«

»

এই লেখাটি 1,761 বার পড়া হয়েছে

Print this প্রকাশনা

এক স্মৃতিচারণঃ ফেলে আসা সংগ্রাম-মুখর দিনগুলি

এক স্মৃতিচারণঃ ফেলে আসা সংগ্রাম-মুখর দিনগুলি

১৯৮৩ সাল । চারদিকে মিশিনগানের বিকট শব্দ । মানসিক চাপ আর মৃত্যুর আশংকা সর্বত্র । রাত হলে পুরুষদের পালিয়ে থাকতে হতো ঘরের বাইরে, জঙ্গলে অথবা ঝোঁপে । এমন পরিস্থিতিতে পার্বত্য চট্রগ্রাম হয়ে উঠেছিল ভয়ানক যু্দ্ধের রণক্ষেত্র । আমাদের পরিবারের বেশ কয়েকজন শান্তিবাহিনীর কর্মকর্তা হওয়াতে সেনাবাহিনীর সদস্যরা প্রায়ই অজান্তে মধ্যেরাতে আমাদের ঘরকে ঘিরে ফেলতো । মা' তখন…… ৪-৫ মাসের অন্তঃস্বত্তা । মানসিক চাপ মাকে ভীষনভাবে আঘাত দেই । একদিকে সেনাদের হয়রানি, ভীতিকর পরিস্থিতি অন্যদিকে শান্তিবাহিনীদের পরিবেশন । দৈনিক কমপক্ষে ১৫-২০ জন শান্তিবাহিনী সদস্যর জন্য ভাত রান্না করে দিতে হতো । সারাদিন পরিশ্রমের পর রাতে ভাল এক ঘুম যাওয়ার আশাটুকু পর্যন্ত থাকতো না । রাত হলেই সেনাবাহিনীদের ভয়ে পুরুষবিহীন হয়ে যেতো গ্রামটা । রাতে মা থাকতেন শুধু দাদীমাসহ কয়েকজন মহিলাকে নিয়ে । এভাবে মানসিক যন্ত্রণা মা'কে ভোগায় । প্রতিদিন নতুন নতুন পরিস্থিতির সাথে সংগ্রাম করতে হয় । মাঝেমধ্যে শান্তিবাহিনী এবং সেনাবাহিনীদের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ বেঁধে যেতো । সেসময় মায়ের প্রতিটি আবেগ -অনুভূতির ভাগিদার আমি ও হই । মনস্তাত্বিক পীড়ন আমাকে ও ভোগায় । কারণ তখন মা'র ব্রেন সেলের সঙ্গে আমার ব্রেন সেলগুলোও ওতোপ্রোতভাবে নির্ভরশীল ছিল । সেহেতু মাতৃগর্ভে থাকাকালীন সময় হতে আমাকে ও সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হয়েছে । অবশেষে আমার জন্ম হয় কিন্তু জন্মের পরপরই গোলাবারুদের গন্ধ এবং মিশনগানের বিকট আওয়াজে আমাকে হতভম্ব করে চোখের লোনাজলের স্রোতে ভাসায় । এভাবে চলতে থাকে সময় । শরনার্থী জীবন … হারানো আপনজন এবং বুকভরা ব্যথা ।

আমার জন্ম হয় ১৯৮৩ সালের শেষের দিকে । যেদিন আমি মাতৃগর্ভ থেকে ভূমিস্থ হই সেসময় চলছিল আর্মি এবং শান্তিবাহিনীদের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ । বন্ধুকের গুলিগুলো টিনের ছালের উপর টিনটিন করে শব্দ করলে সবাই বাড়ির পিছনে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করে তবে মা বাড়ির ভিতরেই ছিলেন । বাড়িটি ছিল মাটির গুদাম তাই থাকাটাই নিরাপদ ছিল যদিও পুরুষদের থাকাটা নিরাপদ ছিল না ।

