«

»

এই লেখাটি 551 বার পড়া হয়েছে

Print this প্রকাশনা

এমএন লারমাঃ বাংলাদেশের ইতিহাসে এক মহানায়কের নাম

CHTBDএমএন লারমা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক মহানায়কের নাম

[ব্যস্ততার কারণে লেখার সময় পাচ্ছি না। তাই গত ১০ নভেম্বর ২০১০-এ লেখা আমার এ প্রবন্ধটি এম এন লারমার স্মরণে এখানে পুন:প্রকাশ করলাম।]

আজ ১০ নভেম্বর। জুম্মজাতি তথা মেহনতি মানুষের জন্যে এক শোকাবহ দিন। এই দিনে আমরা জুম্মজাতির মহান নেতা মানবেন্দ্র নারায়ন লারমাকে হারিয়েছিলাম। ‘৮৩ সালে ১০ নভেম্বর জুম্মজাতির কুলাঙ্গার, অপরিণামদর্শী গিরি-প্রকাশ-পলাশ-দেবেন চক্র বুলেতের আঘাতে ঝাঝরা করে দিয়েছিল মহান নেতার বুক।এনএন লারমার মত মহান নেতা ও উজ্জ্বল এক নক্ষত্রকে হারিয়ে জুম্মজাতি আজও এক বিশাল শুন্যতায় দীন-হীন হয়ে আছে।মহান নেতাকে জানাচ্ছি অজস্র লাল সালাম ও শ্রদ্ধা।

মহান নেতা এম এন লারমা

আমি নতুন প্রজন্মের এক সদস্য।মহান নেতা এমএন লারমাকে চোখে দেখিনি। তবে আমি তার গুণমুগ্ধ।তিনি আমার স্বপ্নের নায়ক।তার স্বপ্ন আমারও স্বপ্ন।সে স্বপ্নটা হলো শোষণমুক্ত সমাজ ও মর্যাদাপূর্ণ মানবিক জীবন।

মানুষের মুখে তার কথা শুনেছি। বিভিন্ন কবিতা-প্রবন্ধ ও ইতিহাসের পাতায় তার কথা পড়েছি। তার জীবনী পড়েছি। যতই পড়েছি, ততই মুগ্ধ হয়েছি।আজও আমার এক বন্ধুর মেইলে পাঠানো এমএন লারমার সংসদীয় বিতর্কের পান্ডুলিপি পড়ছিলাম।বুঝার চেষ্টা করছি, সাংসদ হিসেবে তিনি কেমন ছিলেন। দেখলাম, তিনি কেবল পাহাড়ের পাহাড়ী জনগণের কথা বলেননি, বলেছিলেন কৃষক-শ্রমিক-রিক্সাওয়ালা-মাঝিমাল্লাসহ দেশের মেহনতি মানুষের কথা।আজকে আমার লেখার মাধ্যমে মহান নেতা এমএন লারমা’র জীবনের কিছুদিক জানার তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

এমএন লারমা যেই সময়ে জন্মগ্রহন করেছিলেন সেই সময়টা ছিল উত্তাল সময়। ১৯৩৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর রাঙামাটি জেলার মহাপুরুম গ্রামে এ মহান নেতার জন্ম।সে সময়ে চলছিল মহাসমরের মহাপ্রস্তুতি।ভারত উপমহাদেশে ইতিহাসের বাঁক বিভিন্ন দিকে পরিবর্তন হতে যাচ্ছিল। অথচ তখনও পর্যন্ত আমাদের জুম্মজাতি ঘুমিয়ে ছিল অন্ধকারে।মহান নেতার জন্ম যেন জুম্মজাতির ঘুম ভাঙানির গান শোনানোর জন্যে।

তিনি ধীরে ধীরে বেড়ে উঠলেন। স্কুলবেলা থেকেই নিপীড়িত ও অমানিশার অন্ধকারের মধ্যে মুহ্যমান জুম্মজাতির মুক্তির জন্যে কাজ করার স্পৃহা তারমধ্যে জেগেছিল। সেইভাবে তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন।

