«

»

এই লেখাটি 543 বার পড়া হয়েছে

Print this প্রকাশনা

ওরা কথা বলে আর আবালার ছবি কী বলে

এক

আজকের লেখাটা ফেসবুক বন্ধু আবালা চাকমার আঁকা ছবিকে কেন্দ্র করে। এর মানে হলো, এ লেখার বিষয়বস্তু হলো আবালার ছবির বিশ্লেষণ।কাজেই, আমার বিশ্লেষণ নিয়ে সবাই খুশী হবেন তেমনটা বিশ্বাস করি না।তবে যে কোন আলোচনা-সমালোচনা সাদরে গ্রহণ করতে প্রস্তুত আছি।

অবশ্য এ লেখাটা এক সপ্তাহ আগে, লেখার কথা ছিলো। কিন্তু সময়ের অভাবে তা করা হয়নি। গতকালকে লেখার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু হরি দা’র (প্রথম আলো’র সাংবাদিক হরি কিশোর চাকমা) ফেসবুকে দেওয়া একটি সংবাদ লিংকের উপর যে বিতর্ক হয়ে গেলো, তাতে পুরো সময়টা ব্যয় হয়ে যাওয়ায় গতকালও লেখাটা হয়ে উঠেনি।

কিছু দিন লেখার ছেদ পড়ায় লেখার শিরোনাম কী দেবো তা নিয়ে একটু সমস্যায় ছিলাম। শেষ পর্যন্ত “ওরা কথা বলে আর আবালার ছবি কী বলে” শিরোনামে লিখতে শুরু করলাম। আর আজকের লেখাটা আবালা চাকমার সম্মানে আপনাদের কাছে উপস্থাপন করলাম।  

দুই

জেএসএস-ইউপিডিএফ-এর মারামারি-খুনোখুনি ও আবালা চাকমার ছবি

জেএসএস-ইউপিডিএফ-এর মারামারি ও খুনোখুনি নিয়ে পাঠক ভাইবোনদেরকে নতুন করে বলার কিছুই নেই। গত ১৪ বছর ধরে ওরা মারামারি ও খুনোখুনি করে আসছে। মাঝে মাঝে চুপচাপ হয় আবার জেগে উঠে। কতজন মারা গেলো এ মুহুর্তে পরিসংখ্যান দিতে পারছি না, তবে এটা সত্য যে, ওদের মারামারি-খুনোখুনিতে মৃতের সংখ্যা তিন ডিজিটের উপরে গেছে।এদের অধিকাংশই তরুণ যুবক। সর্বশেষ মৃত্যুর মিছিলে দুই বছরের এক শিশুও (অর্কি চাকমা)যুক্ত হয়েছে। অসংখ্য নারী বিধবা হয়েছে।অসংখ্য শিশু অনাথ হয়েছে। অনেক মায়ের কোল খালি হয়েছে।আর্মি-সেটেলার দ্বারা নয়, আমাদের জুম্ম বাপ বা ভাইয়ের হাতে আমাদের ভাইয়েরা প্রাণ হারিয়েছে। হারাচ্ছে প্রতিনিয়ত। কীসের জন্যে এত প্রাণের বিসর্জন? কার স্বার্থ রক্ষার জন্যে এত প্রাণের বলি? জুম্মজাতির স্বার্থ নাকি জেএসএস-ইউপিডিএফ বড় নেতাদের স্বার্থ রক্ষার জন্যে? বড় নেতারা কী বলেন? বড় নেতাদের কথা “আমরা” কী বিনা বাক্য ব্যয়ে মেনে নেবো? বিশ্বাস করবো?

