«

»

এই লেখাটি 1,778 বার পড়া হয়েছে

Print this প্রকাশনা

আদিবাসীদের বিকাশ এবং ব্যাপারীদের bKash


(১) সোজা হিসাব

 

কে কে পাহাড়ের আদিবাসী সংস্কৃতির বিকাশ চান?

নিশ্চয় সবাই চান। এবার বলুন

কে কে পাহাড়ে পর্যটনের প্রসার চান?

অনেকেই চান। কেন চান?

আপনারা বলবেন, কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে। মানুষের আয় রোজগার বাড়বে। এলাকার উন্নয়ন হবে। দূর্গম অঞ্চলে রাস্তাঘাট হবে। আমরা আধুনিক দুনিয়ার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারবো। আমরা নেংটি ছেড়ে জিন্সের প্যান্ট পরবো। আমরা উন্নত হবো… ইত্যাদি ইত্যাদি।

 

এবার বলুন,

পাহাড়ের শহর-জনপদে মদের জোয়ার কে কে চান? কে কে খাগড়াছড়ি-বান্দরবান এবং রাঙ্গামাটিতে ব্যাপক হারে মদের প্রচলন চান?

কে কে চান আপনার গ্রামের অভাবী মেয়েটা বেশ্যা হোক?

আদিবাসী সমাজের নৈতিকতা-সংস্কৃতি ধ্বংস হোক কে চায়?

আদিবাসীদের লোকজ সংস্কৃতি ধ্বংস হয়ে যাক কে চায়?

আমাদের জীবন, আমাদের সংস্কৃতি সব কিছু শোকেসের সাজানো পণ্যের মতো প্রদর্শনী হবে। তারপর আমরাও পন্য হবো আর আমাদের প্রদর্শনীর টাকা খাবে ব্যাপারিরা – বলুন কে কে চান?

-নিশ্চয় কেউ চান না।

 (লেখাটি হুচ্‌ ৪র্থ বর্ষ ১ম সংখ্যায় প্রকাশিত)

আপনি চান বা না চান বাংলাদেশ রাষ্ট্র চায়। খোলাসা করে বললে বাংলাদেশের রাষ্ট্রনীতি এবং অর্থনীতি এটাই চায়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক-অর্থনীতির যে কারবার সেই নিয়মে আমাদের পন্য করা হবে। ব্যাপারটা খুলে আলোচনা করা যাক। একটু বোরিং লাগবে- আমি আমার উপলদ্ধিটা সহজ করে বলার চেষ্টা করবো।

 

বান্দরবানে আজকাল প্রচুর পর্যটকের ভিড় হয়। বান্দরবান যদি পর্যটনের স্বর্গ হয় তাহলে কি লাভ ক্ষতি একটু ভাবা যাক।

-বান্দরবান পর্যটন স্থান হলে কার কার লাভ হয়ঃ

  • হোটেল-লজ-রিসোর্টের মালিক,
  • হ্যান্ডিক্রাফটস( হস্তশিল্প পন্য- কাপড়,আদিবাসীদের তৈজসপত্র ইত্যাদি),
  • মদের দোকানদার,
  • বেশ্যা আর বেশ্যার দালাল
  • পরিবহন কোম্পানি
  • খাবারের হোটেলের মালিক
  • শহরের ভিড়ভাট্টা হলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের যোগানদার-মার্কেট, বাজারের পাইকারী ও খুচরা দোকানদাররা।

-অর্থাৎ এক কথায় পর্যটনের সাথে যুক্ত ব্যবসায়ীরা।

 

★ যারা বান্দরবানের সাধারণ মানুষ-জুম চাষী, মধ্যবিত্ত, বিভিন্ন অফিসের কর্মচারি তাদের কি লাভ?

– তাদের কোন লাভ নেই।

এখন বান্দরবানের হোটেল-রিসোর্টের মালিক, পরিবহন ব্যবসায়ী, পর্যটন স্থান( নীল গিরি, নীলাচল ইত্যাদি), পাইকারী ব্যবসায়ী কারা?

-অবশ্যই আদিবাসীরা নয়। এরা সবাই পাহাড়ের বাইরের মানুষ যারা মূলত ব্যবসায়ী। এরা ব্যবসা করার উদ্দেশ্যেই পার্বত্য চট্টগ্রামে এসেছে।

কিন্তু বেশ্যা এবং বেশ্যার দালাল, মদের দোকানী, কিছু খাবার হোটেলের মালিক কারা?

-বান্দরবানের আদিবাসীরা।

★  তাহলে সোজা হিসাবে আমরা কি পেলাম? পর্যটনের ফলে আমরা পেলাম বেশ্যাবৃত্তি, আদিবাসী জনপদে মদের বন্যা, ফাটকা ব্যবসায়ী যারা আদিবাসী নয়, সমাজে নৈতিকতা ও সংস্কৃতির অবক্ষয়, আদিবাসীদের পন্যায়ন বা আদিবাসীদের পন্যে পরিণত হওয়া।

 

★পর্যটকের আকর্ষনীয় জিনিষগুলো কি কি?

-প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের স্থান, আদিবাসী সংস্কৃতি যা কৌতূহলী পর্যটকের অচেনা, আদিবাসীদের তৈরি মদ ।

 

বান্দরবান সহ পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী সমাজে মদ্য পান করাটা অপ্রচলিত নয়। বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে এর প্রচলন আছে। মদ্য পানের জন্য এমনিতেই আমাদের সমাজের ভারসাম্য নষ্ট হয়। যদি এর প্রাতিষ্ঠিনিকিকরন করা হয় অর্থাৎ, মদ পান এবং বেচাকেনা যদি সমাজে বেশি প্রচলিত হয়ে যায় এবং তা যদি প্রশাসনের সম্মতিক্রমে হয় তাহলে?

