«

»

এই লেখাটি 1,041 বার পড়া হয়েছে

Print this প্রকাশনা

চুক্তিবাস্তবায়ন ও কিছু কথা

আজকে চুক্তির ১৪ বছর পূর্ণ হলো। জেএসএস (সন্তু লারমা) ও জেএসএস (এম এন লারমা) চুক্তির বর্ষপূর্তি উপলক্ষে যার যার অবস্থান থেকে কর্মসূচী হাতে নিয়েছে। জেএসএসকে দুইভাগে কল্পনা করতে চাই না, এক হিসেবে দেখতে চাই। চুক্তিস্বাক্ষরকারী দল হিসেবে অবশ্যই জেএসএস-এর ভূমিকা অগ্রগণ্য এবং অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।

চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে অনেক কথা হয়েছে এবং হচ্ছে, ভবিষ্যতেও হবে। আজকে ১৪ বছর পরে এসে চুক্তি নিয়ে বেশি কিছু বলার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না।তবে সাধারণ নাগরিক হিসেবে দু’এক কথা বলতে চাই।

স্মরণ করছি, ১৪ বছর আগে চুক্তি স্বাক্ষরের পর সন্তু লারমা দুধুকছড়াতে জনসাধারণের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, “চুক্তি করা যতটা কঠিন, বাস্তবায়ন করা তার চেয়ে কঠিন”।তার এ কথা শুনে তখন মনে হয়েছিলো, তিনি বিজ্ঞ দূরদর্শী রাজনীতিক। মনে মনে বিশ্বাস হয়েছিলো, অন্তত তিনি জানেন, চুক্তিপরবর্তী সময়ে সমাজ পুনর্গঠনে কী কী কাজ করতে হবে। তাঁর প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখে বলছি, আজ ১৪ বছর পরে আমার সেই বিশ্বাস পুরোপুরি ধুলিস্যাত হয়ে গেছে। বর্তমান সময়ে তিনি যেভাবে কথাবার্তা বলছেন এবং কাজ করছেন, তাতে আমার মনে হয়, সন্তু লারমা তার জীবদ্দশায় আর চুক্তির পুরো বাস্তবায়ন দেখে যেতে পারবেন না।

আমার এ কথা শুনে অনেকে হয়তো বেজার হতে পারেন, হয়তো মনে করতে পারেন, অডঙ চাকমা জেএসএস বিরোধী, সন্তু লারমা বিরোধী।না, আমি তা নয়। সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমি কেবল ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিষয়গুলো বলার চেষ্টা করছি।অনুরোধ করবো জেএসএস-এর লোকজনকে জনগণের কথা শুনতে, কে কী বলছে সেগুলো সাদরে গ্রহণ করতে এবং বিশ্লেষণ করতে। জনৈক ফেসবুক বন্ধু বলেছিলেন, “স্যাটেলাইট”। জনগণের স্যাটেলাইটগুলো কী কী বার্তা পাঠাচ্ছে সেগুলো পড়তে এবং বুঝতে আহবান করতে অনুরোধ করবো জেএসএসকে।