শিক্ষায় তিনি ছিলেন একজন আইনজ্ঞ। তবে তিনি পেশা হিসেবে আইনকে বেছে নেননি।টাকা উপার্জনের চেষ্টা করেননি। আলো জ্বালানোকে তিনি মহান ব্রত হিসেবে মনে করেছিলেন। তাই প্রথমে বেছে নিয়েছিলেন শিক্ষকতাকে।দীঘিনালা ও চট্টগ্রামে শিক্ষকতা করেছিলেন।পরে সময়ের দাবীতে পুরোপুরিভাবে রাজনৈতিক কর্মকান্ডে সক্রিয় হয়ে পড়েন। ছাত্রাবস্থায় পাকিস্তান সরকারের কাপ্তাই বাঁধের বিরুদ্ধে ছাত্র ও জুম্ম সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন। ফলে তাকে কারাবরণও করতে হয়েছিল ১৯৬৩ সালে।পাকিস্তান সরকারের শোষণ বঞ্চনা যখন বেড়ে যাচ্ছিল তখন নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে জুম্ম সমাজকে সংগঠিত করা ছাড়া কোন উপায় ছিল না।তাই তিনি নিরিবিলি সংসার জীবন নিয়ে ঘরে বসে থাকেননি।বেরিয়ে পড়লেন আপামর জুম্ম ছাত্র-জনতাকে জাগানোর কঠিন শপথ নিয়ে। ঘুরে বেড়িয়েছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রামের আনাচে কানাচে।শুনিয়েছিলেন মুক্তির বাণী, জুগিয়েছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার দূরন্ত সাহস। শিখিয়েছিলেন প্রতিবাদের ভাষা –

অধিকার কেউ কাউকে দেয় না, আদায় করে নিতে হয়

তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, ছোট ছোট পাহাড়ী জাতিসমূহকে বেঁচে থাকতে হলে সবাইকে এক হয়ে সংগ্রাম করতে হবে। উদাহরণ দিয়ে বললেন, “আমরা জনসংখ্যার বিচারে ছোট ছোট জাতি হতে পারি।কিন্তু আমাদের অসীম শক্তি আছে, সাহস আছে, সম্ভাবনা আছে। উপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার দৃষ্টান্ত আমাদের আছে। ইতিহাস আছে। একটি জাতির জন্যে যেসব শর্তাবলী দরকার তার সবই আমাদের আছে। আছে নিজস্ব ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ।কিন্তু আমাদের পাহাড় সভ্যতা তথাকথিত আধুনিক সভ্যতা থেকে অনেক দূরে বলে আমরা তার প্রকাশ ও বিকাশ ঘটাতে পারছি না।তবে এর জন্যে প্রয়োজন রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন।উপনিবেশিক শাসকরা আমাদের সেই রাজনৈতিক ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিল”।এমএন লারমা জুম্ম জনগণকে আরো বললেন, গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সেই রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন করতে হবে। তার নিজের হাতের আঙুল দেখিয়ে বললেন, “দেখো, পাঁচটি আঙুল। এক আঙুলে খোঁচা মারার চেয়ে এক মুষ্ঠিতে ঘুষি মারলে শক্তি ও জোর দু’টোই বেশি হয়”।  তিনি আরো বললেন, “আমাদের এই জোর-শক্তি লুকিয়ে আছে বৈচিত্র্যের ঐক্যতানে সমৃদ্ধ আমাদের জুম্ম সংস্কৃতির মধ্যে। শুধু প্রয়োজন সেই জোর-শক্তিকে সঠিকভাবে ও বুদ্ধিমত্তার সাথে কাজে লাগানো”।