-গোটা সমাজের নৈতিকতা, ভারসাম্য, শৃংখলা ভেঙে পড়বে।

 

আমার উপরের বক্তব্যের প্রত্যক্ষ প্রমাণ কি?

★ প্রতি বছর রাজ পুন্যাহের সময় বান্দরবানে কি দেখা যায়?

  • গলির ভেতরে সারি বাঁধা “ডাব্বা” খেলা বা জুয়ার পসরা।
  • পর্দার আড়ালে বা বাইরে মদের সহজলভ্য বেচাকেনা। একটু অভাবী সংসারের ঘর হয়ে যায় মদের দোকান।
  • শহর থেকে পর্যটনে আসা বাবুদের খাঁই মেটাতে অভাবী ঘরের মেয়েটা রাস্তায় নামে শরীর বেচতে। একজন আদিবাসী মারমা মেয়ে বেশ্যা হয়ে যায়।
  • ধান্দাবাজ যুবক হাওয়া বুঝে মৌসুমি ব্যবসা ধরে। চাঁদা ধরা, ফাটকাবাজি, এটা- ওটার দোকান দেওয়া ইত্যাদি। তাতে করে তার বেকারত্ব ঘোঁচেনা কিন্তু পরিনতিতে তার ভেতরে দালাল প্রবৃত্তি গড়ে উঠে।

 

(২) আরেকটু তলিয়ে দেখা যাকঃ

 

বান্দরবান সহ পার্বত্য চট্টগ্রামে পর্যটন শিল্পের বিকাশ হলে আমার-আপনার মতো সাধারণ আদিবাসীর এক পয়সা লাভ নেই । কেননা পর্যটন শিল্পের সাথে আমাদের কোন যোগাযোগ নেই। এখানে আমাদের মাতৃভূমি পাহাড়ের নিসর্গ, আমাদের জীবনধারা-সংস্কৃতি দেখিয়ে কিছু মানুষ টাকা কামাচ্ছে আর অন্যদিকে আমাদের সমাজ নষ্ট হচ্ছে। আমাদের সমাজে বেশ্যাবৃত্তি, মদের প্রচলন বাড়ছে। অসাধু উপায়ে টাকা কামানোর দালাল শ্রেনী তৈরি হচ্ছে। আমাদের এবং আমাদের পাহাড়কে দেখিয়ে পর্যটক আকৃষ্ট করে এখানে এনে আমাদের পন্য বানানো হচ্ছে। পর্যটক আকৃষ্ট করতে আমাদের প্রদর্শন করা হচ্ছে, আমাদের সংস্কৃতিকে পন্য বানানো হচ্ছে।

 

চ্যানেল আই কর্তৃপক্ষ গত কয়েক বছর ধরে পার্বত্য আদিবাসীদের নিয়ে লোকজ মেলা আয়োজন করে আসছে। এ বছর পঞ্চমবারের মতো “পর্যটনের বিকাশে, পার্বত্য অঞ্চলকে বহির্বিশ্বে তুলে ধরার লক্ষ্যে কয়েক হাজার পার্বত্য শিল্পী নিয়ে বিশাল আয়োজন” করেছিলো তারা।

কিন্তু কেন?

“আনন্দ কি আনন্দ এসে গেছে  কোকাকোলা

গেছে সব দেনার দায়ে

বাকি আছে কাপড় খোলা”

 

নচিকেতার এই গানটা আমাদের প্রেক্ষাপটে ভাবা যাক। আমরা কেউ ব্যবসায়ী নই। গুটিকয়েক আছেন খুচরা ব্যবসায়ী। বড় কোন বিনিয়োগ যেমন পরিবহন, রিসোর্ট, শিল্প কারখানা আমাদের দিয়ে হবে না। কারন আমরা যুগ যুগ ধরে জুম চাষ করে আসছি। কয়েক দশক হলো আমাদের মধ্যে শিক্ষার প্রসার হয়েছে। যারা শিক্ষিত মধ্যবিত্ত তারাও চাকরিবাকরি করেন, ব্যবসা নয়। রাঙ্গামাটিতে কয়েকজন কুটিরশিল্প আর হস্তশিল্পের মালিক আছেন তাও উল্লেখযোগ্য নয়।

 

★আপনার শহরের সব বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো কারা চালায়? দেশের অর্থনীতির স্থানীয় সঞ্চালক কারা?

-আমি, আপনি বা আমাদের মতো আদিবাসীদের কেউ নই। সুতরাং পর্যটন শিল্পের বিকাশ হওয়া বা না হওয়াতে আমাদের কিছু যায় আসে না। সুতরাং এই শিল্পের বিকাশে আদিবাসীদের কোন লাভ নেই।

 

★তাহলে আমাদের পাহাড়ে পর্যটন শিল্পের বিকাশ করতে কিছু মানুষের এত উৎসাহ কেন? এরা কারা?

 

-এরা কেউ আমাদের মতো সাধারণ খেটে খাওয়া, চাকরি করে জীবিকা উপার্জনের কেউ না। যেমন ধরুন চ্যানেল আই। তাদের এত কিসের ঠ্যাকা পড়লো আমাদের সংস্কৃতি উন্নত করতে?

