«

»

এই লেখাটি 664 বার পড়া হয়েছে

Print this প্রকাশনা

রাজা দেবাশীষ রায়ের কাছে ঘুম ভাঙানির গান চাই

রাজা দেবাশীষ রায়ের কাছে ঘুম ভাঙানির গান চাই

চাকমা সার্কেলের রাজা বলে নয়, নিজ গুণে, দক্ষতায় ও যোগ্যতায় রাজা দেবাশীষ রায় দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বনাম ধন্য ব্যক্তিত্ব।কেবল নিজের দেশের আদিবাসীদের জন্যে নয়, তিনি বিশ্বের সমগ্র আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর জন্যে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাচ্ছেন।তার সম্পর্কে নতুন করে বলার কিছুই নেই। আমার বিশ্লেষণে, এই মুহুর্তে পাহাড়ে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, যার কন্ঠস্বর সময়ের সাথে অধিকতর সামঞ্জস্যপূর্ণ ও আদিবাসী অধিকারের পক্ষে শক্ত যুক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। আজকের দৈনিক প্রথম আলো’র মাধ্যমে জানতে পারলাম, তিনি দীঘিনালায় সফরে গিয়ে তিনি এক সংবর্ধনা সভায় পাহাড়ের ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত বন্ধের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট পক্ষসমূহকে আহবান জানিয়েছেন।

এই প্রসঙ্গে একটি কথা স্মরণ না করে পারছি না। কিছুদিন আগেও জেএসএস-ইউপিডিএফ-এর ঐক্যের পক্ষে ও তাদের মধ্যেকার ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত বন্ধের ব্যাপারে ফেসবুকে ও ব্লগে কথা বলতে গিয়ে গালি খেয়েছিলাম।“ঐক্যের ফেরিওয়ালা”, “সুবিধাবাদী”, “ডিজিএফআইয়ের চর” ইত্যাদি উপাধি পেয়েছিলাম। আজকে রাজা দেবাশীষ রায়কেও আমার মত ফেরিওয়ালাদের দলে কাছে পেয়ে নিজেকে খুব উৎসাহিত বোধ করছি। রাজা রায়কে আমার মত “ঐক্যের ফেরিওয়ালাদের” পক্ষ থেকে উঞ্চ অভিনন্দন জানাচ্ছি।

রাজা দেবাশীষ রায়ের সাথে কোন দ্বিমত নেই। তিনি দীঘিনালার জনসভায় যথার্থই বলেছেন,

“পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর আলাদা আলাদা মতামত ও আদর্শ থাকতে পারে। কিন্তু জাতিসত্তার অধিকার ও আদিবাসী স্বীকৃতির দাবিতে সবাইকে এক মঞ্চে আসতে হবে”।

রাজার এ আহবান সময়ের দাবী। জেএসএস-ইউপিডিএফকে মনে রাখতে হবে, এক মঞ্চে যাওয়া মানে বক্সিং খেলতে যাওয়া নয়, কিংবা কাচার ভিতর মারামারি করে নক-আউট সিস্টেমে রেসলিং খেলা নয়।এক মঞ্চে যাওয়া মানে নিজেদের নীতি আদর্শ বিসর্জন দেওয়া নয়। এক মঞ্চে যাওয়া মানে হলো সংলাপের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান খোঁজা; নিজেদের জেদ দিয়ে নয়, অহংবোধ দিয়ে নয়, যুক্তি দিয়ে জুম্মজাতির মুক্তির পথ নির্দেশনা খোঁজা ও কর্মপন্থা নির্ধারণ করা। জেএসএস-ইউপিডিএফকে মনে রাখতে হবে, তারা নীতি-আদর্শের দোহাই দিয়ে ইতোমধ্যে জুম্মজাতির অনেক ক্ষতি করে ফেলেছেন।জুম্মজাতিকে দ্বিধাবিভক্ত করে ফেলেছেন।কেবল ধন জনহানি নয়, মনস্তাত্ত্বিকভাবেও দুই দল জুম্মসমাজকে ক্ষতিগ্রস্ত ও কলুষিত করে চলেছেন।এ অবস্থা বেশিদিন চলতে পারে না। এই কথাটাই বোধয় রাজাদেবাশীষ রায় অত্যন্ত বিনীতভাবে জেএসএস-ইউপিডিএফ-কে স্মরণ করিয়ে দিতে চেয়েছেন। তিনি বলেছেন, “ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতে একের পর এক মৃত্যু হচ্ছে, তা জাতির জন্য মঙ্গলজনক নয়”।কীসে মঙ্গল হয়, আর কীসে অমঙ্গল হয় সে ব্যাপারে আর নতুন করে মঙ্গলসূত্র আবৃত্তি করার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।