তাই তিনি নিয়ে এলেন পার্বত্য চট্টগ্রামের এগারটি ছোট ছোট জাতিসমূহের মধ্যে ঐক্যের সেতু রচনার মূলমন্ত্র জুম্ম জাতীয়তাবাদ।তবে তিনি এও বলেছিলেন, এই জুম্ম জাতীয়তাবাদ সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ নয়। এ জাতীয়তাবাদের মূল আদর্শ হলো মানবতাবাদ, মানুষের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা। ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও নিজেদের পরিচিতি নিয়ে বেঁচে থাকার জন্যে এই জাতীয়তাবাদ। ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও নিজেদের পরিচিতি নিয়ে বেঁচে থাকা যে কোন মানুষের মৌলিক অধিকার। জুম্মজাতীয়তাবাদ এই অধিকারকে ধারণ করে ও বিশ্বাস করে। জুম্মজাতীয়তাবাদ কারোর অধিকার হরণ করার জন্যে নয়, জুম্মজাতীয়তাবাদ কারোর করুণার উপর নির্ভর করে বেঁচে থাকার জন্যে নয়, জুম্মজাতীয়তাবাদ হলো ছোট ছোট জাতিসমূহের মানবিক মর্যাদা ও সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার মূল ভিত্তি। তার এই মূলমন্ত্র পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম ছাত্রযুব সমাজের মধ্যে বিদ্যূৎবেগে ছড়িয়ে পড়লো।

বিভিন্ন শাসক-শোষক গোষ্ঠীর চরম অবহেলা ও শোষণ বঞ্চনার শিকার জুম্ম জনগণ খুঁজছিলেন এমন এক নেতার যার যোগ্যতা আছে, দক্ষতা আছে, যার স্বপ্ন আছে। নেতৃত্বহীনতার সেই তৃষ্ণার্থ সময়ে জুম্মজনগণের কান্ডারী হিসেবে আবির্ভূত হলেন এমএন লারমা।এমএন লারমার মত এক স্বপ্নবান নেতাকে পেয়ে জুম্মজনগণ বলীয়ান হয়ে উঠল। নতুন আশার দেখতে পেলো।

জুম্ম জনগণের পক্ষে সংসদে কথা বলার জন্যে যোগ্যতম প্রতিনিধি চাই। এ কাজে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্মজনগণ এমএন লারমাকে বেছে নিলেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিপুল ভোটে জুম্মজনগণ তাকে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত করলো।

সবার জানা, ‘৭০-এর নির্বাচনের পর ইতিহাসের বাঁক বদলে যায়। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেনি।বন্দুকের নলের মুখে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা বন্ধ করে দিয়েছিল। ক্ষমতার দম্ভে ধরাকে সরা জ্ঞান করেছিল। শুরু করেছিল বাংলার নিরীহ জনগণের উপর নির্মম অত্যাচার, দমনপীড়ন।শুরু করেছিল মা-বোনের ইজ্জত লুন্ঠনের হোলি খেলা।প্রতিবাদে ফেঁসে উঠে সারা বাংলা। সারা দেশে শুরু হয় পাকিস্তান হটাও আন্দোলন। শুরু হয় মহামুক্তিযুদ্ধ।এমএন লারমা নিশ্চিত ছিলেন পাকিস্তানের শাসন শোষণের শৃংখল হতে অতিশীঘ্রই বাংলার মানুষ মুক্ত হবে।দেশ স্বাধীন হবে।প্রহর গুনছিলেন, দেশের বৃহত্তর বাঙালি জনগোষ্ঠীর সাথে জুম্ম জনগণেরও মুক্তি আসবে।

‘৭১-এ ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলো।বিশ্বের মানচিত্রে স্থান পেয়ে গেলো লাল সবুজের পতাকার দেশ বাংলাদেশ। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। আহা! কী আনন্দ।সবার মুখে, “আমার সোনার বাংলা/আমি তোমায় ভালবাসি/চিরদিন তোমার আকাশ তোমার বাতাস/ আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি/আমার সোনার বাংলা”।

মুক্তির স্বাদ। সে কী আনন্দ!মানুষের মনে দোলা দিতে লাগল নতুন স্বপ্ন, নতুন প্রত্যয়। চোখেমুখে হাসির ঝিলিক, নতুন স্বপ্নে বিভোর সারা দেশের মানুষ। হাতছানি দিচ্ছিল কোটি মানুষের অমিত সম্ভাবনা। স্বপ্ন ছিল, গণমানুষের জন্যে বৈষম্যহীন ও শোষণমুক্ত সমাজ। পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে এমএন লারমাও সংসদে গেলেন বৈষম্যহীন ও শোষণমুক্ত সমাজ ও দেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে।

গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা তথা বৈষম্যহীন ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্যে প্রথম পদক্ষেপ হলো সুলিখিত ও সুচিন্তিত শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করা, যেই শাসনতন্ত্রে দেশের সব মানুষের আশা-আকাঙ্খা ও স্বপ্ন প্রতিফলিত হবে, মানুষের স্বপ্ন ও সম্ভাবনা বাস্তবায়নের কথা লেখা থাকবে।

ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে শাসনতন্ত্র রচনার কাজ শুরু করা হয়। যখন সংবিধানের খসড়া শেষ হয়, তখন তার উপর আলোচনার জন্যে সংসদে উত্থাপন করা হয়। খসড়া সংবিধানের উপর এক একটা অনুচ্ছেদ ধরে সংসদে আলোচনা চলতে থাকে। এমএন লারমা সাংসদ হিসেবে সক্রিয়ভাবে আলোচনায় অংশগ্রহণ নিতেন। উল্লেখ্য, সেই সময়ে গণপরিষদে হাতে গোনা দু’য়েক জন বাদে সবাই আওয়ামীলীগের সদস্য ছিলেন।সেই সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভীড় ঠেলে এমএন লারমা সংসদে বলিষ্ঠ কন্ঠে বক্তব্য রাখতেন। বিভিন্ন ধারার উপর মতামত দিতেন।সরকারী দল যা উপস্থাপন করে তার বিপরীতে কিছু মতামত দেওয়াই ছিল সেই সময়ে এক বড় সমস্যা।

খসড়া সংবিধান অধ্যয়ন করে এমএন লারমা দেখতে পেলেন “মা ও মাটি”র সাথে যেসব মানুষের ঘনিষ্ঠতা বেশি সেসব মানুষের কথা সংবিধানে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়নি।তাই একদিন তিনি দৃঢ় কন্ঠে সংসদে বলছিলেন,

আজ আমি দেখতে পাচ্ছি পদ্মা, মেঘনা, বুড়িগঙ্গা, মাথাভাঙ্গা, শংখ, মাতামুহুরী, কর্ণফুলী, যমুনা,কুশিয়ারা প্রভৃতি নদীতে রোদবৃষ্টি মাথায় করে যারা দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বৎসরের পর বৎসর ধরে নিজেদের জীবন তিলে তিলে ক্ষয় করে নৌকা বেয়ে, দাঁড় টেনে চলেছেন, রোদবৃষ্টি মাথায় করে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যারা শক্ত মাটি চষে সোনার ফসল ফলিয়ে চলেছেন, তাদেরই মনের কথা সংবিধানে লেখা হয়নি। আমি বলছি, আজকে যারা রাস্তায় রাস্তায় রিক্সা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে চলেছেন তাদের মনের কথা এই সংবিধানে লেখা হয়নি” (২৫ অক্টোবর ১৯৭২, সংবিধান বিলের উপরসাধারণ আলোচনায়)

এমএন লারমা’র এ বক্তব্য পড়ার পর সংবিধানের পাতা একটা একটা করে খুলে দেখলাম। মাঝিমাল্লা-রিক্সাওয়ালাদের কথা তো দূরের কথা, সংবিধানে কৃষকের কথাও তেমন নেই। শুধু ১৪ অনুচ্ছেদে দেখতে পেলাম। সেখানে বলা আছে, কৃষক ও শ্রমজীবি মানুষকে সকল প্রকার শোষণ হতে মুক্তিদান করাই হবে রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। কিন্তু কীভাবে কৃষক-শ্রমিক-মাঝিমাল্লা-রিক্সাওয়ালা শোষণ হতে মুক্ত হবে তার কোন দিক-নির্দেশনা সংবিধানে নেই।এরপর ১৬ অনুচ্ছেদে গ্রামীণ উন্নয়ন ও কৃষিবিপ্লবের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কীভাবে হবে তার কোন পথ নির্দেশনা নেই। এককথায়, কৃষক-শ্রমিকের শোষণমুক্তির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে সে ব্যাপারে রাষ্ট্রের কোন বাধ্যবাধকতা নেই।