-কারন এখানেই তাদের লাভ। ওরা আমাদের দেখিয়ে পয়সা কামায়। ওরা মিডিয়ার লোক। অনুষ্ঠান তৈরি করে ওরা কোটি টাকা কামায়। আমাদের সংস্কৃতি প্রদর্শনের নামে ওরা একেকটা অনুষ্ঠান বানাবে (event creation)। সেই অনুষ্ঠানে বিজ্ঞাপন বাবদ বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে ওরা লাখ লাখ টাকা কামাবে, পার্টনার এজেন্সি এবং প্রোমোটারের কাছ থেকেও পয়সা কামাবে। আর এই লক্ষ-কোটি টাকার কিছু উচ্ছিষ্ট ভাগ দেবে আমাদের শিল্পীদের পারিশ্রমিক হিসাবে। আমাদের সংস্কৃতি বাঁচলো কি মরলো তাতে তাদের মাথা ব্যথা নেই। মূল ব্যাপারটা হচ্ছে ব্যবসা। ওদের ব্যবসার সাথে আরও অনেকের ব্যবসা জড়িত। তারা চায় এখানে চ্যানেল আইয়ের মতো মিডিয়ার কার্বারিরা ঢুকুক।

 

★খেয়াল করুন, ওরা আমাদের সংস্কৃতির কোন অংশটাকে প্রচার করে- মারমাদের সাংগ্রাই, জল উৎসব এবং উৎসব সংস্লিষ্ট অনুষ্ঠানাদি। অর্থাৎ আমাদের সংস্কৃতির উৎসবের দিকটাকে ওরা তুলে ধরে।

এখানে “বিশেষভাবে” উৎসবের বাহ্যিক অংশ যেমন পাখা নৃত্য, কলসি নৃত্য, পানি খেলা ইত্যাদিকে দেখানো হয়। যেকোন সামাজিক উৎসবের অনেক দিক থাকে। সামাজিক উৎসবের ঐতিহ্যগত প্রেক্ষাপট এবং সামাজিক গুরুত্বকে (যা উৎসবের মর্মবস্তু) বাদ দিয়ে শুধু উৎসবের প্রকাশ বা উচ্ছ্বাসের (উৎসবসর্বস্বতা) মানে উচ্ছৃংখলতা। আরো খোলামেলা করে বলা যাক। এর বিশদ ব্যাখ্যা পরের অংশে দেওয়া আছে।

পড়াশোনা এবং চাকুরিসূত্রে আমি পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে দশ বছর ছিলাম। আমাদের অফিসে একমাত্র মারমা ছিলাম আমি। একবার কাজের দরকারে গিয়েছিলাম আরেকটা বিভাগে। সেখানকার কর্মকর্তা আমার সাথে পরিচিত হয়ে বললেন, “আচ্ছা আপনি তো মারমা। আপনাদের প্রধান উৎসব তো সাংগ্রাই, তাইনা? ঐ সময় আপনারা পানিখেলা করেন,  ঠিক না? আমি টি ভি তে দেখেছি।”

সেই কর্মকর্তার সাথে যে অভিজ্ঞতাটা হলো একইরকম অভিজ্ঞতা অসংখ্যবার হয়েছে। সেই কর্মকর্তা একজন উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি। তাঁর কাছে মারমা আদিবাসী মানে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী, অশিক্ষিত উপজাতি যারা উৎসব প্রিয়, যারা সাংগ্রাই করে-জলকেলি করে। বাংলাদেশর সংখ্যাগুরু মানুষের মধ্যে আমাদের বিষয়ে এরকমই ধারণা। বাংলাদেশের মিডিয়া এভাবেই আমাদের বাঙালিদের কাছে তুলে ধরে। কিন্তু তারা তুলে ধরে নাঃ

  • আমাদের দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। আমাদের প্রাত্যহিক জীবনসংগ্রাম।
  • আমাদের কৃষ্টি-সংস্কৃতি, প্রথা, সামাজিক আচার-বিচার, নীতি-নৈতিকতা-মূল্যবোধ। মুসলিম বাঙালি সমাজের তুলনায় আমাদের সমাজে নারীদের অবস্থান উঁচুতে। নারীর প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি মিডিয়াতে দেখানো হয়না।
  • আমাদের সামাজিক অনুষ্ঠান এবং উৎসবের সামাজিক গুরুত্ব, ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট।
  • রাষ্ট্র কর্তৃক আমাদের শোষণ বঞ্চনা, গনহত্যার ইতিহাস। মনে করে দেখুন আমাদের পাহাড়ে এত গনহত্যা হলো, আমাদের এত আত্মীয়-স্বজন মারা গেলো, আমরা দেশান্তরী হয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলাম। আমাদের জমি-পাহাড়- আমাদের জন্মভূমি সেটেলারদের আগ্রাসনে বেদখল হয়ে যাচ্ছে। তার এক সেকেন্ড খবর কি কখনো মিডিয়ায় দেখেছেন?

প্রতি বছর পাহাড়ে রাষ্ট্রীয় মদতে সেটেলারদের হাতে আদিবাসীদের ভূমি বেদখল হয়ে যায়। বাংলাদেশের মিডিয়া কি সেই কথা বলে? বছর বছর আমাদের ঘর পুড়ে সেটেলারদের আগুনে। সেই কথা কি মিডিয়া বলে? পাহাড়ের আড়ালে আদিবাসীদের কান্না পাহাড়ের পাথুরে গায়ে প্রতিধ্বনিত হয়। বাংলাদেশের মিডিয়া সেই কথা বলেনা। সেটেলারদের হাতে লাঞ্ছিত হয় আমাদের মা-বোনেরা, মিডিয়া কি সেই কথা বলে?

-বলেনা। মিডিয়া এই ক্ষেত্রে টুঁ শব্দটা করেনা। তাহলে মিডিয়া কেন আমাদের আমোদ-ফুর্তিবাজ হিসাবে দেখাতে চায়? কেন আমাদের জনপদে মদের বন্যা ঘটাতে

চায় রাষ্ট্র, প্রশাসন, মিডিয়া?

