«

»

এই লেখাটি 614 বার পড়া হয়েছে

Print this প্রকাশনা

শরণার্থী জীবনঃ একটু পেছন ফিরে দেখা (২য় পর্ব)


আমাদের আগে যারা শরণার্থী হয়েছিলো, অর্থাৎ যারা ৮৬ সালে শরণার্থী হয়েছিলো তাদেরকে দেশে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছিলো।তারিখটা আমার সঠিক মনে নেই। সম্ভবত ছিলো ১৫ ফেব্রুয়ারী।১৫ ফেব্রুয়ারী পুরনো শরণার্থীদের ফেরত পাঠানো হবে। তাদেরকে ফেরত পাঠানোর আগ মুহুর্তে আমরা গিয়ে হাজির হলাম।

এদিকে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত, অন্যদিকে আরো নতুন করে শরণার্থীর আগমণ ঘটছে। ওদিকে পুরনো শরণার্থীদের দাবী বাংলাদেশ সরকারের সাথে পাকাপোক্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত তারা দেশে ফিরবে না। তারা বলতে লাগলো, জীবন যদি দিতে হয় তাহলে ভারতে জীবন রেখে দেশে ফিরবে, তবুও সেটেলার বাঙাল ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর হাতে অমর্যাদাকরভাবে জীবন হারাতে দেশে ফিরবে না। এ অবস্থায় ভারত সরকার সিদ্ধান্তহীনতায় পড়ে গেলো কী করবে।ভারত সরকারের এই সিদ্ধান্তহীনতার সময়ে আমরা নতুন করে সেখানে শরণার্থী হিসেবে উপস্থিত হলাম। যেহেতু সরকারের উচ্চ পর্যায়ে কোন সিদ্ধান্ত নেই, সেহেতু আমরা যারা নতুন গিয়ে হাজির হলাম তাদের জন্যে শিবিরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কোন কর্মকর্তা সিদ্ধান্ত দিতে পারছিলেন।

তারপর আমাদের শুরু হলো শরণার্থী হিসেবে তালিকাভুক্ত হওয়ার অপেক্ষার পালা। কোন রেশন নেই।এক অনিশ্চিত যাত্রা।কোথায় খাবো, কোথায় থাকবো, আর কোথায় পায়খানা করবো? চাকমা ভাষায় একটা কথা আছে, “খানার আগে আঘিবার চিদে গরা পড়ে” (খাওয়ার আগে পায়খানার চিন্তা করতে হয়)।এ কথাটা পুরোপুরিভাবে আমাদের জন্যে প্রযোজ্য হয়েছিলো। আশেপাশে কোন পায়খানা বা প্রস্রাবখানা নেই। কিছু লম্বা লাইনের গণ শৌচাগার ছিলো। সেগুলোর বর্ণনা এখানে সম্ভব নয়। নতুন জায়গায় ভিন্ন খাবার ও পানি সবার জন্যে উপযোগী ছিলো না। বিশেষ করে গুড় আর চিড়া খেয়ে অনেকের পেটের অবস্থা খারাপ হয়ে গেলো। অনেকের পাতলা পায়খানা শুরু হলো। এই অবস্থায় আমাদের, বিশেষ করে মহিলাদের অবস্থা সবচেয়ে করুণ।পাতলা পায়খানা হলে কীভাবে দৌঁড় দিতে কমবেশি সবার অভিজ্ঞতা আছে বলে মনে করি। পাতলা পায়খানার বেগ আসলে কোথায় দৌঁড়াবে! আ! এই করুণ দশা তো ভাষায় বোঝানো যায় না। যে ভুক্তভোগী কেবল সেই বুঝে। যাহোক, এই করুণ অবস্থার মধ্যেও একটু সহায় ছিলো শিবির ক্যাম্প অফিসের পাশে শরণার্থীদের জন্যে একটা স্বাস্থ্যকেন্দ্র। সেখান থেকে বিনামূল্যে প্রাথমিক চিকিৎসা পাওয়া যেতো। সেখান থেকে ঔষুধ নিয়ে আর সেবিকাদের পরামর্শ নিয়ে কোনমতে পাতলা পায়খানার দুর্দশা হতে অনেকে মুক্ত হয়েছিলো।আজকে সেই সেবিকাদের কর্মব্যস্ত চেহারাগুলোও চোখের সামনে ভেসে উঠছে।ধন্যবাদ সেই সেবিকাদের।

