«

»

এই লেখাটি 952 বার পড়া হয়েছে

Print this প্রকাশনা

ফেরা

“বাবা হঅমলে ঘরত এবে?” (বাবা  বাড়ি আসবি কবে?)

মার কোমল গলা ফোনের ওপাশ থেকে  অন্তুর অন্তর চোখ ভিজিয়ে দেয়।  বছরখানেক নাকি বেশি?  ঐ দূর পাহাড়শ্রেণী পেরিয়ে বাড়ি যাওয়া হয়না কতদিন? অন্তু নিজেও ভুলে গেছে।

 

অন্তুর মন আবার নতুন করে অস্থির হয়ে ওঠে। উফ! ঘরের দরজায় কদিন  পা পড়েনি!   আহা ঐ সবুজ পাহাড়সারি দেখা হয়না কদিন ধরে, হাইকিং হয়না বন্ধুদের সাথে । বন-পাহাড়ের উঁচুনিচু রাস্তায় হেঁটে গ্রামে যাওয়ার দিনগুলো অন্তুর চোখে ভাসে।  অন্তু ছুটছে ঘরের অদূরে রাজনি বাপের বাগানে, তাড়া করছে ছোট্ট মুক্ত-ইথিকা-বগা রা ।  শো শো বাতাসে ভেসে আসছে  আমের গন্ধ। অন্তু আমগাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকে । ঝড়ো বাতাসে আধো আঁধারে টুপ টুপ করে আম পড়ে আর সে ইচ্ছেমত কুড়োয়।  কুড়নো শেষ হলে রাজনি বাপের ভিটেয় ইট মেরে ভো-দৌড়  দেয় অজানার উদ্দেশ্যে…

ভোর  সকালে ভারী কুয়াশার মধ্যে হাঁটা ওর পুরনো অভ্যাস। ব্রাশ মুখে হাঁটতে হাঁটতে  সে একলা চলে যায় চব্বিশ মাইলে। এই এলাকাটা অনেক দূরে, নির্জন একটি চৌরাস্তার মোড়। এখানে বসে অন্তু  কিছুক্ষণ  বিশ্রাম নেয়  আর অপেক্ষা করে দিনের প্রথম বাসের জন্য। প্রকৃতি শান্ত। মাঝে মাঝে দূরে দু’একটা চেনাজানা পাখি ডেকে ওঠে। এই ডাক অন্তুর  চিরচেনা;  জ্ঞান হওয়ার পর থেকে  এই ডাকগুলো প্রতিদিন শোনা হয়। যেন  পরম প্রতিবেশী এই প্রাণীগুলো!

মোড়ের ডানপাশে  এক বিশাল টিলার উপরে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন ক্যাম্পে বাস করে  গোটা দশেক সিপাহী। টিলার অনেক নিচে মোড়ের সমতলে এক পুকুর।   দেশ স্বাধীন হয়েছে চল্লিশেরও আগে । অন্তু বুঝতে পারে না  আজও চল্লিশ বছর পর এই অজ পাড়াগাঁয়ে ব্রিটিশ আমলের ঐ ক্যাম্প কেন রেখেছে সরকার! এখানে চুরিচামারি নেই ডাকাতির আশঙ্কাও নেই।  এখান থেকে থানা সদর যে খুব দূরে  তাও নয়। তারপরও এমন একটা এলাকায় আধাসামরিক পুলিশের লাল ড্রেস কেন? বেচারাদের ঘরদোর অনেক দূরে, ঈদের ছুটিতেও বাড়ির মুখ দেখা যায় না।  ক্যাম্পে বসে মাছি মারা   কোন কাজ নেই। পানি আনতে গেলে বানানো সিঁড়ির ২৬৭ ধাপ বেয়ে নামতে হয়। এত খাটিয়ে মেরে অল্পকজন লোককে বাবুরাম সরকার এখানে রাখলো কেন? গেল বছর এক বুড়ো সেপাই জ্বরে মরে গেল। বুড়োর সাথে অন্তুর অল্পস্বল্প খাতিরও ছিল । দেশের বাড়ির গল্প শোনাত অন্তুকে, পাহাড়ে পরবাসী বুড়োর মুখে সমতলের গল্প। বেচারা শেষ জীবনে ক্যাম্পেই মরে  গেল! অন্তুর বড্ড কষ্ট লাগে লোকটার কথা মনে পড়লে।