–     প্রশ্নগুলো সহজ, উত্তরতো জানা। কারন তারা আমাদের জনপদকে থাইল্যান্ডের অনুকরণে সেক্স ট্যুরিজমের দেশ বানাতে চায়। লাস ভেগাসের মতো জুয়া-মদ-যৌনতার রাজধানী বানাতে চায়। যেখানে দেশ বিদেশের পর্যটকেরা ফুর্তি করতে আসবে। নগরজীবনে ক্লান্ত শহরের বাবু এখানে আসবে ক্লান্তি দূর করতে- আদিবাসী মেয়েছেলে আর সুরার সাগরে ভাসতে।

আমাদের উপরে রাষ্ট্রীয় শোষণের খড়গ নেমেছে কয়েক দশক হলো। সেই খড়গে বলি হয়েছে অগণিত আদিবাসী। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর এই স্বাধীন দেশে গনহত্যা হয়েছে। আর সেই গনহত্যায় শত শত আদিবাসীকে হত্যা করা হয়েছে। আদিবাস নিধনের হাত থেকে বাঁচতে যারা শরনার্থী হয়ে ভারতে পালিয়েছিলো তারা ফিরে এসে দেখে তাদের ভিটেমাটিতে এখন সেটেলারদের বাড়-বাড়ন্ত বসতি। আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের মাটি, আমাদের লোকালয়, আমাদের নারী, আমাদের অস্তিত্ব কিছুই আর নিরাপদ নয়। আমরা আদৌ নিশ্চিত নই যে আমরা আগামী কুড়ি বছর পর আমাদের ভিটে- মাটিতে নিরাপদে থাকতে পারবো কিনা। রাষ্ট্র এভাবেই আমাদের শোষণ করে চলেছে। পাহাড়ে পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটানো আসলে আমাদের শোষণের নতুন পদক্ষেপ। পাহাড়ে পর্যটন শিল্পের বিকাশের মাধ্যমে আদতে রাষ্ট্র আমাদের প্রান্তিকতার শেষ সীমায় ঠেলে দিতে চায়। পর্যটনের ফলে আমাদের পণ্য বানিয়ে রাষ্ট্র আমাদের বেচতে চায়। আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের নৈতিকতা-সামাজিক শৃঙ্খলা, সামাজিক মানুষ হিসাবে ব্যক্তিক আত্মমর্যাদাবোধ- সব কিছু ধ্বংস  করতে চায়। যাতে আমরা হয়ে যাই চিড়িয়াখানার প্রানীর মতো দর্শনীয় উপজাতি, ভোগ করার মতো নারীমাংস, ধ্বংসম্মুখ-বিলুপ্তপ্রায় উপজাতি।

(৪)উচ্চতর শোষণতন্ত্র

প্রশ্ন হচ্ছে পাহাড়ে বিশেষভাবে পর্যটনশিল্পের বিকাশ কেন? কেন এত শিল্প থাকতে পর্যটনশিল্পকেই বেছে নেওয়া হলো? রাষ্ট্র যদি আমাদের জীবনমান উন্নয়নে এখানে শিল্পের বিকাশ ঘটাতে চায়তো তাহলে প্রথমেই পর্যটনশিল্পকে বেছে নিতোনা। পর্যটনশিল্পের বদলে কৃষিশিল্পের বিকাশ করতো কেননা আমাদের জুম্মরা যুগের পর যুগ ধরে জুম চাষ করে আসছে।  এখানে প্রচুর কৃষি উৎপাদন হয়। এখানকার অনেক কৃষি উৎপাদন ভৌগলিক কারণে স্বতন্ত্র উৎকর্ষে অনন্য যেমন-কমলা, আদা, হলুদ, কলা, আনারস ইত্যাদি। সরকার বা রাষ্ট্র যদি একান্তই আমাদের মঙ্গলচিন্তায় শিল্পের বিকাশ চায়তো তাহলে এখানে সর্বপ্রথম কৃষিশিল্পের বিকাশে কার্যকর পদক্ষেপ নিতো। শিল্পবিকাশের জন্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন, উদ্যোক্তা ও পুঁজির বিকাশ, শিল্পবিকাশের প্রতিবন্ধকতা নিরসন যেমন রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আবশ্যক। তাহলে শিল্পবিকাশের পূর্বশর্ত পূরণ না করে কেন এখানে পর্যটনশিল্পের বিকাশ চায় রাষ্ট্র?

কেননা রাষ্ট্র উন্নয়ন চায়। এখানে পর্যটনশিল্পের বদলে অন্য শিল্পের বিকাশ যাতে আদিবাসী সমাজের ক্ষমতায়ন হয় এমন কিছু রাষ্ট্র করতে পারেনা। কেননা বাংলাদেশ একটি বুর্জোয়া পুঁজিবাদী রাষ্ট্র। এই উন্নয়নের স্বার্থে কিছু “উপজাতিয়” সমাজের ক্ষতি প্রকারান্তরে রাষ্ট্রের জন্যই লাভজনক। কেননা সমাজে নীতি-নৈতিকতা, সংস্কৃতি ও সমাজের মানুষের মর্যাদাবোধ যদি সমুন্নত না থাকে সেই সমাজের মানুষকে দিয়ে নৈতিক সংগ্রাম বা অধিকারের লড়াই সম্ভব নয়। লুম্পেন, দালাল, সুবিধাবাদী জনগোষ্ঠী দিয়ে আর যাই হোক গনমুক্তির লড়াই অসম্ভব।

 

সামাজিক উৎসবের ঐতিহ্যগত প্রেক্ষাপট এবং সামাজিক গুরুত্বকে (যা উৎসবের মর্মবস্তু) বাদ দিয়ে শুধু উৎসবের প্রকাশ বা উচ্ছ্বাসের উৎসবসর্বস্বতাকে কেন সামনে নিয়ে আসা হচ্ছে?