দিন যায়, দিন আসে। কিন্তু আমরা শরণার্থী হিসেবে তালিকাভুক্ত হতে পারছিলাম না। হাতে যা টাকা ছিলো সেগুলো চাল ডাল কিনতে শেষ হয়ে আসতে লাগলো। শরণার্থী হিসেবে তালিকাভুক্ত হতে  না পারলে, আর রেশন না পেলে কী খেয়ে থাকবো – এই নিয়ে এক বড় দুশ্চিন্তার মধ্যে পড়ে গেলাম।ছোট ছিলাম। সে হিসেবে তখন হয়তো সংসারের দুঃখ নিজের কাঁধে বহন করতে হয়নি। কিন্তু বয়স কম হলেও মা-বাবা ও দাদু-দাদীদের আলাপন থেকে ও তাদের ফ্যাকাসে মুখগুলো দেখে বুঝতে পারি, মর্মে মর্মে অনুভব করতে পারি, তাদের যাতনাগুলো। রেশন না পেলে কী খাবে পরিবার পরিজন ও ছোট ছোট নাতিপুতি। সেখানে কোন আত্মীয়স্বজন নেই ধারকর্জ করে হলেও কিছুদিন পার করা যাবে। একগুচ্ছ ধানের চারা রোপন করা নেই, কিছুটা আশা নিয়ে বসে থাকা যেতো।একটা কোন গরু, ছাগল, শুকর কিংবা মোরগ-মুরগী নেই সেটা বিক্রি করে ধান চাল কেনা যাবে।অথচ পেছনে ফেলে যেতে হলো গোলভরা ধান, অনেক গরু আরো অনেক কত দামী দামী ঘরের জিনিসপত্র।আর এখন গোলাভরা ধান পেছনে ফেলে ভাতের চিন্তা করতে হচ্ছে মা-বাবা ও দাদু-দাদীদের। এটা কী যে করুণ অবস্থা ভাষায় বর্ণনা করা কঠিন। এককথায় বললে, এক অনিশ্চিত যাত্রা।কোথায় শুরু হয়ে কোথায় শেষ হবে কেউ জানে না।

খোলা আকাশের নীচে না হলেও রাতের বেলায় ঘুমাতাম খোলা জায়গায়।ঠাকুমবাড়ী শরণার্থী ক্যাম্প অফিসের সামনে গোলঘরে।এছাড়া কিছু ঘর ছিলো, যেগুলোকে বলা হতো “কাউন্টার ঘর”। এসব কাউন্টার ঘরগুলো শরণার্থীদের রেশন বিতরণের জন্যে ব্যবহৃত হতো। আমরা অনেক সময় সেসব কাউন্টার ঘর খুঁজে নিতাম। বস্তা অথবা “চট” (বাঁশের বেত দিয়ে বোনা পাটি) বিছিয়ে ঘুমাতাম। এই কাউন্টার ঘরগুলোর চারদিকে কোন বেড়া নেই। চারদিক থেকে বাতাস আসতো। আগেই বলেছি, ফেব্রুয়ারী মাস, তখনও শীতকাল ছিলো। সঙ্গে করে যা কাপড়চোপড় নিতে পেরেছিলাম সেগুলো দিয়ে কোনমতে শীত নিবারনের চেষ্টা চলতো।

এই অনিশ্চিত যাত্রার মধ্যেও একটু সহায় ছিলো আমাদের কিছু আত্মীয়। তারা দীঘিনালা হতে ৮৬ সালে শরণার্থী হয়েছিলো। দিনের বেলায় ঐ আত্মীয়দের বাসায় রা্ন্না হতো। পালা করে খেয়ে আসতাম। আর গোলঘরে গিয়ে বসে থাকতাম। কখন ডাক পড়বে আমাদেরকে শরণার্থী হিসেবে তালিকাভুক্ত করবে সে আশায়। সারাদিস গোলঘরে বসে থাকা। আর রাতের বেলায় ঘুমানোর জন্যে কাউন্টার ঘর খুঁজে বের করা। এভাবে দিনগুলো কেটে যাচ্ছিলো।

