«

»

এই লেখাটি 606 বার পড়া হয়েছে

Print this প্রকাশনা

আমাদের সাহিত্য ও সাহিত্যচর্চা

সাহিত্য কোন একটা জাতির জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। কোন একটা জাতির সাহিত্য সেই জাতির ভাষার সাথে সাথে তার সংগ্রামী প্রেক্ষাপট, আধুনিক মানুষের ভাঙ্গা-গড়ার মধ্য দিয়ে সমাজের যে অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন সেটাকেও স্থায়ীত্ব দান করে। কিন্তু, দুঃখের বিষয়, আমাদের যেমন চাকমা-মারমা-ত্রিপুরা-তন্চঙ্যা-রাখাইন প্রভৃতি ১১ জাতির কোন নিজস্ব সাহিত্য ভাণ্ডার এখনো গড়ে ওঠে নি। আমাদের সাহিত্যে কবিতার প্রচলন শুরু হলেও ছোটগল্প বা উপন্যাসের জন্য আমরা আজও মাথা খুড়েঁ মরছি।

ইতিহাসের ধারা বিবেচনা করলে আমরা দেখতে পাই, সর্বপ্রথম আধুনিক হিসেবে যে কোন সাহিত্যে এসেছিলেন কবিরা। এরপর ধীরে ধীরে আগমন ঘটে ছোটগল্পের, অবশেষে জাতির সাহিত্যকে পূর্ণতা দান করে উপন্যাস। আমাদের সাহিত্যগুলোর মাঝে কবিতার চর্চা অনেকদিন থেকে হয়ে আসছে। আমরা দেখতে পাই, আমাদের সাহিত্য আছে লোকসাহিত্য যেটি চারণ কবিদের মুখে মুখে প্রচারিত হয়ে আসছে। এরপর নিজস্ব ভাষার পাশাপাশি এসেছে বাংলা ভাষায় কবিতার প্রচলন। সময়ের প্রয়োজনে এই কবিরা হয়েছেন সংক্ষুদ্ধ, বিদ্রোহ করেছেন শোষণ-অত্যাচারের প্রতি।

কিন্তু, ছোটগল্প? অনেকে হয়তো এ পর্যন্ত কিছু বই লিখেছেন, তা আমার জানা নেই। তবে, ছোটগল্পের ক্ষেত্রে কিছু বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সা র্থক ছোটগল্প বলতে আমরা কি যে মানদন্ড হিসেবে জানি তা কতটুকু এই গল্পগুলো পূর্ণ করেছে? গল্প একটা লিখলেই সেটা ছোটগল্প হিসেবে পূর্ণতা পায় না যদি তার মাঝে সমাজবাস্তবতা এবং জীবনের ছোট ছোট অংশগুলো তার সমগ্র জীবনের অংশকে ফুটিয়ে তুলতে না পারে।

আর উপন্যাস তো বড় একটা প্রেক্ষাপট। কলম্বিয়ান লেখক মার্কেস বলেছিলেন, ছোটগল্প হল প্রেম আর উপন্যাস হল বিবাহ। আমাদের উপন্যাসের সংখ্যা এখনো পর্যন্ত শুন্য। আমাদের সমাজে আধুনিক ব্যক্তির আগমন অনেক আগেই ঘটেছে। কিন্তু এই আধুনিক ব্যক্তির আগমন কিভাবে হচ্ছে, সমাজে তার অবস্থান কেমন, তার পারিপার্শ্বিক অবস্থান কেমন, তার বর্তমানে সমাজের পরিবর্তন কিভাবে হচ্ছে, তাকে ক্রমাগত কিসের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে এবং এর ফলে সে সমাজকে পাল্টানোর জন্য কি করছে এসব প্রশ্নগুলোর উত্তর সুস্পষ্টভাবে সমাধান করতে না পারলে একজন পাহাড়ী লেখক কিভাবে ঔপন্যাসিক হয়ে উঠবে?
ফলে, সাহিত্য চর্চা আজ আমাদের একটা অনুষঙ্গ হয়ে দাড়িয়েছে। কিন্তু চর্চাটা কিসের উপর? কোন সাহিত্যের উপর ভর করে?

বাংলাদেশের নাগরিক হওয়ার কারণে আমাদের হাতের কাছেই আছে বাংলা সাহিত্যের বিশাল ভান্ডার। আমরা ছোটকাল থেকেই বাংলা সাহিত্য পড়ছি পাঠ্যবইগুলোর মাধ্যমে। হয়তো পাঠ্যবই ভীতি ছিল বলে এসব মন দিয়ে পড়া হয়নি কিন্তু তারুণ্যের এই সময়ে এসে এইসব গল্প-উপন্যাস আজ আমাদেরকে ভাবায়। সমাজকে বুঝতে শেখায়, সমাজের বাঁকগুলো এসে আমাদের চোখের সামনে ধরা দেয়, ইতিহাসের পথপরিক্রমা আজ আমরা উপন্যাসের মাধ্যমে জানতে পারি।

