«

»

এই লেখাটি 770 বার পড়া হয়েছে

Print this প্রকাশনা

প্রেম, স্বপ্ন এবং জীবন

 

জ্যোতি বিকাশ ছিলো আমার পড়ার সহপাঠী । অদম্য মেধাবী ছেলেটি ৬ষ্ট শ্রেনী থেকে ৩য় শ্রেনীতে ভর্তি হয়েছে বলে জুনিয়র হয়েও সিনিয়রদের সাথে মেলামেশা করতে হতো । বয়সটা বয়সন্ধিতে হেলে যেতে যেতে এক সিনিয়র মেয়ের প্রেমে পড়ে যায় জ্যোতি বিকাশ । সেসময় কচি মনের বাস্তবতা বলে দিতো যে জ্যোতি বিকাশের জীবনের গতি বদলিয়ে যাবে দিনদিন । আমরা তার তুলনায় কচি খোকা বটে । সে বয়সে এবং শরীরে ছিলো অনেক অগ্রগামী । তার বুদ্ধিমত্তা এবং মেধার কাছাকাছি আমরা ঘেঁষতে পারতাম না । ক্লাশে ১ম হওয়া ছেলেটি কয়েকবছর পর কোথায় হাওয়া হয়ে মিলিয়ে গেছে আর খবর আসেনি । যে মেয়েটির সাথে প্রেম হয়েছিলো, সে মেয়েটির বিয়ে হয় অল্প বয়সে । জ্যোতি বিকাশের সাথে প্রেমে পড়ার আগেও মেয়েটির পুরাতন এক প্রেমিক ছিলো । শেষান্তে জ্যোতি বিকাশ সেসবকিছু খোলাসাভাবে জানতে পারে । বিয়ে ও হয় সেই পুরাতন প্রেমিকের সাথে । প্রেমিকার গুচ্ছ গল্পগুলো শুনে এবং বিয়ের খবর জেনে জ্যোতি বিকাশ ভীষণভাবে ভেঙ্গে পড়ে । পড়াশুনাতে দিনদিন অমনোযোগী হয়ে ওঠে । সময়মতো ঠিকঠাক খাওয়া দাওয়া করা হয়ে ওঠে না জ্যোতির । আস্তে আস্তে তার শরীরের রং ফেকাসে হয়ে যায়, এবং হলুদ বর্ণ ধারণ করে । বন্ধুদের জোর অনুরোধে শেষমেষ ডাক্তারের শরণাপন্ন হয় । রক্ত পরীক্ষায় রিপোর্টে বিলিরুবিন এর পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে ১.২ এমজি থেকে বেড়ে ৮.৭ হয়েছে । অতি ক্লান্ত ও দূর্বল বোধ করাতে জ্যোতি বিকাশকে পড়াশোনা বাদ দিয়ে দীর্ঘ ২ বছরের বিশ্রামে যেতে বলা হয় । তখন থেকে জ্যোতি বিকাশের শিক্ষা জীবনের ইতি ঘটে । পরবর্তী ঘটনাগুলো আর জানি না । জানি না বন্ধুটি কেমন আছে এবং কোথায় আছে ।

গোপাল আমার আরেক হাই স্কুলের বন্ধু । স্কুলের প্রথম দিনে সে আমার দিকে তার হাতটা প্রসারিত করে করমর্দন করে । ছেলেটি মেধাবী । তার বড়ো বোনটিকে বিয়ে করতে চেয়েছিলো এক রাজনৈতিক নেতা, বোনটি অসম্মতি জানানোর কারণে তাদেরকে পারিবারিকভাবে হেনস্থা করে গ্রাম থেকে উচ্ছেদ করা হয় । প্রাইভেত টিউশনি এবং খালে মাছ ধরে গোপালকে তার পড়াশোনার খরচ যোগাতে হতো । প্রতিদিন স্কুলের টিফিনে গাছের ছায়ার তলে বসে গল্প করতাম । একদিন গল্প করতে করতে বললো দোস্ত – আমি যে একজনের প্রেমে পড়েছি । এখন কি হবে ? মেয়েটি আমাদের থেকে ২ বছরের জুনিয়র । মেয়েটিও ছিলো মেধাবী । গোপালকে জ্যোতি বিকাশের গল্পটা পুরো অনর্গল মুখস্ত বলে দিলাম । সাথে ফ্রী উপদেশ ও ছিলো বন্ধুর জন্যে – < আগে নিজেকে গুছিয়ে নাও । তারপর সব ঠিক হয়ে যাবে ।> বন্ধুটি তাই করলো । দীর্ঘ কয়েকবছর বন্ধুর সাথে কোন যোগাযোগই ছিলো না । শেষে মোবাইল ফোনে বন্ধুর সাথে যোগাযোগ হলে বলে সে এখন সুখী । সে কোন এক টেক্সাটাইল কোম্পানিতে সহকারী ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করে, আর তার সেই ভালো লাগার মেয়েটি ও সহকারী মেডিকেল অফিসার । অভাব অনেকখানি মুছে গেছে । স্কুল জীবনে বেঁধে যাওয়া স্বপ্ন অবশেষে সাগরের মোহনায় মিলিত হতে পেরেছে জেনে আমিও আনন্দবোধ করলাম ।