বর্ষাকালে বাড়ির সামনে ধেবার পানি এসে  হেডমাষ্টারদের বিশাল  ক্ষেত ডুবে বিল হয়ে যায়। অন্তু সাঁতার জানে না ।  কিশোর অন্তু ডুবে মরার ভয় ভুলে নৌকো নিয়ে একাই নামে শাপলা-ডাটার স্তুপ গড়তে।  ঐ ডাটার স্বাদ ভালো, ভাজলে কলমির চেয়েও মজার। অন্তু ভালো নাও বাইতে জানে। দ্রুত সে ডাটা কুড়িয়ে চোরাই ট্রিপের ইতি টেনে পদ্মবাপের নৌকো ঘাটে ভিড়ায়। পদ্মবাপ জাত-শিকারি এবং জাত-মাতাল দুটোই। ইদে (ফাঁদ) পেতে বগা ধরতে এলাকায় তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই। তাঁর নাও চুরি করে ফাও ট্রিপ মেরে  ধোলাই খায়নি এমন ভালো কপাল অন্তুসহ আরো গুটিকয়েক ছোকরার আছে!

বর্ষার বাকি সময়টা ছুটিতে সে এক নানার বাড়িতে কাটায়। পাহাড়ের অনেক ভেতরের দুর্গমে নানার বাড়িতে  বিদ্যুৎ নেই।  চেঙ্গীর জল গড়িয়ে সেই গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে অনেক দূরে  মিশেছে কাপ্তাইয়ের আধারে। নদী এখানে সাগরের মতো। মাঝে  ছোট ছোট দ্বীপ। সেখানে অনেক নৌকো, অনেক দ্বীপ। দ্বীপে দ্বীপে ঘর, দ্বীপে দ্বীপে দোকানপাট-স্কুল। সাঁতারজ্ঞানশূন্য অন্তুর ভয় করে না। নানার নৌকো নিয়ে সে একেক দ্বীপে ঘুরে বেড়ায় একা একা। কোথাও এক দোকানে শেকলে বাঁধা  বানর নিয়ে বাচ্চাদের প্রবল আগ্রহ   চোখে পড়ে। কোথাও একটি টিলার ঘর থেকে ভেসে আসে মদ ও মদ্যপায়ীর  জড়ানো গলার আলাপ। অন্তু  কোথাও নামে না,  নৌকা বেয়ে সামনে চলতে থাকে। এই নদীর রাস্তায় এক ছোট্ট দ্বীপে কোন ঘর নেই । কেবল আছে  নির্জন ছোটবন আর দখিনা হাওয়ার গুঞ্জন।  অন্তু যাবে সেখানেই, সেই নির্জন রাজ্যে। ছোট্ট বনে কোন শব্দের অত্যাচার নেই বাক্য নেই শুধু বাতাস আর প্রকৃতির গানের মগ্নতা। অন্তু ডুবে যায় সেই গানে ছেড়ে  জগতের সব আলেয়া…

“ঐ হালা কি হইল তোর? চাচীর ফোন নাকি? বাসায় যাইতাছস তাইলে?”

যা এতক্ষণ কোথায় পড়েছিলাম! বন্ধুর  তিন প্রশ্নে ফ্ল্যাশব্যাক থেকে অন্তু ফেরে বাস্তবে। আজই বাসের টিকেট কাটতে হবে! ঘরে যাওয়া হচ্ছে, অনেকদিন পর…

About the author

সুমেধ তাপস চাকমা

জুম্ম মুই ফাত্তোরাম পধে পধে আদি যাঙ

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/2388

9 pings

Skip to comment form

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>