এমএন লারমা আরো অনেক বিষয়ে বক্তব্য রেখেছিলেন।দেখলাম, যখনই তিনি কথা বলতে যান, তখনই তাকে বিভিন্নভাবে বাধাগ্রস্ত করা হয়। স্বাচ্ছন্দে তাকে কথা বলতে দেয়া হয়নি।স্পীকার সাহেবও কখনো কখনো তাকে বাধাগ্রস্ত করতেন।তার বক্তব্য চলাকালীন সময়ে অন্য সদস্যরা হস্তক্ষেপ করতেন।

৩১ অক্টোবর ১৯৭২। এক ঐতিহাসিক দিন। এইদিন সংবিধান বিলের উপর আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।ঐ দিন আঃ রাজ্জাক ভুঁইয়া নামে জনৈক সদস্য বাংলাদেশের সকল নাগরিককে বাঙালি করার প্রস্তাব দিলেন। তিনি প্রস্তাব দিলেন, অনুচ্ছেদ ৬-এ

বাংলাদেশের নাগরিকত্ব আইনের দ্বারা নির্ধারিত নিয়ন্ত্রিত হইবে”-এর পরেবাংলাদেশেরনাগরিকদের বাঙ্গালি বলিয়া পরিচিত হইবেন

এরপর আলোচনায় অংশ নিয়ে, উক্ত অনুচ্ছেদের উপর আপত্তি জানিয়ে এমএন লারমা বললেন, যদি এ অনুচ্ছেদ সংবিধানে সংযোজন করা হয় তাহলে আমাদের মত পাহাড়ী জুম্মজনগণের অস্তিত্ব ধ্বংস হয়ে যাবে। তিনি যুক্তি দিয়ে বললেন, আমরা বাংলাদেশের নাগরিক। নাগরিক হিসেবে আমরা বাংলাদেশী।তাই এ অনুচ্ছেদটি গ্রহণ করার আগে আরো পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানালেন।

প্রত্যুত্তরে স্পীকার সাহেব এমএন লারমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি বাঙ্গালি হতে চান না”?

এমএন লারমা উত্তরে বললেন,

বাংলাদেশের বাংলা ভাষায় বাঙ্গালিদের সঙ্গে লেখাপড়া শিখে আসছি। বাংলাদেশের সঙ্গে আমরাওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাংলাদেশের কোটি কোটি জনগণের সঙ্গে একযোগে বসবাস করে আসছি। কিন্তুআমি একজন চাকমা। আমার বাপ দাদা, চৌদ্দপুরুষ কেউ বলে নাই, আমি বাঙ্গালি।….আমরাআমাদেরকে বাংলাদেশি বলে মনে করি এবং বিশ্বাস করি। কিন্তু বাঙ্গালি বলে নয়

কিন্তু তার কথা কেউই কানে নেননি।সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে প্রস্তাবটি পাস হয়ে যায়।এর প্রতিবাদে এমএন লারমা সংসদ থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্যে ওয়াক আউট করলেন।এমএন লারমা’র এই প্রতিবাদ ইতিহাসের অংশ হয়ে গেল।

পরবর্তীতে এমএন লারমা নিয়মিতভাবে সংসদে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ২রা নভেম্বর ১৯৭২, সংবিধানে অনুচ্ছেদ ৪৭ এর সাথে নিম্নোক্ত অনুচ্ছেদটি ৪৭(ক)[মনে হয়, বর্তমানে সংবিধানে অনুচ্ছেদক্রম পরিবর্তিত হয়েছে] হিসেবে সংযুক্ত করার প্রস্তাব সংসদে উত্থাপন করেছিলেন,

পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি উপজাতীয় অঞ্চল বিধায় উক্ত অঞ্চলের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ধর্মীয় অধিকারের নিরাপত্তার জন্যে উক্ত অঞ্চল একটি উপজাতীয় স্বায়ত্বশাসিত অঞ্চল হইবে