কেননা এখানে সামাজিক গুরুত্বের চাইতে অর্থনৈতিক গুরুত্বটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

সাম্প্রতিক সময়ে কর্পোরেট হাউজগুলো বাংলাদেশের অনেক “বাঙালি সংস্কৃতির উৎসবে” পৃষ্ঠপোষকতা করে থাকে। যেমন লালন মেলা, মধু মেলা, নৌকা বাইচ ইত্যাদি। একইভাবে তারা মারমাদের সাংগ্রাই উৎসবে স্পন্সর করে। আর মিডিয়া সাংগ্রায়ের পানিখেলাকে বেশি ফোকাস করে।

বাঙালি সংস্কৃতির অনেক গুরুত্বপূর্ন দিক তারা পৃষ্ঠপোষোকতা করেনা। খেয়াল করলে দেখা যাবে তারা সেই অনুষ্ঠানকেই স্পন্সর করে যেখানে লোকসমাগম বেশি। কেননা, বেশি লোক মানেই বেশি ক্রেতা যাদের কাছে তারা নিজেদের পণ্য ঢোকাতে

পারবে। এখানে তাদের সংস্কৃতিপ্রীতি বা “সি এস আর” (কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি) একটা গৌণ বিষয়, বড় বিবেচ্য হচ্ছে তাদের বাজার সম্প্রসারন, পণ্যের বাজারজাতকরন এবং প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ভোক্তার কাছে বড় করা।

একই কারণে বাঙালি সংস্কৃতির অনেক গুরুত্বপূর্ন দিন পালন না করে কর্পোরেট মিডিয়া এবং কর্পোরেট হাউজগুলো পয়লা বৈশাখকে সামনে নিয়ে আসে।

এভাবে বাঙালি সংস্কৃতির পয়লা বৈশাখ হয়ে যায় “ গ্রামীণ ফোন পয়লা বৈশাখ” যার লাইভ টেলিকাস্ট করে টিভি চ্যানেলগুলো।

পুঁজিবাদী দুনিয়ায় কর্পোরেট স্বার্থে সংস্কৃতি পাল্টে গিয়ে কর্পোরেট সংস্কৃতিতে রূপ নেয়। সেই কর্পোরেট সংস্কৃতি ঢুকে যায় মানুষ নামের ভোক্তার ডাইনিং টেবিলে, কিচেনে, বেডরুমে।

একইভাবে আদিবাসী সংস্কৃতি প্রভাবশালী, সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক প্রভাবে যখন বিলুপ্তপ্রায় তখন মিডিয়ার কারণে মানুষের সামনে চলে আসে সাংগ্রাইএর পানিখেলা। কেননা এর একটা appeal আছে। জলসিক্ত মারমা তরুণী মিডিয়ার কল্যানে টিভিতে চলে আসে আর ওদিকে হারিয়ে যায় মারমাদের শতবর্ষের সমৃদ্ধ অনেক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। ট্যুরিজমের সাথে এর সংযোগটা বিবেচনা করতে হলে আমরা ব্রাজিলের কথা ভাবতে পারি। ব্রাজিলের রয়াল কার্নিভাল আর সাম্বা নাচ। ব্রাজিলের কার্নিভাল আর সাম্বা নাচ ব্রাজিলকে ছাপিয়ে গোটা বিশ্বে পরিচিতি পেয়েছে। প্রতিবছর কার্নিভালের সময় পতিতাবৃত্তি বেড়ে যায় স্বাভাবিক সময়ের চাইতে বহুগুণ।

Council on Hemispheric Affairs (COHA) এর গবেষক Melissa Beale এর মতে

“The commercial view of Brazil is that it is a country of samba, football and carnival. Unfortunately, many tourists visit the breathtaking country not for its culture, but for its renowned reputation of exotically striking people and as a center of personal freedoms. This erotic picture of Brazilians has gained negative attention from inappropriate tourists seeking sexual experiences abroad, whether or not it is consensual or legal, – thus, the sex tourism begins.”

একইভাবে রাষ্ট্রের আদিবাসী হিসাবে মারমাদের ঐতিহ্যগত স্বকীয় অস্ত্বিত্ব, সাংস্কৃতিক বৈচিত্রকে স্বীকার না করে তার উৎসবসর্বস্বতাকে প্রচারের মধ্যেও একটা দূরভিসন্ধি আছে। রাষ্ট্র কি তাহলে চায় যেন

পর্যটকেরা পানিখেলা, আদিবাসী নারীর নৃত্য আর উৎসব দেখে পাহাড়ে ছুটে আসুক?

বাজিল কার্নিভাল, সাম্বা নাচ আর পতিতাবৃত্তির ডলারে দেশের “উন্নয়ন” করে। সেভাবে বাংলাদেশর সরকারও কি চায় “উপজাতীয়দের মদ, উপজাতীয় নারীর নাচ, উপজাতীয়দের উৎসব আর পানিখেলায় জলসিক্ত যৌনাবেদনময় নারীর” আকর্ষনে এখানে আরেকটা ব্রাজিলীয় কায়দায় উৎসবমুখর পরিবেশে আদিবাসীদের বিক্রি করা হোক?

এন জি ও’রা  নিজেদের উন্নয়ন সহায়ক বা উন্নয়নকর্মী বলে দাবি করেন। তাদের কাছে “উন্নয়ন” শব্দের বহুমাত্রিক এবং অনেক ভারী ভারী সংজ্ঞা আছে। সরকার সহ আন্তর্জাতিক “উন্নয়ন সহযোগী” যেমন বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বাতলে দেওয়া উন্নয়ন ধারণা দরিদ্র দেশের কাছে এক মায়ামৃগ যার পেছনে বাংলাদেশের মতো রুগ্ন অর্থনীতির দেশ নিরন্তর ছুটছে কিন্তু নাগাল পাচ্ছে না। এতসব বাঘা বাঘা পন্ডিতের উন্নয়ন নিয়ে মাথা ঘামানো দেখে মনে হয় উন্নয়ন যেন এক প্রপঞ্চ। বৈশ্বিক নীতির নির্ধারক যারা, যাদের প্রেসক্রিপশনে বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র দেশের ভাগ্য নির্ধারিত হয় তারাই ঠিক করে দেন উন্নয়ন কিভাবে হবে-কাদের হবে। বাংলাদেশের ইতিহাসে দেখা যায় গরিবী দূর করার জন্য যত বিদেশী টাকা এদেশে আসে তার সিংহভাগ ক্ষমতাসীনের মন্ত্রনালয় এবং ক্ষমতার কাছাকাছি মানুষেরা ভাগযোগ করে গিলে খায়। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় উন্নয়ন মানে বিশেষ শ্রেনীর উন্নয়ন। ধনিক শ্রেনীর উন্নয়ন। উদোমবাজারি-কানাবাজারি কারবারে ধনী আরো ধনী হয় আর গরীব আরো গরীব হয়। পর্যটন শিল্প তেমনই এক মায়ামৃগের কারবার এবং মুনাফা শিকারের মৃগয়া যেখানে আদিবাসীরা শিকারে পরিণত হবে।

