালি চাঁদ উঠেছে, লিচু গাছের ফাঁকে ফাঁকে জোনাকিরা লিকোচুরি খেলছে । লেকের জলে জোৎস্নার আলো প্রতিফলিত হয়ে ভিজিয়ে দিচ্ছে চারপাশ । হাটতে হাটতে ঝিমিত আনমনা হয়ে যায়, এত বছর ধরে মনের কুঠুরিতে সংগোপনে লুকিয়ে রাখা অনেক আগের পুরনো স্মৃতিগুলি বিদ্রোহ করে । আবছা করে একটি মেয়ের ছবি ভেসে উঠে মনের পর্দায় । সেই অনেক অনেক দিন আগে ঠিক এমন এক মায়াময় রাতে ঝিমিত আর পরানি নরেনদের শান বাঁধানো পুকুরপাড়ে গল্প করে কাটিয়ে দিয়েছিল সারা রাত । “ঝিমিত এগ্রো ফার্ম” এর লেকের শান্ত জলে ঝিমিত দেখতে পায়, পুকুর পাড়ে বসে আছে একটি ছেলে আর ছেলেটিকে জড়িয়ে ধরে ছেলেটির চুলে বিলি করছে একটি মেয়ে…………………………………..

About the author

জুম্মো এডিসন

আমি বস্তুবাদী নাস্তিক ।

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/2512

2 pings

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>