এ প্রশ্নগুলো একক কারোর নয়, পাহাড়ের সকল শান্তিকামী জনতার।পাঠকরা চলুন না দেখি, আমজনতার প্রতিনিধি আবালা চাকমা কীভাবে তার শৈল্পিক মনের কল্পনায় দুই দলের সংঘাতময় রাজনীতির ভেলকিবাজি ছবির সাহায্যে ফুটিয়ে তুলেছেন। দেখুন, ছবির সাহায্যে কীভাবে তিনি জেএসএস-ইউপিডিএফ-কে পাঠ করেছেন।

ছবি ১ বিবেক তুমি কার?, সৌজন্যে আবালা চাকমা

ছবি ২ বিবেক তাদের যাদের হাতে…?, সৌজন্যে আবালা চাকমা

আবালার ছবিগুলোর বিশেষ ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই, নিজেরাই কথা বলছে। ইংরেজীতে যাকে বলে self-explanatory. ছবিগুলো নিজেরাই ব্যাখ্যা করছে জেএসএস-ইউপিডিএফ-এ ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের ফলে পাহাড়ে কী কী ঘটছে।

একপাশে জেএসএস, অন্যপাশে ইউপিডিএফ আর মাঝখানে আবালা চাকমা (১ম ছবি দেখুন)।গভীর মনোযোগ দিয়ে আবালা জেএসএস-ইউপিডিএফ-র “অ আ ক খ রাজনৈতিক তত্ত্ব, আন্দোলন ও অর্জন” ম্যানুয়েল পড়ছে।সে দেখতে পাচ্ছে, স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত ঝাঁঝালো মিছিল, প্রতিবাদী মানুষের মুষ্ঠিবদ্ধ হাত, আর ব্যানার-প্ল্যাকাড। দিকে দিকে স্লোগান ধ্বনিত হচ্ছে “পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন কর, করতে হবে”, “পূর্ণস্বায়ত্তশাসন কায়েম কর, করতে হবে”, “পার্বত্য চট্টগ্রাম হতে সেটেলার প্রত্যাহার কর, করতে হবে”, “পার্বত্য চট্টগ্রাম হতে সেনাশাসন প্রত্যাহার কর, করতে হবে” ইত্যাদি ইত্যাদি স্লোগান। এসব স্লোগান আর মিছিলের ধ্বনি শুনে আবালার মনে সে কী উত্তেজনা! মনে মনে বলছে, সবই তো জুম্ম জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে।একটার পর একটা ম্যানুয়্যালের পাতা উল্টাচ্ছে।কিছুদূর পড়ার পর হঠাৎ থমকে গেলো আবালা।ম্যানুয়্যালের পাতায় দেখতে পাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। গুলিবিদ্ধ মানুষের লাশ, মাথার খুলি উড়ে যাওয়া শিশুর লাশ, বিধবার কান্না…আবালা স্তম্ভিত!মনে মনে প্রশ্ন করছে, “তাহলে কার স্বার্থে এত মিটিং-মিছিল-স্লোগান? কার স্বার্থে ভাই ভাইকে গুলি করে, কার স্বার্থে নিরীহ নিস্পাপ শিশুকে খুন করে?” আবালা বাকরুদ্ধ। মনের ভেতর থেকে প্রতিবাদের এক তীব্র ঢেউ বের হয়ে আসছে। জেএসএস-ইউপিডিএফ-এর ভীবৎসতা দেখে তাদের কাছে প্রশ্ন করছে, “বিবেক তুমি কার?”

আবালা আরো এগোয়।বিষন্ন মনে ম্যানুয়্যালের পাতা উল্টায়। যতই উল্টায় ততই দেখতে পাচ্ছে, জুম্মদের দুঃখ (রেফারেন্স হিসেবে ২ নং ছবি দেখুন)। একদিকে সেনাবাহিনী-সেটেলার মিলে জুম্ম উচ্ছেদ করছে, ঘরবাড়ী পুড়িয়ে দিচ্ছে।গ্রামছাড়া হচ্ছে।সেনাবাহিনীর গুলিতে নিরীহ জুম্মগ্রামবাসী মারা যাচ্ছে। বাবা হারানো ছেলেমেয়েরা কান্নায় চারদিক পরিবেশ ভারী করে তুলেছে। এই অন্যায়-অত্যাচার প্রতিকারের কেউ নেই। রাষ্ট্র, সে তো অনেক দূরে বসবাস করে।আবালার মন ভারী হয়ে যায়।

