«

»

এই লেখাটি 893 বার পড়া হয়েছে

Print this প্রকাশনা

অতঃপর আমি নি:সঙ্গ শেরফা?

অতঃপর আমি নি:সঙ্গ শেরফা?

আজকে ফেসবুক খুলেই চোখে পড়লো ফেসবুক বন্ধু হেগাবগা চাঙমার স্ট্যাটাস। তিনি লিখেছেন,

চলতি পথে আর কবে ফেইসবুকে দেখা হবে এই অনিশ্চত প্রশ্নকে সামনে রেখে আজকের মত বিদায় নিচ্ছি। কিছুদিন আগে এভাবে চলে গিয়ে অনেক প্রাণবন্ত আলোচনাগুলো মিস করেছিলাম। হয়তো আবারো মিস হবে কোন প্রানবন্ত আলোচনা, মিস করবো বন্ধুদের আড্ডামুখর দিনগুলো। ওডং দা,আমিত দা, কার্বারী, সেদাম দা, আলোড়ন দা, দেবী দিদিদের প্রতি থাকলো বিশেষ কৃতজ্ঞতা।অনিয়মিত ছাত্রটির মত অফ আওয়ারে চেষ্টা থাকবে এই জগতটাকে মাঝে মধ্যে একটু তু মেরে যাওয়ার। সবাইকে শুভেচ্ছা সহ ধন্যবাদ।”

বিদায় শব্দটি শুনলে আমার খুব খারাপ লাগে। হেগাবগা চাঙমা “আজকের মত বিদায়” বললেও “চলতি পথে আর কবে দেখা হবে” তার কোন নিশ্চয়তা দেননি। তাই মনটা আরো একটু ভারাক্রান্ত হয়ে গেলো। তবে মন্তব্যের শেষ তিনি বলেছেন, অনিয়মিত ছাত্রের মত তিনি মাঝে মধ্যে এসে ঢুঁ মেরে যাবেন। হঠাৎ করে তার এরকম অনিয়মিত ঢুঁ মারার কথা শুনলেও সেটা আদৌ হবে কী না বুঝতে পারছি না। তিনি যদি ফেসবুকে না আসেন তাহলে তার জোরালো লেখনি, স্পষ্ট বক্তব্য ও মন্তব্য হতে আমরা বঞ্চিত হবো। এটা খারাপ লাগারই কথা। সেকারণে হেগাবগার বিদায়ের বাণী দেখে বন্ধুবর পপি দেওয়ান প্রশ্ন রাখলেন,

“আপনারাতো একেএকে চলে যাচ্ছেন ? অমিত দাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না আপনারা যারা লেখেন এভাবে চলে গেলে কি হয় ?”

পপির মন্তব্য দেখে আমি আরো আবেগ তাড়িত হয়ে গেলাম।হেবাবগা অনিয়মিত হচ্ছেন। হরি দা লিখতেন, তিনিও বোধয় ক্ষোভে ফেসবুকে বা সিএইচটিবিডি ব্লগে লেখা ছেড়ে দিয়েছেন। অন্যদিকে, ছোটভাই অমিতও তার হতাশার কথা ব্যক্ত করেছিলেন দু’একদিন আগে।তিনি বলেছেন, “মনে হয় লেখালেখি ছেড়ে দিতে হবে”।অমিতের হতাশার সুরও আমার মনকে যেনো করে তোলে। অমিত অনেকদিন ধরে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের বিরুদ্ধে সাহসী উচ্চারণ করে যাচ্ছে। লিখতে গিয়ে কখনো জেএসএস আবার কখনো ইউপিডিএফ-এর সমর্থক নেতা বা আন্ডা নেতাদের কাছ থেকে খোঁচা খেতে হয়েছিলো, কখনো বা জুটেছিলো গালি।কেউ একজন তো অমিতের জন্মদিনে তার মৃত্যু কামনা করেছিলো।এসব ঘটনা সত্যিই সত্যিই পাহাড়ে নৃশংস বীভৎস রাজনীতির নির্দেশক (indicators). এই নির্দেশকগুলো দেখলেই অনুমান করা যায়, আমাদের পাহাড়ের রাজনীতি কোথায় গিয়ে ঠেকেছে। কেবল পাহাড়ের রাজনীতির ময়দানে নয়, ভার্চুয়াল জগতেও জেএসএস-ইউপিডিএফ রাজনীতির কুৎসিত চেহারা ও হিংস্রতার তীব্র রূপগুলো চোখে পড়ে। এই অবস্থায় অমিতরা হতাশ হয়ে পড়ে। লিখতে উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। এসব দেখে আমারও সত্যিই খারাপ লাগছে।

