«

»

এই লেখাটি 803 বার পড়া হয়েছে

Print this প্রকাশনা

উৎপল খীসা’র মতামতের জবাবে-

শ্রদ্ধেয় উৎপল খীসা,
ই-পত্রের শুরুতে আমার কুটি কুটি সালাম জানবেন। আশা করি ভগবানের অশেষ কৃপায় আপনার দিনকাল ভালোই কাটছে। এদিকে আমাদের ও কোনমতে এদিক-সেদিক কোরে দিন কেটে যাচ্ছে।
পরসমাচার এই যে, cht24.com –এ মতামত বিভাগে আপনার মতামত দেখে আমি যারপরানই উৎফুল্ল আর আনন্দিত বোধ করছি, এই কারণে যে অনেকদিন পর এক সমালোচকের দেখা পাওয়া গেল! সমালোচক পাওয়া এখন রীতিমত দুষ্কর হয়ে দাঁড়িয়েছে দাদা। এখনকার মানুষ তো ব্যক্তি সম্পর্কের গোড়াটা শক্ত রাখার্থে আলোচনা- সমালোচনা ভূলেই গেছে, তারা এক করে ফেলেছে আলোচনা আর সমালোচনা সংজ্ঞা। আপনি এতোদিনে এই অসাড়তা ভেঙ্গে দিলেন। তাই ভাবলাম যাই আজ তর্কের খাতিরে তর্ক করে আসি এই আন্তর্জালের উঠোনে।
আমার পক্ষ থেকে সমালোচনীয় সালাম জানবেন।

বেশী কথা না বাড়িয়ে কথায় চলে যেতে যাই দাদা। আমি একটি একটি কোরে আলোচনা করবো , একটু ধৈর্য ধরবেন দাদা।

সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে মাতৃভাষার প্রয়োগের কথা বলছেন আপনি আপনার মতামতে। ৬১৭ শব্দের মতামতে আপনি প্রথম থেকেই মাতৃভাষায় রচনার প্রচন্ড গুরুত্ব দিয়েছেন এবং প্রথমেই সচেতন পাঠক সৃষ্টির কথা বলেছেন-
“পাঠক না থাকলে কোন লেখার কি সত্যিকার গুরুত্ব বা তাৎপর্য থাকে? হয়তো থাকে না। কিন্তু লেখার প্রচেষ্টা যদি আমাদের মধ্যে না থাকে তাহলে সচেতন পাঠক সমাজ সৃষ্টি হবে কি করে? আমি মনে করি, আমাদের এই বিষয়গুলো গুরুত্ব সহকারে খেয়াল রাখা উচিত।”

আমার প্রথম প্রশ্ন এখানেই দাদা, আপনিই তো শুরু করতে পারতেন এই সচেতন পাঠক সমাজ সৃষ্টির জন্য যুগোপযোগী একটি লেখনী।

কিন্তু আপনি তা করেননি। আপনিও অন্যদের মতই ভিন্ন ভাষায় সবার কাছে পৌঁছুতে চেয়েছেন। কেন?

 

আপনি যদি শুরু করতেন তাহলে কেউ না কেউ তো আপনার লেখানীর পাঠোদ্ধারে ব্রতী হত এবং আপনার দৃষ্টিতে সে একজন সচেতন পাঠক হিসেবে পরিগণিত হতো। এর ফলে আমরা পেতাম প্রথম সচেতন পাঠক বা সচেতন পাঠক সমাজের প্রথম অংশ।

“একটা সময় পর্যন্ত কিছু কিছু বিষয়ে আমরা হয়তো বাংলায় লেখনির কাজ চালাতে পারি। বাংলায় লেখার মাধ্যমে নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে পারি। যেহেতু আমরা এখনও নিজেদের মাতৃভাষায় লিখতে পড়তে জানি না। তাই বলে আমি বাংলাকে আমাদের লেখার বা সাহিত্য রচনার প্রধান মাধ্যম হিসেবে স্থায়ীভাবে নির্বাচন করতে পারি না। আমাদের লেখকদের কারোরই তেমনটি করা বিচক্ষনতার পরিচায়ক নয় বলে মনে করি। কারন এতে করে আমাদের মাতৃভাষা সাহিত্য কেবল পিছিয়ে পড়ে থাকবে তা নয়, লেখক হিসেবে নিজেরাও নিজেদের কর্তব্য পালনে বা সাফল্য অর্জনে ব্যর্থ হতে থাকব।” 