অন্যদিকে, জুম্মজনগণের অধিকার রক্ষার দাবীদার রাজনৈতিক দল জেএসএস-ইউপিডিএফ কী করছে? রাষ্ট্রের এসব অন্যায়-অবিচারের কথা ভুলে গিয়ে ওরা নিজেরাই মারামারি করছে। তাদের মারামারি-খুনোখুনিতে ভাইয়ের লাশ পড়ছে একটার পর একটা।কখনো জেএসএস কর্মী খুন হচ্ছে, কখনো ইউপিডিএফ-এর কর্মী খুন হচ্ছে। গুলিবিদ্ধ রক্তাক্ত লাশ অনাদরে অবহেলায় মাটিতে পড়ে আছে।রক্তের স্রোতধারা বয়ে যাচ্ছে মাটি বেয়ে।গুলিবিদ্ধ বাবা গুলিবিদ্ধ শিশু কন্যার সাথে নিথর হয়ে শুয়ে আছে।স্বামীহারা বিধবা কান্নায় ভেঙে পড়েছে। মা-বাবা হারিয়ে শিশুরা অসহায় হয়ে পড়েছে। ওদের একূলও নেই, ওকূলও নেই। ওদের ভবিষ্যত হয়ে পড়েছে অন্ধকার।আবালা যতই জেএসএস-ইউপিডিএফ-এর রাজনৈতিক আন্দোলনের ম্যানুয়্যাল পড়ছে ততই দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ছে।সেনাবাহিনী-সেটেলারের হাতে জুম্ম ভাইবোন মারা যায়, শিশুরা অনাথ হয়, জমিহারা হয়। অন্যদিকে জেএসএস-ইউপিডিএফ-এর মারামারিতেও জুম্ম ভাইয়েরা খুন হয়, মহিলারা বিধবা হয়, শিশুরা খুন হয়, অনাথ হয়….তাহলে সেনাবাহিনী-সেটেলারদের সাথে জেএসএস-ইউপিডিএফ-এর তফাৎটা কোথায়? আবালা যতই পড়ে ততই জেএসএস-ইউপিডিএফ-এর রাজনৈতিক অর্জনের হিসাবের ব্যালেন্সশিট মেলাতে পারে না।এত খুন, এত রক্ত কীসের জন্যে, কার স্বার্থ রক্ষার জন্যে??? আবালা যন্ত্রণাবিদ্ধ, তার বিবেকে ধরছে না জুম্মজাতির এত ক্ষতি কীসের জন্যে আর কার স্বার্থ রক্ষার জন্যে? আবালা খুঁজে ফেরে বিবেক।তাই তার প্রশ্ন, বিবেক কাদের হাতে? যাদের হাতে মানুষ খুন হয়, তাদের বিবেক কোথায় থাকে?

তেনারা কী বলেন?

দুই দলের আত্মঘাতী খুনোখুনি নিয়ে জুম্ম জনগণ বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ, কিন্তু কেউ মুখ খুলে কথা বলতে সাহস করছে না।মাঝে মধ্যে নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে একটু আধটু ‍বিবৃতি দেওয়া হয়, বক্তব্য দেওয়া হয়, কিন্তু সেগুলো দ্বন্দ্ব-সংঘাত নিরসনের জন্যে যথেষ্ট নয়। আর ইউপিডিএফ-জেএসএস নিজে থেকে আন্তরিক না হলে এ ধরনের সংঘাত বন্ধ করা এত সহজ নয়। তাই আবালা বুঝার চেষ্টা করেছে, দুই দলের নেতারা তাদের দ্বন্দ্ব-সংঘাত বিষয়ে কী বলেন, এবং কীভাবে সমস্যাটাকে ব্যাখ্যা করেন।কেউ কেউ মনে করেন দুই দলের প্রধান ঠিক না হলে সংঘাত বন্ধ হবে না।কিন্তু তাদের নাম নাকি উচ্চারণ করা যায় না, বলতে হয়, “তেনা”। আবালার ভয় হয়। কারণ, ‘তেনা’দের নাম ধরে ডাকলে নাকি অমঙ্গল হয়। পাঠক বন্ধুরা, আপনারাও এ ব্যাপারে মতামত দিতে পারেন।