 

হেগাবগা চাঙমা অনিয়মিত হয়ে যাচ্ছেন। তারও হয়তো কারণ আছে। অমিত হতাশ হয়ে লেখনি ছেড়ে দেওয়ার কথা উচ্চারণ করে। পপিও আশাহত হয়ে নিরব প্রশ্ন রাখেন, “আপনারা যারা লেখেন এভাবে চলে গেলে কি[কেমন] হয়?” পরিচিত এসব মুখের কাছ থেকে এরকম হতাশা ও বেদনার সুর বের হতে দেখে আমিও একটু স্মৃতিকাতর হয়ে পড়লাম।তাই তাই দু’কলম না লিখে পারছি না। লিখতে গিয়ে নিজেকে নিজে প্রশ্ন করছি, “অতঃপর আমি নি:সঙ্গ শেরফা?”

 

আমার এ প্রশ্ন রাখার পেছনের গল্পটা বলি।

 

ফেসবুকে আছি প্রায় তিন বছরের বেশি সময় ধরে।এই সময়ের মধ্যে অনেকে এসেছিলেন, আর কিছু সময় থেকে অনেকে উধাও হয়ে গিয়েছিলেন।যে ক’জন বেশি সময় ধরে এই ভার্চুয়াল জগতে বন্ধু হয়ে বেশি দিন অবস্থান করছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন অমিত হিল, সেদামপাঞ্জা চাকমা আরও অনেকে। তবে লেখনির মাধ্যমে বিশেষকরে পাহাড়ের সমসাময়িক ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত ও রাজনীতির উপর লেখালেখি করে অতি পরিচিত হয়ে উঠেছে অমিত হিল। সে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের প্রতি তীব্রভাবে “না” উচ্চারণ করে আসছে। অন্যদিকে বন্ধুবর সেদামপাঞ্জা মহারথী হয়ে উঠেছেন চাকমা ভাষার শব্দ ভান্ডার বৃদ্ধি ও চর্চার ক্ষেত্রে। এই দু’জনের মধ্যে ফেসবুক জগতে সেদামপাঞ্জা আমার অনেক পুরনো বন্ধু। তার নিয়মিত উপস্থিতি এখনো চোখে পড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে বন্ধু হিসেবে যুক্ত হয়েছিলেন হেগাবগা চাঙমা ও জেরবো রাম কার্বারী (JR Karbari)। অল্প সময়ের মধ্যে শেষোক্ত দু’জনও তাদের যুক্তিপূর্ণ বক্তব্য ও স্পষ্ট ভাষিতার জন্যে পরিচিত হয়ে উঠেছেন। আরো একজন আছেন, তিনি হলেন জুম্মোচবাশাল। তিনিও তীক্ষ্ণ মন্তব্য ও লেখনির মাধ্যমে ইতোমধ্যে সবার দৃষ্টি কেড়েছেন।অন্যান্য বন্ধুদের সাথে এসব বন্ধুদের মন্তব্য পড়তে পেলে খুব ভালো লাগে। নিজেও অনেক আলোকিত হই। এই প্রেক্ষাপটে হঠাৎ করে হেগাবগার বিদায় শুনে মনটা একটু ভারাক্রান্ত হয়ে উঠলো আজ।