পুঁজিবাদী উন্নয়নের অন্যতম সূচক হচ্ছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। সোজা হিসাবে জিডিপি বাড়লে অর্থনীতির আয়তন বাড়বে ফলস্বরূপ তার প্রবৃদ্ধি বাড়বে। এখন জিডিপি বাড়ানো এবং গড় আয় বৃদ্ধি একটা শুভঙ্করের ফাঁকিবাজী যেখানে একজন এক টাকা রোজগারের মানুষ আর আরেকজন ১০০ লক্ষ টাকা আয়ের মানুষের আয় ভাগ করে গিয়ে দাঁড়ায় জনপ্রতি ৫০ লক্ষে। কোথায় ১ টাকা আর কোথায় ৫০ লক্ষ! যাই হোক, সরকার তথা রাষ্ট্র জিডিপিতে পর্যটনের অংশটা বাড়াতে চান।

কিন্তু সব সম্ভবের দেশে কিছু বুমিং ( Booming) শিল্প খাতে কি দেখা যায়? বাংলাদেশে প্রধান রপ্তানি আয় আসে গার্মেন্টস থেকে। শ্রমিকের শ্রম নিংড়ে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় বাড়ে কিন্তু সেই শ্রমিকের কি হাল? এখানে প্রতি ঘণ্টায় ন্যুনতম মজুরি শূন্য দশমিক ১২ ডলার যা বিশ্বের যেকোন দেশের মধ্যে সর্বনিম্ন। কমপ্লায়েন্স ও শিল্প আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কারখানায় ন্যুনতম নিরাপত্তা রাখা হয়নি। পরিবেশের তেরোটা বাজিয়ে জাহাজ ভাঙার শিল্পে আনা হচ্ছে তেজস্ক্রিয় বর্জ্যে ঠাসা জাহাজ আর শ্রমিকের শ্রম অমানবিকভাবে নিংড়ে বাড়ানো হচ্ছে দেশের জিডিপি। অবশ্য কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য সবকিছুই জায়েজ কেননা প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে গেলে গরিবের শ্রম নিংড়াতেই হবে এবং পরিবেশ দূষনের কথা ভাবা চলবে না। সুতরাং সুযোগ ব্যয় তত্ত্বের ফাঁদে শ্রমিকের শ্রম নিংড়াতেই হবে।

সুতরাং প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হলে আদিবাসীদের বলি দিতেই হবে। বিনিময়ে আদিবাসী সমাজের কি ক্ষতি হলো তাতে রাষ্ট্রের চিন্তিত হবার কোন কারন নেই।

ANITA PLEUMAROM  একজন ভূতত্ত্ববিদ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তিনি “South-East Asia Tourism Monitor” নামক একটি পত্রিকার সম্পাদক এবং ব্যাংকক ভিত্তিক “Tourism Investigation & Monitoring Team (tim-team)” সংগঠনের সমন্বয়ক।

তাঁর মতে পর্যটন শিল্প “একধরনের উন্নয়ন আগ্রাসন” (development aggression)

অর্থাৎ উন্নয়নের মোড়কে আগ্রাসন। কেন তিনি পর্যটনকে আগ্রাসনের সাথে তুলনা করেছেন? তিনি বলেন যে,

“Women in tourism are found to have the most dehumanising and the worst-paid jobs. Tourism has an infamous reputation of boosting the sex industry wherever it takes root. Efforts to make industry comply with the Code of Ethics promoted by the UNWTO have not helped to curb trafficking in women and girls for sex work in tourist destinations, which in many cases  deprives the victims of their fundamental human rights and exposes them to health risks such as HIV/AIDS.

Industry self-regulation has proven an utterly inadequate tool in tourist centres, such as Pattaya in Thailand, Cancun in Mexico or Johannesburg in South Africa, where the sex, drugs and crime, gang violence, mafia-style politics and corruption are out of control.

The erosion of culture and traditional values is visible in all tourist destinations driven by over-commercialisation.  Even many of the UN Educational, Scientific and Cultural Organisation (UNESCO)’s World Heritage sites are not properly protected from privatisation and ‘Disneyfication’.

Tourism – including ‘ecotourism’ – also exploits indigenous and local communities and their cultures, turning them into mere exhibits for tourists’ entertainment.  ”

 

এখানে তিনি থাইল্যান্ডের শিক্ষা থেকে উপরের কথাগুলো বলেছেন। প্রসঙ্গতঃ ব্রাজিলের মতো থাইল্যান্ডও একটি সেক্স ট্যুরিজমের দেশ।

পর্যটন বিষয়ে বহু গ্রন্থের প্রণেতা Deborah McLaren বলেন যে, “Global tourism threatens indigenous knowledge and intellectual property rights, our technologies, religions, sacred sites, social structures and relationships, wildlife, ecosystems, economies and basic rights to informed understanding; reducing indigenous peoples to simply another consumer product that is quickly becoming exhaustible.”