আমরাও চাই পাহাড়ী জাতিগুলোর নিজস্ব সাহিত্যের সমৃদ্ধি। সাহিত্যচর্চার মাঝে নিজেকে ক্রমাগত নিয়োজিত করার মাধ্যমেই আসবে এই সমৃদ্ধি। অন্য ভাষার সাহিত্য পড়ার মাধ্যমে নিজেদের জীবনকে সেইসব সাহিত্যের জীবের সাথে মিলাতে হবে। এখন আমরা কি সাহিত্য পড়ছি, কার লেখা পড়ছি, সমাজবাস্তবতায় তার লেখনী কতটুকু গ্রহণযোগ্য এটাও গুরুত্বপূর্ণ।

তরুণ সমাজের মধ্যে দেখতে পাই বাংলা সাহিত্যের লেখকদের মধ্যে হুমায়ুন আহমেদ, জাফর ইকবাল, সুমন্ত আসলাম, আনিসুল হক, ইমদাদুল হক মিলন প্রমুখ এদের বইগুলোর প্রভাব অনেক। এসব লেখক বর্তমানে পাহাড়ী প্রজন্মকে গিলে ফেলেছে। তারা হুমায়ুন আহমেদের বইয়ের পর বই পড়ে শেষ করছে অথচ বইয়ের দোকানে পাশাপাশি অবস্থান করা রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-শরৎচন্দ্র – মানিক-বিভূতিভূষণ-ইলিয়াস’দের বইগুলো ছুয়েঁ পর্যন্ত দেখে না। অনেকে আবার রবীন্দ্র-শরৎচন্দ্র পড়েন, কিন্তু মানিক-ইলিয়াস তাদের কাছে অচ্ছ্যুৎ থেকে যায়।

আর বিদেশি সাহিত্য বললে আমাদের চোখে ভাসে ড্যান ব্রাউন, ফ্রেডরিক ফরসাইটের মুখ। উপন্যাসগুলোর মধ্যে দ্য ভিঞ্চি কোডের মত রোমাঞ্চকর কিছু না থাকলে বই পড়া কি জমে? ঠিক যেমনটা ইতালিয়ান ক্লাসিক স্লো মুভির চেয়ে হলিউডি অ্যাকশন ফিল্ম আমাদের বেশি টানে। আফসোস লাগে যখন দেখা যায়, বিদেশী সাহিত্যের মধ্যে গোগোল, তলস্তয়, দস্তয়েভস্কি, হেমিংওয়ে, ম্যাক্সিম গোর্কি, মার্কেস, গুস্তফ ফ্লবেয়ার, চিনুয়া আচিবি’রা পাশে পড়ে থাকে কোন পাঠকের অপেক্ষায়। ভাল কোন পাঠকশ্রেণী এখনো আমাদের মধ্যে সৃষ্টি হযনি বিধায় তিন পার্বত্য জেলায় ভালো কোন বইয়ের দোকানও নেই। কোন ছোটখাট লাইব্রেরি’তে মাঝে মাঝে ভাল কিছু বইয়ের সমাহার দেখা যায় তবে তার উপর পড়ে যায় ধূলার আস্তরণ।

তাই এখন প্রয়োজন অন্য ভাষার সাহিত্যকে করায়ত্ত করার মাধ্যমে ধীরে ধীরে নিজেদের সাহিত্যের বিকাশ ঘটানো। জাতি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে হলে যেমন আমাদের মৌলিক অধিকারগুলো আদায়ের সংগ্রাম করতে হবে আবার তার পাশাপাশি সাহিত্যচর্চাকেও চালিয়ে যেতে হবে। অনেক সময় সাহিত্য কোন একটা সমাজের পরিবর্তনে বিশাল ভূমিকা রাখে। যেমন- ভলতেয়ার তাঁর সাহিত্য দিয়ে ফরাসী বিপ্লবকে ত্বরান্বিত করেছিলেন, ব্রিটিশদের বিপক্ষে সংগ্রামের সময় শরৎচন্দ্রসহ প্রমুখ লেখকরা তাদেঁর লেখনীর মাধ্যমে বিপ্লবীদের উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। ঠিক তেমনি আমাদের সংগ্রামের পাশাপাশি নিজেদের সাহিত্যের বিকাশও ঘটাতে হবে। সাহিত্য হোক আমাদের পরবর্তী বিপ্লব। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বলেছিলেন, “ভোটের রাজনীতিতে দরকার পোস্টার আর বিপ্লবের জন্য চাই সাহিত্য”। আমাদেরও আজ সেই বিপ্লবের ডাক দিতে হবে সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে। রক্ত দিয়ে সংগ্রাম তো অনেক করেছি এবার না হয় মেধা দিয়ে, শ্রম দিয়ে সংগ্রাম রচনা করি।

About the author

অজল দেওয়ান

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/2123

2 pings

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>