রাজা দেবাশীষ রায় আরো একটা কথা বলতে চেয়েছিলেন। তিনি বলেছেন,

“পার্বত্য চট্টগ্রামে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত বন্ধ করতে উদ্যোগ নিয়েছি, এতে দলমত-নির্বিশেষে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন”।

জানিনা, সংঘাত বন্ধে তিনি বা নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত কী কী উদ্যোগ নিয়েছিলেন বা নিয়েছেন।পত্রিকার প্রতিবেদকও এ ব্যাপারে কোন ব্যাখ্যা দেননি। আমরা মনে প্রাণে প্রার্থণা করি, রাজা রায়ের নেতৃত্বে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত বন্ধের উদ্যোগ সফলতার মুখ দেখুক।

প্রার্থনা ও আশাবাদের সাথে কিছু নিরাশার কথাও আছে। ফেসবুক স্ট্যাটাসে চোখে পড়লো, দেশমণি তনচংগ্যা নামে জনৈক ফেসবুক বন্ধু সেই নিরাশার কথা ব্যক্ত করেছেন। রাজা রায়ের সবাইকে “এক মঞ্চে আসার” আহবান দেখে ঐ ফেসবুক বন্ধু মন্তব্য করেছিলেন,

“এমন কথাতো অনেক শুনেছি। শীর্ষ নেতৃদ্বয়ের ঘুম ভাঙাবে কে?”

ঐ বন্ধু কী বলতে চেয়েছেন তা স্পষ্ট। “শীর্ষ নেতৃদ্বয়” মানে হলো দুই দলের দুই নেতা – জেএসএস প্রধান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় সন্তু লারমা ও ইউপিডিএফ প্রধান প্রসিত বি খীসা। ঐ বন্ধুর কথা স্পষ্টভাবে নির্দেশ করছে, দুই নেতার ঘুম না ভাঙলে জুম্মজাতির ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত বন্ধ করা এত সহজ নয়। চৌদ্দ বছর ধরে উনারা ঘুম দিচ্ছেন। আমাদের মত ছোট ছোট “ফেরিওয়ালারা” ব্লগে বা ফেসবুকে একটু আধটু চিৎকার দেওয়ার চেষ্টা করছি। কিন্তু এই চিৎকার শব্দ নিয়ন্ত্রিত ঘরে পৌঁছে বলে মনে হয় না। অবশ্য কিছুদিন আগেও রাঙামাটি জেলা পরিষদের প্রাক্তন চেয়ারম্যান ড. মানিক লাল দেওয়ানও একটা চিৎকার দিয়েছিলেন। সেই একবার চিৎকার দেওয়ার পরে তার কাছ থেকে আরো চিৎকার শোনা যায়নি। তারপরেও তার চিৎকার আমাদের মত নগন্য “ঐক্যের ফেরিওয়ালাদের” জন্যে একটা অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

অনেক সময় পরে আজকে রাজার রায়ের নীরব চিৎকার শুনতে পেলাম।তার এই চিৎকারে আমি আশায় বুক বাঁধতে চাই।তাই মাননীয় রাজা দেবাশীষ রায়ের কাছে আমাদের প্রত্যাশা, আমরা আপনার কাছ থেকে ঘুম ভাঙানির গান চাই। কর্কশলয়ে না হোক, মেলাংকলি সুরে কিংবা রবি ঠাকুরের গানের ক্লাসিক্যাল সুরে হলেও আপনি ঘুম ভাঙানির গান শুরু করেন সারা পার্বত্য চট্টগ্রামে। আমরা পার্বত্যবাসী আপনার দিকে চেয়ে আছি। কারণ, “দুই নেতার” গভীর ঘুমের নাক ডাকা নিয়ে জুম্মজাতি মাশুল দিতে পারে না অনন্তকাল ধরে।

অডঙ চাকমা, ২৬ অক্টোবর ২০১১

কিসে মঙ্গল হয়? এটা করলে কী মঙ্গল হবে?, ছবি: আবালা চাকমা

About the author

অডং চাক্‌মা

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/1111

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>