পরিশেষঃ

লেখার শুরুতেই আমি ঠিক করেছিলাম যে এই লেখাটা খুব সহজবোধ্য করে লিখবো। যাতে আমার লেখা আদিবাসী সমাজের সবাই বুঝতে পারেন। সমাজবিজ্ঞান, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও ইতিহাসের আলোকে দেখানো যায় পাহাড়ে পর্যটনের ফলে আদিবাসীদের জীবনে কি বিপর্যয় হতে পারে। সেই বিশ্লেষনী লেখা আমি ভবিষ্যতে উপস্থাপন করবো।

আমার লেখা আরো বিশ্লেষণী এবং ভারী করা যেত। কিন্তু আমি চাইনি আমার লেখা কোন থিসিস পেপার হোক। আমি চাই আমার এই লেখা একটা লিফলেটের মতো হোক, একটা হ্যান্ডবিলের মতো হোক যাতে সবাই এই লেখা পড়ে সচেতন হতে পারে।

এই লেখার প্রাসঙ্গিক বিষয় নিয়ে নীচে দেওয়া ওয়েব লিঙ্কে আরো প্রবন্ধ আছে। আমি আমার লেখায় ঐ সব কথার সারকথা বলতে চেয়েছি।

বাংলাদেশের Economic Trend, Industrial Analysis, Industrial Feasibility and profitability Analysis করে দেখিয়ে দেওয়া যায় যে পাহাড়ে পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনা কত। সব তত্ত্বের  বড় কথা হচ্ছে মুনাফা। পাহাড়ে অতিঅবশ্যই পর্যটন একটি লাভজনক খাত।  পুঁজিবাদী দুনিয়ায় মুনাফাই শেষ কথা। মুনাফার জন্য আদিবাসীদের উচ্ছেদ, আদিবাসীদের পণ্যায়ন হলে আদিবাসীদের সমাজ-সংস্কৃতি ধ্বংস হয়ে গেলে রাষ্ট্রের কিচ্ছু যাবে আসবে না। তাহলে আমাদের কি করনীয়?

  • পর্যটনের নামে আমাদের পণ্য করা রুখতে হবে। ( To resist commoditization and marketizaton of Indigenous people, culture and place)
  • চ্যানেল আই সহ মিডিয়ার ব্যাপারী যারা আমাদের সংস্কৃতি বাজারজাত করার হীন চেষ্টা করে তাদের প্রতিহত করতে হবে। প্রত্যেক ব্যক্তি যদি সচেতন হন-মানুষকে সচেতন করেন এবং তাদের প্রতিহত করতে রাস্তায় নামেন তাহলে মিডিয়ায় আমাদের পণ্য হিসাবে প্রদর্শনী করা বন্ধ করা যায়।
  • সব রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন মিলে যার যার অবস্থান থেকে ট্যুরিজমের নামে আমাদের পণ্য করা রুখতে হবে।
  • আমরা যারা রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত নই আমরাও কিন্তু রাজনীতি করি। শাসকের রাজনীতি বা শাসকের শাসননীতির বিরুদ্ধে রাজনীতি। প্রতিবাদ না করে চুপ করে থাকা মানে শাসকের নীতিকেই মেনে নেওয়া। যদি তার বিরুদ্ধে কেউ মত পোষন করেন, আমি মনে করি তার শাসকের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। আর সোচ্চার হয়ে প্রতিবাদ করা, বিক্ষোভ করার একটা পথ হচ্ছে মানুষকে রাষ্ট্রীয় শাসননীতি ও শোষণনীতির বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলা। আমার এই লেখা কোন প্রেমের উপন্যাস নয়। সুতরাং আমি চাইনা এই লেখা পড়ার পর আপনি আমার লেখার কথা ভুলে যান।

আমি চাই আমার লেখা পড়ে মানুষ ভাববে এবং ভাবাবে। আমার লেখা যদি আপনাকে ভাবাতে পারে এবং মানুষের মধ্যে একটা আলোচনা তুলতে পারে তাহলেই আমার লেখা স্বার্থক। তাই এই লেখাটি পড়ার পর আর সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিন।

http://www.planeta.com/planeta/99/1199globalizationrt.html

http://www.countercurrents.org/sasi230812.htm

http://www.coha.org/the-infamous-link-between-sex-trafficking-sex-tourism-and-sporting-events-%E2%80%93-what-lies-ahead-for-brazil/

http://www.gale.cengage.com/pdf/samples/sp741209.pdf

http://eprints.lse.ac.uk/15478/1/Cultural_industries_and_cultural_policy_%28LSERO%29.pdf

http://www.prospectmagazine.co.uk/magazine/learningthethaisextrade/

http://www.un.org/esa/socdev/unpfii/documents/BriefingNote1_GREY.pdf

http://www.google.com.bd/url?sa=t&rct=j&q=tourism%2C%20sex%20tourism%20%20threatening%20indigenous%20peoples&source=web&cd=10&cad=rja&ved=0CF0QFjAJ&url=http%3A%2F%2Fwww.twnside.org.sg%2Ftitle2%2Fresurgence%2F207-208%2Fcover1.doc&ei=eqcpUeGDDMXTrQeFq4HIBg&usg=AFQjCNG7w3BrZE2fag5kG28WpDavCh0IEA&bvm=bv.42768644,d.bmk

 

 

 

 

 

About the author

পাইচিংমং মারমা

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/2385

4 comments

6 pings

Skip to comment form

  1. Pu Nong Chan

    this is just aweeeeeeeeeeeeeeeesomeeeeeeeeeeeeeeeeeeeee………carry on brother…we will spread this excellent news to everywhere…If u write,we r ready to share it.

  2. Pychingmong Marma

    সবাইকে অশেষ ধন্যবাদ আমার লেখাটি পড়ার জন্য । লেখার স্বার্থকতা তখনই পরিস্ফুট হবে যদি আমরা সবাই বিষয়টি নিয়ে সিরিয়াসলি ভাবি এবং মানুষকে ভাবাই।

  3. Shanta Chakma

    paiching to make hajar hajar donnovad vobissote jeno aro ai saite
    aro visi likte paro kamona Kore dilam…….