এমএন লারমা তার এ প্রস্তাবের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করতে চেয়েছিলেন।কিন্তু “উপজাতীয় স্বায়ত্বশাসিত অঞ্চল” শব্দ শোনার সাথে সাথে বাঙালি জাতীয়তাবাদে অন্ধ সদস্যরা লাফিয়ে উঠলেন। একা একা এমএন লারমা। তাকে সমর্থন দেওয়ার করার মত আর কেউ ছিলেন না। তবে মাঝে মাঝে বিরোধী সদস্য হিসেবে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত আলোচনায় অংশ নিতেন। কিন্তু এমএন লারমাকে বিশেষ অঞ্চলের বিশেষ সমস্যার কথা বলতে হয়। সেজন্যে তার উপর শুরু হয় সরকার দলীয় সদস্যদের ‘আক্রমণ’।

স্বায়ত্তশাসনের কথা শুনে টাঙ্গাইলের লতিফ সিদ্দিকী ফ্লোর নিয়ে বললেন,

“এমএন লারমা আমাদের জাতীয়তাবাদের মূলভিত্তির প্রতি, আমাদের জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রতি অবৈধভাষায় বক্তৃত করেন

এমএন লারমা’র প্রস্তাবকে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি আঘাত হিসেবে অভিহিত করে অসৌজন্যমূলক ভাষায় বক্তৃতা শুরু করলেন। পরে স্পীকার লতিফ সিদ্দিকীকে নিবৃত্ত করেন।এরপর লতিফ সিদ্দিকীর বক্তব্য প্রত্যাহারের অনুরোধ জানিয়ে এমএন লারমা কিছু বলতে চাইলে, স্পীকার সাহেব এমএন লারমা’র উদ্দেশ্যে বললেন, “Please don’t create a pandemonium” (অনুগ্রহপূর্বক বিভ্রান্তি বা বিশৃংখলা সৃষ্টি করবেন না)। এভাবে এমএন লারমা’র কন্ঠ রোধ করার চেষ্টা করা হয় বারবার।

পরে দেখা গেলো, আরো অনেক সদস্য যখনই সুযোগ পেয়েছিলেন তখনই পুঁতি মাছের বড়শি’র টোপে টোক্কর মারার মত করে এমএন লারমার বিরুদ্ধে খোঁচা মেরে কথা বলতেন। জানিনা, সেসব মান্যগণ্য সদস্য এখনো বেঁচে আছেন কী না।তবে তাদের মধ্যে সাজেদা চৌধুরী এখনো অতি পরিচিত। এখনো সংসদে আছেন, এখন সংসদ উপনেতা।তিনিও পাহাড়ী জুম্ম জনগণকে বাঙালি জাতির অংশ মনে করেন। তাই একদিন তিনি স্পীকারের মাধ্যমে এমএন লারমার কাছে সংসদে প্রশ্ন রেখেছিলেন,

একটি উপজাতি হিসাবে স্বীকৃতি পাওয়ার চাইতে একটি জাতি হিসাবে স্বীকৃতি পাওয়া কি অধিকমর্যাদাজনক নয়”?

অর্থাৎ সাজেদা চৌধুরীও বাঙালি জাতি পরিচিতিটা সবার জন্যে অধিক ভালো বলে মনে করেছিলেন।

আরো একদিন, এমএন লারমা যখন পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস, জাতিবৈচিত্র্য, সংস্কৃতি ইত্যাদি তুলে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, বম, খিয়াং, পাংখোয়া খুমী ইত্যাদি জাতিসমূহের জন্যে সাংবিধানিক সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা সংসদে বলছিলেন, তখন জনৈক সদস্য বেগম তসলিমা আবেদ ফ্লোর নিয়ে বলে উঠলেন,

মাননীয় সদস্য [এমএন লারমা] পার্বত্য চট্টগ্রামের কয়েকটি জাতির নাম করলেন, [তারা] বাংলাদেশেমোট একটা জাতি, বাঙ্গালি