সামনে ১৫ ফেব্রুয়ারী আসতে আরো কিছুদিন বাকী। ১২ কি ১৩ ফেব্রুয়ারী, সেদিন আরো একটা দল এসে উপস্থিত হলো দীঘিনালা থেকে।লোকজন বলে “মাইনীকূল” থেকে। ঐ দলের পর আরো পর পর কয়েকটা দল এসে হাজির হলো। চারদিকে আরো প্রচার হয়ে গেলো বাংলাদেশে সেটেলার বাঙাল ও সেনবাহিনীর অত্যাচার তীব্র আকার ধারন করেছে। লোকজন নিজেদের জায়গায় আর থাকতে পারছে না। পর পর আরো কয়েকটা দল আসাতে লোকের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেলো। শোনা গেলো, ভারত তার সীমান্তে কড়া নিরাপত্তা জোরদার করেছে। বাংলাদেশ থেকে যাতে আর লোকজন ভারতে প্রবেশ না পারে তার জন্যে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করার নির্দেশ জারি করা হয়েছে। কিন্তু তারপরেও লোকজনের আসা বন্ধ হয়নি। এখনো চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি, দীঘিনালা থেকে একদল শরণার্থী ভারতে প্রবেশ করার সময় বিএসএফ-এর মুখোমুখি হয়। বিএসএফরা তাদেরকে দেশে পুশব্যাক করতে চাইলে শরণার্থীরা সবাই মিলে বিএসএফ-এর প্রতিরোধ ভেঙে ভারতে প্রবেশ করে। ধাক্কাধাক্কি করে কিছু বিএসএফ-এর সৈন্যকেও তারা আহত করে। ফলে বিএসএফরা চরম ক্ষুব্ধ হয়। তারা সম্ভবত তাদের উর্ধ্বতন কতৃপক্ষকে জানিয়েছিলো।

ঐ শরণার্থীরা যখন পরদিন ভোরে ঠাকুমবাড়ী শরণার্থী শিবিরে এসে পৌঁছলো তখন কিছুক্ষণ পরে বিএসএফ-এর সৈন্যরা এসে হাজির। তারপর শুরু হলো শরণার্থী দলের পালের গোদা খুঁজা। বেছে বেছে দলের নেতাদের বের করা হলো। দুই একটা থাপ্পড় খেতে হয়েছিলো।পাগড়ীওয়ালা বড় বড় শিখ সৈন্যদের লাঠি ঘোরানো তখন দেখেছিলাম।“বাগো, বাগো” বলে তাড়িয়ে দিতে চেয়েছিলো। কিন্তু শরণার্থী শিবিরের এত জন সমুদ্রের মধ্যে তাদের করার কিছুই ছিলো না। তবে তারা ঐ শরণার্থী দলের নেতাদের কোথায় যেন ধরে নিয়ে গিয়েছিলো।

অবশেষে এলো সেই প্রতীক্ষার দিন, ১৫ ফেব্রুয়ারী। শরণার্থী নেতাদের কড়া নির্দেশ ঐ দিন কেউ ঘর থেকে মানে নিজেদের শিবির থেকে বের না হয়। সরকার যদি ফেরত চায় সবাই রাস্তায় রাস্তায় শুয়ে থাকবে। জান দেবে গাড়ীর চাকায়, তবুও কোন চুক্তি ছাড়া বাংলাদেশে ফেরত আসবে না। ঐ দিন আমরাও যারা নতুন গিয়েছিলাম, তারাও একটু সাবধানে ছিলাম। দুপুরের দিকে দুই একটা ট্রাক এসেছিলো শিবির ক্যাম্পে।কেন এসেছিলো জানি না। তবে গভীর উৎকন্ঠার মধ্যে ১৫ ফেব্রুয়ারী কেটে গেলো।

তারপর আমাদের অপেক্ষার পালা শেষ।এক সময় আমাদের ডাক পড়লো শরণার্থীতে তালিকাভুক্ত হতে। এরপর লাইনে গিয়ে দাঁড়ালাম এক এক পরিবার করে।দীর্ঘ প্রতীক্ষার শেষে নাম লেখালাম শরণার্থী হিসেবে। পরিবারগুলোকে কাউন্টারে ভাগ করা হয়। আমাদের কাউন্টারে কয় পরিবার ছিলো এখন মনে নেই। তবে আমাদের কাউন্টার নম্বর হলো ১২। ১২ নং কাউন্টারে অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেলাম। যেদিন তালিকাভুক্ত হলাম, সম্ভবত তারপরের দিন রেশন দেওয়া হলো আমাদের। এর মধ্য দিয়ে শরণার্থী জীবন শুরু হলো।

রেশনের মধ্যে কী কী ছিলো ঠিক মনে নেই। তবে এখনো আছে, শক্ত সিদ্ধ চাল, ডাল, চিড়া, গুড়, কিছু মরিচ ও ভোজ্য তেল। রান্নার সময় যতই পানি দেওয়া হোক না কেন, ভাতগুলো কখনো নরম হয় না। স্টীলের প্লেটে ভাত তুলে একবার ডালের ঝোল নিলে শেষ পর্যন্ত ঐ ডালের ঝোল দিয়ে ভাত খাওয়া যায়। শক্ত সিদ্ধ চালের ভাত খাওয়া দিয়ে শুরু হলো শরণার্থী জীবনের আরো এক নতুন যাত্রা।

চলবে………..

………………………………

অডঙ চাকমা, ২৫ অক্টোবর ২০১১

About the author

অডং চাক্‌মা

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/1103

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>