এটা মনে রাখতে হবে, কোন চুক্তি পরিপূর্ণ নয়। প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ঘাটতিগুলো পূরণ করতে হয়। তবে যাহোক না কেন, চুক্তির মূল কথা হলো “উভয়ের জন্যে জয়” (win-win situation) অর্জন করা। এই অবস্থাটা সৃষ্টি করতে গিয়ে কিছু জায়গায় ছাড় দিতে হয়, আর কিছু জায়গায় বেশি দিতে হয়। এই “ছাড় দেওয়া বা বেশি দেওয়ার” কারণে কেউ কেউ অসন্তুষ্ট হতে পারে, আবার কেউ কেউ খুশি হতে পারে। এই বাস্তবতায় যাতে কেউ বেশি অখুশি না হয়, কিংবা বেশি খুশি হতে গিয়ে অন্যের দু:খের কারণ না হয় সেসব বিষয়ে দৃষ্টি রাখতে হয়। সে কারণে কোন সংঘাত বা চুক্তি পরবর্তী সময়ে কিছু কিছু অগ্রাধিকারের বিষয় থাকে, যেগুলোর মাধ্যমে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে হয় অথবা স্বাভাবিক রাখতে হয়।এসব অগ্রাধিকারের তালিকাগুলো কী কী হতে পারে? এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোন ফর্মুলা নেই। বাস্তব অবস্থার বাস্তব বিশ্লেষণের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রয়োজন হয়। তবে চুক্তির পরবর্তীতে জেএসএস এভাবে ব্যাপক আলোচনা পর্যালোচনা করে, জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে কোন অগ্রাধিকার তালিকা প্রস্তুত করেছিলো বলে জানা নেই।

আমার বিশ্লেষণ মতে, চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ার কিছু দিক রয়েছে।

১) সরকারের কথা বাদ দিলাম। সরকার তো চাইবে যত কম দেওয়া যায়। এ প্রেক্ষিতে চুক্তির পক্ষ হিসেবে জেএসএস ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। কিন্তু আমার মনে হয়েছে, চুক্তিবাস্তবায়ন নিয়ে শুরু থেকেই যেহেতু জেএসএস-এর নিজস্ব কোন দীর্ঘমেয়াদি এবং সময়সূচী ভিত্তিক কোন পরিকল্পনা ছিলো না। ফলে জেএসএস প্রথম থেকেই হোঁচট খেয়ে আসছে।দিন দিন সরকারের সাথে সম্পর্ক খারাপ করে চুক্তিবাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে তুলেছিলো। তার উপর বিরোধী দল বিএনপি’র নেতিবাচক ভূমিকা তো ছিলো এবং ইউপিডিএফ ছিলো।এসব বিরোধী ফ্রন্টগুলোকে কীভাবে মোকাবেলা করতে হবে, অন্তত নিষ্ক্রিয় রাখতে হবে সে ব্যাপারে জেএসএস-এর কোন কৌশলগত পরিকল্পনা ছিলো না, এখনো নেই। জেএসএস যা করে আসছে তা হলো সাংঘর্ষিক অবস্থান। নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে পুরোপুরি অবহিত না হয়ে সাংঘর্ষিক পথে কীভাবে কী অর্জন হবে সে ব্যাপারে আগে থেকেই কৌশলগত অবস্থান থাকা দরকার ছিলো।

২) ক্ষমতা সুসংহতকরণঃ সংঘাত বা চুক্তি পরবর্তী সময়ে জনসেবা নিশ্চিত করতে হলে নিজের ক্ষমতা আগে সুসংহত করতে হয়। কিন্তু জেএসএস সে পথে যায় নি। কেবল আঞ্চলিক পরিষদ নিয়ে বসেছিলো, কিন্তু জনগণের কাছে জনসেবা বা পাবলিক গুডস পৌঁছে দেওয়ার প্রধান প্রধান প্রতিষ্ঠানসমূহ যেমন জেলা পরিষদ ও উন্নয়নবোর্ড ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিজেদের লোক বসাতে পারেননি। ফলে জেএসএস শুরু থেকেই জনগণের কাছে পৌঁছতে পারেনি। তাদের ব্যর্থতার কারণে দালাল-ফালালরা জেলাপরিষদ চুষে খাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে (অনেকে হয়তো যুক্তি দিতে পারেন, সরকার সহযোগিতা করেনি। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানসমূহে নিজেদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করার জন্যে জেএসএস কোন ভূমিকা পালন করেছিলো কিংবা তৎকালীন সরকারের সাথে সংলাপ করেছিলো বলে আমার জানা নেই)।এসব প্রতিষ্ঠানে জেএসএস নিজেদের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি বলে সরকারের ভেতরে চুক্তিবাস্তবায়নের পক্ষে কাজ করার কোন লোক ছিলো না এবং এখানো নেই।