আরো মজা করে জনৈক সদস্য শওকত আলী খান বললেন,

দুইটি জাতিপুরুষ নারী

বা!বা! বেশ মজার বক্তব্য। নতুন তত্ত্বও বটে! এসব সংসদ সদস্যের বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, এমএন লারমা পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্মজনগণের কথা বলতে গিয়ে কতই না বাধার সম্মুখীন হয়েছিলেন। কেউ কেউ গরম গরম কথা বলে, আবার কেউ কেউ কুটতর্ক সৃষ্টি করে এমএন লারমাকে ঘায়েল করার চেষ্টা করেছিল। কেবল রাঘব-বোয়ালদের ছোবল নয়, পুঁতি মাছের টোক্করও খেতে হয়েছিল তাকে।

শুরুর দিকে বলেছিলাম, এমএন লারমা সংসদে কেবল পার্বত্য চট্টগ্রামের বিষয় নিয়ে কথা বলেননি। বলেছিলেন দেশের বিভিন্ন আইন, কৃষি, অর্থনীতি, শিল্পনীতি ইত্যাদি বিষয়ে। সেসব বিষয়ে বিস্তারিত বলার সুযোগ এখানে নেই। তবে এখানে একটা বিষয় অবশ্যই উল্লেখ করার মত। সেটা হলো দুর্নীতি নিয়ে। তখন ১৯৭৪ সাল। এমএন লারমার সংসদীয় বিতর্ক থেকে অনুধাবন করা যায় দুর্নীতি তখন কোন পর্যায়ে ছিল। তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। দুর্নীতি দমন করতে না পারলে তৎকালীন সরকারকে পদত্যাগ করারও অনুরোধ জানিয়েছিলেন।তিনি বলেছিলেন, দুর্নীতিবাজলোকরা সরকারকে ঘিরে রয়েছে। তারা তিন শ্রেণীর – ১) ব্যবসায়ী, ২) একশ্রেণীর রাজনৈতিক কর্মী ও ৩) একশ্রেণীর সরকারী কর্মচারী।তাই তিনি সরকারকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহবান জানিয়েছিলেন। দুর্নীতির ব্যাপকতা ও এর প্রভাব সম্পর্কে হুশিয়ার করে বলেছিলেন,

দুর্নীতির প্রশ্রয় দেওয়া কত বড় মারাত্মক তা বলে শেষ করা যায় না। দুর্নীতি যদি আমরা দূর করতে নাপারি, তাহলে সরকার যত রকমের আইনই করুক না কেন, যত কড়া নির্দেশনামাই দিক না কেন, কোনসুরাহা হবে না

এমএন লারমা একথাগুলো বলেছিলেন ৫ জুলাই ১৯৭৪ সালে। সেই ‘৭৪ থেকে ২০১০ সালের শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি।আজও তার কথা নির্ভেজাল সত্য। ৩৬ বছরেও দুর্নীতি কমেনি। ভাবতেই আশ্চর্য লাগে। সেই চেনা শ্রেণীর লোকগুলো আজও সরকারকে ভর করে দুর্নীতি করে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকবার দুর্নীতিতে প্রথম স্থান দখল করে ফেলেছে বাংলাদেশ।এটা লজ্জার সমগ্রজাতির জন্যে। কিন্তু সেই মা-মাটির সাথে যারা ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত তারা কী দুর্নীতি করে? না, সেই কৃষক, শ্রমিক, মাঝিমাল্লা ও খেতে মানুষগুলো কখনো দুর্নীতির সাথে জড়িত নয়। পাহাড়ী জুম্মজাতির সাধারণ জনগণও দুর্নীতির সাথে জড়িত নয়। পাহাড়ীদের ভাষায় দুর্নীতি শব্দেরও অস্তিত্ব নেই। অথচ সেই চিরচেনা শ্রেণীর দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ী, কর্মচারী ও বাজিকর রাজনৈতিক নেতারাই দেশকে চুষে খাচ্ছে। তাদের জন্যে কোটি কোটি মানুষের কপালে জুটছে দুর্নীতির তিলক।এটা সত্যিই লজ্জাজনক।