– দাদা, আসলে আপনি প্রয়োজন বলতে ঠিক কি বুঝিয়েছেন আমাদের আরো স্পট কোরে দিলে ভালো হতো। এখনো পর্যন্ত তো আমরা সব ধরণের কাজে বাঙলাকেই ব্যবহার করে থাকি শুধুমাত্র মুখের ভাষাটা আমাদের নিজস্ব ভাষা।

সাহিত্য রচনার প্রধান মাধ্যম হিসেবে বাঙলা-কে না ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন এবং লেখকদের বিচক্ষনতার পরিচায়ক নয় বলে মনে করেছেন। তাহলে আপনি কি মনে করছেন এ পর্যন্ত যারা যারা লিখে এসেছেন তারা সবাই অবিচক্ষনতার পরিচয় দিয়েছেন? আজ থেকে ৬০/৭০ বছর আগে যারা প্রথম বাঙলায় কবিতা লিখেছিলেন তাদের –কে চাকমা কবিতার প্রথম আধুনিক হিসেবে ধরা হয়।  (দেখুন- ভগদত্ত খীসা স্মারক গ্রন্থ, সুহৃদ চাকমা স্মারক গ্রন্থ) ।
তাদের সবার হরফ ছিলো বাঙলা। তাহলে কি তারা আধুনিকতার শুরু  করেনি আপনি বলতে চাইছেন নাকি পেছনে যেতে বলছেন আমাদের ?

 

“ ভাবতে লজ্জা লাগে যে, আমরা নিজের মাতৃভাষাকে প্রাধান্য না দিয়ে বা বাদ দিয়ে বাংলা বা অপর কোন বিদেশি ভাষায় নিয়ত চমৎকার গল্প কবিতা নিবন্ধ লিখছি। আর কিনা নিজের জাতির অস্তিত্ব রক্ষার জন্যে অবিরাম কান্নাকাটি করে চলেছি। এটাকে কি আমরা দ্বি-মুখীটা বলব? এটা কি আমাদের জাত রক্ষার নামে এক ধরনের অরন্য রোদন নয়?” 

– লজ্জা লাগাটাই স্বাভাবিক । কারণ এটা আমাদের সীমাবদ্ধটাকেই প্রকটভাবে প্রকাশ করে। তবে এটা যে আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য ক্রিয়াশীল একটি সচেতন মাধ্যম তা আপনি স্বীকার না করলেও আমি করতে বাধ্য, কারণ এই বাঙলা ভাষার মাধ্যমেই আপনি আপনার দাবি-দাওয়া জানাচ্ছেন। এখনো পর্যন্ত আমাদের নিজেরদের ভাষায় কিছু হয়েছে এমন নজির নেই।

হ্যাঁ, এটা আপনি বলতে পারেন উত্তর-উপনিবেশ চেতনা থেকে খারাপ হয়েছে, উত্তররাধুনিক সাহিত্য মানসে এটা লজ্জাকর এবং আমাদের দূর্বলতার প্রতীক, কিন্তু দাদা, এই সমস্ত  উত্তররাধুনিক , উত্তর-উপনিবেশ টার্ম কে বুঝতে চায় বলুন? সবাই তো নিজেরদের নিয়ে ব্যস্ত।
এই প্রসঙ্গে একটা গল্প মনে পড়ে গেলো, সারাংশটুকু বলি-
সৌদি ফেরত এক যুবক তার মার কাছে পানি চেয়েছিলো সৌদি ভাষায়, তার মা আকুল হয় তার ছেলের কষ্ট দেখে এটা-ওটা দেয় কিন্তু বুঝতে পারে না আসলে তার ছেলে কি চাইছে , আর এদিকে ছেলে পানি চাইতে চাইতে মরেই গেলো

আপনি নিশ্চয়ই একজন বাঙ্গালির কাছে গিয়ে বলেন না- পানি হেম, মরে এক্কা এক গলজ পানি দো।

“আমাদের এও খেয়াল রাখা দরকার যে, আমরা নিজেদের মাতৃভাষা চর্চার মধ্যে দিয়ে শেখার বা জ্ঞানার্জনের কথা প্রায়ই বলে থাকি। সেটার সুব্যবস্থা নিশ্চিত করবার জন্যে সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে থাকি। সেটা অত্যন্ত ন্যায়সঙ্গত বলে মনে করি। কারন রাষ্ট্রকেই তার সকল নাগরিকদের শেখার জানার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রত্যেক জাতির সাহিত্য সংস্কৃতি সুরক্ষা বিকাশের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে দায়বদ্ধ থাকতে হবে। এটা অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্যে হলেও রাষ্ট্রের নিশ্চিত করা দরকার। কিন্তু সে জাতিই যদি সেসব ক্ষেত্রে অগ্রণী ভুমিকা গ্রহণ না করে তাহলে সেটা কিভাবে সম্ভব হবে? তাই প্রশ্ন জাগে, পরের মুখাপেক্ষি হয়ে কি সমৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব? নিশ্চয়ই নয়।”