৩)কিছু বিষয়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত দরকার ছিলো। যেমন, আইনগুলোর মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করা, আঞ্চলিক পরিষদ ও জেলা পরিষদগুলোর বিধান/প্রবিধান তৈরী করা, ‍ভূমি কমিশন কার্যকর করা ইত্যাদি। এসব বিষয়ে জেএসএস বা আঞ্চলিক পরিষদের কৌশলগত কোন পরিকল্পনা বা পদক্ষেপ ছিলো বলে জানা নেই। ডিপ্লোম্যাসির পরিবর্তে শুরু থেকে তারা মুখোমুখি অবস্থানে চলে গিয়েছিলেন। ফলে চুক্তি বাস্তবায়নের প্রশ্নে সরকারের সাথে যে সুসম্পর্ক দরকার ছিলো, সেটা আর থাকেনি। সেই অবস্থাটা আজকে চৌদ্দ বছর পরেও দেখতে পাচ্ছি।

৪) আভ্যন্তরীণ শক্তি সুসংহতকরণঃ এ ব্যাপারেও জেএসএস কোন যথাযথ পদক্ষেপ নিয়েছিলো বলে জানা নেই। একদিকে নিজের পার্টির মধ্যে ঐক্য সুসংহত করা, অন্যদিকে জনগণের কাছে যাওয়া। এ দুটোর কোন উদ্দেশ্য তারা পূরণ করতে পারেনি। উল্টো ইউপিডিএফ-এর সাথে মারামারির পথে চলে গেছে। শেষ পর্যায়ে নিজেরা বিভক্ত হয়ে জেএসএস (সন্ত লারমা) আর জেএসএস (এম এন লারমা) ভাগ হলো। অন্যদিকে, রাজনৈতিক দলের সহায়ক শক্তি হিসেবে নাগরিক সমাজ বিশেষ করে পেশাজীবি, সুশীল সমাজকেও কাছে আনতে পারেনি।জেএসএস যা করতে চেয়েছিলো (বা এখনো চায়) তা হলো সব সংগঠনকে নিজের পতাকা তলে নিয়ে এসে তাদের পক্ষে কথা বলানো। এটা গণতান্ত্রিক আন্দোলনের গতিশীলতার পরিচায়ক নয়। ফলে জেএসএস চুক্তি বাস্তবায়নের পক্ষে সব সময় দুর্বল অবস্থানে ছিলো। আর ইউপিডিএফ-এর সাথে মারামারিতে গিয়ে সুশীল সমাজের একটা আন্তরিক অনুভূতি ছিলো, সেটাতেও প্রশ্নবোধক চিহ্ন তৈরী করেছিলো। কেননা, পরিস্থিতি এমন হয়ে দাড়িয়েছে, চুক্তিবাস্তবায়নের পক্ষে কথা বললে ইউপিডিএফদ, আর চুক্তির বিরুদ্ধে একটু বললেই জেএসএস বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।সুশীল সমাজের লোকজন সেই বিপদের ভাগীদার হতে চায়নি, এখনো হতে চাচ্ছে না।

আরো অনেক কথা বলার ছিলো। এটা আজকে চুক্তির বর্ষপূতি উপলক্ষে একটি তাৎক্ষণিক লেখা হিসেবে দিচ্ছি। ভুলত্রুটি থাকতে পারে, তবে যে কোন আলোচনা সমালোচনা সাদরে গ্রহণ করবো। চুক্তি বর্ষপূতির এই দিনে আমার কিছু চাওয়া হলো

১) জেএসএস যদি সত্যি সত্যি চুক্তি বাস্তবায়নে আন্তরিক হয়, তাহলে তাকে প্রথম অগ্রাধিকার দিতে হবে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত বন্ধ করা। এই ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের ফলে জুম্মদের সামাজিক মনস্তত্ত আজ খুব খারাপ অবস্থায় আছে। সরকার নয়, এখন প্রথম দায়িত্ব হলো জুম্ম সমাজের আস্থা অর্জন করা;