কচি খোকার মা হয়ে ও মাকে শান্তিবাহিনী সদস্যদেরকে প্রতিদিন ভাত রান্না করে খাওয়াতে হতো । একসময় শান্তিবাহিনীদের মধ্যে বিভাজন ঘটলে বাদি দল আমাদের এলাকাটা দখল করে রাখে । আত্মীয় শান্তিবাহিনী সদস্যরা যারা লাম্বা দলে ছিল আর আসতে পারে না । প্রতিদিন খবর আসে আজ ঐদিকে যুদ্ধ হয়েছে -এতজনকে হত্যা করা হয়েছে । যেদিন বাদি দল লাম্বা দলের কাউকে মারতে পারে রাতে চলে আনন্দের বন্যা । মা এভাবে বর্ণনা করেন । আমি অবাক হয়ে মা'র দিকে চেয়ে থাকি আর নিষ্ঠুরতা নিয়ে অপলক চোখে ভাবি -কি যে মানুষ নিজের জাতির ভাই হত্যা করতে পারলে আনন্দে মেটে উঠে ? তবে বাদি দল আমাদের এলাকায় অবস্থানকালে কাউকে ক্ষতি করেনি যদিও দিনরাত খাওয়াতে হতো ।

একদিন চিঠি আসে – চিঠিটি পাঠান লাম্বা দলের এক কর্মকর্তা যিনি আপনজনদের একজন -বলা হয় তাড়াতাড়ি যাকিছু আছে তা নিয়ে ভারতে শরনার্থী হতে; পরিস্থিতি দিনদিন খুব ভয়ংকর রুপ ধারণ করবে । তখন সবে নতুন ধান তোলা হয়েছিল; বাড়িতে এখনো দুই গলা ধান; ২০ টির মতো গরু এবং ১৫ টির মতো মহিষ ছিল । শরনার্থী যেতে হলে এসব ফেলে রেখে যেতে হবে । তাছাড়া বাড়ির চারপাশে ছিল নারিকেল, আম, কাঁঠাল, সুপারি এবং লিচু গাছের বাগান । প্রতিরাতে মানুষগুলো গ্রাম ছেড়ে চলে যাচ্ছে । প্রতিদিন খবর আসে আর্মিরা এতজনকে ধরে নিয়ে গেছে । ঐদিকে তুমুল যুদ্ধ বেঁধেছে । খবর আসে বাতাসে  অথবা কালো ধোঁয়ার মধ্যে দিয়ে । চারদিক আস্তে আস্তে নীরব এবং জনশূণ্য হতে থাকে । এরই মধ্যে অনেকেই আর্মিদের স্পাইগিরি করা শুরু করে দেই । স্পাইরা পরিবারসহ সেনাক্যাম্পের কাছাকাছি অবস্থান নেই । অবস্থা বেগতিক দেখাতে আমরা ও অবশেষে ১৯৮৬ সালের দিকে শরনার্থী শিবিরে পা রাখি । শরনার্থী শিবিরে পৌঁছতে আমাদের সময় লেগেছিল ২৩ দিন । পথিমধ্যে যেসব বৃদ্ধরা হাঁটতে পারেননি সেভাবে ফেলে রেখে যাওয়া হয়েছিল । ভাবতে করুণ লাগলে ও করার কিছু ছিল না । অনেকের মৃত্যু ও ঘটে । পরিবারের সবাইকে একসাথে না দেখলে আমি বেশি কান্নাকরি বিদায় আমাদেরকে ও আলাদা করে থাকতে হতো ।