ছবি ৩ উনাদের হাত পরিস্কার (!)।পেছনে ওগুলো কী (???), সৌজন্যে আবালা চাকমা

আবালা ছবির সাহায্যে বিষয়টা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছে। দুই ‘তেনা’ পরস্পরের পার্টিকে মানেন না, পরস্পরকে অসম্মান করে কথা বলেন। জেএসএস-এর ‘তেনা’ বলেন, “ইউপিডিএফ সন্ত্রাসী সংগঠন”।আর ইউপিডিএফ-এর ‘তেনা’ বলেন, “জেএসএস দেউলিয়া সংগঠন এবং আপোসচুক্তি করে জুম্মজাতির সাখে বেঈমানী করেছে”। ৩ নং ছবি দেখুন, কীভাবে ‘তেনা’রা নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এক ‘তেনা’ নেতৃত্ব দিচ্ছেন জেএসএস-কে আরো এক ‘তেনা’ নেতৃত্ব দিচ্ছেন ইউপিডিএফ-কে। তাই আবালা কারোর নাম উল্লেখ না করে দুই ‘তেনা’র ছবি লাগিয়ে এক পাশের বাক্সে জেএসএস আর অন্য পাশের বাক্সে ইউপিডিএফ-এর নাম দেখিয়েছে। দুই ‘তেনা’ কেউ কাউরে মানেন না, তাই সংঘাত অপরিহার্য। আর “তেনা”দের মান-সম্মান রক্ষা করতে গিয়ে অকালে প্রাণ ঝরছে “সাকরেদ আর কমরেডদের”।

কিন্তু দুঃখের বিষয়, ‘তেনারা’ এ দ্বন্দ্ব-সংঘাতকে প্রকাশ্যে স্বীকার করেন না। কোন সহিংস ঘটনা ঘটলে তাদের কমরেডদের দিয়ে ঘটনার দায় অস্বীকার করা হয়। এক তেনা’র দল বলে, “আমাদের দলে কোন সন্ত্রাসী নেই”। অন্য ‘তেনা’র দল বলে, “আমরা হানাহানি রাজনীতি নয়, গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বিশ্বাসী”। এর মানে হলো, ‘তেনা’দের দল মারামারি-খুনোখুনি করে না। তেনা’দের দলে “সন্ত্রাসী” না থাকলে, অস্ত্র না থাকলে, তেনারা গণতান্ত্রিক হলে, তাহলে এত লোকের তো প্রাণ হানি হওয়ার কথা নয়, রক্তাক্ত লাশ দেখতে পাওয়ার কথা নয়, কোন শিশুর অনাথ হওয়ার কথা নয়, কোন মহিলার অকালে বিধবা হওয়ার কথা নয়।

আবালা, তার ছবির সাহায্যে যথার্থভাবে তেনা’দের দলের মিথ্যাচার ও ভেলকিবাজী উন্মোচন করেছে।মুখে মিষ্টিসুর, পেছনে লুকানো অস্ত্র আর সাজানো আছে রক্তাক্ত কফিন। এরকম মিথ্যাচার দিয়ে জনগণের মঙ্গল করা যায় কী? শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায় কী?

আমরা কী করতে পারি তেনা’দের বুঝানোর জন্যে?

আমার এ প্রশ্ন নিয়ে আমারও কোন সঠিক প্রস্তাবনা নেই। বিভিন্ন জনের কাছ যা শুনি, তেনা’দের বুঝানোর মত কোন মানুষ আমাদের জুম্মজাতির মধ্যে নেই। তাই আমি পাঠকদের কাছে আহবান রাখলাম এ ব্যাপারে কী করা যায় সেসব নিয়ে আপনাদের নিজস্ব মতামত বিনিময় করার জন্যে।

………………………………………………….

অডঙ চাকমা, ৯ অক্টোবর ২০১১

About the author

অডং চাক্‌মা

Permanent link to this article: http://chtbd.org/archives/1035

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>