«

»

এই লেখাটি 704 বার পড়া হয়েছে

Print this প্রকাশনা

লাম্বা-বাদি’র ইতিহাসের পোস্ট মোর্টেম রিপোর্ট কার ঘরে ?

রাতের বেলায় জুম্ম চবাশালের অনেক মন্তব্যের সাথে ওদং দার অনুদিত এই মন্তব্যটি ও পড়েছিলাম। বাংলা হরপে লেখাটির এই সংস্কারটি আবারও পড়লাম। আশা করি, জুম্ম চবাশালের বাকী মন্তব্যগুলি নিয়ে আপনিও দেশবাসীকে আরো সুন্দর সুন্দর অজানা তথ্য উপহার দেবেন, উন্মোচন করবেন প্রকৃত সত্য। এই সম্পর্কে আমি যতদূর শুনেছিলাম মনে করতে পারি তারো অনেক কম। তারপরও ঘটনার পটভুমি থেকে অবস্থাকে দেখার চেষ্টা করছি এই ছোট্ট লেখার মাধ্যমে।

(১) যতদূর মনে পরে জ়ে,বি,(সন্তু) লারমা’র গ্রেফতার হওয়ার পিছনে কারনগুলোর মধ্যে প্রধান যে কারন হচ্ছে মিসেস জ়ে,বি, লারমার ছোট বোন তথা জ়ে,বি, লারমার শালিকা সীমা দেওয়ান(সম্ভবত নামটা সীমা)! যে সময় জুম্মসমাজ জাতীয়তাবাদের চেতনাকে ধারন করে জাতীয় মুক্তির জন্য সংগ্রাম করছিল, ঠিক সেই সময় আমাদের তথাকথিত শিক্ষিত জুম্ম নারীদের পেয়ে বসেছিল বাঙ্গাল প্রেমের মাতাল নেশা। জ়ে,বি লারমার শালিকা সীমা দেওয়ান(সম্ভবত নামটা সীমা)ও সেই স্রোতে ভেসে যাওয়া জুম্ম বর্জ্য হয়ে উঠেছিল। আপন শালিকার এহেন দূর্গন্ধময় পঁচে যাওয়াটা সেই সময়ের জাতীয়তাবাদী  সন্তু লারমার পক্ষে সহ্য সম্ভব ছিলো না। তাই তিনি বীর দর্পে এসেছিলেন শালিকাকে উদ্ধারে ত্রাতা হয়ে! কিন্তু পথেই গ্রেফতার হওয়ায় তার স্বপ্ন সেখানে থেম যায়।

(২) যখন পার্টির গোপনবিষয়-আসয় সম্পর্কে বিস্তর জানা একজন সদস্য গ্রেফতার হয় তখন শান্তিবাহিনীকে সচেতন হতে হয়।কারন যে কোন তথ্য প্রকাশ পেলে পার্টির উপর সরকারী বাহিনীর হামলা, এমনকি পার্টির ধ্বংস ও অনিবার্য। তাই পার্টির সিদ্ধান্ত মোতাবেক সন্তু লারমাকে উদ্ধারের জন্য পার্টি অপারেশন চালানোর বিষয় বিবেচনায় নিয়ে প্রস্তুত হতে থাকে। সম্ভাব্য ফিল্ড হিসেবে “কাট্টলীবিল”এর এলাকাকে ধরা হয়। সিদ্ধান্ত মোতাবেক, জীবিত অথবা মৃত সন্তু লারমাকে উদ্ধার করাই হবে অপারেশনের মুল লক্ষ্য। কিন্তু শেষ সময়ে নাকি এম,এন, লারমা’র কাছ থেকে ভেটো এসেছিল। অনেকে এটাকে ছোট ভাইএর জন্য এম,এন, লারমা’র শিথিলতা হিসেবে মনে করেন।