আমাদের প্রথম শরনার্থী শিবির ছিল করবুকে । যাওয়ার পর অনেকেই কলেরায় আক্রান্ত হই । শিবিরের অনেকের অকালে মৃত্যু ও ঘটে এসব কলেরা/জন্টিস/ম্যালেরিয়াবাহিত রোগে । আমার পেট ও দিনদিন বড় হতে থাকে, অপুষ্টি ঘিরে বসে । বাবাকে অনেক কাটনি করতে হতো । স্থানীয় ভারতীয়দের ঘরে দৈনিক পরের কাজ করে বাড়ির জন্য বাজার করে নিয়ে আসতো । জীবনে এর থেকে কঠিন সংগ্রাম কি আর হতে পারে ? পরে শুনি আমাদের দেশে ফেলে রেখে যাওয়া ঘরটি সেনাবাহিনীরা আগুনে পুড়িয়েছে -গাছের বাগানগুলোকে কেটে দিয়েছে । গরু-মহিষগুলো অন্যরা নিয়ে গেছে । এসময় দাদু এবং দাদীমার চোখে নরম লোলজল জড়িয়ে পড়ে । কত কষ্টকরে এতোকিছু অর্জন সব শেষ হয়েছে । আশাগুলো মিশে যাই চোখের জলে, নীরবে । পরের দেশে পরের ঘরে কাজ করার মতো কঠিন বাস্তবতা । জীবনে কখনো ভাবেনি এমন হবে, যা হয়েছে । পরে আমাদেরকে রেজিষ্টারভুক্ত শরনার্থী করা হয় । প্রতিমাসে কিছু চাল/ডাল পেতাম যা দিয়ে পরিবার চালানো কঠিন ছিল । করবুক থেকে পরে থাকুমবাড়িতে চলে যাই । এরপর চলে যাই সাবরুংয়ে ।

থাকুমবারিতে থাকাকালীন শান্তিবাহিনীদের এলাকা বোরাগি আদামে প্রায়ই বেড়াতে যেতাম । তখন শান্তিবাহিনীর বউ/ছেলে/মেয়েরা আমাদের শরীর থেকে শরনার্থীর গন্ধ পেতো । শান্তিবাহিনীর বউরা তাদের সন্তানদের আমাদের সাথে মিশতে বারন করতো; আর বলতো ঐরা হলো শরনার্থী । এসময় এমন খারাপ লাগতো যা ভাষা দিয়ে বুঝানো সম্ভব নয় । মনেমনে ভাবতাম বড় হলে এক শান্তিবাহিনীর কন্যাসন্তান বিয়ে করে সারাজীবন কষ্ট লাগাবো । হাহাহাহা….। বউরা এতো অহংকারী ছিল যে আমার চোখে এখনো সেসব দৃশ্য বাস্তবের মতো ভেসে উঠে । তবুও মানুষ হিসেবে মানিয়ে নিই । “ক্ষমা মহত্বের লক্ষণ” । তবুও আমি মনে করি চুক্তির পর শান্তিবাহিনীর সকল সদস্যকে পরিবারসহ জনসমক্ষে নিজেদের খারাপ ব্যবহারের জন্য পাবলিকের কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত ছিল । যদিও ক্ষমার বদলে তারা পুনরায় রণ ময়দানে নামেন ।

বয়স তখন ৫ বছর হবে শিবিরের বাজারে বিভিন্ন রকম শাকসব্জি বিক্রি করতে শুরু করি । বিক্রিত টাকা দিয়ে মার্বেল কিনি আর খেলি । এভাবে আমেশ উঠে । দিন কেটে যায় । জীবন সংগ্রাম থেমে থাকে না ।

নতুন প্রজন্ম এসব বুঝবে না; জানবে না । শরনার্থী জীবন কখনো সুখের ছিল না । সেই শরনার্থী জীবনের ছবিগুলো সব হৃদয়ের ফ্রেমে বাঁধা হয়ে রয়ে গেছে । তবুও সংগ্রামে পরাজয় বরণ করতে হয় জানা নেই । এটাই হচ্ছে সত্যিকার অর্থে জীবন সংগ্রাম । অনন্ত দিন/মাস/বছর করে সেই ব্যথাগুলোকে ভুলে যেতে চাচ্ছি যদি ও অনেকসময় আবেগী করে তুলে । তবুও ভবিষ্যতের কথা ভেবে অতীতকে ভুলে যেতে হয় । শুধু শিক্ষনীয় কিছু রেখে দিয়ে । এরজন্য ঐক্যতাকে গভীরভাবে প্রয়োজনবোধ করি । ভ্রাতৃহত্যার মতো জঘন্যতাকে ঘৃণা করি ।

zp8497586rq

About the author

অমিত হিল

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/1361