 

এটা অনেক যুক্তিযুক্ত কথা যার সাথে আমি একমত কিছু বিষয় ছাড়া। আজ রাষ্ট্র যে এই সমস্ত বিষয়ে অধিকার দিচ্ছে না এটা তো সাহিত্য সমস্যা নয় । আপনিও জানেন আমি জানি এই সমস্যা রাজনৈতিক। এই কথাগুলো হয়তো বলতে পারতেন আমাদের রাজনৈতিক কর্তাব্যক্তিগণ এবং সাংস্কৃতিক ইন্সিটিউট-এ কর্মরত সচিবগণ, আগ্রনী (আসলে চাতালীয়) লেখকগণ, কৈ ? তারা তো এসব নিয়ে বলেনি । তারা তো শুরু থেকেই নিজেদের আখের গোছাতেই ব্যতিব্যস্ত ছিলেন।
সাহিত্য শুরুর পর্যায় থেকেই মাতৃভাষার প্রয়োগ একেবারে নেই বললেই চলে। ফলে যা হবার তা হয়েছে । পরবর্তী প্রজম্ন পূর্ববর্তীদের কাছ থেকেই যা শেখার শিখেছে। দোষ আপনি এখন কার ঘাড়ে চাপাবেন মশাই ?

 

অনেককিছু বলে ফেললাম দাদা, প্রয়োজনীয়/অ- প্রয়োজনীয় অনেক কিছু। আরো কিছু বাকি আছে কিন্তু পত্রের কলেবর তা আর হতে দিচ্ছে না। কোন লেখনীর মাধ্যমে আপনাকে অজ্ঞাতসারে আঘাত করে থাকলে দোষ আমার ক্ষমা আপনার। পরিশেষ আপনাকে জ্ঞাতার্থে বলতে চাই  আমি কোনভাবেই বলছি না মাতৃভাষার প্রয়োজন নেই। বরং আমি মাতৃভাষায় সমস্ত কিছু করতে চাই। কিন্তু আপনি যেভাবে ঢালাওভাবে সবাইকে  অবিচক্ষন, অন্য ভাষায় লেখা হয় বলে আপনি লজ্জায় কুঁকড়ে যাচ্ছেন সেখান থেকেই আপনার সাথে আমার মতপার্থক্য। ভালো থাকবেন দাদা, ভগবান আপনার উপর অশেষ কৃপা বর্ষণ করুক।

ইতি

আপনার গুণগ্রাহী

আলোড়ন খীসা

 

 

About the author

জুম্মো ব্লগার

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/2369

1 comment

2 pings

  1. Aloran Khisa

    কিছু বিষয় নিয়ে ফেবু-তে আরো কিছু কথা বলেছেন যার সাথে আমি সহমত। সামনে আরো কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করার ইচ্ছে পোষণ করছি। ধন্যবাদ দাদা আপনাকে@ Utpal Khisa

  2. Aloran Khisa

    Diponkar [email protected] ধন্যবাদ দাদা , আশা করছি এই বিষয় নিয়ে আরো আলোচনা হতে পারে ।