(৩) যখন জ়ে,বি, লারমা(সন্তু) জ়েল থেকে মুক্ত হন তখন সালটা ছিল ১৯৮০ (২২ শে জানুয়ারি, ১৯৮০) কাউন্টার ইনসারজ়েন্সি সময় [সুত্রঃ জীবনালেখ্য-স্নেহ কুমার চাকমা]। জ়েল থেকে মুক্তির পরে সন্তু লারমাকে পার্টির গঠনতন্ত্র শিথিল করে আবারো শান্তিবাহিনীতে যোগদানের সুজোগ দেয়া হয় বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে এম,এন, লারমার ইচ্ছায়। তখন শান্তিবাহিনীর গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পার্টির কোন সক্রিয় সদস্য সরকারের হাতে বন্দি হলে তাকে ৫ বছর পর্যন্ত মুল পার্টিতে প্রাথমিক সদস্য করার মাধ্যমে পর্যবেক্ষন করা হতো। পরে আচরন সন্তোষজনক হলে তাকে উপযুক্ত পদে বা পুর্বের দায়িত্ব ফিরিয়ে দেয়া হত। কিন্তু সন্তু লারমার ক্ষেত্রে এসব গঠনতন্ত্র শিথিলতা যেমন বিশেষ বিশেষ বিষয়কে নিয়ে করা হয়েছিল তেমনি এই সব বিষয় পার্টিতে অনেক বিতর্ক জন্ম দিয়েছিল।বঞ্চিতরা হয়েছিল ক্ষুদ্ধ, তবুও সচেতনভাবে অনেকেই এইসবের মধ্যে দেখতে পেয়েছিলেন পরিবারতান্ত্রিকতার অস্তিত্ব, বিপন্ন গনতান্ত্রিক চেতনা আর এর ফলে সৃস্ট সমস্যা পরবর্তিতে অনেক রক্ত ঝরিয়েছে।

[পারিবারিক তন্ত্রের আরো অনেক নিদর্শন পার্টিতে দেখা গিয়েছিল পার্টিতে। যদিও সেই সময়ের বাস্তবতায় জাতির অগ্রগতির জন্য লারমা পরিবারের মত ত্যাগ স্বীকারে নিবেদিত এবং আত্মত্যাগী পরিবার খুব কমই ছিল বলে মনে হয়।]

(৪) জুম্ম চবাশালের দেয়া মন্তব্য থেকে অনেক অজানা বিষয় জানা গেল যে গুলো ভবিষ্যতে জুম্মজাতির ইতিহাসের পাঠকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারে। [যারা মুক্তচিন্তায় সত্য সন্ধানী তারা কেন সত্যকে পাশ কাটিয়ে যাবে; এজন্য যথাযথ ইতিহাসকে বুঝার জন্য এগুলি সত্যতা যাচাই হওয়া উচিত!] মন্তব্যটি পড়ে মনে প্রশ্ন জাগচ্ছে বার বার, ১৪ই জুন কি ঘটেছিল জুম্মজাতির ইতিহাসে? বিশেষ সেক্টরে কেনই বা বলি ওস্তাটকে নির্মম ভাবে হত্যা করা হলো ? তাহলে এই যে এট এট “ক্ষমা করা, ভুলে যাও”র পক্ষে উচ্চকন্ঠে আওয়াজ তুলি তখনো কি এর ব্যবহারিক পাঠ স্বয়ং উদ্দৃতিকারিও প্রয়োগে ব্যার্থ হয়েছিলেন! [বি,দ্রঃ আমি বাঙ্গালদের মত, সিপাহী হত্যাকে সিপাহী জনতার বিপ্লব বলে জাতিকে ভাগ কতে চাচ্ছি না/ শোককে দিবসকে জন্মদিন পালনের সংস্কৃতির আমদানি করতে চাচ্ছি না/জ়েল হত্যার ইতিহাসে প্রথম সিরাজ নাকি চার নেতা ]

এই যে গ্রেফতারের পরে গিরি-র মত একসময়ের ভারপ্রাপ্ত ফিল্ড কমান্ডারকে (তখনকার অন্যতম শান্তিবাহিনীর নেতা) বেলা বিস্কুট ও রঙ চা (শুওনো গুরু গু লগে ঝর পানি )দেয়া হলো সত্যিই তা জাতির জন্য লজ্জার।এটে অন্তত যুদ্ধের নিয়ম-নীতি মেনে নুন্যতম ভ্রাতৃত্ববোধমুলক সৌজন্যতা দেখানোটা প্রত্যাশিত ছিল।