ত্বরিত এবং রাজা আমার কলেজের প্রাণের বন্ধু । পুরা খাগড়াছড়ি শহর সাইকেলে চড়ে বেড়ানো এখন শুধু স্মৃতি । পানখাইয়া পাড়ার বিলের মধ্যে দিয়ে ‘নিউজিল্যান্ড’ নামকরণের সাথে আমাদের স্মৃতিগুলো নিবিরভাবে জড়ানো । তখনো রাস্তাটা পিচ করা হয়নি । আমরা কখনো পায়ে হেঁটে, আবার কখনো সাইকেলে করে গল্প করতে করতে একপাশ থেকে অন্যপাশে যেতাম । ত্বরিত এবং রাজা দুজনই মেধাবী । ত্বরিত ১ম স্থান অধিকার করার জন্যে কলেজে অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলো । তিনজনের অঙ্গরঙ্গ বন্ধুত্ব জানি না ভবিষ্যতে আর পাবো কিনা, যেহেতু এখনো মেলাতে পারিনি ! রাজা দেখতে ফর্সা এবং লম্বা । চেহারা ভালো । পানখাইয়াপাড়া পথে হাঁটতে বের হলে যুবতিরা ব্রেটলি …. ব্রেটলি করে ডাকতো । আমরা হেসে পাশ কাটিয়ে যেতাম । ত্বরিতকে নিয়ে শহরে ছিলো অন্যরকম আলোচনা । কখনো কেউ জামাই পড়াবে এমনো ইঙ্গিত দিয়েছিলো, তাই সে নিজের মনের ভিতর সে আখাঙ্কাটা লালিত করে রোমাঞ্চ-রোমাঞ্চ হাবভাব দেখাতো । অবশেষে রাজারও প্রেমের অফার আসে । রাজা নিজেও দূর্বল হতে থাকে । নারীর আবেদন এক পুরুষের মনকে কতটা যে ভঙ্গুর করাতে পারে -শুধু অনুধাবন করলাম । রাজাকে বাঁচাতে তাদের গল্পটা নিজের মাথায় তুলে নিলাম কয়েক মাসের জন্যে । একদিন তিনজনে বসে জীবন থেকে সেসব আবেদনকে উড়িয়ে দিলাম এক কলা ছরা, ও আধা কেজি মুড়ির আয়োজনে । কলেজ জীবন ও শেষ হলো প্রেমহীন হয়ে ।

জীবনে প্রেম আসবে প্রেম চলে যাবে কেউ হবে ছন্নছাড়া বাঁধাবে স্বপ্ন করাবে বিজয়ী হয়ত কেউ বা পাবে সোনার মুকুট কাউকে বানাবে ভিখারি

জ্যোতিবিকাশের গল্প আমার পরবর্তী হাইস্কুল এবং কলেজের বন্ধুদের ব্যর্থতার বদলে এনে দিয়েছে জীবন স্বপ্নের সফলতার চাবি । জ্যোতি বিকাশ আমার শিক্ষা, আমাদের শিক্ষা, সমাজের শিক্ষা ।

লিখেছেন – Joy Ch

About the author

JOY CH

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/2416

1 ping

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>