২) কেবল সাংঘর্ষিক পন্থায় চুক্তি বাস্তবায়ন হবে না।সরকারের সাথে বিভিন্ন পর্যায়ে প্রতিনিয়ত ডায়ালগ চালাতে হবে। সেটার জন্যে আঞ্চলিক পরিষদ বা জেএসএস কী কী ভূমিকা পালন করতে পারে সেটা তাদেরকে ভাবতে হবে।

৩) চুক্তিবাস্তবায়ন একটি বহুপাক্ষিক প্রক্রিয়া। কাজেই এখানে অনেক পক্ষের সহযোগিতা প্রয়োজন। সরকারী আমলাতন্ত্র, সামরিক তন্ত্রের সহযোগিতা, অন্তত ইতিবাচক মনোভাব যেমন লাগবে, তেমনি জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতা লাগবে। কেবল বামদলগুলো বন্ধু হলে চলবে না, বিএনপি-জামাত, এরশাদ ইত্যাদি দলেরও সহযোগিতা লাগবে। এ ব্যাপারে আরো বেশি করে চিন্তা করার ও কাজ করার রয়েছে। এছাড়া চুক্তির বিভিন্ন দিক নিয়ে পক্ষে কিংবা বিপক্ষে বিশ্লেষণ ও কৌশলগত/কারিগরি সহযোগিতা নেওয়ার জন্যে পেশাজীবি বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিজ্ঞ অধ্যাপকদের পরামর্শ নেওয়া। তারা একাডেমিক দিক থেকে বিশ্লেষণ দিতে পারেন, সমাধানের পথেও পরামর্শ দিতে পারেন। এ দিকগুলো খতিয়ে দেখা দরকার।

৪) দক্ষতাবৃদ্ধিঃ একা সন্তু লারমা চুক্তি বাস্তবায়ন করতে পারবেন না, সরকারের সাথে সংলাপ চালাতে পারবেন না। তার সাথে দক্ষ কর্মী বাহিনী দরকার। তার সাথে যারা আছেন, তাদের কী প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও যোগ্যতা আছে তী? এই প্রশ্ন নিয়ে জেএসএস বা সন্তু লারমাকে গভীরভাবে ভাবতে হবে।

৫) জনগণের কাছে যাওয়া: চুক্তি বাস্তবায়ন হোক আর না হোক, জনগণের অধিকারের পক্ষে কথা বলতে চাইলে জেএসএসকে জনগণের কাছে যেতে হবে। তৃণমূল পর্যায়ে বিশেষ করে গ্রাম পঞ্চায়েতগুলোকে শক্তিশালি করতে হবে। এই গ্রামগুলো হতে পারে সরকারের বিকল্প আদিবাসী সরকার। এ ব্যাপারে দীর্ঘমেয়াদি ও অর্জন যোগ্য নির্দিষ্ট লক্ষ্য সামনে রেখে পরিকল্পনা ও কর্মসূচী গ্রহণ করতে হবে।

কেবল ”চুক্তিবাস্তবায়ন কর” স্লোগান দিয়ে জনগণের পেট ভরবে না। জনগণের পেটের সমস্যা সমাধানের জন্যেও কিছু কিছু কাজ স্থানীয়ভাবে শুরু করতে হবে, জনগণের উদ্যোগগুলোকে উৎসাহিত করতে হবে। শিক্ষা-চিকিৎসা পরিবেশ, কৃষি ইত্যাদি বিষয়ে জনগণকে সংগঠিত করতে হবে।

About the author

অডং চাক্‌মা

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/1342

1 comment

  1. Biplob Rahman

    লেখকের মূল সূরের সঙ্গে এ ক ম ত। ধন্যবাদ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>