(৫) জিয়ার ১৯৭৬ এ মার্মা সংসদ ও ১৯৮৩ তে এরশাদ তঞ্চঙ্গা সমিতি গঠনের পরে সেখানে টাকা ধেলে তঞ্চঙ্গা এবং মারমাদের দিয়ে শান্তিবাদিনীর মোকাবেলার কাজও শুরু হয়েছিল। তখনো অনেক মারমা শান্তিবাহিনীর অন্যতম মারমা নেতা চাবাই মগকে মেনে চলতো। ১৯৮০ সালে সন্তু লারমাকে যে দিন জ়েল থেকে মুক্তি দেয়া হয় সেইদিন চাবাই মগকেও মুক্তি দেয়া হয়। পরবর্তিতে চাবাইকে হত্যা করে সমযোতার মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ জুম্মজাতির স্বপ্নকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়া হয়।

(৬) অনেকে উপরের প্রতিটি বিষয়ের মধ্য CID বা ROWএর প্রত্যক্ষ ভুমিকা দেখতে পান।জুম্ম জাতীয়তাদাবী আন্দোলনের সফলতা যথন আপন মহিমায় বিশ্বকে জানান দিচ্ছিল তার অস্তিত্ব, তখন আঞ্চলিক শক্তিগুলি এটে খেলতে চাইবেই যেমনটা বর্তমানে বিশ্বর নানা জায়গায় দেখা যায়। তাছাড়া, ইন্ডিয়াও এই ভয়ে ভীত ছিল যে শান্তিবাহিনীর সফলতা তার অখন্ডতাকে হুমকিগ্রস্ত করবে; বিশেষ করে, পুর্বাঞ্চলীয় সেভেন সিস্টারকে। তাহলে প্রশ্ন জাগে আমরা কি কেবল খেলার পুতুল হয়েই দিন-পাত করে যাবো?

(৭) ততদিনে কর্নফুলি-চেঙ্গি-মাইনী-কাচালং ‘তে অনেক পানি গরিয়েছে। ভ্রতৃঘাটি সংঘাটে জড়িয়ে জুম্মরা যে মরতে শিখেছে! আক্রমন-পাল্টা আক্রমনে পাহাড়ের উত্তেজনার সাথে বাঙ্গালী পুনর্বাসন তখন তুঙ্গে, কাউখালি, মাটিরাঙ্গা-বেলছড়িতে জুম্ম মরছে বাঙ্গালি-সেনার হাতে, অন্যদিকে ১৪ জুন বলি ওস্তাদ, ১০ই নভেম্বর এম,এন, লারমা’র মত নেতৃত্বকে হারিয়ে জুম্মরা হলো শোকাহত।

তখনকার বাস্তবতায় এম,এন, লারমার মত মহান রাজনৈতিক ব্যক্তি নিশ্চয় এই সব বিষয় উপলদ্ধি করেছিলেন[(৬)কে জোর দিচ্ছি] ! তাই তিনি “ক্ষমা কর, ভুলে যাও”কে পরবর্তিতে রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করে ঐক্যবদ্ধ জুম্মজাতি হেসেবে প্রতিষ্ঠা করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ততদিনে পার্টিতে একটু করে ভাঙ্গনের শুর ততদিনে প্রকাশ্য রুপ ধারন করেছিল। ভাগ হয়েছিল “লাম্বা” আর “বাদি” নামে শান্তিবাহিনীর দুটি গ্রুপ। এভাবে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত কম-বেশী সংঘাট জিয়ে ছিলো। পরবর্তি অবস্থায় লাম্বারা টিকে গেলেও বাদিদের অবস্থা জুম্ম চবাশালের ভাষ্য অনুযায়ী “ চুপ চাপ মাত্যে সাপ” হয়ে ইন্ডিয়া-বাংলাদেশের কাছে সারেন্ডার করে নিষ্ক্রিয় হয়ে সাধারন জীবন যাপন করছে। পরবর্তি ইতিহাস লাম্বাদের ইতিহাস, পার্টিকে পুনর্গঠনের ইতিহাস, ৯৭-এর ইতিহাস আর বাকী ইতিহাসের প্রত্যক্ষদর্শী আমরা আপনারাও…

তবুও যে লাম্বা-বাদি’র ইতিহাসের পোস্ট মোর্টেম রিপোর্ট আজো জুম্মদের কাছে এক বিরাট প্রশ্ন হয়ে আছে তার মধ্যেই কি লুকিয়ে আছে ভ্রতৃঘাটি সংঘাটের গোপন কোন উত্তর ?

১০ই নভেম্বর ২০১১

About the author

হেগা

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/1156

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>