আর আমি? নিজেকে নিঃসঙ্গ শেরফা মনে হচ্ছে।তবে নিজেকে নিঃসঙ্গ শেরফা আমার কোন ক্ষোভও নেই, হতাশাও নেই।ক্ষোভ-হতাশা, নিন্দা-প্রশংসা, সমালোচনা-কুৎসা ইত্যাদি উপেক্ষা করে “একলা চলো রে” নীতি অনুসরণ করে হলেও সামনে পথ চলা অব্যাহত রাখবো। আমি চলতে চাই।কারণ, এই ফেসবুকে ও ব্লগে পথ চলা শুরু করেছিলাম বলতে গেলে একাই কোন কিছু না জেনে।

এখানে বলে রাখি, প্রথমদিকে ফেসবুক কী জিনিস তা জানতাম না।তাছাড়া আমার নিজস্ব কোন পিসি না থাকায় ফেসবুকে বিলাসী সময় কাটানোর কোনো কল্পনাও করতে পারিনি তখন। একদিন কাজের ফাঁকে খেলারছলে জনৈক বন্ধু আমার নামে একটা অ্যাকাউন্ট খুলে দিয়েছিলো, “এই দেখ, এটা তোমার মুখের বই (ফেসবুক)। এর মাধ্যমে বিভিন্ন মানুষের সাথে যোগাযোগ রাখতে পারবে”।এরপর থেকে প্রতিদিন পেতে লাগলাম অনেক জাংক মেইল (যেমন, বন্ধুত্বের অনুরোধ, অনেক মন্তব্য ইত্যাদি)। সেসব জাংক মেইল পরিস্কার করতে গিয়ে আস্তে আস্তে করে ফেসবুকের সাথে পরিচিত হয়ে গেলাম। ফেসবুকের সূত্র ধরে অনেক ব্লগের সাথে পরিচিত হয়ে গেলাম। প্রথম ব্লগ ছিলো, “সামহোয়ারইনব্লগ”। সেখানে ব্লগ অ্যাকাউন্ট খুললাম।ইচ্ছে ছিলো, কেবল বাঙালদের সাথে জুম্মদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার নিয়ে বিতর্কে নামবো। সেসব ব্যাপার নিয়ে কিছু সময় বাঙালদের সাথে ে“সামহোয়ারইনব্লগে” বিতর্কে নামতাম।

এক সময় বাঙালরা পাহাড়ের দু’ই রাজনৈতিক দল জেএসএস-ইউপিডিএফ-এর মারামারি ও লাশ পড়া নিয়ে আমাকে তীর্যক মন্তব্য করতো। সেসব তীর্যক মন্তব্য হজম করতে না পেরে তারপর জেএসএস-ইউপিডিএফ-এর অসুস্থ রাজনীতি নিয়ে ব্লগ লেখা শুরু করলাম।

এভাবে একা একা পথ চলতে গিয়ে অনেক জুম্ম বন্ধুবান্ধবীর সাথে পরিচিত হয়ে গেলাম। নতুন করে অনেক আদিবাসী ব্লগ ও ফেসবুক গ্রুপ খোলা হয়ে গেলো। সেসব ব্লগ ও ফেসবুক গ্রুপে অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেলাম। CHTBD-এলো, আর এলো ‘পাহাড়ের প্রতিধ্বনি’। CHTBD ও ‘পাহাড়ের প্রতিধ্বনি’তে যুক্ত হয়ে গেলাম আলোড়ন খীসা ও তার সহকর্মীদের সহযোগিতায়। এরপর থেকে চেষ্টা করে আসছি CHTBD ফেসবুক গ্রুপ ও ‘পাহাড়ের প্রতিধ্বনি’তে লেখা দিতে। আর এভাবে নিঃসঙ্গ শেরফা থেকে অনেক জুম্ম সহযাত্রীর খোঁজ পেলাম।

দীর্ঘ তিন বছর সময়ের মধ্যে অনেকে এসেছিলেন, অনেকে হারিয়ে গেছেন। আর অনেকে টিকে আছেন। অনেকে কবিতা লিখেন, অনেকে কলাম লিখেন। অনেক মানুষের ভীড়ে আলোড়ন খীসা, সেদামপাঞ্জা চাকমা, অমিত হিল, হেগাবগা চাঙমা, জেআর কার্বারী ইত্যাদি নাম অতি পরিচিত হয়ে উঠে। তখন আমার খুব ভালো লাগে।