  4. Subas Chakma

    অনেক ভালো হয়েছে এই লেখাটি পড়ে অনেক জুম্ম,জনগন সচেতন হবে ।wellcome p.m. 100000000 [[f9.like]] for u.. 🙂

  5. Samabesh Chakma

    Dosto, Tomai Lal Salam. Prattona kori tomar ai protiva r o bikosito hok abong tomar ai chetona chorea poruk sob jummo jonotar maje.

  6. Pulak Chakma

    পাইচিং মংকে ধন্যবাদ চমৎকার লেখার জন্য। লেখাটা সময়োপযোগী । স্রোতের বিপরীতে চলতে গেলে সাহস ও আদর্শের প্রয়োজন। পাইচিং মং আমাদের চিন্তা-চেতনার বন্ধ্যাত্বকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। আশাকরি একদিন না একদিন আলোর পথ দেখবো।

  7. Khokon Dewan

    osadharon dristivongi jekhane porjon shilper prosarer arale pujibadi omanobikota ar borborota susposto

  8. Mihir Kanti Chakma

    Dhonnobad Paichingmong Marma-k lekhatir jonno.

  9. Diponkar Tripura

    একথায় বলব চমৎকার একটি বিশ্লেষণধর্মী লেখা। যে লেখার মধ্যে সমাজ- সংস্কৃতি, ঐতিহ্যে এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির স্বচ্ছতার সমাবেশ আছে। আছে রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের কূটকৌশল প্রয়োগের হাতিয়ার সমূহের সম্ভাব্যতা বিষয়ে তার মতো করে গভীরতা। লেখার স্বার্থকতা তখনি বোঝা যায় যার মধ্যে দিক নির্দেশনা এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থার একটি চিত্র উপস্থিত থাকে এবং উপস্থিত থাকতে হয় সমাজের দায়িত্বশীল ভূমিকার প্রতি ইঙ্গিত ।

    আমাদের সমাজ ব্যবস্থা যে, এসব কিছু বুঝে না যে তাও কিন্তু নয়। তারপরও নিজেদের ধ্বংসের দিকে আমরা নিয়ে যায়। ভবিষ্যৎকে নিয়ে আমরা আমাদের স্বপ্ন রচনা করিনা। চিন্তার এবং দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে ফারাক আমাদের প্রচুর রয়েছে।এসব সীমাবদ্ধতা গুলো নিয়ে আমরা কাজে নেমে পড়ি। অর্ধ পথে হতাশার নিমজ্জিত হতে হয়। আর রাজনৈতিক -অর্থনৈতিক এবং সামাজিক পরিকল্পনা প্রণয়নের ক্ষেত্রে দিক- বেদি বুঝতে না পারার মধ্যে সীমাবদ্ধতা। আমরা মনে করি মিডিয়া কাভারেজ করা মানে তার গুরুত্ব বেড়ে যাওয়া। এটাকে নিয়ে যে, ব্যবসা হয়, মনোরঞ্জনের খোরাক হিসেবে উপস্থাপন করা হয় তানিয়া আমরা চিন্তা করি না। উল্টো এ নিয়ে উচ্চ বাচ্য বলা মানে হচ্ছে নিজের ব্যক্তিসত্তায় আঘাত হানা।

    রাজনৈতিক -অর্থনৈতিক- সামাজিক চিন্তা-চেতনার দিক দিয়ে আমাদের সমাজ ব্যবস্থা সমান্তরাল এগিয়ে যেতে পারেনি।সমাজের সামাজিক দায়বদ্ধতা কি, দায়িত্ব কি তাই আমরা জানি না। সম্মানিত ব্যক্তিকে সম্মান দেয়া এবং অসৎ কে ভৎসনা করতে হয় তাই না করে উল্টোটা আমরা করি। আমরা সহজে প্রলোভনের স্বীকার হয়।সামাজিক অবক্ষয়ের সীমানায় দাঁড়িয়ে আমাদের সামাজিক ব্যবস্থা। রোগাক্রান্ত একটি জাতিতে পরিণত হতে চলেছি। আমরা অতি সস্তা দামে নিজের বিকিয়ে দিই, বিলিয়ে দিতে চায়।

    আমাদের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে আমরা আমাদের দ্বারা আক্রান্ত হতে দেখি। গৌরবময় ইতিহাসকে ছুরি কশাঘাত হতে দেখি। আমাদের সমাজের খারাপ ব্যবস্থার প্রচলন করতে দেখি এবং আমাদের নিজেদের লোক দিয়ে সমাজকে কলুষিত করতে দেখি।আলোচনা কিংবা মতামত প্রকাশ কে আমরা ভিন্নমত হিসেবে চালিয়ে দিতে চায়।
    নিজেদেরকে চিনতে না পারার অক্ষমতা আমাদের পেয়ে বসেছে। আমরা নিজেকে এবং নিজের পরিবারকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনা।এমন অবস্থায় পৌঁছেছে। এভাবে সমাজকে কিংবা বর্তমান ব্যবস্থাকে কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করবো।
    এ ধরনের অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি।
    এ ব্যবস্থার পরিবর্তনের আকাঙ্খা আমাদের মধ্যে এখনো বিদ্যমান আছে। প্রতিটি এলাকার এক একটি গ্রামকে আদর্শিক গ্রাম হিসেবে গড়ে তুলে ধরার প্রয়াস চালাতে হবে। ক্লাব -পাঠাগার সমু হে উন্নত চিন্তা চেতনার বিকাশ ও সম্প্রসারণ করতে হবে। নিজেদের নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।সমাজ -জাতিকে হেয় অপমানিত হওয়ার জায়গাগুলোতে ভূমিকা রাখতে হবে দৃঢ়তার সাথে।
    পাইচিং এর লেখার স্বার্থকতা কামনা করছি এবং বাস্তব ক্ষেত্রে সমাজে এর প্রতিফলন হবে আশা করি।

  10. Mitra Proshad

    অনেক dhonybad

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>