আজ ১০ নভেম্বর ২০১০। তিনি আমাদের মাঝে নেই। তবে তার কথাগুলো আছে। তার সংসদীয় বক্তব্য পড়ছি আর ভাবছি, সংসদে তিনি যা বলেছিলেন তৎকালীন সরকারের যদি শোনার ধৈর্য থাকতো, সেভাবে শাসনতন্ত্রে গণ মানুষের শোষণমুক্তির কথা লেখা হতো তাহলে বাংলাদেশের ভবিষ্যত আরো অনেক উজ্জ্বল হতে পারতো।

এমএন লারমাই প্রথম সংসদে নাগরিকত্ব প্রশ্নে বাংলাদেশের সকল নাগরিক বাংলাদেশী বলে গণ্য হবে বলেছিলেন।ভাবছি, আজ যারা বিভিন্ন সনদে নাগরিকত্ব হিসেবে ‘বাংলাদেশী’ লেখেন, তারা কখনো কী একবারের জন্যে হলেও এমএন লারমার নাম স্মরণ করেন?

এম এন লারমা যখন সংসদে জুম্ম জনগণের জন্যে স্বায়ত্বশাসনের কথা বলেছিলেন, তখন তাকে অনেকে সংসদে আক্রমণ করেছিলেন তীব্র কুরুচিপূর্ণ ভাষায়। তাঁর প্রস্তাবকে সার্বভৌমত্বের প্রতি, জাতীয়তাবাদের [বাঙালি জাতীয়তাবাদ] প্রতি আঘাত হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। ভাবছি, সেসব লোকগুলো এখনো সেকথা বলে কী না।

ইদানীং দেখা যাচ্ছে, এককালের উর্দিপরা জেনারেল, বর্তমানে বড় রাজনৈতিক নেতা হোমো এরশাদ প্রাদেশিক সরকারের তত্ত্ব বলে বেড়াচ্ছেন সারা বাংলাদেশে।এখন হোমো এরশাদের প্রস্তাবকে কেউ কী সার্বভৌমত্ব ও জাতীয়তাবাদের প্রতি হুমকী হিসেবে আখ্যায়িত করবেন? জানতে ইচ্ছে করে, এমএন লারমা যদি তৎকালীন সময়ে এরকম প্রাদেশিক সরকারের প্রস্তাব দিতেন তখন কী প্রতিক্রিয়া হতো? এমএন লারমা না হয়ে অন্য কেউ যদি স্বায়ত্তশাসন বা প্রাদেশিক সরকার ব্যবস্থার প্রস্তাব করতেন তখনো কী উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদের ধ্বজাধারীরা সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতার প্রতি হুমকীর গন্ধ পেতেন?

এমএন লারমা, তুমি আমাদের মাঝে না থাকলেও তোমার স্বপ্ন আমাদের মনের মণিকোঠায় আমরা সাজিয়ে রেখেছি। তুমি চেয়েছিলে জুম্ম জনগণের সাংবিধানিক স্বীকৃতি। সেই চাওয়া এখনো হারিয়ে যায়নি। পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণসহ সারা বাংলাদেশের আদিবাসী আজ ঐক্যবদ্ধ সাংবিধানিক স্বীকৃতি আদায়ের জন্যে। তোমার সাহসী বাণী আমরা এখনো ভুলিনি- অধিকার কেউ কাউকে দেয় না, আদায় করে নিতে হয়। অধিকার আদায়ের জন্যে আমরা এখনো ছুটছি তোমার প্রদর্শিত পথ ধরে। মনে প্রাণে বিশ্বাস করি, সব বাধাবিঘ্ন অতিক্রম করে আমাদের একদিন জয় হবে হবেই। চলার পথে অসীম সাহসে আমরা সুর ধরি আমরা করবো জয়, আমরাকরবো জয় একদিন

মহান নেতা এমএন লারমা তুমি অমর।তোমার কোন মৃত্যু নেই।তুমি জুম্মজাতির আকাশে লালসূর্য হয়ে অনন্তকাল আলো দেবে। তোমায় লাল সালাম।

মহান নেতা, তুমি যুগযুগ জিও।

————————–

অডঙ চাকমা

About the author

অডং চাক্‌মা

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/1131

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>