মোটামুটিভাবে বলতে পারি, যারা এসব ফেসবুক গ্রুপ ও ‘পাহাড়ের প্রতিধ্বনি’তে লেখালেখি করছেন, তারা সবাই পাহাড়ের ভ্রাতৃঘাতী বন্ধের জন্যে সাহসী উচ্চারণ করে যা্চ্ছেন। এ ব্যাপারে ইতোমধ্যে বেশ জোরালো দাবীও উঠে এসেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর কাছেও এই ম্যাসেজগুলো যাচ্ছে। এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এসে হেগাবগা চাঙমা ‘অনিয়মিত’ হয়ে যাচ্ছেন, আর ‘অমিত হিল’ জেএসএস-ইউপিডিএফ-এর ‘তোচ্চেপুকদের’ বিরক্তি সহ্য করতে না পেরে লেখা বন্ধ করার চিন্তা করে। স্বাভাবিকভাবে আমার মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে যায়।

এই প্রেক্ষাপটে যদি লেখার সহযাত্রীর অভাব ঘটে, তাহলেও আমি নিঃসঙ্গ শেরফা হয়ে পথ চলতে চাই। যতদূর পারি পথ চলতে চাই।

…………………………………………..

অডঙ চাকমা, ২০ ডিসেম্বর ২০১১

About the author

অডং চাক্‌মা

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/1482

2 comments

  1. আলোড়ন খীসা

    Odong [email protected] দাদা, আমরা এখনো কোন গুরুতবপুর্ণ ইস্যু তৈরি হলেই প্রথমে স্মরণ করি আপনাকে যে আপনি কখন মুখ খুলবেন, কখন আপনার কলম জেগে উঠবে। আমি নিজে কবিতা লিখি তাই বিস্তারিত আপনার মত লেখা আমার পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠেনা । আর কারো কথা বলতে পারি না আমি ব্যক্তিগতভাবে আপনার লেখা পড়ার জন্য আকুল হয়ে থাকি কারণ আমি জানি একটি কবিতা যতোটা না প্রভাব ফেলবে তারচে আপনার চিন্তাযুক্ত লেখা আরো বেশি আঘাত হানবে আমাদের মননের শিরায় শিরায়। হরি দা ব্যস্ত তাই মনে হয় সময় পাচ্ছেন না, আশা করছি খুব দ্রুত-ই তিনি আমাদের সাথে লিখবেন। আমার আশা অমিত সময়-মতই ফিরে আসবে আর হেগাবোগা তার ঝামেলাটা কাটিয়ে উঠে আশা করছি খুব দ্রুত-ই আবার আমাদের সাথে এই পথের পথিক হবে। সুতরাং আপনি নিজেকে নি:সঙ্গ শেরফা ভাববেন না। আমরা আছি, থাকবো।

  2. আলোড়ন খীসা

    ‎Odong [email protected]@ দাদা, কিছুক্ষণ আগে আমার দু-জন বন্ধু ফোন করে বলল তাদের খুব একা লাগছে , আমি যেন সময় পেলে তাদের কাছে গিয়ে তাদের একটু সঙ্গ দিয়ে আসি… হায়রে জীবিকা , আমাকে পিছু ছাড়ে না। কিন্তু তাই বলে মানসিকভাবে কখনোই আমরা দূরে নই। আমরা একে- অপরের খুব কাছাকাছি অবস্থান করছি।। আমাদের মনের দূরত্ব নেই একেবারেই। কেন আপনি নিজেকে একা মনে করছেন ? হেগাবোগা যাবার আগে বলে গেলেন তার যাবার কারণ, আশা করছি সে খুব দ্রুত-ই ফিরে আসবে। আপনি একা নন। আমরা সবাই আছি। হাল ছাড়ার মানুষ আমরা নই। আমরা কিছু করতে এসেছি, কিছু আদায় করতে এসেছি। না করে যাবো না। সাথে আছি…

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>