  3. Diponkar Tripura

    উৎপল দাকে ধন্যবাদ দিয়ে আমার মতামত প্রকাশ করছি। কারো আলোচনার সূত্র ধরে আলোচনা নয়। সম্পূর্ণ আমার মতামত ব্যক্ত করছি।
    আমাদের মাতৃভাষায় সাহিত্য চর্চার প্রয়োজনীয়তাকে অনুভব করে গুরত্ব দিয়ে উৎপল দা’ র এ লেখা। লেখকের লেখার উপর সকলের সমালোচনা করার অধিকার আছে। সে সমালোচনা গুলো মতামত যোগ করার ভিত্তিতে এগুতে পারে। যার মধ্যে দিয়ে লেখাটির সার বস্তু উঠে আসবে।
    মাতৃভাষায় যে কোন জিনিস চর্চার করা মানে হচ্ছে ভাষাটি আরো বেশি সমৃদ্ধ হওয়া এবং ভাষার গাঁথুনি মজবুত হওয়া।
    পার্বত্য চট্টগ্রামের জাতিসত্তা সমূহের মাতৃভাষার মাধ্যমে সাহিত্য চর্চার গুরুত্ব অপরিসীম।কিন্তু এমতাবস্থায় মাতৃভাষা চর্চা বর্ণমালা ব্যবহার করে করলে কতটুকু ফলপ্রসু হবে আমার বোধগম্য হয় না।এটি সাধারণ মানুষের কাছে বা কতটুকু আবেদন জানাবে আমার চিন্তায় কুলায় না। একটি ভাষা বিকশিত হয় তখনি যখন ভাষাটা ব্যবহারের লোক সংখ্যা বেশী হয়।
    পার্বত্য চট্টগ্রামে ভিন্ন ভাষাভাষীর মধ্যে নিঃসন্দেহে চাকমা ভাষাটি সমৃদ্ধ। কারণ ভাষাটি সহজ এবং প্রয়োগের ক্ষেত্রটাও প্রচুর। স্বাভাবিকভাবে বিকশিত হয়েছে।নিজস্ব বর্ণমালা প্রয়োগ করে যে, ভাষা চর্চাটা যে করতে হবে তাতে পুরোপুরি আমি একমত নই।বাংলা বা রোমান হরফ ব্যবহার করেও একটি ভাষা সমৃদ্ধ হতে পারে।এতে হয়ত ভাষার বিকৃতি সুর কিছুটা পরিবর্তন হয়। কিন্তু তার পাশাপাশি নিজস্ব বর্ণমালার চর্চা হতে পারে এবং তা নিয়ে সাহিত্য গান রচনা হতে পারে। আমাদের ভাষার গুরুত্বটা যেহেতু রাষ্ট্রীয়ভাবে কোন গুরুত্বপূর্ণ জায়গার মধ্যে নেই সেহেতু আমাদেরকেই তা ঠিক করে নিতে হবে।কোনটা করলে আমাদের ভাষাটা আরা বেশি শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ হবে।
    আমাদের জাতিসত্তার আন্দোলনে ঐক্যের বিষয়ে ভাষা হিসেবে ‘লেংগুয়া ফ্রাংকা‘ ভাষাকে আমরা ব্যবহার করতে পারি।এক্ষেত্রে এটাকে ভালোভাবে প্রয়োগ করতে হবে। যাতে কেউ এটাকে ভূল বুঝার অবকাশ হিসেবে সূত্র খোঁজে না পায়। এটা নিয়ে ও ব্যাপক আলোচনা হতে পারে।
    গ্রামের সাধারণ খেতে খাওয়া মানুষের নিত্য দিনের মুখের ভাষাকে আমরা যদি সাহিত্য রচনা, কবিতা ,গান বা গল্পের মাধ্যমে তুলে ধরতে পারি তাহলে ভাষা সমৃদ্ধ হবে বলে আমি মনে করি।
    ব্যক্তিগত ভাবে ত্রিপুরা ভাষায় কথা কিংবা বক্তব্য দিতে বললে আমি স্বাচ্ছন্দ বোধ করি না। কথার লাইনগুলো সাজাতে পারি না।খেঁই হারিয়ে ফেলি। চাকমা ভাষায় যতটা পারি। এটা আমার ভাষা চর্চার সীমাবদ্ধতা।
    একটু অন্যভাবে চিন্তা করি যদি রাজনৈতিক দাবির শ্লোগান ,মিছিলের শ্লোগান সমুহ আমাদের মাতৃভাষায় হোত তাহলে কিন্তু ভাবটা আরো বেশি আমাদের সাধারণ মানুষের মনে গভীরভাবে গেঁথে যেত। মিঠুন দা সহ পিসিপি’তে থাকার সময় আমরা কয়েকজন চেষ্টা ও করেছিলাম।
    চাকমা ভাষায় ’উজো’ শব্দ দিয়ে যেভাবে লড়াইয়ের মানুষি কতা বা একত্রিত হওয়ার আকাঙ্খা সৃষ্টি করে সে রকম আমাদের নিজস্ব ভাষায় কিছু কিছু শব্দ হয়ত বা আছে যার মাধ্যমে নিজেকে চেনানোর চেতনা সৃষ্টি করবে।
    ভাষার ব্যবহার এবং প্রয়োগের উপর তার বিকশিত হওয়ার মাত্রা নির্ভর করে। আলোচনা হতে পারে আরো ব্যাপক ভাবে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>